১. এক দিনের রাজা
২. লোকার্ডের নীতি
৩. দ্য পোর্টেবলস ডটার
8. ডাউন টু দ্য বোন
৫. নড়াচড়ার উপর থাকলে ওরা তোমায় ধরতে পারবে না

দ্য বোন কালেক্টর – ২৫

অধ্যায় পঁচিশ

‘কোনোমতেই না। তুমি এটা করতে পারো না, রাইম।’

বার্জার অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে। রাইমের ধারণা, এই পেশায় এমন মুহূর্তে হরেক রকম পাগলামি দেখতে অভ্যস্ত সে। যারা মরতে চায়, তাদের নিয়ে তেমন সমস্যা হয় না বার্জারের। যারা সবাইকে বাঁচাতে চায়, সমস্যাটা তাদের নিয়ে।

দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে টম।

‘টম,’ ডাকল রাইম। ‘সব ঠিক আছে। তুমি যেতে পারো।’ স্যাক্সের দিকে তাকাল সে। ‘আমাদের বিদায় নেওয়া হয়ে গেছে। তোমার আর আমার। নিখুঁত প্রস্থানটা নষ্ট করা ঠিক হচ্ছে না।’

‘তুমি এটা করতে পারো না।’

খবরটা দিল কে? পিট টেলর হয়তো। ডাক্তার নিশ্চয়ই আন্দাজ করেছিলেন যে সে আর টম মিথ্যা বলছে। রাইম দেখল মেয়ের চোখ টেবিলের উপর রাখা তিনটি জিনিসের উপর। গিফট অব দ্য ম্যাজাই: ব্র্যান্ডি, বড়ি আর প্লাস্টিকের ব্যাগ। আর একটা রাবার ব্যান্ড, স্যাক্স তার জুতোর উপর যেমনটা পরে আছে।

(কতবার ক্রাইম সিন থেকে বাড়ি ফিরে দেখেছে ব্লেইন তার জুতোর ব্যান্ডের দিকে তাকিয়ে আছে, কিছুটা আতঙ্কিত হয়েই। ‘সবাই ভাববে আমার বরের নতুন জুতো কেনার সামর্থ্য নেই। রাবার ব্যান্ড দিয়ে তলা আটকে রেখেছে। লিংকন, সত্যিই হবে এমনটা!’)

‘স্যাক্স, এই ভোলাভালা ডাক্তারটার হাতকড়া খুলে দাও, প্লিজ। আর তোমাকে শেষবারের মতো বলছি: চলে যাও।’

দ্রুত হেসে উঠল মেয়েটা। ‘উঁহু। এটা নিউ ইয়র্কে অপরাধ। ডিএ চাইলে এটাকে খুনের মামলা হিসেবেও চালাতে পারে।’

‘আমি তো শুধু রোগীর সাথে কথা বলছিলাম,’ বলল বার্জার।

‘সেজন্যই অভিযোগটা কেবল প্রচেষ্টার। এখন পর্যন্ত। এনসিআইসি-র মাধ্যমে আপনার নাম আর প্রিন্ট চালিয়ে দেখলে কেমন হয়? দেখি কী বেরোয়।’

‘লিংকন!’ আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত বলল বার্জার। ‘আমি পারব না-‘

‘সব ঠিক হয়ে যাবে,’ রাইম বলল। ‘স্যাক্স, প্লিজ।’

পা ফাঁক করে ছিপছিপে কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে স্যাক্স। তার সুন্দর মুখখানায় আদেশের ভঙ্গি। ‘চলুন।’ ডাক্তারকে ধমক দিল সে।

‘স্যাক্স, তোমার কোনো ধারণাই নেই এটা কত জরুরি।’

‘আমি তোমাকে মরতে দেবো না।’

‘দেবে না?’ খেঁকিয়ে উঠল রাইম। ‘তুমি না দেওয়ার কে? তোমার অনুমতি কেন লাগবে আমার?’

ইতস্তত করল বার্জার। ‘মিস… অফিসার স্যাক্স, এটা ওর সিদ্ধান্ত। ওর পুরোপুরি সম্মতি আছে। আমার দেখা অধিকাংশ রোগীর চেয়ে লিংকন অনেক বেশি সচেতন।’

‘রোগী? ভিকটিম বলুন।’

‘স্যাক্স!’ ফস করে বলল রাইম, গলার মরিয়া ভাবটা লুকানোর চেষ্টা করছে। ‘সাহায্য করার মতো কাউকে খুঁজে পেতে আমার এক বছর লেগেছে।’

‘কারণ কাজটা ভুল। ভেবে দেখেছ কখনো? এখন কেন, রাইম? ঠিক এই কেসের মাঝখানে?’

‘যদি আমার আরেকটা অ্যাটাক হয় আর স্ট্রোক করি, তবে হয়তো কথা বলার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলব। চল্লিশ বছর ধরে জ্ঞান থাকবে অথচ নড়তে পারব না। আর যদি ব্রেন-ডেড না হই, তবে দুনিয়ার কেউ লাইফ সাপোর্ট খুলবে না। অন্তত এখন আমি আমার সিদ্ধান্তের কথাটা জানাতে পারছি।’

‘কিন্তু কেন?’ ফস করে বলে উঠল মেয়েটা।

‘কেন নয়?’ জবাব দিল রাইম। ‘বলো। কেন নয়?’

‘মানে…’ আত্মহত্যার বিরুদ্ধে যুক্তিগুলো এতই স্পষ্ট যে সে গুছিয়ে বলতে পারছে না। ‘কারণ…’

‘কারণ কী, স্যাক্স?’

‘প্রথমত, এটা কাপুরুষতা।’

হেসে উঠল রাইম। ‘তর্ক করতে চাও, স্যাক্স? বেশ। কাপুরুষতা, তাই না? স্যার টমাস ব্রাউনের কথায় আসা যাক: “যখন জীবন মৃত্যুর চেয়েও ভয়ানক, তখন বেঁচে থাকাই প্রকৃত সাহসিকতা।” অদম্য প্রতিকূলতার মুখে সাহস… বেঁচে থাকার পক্ষে এক ধ্রুপদী যুক্তি। কিন্তু তা যদি সত্যি হয়, তবে অস্ত্রোপচারের আগে রোগীকে অজ্ঞান করা হয় কেন? অ্যাসপিরিন বিক্রি হয় কেন? ভাঙা হাত জোড়া লাগানো হয় কেন? কেন আমেরিকায় প্রোজ্যাক সবচেয়ে বেশি চলা ঔষধ? সরি, কিন্তু ব্যথার মধ্যে আদতে ভালো কিছু নেই।’

‘কিন্তু তোমার তো ব্যথা নেই।’

‘ব্যথাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবে, স্যাক্স? হয়তো কোনো অনুভূতি না থাকাও এক ধরনের ব্যথা।’

‘তুমি চাইলে এখনো অনেক কিছু করতে পারো। তোমার কী বিশাল জ্ঞানের ভান্ডার! এত এত ফরেনসিক আর ইতিহাসের জ্ঞান!’

‘社会的 উপকারের যুক্তি। ওটা বেশ জনপ্রিয়।’ বার্জারের দিকে তাকাল রাইম, কিন্তু চুপ করে রইল ডাক্তার। দেখল, টেবিলের উপর রাখা হাড়টার দিকে নজর তার-মেরুদণ্ডের সেই ফ্যাকাশে চাকতি। ওটা তুলে নিল সে, হাতকড়া-পরা হাতে নাড়াচাড়া করছে। অর্থোপেডিকসের লোক ছিল বার্জার, মনে পড়ল রাইমের।

স্যাক্সকে বলল সে, ‘কিন্তু আমাদের সমাজের উপকার করতেই হবে, তা কে বলেছে? তাছাড়া, এর উল্টোটাও তো হতে পারে, আমি হয়তো খারাপ কিছুও করতে পারি। কারো ক্ষতিও করতে পারি। নিজের বা অন্য কারো।’

‘জীবন মানেই তো তাই।’

‘হাসল রাইম। ‘কিন্তু আমি মৃত্যুকে বেছে নিচ্ছি, জীবনকে নয়।’

খুব চিন্তিত দেখাল স্যাক্সকে। ‘ব্যাপারটা হলো… মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। জীবন স্বাভাবিক।’

‘না? ফ্রয়েড তোমার সাথে একমত হতেন না। প্লেজার প্রিন্সিপল বা সুখের নীতি থেকে সরে এসে তিনি অনুভব করেছিলেন যে অন্য একটা শক্তি আছে। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন “নন-এরোটিক প্রাইমারি এগ্রেশন”। এটা আমাদের জীবনের বন্ধনগুলো ছিঁড়ে ফেলার জন্য কাজ করে। আমাদের আস্তে আস্তে শেষ করে দেয়। মরে তো সবাই-ই। মৃত্যুর চেয়ে স্বাভাবিক আর কী হতে পারে?’

আবারো মাথায় হাত বোলাল অ্যামেলিয়া।

‘ঠিক আছে,’ বলল সে। ‘অন্যদের চেয়ে তোমার জীবনটা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম… তোমাকে দেখে যা বুঝেছি, তুমি চ্যালেঞ্জ পছন্দ করো।’

‘চ্যালেঞ্জ? তোমাকে চ্যালেঞ্জের কথা বলি। এক বছর ভেন্টিলেটরে ছিলাম। গলার এই ছিদ্রটা দেখেছ? পজিটিভ-প্রেশার ব্রিদিং এক্সারসাইজ আর আমার সমস্ত ইচ্ছাশক্তি দিয়ে মেশিনটা থেকে মুক্তি পেয়েছি। সত্যি বলতে, আমার ফুসফুস এখন যেকোনো সুস্থ মানুষের মতোই। সি-ফোর অচল মানুষের জন্য এটা একটা রেকর্ড, স্যাক্স। আট মাস ধরে জীবনটা এর পেছনেই গেছে। বুঝতে পারছ আমি কী বলছি? একটা সাধারণ কাজ করার জন্য আটটা মাস গেছে। সিস্টিন চ্যাপেল আঁকা বা বেহালা বাজানো শেখার জন্য না। শুধু শ্বাস নেওয়ার কথা বলছি।’

‘কিন্তু তুমি তো ভালো হয়ে উঠতে পারো। আগামী বছর হয়তো কোনো ঔষধ আবিষ্কৃত হবে।’

‘হবে না। দশ বছরেও হবে না।’

‘তুমি জানো না। নিশ্চয়ই গবেষণা হচ্ছে-‘

‘অবশ্যই হচ্ছে। জানতে চাও কী নিয়ে? আমি এ ব্যাপারে এক্সপার্ট। ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুর উপর ভ্রুণের নার্ভ টিস্যু প্রতিস্থাপন করে স্নায়ুর পুনর্গঠন।’ কথাগুলো অনায়াসে বেরিয়ে এল রাইমের সুন্দর ঠোঁটজোড়া দিয়ে। ‘কোনো উল্লেখযোগ্য ফল নেই। কিছু ডাক্তার ক্ষতিগ্রস্ত জায়গাগুলো কেমিক্যাল দিয়ে ট্রিটমেন্ট করছেন যাতে কোষগুলো আবার জন্মানোর পরিবেশ পায়। কোনো উল্লেখযোগ্য ফল নেই-উন্নত প্রজাতির ক্ষেত্রে। নিম্নবর্গের প্রাণীদের ক্ষেত্রে বেশ ভালোই কাজ হয়েছে। আমি যদি ব্যাঙ হতাম, তবে আবার হাঁটতে পারতাম। মানে, লাফাতে পারতাম।’

‘তার মানে কাজ তো চলছে?’ জিজ্ঞেস করল স্যাক্স।

‘নিশ্চয়ই। কিন্তু বিশ-ত্রিশ বছরের আগে কোনো ব্রেকথ্রুর আশা নেই।’

‘যদি আশা করাই যেত,’ পাল্টা জবাব দিল সে, ‘তবে তো আর ব্রেকথ্রু হতো না, তাই না?’

হেসে ফেলল রাইম। মেয়েটা বেশ চতুর।

চোখের সামনে থেকে লাল চুলের পর্দাটা সরাল স্যাক্স, ‘তোমার ক্যারিয়ার ছিল আইন প্রয়োগ করা নিয়ে, মনে আছে? সেই আইনে আত্মহত্যা বেআইনি।’

‘পাপও বটে,’ জবাব দিল সে। ‘ডাকোটা ইন্ডিয়ানরা বিশ্বাস করত, যারা আত্মহত্যা করে, তাদের প্রেতাত্মাকে অনন্তকাল ধরে সেই গাছটা বয়ে বেড়াতে হয় যেটায় তারা ঝুলেছিল। তাতে কি আত্মহত্যা থেমে গিয়েছিল? উঁহু। ওরা কেবল ছোট গাছ বেছে

নিত।’

‘একটা কথা বলি, রাইম। এটাই আমার শেষ যুক্তি।’ বার্জারের দিকে মাথা নেড়ে হাতকড়ার শিকল ধরল সে। ‘আমি ওকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছি। এটা ঠেকানোর পাল্টা যুক্তি দাও দেখি।’

‘লিংকন,’ অস্বস্তির সাথে বলল বার্জার, চোখে আতঙ্ক।

ডাক্তারের কাঁধ ধরে দরজার দিকে নিয়ে গেল স্যাক্স।

‘না,’ বলল বার্জার। ‘প্লিজ। এটা করবেন না।’

স্যাক্স দরজা খুলতেই রাইম ডেকে উঠল, ‘স্যাক্স, ওটা করার আগে একটা কথার উত্তর দাও।’

থামল সে। দরজার হাতলে একটা হাত রেখেছে।

‘একটা প্রশ্ন।’

পেছনে তাকাল অ্যামেলিয়া।

‘কখনো কি চেয়েছ নিজেকে মেরে ফেলতে?’

জোরে শব্দ করে দরজাটা আনলক করল সে।

‘উত্তর দাও!’

দরজা খুলল না স্যাক্স। পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ‘না। কক্ষনো না।’

‘জীবন নিয়ে সুখী তুমি?’

‘আর দশজনের মতোই।’

‘কখনো হতাশ হও না?’

‘আমি তা বলিনি। বলেছি কখনো আত্মহত্যা করতে চাইনি।’

‘ড্রাইভ করতে পছন্দ করো, বলেছিলে আমাকে। যারা ড্রাইভ করতে ভালোবাসে, তারা জোরে চালাতে পছন্দ করে। তুমিও করো, তাই না?’

‘হ্যাঁ। মাঝেমধ্যে।’

‘সবচেয়ে বেশি কত গতিতে চালিয়েছ?’

‘জানি না।’

‘আশির উপরে?’

উড়িয়ে দেওয়া হাসি দিল সে। ‘হ্যাঁ।’

‘একশোর উপরে?’

বুড়ো আঙুল দিয়ে উপরের দিকে ইশারা করল স্যাক্স।

‘একশো দশ? একশো বিশ?’ অবাক হয়ে হেসে জিজ্ঞেস করল রাইম।

‘১৬৮ উঠেছিল একবার।’

‘বাপরে, স্যাক্স, তুমি তো ইম্প্রেসিভ। তা এত জোরে চালানোর সময় একবারও কি মনে হয়নি যে হয়তো সামান্য হলেও কিছু একটা ঘটতে পারে? রড বা এক্সেল বা কিছু একটা ভেঙে যেতে পারে, টায়ার ফেটে যেতে পারে, রাস্তায় তেলের দাগ থাকতে পারে?’

‘বেশ নিরাপদ ছিল। আমি পাগল নই।’

‘বেশ নিরাপদ। কিন্তু ছোট বিমানের গতিতে গাড়ি চালানো, পুরোপুরি নিরাপদ তো নয়, তাই না?’

‘তুমি আমাকে প্রভাবিত করছ।’

‘না, করছি না। এবার বলো। তুমি যেহেতু এত জোরে চালাও, তাহলে তো তোমাকে মেনে নিতেই হবে যে অ্যাকসিডেন্ট হয়ে মারা যেতে পারো, ঠিক?’

‘হয়তো,’ স্বীকার করল সে।

বার্জার তার হাতকড়া-পরা হাত সামনে নিয়ে নার্ভাস হয়ে তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে মেরুদণ্ডের সেই ফ্যাকাশে হলুদ চাকতিটা টিপছে।

‘তার মানে তুমি ঐ রেখাটার খুব কাছাকাছি গিয়েছ, তাই না? তুমি জানো আমি কী বলছি। মরার ঝুঁকি আর নিশ্চিত মৃত্যুর মাঝখানের সেই রেখা। দেখো, স্যাক্স, যদি মৃতদের সব সময় সাথে নিয়ে ঘোরো, তবে ঐ রেখাটা পার হতে খুব বেশি সময় লাগে না। ওদের সাথে যোগ দিতে খুব ছোট্ট একটা পদক্ষেপই যথেষ্ট।’

মাথা নামাল সে। মুখটা একেবারে স্থির হয়ে গেল, চুলের পর্দায় ঢাকা পড়ে গেল চোখ।

‘মৃতদের মায়া ত্যাগ করো,’ ফিসফিস করে বলল সে, মনে মনে প্রার্থনা করল যেন বার্জারকে নিয়ে চলে না যায় সে। জানে, অ্যামেলিয়াকে ভেঙে ফেলার খুব কাছাকাছি চলে গেছে ও।

‘আমি ঠিক জায়গায় ঘা দিয়েছি। তোমার কতটুকু অংশ মৃতদের অনুসরণ করতে চায়? অল্প নয়, স্যাক্স। অল্পের চেয়ে অনেক বেশিই হবে।’

ইতস্তত করছে মেয়েটা। রাইম বুঝতে পারল তার মনের গভীরে পৌঁছে গেছে সে। রাগের মাথায় বার্জারের দিকে ঘুরল সে হঠাৎ, হাতকড়া ধরে টান দিল।

‘আসুন।’ দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।

ওকে ডাকল রাইম, ‘আমি কী বলছি বুঝতে পারছ, তাই না?’

আবার থামল মেয়েটা।

‘মাঝেমধ্যে… এমন কিছু ঘটে, স্যাক্স। মাঝেমধ্যে তুমি যা হতে চাও তা হতে পারো না, যা পেতে চাও তা পাও না। আর জীবন বদলে যায়। হয়তো অল্প, হয়তো অনেকখানি। আর একটা পর্যায়ে ভুলগুলো শুধরানোর লড়াইটা আর চালিয়ে যাওয়ার মানে হয় না।’

দরজায় ওদের ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল সে। ঘরটা একদম নিস্তব্ধ। ঘুরে তার দিকে তাকাল সে।

‘মৃত্যু একাকিত্ব ঘোচায়,’ বলে চলল রাইম। ‘টেনশন কমায়। চুলকানি মেটায়।’ মেয়েটা যেমন আগে তার পায়ের দিকে তাকিয়ে ছিল, রাইমও এখন চট করে তার ক্ষতবিক্ষত আঙুলগুলোর দিকে তাকাল।

বার্জারের হাতকড়া খুলে দিয়ে জানালার কাছে গেল সে। রাস্তার বাতির হলুদ আলোয় তার গালে চিকচিক করে উঠল চোখের পানি।

‘স্যাক্স, আমি ক্লান্ত,’ আন্তরিকভাবেই বলল সে। ‘কতটা ক্লান্ত বলে বোঝাতে পারব না। তুমি জানো জীবন শুরু থেকেই কত কঠিন। তার উপর এক পাহাড়সম বোঝা চাপাও। ধোয়া, খাওয়া, মলত্যাগ করা, ফোন করা, বোতাম লাগানো, নাক চুলকানো… তারপর আরো হাজারটা যোগ করো। তার উপর আরো।’

চুপ করে রইল সে। দীর্ঘক্ষণ পর অ্যামেলিয়া বলল, ‘তোমার সাথে একটা রফা

করতে পারি।’

‘কী সেটা?’

পোস্টারটার দিকে ইশারা করল সে। ‘ঐ মা আর তার ছোট মেয়েকে আটকে রেখেছে ৮২৩… ওদের বাঁচাতে সাহায্য করো। শুধু ওদের। যদি করো, তবে আমি ডাক্তারকে তোমার সাথে এক ঘণ্টা একা থাকতে দেবো।’ বার্জারের দিকে তাকাল সে। ‘শর্ত হলো, এরপর তাকে শহর ছেড়ে পালাতে হবে।’

মাথা নাড়ল রাইম। ‘স্যাক্স, যদি আমার স্ট্রোক হয়, যদি কথা বলতে না পারি…’

‘যদি তা-ও হয়,’ শান্ত গলায় বলল সে, ‘যদি একটা কথাও বলতে না পারো, তবুও চুক্তি বহাল থাকবে। আমি নিশ্চিত করব যেন তোমরা এক ঘণ্টা সময় পাও।’

হাতদুটো আড়াআড়িভাবে ভাঁজ করল সে, পা ফাঁক করে দাঁড়াল। অ্যামেলিয়া স্যাক্সের এই ভঙ্গিটাই এখন রাইমের সবচেয়ে প্রিয়। ইশ, ঐদিন রেললাইনের উপর ট্রেন থামানোর সময় যদি তাকে দেখতে পেত!

‘এর চেয়ে বেশি কিছু করতে পারব না,’ বলল মেয়েটা।

এক মুহূর্ত কাটল। এরপর মাথা নাড়ল রাইম। ‘ওকে। চুক্তি হলো তাহলে।’ বার্জারকে বলল, ‘সোমবার?’

‘ওকে, লিংকন। ঠিক আছে।’ বার্জার কাঁপছে তখনো। স্যাক্স হাতকড়া খোলার সময় সতর্ক চোখে তাকিয়ে রইল। ভয় পাচ্ছিল সে, যদি মত পাল্টায় মেয়েটা! ছাড়া পেয়েই দ্রুত দরজার দিকে হাঁটা দিল সে। যাওয়ার সময় খেয়াল করল, মেরুদণ্ডের হাড়টা এখনো তার হাতে। ফিরে এসে নামিয়ে রাখল বেশ ভক্তিভরেই-রাইমের পাশে থাকা সকালের প্রথম খুনের ক্রাইম সিন রিপোর্টের উপর।

‘লাল ভার্জিনিয়া কাদার মধ্যে গড়াগড়ি খেলে শুয়োরেরা যেমন খুশি হয়, তার চেয়েও বেশি খুশি,’ মন্তব্য করল স্যাক্স। ক্যাঁচক্যাঁচে বেতের চেয়ারে গা এলিয়ে বসে আছে। সেলিট্টো আর পোলিংয়ের কথা বলছে। রাইম আরো একদিন কেসে থাকতে রাজি হয়েছে, এটা শুনে নাকি ওদের ঐ অবস্থাই হয়েছিল।

‘বিশেষ করে পোলিং,’ বলল সে। ‘ভাবলাম বেঁটে লোকটা বুঝি জড়িয়েই ধরবে আমাকে। আবার বোলো না ওকে আমি বেঁটে বলেছি। কেমন লাগছে এখন? ভালোই দেখাচ্ছে।’

একটু স্কচ খেল সে আর গ্লাসটা বেডসাইড টেবিলে রাখল, রাইমের গ্লাসের পাশে। ‘খারাপ না।’

বিছানার চাদর বদলাচ্ছে টম। ‘ঝরনার মতো ঘামছিলেন আপনি,’ বলল সে।

‘কিন্তু শুধু গলার উপরে ঘেমেছি,’ মনে করিয়ে দিল রাইম।

‘তাই নাকি?’ জিজ্ঞেস করল স্যাক্স।

‘হ্যাঁ। ব্যাপারটা এভাবেই হয়। নিচের থার্মোস্ট্যাট নষ্ট। আমার কখনো অ্যাক্সিয়াল ডিওডোরেন্ট লাগে না।’

‘অ্যাক্সিয়াল?’

‘পিট,’ নাক দিয়ে শব্দ করল রাইম। ‘বগল। আমার প্রথম সহকারী কখনো আর্মপিট বলত না। সে বলত, “আমি আপনাকে অ্যাক্সিয়াল ধরে উপরে তুলব, লিংকন।” ওহ, আর: “বমি করতে চাইলে করতে পারেন, লিংকন।” নিজেকে বলত কেয়ারগিভার। শব্দটা ওর জীবনবৃত্তান্তে লেখা ছিল। কেন যে ওকে রেখেছিলাম কে জানে। আমরা বড্ড কুসংস্কারাচ্ছন্ন, স্যাক্স। ভাবি নাম বদলালেই জিনিসটা বদলে যাবে। আনসাব। নিপীড়ক। কিন্তু ঐ সহকারী…ও আসলে এমন একটা নার্স যার নিজের বগল পর্যন্ত প্রস্রাব আর বমিতে মাখামাখি থাকত। তাই না, টম? লজ্জার কিছু নেই। এটা সম্মানজনক পেশা। নোংরা কিন্তু সম্মানজনক।’

‘নোংরামি আমার পছন্দ। সেজন্যই আপনার কাজ করি।’

‘তুমি কী, টম? এইড নাকি কেয়ারগিভার?’

‘আমি একজন সন্ত।’

‘হা, চটজলদি জবাব। আর সুঁইয়ের কাজেও পটু। আমাকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে এনেছে। একবার নয়, বহুবার।’

হঠাৎ রাইমের মনে হলো, স্যাক্স হয়তো তাকে নগ্ন দেখে ফেলেছে। ভয় হলো তার।

আনসাব প্রোফাইলের উপর চোখ রেখে সে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, তোমাকেও কি ধন্যবাদ দেওয়া উচিত, স্যাক্স? ক্লারা বার্টনের রোল প্লে করেছিলে নাকি?’

অস্বস্তি নিয়ে তার উত্তরের অপেক্ষা করতে লাগল। যদি সে দেখে থাকে, তবে কীভাবে আবার তার দিকে তাকাবে?

‘উঁহু,’ জবাব দিল টম। ‘একা হাতেই বাঁচিয়েছি আপনাকে। আপনার ঐ থলথলে পাছা দেখে এই সংবেদনশীল মানুষগুলো বমি করে ফেলুক, তা চাইনি।’

ধন্যবাদ, টম, ভাবল সে। তারপর ধমকে উঠল, ‘এবার যাও! কেস নিয়ে কথা বলতে হবে। স্যাক্স আর আমার।’

‘আপনার ঘুমানো দরকার।’

‘অবশ্যই দরকার। কিন্তু কেস নিয়ে কথা বলাটাও দরকার। গুড নাইট, গুড নাইট।’

টম চলে যাওয়ার পর গ্লাসে খানিকটা ম্যাকালান ঢালল স্যাক্স। মাথা নামিয়ে ধোঁয়াটে ঘ্রাণটা নিল সে।

‘কে বলে দিয়েছে?’ রাইম জিজ্ঞেস করল। ‘পিট?’

‘পিট কে?’ জিজ্ঞেস করল সে।

‘ডাক্তার টেলর, এসসিআই লোকটা।’

বেশ কিছুক্ষণ ইতস্তত করল স্যাক্স। রাইম বুঝে ফেলল যে টেলরই বলেছিল। অবশেষে বলল, ‘উনি তোমার ভালো ভেবেই বলেছেন।’

‘সেটাই তো সমস্যা। আমি চাই না সে আমার ভালো ভাবুক। বার্জারের কথা জানে?’

‘সন্দেহ করেন।’

মুখ কুঁচকে ফেলল রাইম। ‘দেখো, ওকে বলো বার্জার আমার পুরোনো বন্ধু। সে…কী?’

ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ল স্যাক্স, যেন ঠোঁট গোল করে সিগারেট-এর ধোঁয়া ছাড়ছে। ‘তোমাকে মরতে দিতে হবে, সেই সাথে তোমাকে যে বারণ করতে পারত, তাকেও মিথ্যা বলতে হবে?’

‘ও আমাকে বারণ করতে পারবে না,’ জবাব দিল রাইম।

‘তবে মিথ্যা বলতে বলছ কেন?’

হাসল সে। ‘ডাক্তার টেলরকে আর কটা দিন অন্ধকারে রাখা যাক।’

‘ঠিক আছে,’ বলল সে। ‘জিসাস, তোমাকে সামলানো বড্ড কঠিন।’

তাকে খুঁটিয়ে দেখল সে। ‘বলছ না কেন?’

‘কী?’

‘মৃতরা কারা? যাদের মায়া ত্যাগ করোনি?’

‘অনেকেই আছে।’

‘যেমন?’

‘খবরের কাগজ পড়ো।’

‘বলো না, স্যাক্স।’

মাথা নাড়ল সে, স্কচের দিকে তাকিয়ে রইল, ঠোঁটে ম্লান হাসি। ‘মনে হয় না বলা যাবে।’

রাইম ভাবল একদিনের চেনা কারো সাথে ব্যক্তিগত কথা বলতে চাইছে না সে। ব্যাপারটা অদ্ভুত যদিও, কারণ সে বসে আছে একগাদা ক্যাথেটার, কে-ওয়াই জেলির টিউব আর ডিপেন্ডস ডায়াপারের বাক্সের পাশে। তবুও চাপাচাপি করল না সে, চুপ করে রইল।

মেয়েটা হঠাৎ উপরের দিকে মুখ তুলে কাঁদতে শুরু করায় চমকে গেল তাই। ‘আসলে…আসলে…ওহ, হেল!’ কথা বলতে পারছে না অ্যামেলিয়া। মুখ ঢাকল সে, পারকেটের মেঝের উপর স্কটল্যান্ডের সেরা মদের বেশ কিছুটা ফেলে দিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *