১. এক দিনের রাজা
২. লোকার্ডের নীতি
৩. দ্য পোর্টেবলস ডটার
8. ডাউন টু দ্য বোন
৫. নড়াচড়ার উপর থাকলে ওরা তোমায় ধরতে পারবে না

দ্য বোন কালেক্টর – ৮

অধ্যায় আট

আবছা এক গুহা যেন। গরম, নিকষ অন্ধকার আর ভ্যাপসা।

নোংরা করিডর ধরে দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলল তারা। সামনে কেবল একটাই দরজা দেখতে পেল স্যাক্স। দরজার গায়ে লেখা ‘বয়লার রুম’। পুরো শরীর ঢাকা বডি আর্মার আর হেলমেট পরা ইএসইউ অফিসারের পেছনে রয়েছে সে। সবার পেছনে রয়েছে মেডিক।

হাতের ওজনে টনটন করছে ডান হাতের গাঁট আর কাঁধ। স্যুটকেসটা হাতবদল করল সে। প্রায় পড়েই যাচ্ছিল হাত ফসকে, ঐ অবস্থায় গ্রিপটা ঠিক করে নিল। দরজার কাছে পৌঁছাল তারা।

সোয়াট অফিসার ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল, আবছা আলোয় মেশিনগান তাক করে চক্কর দিল একবার। গানের নলের সাথে লাগানো ফ্ল্যাশলাইটের আলো চিরে দিল বাষ্পের কুণ্ডলী। আর্দ্রতা আর স্যাঁতসেঁতে গন্ধ পেল স্যাক্স। সেই সঙ্গে পেল আরেকটা গন্ধ, বমি আসার মতো।

ক্লিক। ‘অ্যামেলিয়া?’

রাইমের যান্ত্রিক গলার স্বর আচমকা ভেসে আসায় ভীষণ চমকে উঠল সে। ‘তুমি কোথায়, অ্যামেলিয়া?’

কাঁপা হাতে ভলিউম কমিয়ে দিল সে।

‘ভেতরে,’ ফিসফিস করে বলল।

‘বেঁচে আছে মেয়েটা?’

পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল স্যাক্স, দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ কুঁচকে দেখার চেষ্টা করল সে। প্রথমে বুঝতেই পারল না কী দেখছে। তারপর বুঝতে পারল।

‘ওহ, না!’ ফিসফিসিয়ে উঠল মেয়েটা। বমি ঠেলে এল পেটের ভেতর থেকে।

সেদ্ধ মাংসের জঘন্য গন্ধে ভরে আছে চারপাশ। কিন্তু ওটাই সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার নয়। বড় বড় আঁশের মতো উঠে আসা মেয়েটার প্রায় কমলা রঙের চামড়াটাও কোনোমতে সহ্য করা যাচ্ছে। মুখমণ্ডল থেকে পুরোপুরি খসে গেছে চামড়া। কিন্তু টি.জে. কোলফ্যাক্সের শরীরের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। দুমড়ে-মুচড়ে অসম্ভব এক কোণ তৈরি করে আছে তার হাত-পা আর ধড়। ঐ সর্বনাশা তাপ থেকে বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল বেচারি।

সে আশা করছে ভিকটিম যেন মরে গিয়ে থাকে। তার ভালোর জন্যই…

‘বেঁচে আছে ও?’ আবার জিজ্ঞেস করল রাইম।

‘না,’ ফিসফিস করে বলল স্যাক্স। ‘বাঁচার তো কোনো কারণ দেখি না…’

‘রুম কি সিকিউরড?’

অফিসারের দিকে তাকাল স্যাক্স, ট্রান্সমিশনটা শুনেছে সে-ও। মাথা নাড়ল। ‘সিন সিকিউরড।’

রাইম বলল তাকে, ‘ইএসইউ ট্রুপারকে বাইরে পাঠিয়ে দাও, তারপর তুমি আর মেডিক গিয়ে চেক করো মেয়েটাকে।’

গন্ধে আরেকবার বমি এল স্যাক্সের, জোর করে সামলে নিল নিজেকে। পাইপটার দিকে আড়াআড়িভাবে এগিয়ে গেল সে আর মেডিক। ভাবলেশহীন মুখে ঝুঁকে মেয়েটার ঘাড় স্পর্শ করল মেডিক। মাথা ঝাঁকাল পর মুহূর্তেই।

‘অ্যামেলিয়া?’ ডাকল রাইম।

ডিউটিতে থাকাকালীন এই নিয়ে দ্বিতীয় লাশ দেখল স্যাক্স। দুটোই আজকে। মেডিক বলল, ‘ডি.সি.ডি.এস.-ডিসিজড, কন্ডার্মড ডেড অ্যাট সিন।’

মাথা নাড়ল স্যাক্স, পোশাকি গলায় বলল মাইকে, ‘ভিকটিম মৃত, ঘটনাস্থলেই মারা গেছে সে।’

‘সেদ্ধ হয়ে মরেছে?’ জানতে চাইল রাইম।

‘তেমনই তো মনে হচ্ছে।’

‘দেয়ালের সাথে বাঁধা?’

‘একটা পাইপের সাথে। হাতে হাতকড়া, হাতদুটো পেছনের দিকে। পা বাঁধা নাইলনের দড়ি দিয়ে। মুখে ডাক্ট টেপ। স্টিম পাইপটা খুলে দিয়েছিল সে। ওটার মুখ থেকে মাত্র দুফুট দূরে ছিল মেয়েটা। খোদা!’

রাইম বলে চলল, ‘যেভাবে গিয়েছিলে, সেভাবেই মেডিককে পিছু হটতে বলো। দরজার দিকে। কোথায় পা ফেলছ খেয়াল রেখো।’

লাশটার দিকে তাকিয়ে থেকেই কাজটা করল সে। চামড়া এমন লাল হয় কী করে? সেদ্ধ করা কাঁকড়ার খোলসের মতো লাগছে।

‘ঠিক আছে, অ্যামেলিয়া। এবার সিন প্রসেস করতে হবে তোমাকে। স্যুটকেসটা খোলো।’

কিছু বলল না সে। তাকিয়েই রইল।

‘অ্যামেলিয়া, দরজার কাছে আছ তুমি? অ্যামেলিয়া?’

‘কী?’ চিৎকার করে উঠল সে।

‘দরজার কাছে আছ?’

লোকটার গলা কী জঘন্য রকম শান্ত! শোবার ঘরে দেখা সেই খিটখিটে, বদরাগী লোকটার চেয়ে একদম আলাদা। শান্ত… এবং অন্য কিছু একটা। যেটা ধরতে পারল না সে।

‘হ্যাঁ, দরজার কাছেই আছি। এটা পাগলামি।’

‘পুরোদস্তুর পাগলামি,’ সায় দিল রাইম, প্রায় খুশি শোনাল গলাটা। ‘স্যুটকেস খুলেছ?’

ঢাকনাটা উল্টে ভেতরে তাকাল সে।

প্লাস আর চিমটা, হাতলসহ ফ্লেক্সিবল আয়না, তুলোর বল, আই-ড্রপার, কাঁচি, পিপেট, স্প্যাচুলা, স্ক্যালপেল…

এসব এখানে কেন?

…ডাস্ট-বাস্টার বা ছোট ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, চিজ-ক্লথ, খাম, চালুনির মতো জালি, ব্রাশ, কাঁচি, প্লাস্টিক আর কাগজের ব্যাগ, ধাতব কৌটো, বোতল-পাঁচ শতাংশ নাইট্রিক অ্যাসিড, নিনহাইড্রিন, সিলিকন, আয়োডাইড, আঙুলের ছাপ তোলার সরঞ্জাম।

অসম্ভব। মাইকে বলল সে, ‘ডিটেকটিভ, আমার কথা বিশ্বাস করোনি তার মানে। আমি সত্যিই ক্রাইম সিনের কাজ কিচ্ছু জানি না।’

মেয়েটার বীভৎস লাশের উপর চোখ গেল আবার। ছাল-ওঠা নাক বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে পানি। গালের এক জায়গায় চামড়া নেই, বেরিয়ে পড়েছে হাড়ের সাদা অংশ। আর যন্ত্রণায় মুখটা এমনভাবে বেঁকে আছে যে মনে হচ্ছে মুখ ব্যাদান করে হাসছে সে। ঠিক সকালের লাশটার মতো।

‘আমি বিশ্বাস করেছি তোমাকে, অ্যামেলিয়া,’ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল সে। ‘এখন বলো, কেসটা খোলা আছে?’

হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছে। ওর গলায় আবেদন। ঠিক যেভাবে একজন প্রেমিক কথা বলে।

ঘৃণা করি ওকে আমি, ভাবল সে। পঙ্গু মানুষকে ঘৃণা করা অন্যায়। কিন্তু ঐ হারামজাদাকে ঘৃণা না করে পারা যাচ্ছে না।

‘বেসমেন্টেই আছ তো?’

‘ইয়েস, স্যার।’

‘শোনো, আমাকে লিংকন বলে ডাকতে হবে। এই কাজ শেষ হতে হতে একে অপরকে খুব ভালোভাবে চিনে ফেলব আমরা।’

বড়জোর ষাট মিনিট লাগবে, তার বেশি নয়।

‘স্যুটকেসের ভেতর কিছু রাবার ব্যান্ড পাবে, যদি ভুল না করে থাকি।’

‘পেয়েছি।’

‘জুতোর উপর পরে নাও ওগুলো। পায়ের পাতার দিকে। যদি কোনো পায়ের ছাপ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তবে বুঝতে পারবে ওগুলো তোমার।’

‘ওকে।’

‘কিছু এভিডেন্স ব্যাগ আর খাম নাও। ডজনখানেক পকেটে পুরে রাখো। চপস্টিক ব্যবহার করতে পারো?’

‘কী বললে?’

‘শহরেই থাকো তো, তাই না? মট স্ট্রিটে যাওনি কখনো? জেনারেল সাউ-এর চিকেন খেতে? বা তিলের সস দেওয়া নুডলস?’

খাবারের কথায় পেটের ভেতরটা গুলিয়ে উঠল তার। সামনে ঝুলে থাকা মেয়েটার দিকে তাকাতে চাইল না একদম।

বরফশীতল গলায় বলল সে, ‘চপস্টিক ব্যবহার করতে পারি।’

‘স্যুটকেসে দেখো। পাবে কি না নিশ্চিত নই। আমি যখন কাজ করতাম, তখন থাকত।’

‘দেখছি না তো।’

‘আচ্ছা, কিছু পেনসিল পাবে দেখো। পকেটে রাখো ওগুলো। এবার গ্রিড ধরে হাঁটবে তুমি। প্রতিটা ইঞ্চি কাভার করবে। তৈরি?’

‘হ্যাঁ।’

‘প্রথমে বলো কী দেখছ।’

‘বিশাল একটা ঘর। হয়তো বিশ বাই ত্রিশ ফুট। মরচেধরা পাইপে ভরতি। ফাটা কংক্রিট মেঝে। দেয়ালগুলো ইটের। শ্যাওলাধরা।’

‘কোনো বাক্স-টাক্স? মেঝেতে কিছু আছে?’

‘না, ফাঁকা। পাইপ, তেলের ট্যাংক আর বয়লার ছাড়া কিছু নেই। আর বালি আছে-ঝিনুকের গুঁড়ো, দেয়ালের ফাটল দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে একগাদা। আর কিছু ধূসর রঙের জিনিসও আছে…’

‘জিনিস?’ খেঁকিয়ে উঠল রাইম। ‘শব্দটা আমার ডিকশনারিতে নেই। তা জিনিস-টা কী?’

রাগের একটা ঝলক খেলে গেল স্যাক্সের ভেতর। শান্ত হয়ে বলল, ‘অ্যাসবেস্টস, তবে সকালের মতো দলা-পাকানো নয়। ঝুরঝুরে শিটের মতো।’

‘গুড। এবার প্রথম চক্কর। পায়ের ছাপ খুঁজবে আর কোনো সাজানো ক্লু আছে কি না দেখবে।’

‘তোমার মনে হয় আরো ক্লু রেখে গেছে সে?’

‘বাজি ধরতে পারি,’ বলল রাইম। ‘গগলস পরো আর পলি-লাইট ব্যবহার করো। নিচু করে ধরবে। গ্রিড ধরে এগোও। প্রতি ইঞ্চিতে। শুরু করো। গ্রিড ধরে হাঁটতে জানো তো?’

‘জানি।’

‘কীভাবে?’

তেতে উঠল সে। ‘পরীক্ষা দিতে পারব না।’

‘আহা, বলোই না। শুনি?’

‘একদিকে সামনে-পেছনে, তারপর তার আড়াআড়ি দিকে সামনে-পেছনে।’

‘প্রতি কদমে এক ফুটের বেশি জায়গা নেবে না।’

এটা জানা ছিল না তার। তারপরেও বলল, ‘জানি।’

‘এগিয়ে যাও।’

জ্বলে উঠল পলি-লাইট, এক ভৌতিক, অপার্থিব আভা। সে জানে এটাকে বলে এএলএস বা অল্টারনেটিভ লাইট সোর্স-আঙুলের ছাপ, বীর্য, রক্ত আর কিছু জুতোর ছাপ এতে জ্বলজ্বল করে ওঠে। পিত্তি-রঙা সবুজ আলোয় ছায়াগুলো নেচে উঠল, কয়েকবার তো আঁতকে উঠে পিস্তলই বের করতে যাচ্ছিল সে, পরে দেখল ওগুলো আসলে ছায়ার ভেলকি।

‘অ্যামেলিয়া?’ রাইমের গলাটা তীক্ষ্ণ। আবারো চমকে উঠল সে।

‘হ্যাঁ? কী?’

‘কোনো পায়ের ছাপ দেখছ?’

মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল সে। ‘আমি… উম, না। ধুলোর উপর কেমন যেন দাগ দেখতে পাচ্ছি। বা অমন কিছু।’

এমন অপেশাদার শব্দ ব্যবহার করায় নিজেই কুঁকড়ে গেল সে। কিন্তু রাইম পেরেত্তির মতো নয়; ও পাত্তাই দিল না। বলল, ‘তার মানে ঝাড়ু দিয়েছে। কাজ শেষে সব পরিষ্কার করে গেছে।’

অবাক হলো মেয়েটা। ‘হ্যাঁ, তাই তো! ঝাড়ু দেওয়ার দাগ। বুঝলে কী করে?’

হাসল রাইম। এই ভ্যাপসা কবরের ভেতর শব্দটা বেমানান শোনাল স্যাক্সের কানে। বলল, ‘সকালে নিজের পায়ের ছাপ ঢাকার মতো বুদ্ধি ছিল ওর; এখন না করার তো কোনো কারণ নেই। ও বেশ ঝানু মাল। তবে আমরাও কম যাই না। চালিয়ে যাও।’

উবু হয়ে জয়েন্টের ব্যথা অগ্রাহ্য করে তল্লাশি শুরু করল স্যাক্স। মেঝের প্রতি বর্গফুট দেখে শেষ করল। ‘কিছু নেই এখানে। কিচ্ছু না।’

তার গলার চূড়ান্ত হতাশার সুরটা ধরে ফেলল রাইম। ‘এই তো সবে শুরু করলে, অ্যামেলিয়া। ক্রাইম সিন ত্রিমাত্রিক হয়। মনে রেখো। তুমি বলতে চাইছ মেঝেতে কিছু নেই। এবার দেয়ালগুলো দেখো। স্টিম পাইপ থেকে সবচেয়ে দূরের জায়গাটা দিয়ে শুরু করো, প্রতি ইঞ্চি দেখবে।’

ঘরের মাঝখানে ঝুলে থাকা বীভৎস পুতুলটাকে ঘিরে ধীরে ধীরে চক্কর দিতে লাগল সে। ছয়-সাত বছর বয়সে ব্রুকলিনের রাস্তায় মেপোল খেলার কথা মনে পড়ে গেল তার, বাবা গর্বিত মুখে হোম মুভি বানাচ্ছিল তখন।

ধীরে ধীরে চক্কর দিচ্ছে। ঘরটা খালি অথচ খোঁজার মতো হাজারটা জায়গা আছে এখানে। হতাশাজনক… অসম্ভব।

কিন্তু অসম্ভব হলো না। মেঝে থেকে ছয় ফুট উঁচুতে একটা কার্নিশের উপর পরবর্তী কুগুলো পেয়ে গেল সে। খুশিতে ছোটখাটো একটা চিৎকার দিল সে। ‘পেয়েছি মনে হয়।’

‘একসাথে জড়ো করা?’

