অধ্যায় চার
‘ক্রাইম সিনটা সাজানো,’ ঘোষণা করল লিংকন রাইম।
গায়ের জ্যাকেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে লন সেলিট্টো, বেরিয়ে পড়েছে বাজেভাবে দোমড়ানো-মোচড়ানো শার্টটা। কাগজ আর বইপত্র ছড়ানো টেবিলটার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল সে, হাতদুটো বুকের উপর ক্রস আকারে রাখা।
ফিরে এসেছে জেরি ব্যাংকসও, তার ফ্যাকাশে নীল চোখদুটো এখন রাইমের উপর। বিছানা আর কন্ট্রোল প্যানেল নিয়ে আর কোনো আগ্রহ নেই তার।
‘কিন্তু আনসাব আমাদের কী গল্প গেলাতে চাইছে?’ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল সেলিট্টো।
ক্রাইম সিনে, বিশেষ করে খুনের ঘটনায়, অপরাধীরা তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করার জন্য প্রায়ই আলামত নিয়ে কারসাজি করে। কেউ কেউ বেশ বুদ্ধির পরিচয় দেয়, তবে বেশিরভাগই তা পারে না। যেমন সেই স্বামী যে তার স্ত্রীকে পিটিয়ে মেরে ডাকাতির নাটক সাজাতে চেয়েছিল, কিন্তু স্ত্রীর গয়নাগাটি সরালেও নিজের সোনার ব্রেসলেট আর হীরের আংটি ড্রেসারের উপরই ফেলে রেখেছিল সে।
‘মজার ব্যাপার তো ওটাই,’ বলল রাইম। ‘লন, কী ঘটেছে সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো কী ঘটতে যাচ্ছে।’
‘কী দেখে এমন মনে হলো তোমার?’ জানতে চাইল সেলিট্টো, কণ্ঠে সন্দেহ।
‘কাগজের টুকরোগুলো। ওগুলোর মানে হলো: আজ বিকেল তিনটা।’
‘আজ?’
‘দেখো!’ রিপোর্টের দিকে মাথা নাড়ল রাইম, হাবভাবে অধৈর্য ভঙ্গি তার।
‘একটা টুকরোয় লেখা: বিকেল তিনটা,’ বলল ব্যাংকস। ‘কিন্তু অন্যটা তো পৃষ্ঠার নম্বর। আপনার কেন মনে হচ্ছে আজই?’
‘ওটা পৃষ্ঠা নম্বর নয়।’ ভ্রু নাচাল রাইম। ওরা এখনো ব্যাপারটা ধরতে পারছে না। ‘যুক্তি! কু বা সূত্র ফেলে রাখার একটাই কারণ হতে পারে—আমাদের কিছু জানানো। যদি তাই হয়, তবে ৮২৩ কোনো সাধারণ পৃষ্ঠা নম্বর হতে পারে না, কারণ ওটা কোন বইয়ের পৃষ্ঠা তার কোনো হদিস নেই। তাহলে ওটা পৃষ্ঠা নম্বর না হলে কী?’
নীরবতা।
বিরত হয়ে ধমকে উঠল রাইম। ‘ওটা একটা তারিখ! আট, তেইশ। তেইশে আগস্ট। আজ বিকেল তিনটায় কিছু একটা ঘটতে চলেছে। আর ঐ সুতোর দলাটা? ওটা অ্যাসবেস্টস।’
‘অ্যাসবেস্টস?’ জিজ্ঞেস করল সেলিট্টো।
‘রিপোর্টে দেখোনি? ফর্মুলাটা? হর্নব্লেন্ড। সিলিকন ডাইঅক্সাইড। ওটাই অ্যাসবেস্টস। পেরেত্তি কেন ওটা এফবিআই-এর কাছে পাঠাতে গেল কে জানে। তো রেললাইনের উপর অ্যাসবেস্টস পাওয়া গেছে যেখানে ওটা থাকার কথা নয়। আর আছে একটা লোহার বল্টু, যার মাথায় জং ধরেছে কিন্তু প্যাঁচে ধরেনি। তার মানে অনেক দিন কোথাও আটকানো ছিল ওটা, সম্প্রতি খোলা হয়েছে।’
‘হয়তো মাটি খোঁড়ার সময় উল্টে গিয়ে ময়লা লেগেছে,’ মত দিল ব্যাংকস।
‘না। মিডটাউনে শক্ত পাথর মাটির খুব কাছেই থাকে, মানে ভূগর্ভস্থ জলস্তরও। থার্টি-ফোরথ স্ট্রিট থেকে হার্লেম পর্যন্ত মাটির যা অবস্থা, তাতে লোহার জিনিসে জং ধরতে কয়েক দিনই যথেষ্ট। মাটির নিচে থাকলে শুধু মাথায় নয়, পুরোটাতেই জং ধরত। না, ওটা কোথাও থেকে খোলা হয়েছে, ঘটনাস্থলে বয়ে এনে রেখে দেওয়া হয়েছে। আর ঐ বালি… ম্যানহাটনের মিডটাউনে রেললাইনের বেডে সাদা বালি এল কোত্থেকে? ওখানকার মাটিতে থাকে দোআঁশ, পলি, গ্রানایت, শক্ত পাথর আর নরম কাদা,’ বলল রাইম।
ব্যাংকস কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিল রাইম। ‘আর এই জিনিসগুলো সব একসাথে জড়ো করে রাখা ছিল কেন? ওহ, আমাদের আনসাব কিছু একটা বলতে চাইছে। বাজি ধরে বলতে পারি, চাইছে সে। ব্যাংকস, এক্সেস ডোর বা ঐ দরজাটার কী খবর?’
‘ঠিকই ধরেছিলেন,’ বলল তরুণটি। ‘কবর থেকে একশো ফুট উত্তরে একটা দরজা পাওয়া গেছে। ভেতর থেকে ভেঙে খোলা হয়েছে। ছাপের ব্যাপারেও ঠিকই বলেছিলেন আপনি। কিচ্ছু নেই। গাড়ির চাকার দাগ বা অন্য কোনো আলামতও না।’
একদলা নোংরা অ্যাসবেস্টস, একটা বল্টু, ছেঁড়া খবরের কাগজ…
‘আর ক্রাইম সিন?’ জানতে চাইল রাইম। ‘অক্ষত আছে?’
‘ছেড়ে দেওয়া হয়েছে পুলিশি পাহারা।’
বিরক্তিতে জোরে জোরে শ্বাস ফেলল খুনি ফুসফুসের অধিকারী লিংকন রাইম। ‘ভুলটা করল কে?’
‘জানি না,’ আমতা আমতা করে বলল সেলিট্টো। ‘ওয়াচ কমান্ডার হয়তো।’
রাইম বুঝতে পারল কাজটা পেরেত্তির। ‘তাহলে যা পেয়েছ তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে তোমাদের।’
কিডন্যাপার কে বা তার মতলব কী—সেসব সূত্র হয় রিপোর্টে আছে, নয়তো পুলিশ, দর্শক আর রেলকর্মীদের পায়ের তলায় পিষে চিরতরে হারিয়ে গেছে। মাঠেঘাটে খাটাখাটনি, আশেপাশে খোঁজখবর নেওয়া, সাক্ষীদের জেরা করা, সূত্র বের করা, গতানুগতিক গোয়েন্দাগিরি—এসব ধীরে সুস্থে করা যায়। কিন্তু ক্রাইম সিনের কাজ করতে হয় ‘বজ্রপাতের গতিতে’, আইআরডি-তে থাকার সময় অফিসারদের এই নির্দেশই দিত রাইম। তার মনমতো দ্রুত কাজ না করায় সিএসইউ-এর বেশ কয়েকজন টেকনিশিয়ানকে বরখাস্তও করেছিল সে।
‘পেরেত্তি কি নিজে সিনের দায়িত্বে ছিল?’ জানতে চাইল সে।
‘পেরেত্তি আর তার পুরো দল।’
‘পুরো দল?’ বাঁকা গলায় জিজ্ঞেস করল রাইম। ‘পুরো দল বলতে কী বোঝাচ্ছ?’
ব্যাংকসের দিকে তাকাল সেলিট্টো।
‘ফটো থেকে চারজন টেকনিশিয়ান, ল্যাটেন্টস বা ছাপ বিশেষজ্ঞ চারজন। আটজন সার্চার। এমই ট্যুর ডাক্তার,’ বলল ব্যাংকস।
‘আটজন সার্চার?’
ক্রাইম সিন প্রসেস করার একটা ‘বেল কার্ড’ বা কার্যকারিতার গ্রাফ আছে। একটা খুনের ঘটনার জন্য দুজন অফিসারকে সবচেয়ে দক্ষ মনে করা হয়। একা কাজ করলে অনেক কিছু চোখ এড়িয়ে যেতে পারে; আবার তিন বা তার বেশি হলে আরো বেশি জিনিস মিস করার সম্ভাবনা থাকে। লিংকন রাইম সব সময় একা ক্রাইম সিন সার্চ করত। ছাপের কাজ ল্যাটেন্টস আর ছবি বা ভিডিওর কাজ ফটো ইউনিটের উপর ছেড়ে দিত। কিন্তু গ্রিড ধরে হাঁটার কাজটা করত সে একাই।
পেরেত্তি। এক বড়লোক রাজনীতিবিদের ছেলে। এই তরুণকে ছয়-সাত বছর আগে নিজেই নিয়োগ দিয়েছিল রাইম। সিএস বা ক্রাইম সিন ডিটেকটিভ হিসেবে ছেলেটা ভালোই, নিয়ম মেনে কাজ করে। ক্রাইম সিন ইউনিটকে লোভনীয় জায়গা মনে করা হয়, সেখানে ঢোকার জন্য সব সময় লম্বা লাইন লেগে থাকে। আবেদনকারীদের সংখ্যা কমানোর জন্য রাইম একটা অদ্ভুত কাজ করত: ওদেরকে ফ্যামিলি অ্যালবাম দেখতে দিত সে, যা আসলে বীভৎস সব ক্রাইম সিনের কালেকশন। কিছু অফিসার ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যেত, কেউ কেউ মুখ টিপে হাসত। কেউ আবার অ্যালবাম ফেরত দিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে তাকাত, যেন জিজ্ঞেস করছে, তাতে কী? আর এদেরকেই চাকরিতে নিত লিংকন রাইম। পেরেত্তি ছিল তাদেরই একজন।
একটা প্রশ্ন করেছিল সেলিটো। রাইম দেখল ডিটেকটিভ তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আবারো বলল সে, ‘এই কেসটায় আমাদের সাথে কাজ করবে তুমি, করবে না, লিংকন?’
‘তোমাদের সাথে কাজ?’ কেশে গলা পরিষ্কার করে হাসল রাইম। ‘আমি পারব না, লন। শুধু কয়েকটা আইডিয়া দিচ্ছি তোমাদের। এটুকুই। কাজে লেগে পড়ো। টম, বার্জারকে ফোন লাগাও।’
মরণ-ডাক্তারের সাথে একান্ত আলাপচারিতা পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য এখন আফসোস হচ্ছে তার। হয়তো এখনো খুব বেশি দেরি হয়নি। মৃত্যুর জন্য আরো এক বা দুদিন অপেক্ষা করার কথা ভাবলেই অসহ্য লাগছে। আর সোমবার… সোমবার মরতে চায় না সে। বড্ড সাধারণ মনে হয় দিনটা।
‘প্লিজ, বলো।’
‘টম!’
‘ঠিক আছে।’ হাত তুলে হার মানল তরুণ সহকারী।
বেডসাইড টেবিলের যে জায়গাটায় বোতল, বড়ি আর প্লাস্টিকের ব্যাগটা রাখা ছিল, সেদিকে তাকাল রাইম—খুব কাছেই আছে ওগুলো। কিন্তু এই জীবনের বাকি সবকিছুর মতোই এগুলোও লিংকন রাইমের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে এখন।
ফোন করল সেলিট্টো, লাইন কানেক্ট হতেই ঘাড় কাত করল। পরিচয় দিল নিজের। দেয়ালঘড়িতে তখন সাড়ে বারোটা।
‘ইয়েস, স্যার।’ ডিটেকটিভের গলা শ্রদ্ধামিশ্রিত ফিসফিসানিতে নেমে এল। মেয়র হবে হয়তো, আন্দাজ করল রাইম। ‘কেনেডির কিডন্যাপ কেসটা নিয়ে। আমি লিংকন রাইমের সাথে কথা বলছিলাম… ইয়েস, স্যার, ওর কিছু মতামত আছে এই ব্যাপারে।’
জানালার কাছে সরে গেল ডিটেকটিভ, ফ্যালকন পাখিটার দিকে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় শহর পরিচালনাকারী মানুষটিকে অব্যাখ্যাত সব ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। ফোন রেখে রাইমের দিকে ফিরল সে।
‘উনি এবং চিফ দুজনেই তোমাকে চাইছেন, লিংক। বিশেষভাবে অনুরোধ করেছেন। খোদ উইলসন।’
হেসে উঠল রাইম। ‘লন, ঘরটার দিকে তাকাও। আমার দিকে তাকাও! আমাকে দেখে কি মনে হয় কোনো কেস চালানোর মুরোদ আছে আমার?’
‘সাধারণ কেস হলে পারতাম না। কিন্তু এটা তো আর সাধারণ কেস নয়, তাই না?’
‘আমি দুঃখিত। আমার একদম সময় নেই। ঐ ডাক্তার। ট্রিটমেন্ট। টম, ফোন করেছ ওনার কাছে?’
‘এখনো করিনি। এই তো করছি।’
‘এক্ষুনি করো!’
সেলিট্টোর দিকে তাকাল টম। দরজার দিকে এগিয়ে গেল, পা বাড়াল বাইরে। রাইম জানে সে ফোন করবে না। অসহ্য এই দুনিয়া।
গালে রেজার ব্লেডে কাটার দাগে হাত বুলিয়ে ফস করে বলে বসল ব্যাংকস, ‘আমাদের শুধু কিছু আইডিয়া দিন, প্লিজ। এই আনসাব, আপনি বলছিলেন সে…’
হাত নেড়ে তাকে চুপ করিয়ে দিল সেলিটো। চোখদুটো রাইমের উপরই স্থির রেখেছে সে। ওহ, শয়তান কোথাকার, মনে মনে গালি দিল রাইম। সেই পুরোনো নীরবতা। কী ভীষণ ঘৃণা করি আমরা এই নীরবতাকে, আর কত দ্রুতই না সেটাকে দূর করতে চাই। এমনই ভারী, তপ্ত নীরবতার চাপে ভেঙে পড়েছিল অনেক সাক্ষী। ভালো জুটিই ছিল বটে সে আর সেলিট্টো। রাইম চিনত আলামত আর লন সেলিট্টো চিনত মানুষ। দ্য টু মাস্কেটিয়ার্স। আর যদি তৃতীয় কেউ থেকে থাকে, তবে সেটা হলো বিশুদ্ধ বিজ্ঞান।
ক্রাইম সিন রিপোর্টের উপর চোখ নামাল ডিটেকটিভ। ‘লিংকন। আজ তিনটায় কী হতে যাচ্ছে বলে তোমার মনে হয়?’
‘আমার কোনো ধারণা নেই,’ জানিয়ে দিল রাইম। ‘ধারণা নেই?’ ভারী সস্তা চাল চাললে, লন। এর শোধ আমি নেব।’ অবশেষে মুখ খুলল রাইম। ‘ও মেয়েটাকে মেরে ফেলবে… ট্যাক্সির ঐ মেয়েটাকে। আর খুব জঘন্যভাবে মারবে, আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি। এমন কিছু যা জ্যান্ত কবর দেওয়ার চেয়েও ভয়ানক।’
‘জিসাস,’ দরজা থেকে ফিসফিস করে বলল টম।
ওরা কেন তাকে একা থাকতে দেয় না? ঘাড় আর কাঁধের সেই তীব্র যন্ত্রণার কথা ওদের বললে কি কোনো লাভ হবে? কিংবা সেই ফ্যান্টম পেইন। দিনে দিনে অচেনা হয়ে ওঠা এই শরীরটাকে কুরে কুরে খায় ওটা। প্রতিদিনের প্রতিটি কাজের জন্য যে সংগ্রাম করা লাগে, তা থেকে উদ্ভূত ক্লান্তির কথা বলবে ওদেরকে? কিংবা সবচাইতে বড় ক্লান্তি—অন্যের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকার গ্লানির কথা? মশার ব্যাপারটা বলা যায় ওদের। কাল রাতে একটা মশা ঢুকেছিল ঘরে, এক ঘণ্টা ধরে চক্কর কেটেছে মাথার উপর; মাথা নেড়ে ওটাকে তাড়াতে গিয়ে ক্লান্তিতে মাথা ঝিমঝিম করছিল তার। অবশেষে পোকাটা এসে বসল তার কানের উপর। ওখানেই ওটাকে হুল ফোটাতে দিয়েছিল সে। কারণ বালিশের সাথে ঘষে একমাত্র ঐ জায়গাটারই চুলকানি মেটাতে পারে সে।
একদিকের ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল সেলিট্টো। ‘আজই,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল রাইম। ‘একটা দিন। ব্যস, এটুকুই।’
‘ধন্যবাদ, লিংক। তোমার কাছে ঋণী হয়ে রইলাম।’ বিছানার পাশে একটা চেয়ার টেনে বসল সেলিটেট্টা। ব্যাংকসকেও ইশারা করল বসার জন্য। ‘বলো এবার। তোমার কী মনে হয়? ঐ হারামজাদার খেলাটা কী?’
রাইম বলল, ‘এত তাড়াহুড়ো কোরো না। আমি একা কাজ করি না।’
‘সেটাই স্বাভাবিক। কাকে চাও টিমে?’
‘আইআরডি-র একজন টেকনিশিয়ান। ল্যাবের যে সেরা, তাকেই চাই। বেসিক যন্ত্রপাতি নিয়ে এখানে চলে আসুক সে। আর কিছু ট্যাকটিক্যাল ছেলেপেলে দরকার। ইমার্জেন্সি সার্ভিসেস। ওহ, আর কয়েকটা ফোন লাগবে আমার,’ ড্রেসারের উপর রাখা স্কচের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিল রাইম। বার্জারের কিটের সেই ব্র্যান্ডির কথা মনে পড়ে গেল তার। ওসব সস্তা জিনিস খেয়ে মরতে রাজি নয় সে। তার ‘ফাইনাল এক্সিট’ বা শেষ যাত্রাটা হবে ষোলো বছরের পুরোনো লাগাভুলিন কিংবা বহু বছরের পুরোনো ম্যাকালান দিয়ে। অথবা দুটো দিয়েই।
নিজের সেলফোন বের করল ব্যাংকস। ‘কী ধরনের লাইন? শুধু…’
‘ল্যান্ডলাইন।’
‘এখানে?’
‘অবশ্যই না!’ ধমকে উঠল রাইম।
সেলিট্টো বলল, ‘ও চাইছে লোকলস্কর দিয়ে ফোন করানো হোক। বিগ বিল্ডিং বা হেডকোয়ার্টার থেকে।’
‘ওহ।’
‘ডাউনটাউনে ফোন দাও,’ হুকুম দিল সেলিট্টো। ‘ওদের বলো আমাদের জন্য তিন-চারজন ডিসপ্যাচার দিতে।’
‘লন,’ জিজ্ঞেস করল রাইম, ‘আজ সকালের খুনের ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছে কে?’
হাসি চাপল ব্যাংকস। ‘হার্ডি বয়েজ।’
রাইমের রাগী চাহনিতে মুখের হাসি মিলিয়ে গেল তার। ‘ডিটেকটিভ বেডিং আর সল, স্যার,’ তড়িঘড়ি করে যোগ করল ছোকরা।
কিন্তু এবার হাসল সেলিট্রোও। ‘হার্ডি বয়েজ। সবাই ওদের এই নামেই ডাকে। তুমি ওদের চেনো না, লিংক। ডাউনটাউনের হোমিসাইড টাস্ক ফোর্সের লোক ওরা।’
‘ওরা দেখতে অনেকটা একই রকম, ঐজন্য,’ ব্যাখ্যা দিল ব্যাংকস। ‘আর ওদের কথাবার্তার ধরনটাও একটু অদ্ভুত।’
‘কমেডিয়ান লাগবে না আমার।’
‘না, ওরা ভালো,’ বলল সেলিট্টো। ‘শহরের সেরা ক্যানভাসার ওরা। গত বছর কুইন্সে যে জানোয়ারটা ঐ আট বছরের মেয়েটাকে কিডন্যাপ করেছিল, মনে আছে? বেডিং আর সলই এলাকা চষে ফেলেছিল। পুরো পাড়ার ইন্টারভিউ নিয়েছিল ওরা, বাইশশোটা জবানবন্দি। ওদের কারণেই মেয়েটাকে বাঁচাতে পেরেছিলাম আমরা। আজ সকালে যখন জানা গেল ভিকটিম জেএফকে-র প্যাসেঞ্জার, চিফ উইলসন নিজেই ওদের কেসটা দিয়েছেন।’
‘ওরা এখন কী করছে?’
‘মূলত সাক্ষীদের সাথে কথা বলছে। রেললাইনের আশেপাশে। আর ড্রাইভার ও ট্যাক্সির ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছে।’
হলওয়েতে থাকা টমের উদ্দেশে চেঁচিয়ে উঠল রাইম, ‘বার্জারকে ফোন করেছিলে? না, অবশ্যই করোনি। অবাধ্যতা শব্দটার কোনো মানে আছে তোমার কাছে? অন্তত কাজের কাজ কিছু একটা করো। ক্রাইম সিন রিপোর্টটা কাছে আনো আর পাতা ওল্টাতে থাকো।’ টার্নিং ফ্রেমটার দিকে মাথা নাড়ল সে। ‘জঘন্য এক জিনিস ওটা।’
‘আজ মেজাজটা তো বেশ ফুরফুরে দেখছি,’ পাল্টা জবাব দিল সহকারী।
‘আরো উঁচুতে ধরো। চোখে লাগছে।’
মিনিটখানেক পড়ল সে। তারপর মুখ তুলল।
ফোনে কথা বলছিল সেলিট্টো, কিন্তু তাকে থামিয়ে দিল রাইম। ‘আজ তিনটায় যাই ঘটুক না কেন, আমরা যদি জায়গাটা খুঁজে পাই, তবে ওটা একটা ক্রাইম সিন হবে। ওটা সামলানোর জন্য কাউকে লাগবে আমার।’
‘ভালো,’ বলল সেলিট্টো। ‘পেরেত্তিকে ফোন দিচ্ছি। একটা হাড় ছুঁড়ে দেই ওর দিকে। এমনিতেই আমাদের গোপন তদন্তের কারণে নাক কুঁচকে আছে সে।’
ঘোঁৎ করে শব্দ করল রাইম। ‘আমি কি পেরেত্তিকে চেয়েছি?’
‘কিন্তু ও তো আইআরডি-র সেরা ছাত্র,’ বলল ব্যাংকস।
‘ওকে চাই না আমি,’ বিড়বিড় করল রাইম। ‘অন্য একজনকে চাই।’
নিজেদের মধ্যে চাহনি বিনিময় করল সেলিট্টো আর ব্যাংকস। হাসল বয়স্ক ডিটেকটিভ, নিজের কুঁচকানো শার্টটা ঝাড়ল অকারণে। ‘তুমি যাকে চাও, তাকেই পাবে। মনে রেখো, আজকের দিনের জন্য তুমিই রাজা।’
টি.জে. কোলফ্যাক্স, পূর্ব টেনেসির পাহাড় থেকে আসা কালো চুলের উদ্বাস্তু মেয়ে, এনওয়াইইউ বিজনেস স্কুলের গ্র্যাজুয়েট, তুখোড় কারেন্সি ট্রেডার। গভীর স্বপ্ন থেকে এইমাত্র জেগে উঠল সে। জট-পাকানো চুলগুলো লেপটে আছে গালে, শিরা বেয়ে ঘাম গড়িয়ে নামছে মুখ, ঘাড় আর বুক দিয়ে।
তাকিয়ে আছে একটা কালো চোখের দিকে। মরচেধরা পাইপের গায়ে প্রায় ছয় ইঞ্চি চওড়া একটা গর্ত। সেখান থেকে ছোট্ট একটা অ্যাকসেস প্লেট সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
নাক দিয়ে ভ্যাপসা বাতাস টেনে নিল টি.জে., মুখটা এখনো টেপ দিয়ে আটকানো। প্লাস্টিক আর গরম আঠার স্বাদ পাচ্ছে। তেতো। আর জন? ভাবল সে। কোথায় সে? গত রাতে বেসমেন্টে শোনা সেই বিকট শব্দটার কথা মনে করতে চাইল না একদম। পূর্ব টেনেসিতে বড় হয়েছে সে, গুলির আওয়াজ কেমন হয় ভালোই জানে। প্লিজ, বসের জন্য প্রার্থনা করল সে। ও যেন ভালো থাকে।
শান্ত থাকো! নিজেকে ধমক দিল মেয়েটা। যদি আবার কান্না শুরু করো, তবে মনে করে দেখো কী হয়েছিল। বেসমেন্টে গুলির শব্দের পর পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল সে। দমক দিয়ে কান্না উঠে আসায় দম আটকে মরতে বসেছিল প্রায়।
রাইট। শান্ত।
পাইপের ঐ কালো চোখটার দিকে তাকাও। ভান করো ওটা তোমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপছে। তোমার গার্ডিয়ান এঞ্জেলের চোখ।
মেঝের উপর বসে আছে টি.জে., তাকে ঘিরে আছে শত শত পাইপ, ডাক্ট আর সাপের মতো পেঁচিয়ে থাকা তারের জঙ্গল।
ভাইয়ের ডিনারের চেয়েও বেশি গরম, দশ বছর আগের জুল হোয়েলানের নোভার পেছনের সিটের চেয়েও বেশি গরম।
পানি চুইয়ে পড়ছে, মাথার উপরের পুরোনো গার্ডার থেকে ঝুলে আছে সব স্ট্যালাকটাইট। টিমটিম করে জ্বলছে গোটা ছয়েক ছোট্ট হলুদ বাল্ব।
ওটুকুই যা আলো। মাথার উপর-ঠিক সোজাসুজি-একটা সাইনবোর্ড। পরিষ্কার পড়তে পারছে না, যদিও লাল বর্ডারটা নজরে এসেছে ওর।
মেসেজ যাই থাকুক না কেন, শেষে মোটা একটা আশ্চর্যবোধক চিহ্ন আছে।
আরেকবার মোচড়ামুচড়ি করল সে, কিন্তু হাতকড়াটা শক্ত করে ধরে রেখেছে তাকে, হাড়ের উপর চেপে বসেছে।
গলা দিয়ে একটা মরিয়া চিৎকার উঠে এল, জান্তব আর্তনাদ। কিন্তু মুখের উপর সাঁটা মোটা টেপ আর যন্ত্রপাতির একঘেয়ে ঘর্ঘর আওয়াজ গিলে খেল সেই শব্দ।
কেউই শুনতে পেল না তার কান্না।
একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কালো চোখটা। তুমি আমাকে বাঁচাবে, তাই না? ভাবল সে।
হঠাৎ ঝনঝন শব্দে ভেঙে গেল নীরবতা, লোহার ঘণ্টার আওয়াজ পাওয়া গেল বহুদূরে। যেন কোনো জাহাজের দরজা দড়াম করে বন্ধ হলো।
শব্দটা এল পাইপের ঐ গর্ত থেকে। তার সেই বন্ধুভাবাপন্ন চোখটা থেকে।
পাইপের গায়ে হাতকড়া দিয়ে বাড়ি মারল সে, দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু কয়েক ইঞ্চির বেশি নড়তে পারল না।
ওকে, প্যানিক কোরো না। রিল্যাক্স। সব ঠিক হয়ে যাবে।
ঠিক তখনই মাথার উপরের সাইনবোর্ডটা নজরে পড়ল তার। নড়াচড়া করার সময় শরীরটা একটু সোজা হয়েছিল, মাথাটা কাত করেছিল একপাশে।
তাতেই লেখাগুলো চোখে পড়ল।
ওহ, না। ওহ, খোদা…আবার কাঁদতে শুরু করল ও।
মায়ের কথা মনে পড়ল, গোলগাল মুখ থেকে চুলগুলো পেছনে সরিয়ে নিয়েছে মা, পরনে কর্নফ্লাওয়ার-নীল রঙের হাউজড্রেস, ফিসফিস করে বলছে, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে, সোনা। একদম ভেবো না।’
কিন্তু ঐ কথায় বিশ্বাস হলো না তার।
সাইনবোর্ডের লেখাটাকে বিশ্বাস হলো তার।
এক্সট্রিম ডেঞ্জার! সুপারহিটেড স্টিম আন্ডার হাই প্রেশার। ডু নট রিমুভ প্লেট ফ্রম পাইপ। কল কনসলিডেটেড এডিসন ফর অ্যাকসেস। এক্সট্রিম ডেঞ্জার!
তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে সেই কালো চোখ, সরাসরি স্টিম পাইপের হৃৎপিণ্ডে গিয়ে মিলেছে ওটা।
তার বুকের গোলাপি চামড়ার দিকে সরাসরি তাকিয়ে আছে। পাইপের গভীর থেকে ভেসে এল ধাতব ঠুংঠাং শব্দ। শ্রমিকরা হাতুড়ি পেটাচ্ছে, পুরোনো জয়েন্ট টাইট দিচ্ছে।
অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে আরো একটা ঠুং শব্দ শুনতে পেল ট্যামি জিন কোলফ্যাক্স। তারপর খুব ক্ষীণ স্বরে আসা দূরাগত গোঙানি।
আর তার মনে হলো, ঐ চোখের পানির ভেতর দিয়েই শেষমেশ বুঝি চোখ টিপল ঐ কালো গর্তটা।
