পূর্বকথা
গল্পের শুরু
প্রথম অংশ: কল্পযাত্রা
দ্বিতীয় অংশ : সত্যাভিযান

রাজদ্রোহী – ২৮

অধ্যায় আটাশ

বর্তমান সময়

লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ

লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই বিরাট রাজপ্রাসাদের মতো বাড়িটা চোখে পড়ল পুকুরের অন্যপাশে। বাড়িটা দেখে শিস বাজিয়ে বলে উঠল সোহেল, ‘আরে এইটা ওই বাড়ি না? ছোটোবেলায় ইতিহাসের বইতে পড়েছিলাম বাড়িটার কথা, এইটা যে এইখানে তা জানতাম না।’

‘বেশিরভাগ মানুষই জানে না,’ সোহেল পাশ দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে পৃথা বলে উঠল। ‘আমাদের দেশে ইতিহাসটা ছোটো বাচ্চাদেরকে স্রেফ জোর করে গেলানো হয়, ইতিহাসের আসল অংশটুকুর নির্যাস নিতে দেওয়া হয় না। এই কারণে জ্ঞানটাও ওই পরীক্ষা পর্যন্তই টিকে থাকে, এরপরে আর খুব বেশি সাসটেইন করে না। চলো সবাই,’ ওরা সুন্দর আঙিনার ভেতর দিয়ে হেঁটে এগিয়ে যেতে লাগল।

‘ওয়াও, এইটাও তো খাতার পেছনের ছবিতে দেখেছি,’ ওদের হাতের ডানে সুন্দর সাদা রংয়ের একটা ভাষ্কর্য। গরুর গাড়িকে ঠেলতে থাকা একটা কিশোরের অবয়ব ফুটে উঠেছে দারুণভাবে।

‘হ্যাঁ, এটার নাম সংগ্রাম ভাষ্কর্য, শিল্পী জয়নুল আবেদিনের বানানো,’ বলে চৌধুরী ওদেরকে চারপাশে দেখল এই পুরো ফাউন্ডেশনটাই উনার প্রতিষ্ঠা করা। ‘ওই যে উনার একটা আবক্ষ মূর্তিও আছে এখানে,’ বলল সে, বঙ্গবন্ধুর ভাষণরত মূর্তির পাশেই জয়নুল আবেদীনের আবক্ষ একটা মূর্তি দেখাল।

‘ফাউন্ডেশনের অফিসটা কোনোদিকে?’ এসব কচকচানি বাশারের ভালো লাগছে না। সে দ্রুত কাজে নামতে চাইছে। প্রতিমুহূর্তে কেমন জানি এক অসহায়ত্ব আর শঙ্কা চেপে ধরছে ওকে। কেন জানি এখানে এসে ওর ময়মনসিংহের শশীলজ আর পুরনো জমিদার বাড়ির স্মৃতিগুলো উসকে উঠতে চাইছে মনের ভেতরে। যদিও কেসটাতে শেষ পর্যন্ত সফলতা এসেছ এবং সবদিক থেকেই সেটা ওর জন্যে ভালো হয়েছে, কিন্তু সেই সময়ের ভয়াবহ কিছু অভিজ্ঞতার কথা মনে হতেই বুকের ভেতরে কেমন জানি একটা অস্থিরতা তৈরি হয়। ‘উনার সাথে কী কথা হয়েছে?’ বাশার পৃথার কাছে জানতে চাইল। ‘উনি কী আছেন বা হেল্প করবেন আমাদেরকে?’