‘হ্যাঁ। কালো কাঠের একটা বড় টুকরো।’

‘চপস্টিক।’

‘কী?’ জিজ্ঞেস করল সে।

‘পেনসিলগুলো। ওগুলো দিয়ে তোলো। ভেজা নাকি?’

‘এখানকার সবকিছুই ভেজা।’

‘স্বাভাবিক। স্টিমের জন্য। ওটা কাগজের এভিডেন্স ব্যাগে রাখো। প্লাস্টিক আর্দ্রতা ধরে রাখে। আর এই গরমে ব্যাকটেরিয়া সমস্ত ট্রেস এভিডেন্স নষ্ট করে ফেলবে। আর কী আছে ওখানে?’ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল সে।

‘এটা… জানি না, চুল মনে হয়। ছোট ছোট করে ছাঁটা। একগাদা।’

‘আলগা নাকি চামড়ার সাথে লাগানো?’

‘আলগা।’

‘স্যুটকেসে দুই ইঞ্চি টেপের রোল আছে। থ্রি-এম কোম্পানির। ওটা দিয়ে তোলো।’

বেশিরভাগ চুল তুলে ফেলল স্যাক্স, কাগজের খামে রাখল। চুলের আশেপাশের কার্নিশটা পরীক্ষা করল সে।

‘কিছু দাগ দেখতে পাচ্ছি। মরচে বা রক্ত মনে হচ্ছে।’ পলি-লাইটের আলো ফেলল সে। ‘ফ্লোরোসেন্ট বা জ্বলজ্বল করছে।’

‘প্রিজাম্পটিভ ব্লাড টেস্ট করতে পারবে?’

‘না।’

‘ধরে নেই ওটা রক্ত। ভিকটিমের হতে পারে?’

‘মনে তো হয় না। অনেক দূরে ওটা আর লাশ পর্যন্ত কোনো রক্তের দাগও নেই।’

‘কোনো দিকে গেছে দাগটা?’

‘তেমনই তো মনে হচ্ছে। দেয়ালের একটা ইটের দিকে। আলগা ইটটা। কোনো ছাপ নেই ওটায়। সরাতে যাচ্ছি আমি। আমি… ওহ, জিসাস!’

এক-দুপা পিছিয়ে এল স্যাক্স, প্রায় পড়েই যাচ্ছিল।

‘কী?’ জানতে চাইল রাইম।

앞ে ঝুঁকে অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে রইল সে।

‘অ্যামেলিয়া। কথা বলো।’

‘একটা হাড়। রক্তমাখা হাড়।’

‘মানুষের?’

‘জানি না,’ জবাব দিল সে। ‘কী করে বুঝব? জানি না আমি।’

‘কাঁচা হাড়?’

‘তেমনই মনে হচ্ছে। ইঞ্চি দুয়েক লম্বা আর ব্যাসও দুই ইঞ্চি। গায়ে রক্ত আর মাংস লেগে আছে। করাত দিয়ে কাটা হয়েছে। খোদা! কোন শয়তান এমন কাজ…’

‘ভড়কে যেও না।’

‘যদি অন্য কোনো ভিকটিমের হাড় হয়?’

‘তাহলে তাকে খুব তাড়াতাড়ি খুঁজে বের করতে হবে আমাদের, অ্যামেলিয়া। ব্যাগে ভরো ওটা। হাড়ের জন্য প্লাস্টিক ব্যবহার করো।’

কাজটা করার সময় রাইম জিজ্ঞেস করল, ‘আর কোনো সাজানো ক্লু আছে?’ চিন্তিত শোনাল তাকে।

‘না।’

‘এটুকুই? চুল, একটা হাড় আর কাঠের টুকরো। কাজটা খুব একটা সহজ করছে না সে, তাই না?’

‘এটা কি তোমার… অফিসে নিয়ে আসব?’

হাসছে রাইম। ‘সে তো চাইবেই আমরা হাল ছেড়ে দেই। কিন্তু না। এখনো শেষ হয়নি। আনসাব ৮২৩ সম্পর্কে আরো কিছু জানা যাক।’

‘কিন্তু এখানে তো আর কিছু নেই।’

‘আছে, অ্যামেলিয়া। তার ঠিকানা, ফোন নম্বর, তার চেহারা, তার আশা-আকাঙ্ক্ষা-সব আছে ওখানে। তোমার চারপাশেই আছে।’

তার এই মাস্টারি ফলানো গলা শুনে মেজাজ খারাপ হলো স্যাক্সের। চুপ করে রইল সে।

‘ফ্ল্যাশলাইট আছে সাথে?’

‘আমার ইস্যু করা হ্যালোজেনটা আছে…’

‘না,’ গজগজ করে বলল সে। ‘ইস্যু করা বাতিতে আলো কম। টুয়েলভ-ভোল্টের ব্রড বিম লাইটটা দরকার।’

‘ওটা তো আনিনি,’ রেগে গিয়ে বলল স্যাক্স। ‘গিয়ে নিয়ে আসব?’

‘সময় নেই। পাইপগুলো দেখো।’

মিনিট দশেক ধরে খুঁজল সে, সিলিং পর্যন্ত উঠে গেল, শক্তিশালী আলো ফেলে এমন সব কোনায় উঁকি দিল যেখানে হয়তো গত পঞ্চাশ বছরে আলো পড়েনি।

‘না, কিচ্ছু দেখছি না।’

‘দরজার কাছে ফিরে যাও। জলদি।’

একটু ইতস্তত করে ফিরে এল সে।

‘ওকে, এসেছি।’

‘এবার। চোখ বন্ধ করো। কীসের গন্ধ পাচ্ছ?’

‘গন্ধ? গন্ধ শুঁকতে বলছ?’ পাগল নাকি লোকটা?

‘ক্রাইম সিনে সব সময় বাতাসের গন্ধ শুঁকবে। একশোটা কথা বলে দিতে পারে ঐ বাতাস।’

বড় বড় চোখে তাকিয়ে বুকভরে শ্বাস নিল সে। বলল, ‘তেমন কিছু তো পাচ্ছি না।’

‘এটা কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর নয়।’

হতাশায় শ্বাস ফেলল সে, আশা করল সেই দীর্ঘশ্বাসের শব্দ রাইমের টেলিফোনে পরিষ্কার শোনা যাবে। চোখদুটো জোর করে বন্ধ করল, শ্বাস নিল, বমি ভাবটা আটকাল আবার। ‘শ্যাওলা, ভ্যাপসা গন্ধ। স্টিমের গরম পানির গন্ধ।’

‘কোথেকে আসছে জানার দরকার নেই। শুধু বর্ণনা করো।’

‘গরম পানি। মেয়েটার পারফিউম।’

‘নিশ্চিত যে ওটা ওরই?’

‘মানে, না।’

‘তুমি কোনো পারফিউম দিয়েছ?’

‘না।’

‘আফটারশেভ? মেডিক বা ইএসইউ অফিসারের?’

‘মনে হয় না।’

‘বর্ণনা করো গন্ধটা।’

‘কড়া ঝাঁঝালো। অনেকটা জিন মদের মতো।’

‘অনুমান করো, পুরুষের আফটারশেভ নাকি মেয়েদের পারফিউম?’

নিক কী ব্যবহার করত? অ্যারাইড এক্সট্রা ড্রাই।

‘জানি না,’ বলল সে। ‘পুরুষের।’

‘লাশটার কাছে যাও।’

পাইপটার দিকে একবার তাকাল সে, তারপর চোখ নামাল মেঝেতে। ‘আমি…’

‘যাও,’ লিংকন রাইম বলল।

গেল সে। খোসা ওঠা চামড়াগুলো কালচে লাল বার্চ গাছের ছালের মতো দেখাচ্ছে।

‘ওর ঘাড়টা শুঁকে দেখো।’

‘সব তো… মানে, চামড়াই তো নেই।’

‘আমি দুঃখিত, অ্যামেলিয়া, কিন্তু তোমাকে করতেই হবে। ওটা ওর পারফিউম কি না দেখতে হবে আমাদের।’

শ্বাস টানল মেয়েটা। বমি ঠেলে বেরিয়ে এল তাতে। প্রায় উগড়ে দিল সে। বমি করে ফেলব আমি, ভাবল সে। ঠিক পাঞ্চোস বারের সেই রাতের মতো। নিকের সাথে ঐ জঘন্য ফ্রোজেন ডাইকুইরি খেয়ে ঐ অবস্থা হয়েছিল। দুজন কসাই মার্কা পুলিশ, নীল প্লাস্টিকের সোর্ডফিশ ভাসানো মেয়েলি ড্রিংকটা সামাল দিতে পারেনি।

‘পারফিউমের গন্ধ পাচ্ছ?’

এই তো এল বলে… বমি আসছে আবার। না! না! চোখ বন্ধ করল সে, মন দিল হাড়ের ব্যথায়। সবচেয়ে বেশি ব্যথা করছে হাঁটুতে। আর জাদুর মতোই বমি ভাবটা কেটে গেল। ‘এটা ওর পারফিউম নয়।’

‘গুড। তার মানে আমাদের খোকা হয়তো শৌখিন, প্রচুর আফটারশেভ মাখে। সামাজিক অবস্থানের একটা সূচক হতে পারে এটা। অথবা হয়তো অন্য কোনো গন্ধ ঢাকার চেষ্টা করছে সে। রসুন, সিগারেট, মাছ, হুইস্কি। দেখতে হবে। এবার, অ্যামেলিয়া, মন দিয়ে শোনো।’

‘কী?’

‘আমি চাই তুমি খুনির মনে ঢুকে যাও।’

ওহ। সাইকোগিরি। এটারই অভাব ছিল।

‘আমার মনে হয় না এর জন্য সময় আছে আমাদের।’

‘ক্রাইম সিনের কাজে সময়ের অভাব সব সময়ই থাকে,’ মোলায়েম গলায় বলল রাইম। ‘তাতে তো আর আমরা থেমে যাই না। ওর মনের ভেতর ঢোকো। এতক্ষণ আমাদের মতো করে ভাবছিলে। এবার ওর মতো করে ভাবো।’

‘সেটা করব কী করে?’

‘কল্পনাশক্তি ব্যবহার করো। ওটা তো খোদা এমনি এমনি দেননি। এখন তুমি হলে খুনি। ওকে হাতকড়া পরিয়েছ, মুখে টেপ মেরেছ। ওকে ঐ ঘরে নিয়ে গেলে। পাইপের সাথে বাঁধলে। ভয় দেখালে। ব্যাপারটা উপভোগ করছ তুমি।’

‘কী করে জানলে সে উপভোগ করেছে?’

‘তুমি উপভোগ করছ। সে নয়। কী করে জানলাম? কারণ উপভোগ না করলে কেউ এত কষ্ট করে এসব করে না। এখন ভাবো, এখানকার পথঘাট তোমার চেনা। আগেও এসেছ তুমি।’

‘কেন মনে হলো?’

‘জায়গাটা আগে রেকি করতে হয়েছে তোমাকে-স্টিম সিস্টেমের ফিডার পাইপসহ এমন নির্জন জায়গা খুঁজে বের করতে। আর রেললাইনের ধারে কুগুলো রেখে আসার জন্য।’

লোকটার ভরাট, নিচু স্বরে আচ্ছন্ন হয়ে গেল স্যাক্স। ভুলেই গেল লোকটার শরীর অকেজো। ‘ওহ। তা ঠিক।’

‘স্টিম পাইপের ঢাকনাটা খুললে তুমি। কী ভাবছ তখন?’

‘জানি না। ভাবছি কাজটা সেরে দ্রুত কেটে পড়ি।’

মুখ দিয়ে কথাটা বেরোতেই মনে হলো: ভুল।

রাইমের চুকচুক শব্দ শুনে অবাক হলো না সে। ‘সত্যিই কি তাই?’ জিজ্ঞেস করল সে।

‘না। আমি চাই ব্যাপারটা দীর্ঘস্থায়ী হোক।’

‘হ্যাঁ! আমারও তাই মনে হয়। স্টিমে ওর কী দশা হবে তাই ভাবছ তুমি। আর কী মনে হচ্ছে?’

‘আমি…’

অস্পষ্ট একটা চিন্তা উঁকি দিল মাথায়। মেয়েটা বাঁচার জন্য ধস্তাধস্তি করছে দেখতে পেল সে। অন্য কিছু দেখল… অন্য কাউকে। তাকে, ভাবল সে। আনসাব ৮২৩। কিন্তু তার ব্যাপারে কী? প্রায় ধরে ফেলেছে ও ব্যাপারটা। কী… কী যেন? কিন্তু হঠাৎ করেই চিন্তাটা মিলিয়ে গেল। এক মুহূর্ত আগেও ছিল। এখন নেই।

‘জানি না,’ ফিসফিস করে বলল সে।

‘কোনো তাড়া অনুভব করছ? নাকি বেশ ধীরস্থিরভাবে কাজ করছ?’

‘তাড়া আছে। পালাতে হবে। যেকোনো মুহূর্তে পুলিশ চলে আসতে পারে। কিন্তু তবুও আমি…’

‘কী?’

‘চুপ!’ নিজেকেই ধমক দিল সে, সারা ঘরে চোখ বোলাল, হারিয়ে যাওয়া চিন্তাটার সূত্র খুঁজছে। ঘরটা দুলছে, এক কালো তারাময় রাত যেন। অন্ধকারের ঘূর্ণি আর দূরে জন্ডিস রোগীর মতো হলুদ আলো। খোদা, অজ্ঞান যেন না হই!

ঐ তো! ওটাই। স্টিম পাইপটার দিকে তাকিয়ে আছে স্যাক্স। ঘরের এক কোনায় ছায়ার মধ্যে আরেকটা অ্যাকসেস প্লেট বা ঢাকনা দেখতে পেল সে। মেয়েটাকে লুকানোর জন্য ওটাই বেশি ভালো জায়গা ছিল। করিডর দিয়ে হেঁটে গেলে চোখে পড়ত না। আর দ্বিতীয় প্লেটটায় মাত্র চারটা বল্টু, আটটা নয়, যেটা সে বেছে নিয়েছে সেটার মতো।

ঐ পাইপটা বাছল না কেন?

তারপর বুঝতে পারল সে।

‘সে চায় না… আমি এখনই যেতে চাইছি না, কারণ আমি ওর উপর নজর রাখতে চাই।’

‘কেন মনে হলো?’ জানতে চাইল রাইম, একটু আগে স্যাক্সের বলা কথারই প্রতিধ্বনি করল যেন।

‘অন্য আরেকটা পাইপের সাথে বাঁধতে পারতাম ওকে, কিন্তু আমি এমন একটা বেছে নিলাম যেটা একদম খোলামেলা জায়গায় আছে।’

‘যাতে দেখতে পাও ওকে?’

‘তাই তো মনে হয়।’

‘কেন?’

‘হয়তো ও যাতে পালাতে না পারে তা নিশ্চিত করতে। হয়তো মুখের বাঁধনটা ঠিক আছে কি না দেখতে… আমি জানি না।’

‘ গুড, অ্যামেলিয়া। কিন্তু এর মানে কী? এই তথ্যটা কীভাবে কাজে লাগাব আমরা?’

স্যাক্স এমন একটা জায়গা খুঁজল যেখান থেকে নিজেকে আড়াল করে মেয়েটাকে সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা সম্ভব। দুটো বড় হিটিং-অয়েল ট্যাংকের মাঝখানের অন্ধকার জায়গাটাই উপযুক্ত মনে হলো।

‘হ্যাঁ!’ উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠল সে, মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। ‘সে এখানে ছিল।’ অভিনয়ের কথা ভুলে গেল সে। ‘ঝাড়ু দিয়েছে।’

পলি-লাইট বারের পিত্তি-রঙা আলো ফেলল সে। ‘পায়ের ছাপ নেই,’ হতাশ গলায় বলল। কিন্তু আলোটা নেভানোর জন্য তুলতেই ট্যাংকের গায়ের একটা দাগ জ্বলে উঠল। ‘প্রিন্ট পেয়েছি একটা!’ ঘোষণা করল সে।

‘প্রিন্ট?’

‘মেয়েটাকে ভালো করে দেখার জন্য ট্যাংকে ভর দিয়ে সামনে ঝুঁকলে এমন প্রিন্টই পড়ার কথা। ওটাই করেছে সে, আমি নিশ্চিত। কিন্তু লিংকন… এটা অদ্ভুত। কেমন যেন… বিকৃত। হাতটা।’

দানবীয় হাতের ছাপটার দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠল সে।

‘স্যুটকেসে ডিএফও লেখা একটা অ্যারোসল বোতল আছে। ফ্লোরোসেন্ট স্টেইন। প্রিন্টটার উপর স্প্রে করো, পলি-লাইট ফেলে ওয়ান-টু-ওয়ান পোলারয়েড দিয়ে ছবি তোলো।’

কাজটা শেষ করে জানাল সে।

রাইম বলল, ‘এবার ট্যাংকের মাঝখানের মেঝেটা ডাস্ট-বাস্টার দিয়ে পরিষ্কার করো। কপাল ভালো থাকলে হয়তো কোনো চুল বা নখ কামড়ানোর টুকরো পাওয়া যাবে।’

আমার বদভ্যাস, ভাবল স্যাক্স। এই একটা জিনিসের জন্যই তার মডেলিং ক্যারিয়ারটা শেষ হয়ে গিয়েছিল-রক্তাক্ত নখ আর চিন্তিত ক্রয়ের জন্য। থামানোর অনেক চেষ্টা করেছিল সে। শেষে হাল ছেড়ে দিয়েছে, হতাশ হয়ে ভেবেছে সামান্য একটা অভ্যেস কীভাবে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

‘ভ্যাকুয়াম ফিল্টারটা ব্যাগে ভরো।’

‘কাগজের?’

‘হ্যাঁ, কাগজ। এবার লাশটা দেখো, অ্যামেলিয়া।’

‘কী?’

‘লাশটা প্রসেস করতে হবে তোমাকে।’

বুকটা ধক করে উঠল তার। অন্য কেউ করুক। প্লিজ, অন্য কাউকে দিয়ে করাও। বলল, ‘এমই বা ডাক্তার শেষ না করা পর্যন্ত ধরা যাবে না। এটাই নিয়ম।’

‘আজ কোনো নিয়ম নেই, অ্যামেলিয়া। আমরা আমাদের নিয়মেই চলব। মেডিক্যাল এক্সামিনার আমাদের পরেই পাবে ওকে।’

মেয়েটার কাছে এগিয়ে গেল স্যাক্স।

‘রুটিন জানো তো?’

‘ হ্যাঁ।’ প্রায় গলে যাওয়া শরীরটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে। তারপর জমে গেল। হাতদুটো লাশের চামড়া থেকে কয়েক ইঞ্চি দূরে। পারব না আমি। শিউরে উঠল সে। নিজেকে বলল কাজটা করতে। কিন্তু পারল না; পেশিগুলো সাড়া দিচ্ছে না।

‘স্যাক্স? আছ তুমি?’

জবাব দিতে পারল না সে। আমি পারব না… অসম্ভব। পারব না।

‘স্যাক্স?’

আর তারপর নিজের মনের গহীনে উঁকি দিল সে। আর কেমন করে যেন বাবাকে দেখতে পেল। ইউনিফর্ম-পরা বাবা, ওয়েস্ট ফর্টি-সেকেন্ড স্ট্রিটের তপ্ত, গর্তভরা ফুটপাতে ঝুঁকে এক খোস-পাঁচড়া ভরা মাতালকে বাড়ি পৌঁছাতে সাহায্য করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

তারপর দেখল তার প্রেমিক নিককে-ব্রংকসের এক শুঁড়িখানায় বসে বিয়ার খাচ্ছে আর হাসছে এক হাইজ্যাকারের সাথে, যে কিনা জানতে পারলে এক মুহূর্তের মধ্যেই মেরে ফেলত তরুণ আন্ডারকাভার পুলিশটাকে।

তার জীবনের দুই পুরুষ, নিজেদের যা করণীয় তাই করছে।

‘অ্যামেলিয়া?’

ছবি দুটো ভেসে রইল তার মনে। আর কেন ওগুলো তাকে শান্ত করল, বা সেই প্রশান্তি কোথেকে এল, তা ঘুণাক্ষরেও টের পেল না সে।

‘আমি আছি,’ লিংকন রাইমকে বলল সে। আর তাকে যা শেখানো হয়েছে সেই কাজে মন দিল। নখের নিচ থেকে ময়লা নিল, এরপর শরীর এবং মাথার চুল আঁচড়ে দিল। কী করছে তা প্রতি মুহূর্তে জানাতে লাগল রাইমকে। উপেক্ষা করল মেয়েটার চোখের সেই নিষ্প্রভ গোলক দুটো… উপেক্ষা করল টকটকে লাল মাংস। চেষ্টা করল গন্ধটা উপেক্ষা করার।

‘ওর জামাকাপড় নাও,’ রাইম বলল। ‘সব কেটে নাও। নিচে একটা খবরের কাগজ পেতে নাও যাতে কোনো আলগা আলামত পড়ে গেলে ধরা যায়।’

‘পকেট চেক করব?’

‘না, ওটা এখানে করব। কাগজে মুড়িয়ে নাও ওগুলো।’

ব্লাউজ আর স্কার্টটা কেটে ফেলল স্যাক্স, প্যান্টিটাও। বুকের উপর ঝুলে থাকা ব্রা-টা ধরার জন্য হাত বাড়াল সে। স্পর্শটা অদ্ভুত লাগল, আঙুলের চাপেই খুলে এল জিনিসটা। এমনভাবে চমকে উঠল যেন ওকে থাপ্পড় মেরেছে কেউ। বুঝতে পারল কী ধরে আছে সে। ছোট্ট একটা চিৎকার বেরিয়ে গেল মুখ দিয়ে।

কাপড় নয় ওটা, চামড়া।

‘অ্যামেলিয়া? ঠিক আছ?’

‘হ্যাঁ!’ হাঁপাচ্ছে সে। ‘ঠিক আছি।’

‘বাঁধনগুলো বর্ণনা করো।’

‘মুখে ডাক্ট টেপ-দুই ইঞ্চি চওড়া। হাতে স্ট্যান্ডার্ড পুলিশি হাতকড়া, পায়ে নাইলনের দড়ি।’

‘শরীরে পলি-লাইট ফেলো। খালি হাতে ছুঁয়ে থাকতে পারে। প্রিন্ট খোঁজো।’

খুঁজল সে। ‘কিছু নেই।’

‘ওকে। এবার দড়িটা কাটো, তবে গিঁটের উপর দিয়ে নয়। ব্যাগে ভরো। প্লাস্টিকের।’

তাই করল স্যাক্স।

তারপর রাইম বলল, ‘হাতকড়াটা লাগবে আমাদের।’

‘ওকে। আমার কাছে চাবি আছে।’

‘না, অ্যামেলিয়া। চাবি দিয়ে খুলো না।’

‘কী?’

‘হাতকড়ার লকের মেকানিজম থেকে আসামির ট্রেস পাওয়ার খুব ভালো সম্ভাবনা থাকে।’

‘তাহলে চাবি ছাড়া খুলব কী করে?’ হেসে ফেলল সে।

‘ স্যুটকেসে একটা রেজার স বা করাত আছে।’

‘হাতকড়া কেটে ফেলতে বলছ?’

একটু বিরতি। রাইম বলল, ‘না, হাতকড়া নয়, অ্যামেলিয়া।’

‘তাহলে কী কাটতে বলছ… ওহ, ইয়ার্কি করছ না নিশ্চয়ই। ওর হাত?’

‘করতেই হবে তোমাকে।’ তার অনিচ্ছায় বিরক্ত হলো রাইম।

ঠিক আছে, অনেক হয়েছে। সেলিটো আর পোলিং এক পাগলের সাথে জুড়ে দিয়েছে তাকে। ওদের ক্যারিয়ার হয়তো ডুবছে, কিন্তু আমি ওদের সাথে ডুবব না। ‘বাদ দাও।’

‘অ্যামেলিয়া, এটা এভিডেন্স সংগ্রহের আরেকটা উপায় মাত্র।’

ওকে এত যুক্তিবাদী শোনাচ্ছে কেন? মরিয়া হয়ে অজুহাত খুঁজল সে।

‘আমি কাটতে গেলে রক্ত মেখে একাকার হবে…’

‘ওর হৃৎপিণ্ড তো আর চলছে না। তাছাড়া,’ টিভির রাঁধুনির মতো যোগ করল সে, ‘রক্ত এতক্ষণে জমাট বেঁধে গেছে।’

বমি ভাবটা আবার ফিরে এল অ্যামেলিয়ার।

‘যাও, অ্যামেলিয়া। স্যুটকেসের কাছে যাও। করাতটা নাও। ঢাকনার উপরেই আছে।’ এরপর হিমশীতল গলায় যোগ করল, ‘প্লিজ।’

‘নখের নিচের ময়লা নিতে বললে কেন তাহলে? আমি তো হাতদুটোই নিয়ে যেতে পারতাম!’

‘অ্যামেলিয়া, হাতকড়াটা দরকার আমাদের। ওটা এখানেই খুলতে হবে আর এমই-র জন্য অপেক্ষা করার সময় নেই আমাদের। কাজটা করতেই হবে।’

দরজার কাছে ফিরে এল সে। ফিতেগুলো খুলল, খাপ থেকে বের করল সেই ভয়াল করাতটা। নোংরা ঘরের মাঝখানে জমে যাওয়া সেই যন্ত্রণাক্লিষ্ট ভঙ্গিমার দিকে তাকিয়ে রইল সে।

‘অ্যামেলিয়া? অ্যামেলিয়া?’

বাইরে আকাশটা তখনো গুমোট। হলদে বাতাস ভারী হয়ে আছে। আশেপাশের দালানগুলো পোড়া হাড়ের মতো কালিতে মাখামাখি। তারপরেও, বাইরে এসে এত স্বস্তি আগে কখনো পায়নি স্যাক্স।

এক হাতে সিইউ স্যুটকেস, অন্য হাতে রেজার স, গলার কাছে অকেজো হয়ে ঝুলে আছে হেডসেটটা। পুলিশ আর দর্শকদের ভিড় উপেক্ষা করে সোজা স্টেশন ওয়াগনের দিকে হাঁটা দিল স্যাক্স।

সেলিত্তোর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় না থেমেই তার হাতে করাতটা ধরিয়ে দিল, প্রায় ছুঁড়েই দিল বলা চলে।

‘ওর যদি এতই শখ থাকে তো ওকে বলো নিজের পায়ে হেঁটে এসে কাজটা সেরে যেতে।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *