১. এক দিনের রাজা
২. লোকার্ডের নীতি
৩. দ্য পোর্টেবলস ডটার
8. ডাউন টু দ্য বোন
৫. নড়াচড়ার উপর থাকলে ওরা তোমায় ধরতে পারবে না

দ্য বোন কালেক্টর – ২১

অধ্যায় একুশ

‘একেবারে ডাউনটাউনে চলো, স্যাক্স,’ রেডিওতে ভেসে এল রাইমের গলা।

আরআরভি-র অ্যাক্সিলেটরে পা ডাবিয়ে দিল অ্যামেলিয়া, লাল বাতি জ্বলে উঠল। ওয়েস্ট সাইড হাইওয়ে ধরে ডাউনটাউনের দিকে গর্জন করে ছুটল গাড়িটা। বরফের মতো ঠান্ডা মাথায় ওয়াগনটার গতি আশিতে তুলল সে।

‘ওকে, থামো,’ বলল জেরি ব্যাংকস।

কাউন্টডাউন শুরু হলো। টুয়েন্টি-থার্ড স্ট্রিট, টুয়েন্টিয়েথ, ফোর্টিন্থ স্ট্রিটের গার্বেজ বার্জ ডকের কাছে স্কিড করে এক চক্কর। ভিলেজ আর মিটপ্যাকিং ডিস্ট্রিক্টের ভেতর দিয়ে যখন তারা ঝড়ের বেগে যাচ্ছে, ঠিক তখনই একটা সেমি-ট্রাক সাইড স্ট্রিট থেকে সোজা তার সামনে বেরিয়ে এল। ব্রেক না কষে স্টিপল-চেজারের মতো ওয়াগনটাকে মাঝখানের আইল্যান্ডের উপর দিয়ে চালিয়ে নিল সে। ব্যাংকসের গলা দিয়ে গোঙানি বেরিয়ে এল। আর বিশাল হোয়াইট ট্রাকটার এয়ার হর্ন আর্তনাদ করে উঠল। অদ্ভুতভাবে ভাঁজ হয়ে গেছে ওটা।

গাড়ি ঘুরিয়ে সাউথবাউন্ড লেনে ফিরে এল সে। রাইমকে বলল, ‘আবার বলুন। শুনতে পাইনি।’

কানে লাগানো ইয়ারফোন দিয়ে রাইমের যান্ত্রিক গলা ভেসে এল। ‘ডাউনটাউন, এটুকুই বলতে পারি। পাতাটার মানে বের করার আগ পর্যন্ত।’

‘আমরা ব্যাটারি পার্ক সিটির দিকে আসছি।’

‘জোয়ার আসতে আর পঁচিশ মিনিট বাকি,’ বলল ব্যাংকস। হয়তো ডেলরের টিম লোকটার পেট থেকে সঠিক জায়গার নামটা বের করতে পারবে। মিস্টার ৮২৩-কে হয়তো কোনো গলিতে টেনে নিয়ে গিয়ে এক বস্তা আপেল দিয়ে পিটুনি দেবে তারা। নিক তাকে বলেছিল আসামিদের ‘সহযোগিতা’ করানোর জন্য ওটাই নাকি ওদের নিয়ম। এক বস্তা ফল দিয়ে পেটে মারো। প্রচণ্ড ব্যথা হয়। কোনো দাগ থাকে না। বড় হওয়ার সময় সে ভাবত না যে পুলিশরা এমন কাজ করে। এখন সে জানে ব্যাপারটা অন্য রকম।

তার কাঁধে টোকা দিল ব্যাংকস। ‘ঐ যে। একগাদা পুরোনো পিয়ার।’

