অধ্যায় উনিশ
১৯১১ সালে আমাদের এই সুন্দর শহরে এক বিশাল ট্র্যাজেডি নেমে এসেছিল। ২৫শে মার্চ, ডাউন-টাউন ম্যানহাটনের গ্রিনউইচ ভিলেজের কুখ্যাত ‘সোয়েট-শপ’-গুলোরই একটি পোশাক কারখানায় হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছিল শত শত তরুণী। মুনাফার লোভে এতটাই অন্ধ ছিল কোম্পানির মালিকেরা যে তাদের অধীনে কাজ করা হতদরিদ্র মেয়েগুলোকে ক্রীতদাসদের প্রাপ্য ন্যূনতম সুবিধাটুকুও দিত না তারা। শ্রমিকরা যাতে কাজের ফাঁকে টয়লেটে গিয়ে সময় নষ্ট না করে, সেজন্য কাটিং আর সেলাই ঘরের দরজায় তালা ঝুলিয়ে রাখত তারা।
নিজের আস্তানায় গাড়ি চালিয়ে ফিরে যাচ্ছিল বোন কালেক্টর। একটা স্কোয়াড কার পাশ কাটিয়ে চলে গেল। কিন্তু চোখদুটো রাস্তার উপর স্থির রেখেছিল সে, তাই পুলিশরা লক্ষই করল না তাকে।
দুর্ভাগ্যের সেই দিনে আটতলায় আগুন লাগে। কয়েক মিনিটের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে পুরো কারখানায়, পালানোর চেষ্টা করে তরুণী কর্মীরা। কিন্তু দরজায় শিকল তোলা থাকায় বেরোতে পারেনি তারা। অনেকে ওখানেই মারা যায়। আর বাকিরা… কারো গায়ে হয়তো ভয়ংকরভাবে আগুন ধরে গিয়েছিল, বাঁচার জন্য একশো ফুট উপর থেকে লাফিয়ে পড়েছিল নিচের পাথুরে রাস্তায়; ধরিত্রী মায়ের বুকে আছড়ে পড়ে মৃত্যু হয়েছিল তাদের।
ট্রায়াঙ্গেল শার্টওয়েস্ট অগ্নিকাণ্ডে ১৪৬ জন মারা গিয়েছিল। তবে পুলিশ একটা ব্যাপার নিয়ে ধোঁয়াশায় পড়ে গিয়েছিল, এস্থার ওয়ানরব নামের এক তরুণী ভিকটিমকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, অথচ সাক্ষীরা তাকে আটতলার জানালা থেকে মরিয়া হয়ে লাফ দিতে দেখেছিল। যারা লাফিয়েছিল, তাদের কেউই বাঁচেনি। তাহলে কি অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিল সে? কারণ স্বজনদের শনাক্ত করার জন্য রাস্তায় যখন লাশগুলো সারি দিয়ে রাখা হলো, তখন কোথাও পাওয়া গেল না হতভাগী মিস ওয়ানরবকে।
গুঞ্জন ছড়াতে শুরু করল: এক পিশাচকে নাকি ঘটনাস্থল থেকে বড়সড়ো একটা বোঁচকা নিয়ে যেতে দেখা গেছে। একজন নিষ্পাপ তরুণীর পবিত্র দেহাবশেষ কেউ চুরি করেছে ভেবে পুলিশ এতটাই ক্ষেপে গিয়েছিল যে লোকটাকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করেছিল তারা।
কয়েক সপ্তাহ পর তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল মিলল। গ্রিনউইচ ভিলেজের দুই বাসিন্দা জানাল, তারা এক লোককে কাঁধে করে ‘কার্পেটের মতো’ ভারী একটা বোঁচকা নিয়ে অগ্নিকাণ্ডের স্থান থেকে সরে যেতে দেখেছে। সূত্র ধরে শহরের ওয়েস্ট সাইড পর্যন্ত লোকটাকে ধাওয়া করল পুলিশ, প্রতিবেশীদের জেরা করে জানল যে পলাতক জেমস স্নাইডারের বর্ণনার সাথে মিলে যাচ্ছে লোকটার চেহারা।