‘ফোনে কথা হয়েছে। উনি কাছাকাছিই থাকেন। এত সকালে অবশ্য উনি অফিসে আসেন না, তবে আমি আমাদের বিষয়টা জানাতেই বেশ এক্সাইটেড হয়ে উঠলেন এবং বললেন তার অফিসে গিয়ে অপেক্ষা করতে, উনি যতটা সম্ভব দ্রুত আসার চেষ্টা করবেন।’

‘কাউকে জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন মনে হয়,’ বাশার এক গার্ডকে ডেকে জিজ্ঞেস করল ফাউন্ডেশনের অফিস কোনোদিকে। সেখানে গিয়ে রিসিপশনে হামিদ সাহেবের গেস্ট পরিচয় দিতেই ওরা জানাল হামিদ সাহের ইতিমধ্যেই তাদেরকে কল করে জানিয়েছেন, ওরা যাবে, তাই বেশ খাতির-যত্ন করেই বসালো ওদেরকে। বাশার মনে মনে খুশি হয়ে উঠল। এসব আর্কিয়োলজিস্ট বা এ-ধরনের লোকের সাথে ওর কাজের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর না। কিন্তু এই লোকের আচরণে সে খানিকটা অবাকই হয়েছে। ভাব দেখে মনে হলো এ-বাকিদের মতো না, সেন্স আছে।

ওরা অফিসে বসে অপক্ষো করতে লাগল তবে ভদ্রলোক খুব বেশি দেরি করলেন না। ভদ্রলোকের চেহারা বাশারের ভাবনার সাথে বেশ মিলে গেল। পেশায় আর্কিয়োলজিস্ট হলেও, পঞ্চান্ন-ষাটের মাঝামাঝি বয়সের হ্যাংলা-পাতলা হামিদ সাহেব বেশ পরিপাটি এবং সুন্দর পোশাক পরনে। কাঁচাপাকা চুলের মোটা গোঁফওয়ালা মানুষটা রিসিপশনে প্রবেশ করে ওদেরকে দেখে হেসে উঠে পৃথার দিকে এগিয়ে এলো। ‘গুড মর্নিং, পৃথা, কতদিন পর দেখা,’ বলে সে ওদেরকে দেখল। পৃথা এক একে পরিচয় করিয়ে দিলো সবাইকে। বাশার আর সোহেলের দিকে তাকিয়ে তার ভ্রু কুঁচকালো সামান্য, ‘পুলিশ! কোনো সমস্যা কী?’ খানিকটা চোখ সরু করেই সে জানতে চাইল।

‘স্যার,’ পৃথার ঠিক মনে পড়ছিল না ভদ্রলোককে কি ও স্যার ডাকত নাকি আঙ্কেল, তাই একটু দ্বিধা বোধ করছিল, অবশেষে স্যারই ডাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে বলে উঠল, ‘আমাদের একটা বিশেষ বিষয়ে সাহায্য প্রয়োজন, এখানে তো আমরা আর কাউকে চিনিও না, আর আপনি এই এলাকা নিয়েই গবেষণা করছেন বহু বছর ধরে, এ-কারণেই সরাসরি চলে এলাম আপনার কাছে।’ ‘বিষয়টা কি কোনোভাবে তোমার বাবা বা মার সাথে সংশ্লিষ্ট?’ সে এখনও সন্দেহের দৃষ্টিতেই তাকাচ্ছে ওদের দিকে।

‘হ্যাঁ, আবার নাও,’ পৃথা দ্বিধা করছে দেখে ভদ্রলোক মৃদু হেসে উঠল। ‘আচ্ছা আমি বুঝতে পেরেছি। চল আমার অফিসে গিয়ে একান্তে কথা বলি। তোমাদেরকে চা বা অন্য কিছু দিতে বলি?’ ভদ্রলোকের আপ্যায়নের জবাবে সবাই মানা করে উঠে জানাল ওরা মাত্র চা খেয়ে এসেছে।

সবাই মিলে প্রফেসর হামিদের অফিসের কামরায় এসে বসল ওরা। সুন্দর অফিসে, বসার টেবিলের পেছনের বড়ো জানালা দিয়ে সবুজে ঘেরা পুরো ইয়ার্ড চোখে পড়ে।

‘বলো, পৃথা, ব্যাপার কী?’ বলে সে একটু দ্বিধা করল। ‘তোমার বাবার কোনো খোঁজ পাওয়া গেছে? এত ব্রিলিয়ান্ট মানুষ অথচ,’ বলে সে আফসোসের সাথে মাথা নাড়ল। ‘আসলে সত্যি কথা হলো তোমার বাবা-মা দুজনেই এত ব্রিলিয়ান্ট মানুষ অথচ উনাদের ভেতরে মিলটা হলো না, আর সব দিক থেকে সেটার সাফারার হলে তুমি, যাক গে বলো।’

‘আসলে, স্যার, আমরা মাম্মি এবং পাপা দুজনের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্যেই এসেছি,’ এইটুকু বলে সে একবার বাশারের দিকে দেখল। ‘তবে, স্যার, আপনাকে একটা কথা আগেই বলে নেই। যে-বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে এসেছি সেটা নিয়ে কিছু ঝামেলা আছে। যদিও পুলিশের লোক আমাদের সাথে আছে কিন্তু এর সাথে আরও বেশ কিছু মহল জড়িত থাকতে পারে। কাজেই কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। কাজেই আপনি যদি ইনভলভড হতে না চান বা এর সাথে জড়াতে না চান আমাদের কোনো আপত্তি নেই,’ বলে সে আবারও বাশারের দিকে তাকাতেই দেখল বাশার কিছু না বললেও চৌধুরী বেশ আপত্তির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে, এই ঝুঁকিটা পৃথা নিয়ে নিয়েছে এটা সম্ভবত তার ভালো লাগছে না। কিন্তু পৃথা জানে এইটুকু না বললে ভদ্রলোককে এর ভেতরে ইনভলভ করাটা ইথিক্যাল হবে না। ‘তবে এটাও ঠিক, স্যার, আমাদের আসলে আপনি ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না; আর তাছাড়া যেই বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে এসেছি, সেটা পাপাকে খুঁজে বের করার একটা শেষ উপায় বলতে পারেন।

যদিও আগের অংশে পৃথা লোকটাকে বিপদের ব্যাপারে আভাস দিয়েছে, কিন্তু পরেরটুকু বলে ও আসলে তাকে কনভিন্স করারই চেষ্টা করছে।

কিন্তু সে অবাক হয়ে দেখল ওর কথা শুনে ভদ্রলোক স্রেফ একটা হাসি দিলো, ‘পৃথা, আমি আর্কিয়োলজির জগতে আছি আজ পঁচিশ বছরের ওপরে। অনেকেই জানে না এই জগতে একদিকে ঝুঁকির পরিমাণ যেমন থাকে, ঠিক তেমনি করাপশনের অনেক সুযোগও থাকে। আমি আজ পর্যন্ত ক্লিন ছিলাম তবে তাই বলে নতুন একটা অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পাবো আর সেটাতে অংশগ্রহণ করবো না-স্রেফ ঝুঁকির ভয়ে এটা হতেই পারে না,’ বলে সে আবারও মৃদ হাসল। ‘এছাড়াও আসলে প্রফেসর ইফতেখারকে আমি পছন্দ করতাম, যদিও তার সাথে সেভাবে মেশার সুযোগ হয়নি আমার। কিন্তু তোমার মাম্মি, মানে ইলা ম্যাডামের সাথে আমি অনেক কাজ করেছি। আমার আর্লি ক্যারিয়ারে উনি অনেক হেল্প করেছেন। ওভারঅল বলতে গেলে তোমাদের পরিবারের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আর তাছাড়া তোমার বাবাকে সবাই অপছন্দ করলেও আমি পছন্দ করতাম কারণ স্যার ব্যতিক্রম ছিলেন। এখন বলো, বিষয়টা কী?’

পৃথা আরেকবার বাশারের দিকে দেখে নিয়ে সংক্ষেপে বলে গেল পুরো বিষয়টা কী নিয়ে। বাশার এবং চৌধুরী ওকে আগেই ব্রিফ করেছে কোন জায়গাগুলো বাদ দিতে হবে। সেগুলো বাদে সংক্ষেপে সে বেশ সুন্দর করেই বলে গেল প্রায় প্রতিটা বিষয়। বলা শেষ করে আরেকবার বাশারের দিকে দেখতেই বাশার মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

‘আচ্ছা, ম্যাপটা আছে তাহলে তোমাদের কাছে?’ প্রশ্নটা করতেই পৃথা ম্যাপটা বের করে দেখাল তাকে। ভদ্রলোক ম্যাপটা নিলেও সেটা খুলল না ওটাকে টেবিলের ওপরে রেখে, সে বলে উঠল। ‘একটা কথা বলো তো, এটা দিয়ে আসলে তোমরা ঠিক কী খুঁজে বের করতে চাইছ?’

‘স্যার, আমি একটু বলি, অনুমতি দিলে,’ বাশার বলে উঠল। ‘আসলে আমাদের শুরুর মিশনটা ছিল প্রফেসর ইফতেখারকে খুঁজে বের করা, কেন তাকে খুঁজে বের করতে চাচ্ছি সেটা তো পৃথা বললই। কিন্তু এখন আরও একটা ব্যাপার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে সেটা হলো রাজদ্রোহীর রহস্যটার সমাধান করা। চট্টগ্রাম থেকে আমাদের এজেন্ট যা আবিষ্কার করেছে সেটা স্রেফ দুভাবে বোঝা যেতে পারে, এক প্রফেসর ইফতেখার নিজে সেটার সমাধান করবেন অথবা উনি এমন কিছু রেখে গেছেন যেটা দিয়ে ওটার সমাধান করা সম্ভব হবে। কাজেই আপাতত আমাদের উদ্দেশ্য এটাই।’

আরও একটা ব্যাপার তোমাদের কথা থেকে আমি বুঝতে পেরেছি। সেটা হলো, যদিও তোমাদের উদ্দেশ্য এবং বিধেয় দুটোই এ-থেকে আলাদা কিন্তু অবশ্যই অবশ্যই এই পুরো বিষয়টার সাথে তোমার মায়ের বড়ো ধরনের কোনো সংযোগ আছে। এই ব্যাপারটাও মাথায় রাখা জরুরি।’

‘সেটা আমিও বলেছি ওদেরকে,’ চৌধুরী কথা বলে উঠল অনেকক্ষণ পর।

‘লেটস সি, এটাতে কী আছে,’ ম্যাপটা সে হাতে নিয়ে ওটার ওজন দেখল প্রথমে, তারপর ওটার কাপড়টা পরখ করল। ‘মসলিন, একেবারে পিয়োর মসলিন, সেই আদি যুগে বানানো, ভেজালগুলো নয়।’

‘একারণেই এটা সেই লকেটের ছোট্ট পরিসরের ভেতরেও ধরেছিল।’

‘মসলিনের ব্যাপারটা আরও একটা কারণে গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হলো তোমার মা কিন্তু এটা নিয়েও কাজ করেছেন,’ বলে প্রফেসর হামিদ আবারও মাথা নাড়ল। সত্যি কথা হলো উনার মতো মহিলা অমি লাইফে দেখিনি। জীবনের বেশিরভাগ সময় দেশের বাইরে থেকেছেন অথচ বেশিরভাগ সময় উনি দেশের কথাই ভাবতেন। দেশের মঙ্গলের কথা ভাবতেন,’ এইটুকু বলে সে ম্যাপটা খুলে মনোযোগের সাথে দেখতে লাগল। ‘তোমাদের কাছে কেন মনে হলো এটা এই জায়গার সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো মানচিত্র?’ ম্যাপটা দেখতে দেখতে উনি জানতে চাইলেন।

‘স্যার, ওটার কারণে,’ বাশার দেওয়ালে ঝোলানো পুরনো একটা ছবির কোণে সেই চিহ্নটা দেখিয়ে বলে উঠল। ‘যে-লকেটের ভেতরে ওটা ছিল ওটার গায়ে এই চিহ্নটা ছিল।’

‘লকেটটা কোথায়?’ প্রফেসর হামিদের প্রশ্নের জবাবে বাশার কিছু বলল না। এই অংশটা ওরা তাকে বলেনি। পৃথা চোখ গরম করে তাকাল আবার বাশারের দিকে। আর সোহেল হাসি সামলে, চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে দেখল সে-ও মৃদু হাসিমুখে তাকিয়ে আছে।

‘স্যার ওটা তো মিসিং, বাট ম্যাপটা তো এখানকারই কোনো জায়গার নাকি?’

পৃথার প্রশ্নের জবাবে, সে ম্যাপটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। রুমের একপাশে গিয়ে একটা প্রজেক্টর ওপেন করে, ওটার সংযোগ দিলো পুরনো দিনের একটা ইউএইচপি মেশিনের সাথে। ওটার নিচে, কাগজ বা কিছু ধরলে সেটা প্রজেক্টরে ডিসপ্লে করে। জিনিসটার সংযোগ দিয়ে কাপড়টা ওটার বাতির নিচে ধরতেই ওরা দেওয়ালের প্রজেক্টরে পুরো ম্যাপটা দেখতে পেল।

‘তোমরা একটা জিনিস ভুল ধারণা করেছ, ম্যাপটা ঠিক এখানকার নয়, প্রফেসর এখনও ম্যাপটা মনোযোগ দিয়ে দেখে বোঝার চেষ্টা করছে কিছু একটা।

‘তাহলে?’ পৃথা বেশ অবাক হয়েই জানতে চাইল। তা মুখ শুকিয়ে গেছে। ‘আরে এত অস্থির হবার কিছু নেই,’ প্রফেসর হামিদ হেসে উঠল। ‘এখানকার নয় বলতে সরাসরি এই জায়গার নয়, কিন্তু এই চৌহদ্দির ভেতরেই কোনো একটা জায়গার। তোমরা জানো কি না জানি না-এইখানে মোট তিনটে এলাকা আছে। বড়ো নগর, খাস নগর আর পানাম নগর। আমরা এখন আছি খাস নগরে, আর আমার যদি ভুল না হয় তবে যে-জায়গাটা ম্যাপে শো করছে ওটা পানাম নগর।’

যদিও স্যার আপনি এই এলাকার ব্যাপারে এক্সপার্ট তাও যদি জিজ্ঞেস করি, আপনি নিশ্চিত হলেন কীভাবে?’ পৃথা প্রশ্ন করল।

‘দেখো,’ বলে উনি সরে এসে দেওয়ালের ডিসপ্লের সামনে দাঁড়ালেন। এখানে দুটো আর এই পাঁচটে আউটলাইন দেখছ পুরো ম্যাপ জুড়ে?’ দাগগুলো উনি হাতে দেখালেন পয়েন্ট করে। ‘আমার যদি ভুল না হয় তবে, এগুলো পানামের পানির সাপ্লাইয়ের চিহ্ন। পানাম নগরী যখন সমৃদ্ধ ছিল এটা খুবই আধুনিক এবং স্ট্রাকচারড একটা শহর ছিল। নগরবাসীদের যাতে পানির সমস্যা না হয় সেজন্যে এখান দুটো খাল এবং পাঁচটা বড়ো বড়ো পুকুর কাটা হয়েছিল। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে এটা খুবই আধুনিক একটা ধারণা এবং খরচসাপেক্ষও বটে,’ বলে সে আউটলাইনে আবারও আঙুল রেখে দেখাল। ‘কিন্তু একটা জিনিস বুঝতে পারছি না। এটা কী?’ সে আরেকটা লাইন দেখাল। মূল আইটলানের ভেতরে চারকোনা স্ট্রাকচারগুলোর ভেতরে এটা আরেকটা লাইনের মতো কিন্তু এটা প্রবাহিত হয়েছে একেবারে ভিন্নভাবে। ‘আর এই বিন্দুগুলোই বা কী?’ ম্যাপের মধ্যে চারকোনা আকৃতিগুলোর ভেতরে ছড়ানো বেশ কিছু বিন্দুর দিকে নির্দেশ করল সে।

‘এগুলো কী কূপ হতে পারে?’ চৌধুরী মন্তব্য করার মতো করে বলে উঠল। ‘প্রফেসর হামিদের হয়তো মনে নেই, কিন্তু একসময় আমিও এখানে প্রফেসর ইফতেখারের টিমে কাজ করেছিলাম। তখন দেখেছিলাম এখানে অনেক বাড়িতেই বিশেষ করে বড়ো বাড়িগুলোর বেশিরভাগ গুলোতেই দৈনিক চাহিদার যোগানের জন্যে কুয়া আছে। সেটা কি হতে পারে?’

‘ভেরি ওয়েল সেইড,’ প্রফেসর হামিদ বেশ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল । ‘এগুলো কূপ হবার সম্ভাবনা ফেলে দেওয়া যায় না। কিন্তু সেক্ষেত্রে যে আউটলাইনগুলাকে আমরা পানির ধারা বলে ধরে নিচ্ছি সেগুলোকে বাদ দিলে, এই নিচের লাইনটা কীসের?’ সে এখনও আনমনে হাত বুলাচ্ছে ম্যাপের ওপরে। ‘এক কাজ করি চলো, পানামে চলে যাই, ওখানে গিয়ে না দেখলে ক্লিয়ার হবে বলে মনে হচ্ছে না।’ ‘আমার কাছেও সেটাই মনে হচ্ছে সেখানে গিয়ে প্র্যাকটিক্যালি দেখলে হয়তো আরও অনেক বেশি ক্লিয়ার বোঝা যাবে অনেক কিছু,’ কথাটা বলে পৃথা উঠে দাঁড়াল। বাকিদেরকে বাইরে অপক্ষো করতে বলে প্রফেসর হামিদ তার ব্যক্তিগত কামরায় গিয়ে ঢুকল। ‘ম্যাপটা?’ বাশার পৃথার কানে ফিস ফিস করে বলে উঠল। পৃথা একটু অস্বস্তির সাথে ফিরে তাকাল ওটার দিকে। জিনিসটা এখনও সেই ইউএইচপির ওপরেই রাখা। ‘আমার মনে হয় ওটা প্রফেসর হামিদই নিয়ে আসবেন। যেহেতু উনাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এখানকার পুরো বিষয়ে, কাজেই তাকে ট্রাস্ট করতে হবে এখন। আর নিজে থেকে উইলিংলি উনি আমাদেরকে হেল্প করতে চাইছেন।’

‘ঠিক আছে,’ বাশার কাঁধ ঝাঁকাল, ‘আর ম্যাপটার ছবি তো আছেই এখন আমাদের কাছে। কাজেই, নো প্রবলেম, তুমি,’ ওরা বাইরে এসে বসতেই কিছুক্ষণ পরেই বেরিয়ে এলো প্রফেসর হামিদ। বাশার দেখল ম্যাপটা তার হাতে, সেটাকে উনি ভাঁজ করে পকেটে ভরে ফেললেন। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল বাশার।

‘আমরা কি গাড়ি নিব?’ বাশার জানতে চাইল, ‘আমাদের গাড়ি—’

‘প্রয়োজন হবে না,’ প্রফেসর হামিদ হাত নেড়ে মানা করল। ‘এখান থেকে দশ মিনিট হাঁটলেই হবে।’

ওরা উনার পিছু নিয়ে হেঁটে দশ নয়, পনেরো মিনিটের ভেতরেই চলে এলো পানামের প্রবেশ পথে। প্রবেশ পথের কাছেই একটা কৃত্রিম বইতে নগরীর শুরুর দিককার ইতিহাস লেখা সংক্ষেপে, ওটার কাছেই একটা টিকেট কাটার বুথের মতো আছে। প্রফেসর থাকাতে ওদের টিকেট কাটার প্রয়োজন পড়ল না। ওরা পানামে ঢুকে ওটার মূল রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। সকালবেলা হওয়াতে এখনও তেমন একটা দর্শনার্থী নেই শুধুমাত্র নিয়মিত গ্রামের লোকজন যারা এই পথে চলাচল করে, তারা বাদে বলতে গেলে তেমন কেউই নেই।

‘এটা হলো এই নগরীর মূল পথ, একসময় এখানে ঘোড়ার গাড়ি চলত,’ এগোতে এগোতে প্রফেসর বলে উঠল। ‘এই নগরী একসময় পুরো বঙ্গদেশে তো বটেই এমনকি পুরো এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ নগরীগুলোর ভেতরে একটা ছিল।’ বাশার হাঁটতে হাঁটতে আর দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছে। চারপাশে, ভাঙাচোরা ভগ্নপ্রায় বাড়িগুলো দেখলে হয়তো এর অতীতের জৌলুসের ব্যাপারে খানিকটা ধারণা পাওয়া যায়, কিন্তু একসময় এই জায়গাই পৃথিবীর সেরা সমৃদ্ধ নগরীগুলোর একটা ছিল—সেটা ভাবাটা রীতিমতো কষ্টকর মনে হয়।

‘তোমরা কী এর ইতিহাস জানো?’ বলে সে চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘আপনি হয়তো জানেন, তাও ওদের জানার জন্যে খানিকটা বলছি—’

‘শুনেছি এটার সাথে নাকি ঈশা খাঁ আর বারো ভূঁইয়াদের সংযোগ ছিল, ‘ সোহেল বলে উঠল।

‘এটা আসলে এই নগরীর ইতিহাসের একটা অংশ,’ পৃথা যোগ করল এবার। ‘এই নগরীর ইতিহাস অনেক বেশি পুরনো।’

‘ঠিক বলেছ এটা আসলে সবসময়ই একটা ব্যাবসায়িক নগরী ছিল,’ প্রফেসর যেতে যেতে বলে চলেছেন। ‘এক হিন্দু জমিদার এটার গোড়াপত্তন করেছিলেন। মূলত ব্যাবসায়িক কারণেই। এর পেছনে কারণও ছিল। কী কারণ কেউ বলতে পারবে?’

‘কমিউনিকেশন,’ বাশার বলে উঠল। যদিও ওর আসলে ইতিহাস নিয়ে খুব একটা আগ্রহ নেই। কিন্তু আলোচনা শুনতে শুনতে নিজের মতামত দেওয়ার লোভটা সামলাতে পারল না। ‘কারণ এখান থেকে মেঘনা এবং শীতলক্ষ্যা দুটোই খুব কাছে।’

‘একদম ঠিক বলেছ তুমি,’ প্রফেসর যেতে যেতে পকেট থেকে ম্যাপটা বের করে আবারও কিছু একটা দেখলেন তারপর সন্তুষ্ট হয়ে ওটাকে পকেটে রেখে দিয়ে সে বলে উঠল। ‘হ্যাঁ, কমিউনিকেশনই মূল কারণ ছিল। আশপাশে জলপথ কাছাকাছি হওয়াতে প্রথমে হিন্দু জমিদারদের ব্যাবসার কেন্দ্রস্থল ছিল এটা, তারপর মসলিন ব্যবসায়ীদের এবং পরবর্তীতে ইংরেজদের সময়ে নীল ব্যাবসার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল এই নগরী। এই নগরী নিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত এবং প্রচলিত ঘটনাটা হলো পারস্যের কবি হাফিজকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তৎকালীন শাসক গিয়ানউদ্দিন আজম শাহ। কিন্তু বয়স বেশি হবার কারণে কবি আসতে পারেননি। কিন্তু উনি এই পানাম নিয়ে এতটাই ফ্যাসিনেটেড ছিলেন যে পরবর্তীতে একটা কবিতা লিখেছিলেন এই নগরীকে নিয়ে। ভাবা যায়?’ বলে উনি চারপাশে দেখালেন।

‘এটা ধ্বংস হলো কবে?’ বাশার জানতে চাইল।

‘মূলত এই নগরীর অবক্ষয় শুরু হয় ব্রিটিশ আমল থেকে। তখন ওরা এই অঞ্চলের ব্যাবসায়িক প্রতিপত্তি কমানোর জন্যে ধীরে ধীরে মুসলিম শাসিত অঞ্চলগুলো থেকে অনেককিছু সরিয়ে ফেলতে থাকে। ওই সময়টাতে এই এলাকার শাসনভার মুসলিমদের থেকে সরতে সরতে হিন্দু জমিদারদের ওপরে প্রবর্তিত হয়, সেখানে এখনও যে বাড়িগুলো দেখলে, রাস্তার দুপাশে দেখাল সে। ‘এর অনেকগুলোই আসলে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত হিন্দু জমিদারদের আয়ত্তে থাকা অবস্থায় সেই সময় এখান থেকে অনেক পুরনো স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। সেই সাথে অনেক কিছু আবার একাত্তরের পর মানুষজনকে ইজারা দিতে শুরু করে সরকার। ইজারাও এক সময় কমে গেলে সরকার এটাকে হেরিটেজ ঘোষণা করে। তবে মজার বিষয় কি জানো এই এলাকা এখনও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বেশ কয়েক বছর আগে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ এই নগরীকে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরীগুলোর একটা ঘোষণা করেছে।’

‘তাই নাকি?’ সোহেল বলে উঠল। ‘তারমানে এখনও এই নগরীর গুরুত্ব একেবারে কম না?’

তা তো বটেই,’ কথাটা বলে সে আবারও পকেট থেকে ম্যাপ বের করল প্রফেসর, কিছু একটা মিলিয়ে নিয়ে বলে উঠল, ‘আমি যেখান থেকে শুরু করতে চাচ্ছি আমরা কিন্তু তার কাছাকাছি চলে এসেছি,’ বলে সে ডানে মোড় নিলো।

সবাইকে এগোতে দেখলেও বাশার দাঁড়িয়ে আশপাশে তাকাল। যদিও ওরা বেশ নিরাপদ একটা জায়গাতেই আছে। কিন্তু কেন জানি অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে ওর। মনে হচ্ছে ভীষণ বিপদের ভেতরে তো আছেই কেউ হয়তো ওদের ওপরে নজর রাখছে, আনমনেই সে একবার নিজের পিস্তলে হাত বুলাল। তারপর এগিয়ে গেল প্রফেসর হামিদ যেদিকে গেছেন সেদিকে।

***

বাশার থেমে যেতেই ওদের ওপরে নজর রাখতে থাকা লোকটাও থেমে গেছিল। সে আবারও এগিয়ে যেতেই তার পাশ থেকে আরেকবার ইশারা করল এবং তারপর মৃদু স্বরে বলে উঠল, ‘লেট দেম ফিনিস দেয়ার ওয়ার্ক, তারপর মৃদু হেসে যোগ করল, ‘আমরা নিজেদেরকে দৃশ্যমান করবো ওরা যদি কিছু খুঁজে পায় তখন, কাজেই রিল্যাক্স।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *