অধ্যায় ছত্রিশ
দুই পা ফেলেই বিছানার কাছে পৌঁছে গেল টেলর। রাইমের আঙুলের নিচ থেকে ইসিইউ কন্ট্রোলারটা ছোঁ মেরে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলল ঘরের কোনায়।
চিৎকার করার জন্য শ্বাস নিল রাইম।
কিন্তু ডাক্তার বলল, ‘ও-ও মরেছে। কনস্টেবলটা।’ দরজার দিকে মাথা নাড়ল সে, নিচের পাহারাদারের কথা বলছে।
মেরুদণ্ড ভাঙা প্রাণীর মতো ছটফট করছে পোলিং, মেঝে আর দেয়ালে রক্ত ছিটাচ্ছে, আর টেলর মুগ্ধ হয়ে দেখছে দৃশ্যটা।
‘জিম!’ চিৎকার করে উঠল রাইম। ‘না, ওহ, না…’
ক্যাপ্টেনের হাতদুটো তার ক্ষত-বিক্ষত বুকের উপর কুঁকড়ে গেল। গলা দিয়ে ভেসে এল ভয়ানক এক ঘড়ঘড়ে শব্দ। মেঝেতে পাজোড়া নিয়ন্ত্রণহীনভাবে নড়ায় জুতো দিয়ে ধুপধাপ আওয়াজ হতে লাগল। অবশেষে একটা প্রচণ্ড খিঁচুনি দিয়ে স্থির হয়ে গেল সে। রক্তজবা চোখজোড়া নিঃস্পন্দ চেয়ে রইল ছাদের দিকে।
বিছানার দিকে ফিরল টেলর, লিংকন রাইমের উপর চোখ রেখে ঘুরতে শুরু করল। ধীরে ধীরে চক্কর দিচ্ছে, হাতে ছুরি। জোরে শ্বাস নিচ্ছে।
‘কে তুমি?’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল রাইম।
নিঃশব্দে এগিয়ে এল ডাক্তার, রাইমের হাতে আঙুল রাখল, হাড়টা কয়েকবার টিপল, হয়তো জোরে, হয়তো বা আস্তে। তার হাত চলে গেল রাইমের বাঁ হাতের অনামিকায়। ইসিইউ থেকে আঙুলটা তুলল সে। রক্তমাখা ছুরি দিয়ে ওটায় আদর করল। ধারালো আগাটা ঢুকিয়ে দিল নখের নিচে। হালকা ব্যথা পেল রাইম, গা গুলিয়ে এল। তারপর আরো জোরে। বড় বড় শ্বাস পড়তে লাগল ওর।
হঠাৎ কিছু একটা দেখে জমে গেল টেলর। আঁতকে উঠে সামনে ঝুঁকল।
তাকিয়ে আছে টার্নিং ফ্রেমে রাখা ক্রাইম ইন ওল্ড নিউ ইয়র্ক বইটার দিকে।
‘এভাবেই… তুমি সত্যিই খুঁজে পেয়েছ ওটা! কনস্টেবলরা তোমাকে নিয়ে গর্ব করতেই পারে, লিংকন রাইম। ভেবেছিলাম বাড়িটা খুঁজে বের করতে তোমাদের কয়েক দিন লেগে যাবে। ভেবেছিলাম ততক্ষণে কুকুরগুলো ম্যাগিকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলবে।’
‘কেন করছ এসব?’ জানতে চাইল রাইম।
উত্তর দিল না টেলর। রাইমকে খুঁটিয়ে দেখছে সে, বিড়বিড় করছে। নিজের মনেই বলে চলল, ‘আগে তো এত ভালো ছিলে না তুমি। সেই পুরোনো দিনে। তখন অনেক কিছুই মিস করতে, তাই না? সেই আগের যুগে।’
আগের যুগে… মানে কী?
টাক-পড়া মাথাটা নাড়ল সে, ধূসর চুল-বাদামি নয়। রাইমের ফরেনসিক বইয়ের একটা কপির দিকে তাকাল।
চোখে চেনার আভাস দেখতে পেল রাইম, আর ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করল। ‘তুমি আমার বইটা পড়েছ,’ বলল ক্রিমিনালিস্ট। ‘স্টাডি করেছ। লাইব্রেরিতে, তাই না? তোমার কাছের পাবলিক লাইব্রেরিতে?’
৮২৩ আসলে একজন পাঠক। তাই সে রাইমের ক্রাইম সিন প্রসিডিউর জানত। সেজন্যই সে এত সাবধানে ঝাড়ু দিত, গ্লাভস পরত এমন সব জায়গায় যেখানে ছাপ থাকার কথা নয়, আফটারশেভ স্প্রে করত। কারণ সে জানত স্যাক্স ঠিক কী খুঁজবে।
আর তার পড়া বইয়ের মধ্যে শুধু ম্যানুয়ালটাই ছিল না। সিনস অব দ্য ক্রাইম-ও পড়েছিল সে। ওখান থেকেই সাজানো ক্লুগুলোর আইডিয়া পেয়েছিল-প্রাচীন নিউ ইয়র্কের কু। এমন সব সূত্র যা কেবল লিংকন রাইমই ধরতে পারবে।
আট মাস আগে রাইমকে দেওয়া মেরুদণ্ডের হাড়ের টুকরোটা তুলে নিল টেলর। আনমনে আঙুল দিয়ে ডলতে লাগল ওটা। আর রাইম বুঝল, সেই উপহার, যা তখন তাকে ছুঁয়ে গিয়েছিল, আসলে ছিল এই ভয়াবহ উপন্যাসের মুখবন্ধ।
ডাক্তারের দৃষ্টি এখানে নেই, চলে গেছে যেন কোন সুদূরে। মনে পড়ল আগেও এই দৃষ্টি দেখেছে রাইম, তাকে পরীক্ষা করার সময়ে। ব্যাপারটাকে ডাক্তারের একাগ্রতা ভেবেছিল সে, কিন্তু এখন বুঝল ওটা তার মানসিক বিকৃতির অংশ। যে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করছিল সে, তা হারিয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। ‘বলো,’ জিজ্ঞেস করল রাইম। ‘কেন?’
‘কেন?’
ফিসফিস করে বলল টেলর, রাইমের পায়ের উপর দিয়ে হাত বোলাচ্ছে, আবার পরীক্ষা করছে… হাঁটু, শিন, গোড়ালি। ‘কারণ তুমি ছিলে অসাধারণ, রাইম। অদ্বিতীয়। তুমি ছিলে অপরাজেয়।’
‘মানে?’
‘যে লোক মরতে চায়, তাকে শাস্তি দেবে কী করে? মেরে ফেললে তো তার চাওয়াই পূর্ণ হলো। তাই তোমার মাঝে বাঁচার ইচ্ছা জাগাতে হতো আমার।’
অবশেষে উত্তরটা পেল রাইম।
সেই আগের যুগে…
‘ওটা ভুয়া ছিল, তাই না?’ ফিসফিস করে বলল সে। ‘অ্যালবানি করোনারের সেই শোকসংবাদ। তুমি নিজেই তো লিখেছিলে।’
কলিন স্ট্যান্টন। ডাক্তার টেলরই আসলে কলিন স্ট্যান্টন। সেই লোক যার পরিবারকে তার চোখের সামনে কসাইয়ের মতো খুন করা হয়েছিল চায়নাটাউনের রাস্তায়। যে লোকটা স্ত্রী আর দুই সন্তানের রক্তাক্ত লাশের সামনে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল, সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি কাকে বাঁচাবে। আগের যুগের অনেক কিছুই মিস করি।
এখন, বড্ড দেরিতে, পাজলের শেষ টুকরোগুলো মিলে গেল।
ভিকটিমদের দেখত ও: টি.জে. কোলফ্যাক্স, মনেল আর ক্যারল গ্যানজ। ধরা পড়ার ঝুঁকি নিয়েও সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখত ওদের-ঠিক যেভাবে স্ট্যান্টন তার পরিবারের দিকে তাকিয়ে ছিল তাদের মৃত্যুর সময়ে।
প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল সে। কিন্তু পেশায় তো ডাক্তার, জীবন রক্ষার শপথ নেওয়া, তাই খুন করার জন্য তাকে তার আধ্যাত্মিক পূর্বপুরুষে পরিণত হতে হয়েছিল। সে বনে গিয়েছিল বোন কালেক্টর, ওরফে জেমস স্নাইডার, উনবিংশ শতাব্দীর এক উন্মাদ, যার পরিবারকে police ধ্বংস করে দিয়েছিল।
‘মানসিক হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ম্যানহাটনে ফিরে এসেছিলাম। ইনকোয়েস্ট রিপোর্টে পড়েছিলাম কীভাবে তুমি ক্রাইম সিনে খুনিকে মিস করেছিলে, কীভাবে সে পালিয়েছে। জানতাম তোমাকে মারতে হবে। কিন্তু পারিনি। জানি না কেন…অপেক্ষা করছিলাম কিছু একটার জন্য। আর তারপর বইটা পেলাম। জেমস স্নাইডার… আমার মতোই দশা হয়েছিল তার। সে পেরেছিল; আমিও পারব।’
আমি ওদের হাড় পর্যন্ত বের করে এনেছি।
‘শোকসংবাদটা,’ বলল রাইম।
‘রাইট। আমার কম্পিউটারে নিজেই লিখেছিলাম। এনওয়াইপিডি-তে ফ্যাক্স করেছিলাম যাতে আমাকে সন্দেহ না করে। তারপর অন্য কেউ বনে গেলাম। ডাক্তার পিটার টেলর। পরে বুঝেছিলাম নামটা কেন বেছেছিলাম। ধরতে পারছ?’ চার্টের দিকে চোখ চলে গেল স্ট্যান্টনের। ‘উত্তরটা ওখানেই আছে।’
প্রোফাইলটা দেখল রাইম।
| ● | সাধারণ জার্মান জানে |
‘স্নাইডার,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল রাইম, ‘জার্মান ভাষায় এর মানে দর্জি।’
মাথা নাড়ল স্ট্যান্টন।
‘সপ্তাহের পর সপ্তাহ লাইব্রেরিতে কাটিয়েছি, স্পাইনাল কর্ড ট্রমা নিয়ে পড়াশোনা করেছি, তারপর ফোন করেছি, বলেছি কলম্বিয়া এসসিআই রেফার করেছে। প্রথম অ্যাপয়েন্টমেন্টেই তোমাকে মারার প্ল্যান ছিল, একবারে এক ফালি করে চামড়া কেটে, রক্তক্ষরণ হয়ে মরতে দিতাম। হয়তো কয়েক ঘণ্টা লাগত। বা কয়েক দিন। কিন্তু কী হলো?’
চোখ বড় বড় হয়ে গেল তার। ‘জানতে পারলাম তুমি আত্মহত্যা করতে চাও।’ রাইমের কাছে ঝুঁকে এল সে। ‘জিসাস, তোমাকে প্রথমবার দেখার মুহূর্তটা এখনো মনে আছে। হারামি কোথাকার। তুমি তো মরেই গিয়েছিলে। বুঝতে পেরেছিলাম আমাকে কী করতে হবে-তোমাকে জীবনের স্বাদ দিতে হবে। তোমাকে আবার একটা লক্ষ্য দিতে হবে।’
তাই কাকে কিডন্যাপ করা হচ্ছে তাতে কিছু যেত আসত না। যে কেউ হলেই হলো।
‘ভিকটিমরা বাঁচল না মরল তা নিয়ে তোমার কোনো মাথাব্যথাই ছিল না।’
‘অবশ্যই না। শুধু চেয়েছিলাম যাতে ওদের বাঁচানোর চেষ্টা করতে বাধ্য হও তুমি।’
‘গিটটা,’ পোস্টারের পাশে ঝুলতে থাকা দড়ির ফাঁসটা দেখে জিজ্ঞেস করল রাইম। ‘ওটা সার্জিক্যাল সেলাই?’
মাথা নাড়ল সে।
‘অবশ্যই। আর তোমার আঙুলের দাগটা?’
‘আমার আঙুল?’ ভ্রু কুঁচকাল সে। ‘কীভাবে তুমি… ওর ঘাড়! তুমি ওর ঘাড়ের প্রিন্ট নিয়েছিলে, হানার। জানতাম ওটা সম্ভব। মাথায় আসেনি।’
নিজের উপরই বিরক্ত হলো স্ট্যান্টন। ‘হাসপাতালের লাইব্রেরিতে একটা গ্লাস ভেঙেছিলাম,’ বলে চলল সে। ‘কবজি কাটার জন্য। চাপ দিয়ে ভেঙেছিলাম।’ পাগলের মতো বাম হাতের তর্জনী দিয়ে দাগটা অনুসরণ করল সে।
‘তোমার স্ত্রী আর সন্তানের মৃত্যু…’ শান্ত গলায় বলল রাইম, ‘ওটা একটা দুর্ঘটনা ছিল। ভয়ানক, মর্মান্তিক একটা দুর্ঘটনা। কিন্তু ইচ্ছা করে ঘটেনি। ওটা একটা ভুল ছিল। তোমার আর ওদের জন্য খুব দুঃখ লাগছে আমার।’
সুরেলা গলায় ধমকে উঠল স্ট্যান্টন, ‘মনে আছে কী লিখেছিলে? তোমার টেক্সটবইয়ের ভূমিকায়?’
নিঁখুতভাবে আউড়ে গেল সে, “ক্রিমিনালিস্ট জানে যে প্রতিটি কাজেরই একটা ফল থাকে। অপরাধীর উপস্থিতি প্রতিটা ক্রাইম সিনকে বদলে দেয়, তা যত সামান্যই হোক না কেন। আর এই কারণেই আমরা অপরাধীদের শনাক্ত করতে এবং খুঁজে বের করতে পারি আর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারি।”
রাইমের চুল ধরে মাথাটা সামনে টেনে আনল স্ট্যান্টন। ইঞ্চিখানেক দূরত্ব দুজনের মাঝে। পাগলটার নিঃশ্বাসের গন্ধ পেল রাইম, ধূসর চামড়ার উপর ঘামের দানা দেখল।
‘আমিই তোমার কাজের ফল।’
‘কী লাভ হবে? আমাকে মেরে ফেললে তো আমার কোনো ক্ষতিই হবে না।’
‘ওহ, কিন্তু তোমাকে এখনই মারব না আমি। এখন না।’
রাইমের চুল ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে গেল স্ট্যান্টন।
‘জানতে চাও কী করব?’ ফিসফিস করে বলল সে। ‘তোমার ডাক্তার, বার্জারকে খুন করব। কিন্তু সে যেভাবে মারে সেভাবে নয়। কোনো ঘুমের ঔষধ বা মদ দিয়ে নয়। দেখব সেকেলে মৃত্যু তার কেমন লাগে। তারপর তোমার বন্ধু সেলিট্রোর পালা। আর অফিসার স্যাক্স? সেও বাদ যাবে না। একবার বেঁচে গেছে। পরের বার ঠিকই ধরব। আরেকটা কবর হবে ওর জন্য। আর টমও বাদ যাবে না। তোমার চোখের সামনেই মরবে ও। হাড় পর্যন্ত বের করে আনব ওর… ধীরে সুস্থে।’
‘হায় ঈশ্বর।’
দ্রুত শ্বাস নিচ্ছে স্ট্যান্টন। ‘হয়তো আজই ওকে দিয়ে শুরু করব। কখন ফিরবে ও?’
‘আমিই ভুলগুলো করেছিলাম। এটা আমার-‘ হঠাৎ কেশে উঠল রাইম। গলা পরিষ্কার করে দম নিল। ‘সব দোষ তো আমারই। আমার সাথে যা খুশি করো।’
‘না, তোমরা সবাই দায়ী। এটা-‘
‘প্লিজ। এই কাজ কোরো না-‘ আবার কাশতে শুরু করল রাইম। ভয়ানক কাশির দমক আসছে ওর। কোনোমতে সামলাল সে।
একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল স্ট্যান্টন।
‘ওদের ক্ষতি করতে পারো না তুমি। যা বলবে তাই করব-‘ বলতে বলতে রাইমের গলা আটকে গেল। মাথাটা পেছনে উল্টে গেল, চোখদুটো ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে। এরপর তার শ্বাসপ্রশ্বাস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। মাথাটা এপাশ-ওপাশ করছে, কাঁধদুটো কাঁপছে প্রচণ্ড। গলার রগগুলো স্টিলের তারের মতো টানটান হয়ে আছে।
‘রাইম!’ চিৎকার করে উঠল স্ট্যান্টন।
ও থুতু ছিটাচ্ছে, ঠোঁট দিয়ে লালা বেরোচ্ছে সমানে। পরপর দুবার কেঁপে উঠল রাইম, যেন ভূমিকম্প বয়ে যাচ্ছে তার শিথিল শরীরে। মাথাটা এলিয়ে পড়ল, মুখের কোনা দিয়ে গড়িয়ে পড়ল রক্ত।
‘না!’ চিৎকার করল স্ট্যান্টন। রাইমের বুকে থাবা মারল সে। ‘মরতে পারো না তুমি!’
রাইমের চোখের পাতা তুলল ডাক্তার, সাদা অংশ ছাড়া কিছু নেই। টমের ঔষধের বাক্স ছিঁড়ে ব্লাড-প্রেশারের ইনজেকশন তৈরি করল স্ট্যান্টন, পুশ করল। বিছানা থেকে বালিশটা সরিয়ে রাইমকে চিত করে শোয়াল। রাইমের ঝুলে পড়া মাথাটা কাত করে ঠোঁট মুছল, আর নিজের মুখ রাইমের মুখের উপর রেখে অসাড় ফুসফুসে জোরে বাতাস দিতে লাগল।
‘না!’ গর্জে উঠল স্ট্যান্টন। ‘মরতে দেবো না তোমাকে! মরতে পারবে না তুমি!’
কোনো সাড়া নেই। আবার। স্থির চোখদুটো দেখল সে। ‘কাম অন! কাম অন!’
আরেকটি শ্বাস নিল রাইম। স্থির বুকে চাপ দিল ডাক্তার।
তারপর পিছিয়ে গেল সে, আতঙ্ক আর শকে জমে গেছে। তাকিয়ে রইল, চোখের সামনে মানুষটাকে মরে যেতে দেখছে। সামনে ঝুঁকে শেষবারের মতো রাইমের মুখে গভীর শ্বাস দিল সে। ক্ষীণতম শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দের আশায় কান পাতল বুকে।
ঠিক তখনই রাইমের মাথাটা ছোবল মারা সাপের মতো সামনে ছিটকে এল। স্ট্যান্টনের ঘাড়ে দাঁত বসিয়ে দিল সে, ক্যারোটিড ধমনি ছিঁড়ে কামড়ে ধরল লোকটার মেরুদণ্ডের একটা অংশ। একেবারে…
চিৎকার করে উঠল স্ট্যান্টন, পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে রাইমকে সুদ্ধ টেনে নামাল বিছানা থেকে। দুজনে একসাথে মেঝের উপর আছড়ে পড়ল। গরম তামাটে রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে রাইমের মুখ ভরিয়ে দিল। …হাড় পর্যন্ত।
তার ফুসফুস, তার সেই ঘাতক ফুসফুস, প্রায় এক মিনিট বাতাস ছাড়া ছিল। কিন্তু এখন শ্বাস নেওয়ার জন্য কামড় আলগা করতে রাজি হলো না সে। গালের ভেতরের পোড়া ব্যথাটা উপেক্ষা করল। সেখানে সে ইচ্ছা করেই কামড়ে রক্ত বের করেছিল তার ভয়ার্ত ডিসরিফ্লেক্সিয়া অ্যাটাককে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য।
রাগে গরগর করে উঠল রাইম। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে মাটিচাপা অ্যামেলিয়া স্যাক্সকে, দেখছে কীভাবে টি.জে. কোলফ্যাক্সের গায়ের উপর গরম বাষ্প ছিটকে পড়ল। প্রবল ক্রোধে মাথাটা ঝাঁকাল সে, হাড় আর তরুণাস্থি মট করে ভাঙার শব্দ পেল।
রাইমের বুকে কিল মারছে স্ট্যান্টন, চিৎকার করছে। তার সাথে সেঁটে থাকা দানবটার কাছ থেকে পালাতে চায় যেকোনো মূল্যে।
লাথি মেরেও ছাড়াতে পারল না সে। রাইমের কামড় পাথরের মতো। যেন সারা শরীরের মৃত পেশিগুলোর সমস্ত শক্তি তার চোয়ালে এসে জমা হয়েছে।
হামাগুড়ি দিয়ে বেডসাইড টেবিলের কাছে গেল স্ট্যান্টন, কোনোমতে হাতে পেল ছুরিটা। রাইমের শরীরে বসিয়ে দিল সজোরে। একবার, দুবার। কিন্তু কেবল রাইমের হাত আর পায়েই নাগাল পেল সে।
ব্যথা মানুষকে দুর্বল করে। কিন্তু এখন হাত-পায়ের ব্যথাহীনতাই লিংকন রাইমকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে। چوয়ালের সাঁড়াশি আরো শক্ত হলো তার। শ্বাসনালি ছিঁড়ে যেতেই স্ট্যান্টনের চিৎকার থেমে গেল।
রাইমের হাতে ছুরিটা আমূল বসিয়ে দিল সে। হাড় পর্যন্ত গিয়ে থামল ওটা। বের করে আবার মারতে যাবে, এমন সময় পাগলটার শরীর জমে গেল হঠাৎ। প্রচণ্ড খিঁচুনি দিয়ে দুবার কেঁপে উঠল সে। এরপর একেবারে নিস্তেজ হয়ে গেল।
মেঝের উপর লুটিয়ে পড়ল স্ট্যান্টন, সাথে রাইমকেও টেনে নিল। ওক কাঠের উপর সজোরে ঠুকে গেল ক্রিমিনালিস্টের মাথা। তবুও ছাড়ল না রাইম। শক্ত করে ধরে আছে লোকটার ঘাড়, ঝাঁকাচ্ছে, মাংস ছিঁড়ছে। রক্তের নেশায় উন্মাদ এক সিংহ হয়ে গেছে যেন সে, লালসা মেটানোর এক অসীম তৃপ্তিতে মগ্ন।