সিক্সটিইথ স্ট্রিটের স্টকইয়ার্ডের কাছে হেলস কিচেনের এক গলিতে জরাজীর্ণ এক আস্তানার খোঁজ পেল তারা। গলিতে ঢুকতেই এক উৎকট গন্ধে নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসার জোগাড় হলো তাদের।
এখন ঠিক সেই ট্রায়াঙ্গেল ফায়ারের ঘটনাস্থল দিয়েই গাড়ি চালাচ্ছে সে-হয়তো অবচেতন মনই তাকে এখানে টেনে এনেছে। অ্যাশ্চ বিল্ডিং-যে দালানটায় সেই অভিশপ্ত কারখানা ছিল-সেটা এখন আর নেই। জায়গাটা এনওয়াইইউ-এর অংশ হয়ে গেছে। তখন আর এখন…সাদা ব্লাউজ পরা কর্মজীবী মেয়েগুলোকে তার চারপাশে তুষারপাতের মতো ঝরে পড়তে দেখলে বোন কালেক্টর একটুও অবাক হতো না। ভাবল, তাদের শরীর থেকে আগুনের ফুলকি আর ধোঁয়া উড়ছে, অবাক মহিমায় তারা লুটিয়ে পড়ছে মৃত্যুর কোলে।
স্নাইডারের আস্তানায় ঢুকে এমন দৃশ্য দেখল পুলিশ যা তাদের মতো ঝানু লোকদেরও রোম খাড়া করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বেসমেন্টে পাওয়া গেল হতভাগী এস্থার ওয়ানরবের লাশ (বা তার যা অবশিষ্ট ছিল)। আগুনের অসমাপ্ত কাজটা শেষ করার ঝোঁক চেপেছিল স্নাইডারের মাথায়, তাই সে ধীরে ধীরে মেয়েটার শরীর থেকে মাংস সরাচ্ছিল, যার পদ্ধতি এখানে বর্ণনা করা অসম্ভব।
এই জঘন্য জায়গা তল্লাশি করে বেসমেন্টের পাশে একটা গোপন কুঠুরি পাওয়া গেল, যা মাংস ছাড়ানো হাড়ে ভরতি। স্নাইডারের বিছানার নিচে একটা ডায়েরি পেল এক কনস্টেবল, সেখানে নিজের কুকর্মের ইতিহাস লিখে রেখেছিল ঐ উন্মাদ।
‘হাড় হলো মানুষের পরম সত্তা,’ লিখেছিল স্নাইডার। ‘এটা বদলায় না, ধোঁকা দেয় না, নতি স্বীকার করে না। একবার যদি আমাদের নশ্বর মাংসের খোলস, নিচু জাতের খুঁত আর দুর্বল লিঙ্গ পরিচয় পুড়িয়ে বা সেদ্ধ করে ফেলা যায়, তবে আমরা সবাই হাড়মাত্র। হাড় কখনো মিথ্যা বলে না। হাড় অমর।’
পাগলটার লেখায় ভিকটিমদের শরীর থেকে মাংস ছাড়ানোর নানান বীভৎস পরীক্ষার বর্ণনা ছিল। সে লাশ সেদ্ধ করেছে, পুড়িয়েছে, ক্ষার দিয়ে গলিয়েছে, পশুপাখিকে খাইয়েছে, পানিতে ডুবিয়ে রেখেছে। কিন্তু এই নারকীয় খেলার জন্য একটা পদ্ধতিই সবচেয়ে পছন্দ ছিল তার।
‘আমি সিদ্ধান্তে এসেছি যে এটাই সেরা; উর্বর মাটিতে শরীরটা কবর দেওয়া আর প্রকৃতিকে তার কাজ করতে দেওয়া। এতে সময় বেশি লাগে ঠিকই, কিন্তু সন্দেহ হওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ এতে গন্ধ খুব একটা ছড়ায় না। জ্যান্ত কবর দেওয়াই পছন্দ আমার, তবে কেন তা নিশ্চিত করে বলতে পারব না।’
গোপন কুঠুরিতে আরো তিনটি লাশ ঠিক এই অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। হতভাগা ভিকটিমদের ছড়িয়ে থাকা হাত আর হাঁ করা মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, স্নাইডার যখন তাদের যন্ত্রণাক্লিষ্ট মাথার উপর শেষ বেলচা মাটি ফেলছিল, তখনো জীবিত ছিল তারা। এই ভয়ানক পন্থার কারণেই তৎকালীন সাংবাদিকরা স্নাইডারকে এমন এক নামে ডাকতে শুরু করে যা চিরকালের জন্য তার সাথে জুড়ে যায়: ‘দ্য বোন কালেক্টর।’
গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে সে, মন পড়ে আছে ট্রাংকে থাকা মেয়েটার দিকে, এস্থার ওয়ানরব। তার সরু কনুই, পাখির ডানার মতো নাজুক কলার বোন। ক্যাবের গতি বাড়াল সে, দুটো লাল বাতি অমান্য করার ঝুঁকিও নিল। আর তর সইছে না তার।
‘আমি ক্লান্ত নই!’ খেঁকিয়ে উঠল রাইম।
‘ক্লান্ত হন বা না হন, বিশ্রাম দরকার আপনার।’
‘না, আমার আরেক পেগ মদ দরকার।’
দেয়ালের পাশ দিয়ে কালো স্যুটকেসগুলো রাখা, টুয়েন্টিয়েথ প্রিসিংকটের অফিসাররা এসে ওগুলো আইআরডি ল্যাবে নিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে। নিচতলায় মাইক্রোস্কোপের বাক্সটা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে মেল কুপার। ক্যাঁচক্যাঁচে বেতের চেয়ারে বসে আছে লন সেলিট্টো, মুখে কোনো কথা নেই।
বোঝাই যাচ্ছে মদের নেশা খুব একটা স্থির করতে পারেনি লিংকন রাইমকে। টম বলল, ‘নিশ্চিত আপনার ব্লাড প্রেশার বেড়ে গেছে। বিশ্রাম নিন।’
‘মদ চাই আমার।’
অ্যামেলিয়ার পিন্ডি চটকাতে ইচ্ছা করছে। কেন যে করছে, তা বুঝে পাচ্ছে না রাইম।
‘ছেড়ে দেওয়া উচিত আপনার। মদ আপনার জন্য ভালো নয়।’
বেশ তো, ছেড়েই তো দিচ্ছি, মনে মনে জবাব দিল রাইম। একেবারে। সোমবার। আর কোনো বারো-ধাপের প্ল্যান নয়; এক ধাপেই খেল খতম।
‘আরেকটু ঢেলে দাও,’ হুকুম দিল সে। আসলে মদ খাওয়ার কোনো ইচ্ছাই নেই তার।
‘না।’
‘মদ ঢালো বলছি!’ খেঁকিয়ে উঠল রাইম।
‘কোনোমতেই না।’
‘লন, তুমি একটু দেবে, প্লিজ?’
‘আমি…’
টম বলল, ‘আর এক ফোঁটাও পাবে না ও। এমন মেজাজ দেখালে সে অসহ্য হয়ে ওঠে। আর আমরা কেউ ওর অত্যাচার সহ্য করব না।’
‘আমার জিনিস আমাকে দিচ্ছ না? বরখাস্ত করব তোমাকে।’
‘করুন।’
‘পঙ্গু নির্যাতন! মামলা ঠুকে দেবো তোমার নামে। অ্যারেস্ট করো ওকে, লন।’
‘লিংকন,’ শান্ত করার চেষ্টা করল সেলিট্টো।
‘অ্যারেস্ট করো ওকে!’
রাইমের গলার ঝাঁঝালো স্বরে ভড়কে গেল ডিটেকティブ।
‘অ্যাই, একটু শান্ত হও,’ বলল সেলিট্টো।
‘ওহ, ক্রাইস্ট,’ গোঙাতে শুরু করল রাইম। জোরে জোরে কাতরাতে লাগল।
ফস করে বলে উঠল সেলিট্টো, ‘কী হলো?’
চুপ করে আছে টম, সতর্ক চোখে দেখছে তাকে।
‘আমার লিভার।’ মুখে এক নিষ্ঠুর হাসি ফুটিয়ে বলল রাইম। ‘সিরোসিস হয়েছে বোধহয়।’
রাগে টম ঘুরে দাঁড়াল। ‘আমি আর এসব সহ্য করব না। ঠিক আছে?’
‘না, ঠিক নেই-‘ দরজা থেকে এক নারীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল: ‘আমাদের হাতে সময় বেশি নেই।’ ‘-একদমই না।’
ঘরে ঢুকল অ্যামেলিয়া স্যাক্স, খালি টেবিলগুলোর দিকে তাকাল। ঠোঁটের উপর লালা অনুভব করল রাইম। প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়ল সে। কারণ মেয়েটা তার লালা দেখে ফেলেছে। এই কড়কড়ে সাদা শার্টটা তো ও শুধু মেয়েটার জন্যই পরেছিল। আর সে একা হতে চেয়েছিল, চিরকালের জন্য, নিথর শান্তিঘেরা অন্ধকার রাজ্যে, যেখানে সে রাজা হতে পারবে। একদিনের জন্য নয়। অনন্তকালের জন্য।
এখনো সুড়সুড় করছে লালাটা। ঠোঁট মুছতে গিয়ে ঘাড়ের ব্যথা করা পেশিগুলোয় খিল ধরে গেল তার। পটু হাতে বাক্স থেকে টিস্যু বের করে বসের মুখ আর থুতনি মুছে দিল টম।
‘অফিসার স্যাক্স,’ বলল টম। ‘স্বাগত। পরিপক্বতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখালেন। যদিও এই মুহূর্তে এখানে তার বড়ই অভাব।’
টুপি পরেনি মেয়েটা, নেভি ব্লাউজের কলারটা খোলা। লম্বা লাল চুলগুলো কাঁধের উপর ছড়িয়ে আছে। কম্পারিজন মাইক্রোস্কোপের নিচে ঐ চুল আলাদা করতে কারো কোনো অসুবিধে হবে না।
‘খবর?’
‘মেল আমাকে ঢুকতে দিল,’ সিঁড়ির দিকে মাথা নেড়ে বলল সে।
‘শুতে যাওয়ার সময় পার হয়ে যায়নি, স্যাক্স?’
কাঁধে টোকা দিল টম। ভদ্রভাবে কথা বলার ইঙ্গিত সেই টোকায়।
‘ফেডারেল বিল্ডিংয়ে ছিলাম,’ সেলিট্টোকে বলল সে। ‘আমাদের ট্যাক্সের টাকার কী হলো তা দেখতে।’
‘ধরে ফেলেছে ওকে।’
‘কী?’ বলে উঠল সেলিট্টো। ‘এত সহজে? জিসাস। ডাউনটাউনে জানে সবাই?’
‘পারকিন্স মেয়রকে ফোন করেছে। লোকটা এক ক্যাব ড্রাইভার। জন্ম এখানেই, কিন্তু বাবা সার্বিয়ান। তাই ওরা ভাবছে ইউএন-এর উপর কোনো আক্রোশ থেকে এসব করছে। ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে। ওহ, মানসিক সমস্যার ইতিহাসও আছে। ডেলরে আর এফবিআই সোয়াট টিম রওয়ানা হয়ে গেছে।’
‘কীভাবে পেল?’ জানতে চাইল রাইম। ‘बाजी ধরে বলতে পারি আঙুলের ছাপটা দিয়ে।’
মাথা নাড়ল সে।
‘জানতাম ওটার বড় ভূমিকা থাকবে। আচ্ছা, বলো তো, পরের ভিকটিমকে নিয়ে ওরা কতটা চিন্তিত?’
‘চিন্তিত,’ ভাবলেশহীন গলায় বলল সে। ‘তবে আনসাবকে ধরানোটাই ওদের আসল উদ্দেশ্য।’
‘ওটাই তো ওদের স্বভাব। ওরা নিশ্চয়ই ভাবছে লোকটাকে ধরার পর প্যাঁদানি দিয়ে ভিকটিমের খোঁজ বের করবে।’
‘ঠিক ধরেছেন।’
‘সেটা করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হতে পারে,’ বলল রাইম। ‘আমাদের ডাক্তার ডবিন্স আর বিহেভিওরাল এক্সপার্টদের সাহায্য ছাড়াই এই মত দিচ্ছি। তা, মত বদলালে নাকি, অ্যামেলিয়া? ফিরে এলে কেন?’
‘ডেলরে ওকে ধরুক বা না ধরুক, আমার মনে হয় না অপেক্ষা করার মতো সময় আছে আমাদের। মানে, পরের ভিকটিমকে বাঁচানোর জন্য।’
‘ওহ, কিন্তু আমাদের তো উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, শোনোনি? দোকান বন্ধ, পাট চুকে গেছে।’
কালো কম্পিউটার স্ক্রিনে নিজের ছায়া দেখছে রাইম, চুলটা ঠিক আছে কি না বোঝার চেষ্টা করছে।
‘হাল ছেড়ে দিচ্ছ?’ জানতে চাইল সে।
‘অফিসার,’ শুরু করল সেলিট্টো, ‘আমরা কিছু করতে চাইলেও তো আমাদের কাছে কোনো ফিজিক্যাল এভিডেন্স নেই। ওটাই তো একমাত্র যোগসূত্র…’
‘আমার কাছে আছে।’
‘কী?’
‘সব আছে। নিচে আরআরভি-তে।’
জানালার বাইরে তাকাল ডিটেকティブ।
বলে চলল স্যাক্স, ‘শেষ সিনের আলামত। সব সিনের।’
‘তোমার কাছে আছে?’ রাইম জিজ্ঞেস করল। ‘কীভাবে?’
কিন্তু হাসছে সেলিট্টো। ‘ও চুরি করেছে ওগুলো, লিংকন। মাথা নষ্ট অবস্থা!’
‘ডেলরের ওসবের দরকার নেই,’ যুক্তি দিল স্যাক্স। ‘শুধু ট্রায়ালের সময় লাগবে। ওরা আনসাবকে পেয়েছে, আমরা ভিকটিমকে বাঁচাব। ভালোই তো, তাই না?’
‘কিন্তু মেল কুপার তো এইমাত্র চলে গেল।’
‘না, ও নিচেই আছে। আমি অপেক্ষা করতে বলেছি।’ হাত আড়াআড়ি ভাঁজ করল স্যাক্স। ঘড়ির দিকে তাকাল সে। এগারোটা বাজে। ‘আমাদের হাতে সময় বেশি নেই,’ আবার বলল সে।
রাইমের চোখও ঘড়ির দিকে। উফ, বড্ড ক্লান্ত সে। টম ঠিকই বলেছিল; গত কয়েক বছরের মধ্যে আজই সবচেয়ে বেশি সময় জেগে আছে সে। কিন্তু অবাক হয়ে-না, আঁতকে উঠে-আবিষ্কার করল যে আজকের দিনে সে যতই রেগে থাকুক বা লজ্জিত হোক কিংবা হতাশায় বিদ্ধ হোক না কেন, সময়টা তার বুকের উপর অসহ্য পাথরের মতো চেপে বসেনি। যেমনটা গত সাড়ে তিন বছর ধরে বসে ছিল।
‘ইঁদুর হয়ে আবার ঢুকে পড়লাম তদন্তে,’ হাসল রাইম। ‘টম? টম! কফি লাগবে আমাদের। জলদি। স্যাক্স, সেলোফেনের স্যাম্পলগুলো ল্যাবে নিয়ে যাও, সাথে মেল যেটা বাছুরের হাড় থেকে পেয়েছিল সেটার পোলারয়েডটাও। এক ঘণ্টার মধ্যে পোলারাইজেশন-কম্পারিজন রিপোর্ট চাই। কোনো সম্ভবত মার্কা বালছাল চলবে না। আমি সোয়াড় উত্তর চাই-কোন গ্রোসারি চেইন থেকে বাছুরের হাড় কিনেছিল আমাদের আনসাব। আর তোমার ঐ ছায়াসঙ্গীকে ফিরিয়ে আনো, লন। ঐ যে বেসবল প্লেয়ারের নামে যার নাম।’
কালো ভ্যানগুলো অলিগলি দিয়ে ছুটছে। আসামি যেখানে থাকে, সেখানে যাওয়ার জন্য এটা ঘুরপথ, কিন্তু ডেলরে জানে সে কী করছে। অ্যান্টি-টেরর অপারেশনে প্রধান রাস্তাগুলো এড়িয়ে চলাই নিয়ম, ওগুলোয় প্রায়ই পাহারা বসায় সঙ্গীরা।
লিড ভ্যানের পেছনে বসে বডি আর্মারের ভেলক্রো স্ট্র্যাপটা টাইট করল ডেলরে। আর দশ মিনিটের পথ। জরাজীর্ণ অ্যাপার্টমেন্ট আর আবর্জনায় ভরা লটগুলোর দিকে তাকাল সে, গাড়ি ছুটছে ঝড়ের বেগে।
শেষবার যখন এই ভাঙাচোরা পাড়ায় এসেছিল, তখন সে ছিল কুইন্সের রাস্তাফারিয়ান পিটার হেইল টমাস। ১৩৭ পাউন্ড কোকেন কেনার কথা ছিল এক শুঁটকা পুয়ের্তোরিকানের কাছ থেকে। সে আবার শেষ মুহূর্তে মত বদলে বায়ারকে, অর্থাৎ তাকেই হাইজ্যাক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ডেলরের বাই-অ্যান্ড-বাস্ত টাকাটা নিয়ে তার কুঁচকি লক্ষ্য করে বন্দুক তাক করেছিল লোকটা, ট্রিগারে চাপ দিয়েছিল এমনভাবে যেন মুদি দোকান থেকে সবজি কিনছে। ক্লিক, ক্লিক, ক্লিক। মিসফায়ার। টবি ডুলিটল আর ব্যাকআপ টিম ঐ শুয়োর আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের ধরে ফেলার আগেই নিজের অন্য বন্দুকটা বের করার চেষ্টা করেছিল ব্যাটা। আর ডেলরে তখন ভাবছিল কী কপাল তার! ও মরতে বসেছিল কারণ লোকটা সত্যিই বিশ্বাস করেছিল যে সে পুলিশ নয়, ড্রাগ ডিলার।
‘আর চার মিনিট,’ জানাল ড্রাইভার।
কেন যেন লিংকন রাইমের কথা মনে পড়ে গেল ডেলরের। কেসটা কেড়ে নেওয়ার সময় অমন খারাপ ব্যবহার না করলেই হতো। কিন্তু এছাড়া উপায় ছিল না। সেলিট্টো ভীষণ একগুঁয়ে আর পোলিং একটা সাইকো। অবশ্য, ডেলরে ওদের সামলে নিতে পারে। কেবল রাইমই তাকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। ক্ষুরধার বুদ্ধি (আরে, ওর টিমই তো পিটর্সের প্রিন্ট খুঁজে পেয়েছিল। ওরা কাজটা যথাসম্ভব দ্রুতভাবে করেনি যদিও)। দুর্ঘটনার আগে রাইম না চাইলে তাকে হারানো অসম্ভব ছিল।
আর তাকে বোকা বানানোও যেত না। এখন, রাইম একটা ভাঙা খেলনা। মানুষের কপালে কী ঘটে, ভাবলে কষ্ট হয়, কীভাবে মরে গিয়েও বেঁচে থাকে মানুষ।
ডেলরে ওর ঘরে ঢুকেছিল-শোবার ঘর, তাও-আর বেশ কড়া কথা শুনিয়েছিল। যতটা দরকার ছিল তার চেয়েও বেশি। হয়তো একটা ফোন করা উচিত। সে পারত…
‘শো টাইম,’ হাঁক দিল ড্রাইভার। লিংকন রাইমের কথা বেমালুম ভুলে গেল ডেলরে।
পিটর্স যেখানে থাকে সেই রাস্তায় ঢুকল ভ্যানগুলো। অন্যান্য রাস্তায় ঘেমে নেয়ে একাকার হওয়া মানুষজন বিয়ারের বোতল আর সিগারেট হাতে একটু ঠান্ডা বাতাসের আশায় দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু এই রাস্তাটা অন্ধকার, জনশূন্য। ধীরে ধীরে থামল ভ্যানগুলো।
দুই ডজন এজেন্ট নামল, কালো ট্যাকটিক্যাল পোশাকে, হাতে এইচঅ্যান্ডকে, নলের মাথায় লাইট আর লেজার সাইট লাগানো। দুইটা ভবঘুরে লোক তাকিয়ে রইল ওদের দিকে; একজন তাড়াতাড়ি তার শার্টের নিচে কোল্ট ৪৪ মল্ট লিকারের বোতলটা লুকিয়ে ফেলল।
পিটর্সের দালানের একটা জানালার দিকে তাকাল ডেলরে; টিমটিমে হলুদ আলো জ্বলছে সেখানে। ছায়ায় ঢাকা একটা পার্কিং স্পেসে প্রথম ভ্যানটা ব্যাক করে ঢোকাল ড্রাইভার, ডেলরেকে ফিসফিস করে বলল, ‘পারকিন্স।’ হেডসেটে টোকা দিল সে। ‘ডিরেক্টর লাইনে আছেন। জানতে চাইছেন লিড দিচ্ছে কে।’
‘আমি দিচ্ছি!’ ধমকে উঠল বহুরূপী। টিমের দিকে ফিরল সে। ‘রাস্তার ওপাশে আর গলিতে নজর রাখো। স্নাইপার, ওখানে, ওখানে আর ওখানে। আর সবাইকে পাঁচ মিনিট আগেই পজিশনে দেখতে চাই আমি। সবাই কি একমত?’
সিঁড়ি দিয়ে নামছে ওরা, ক্যাঁচক্যাঁচ করছে পুরোনো কাঠ। সে। মাথায় আঘাত পেয়ে আধো-অচেতন মেয়েটাকে হাতে জড়িয়ে বেসমেন্টে নিয়ে এল সিঁড়ির গোড়ায় তাকে মাটির মেঝের উপর ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল, তাকিয়ে রইল তার দিকে। এস্থার…
চোখ তুলে তাকাল মেয়েটা। হতাশ, মিনতি করছে। খেয়াল করল না সে। শুধু ওর শরীরের দিকে চোখ। জামাকাপড় খুলতে শুরু করল সে; বেগুনি জগার্স আউটফিট। ভাবাই যায় না, এই যুগে কোনো মেয়ে অমন পোশাক পরে বাইরে বেরোতে পারে। এটা তো অন্তর্বাস ছাড়া আর কিছুই নয়। এস্থার ওয়ানরব যে বেশ্যা ছিল, তা ভাবেনি সে। খেটে খাওয়া মেয়ে ছিল সে, শার্ট সেলাই করত, এক পেনিতে পাঁচটা।
বোন কালেক্টর লক্ষ করল, গলার কাছে তার কলার বোনটা কেমন ভেসে উঠেছে। অন্য কোনো পুরুষ হয়তো তার স্তন আর কালো বোঁটার দিকে তাকাত। কিন্তু সে তাকিয়ে রইল বুকের মাঝখানের হাড় বা ম্যানুব্রিয়ামের খাঁজের দিকে। সেখান থেকে মাকড়সার পায়ের মতো ছড়িয়ে পড়েছে পাঁজরের হাড়গুলো।
‘কী করছেন আপনি?’ জিজ্ঞেস করল মেয়েটা, মাথায় আঘাতের কারণে ঝিমুচ্ছে।
বোন কালেক্টর খুঁটিয়ে দেখল তাকে। মেয়েটার চওড়া নাক, পুরু ঠোঁট আর নোংরা বালিরঙা চামড়া দেখল না অবশ্য। ঐসব খুঁতের আড়ালে সে দেখছে তার হাড়ের কাঠামোর নিখুঁত সৌন্দর্য।
কপালে হাত বোলাল সে, আলতো করে। প্লিজ, যেন ফাটা না থাকে…
কাশল মেয়েটা, নাসারন্ধ্র ফুলে উঠল তাতে। বেসমেন্টে খুব কড়া একটা গন্ধ। সে আর ওটা টের পায় না যদিও।
‘আর মেরো না আমাকে,’ ফিসফিস করে বলল ভিকটিম, মাথাটা এপাশ-ওপাশ করছে। ‘প্লিজ, মেরো না। প্লিজ।’
পকেট থেকে ছুরিটা বের করল সে, নিছু হয়ে কেটে ফেলল অন্তর্বাস। নিজের নগ্ন শরীরের দিকে তাকাল সে।
‘এটা চান আপনি?’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল সে। ‘ঠিক আছে, আমাকে ধর্ষণ করতে পারেন। মেরে ফেলবেন না, প্লিজ।’
মাংসের সুখ…এর ধারেকাছেও লাগে না, ভাবল সে।
তাকে টেনে দাঁড় করাল সে, আর পাগলের মতো তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বেসমেন্টের কোনায় একটা ছোট দরজার দিকে টলতে টলতে এগোতে লাগল মেয়েটা। দৌড়াচ্ছে না, পালানোরও চেষ্টা করছে না। শুধু ফুঁপিয়ে কাঁদছে, হাত বাড়াচ্ছে, দরজার দিকে এঁকেবেঁকে এগোচ্ছে।
তাকিয়ে রইল বোন কালেক্টর, তার এই ধীর, করুণ ভঙ্গি দেখে মোহিত হয়ে গেছে। দরজাটা একসময় কয়লা ফেলার পথ ছিল। এখন একটা সরু সুড়ঙ্গে গিয়ে মিশেছে, পাশের পরিত্যক্ত দালানের বেসমেন্টের সাথে যুক্ত।
কোনোমতে ধাতব দরজাটার কাছে পৌঁছাল এস্থার, টান দিয়ে খুলল। ঢুকে পড়ল ভেতরে। মিনিটখানেক পরেই তার আকাশফাটা চিৎকার শুনতে পেল সে। তারপর ভেসে এল দমফাটা, বুকচেরা আর্তনাদ। ‘গড, না, না, না…’ আরো কিছু কথা অস্পষ্ট হয়ে গেল তার আতঙ্কিত চিৎকারে।
তারপর সুড়ঙ্গ দিয়ে ফিরে এল সে, এবার আরো দ্রুত। হাতদুটো চারপাশে ঝাপটাচ্ছে, যেন যা দেখেছে তা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছে।
আমার কাছে এসো, এস্থার।
মাটিতে হোঁচট খাচ্ছে মেয়েটা, কাঁদছে।
আমার কাছে এসো।
সোজা দৌড়ে এসে তার ধৈর্যশীল, অপেক্ষমাণ বাহুর মধ্যে ধরা দিল সে, জড়িয়ে ধরল তাকে। প্রেমিকের মতো শক্ত করে মেয়েটাকে পাল্টা জড়িয়ে ধরল বোন কালেক্টর, আঙুলের নিচে সেই চমৎকার কলার বোনটাকে অনুভব করল। এরপর ধীরে ধীরে উন্মাদপ্রায় মেয়েটাকে সুড়ঙ্গের দরজার দিকে টেনে নিয়ে চলল সে।