আনসাব ৮২৩
চেহারাগাড়ি / বাসাঅন্যান্য
• শ্বেতাঙ্গ পুরুষ, হালকা গড়ন, মধ্যম স্বাস্থ্য • পোশাক: কালো, গাঢ় রঙের পোশাক পরে •গ্লাভস, লালচে কিডস্কিন •আফটারশেভ (অন্য কোনো গন্ধ ঢাকার জন্য?) •স্কি মাস্ক? নেভি বু? •গাঢ় রঙের গ্লাভস• হলুদ ক্যাব • সম্ভবত সেফ হাউজ আছে • নতুন মডেলের সেডান (রং: ধূসর/রুপালি/বেইজ) • অবস্থান: ব্রডওয়ে ও ৮২তম স্ট্রিট (শপরাইট), ব্রডওয়ে ও ৯৬তম স্ট্রিট (অ্যান্ডারসন ফুডস) গ্রিনউইচ ও ব্যাংক স্ট্রিট (শপরাইট) ২য় এভিনিউ, ৭২-৭৩তম স্ট্রিট (গ্রোসারি ওয়ার্ল্ড) ব্যাটারি পার্ক সিটি জে অ্যান্ড জি’স এম্পোরিয়াম (১৭০৯ ২য় এভিনিউ) অ্যান্ডারসন ফুডস (৩৪তম স্ট্রিট ও লেক্সিংটন এভিনিউ) ফুড ওয়্যারহাউজ (৮ম এভিনিউ ও ২৪তম স্ট্রিট) শপরাইট (হিউস্টন ও লাফায়েট স্ট্রিট) জে অ্যান্ড জি’স এম্পোরিয়াম (৬ষ্ঠ এভিনিউ ও হিউস্টন) গ্রোসারি ওয়ার্ল্ড (গ্রিনউইচ ও ফ্র্যাংকলিন)• ক্রাইম সিন প্রসিডিউর জানে • সম্ভবত আগের ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে • ফিঙ্গারপ্রিন্ট অ্যানালাইসিস জানে • পিস্তল = .৩২ কোল্ট • ভিক্টিমকে অদ্ভুতভাবে বাঁধে
  • প্রাচীন জিনিস তাকে টানে কাজ চালানোর মতো জার্মান জানে • একজন ভিক্টিমকে ‘হ্যানা’ বলে ডেকেছে • মাটির নিচের দুনিয়া তার কাছে আকর্ষণীয় • দ্বৈত ব্যক্তিত্ব • সে একজন যাজক, সমাজকর্মী বা কাউন্সিলর হতে পারে • জুতোর তলায় অস্বাভাবিক ক্ষয়। প্রচুর বই পড়ে? • ভিকটিমের আঙুল ভাঙার শব্দ শুনেছে, তদন্তকারীদের ভ্যাংচানোর জন্য সাপ রেখে গেছে • ভিকটিমের পা ছিলার ইচ্ছা ছিল • এক ভিকটিমকে ‘ম্যাগি’ নামে ডেকেছে • মা ও সন্তানের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা? • ক্রাইম ইন ওল্ড নিউ ইয়র্ক বইটা কি তার মডেল? জেমস স্নাইডার বা ‘বোন কালেক্টর’-এর কায়দায় অপরাধ করছে • পুলিশের প্রতি ঘৃণা আছে

পচা কাঠ, নোংরা? ভূতুড়ে জায়গা সব। বাঁকা করে গাড়ি থামাল তারা, লাফিয়ে নামল, দৌড় দিল পানির দিকে।

‘আছেন আপনি, রাইম?’

‘কথা বলো, স্যাক্স। কোথায় তুমি?’

‘ব্যাটারি পার্ক সিটির ঠিক উত্তরে একটা পিয়ারে।’

‘ইস্ট সাইড থেকে লনের খবর পেলাম। কিছুই পায়নি সে।’

‘কোনো আশা নেই,’ বলল মেয়েটা। ‘ডজনখানেক পিয়ার আছে এখানে। তারপর বেড়ানোর পুরো পথটা… সাথে ফায়ারবোট হাউজ, ফেরি ডক, ব্যাটারি পার্কের পিয়ার…ইএসইউ-কে দরকার আমাদের।’

‘আমাদের সাথে ইএসইউ নেই, স্যাক্স। ওরা আর আমাদের দলে নেই।’

জোয়ার আসতে আর কুড়ি মিনিট। তার চোখদুটো তীরের উপর দিয়ে ছুটে বেড়াল। হতাশায় ঝুলে পড়ল তার কাঁধ। অস্ত্রে হাত রেখে নদীর দিকে দৌড় লাগাল সে, জেরি ব্যাংকসও খুব একটা পেছনে নেই।

‘পাতাটা সম্পর্কে কিছু একটা বের করো, মেল। একটা আন্দাজ করো, যা খুশি। বানিয়ে বলো।’

উশখুশ করতে করতে মাইক্রোস্কোপ থেকে কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকাল কুপার। ম্যানহাটনে আট হাজার জাতের পাতাযুক্ত গাছ আছে। ‘কোনোটার কোষের গঠনের সাথে মিলছে না।’

‘এটা পুরোনো,’ বলল রাইম। ‘কত পুরোনো?’

আবারো পাতাটার দিকে তাকাল কুপার। ‘মমি হয়ে গেছে। আমার মনে হয় একশো বছর, হয়তো একটু কম।’

‘গত একশো বছরে কী বিলুপ্ত হয়ে গেছে?’

‘ম্যানহাটনের মতো ইকোসিস্টেমে গাছপালা বিলুপ্ত হয় না। আবার ফিরে আসে।’

রাইমের মাথায় একটা টুং শব্দ হলো। কিছু একটা মনে করার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে সে। এই অনুভূতিটা ভালোবাসে সে, আবার ঘৃণাও করে। হয়তো স্লো পপ-আপ ফ্লাইয়ের মতো চিন্তাটাকে ধরে ফেলতে পারবে সে। কিংবা হয়তো পুরোপুরি মিলিয়ে যাবে ওটা, রেখে যাবে পেয়েও হারিয়ে ফেলার জ্বালা।

জোয়ার আসতে আর ষোলো মিনিট। চিন্তাটা কী ছিল? ওটার সাথে কুস্তি লড়ল সে, চোখ বন্ধ করল…

পিয়ার বা জেটি, ভাবছিল সে। ভিকটিম পিয়ারের নিচে আছে। ওটা নিয়ে কী? ভাবো!

পিয়ার… জাহাজ… খালাস করা… মালপত্র বা কার্গো।

মাল খালাস!

ঝট করে চোখ খুলল তার। ‘মেল, ওটা কি কোনো ফসল?’

‘ওহ, হেল। আমি তো সাধারণ বাগান করার পেজগুলো দেখছিলাম, চাষ করা ফসল নয়।’ মনে হলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে টাইপ করল সে।

‘কী হলো?’

‘দাঁড়ান, দাঁড়ান। এনকোডেড বাইনারিগুলোর একটা লিস্ট পেয়েছি।’ স্ক্যান করল সে। ‘আলফালফা, বার্লি, বিট, ভুট্টা, ওটস, তামাক…’

‘তামাক! ওটা ট্রাই করো।’ মাউসে ডাবল ক্লিক করল কুপার, আর স্ক্রিনে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল ছবিটা।

‘ওটাই!’

‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড টাওয়ার,’ ঘোষণা করল রাইম। ‘ওখান থেকে উত্তরের জমিটা একসময় তামাকের ক্ষেত ছিল। টম, আমার বইয়ের রিসার্চ-১৭৪০ সালের ম্যাপটা চাই। আর বো হাউম্যান অ্যাসবেস্টস ক্লিন-আপ সাইটের জন্য যে আধুনিক ম্যাপটা ব্যবহার করছিল সেটাও। ওগুলো দেয়ালে টাঙাও, পাশাপাশি।’

রাইমের ফাইলে পুরোনো ম্যাপটা খুঁজে পেল সহকারী। বিছানার কাছে দেয়ালে দুটোই টেপ দিয়ে আটকাল সে। কাঁচা হাতে আঁকা, পুরোনো ম্যাপটায় বসতি গড়া শহরের উত্তরাঞ্চল দেখা যাচ্ছে-দ্বীপের নিচের দিকের একটা অংশ-ক্ষেতে ঢাকা। নদীর ধারে তিনটা বাণিজ্যিক জেটি ছিল, তখন নদীটাকে হাডসন না বলে ওয়েস্ট রিভার বলা হতো।

শহরের সাম্প্রতিক ম্যাপটার দিকে তাকাল রাইম। ক্ষেতখামারগুলো উধাও হয়ে গেছে স্বাভাবিকভাবেই, আদি জেটিগুলোও নেই। কিন্তু আধুনিক ম্যাপটায় একটা পরিত্যক্ত জেটি দেখা যাচ্ছে ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে তামাক রপ্তানিকারকের পুরোনো পিয়ারগুলোর একটা ছিল।

সামনে ঝুঁকতে চাইল রাইম, দেখার চেষ্টা করল কোন রাস্তার কাছে ওটা। টমকে ডেকে ম্যাপটা কাছে ধরতে বলতে যাচ্ছিল সে, ঠিক তখনই নিচতলা থেকে একটা জোর খটাস শব্দ শুনল, আর দরজাটা ভেঙে ভেতরে পড়ল। কাচ ভাঙল ঝনঝন করে।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল টম।

‘আমি ওকে দেখতে চাই।’ হলওয়ে ভরাট করে দিল সেই কর্কশ গলা।

‘একটু-‘ শুরু করল সহকারী।

‘না। এক মিনিট পর নয়, এক ঘণ্টা পর নয়। রাইট। ফাকিং। নাউ।’

‘মেল,’ ফিসফিস করে বলল রাইম, ‘এভিডেন্সগুলো সরিয়ে ফেলো, সিস্টেম বন্ধ করো।’

‘কিন্তু-‘

‘করো!’ জোরে মাথা নাড়ল রাইম, হেডসেটের মাইক্রোফোনটা খুলে গেল। ক্লিনিট্রনের পাশে পড়ে গেল ওটা। সিঁড়িতে দুপদাপ পায়ের শব্দ।

দেরি করানোর জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করল টম। কিন্তু আগন্তুকরা তিনজন ফেডারেল এজেন্ট আর তাদের দুজনের হাতেই বড় বড় বন্দুক। ধীরে ধীরে তাকে পিছু হঠিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে তুলে আনল তারা।

অবিশ্বাস্যভাবে পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে একটা কম্পাউন্ড মাইক্রোস্কোপ খুলে ফেলল মেল কুপার এবং এফবিআই সিঁড়ি দিয়ে ঝড়ের বেগে রাইমের ঘরে ঢোকার আগেই শান্তভাবে পার্টসগুলো গুছিয়ে রাখতে শুরু করল। এভিডেন্স ব্যাগগুলো একটা টেবিলের নিচে ঢুকিয়ে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।

‘আহ, ডেলরে,’ জিজ্ঞেস করল রাইম। ‘আমাদের আনসাবকে খুঁজে পেয়েছ বুঝি?’

‘আমাদের বলোনি কেন?’

‘কী বলব?’

‘যে আঙুলের ছাপটা ভুয়া।’

‘কেউ তো জিজ্ঞেস করেনি আমাকে।’

‘ভুয়া?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল কুপার।

‘আসলে, ওটা আসল ছাপই ছিল।’ রাইমের কথা শুনে মনে হলো এমনটা হরহামেশাই ঘটে থাকে। ‘কিন্তু ওটা আনসাবের ছিল না। আমাদের খোকা-র শিকার ধরার জন্য একটা ট্যাক্সির দরকার ছিল। তাই তার দেখা হলো-নামটা যেন কী?’

‘ভিক্টর পিটর্স,’ বিড়বিড় করল ডেলরে। এরপর ক্যাব ড্রাইভারের ইতিবৃত্ত শোনাল।

‘দারুণ চাল,’ সত্যিকার মুগ্ধতার সাথেই বলল রাইম। ‘ক্রিমিনাল রেকর্ড আর মানসিক সমস্যা আছে এমন এক সার্বিয়ানকে বেছে নিয়েছে। কে জানে কতদিন ধরে এমন ক্যান্ডিডেট খুঁজছিল সে। যাই হোক, বেচারা মি. পিটর্সকে খুন করল ৮২৩, তার ক্যাবটা চুরি করল। তার আঙুল কেটে নিল। ওটা নিজের কাছে রেখে দিয়েছিল এবং ভেবেছিল আমরা যদি বেশি কাছে চলে আসি, তবে আমাদের বিভ্রান্ত করার জন্য কোনো একটা সিনে সুন্দর পরিষ্কার একটা ছাপ রেখে আসবে। মনে হয় কাজটা সে ঠিকঠাকই করেছে।’ ঘড়ির দিকে তাকাল রাইম। আর মাত্র চৌদ্দ মিনিট।

‘জানলে কী করে?’ রাইমের দেয়ালের ম্যাপগুলোর দিকে তাকাল ডেলরে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, ওগুলোতে কোনো আগ্রহ দেখাল না সে।

‘ছাপটায় পানিশূন্যতা আর কুঁচকে যাওয়ার লক্ষণ ছিল। বাজি ধরে বলতে পারি লাশটার অবস্থা খারাপ ছিল। আর তোমরা ওটা বেসমেন্টে পেয়েছ? ঠিক বলছি? ওখানেই আমাদের খোকা তার শিকারদের জমা করে রাখে।’

তাকে পাত্তাই দিল না ডেলরে, বিশাল এক টেরিয়ার কুকুরের মতো সারা ঘর শুঁকে বেড়াতে লাগল। ‘আমাদের এভিডেন্স কোথায় লুকিয়েছ?’

‘এভিডেন্স? আমি জানি না তুমি কীসের কথা বলছ। আচ্ছা, তুমি কি আমার দরজা ভেঙেছ? গতবার নক না করেই ঢুকেছিলে। এবার তো ভেঙেই ফেললে।’

‘জানো, লিংকন, আমি আগের বারের জন্য ক্ষমা চাইব ভাবছিলাম-‘

‘ভদ্রতার জন্য ধন্যবাদ, ফ্রেড।’

‘কিন্তু এখন তোমার পাছাটায় লাথি মারার চেয়ে মাত্র এক ইঞ্চি দূরে আছি আমি।’

মেঝের উপর ঝুলে থাকা মাইক্রোফোন হেডসেটটার দিকে তাকাল রাইম। কল্পনা করল ইয়ারফোন থেকে স্যাক্সের গলা ব্যা-ব্যা করে ভেসে আসছে।

‘আমাকে ঐ এভিডেন্সগুলো দাও, রাইম। বুঝতে পারছ না কী জঘন্য ঝামেলায় ফেঁসেছ তুমি।’

‘টম,’ ধীরে ধীরে বলল রাইম, ‘এজেন্ট ডেলরে আমাকে চমকে দিয়েছিল। ওয়াকম্যানের হেডসেটটা ফেলে দিয়েছি। ওটা একটু বেডফ্রেমে আটকে দেবে?’

একটুও ভড়কাল না সহকারী। রাইমের মাথার কাছে মাইকটা রেখে দিল সে, ডেলরের নজরের আড়ালে। ‘ধন্যবাদ,’ টমকে বলল রাইম।

তারপর যোগ করল, ‘জানো, আমার গোসলটা এখনো হয়নি। আমার মনে হয় সময় হয়েছে, কী বলো?’

‘ভাবছিলাম কখন চাইবেন,’ জন্মগত অভিনেতার দক্ষতায় বলল টম। ‘কথা বলো, রাইম। ফর ক্রাইস্ট সেক। কোথায় তুমি?’

তখন হেডসেটে একটা গলা শুনতে পেল সে। টমের। কেমন যেন আড়ষ্ট, অতিরঞ্জিত শোনাল। কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে।

‘নতুন স্পঞ্জটা পেয়েছি,’ বলল গলাটা। ‘ভালোই মনে হচ্ছে,’ জবাব দিল রাইম। ‘রাইম?’ ফস করে বলে উঠল স্যাক্স। ‘হচ্ছেটা কী?’

‘দাম সতেরো ডলার। ভালো তো হওয়ারই কথা। তোমাকে পাশ ফিরিয়ে দেবো এবার।’

আরো গলার স্বর ভেসে এল ইয়ারশনে, কিন্তু বুঝতে পারল না সে।

স্যাক্স আর ব্যাংকস ওয়াটারফ্রন্ট ধরে জগিং করছে, জেটিগুলোর উপর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে হাডসন নদীর ধূসর-বাদামি পানির দিকে। ব্যাংকসকে থামার ইশারা করল সে, পাঁজরের নিচের খিল ধরা ব্যথাটা কমানোর জন্য শরীরটা বাঁকাল, থুতু ফেলল নদীতে। দম নেওয়ার চেষ্টা করল।

হেডসেটের ভেতর শুনতে পেল: ‘…বেশি সময় লাগবে না। মাফ করবেন, জেন্টলমেন।’ ‘…আমরা অপেক্ষা করছি।’

‘একটু প্রাইভেসি কি পেতে পারি না এখানে?’

‘রাইম, শুনতে পাচ্ছ?’ মরিয়া হয়ে ডাকল স্যাক্স। কী করছে লোকটা?

‘উঁহু। যারা এভিডেন্স চুরি করে, তাদের জন্য কোনো প্রাইভেসি নেই।’

ডেলরে! রাইমের ঘরে সে। তার মানে সব শেষ। ভিকটিম মরেই গেছে ধরে নেওয়া যায়।

‘ঐ এভিডেন্স চাই আমার!’ ধমকে উঠল এজেন্ট।

‘বেশ, যা পাবে তা হলো একজন মানুষের স্পঞ্জ বাথ নেওয়ার প্যানারোমিক দৃশ্য।’

банкস কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তাকে চুপ থাকার ইশারা করল সে। বিড়বিড় করা কিছু শব্দ কানে এল স্যাক্সের। সাথে এজেন্টের রাগী চিৎকার। তারপর আবার রাইমের শান্ত গলা।

‘… জানো, ডেলরে, আমি সাঁতারু ছিলাম। রোজ সাঁতার কাটতাম।’

‘দশ মিনিটেরও কম সময় আছে আমাদের,’ ফিসফিস করে বলল স্যাক্স। পানি শান্তভাবে ছলাৎ ছলাৎ করছে। দুটো নৌকা ধীরে ধীরে ভেসে গেল পাশ দিয়ে।

বিড়বিড় করে কিছু বলল ডেলরে। ‘আমি হাডসন নদীতে গিয়ে সাঁতার কাটতাম। তখন অনেক পরিষ্কার ছিল পানিটা।’

ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ। লাইনটা কেটে যাচ্ছে।

‘…পুরোনো পিয়ার। আমার প্রিয়টা এখন আর নেই। হাডসন ডাস্টারদের আস্তানা ছিল ওটা। ঐ গ্যাংটা, নাম শুনেছ ওদের? ১৮৯০ সালের দিকে। এখন যেখানে ব্যাটারি পার্ক সিটি তার উত্তরে। তোমাকে বোরড দেখাচ্ছে। এক পঙ্গুর থলথলে পাছা দেখতে দেখতে ক্লান্ত, না? যা ইচ্ছা করো। ঐ পিয়ারটা ছিল নর্থ মুর আর চেম্বার্সের মাঝখানে। আমি ডাইভ দিতাম, পিয়ারগুলোর চারপাশে সাঁতার কাটতাম…’

‘নর্থ মুর আর চেম্বার্স!’ চিৎকার করে উঠল স্যাক্স। ঘুরল। বড্ড বেশি দক্ষিণে চলে এসেছিল বলে ওরা মিস করেছে। ওরা যেখানে আছে, সেখান থেকে মাত্র সিকি মাইল দূরে। বাদামি রঙের জরাজীর্ণ কাঠটা দেখতে পেল সে, একটা বিশাল ড্রেনপাইপ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকছে। কত সময় বাকি? নেই বললেই চলে। তাকে বাঁচানোর কোনো উপায় নেই।

হেডসেটটা ছিঁড়ে ফেলে গাড়ির দিকে দৌড় লাগাল সে, ব্যাংকস ঠিক পেছনেই।

‘সাঁতার জানো?’ জিজ্ঞেস করল সে। ‘আমি? হেলথ অ্যান্ড র‍্যাকেট ক্লাবে এক-আধ ল্যাপ দিয়েছি।’

ওরা পারবে না। হঠাৎ থেমে গেল স্যাক্স, চট করে একপাক ঘুরে নিল, তাকিয়ে রইল জনশূন্য রাস্তাগুলোর দিকে।

পানি প্রায় তার নাক পর্যন্ত।

***

শ্বাস নেওয়ার সময়ে উইলিয়াম এভারেটের মুখের উপর ছোট একটা ঢেউ আছড়ে পড়ল। সেই নোংরা, নোনা তরল ঢুকে গেল তার গলায়। গলা আটকে আসতে শুরু করেছে, ঘড়ঘড় করে শব্দ হচ্ছে। শরীরটা মোচড় দিয়ে উঠল। পানি দিয়ে ভরে গেল ফুসফুস। পিয়ারের খুঁটি থেকে হাত ফসকে গেল তার। সাথে সাথেই পানির নিচে তলিয়ে গেল সে। শক্ত হয়ে গেল শরীরটা। আবার ভেসে উঠল, তারপর আবার ডুবল। না, খোদা, না…প্লিজ…

হাতকড়া নাড়ল সে, লাথি মারল জোরে, একটু নড়াচড়ার জায়গা পাওয়ার আশায়। যেন কোনো মিরাকল ঘটবে আর তার দুর্বল পেশিগুলো ঐ বিশাল বল্টুটাকে বাঁকিয়ে ফেলবে। নাক দিয়ে পানি ঝাড়ছে, আতঙ্কে এপাশ-ওপাশ করছে মাথাটা। মুহূর্তের জন্য ফুসফুসটা পরিষ্কার করল সে। ঘাড়ের পেশিগুলোয় আগুন জ্বলছে-ভাঙা আঙুলের মতোই যন্ত্রণাদায়ক। মাথাটা পেছনের দিকে বাঁকিয়ে মুখের ঠিক উপরে থাকা বাতাসের পাতলা স্তরটা খোঁজার চেষ্টা করছে।

মুহূর্তের জন্য স্বস্তি পেল সে।

তারপর আরেকটা ঢেউ, একটু উঁচু।

আর ওটাই শেষ।

লড়তে পারবে না আর। হার মানল। এভলিনের সাথে দেখা হবে এবার… অবশেষে উইলিয়াম এভারেট নিজেকে ছেড়ে দিল। পানির নিচে সেই নোংরা আবর্জনায় ভরা পানির মধ্যে ভাসতে লাগল সে, আগাছার লতাপাতা জড়িয়ে আছে।

তারপর আতঙ্কে ছিটকে সরে এল। না, না…

किডন্যাপারটা ফিরে এসেছে। লাথি মেরে ভেসে উঠল এভারেট, আরো পানি ঝাড়ল নাক দিয়ে, পালানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল। এভারেটের চোখে তীব্র আলো ফেলল লোকটা। একটা ছুরি নিয়ে তার দিকে হাত বাড়াল।

না, না…

আমাকে ডুবিয়ে মারাটাই যথেষ্ট ছিল না, এখন কেটেকুটে মারতে হবে! না ভেবেই তার দিকে লাথি মারল এভারেট। কিন্তু পানির নিচে অদৃশ্য হয়ে গেল কিডন্যাপার…আর তারপরই, খটাস। এভারেটের হাত মুক্ত হয়ে গেল।

মৃত্যুচিন্তা ভুলে জানপ্রাণ দিয়ে লাথি মেরে ভেসে উঠল বুড়ো, নাক দিয়ে টেনে নিল টক টক বাতাস। এরপর মুখ থেকে টেপটা ছিঁড়ে ফেলল। হাঁপাচ্ছে, থু করে ফেলছে নোংরা পানি। ওক কাঠের পিয়ারের নিচের দিকে তার মাথাটা ঠুকল সজোরে। উচ্চস্বরে হেসে উঠল সে। ‘ওহ, গড, গড, গড…’

তারপর আরেকটা মুখ ভেসে উঠল… ওটাও হুড পরা, সাথে আরেকটা চোখধাঁধানো বাতি লাগানো। এভারেট লোকটার ওয়েটস্যুটের উপর এনওয়াইপিডি-র প্রতীকটা আবছা দেখতে পেল। ওদের হাতে ছুরি নয়, মেটাল কাটার। একজন এভারেটের ঠোঁটের মাঝে একটা তেতো রাবার মাউথপিস গুঁজে দিল। এক বুক সতেজ অক্সিজেন টেনে নিল সে। ডু্বুরি তার কোমরে হাত দিয়ে ধরে তাকে সাঁতরে পিয়ারের কিনারায় নিয়ে গেল।

‘বুকভরে শ্বাস নিন, এক মিনিটের মধ্যেই বেরিয়ে যাব আমরা।’ বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিল সে। চোখ বন্ধ করে ডুবুরির সাথে পানির গভীরে চলল। লোকটার কপালে থাকা হলুদ আলোয় ভূতুড়ে লাগছে জায়গাটাকে। ছোট কিন্তু হাড় হিম করা এক ভ্রমণ হলো সোজা নিচে। তারপর ঘোলা, শ্যাওলাভরা পানির ভেতর দিয়ে উপরে। একবার ডুবুরির হাত ফসকে গিয়েছিল, মুহূর্তের জন্য আলাদা হয়ে গিয়েছিল তারা। কিন্তু উইলিয়াম এভারেট ব্যাপারটা গায়েই মাখল না। আজ সন্ধ্যার পর উত্তাল হাডসন নদীতে একা সাঁতার কাটা তার কাছে নস্যি।

***

ট্যাক্সি নেওয়ার কোনো প্ল্যান ছিল না তার। এয়ারপোর্টের বাসটাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু বড্ড কম ঘুমানোয় খিটখিট করছে প্যামি। সেই ভোর পাঁচটা থেকে জেগে আছে দুজনেই। অস্থির হয়ে উঠেছে তাই। ছোট মেয়েটাকে শিগগিরই বিছানায় শোয়াতে হবে, কম্বল মুড়ি দিয়ে আর হাওয়াইয়ান পাঞ্চের বোতলটা সাথে দিয়ে। তাছাড়া, ক্যারলের নিজেরও ম্যানহাটনে যাওয়ার জন্য আর তর সইছিল না। সে এক রোগা মিডওয়েস্টের মেয়ে। একচল্লিশ বছরের জীবনে ওহাইও-র চেয়ে পূর্বে কখনো আসেনি। নিউ ইয়র্ক দেখার জন্য ফেটে যাচ্ছে সে।

লাগেজ সংগ্রহ করল ক্যারল। এরপর ওরা এক্সিটের দিকে এগোল। সেদিন বিকেলে কেট আর এডির বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ে যা যা নিয়েছিল, সব সাথে আছে কি না চেক করল। প্যামি, পুহ, পার্স, কম্বল, স্যুটকেস, হলুদ ন্যাপস্যাক। সব আছে।

শহরটা সম্পর্কে তাকে সাবধান করে দিয়েছিল তার বন্ধুরা। ‘তোমাকে বোকা বানাবে ওরা,’ বলেছিল এডি। ‘পার্স ছিনতাইকারী, পকেটমার।’

‘আর রাস্তায় ঐ তাসের জুয়া খেলো না যেন,’ যোগ করেছিল কেট, মায়ের মতো গলায়।

‘আমি তো নিজের লিভিং রুমেও তাস খেলি না,’ হেসে মনে করিয়ে দিয়েছিল ক্যারল। ‘ম্যানহাটনের রাস্তায় কেন খেলতে যাব?’

তবে ওদের এই উদ্বেগের কদর করে সে। যাই হোক, সে এখানে এসেছে, এক বিধবা, সাথে তিন বছরের বাচ্চা, চলেছে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন শহরে ইউএন কনফারেন্সের জন্য-এত বিদেশি সে জীবনে একসাথে দেখেনি। এত মানুষই দেখেনি।

একটা পে ফোন খুঁজে রেসিডেন্স হোটেলে ফোন করল ক্যারল, রিজার্ভেশন চেক করার জন্য। নাইট ম্যানেজার বলল রুম রেডি আছে, ওদের জন্য অপেক্ষা করছে। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে দেখা হবে।

অটোমেটিক দরজা দিয়ে বেরোতেই ভ্যাপসা গরম বাতাস এসে ঝাপটা মারল। থমকে দাঁড়াল ক্যারল, চারপাশে তাকাল। এক হাতে প্যামিকে শক্ত করে ধরে আছে, অন্য হাতে পুরোনো স্যুটকেসের হাতল। ভারী হলুদ ন্যাপস্যাকটা কাঁধে ঝুলছে। ট্যাক্সি স্টার্টার বুথের সামনে যাত্রীদের লাইনে দাঁড়াল তারা।

হাইওয়ের উল্টো দিকে একটা বিশাল বিলবোর্ডের দিকে তাকাল ক্যারল। ‘ওয়েলকাম ইউ.এন. ডেলিгеটস!’ লেখা ওতে। আঁকাআঁকিটা জঘন্য, তবুও অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল সে; বিলবোর্ডের একজন মানুষকে দেখতে রনির মতো লাগছে। বছর দুয়েক আগে সে মারা যাওয়ার পর বেশ কিছুদিন সবকিছুতেই নিজের সুদর্শন, ক্রু-কাট স্বামীকে খুঁজে পেত সে। ম্যাকডোনাল্ডসের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মনে পড়ত বিগ ম্যাক পছন্দ করত সে। সিনেমার অভিনেতারা, যাদের সাথে তার চেহারার কোনো মিল নেই, তারাও হয়তো ঘাড়টা কাত করত ঠিক তার মতো করে। লন-মোয়ার বিক্রির লিফলেট দেখলে মনে পড়ত আর্লিংটন হাইটসের এক চিলতে উঠোনের ঘাস কাটতে কতটা ভালোবাসত সে।

তারপর কান্না আসত। আবার প্রোজ্যাক বা ইমিগ্রামিন গেলা শুরু করত সে। এক সপ্তাহ বিছানায় পড়ে থাকত। অনিচ্ছাসত্ত্বেও কেটের প্রস্তাবে রাজি হতো, ওদের সাথে এডির বাড়িতে গিয়ে থাকত এক রাত। বা এক সপ্তাহ। অথবা এক মাস।

কিন্তু আর কান্না নয়। জীবনটা নতুন করে শুরু করতে এসেছে সে। দুঃখ এখন অতীত।

ঘর্মাক্ত কাঁধ থেকে কালচে সোনালি চুলের রাশিটা ঝেড়ে ফেলে প্যামিকে সামনে এগিয়ে দিল ক্যারল, লাগেজগুলো লাথি মেরে সরাল সামনে, ট্যাক্সির লাইন বেশ কয়েক ধাপ এগিয়েছে। চারপাশে তাকাল সে, ম্যানহাটনকে এক ঝলক দেখার আশায়। কিন্তু ট্রাফিক, বিমানের লেজ, মানুষ, ক্যাব এবং গাড়ির সমুদ্র ছাড়া আর কিছুই দেখা গেল না। ম্যানহোল থেকে ভূতের মতো বাষ্প উড়ছে। রাতের আকাশটা কালো, হলুদ আর কুয়াশাচ্ছন্ন।

যাক গে, শিগগিরই শহরটা দেখতে পাবে সে, আন্দাজ করল। আশা করল প্যামির বয়স হয়েছে, প্রথম দেখার স্মৃতিটা মনে রাখতে পারবে।

‘আমাদের অ্যাডভেঞ্চারটা কেমন লাগছে বলো তো, সোনা?’

‘অ্যাডভেঞ্চার। আমার অ্যাডভেঞ্চার ভালো লাগে। আমি ওয়াইয়ান পাঞ্চ খাব। দেবে, প্লিজ?’

প্লিজ… এটা নতুন। তিন বছরের মেয়েটা সব কায়দাকানুন শিখে ফেলছে। হাসল ক্যারল। ‘শিগগিরই দেবো তোমাকে।’

অবশেষে একটা ট্যাক্সি পেল তারা। ট্রাংকটা খুলে গেল। লাগেজগুলো ভেতরে ছুঁড়ে দিয়ে ডালাটা বন্ধ করল ক্যারল। পেছনের সিটে উঠে দরজা বন্ধ করল তারা। প্যামি, পুহ, পার্স…

ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায়?’ মিডটাউন রেসিডেন্স হোটেলের ঠিকানা দিল সে, প্লেক্সিগ্লাস ডিভাইডারের ভেতর দিয়ে চিৎকার করে।

ট্রাফিকের ভিড়ে গাড়ি ঢোকাল ড্রাইভার। সিটে হেলান দিয়ে প্যামিকে কোলে বসাল ক্যারল।

‘আমরা কি ইউএন-এর পাশ দিয়ে যাব?’ জানতে চাইল সে। কিন্তু লোকটা লেন বদলানোয় ব্যস্ত থাকায় শুনতে পেল না।

‘আমি কনফারেন্সের জন্য এসেছি,’ বুঝিয়ে বলল সে। ‘ইউএন কনফারেন্স।’ তবুও কোনো উত্তর নেই।

ভাবল লোকটার হয়তো ইংরেজিতে সমস্যা আছে। কেট তাকে সাবধান করেছিল যে নিউ ইয়র্কের ট্যাক্সি ড্রাইভাররা সব বিদেশি। (‘আমেরিকানদের চাকরি খেয়ে দিচ্ছে,’ গজগজ করত এডি। ‘তবে ওসব কথা বাদ দাও।’) দাগ ধরা ডিভাইডারের ভেতর দিয়ে তাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। হয়তো কথা বলতে চাইছে না লোকটা।

আরেকটা হাইওয়েরে উঠল তারা। হঠাৎ সামনে ভেসে উঠল শহরের আঁকাবাঁকা স্কাইলাইন। ঝলমলে। কেট আর এডি যে ক্রিস্টাল জমাত ঠিক তেমন। দ্বীপের মাঝখানে নীল, সোনালি আর রুপালি দালানের বিশাল এক গুচ্ছ। আরেকটা গুচ্ছ বাঁ দিকে, অনেকটা দূরে। জীবনে এত বড় কিছু দেখেনি ক্যারল। মুহূর্তের জন্য দ্বীপটাকে বিশাল এক জাহাজ বলে মনে হলো।

‘দেখো, প্যামি, ওখানেই যাচ্ছি আমরা। সুউউউন্দর না?’

পর মুহূর্তেই অবশ্য দৃশ্যটা আড়াল হয়ে গেল, ড্রাইভার এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নেমে র‍্যাম্পের নিচ দিয়ে দ্রুত বাঁক নিল। তারপর তপ্ত, জনশূন্য রাস্তা দিয়ে এগোতে লাগল তারা, দুপাশে অন্ধকার ইটের দালান।

সামনে ঝুঁকল ক্যারল। ‘শহরে যাওয়ার রাস্তা কি এটাই?’

আবারো কোনো উত্তর নেই।

প্লেক্সিগ্লাসে জোরে টোকা দিল সে। ‘ঠিক পথে যাচ্ছেন তো? জবাব দিন। জবাব দিন!’

‘মাম্মি, কী হয়েছে?’ কেঁদে উঠল প্যামি।

‘কোথায় যাচ্ছেন আপনি?’ চেঁচিয়ে উঠল ক্যারল।

কিন্তু ধীরে সুস্থে গাড়ি চালিয়ে গেল লোকটা। সব লাল বাতিতে থামছে, গতিসীমা পার হচ্ছে না। যখন সে অন্ধকার, পরিত্যক্ত এক কারখানার পেছনের জনশূন্য পার্কিং লটে ঢুকল, তখনো ঠিকঠাক সিগন্যাল দিতে ভুলল না।

সর্বনাশ!

একটা স্কি মাস্ক পরে ক্যাব থেকে নামল সে। হেঁটে পেছনের দিকে এল, দরজায় হাত দিল। কিন্তু ইতস্তত করে হাত নামিয়ে নিল কেন যেন। হঠাৎ সামনে ঝুঁকল সে, জানালার কাচে মুখ ঠেকিয়ে টোকা দিল! একবার, দুবার, তিনবার। রেপটাইিল রুমে টিকটিকির দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো। দরজা খোলার আগে মা ও মেয়ের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *