১. এক দিনের রাজা
২. লোকার্ডের নীতি
৩. দ্য পোর্টেবলস ডটার
8. ডাউন টু দ্য বোন
৫. নড়াচড়ার উপর থাকলে ওরা তোমায় ধরতে পারবে না

দ্য বোন কালেক্টর – ২২

অধ্যায় বাইশ

‘কীভাবে কাজটা করলে, স্যাক্স?’

কটু গন্ধযুক্ত হাডসন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে স্টিক মাইক্রোফোনে কথা বলল সে। ‘মনে পড়েছিল ব্যাটারি পার্কে ফায়ারবোট স্টেশন দেখার কথা। ওরা খবর পাওয়ামাত্র দুজন ডুবুরি পাঠিয়ে দিল, তিন মিনিটের মধ্যে পিয়ারে পৌঁছে গেল বোটটা। যদি দেখতেন কীভাবে চলে বোটটা! একদিন অমন একটা বোটে চড়ার ইচ্ছা আছে আমার।’

আঙুলবিহীন সেই ক্যাব চালকের ব্যাপারটা তাকে বুঝিয়ে বলল রাইম।

‘শয়তানের বাচ্চা!’ জিভে চুকচুক শব্দ করে বিরক্তির সাথে বলল সে। ‘হারামিটা আমাদের সবাইকেই ঘোল খাইয়েছে।’

‘সবাইকে নয়,’ সলজ্জভাবে মনে করিয়ে দিল রাইম।

‘তার মানে ডেলরে জানে আমি এভিডেন্স সরিয়েছি। আমাকে খুঁজছে নাকি ও?’

‘ফেডারেল বিল্ডিংয়ে ফিরে যাওয়ার কথা বলেছিল সে। আমাদের মধ্যে কাকে আগে গ্রেপ্তার করবে সেই সিদ্ধান্ত নিতেই হয়তো। ওখানকার সিনটা কেমন, স্যাক্স?’

‘খুবই খারাপ,’ রিপোর্ট দিল সে। ‘নুড়িপাথরের উপর পার্ক করেছিল সে-‘

‘তার মানে কোনো পায়ের ছাপ নেই।’

‘তার চেয়েও খারাপ। ড্রেনপাইপ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকেছিল আর সে যেখানে পার্ক করেছিল সেটা পানির নিচে তলিয়ে গেছে।’

‘জাহান্নাম,’ বিড়বিড় করল রাইম। ‘কোনো ট্রেস নেই, ছাপ নেই, কিচ্ছু নেই। ভিকটিম কেমন আছে?’

‘ভালো নয়। ঠান্ডায় জমে গেছে, আঙুল ভাঙা। হার্টের সমস্যা আছে ওর। হাসপাতালে দু-একদিন রাখবে ওকে।’

‘আমাদের কি কিছু বলতে পারবে সে?’

ব্যাংকসের দিকে হেঁটে গেল স্যাক্স, উইলিয়াম এভারেটের জবানবন্দি নিচ্ছে সে।

‘বড়সড়ো ছিল না লোকটা,’ নিরাসক্তভাবে বলল লোকটা, মেডিক তার হাতে যে স্প্রিন্ট লাগাচ্ছে তা মনোযোগ দিয়ে দেখছে সে। ‘আর গায়ে খুব একটা জোরও নেই, পালোয়ান নয়। তবে আমার চেয়ে শক্তিশালী। আমি জাপটে ধরেছিলাম, কিন্তু ও সহজেই আমার হাত ছাড়িয়ে দিল!’

‘বর্ণনা?’ জানতে চাইল ব্যাংকস।

কালো পোশাক আর স্কি মাস্কের কথা বলল এভারেট। ওটুকুই মনে আছে তার। ‘একটা কথা বলা দরকার।’

ব্যান্ডেজ করা হাতটা তুলে ধরল এভারেট।

‘খুবই হিংস্র স্বভাবের। তখন মাথা কাজ করছিল না ভয়ে, তাই খামচে ধরেছিলাম। কিন্তু ও খুব ক্ষেপে গেল। তখনই আমার আঙুলটা মটকে দিল!’

‘প্রতিরোধ, তাই না?’ জিজ্ঞেস করল ব্যাংকস।

‘হয়তো। কিন্তু সেটা ব্যাপার না।’

‘তাহলে?’

‘অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ওটার শব্দ কানের কাছে নিয়ে শুনছিল সে।’

লেখা থামিয়ে স্যাক্সের দিকে তাকাল তরুণ ডিটেকটিভ।

‘আমার হাতটা কানের কাছে ধরল, খুব শক্ত করে, তারপর আঙুলটা বাঁকাতে থাকল যতক্ষণ না ভেঙে যায়। যেন কান পেতে শুনছিল সে। আর উপভোগ করছিল।’

‘শুনেছ, রাইম?’

‘হ্যাঁ। প্রোফাইলে যোগ করে নিয়েছে টম। তবে এর মানে কী জানি না। ভাবতে হবে।’

‘সাজানো কোনো পাওয়া গেছে?’

‘এখনো না।’

‘গ্রিড করে খোঁজো, স্যাক্স। ওহ, আর ভিকটিমের…’

‘কাপড়? আমি আগেই চেয়েছি। আমি-রাইম, ঠিক আছ?’

কাশির দমক শুনতে পেল সে।

মুহূর্তের জন্য লাইন কেটে গেল। একটু পরেই ফিরে এল সে। ‘আছ, রাইম? সব ঠিক আছে?’

‘ঠিক আছি,’ দ্রুত বলল রাইম। ‘কাজে লাগো। গ্রিড ধরে হাঁটো।’

চারপাশটা জরিপ করল মেয়েটা, ইএসইউ-র হ্যালোজেন আলোয় দিনের মতো পরিষ্কার। বড্ড হতাশাজনক। সে এখানেই ছিল। মাত্র কয়েক ফুট দূরে নুড়ির উপর দিয়ে হেঁটেছে। কিন্তু ভুলবশত যাই ফেলে যাক না কেন, তা এখন ঘোলা পানির কয়েক ইঞ্চি নিচে শুয়ে আছে।

ধীরে ধীরে জমিন চষে ফেলল সে। সামনে-পেছনে।

‘কিছুই দেখছি না। হয়তো ভেসে গেছে কুগুলো।’

‘না, সে যথেষ্ট চালাক, জোয়ারের কথা মাথায় রেখেই কাজ করেছে। শুকনো জায়গাতেই থাকার কথা।’

‘একটা বুদ্ধি আছে,’ হঠাৎ বলল সে। ‘এখানে চলে আসো।’

‘কী?’

‘আমার সাথে সিনটা দেখো, রাইম।’

নীরবতা।

‘রাইম, শুনতে পাচ্ছেন?’

‘আর ইউ টকিং টু মি?’ জিজ্ঞেস করল সে।

‘তোমার সাথে ডি নিরোর মিল আছে। কিন্তু ওর মতো ভালো অভিনয় করতে পারো না। জানো তো? ট্যাক্সি ড্রাইভার সিনেমার সেই সিনটা?’

হাসল না রাইম। বলল, ‘ডায়লগটা ছিল “আর ইউ লুকিং অ্যাট মি?”, “টকিং টু মি” নয়।’

একটুও না দমে বলল সে, ‘চলে আসো। কাজ করো আমার সাথে।’

‘ডানা মেলে উড়ে আসব। না, তার চেয়ে বরং টেলিপ্যাথি ব্যবহার করে চলে আসি ওখানে।’

‘আমি সিরিয়াস।’

‘আমি…’

‘তোমাকে দরকার আমাদের। কুগুলো খুঁজে পাচ্ছি না।’

‘ওখানেই আছে ওগুলো। আরেকটু ভালো করে খুঁজতে হবে।’

‘পুরো গ্রিড দুবার চষেছি আমি।’

‘তার মানে সীমানা বড্ড ছোট করে ফেলেছ। আরো কয়েক ফুট বাড়িয়ে নাও আর খুঁজতে থাকো। ৮২৩-এর খেলা এখনো শেষ হয়নি, ঢের বাকি।’

‘কথা ঘোরাচ্ছ। এসে সাহায্য করো।’

‘কীভাবে?’ জানতে চাইল রাইম। ‘কীভাবে করব সেটা?’

‘আমার এক বন্ধুর এমন সমস্যা ছিল,’ বলতে শুরু করল অ্যামেলিয়া।

‘মানে পঙ্গু ছিল,’ শুধরে দিল রাইম।

নরম কিন্তু দৃঢ় গলায় অ্যামেলিয়া বলল, ‘রোজ সকালে ওর সহকারী ওকে এক ফ্যান্সি হুইলচেয়ারে বসিয়ে দিত আর সে নিজেই ওটা চালিয়ে সব জায়গায় যেত। সিনেমা দেখতে যেত, আর…’

‘ওসব চেয়ারে…আমার চলে না,’ রাইমের গলা কেমন যেন ফাঁকা শোনাল। ‘সমস্যাটা হলো আমার জখমের ধরন। হুইলচেয়ারে বসাটা আমার জন্য বিপজ্জনক। এতে…’ একটু ইতস্তত করল সে। ‘অবস্থা আরো খারাপ হতে পারে।’

‘আমি দুঃখিত। জানতাম না।’

একটু পরে সে বলল, ‘তা বুঝতে পেরেছি।’

তালগোল পাকিয়ে ফেলেছি। সেরেছে!

কিন্তু রাইমের গলার স্বরে নার্ভাসনেস বোঝা গেল না। মসৃণ, ভাবলেশহীন।

‘শোনো, তল্লাশি চালিয়ে যেতে হবে তোমাকে। আমাদের আনসাব চালগুলো কঠিন করছে। কিন্তু অসম্ভব নয়। একটা আইডিয়া দিচ্ছি। সে পাতাল-মানব, তাই না? হয়তো পুঁতে রেখেছে ওগুলো।’

পুরো জায়গাটার উপর চোখ বোলাল অ্যামেলিয়া। হয়তো ওখানে… নুড়িপাথরের কাছে লম্বা ঘাসের মধ্যে মাটি আর পাতার একটা ঢিবি দেখতে পেল সে। দৃশ্যটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না; উল্টো মনে হচ্ছে যেন সাজানো। পাশে উবু হয়ে বসল স্যাক্স, মাথা নামিয়ে পেনসিল দিয়ে পাতা সরাতে লাগল। মুখটা সামান্য বাঁয়ে ঘোরাতেই ফণা তোলা মাথা আর উঁচিয়ে থাকা বিষদাঁত দেখতে পেল সে।

‘জিসাস লর্ড!’ চিৎকার করে উঠল সে, হুমড়ি খেয়ে পিছিয়ে গেল। পাছার উপর ভর দিয়ে পড়ে যেতেই অস্ত্র বের করার জন্য হাতড়াল।

না…

রাইম চিৎকার করে উঠল, ‘ঠিক আছ তুমি?’

বন্দুক তাক করল স্যাক্স, কাঁপা হাতে নিশানা স্থির করার চেষ্টা করছে।

দৌড়ে এল জেরি ব্যাংকস, গ্লক বের করেছে সে-ও। থামল সে।

উঠে দাঁড়াল স্যাক্স, সামনের জিনিসটার দিকে তাকিয়ে আছে।

‘ম্যান,’ ফিসফিস করে বলল ব্যাংকস।

‘একটা সাপ…মানে, সাপের কঙ্কাল,’ রাইমকে বলল স্যাক্স। ‘র‍্যাটলস্নেক। ফাক।’

গ্লকটা হোলস্টারে ঢোকাল। ‘তক্তার উপর বসানো।’

‘সাপ? ইন্টারেস্টিং।’ আগ্রহী শোনাল রাইমকে।

‘হ্যাঁ, খুবই ইন্টারেস্টিং Winters,’ বিড়বিড় করল সে।

ল্যাটেক্স গ্লাভস পরে কুণ্ডলী পাকানো হাড়টা তুলে নিল সে। উল্টে দেখল। ‘”মেটামরফোসিস”।’

‘কী?’

‘তলায় একটা লেবেল। যেখান থেকে এসেছে এটা, সেই দোকানের নাম। ৬০৪ ব্রডওয়ে।’

রাইম বলল, ‘হার্ডি বয়েজদের পাঠাচ্ছি ওটা দেখতে। কী পেয়েছি আমরা? কুগুলোর কথা বলো।’

সাপের নিচেই ছিল ওগুলো। একটা ব্যাগে। ব্যাগের উপর ঝুঁকে বসতেই বুক ধড়ফড় করতে লাগল তার।

‘এক প্যাকেট দেশলাই,’ বলল মেয়েটা।

‘ওকে, হয়তো অগ্নিসংযোগের কথা ভাবছে সে। কিছু লেখা আছে ওতে?’

‘না। তবে কিছু একটা মাখানো আছে। ভ্যাসলিনের মতো। কিন্তু দুর্গন্ধযুক্ত।’

‘গুড, স্যাক্স-এভিডেন্স সম্পর্কে নিশ্চিত না হলে সব সময় গন্ধ শুঁকে দেখবে। তবে আরেকটু নির্দিষ্ট হতে হবে।’

কাছে গিয়ে শুঁকল সে। ‘ওয়াক।’

‘এটা কোনো নির্দিষ্ট বর্ণনা নয়।’

‘সালফার হতে পারে।’

‘নাইট্রেট-বেসড হতে পারে। বিস্ফোরক। টভেক্স। নীল কি?’

‘না, দুধের মতো স্বচ্ছ।’

‘যদি বিস্ফোরকও হয়, তবে সেকেন্ডারি এক্সপ্লোসিভ হবে। ওগুলো স্থিতিশীল হয়। আর কিছু?’

‘কাগজের আরেকটা টুকরো। কিছু লেখা আছে ওতে।’

‘কী? ওর নাম, ঠিকানা, ই-মেইল হ্যান্ডেল?’

‘ম্যাগাজিন থেকে ছেঁড়া মনে হচ্ছে। সাদা-কালো একটা ছোট ছবি দেখা যাচ্ছে। কোনো দালানের অংশ মনে হচ্ছে, কিন্তু ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। আর তার নিচে শুধু একটা তারিখ পড়া যাচ্ছে। ২০শে মে, ১৯০৬।’

‘পাঁচ, বিশ, শূন্য-ছয়। কোনো কোড কি না কে জানে। বা কোনো ঠিকানা। ভাবতে হবে এটা নিয়ে। আর কিছু?’

‘না।’

ওপাশে দীর্ঘশ্বাস শুনতে পেল স্যাক্স।

‘ঠিক আছে, ফিরে এসো। কটা বাজে? মাই গড, প্রায় একটা। কত বছর পর এত রাত জাগলাম। ফিরে এসো, দেখা যাক কী পাওয়া যায়।’

***

ম্যানহাটনের সব এলাকার মধ্যে লোয়ার ইস্ট সাইডই ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে সবচেয়ে অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।

অবশ্য, অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে: সেইসব ঢেউখেলানো সবুজ মাঠ। জন হ্যানকক আর সরকারের প্রথম দিকের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের শক্তপোক্ত ম্যানশনগুলো। ডার কোলেক হলো একটা বিশাল মিষ্টি পানির হ্রদ (যার ডাচ নাম কালক্রমে বিকৃত হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘দ্য কালেক্ট’, দূষিত নোংরা পুকুরটার জন্য লাগসই নাম)। কুখ্যাত ফাইভ পয়েন্ট এলাকা-১৮০০ সালের শুরুর দিকে যা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক এক বর্গমাইল-যেখানে নরকের দরজার মতো জরাজীর্ণ এক-একটা বস্তিতে প্রতি বছর দুই-তিনশো খুন হতো।

কিন্তু হাজার হাজার পুরোনো দালান আজও টিকে আছে। উনবিংশ শতাব্দীর বস্তিবাড়ি আর তার আগের শতাব্দীর কলোনিয়াল আমলের কাঠের বাড়ি ও ফেডারেল আমলের ইটের টাউনহোম, বারোক রীতির মিটিং হল, দুর্নীতিগ্রস্ত কংগ্রেসম্যান ফার্নান্দো উডের নির্দেশে বানানো মিশরীয় ধাঁচের কিছু সরকারি দালান। কিছু পরিত্যক্ত, আগাছায় ঢাকা দেয়াল আর চারাগাছে ফাটা মেঝে। কিন্তু অনেকগুলোই এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে; ট্যামানি হলের পাপের আখড়া, ঠেলাগাড়ি আর সোয়েট-শপ, হেনরি স্ট্রিট সেটেলমেন্ট হাউজ, মিনস্কির বার্লেস্ক আর কুখ্যাত ইদিশ গোমোরাহ-ইহুদি মাফিয়ার রাজত্ব ছিল এই এলাকা। যে এলাকা এমন সব প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়, তা সহজে মরে না।

এই এলাকার দিকেই ট্যাক্সি চালিয়ে যাচ্ছে বোন কালেক্টর, পেছনের সিটে সেই কৃশকায় মহিলা আর তার ছোট মেয়ে।

পুলিশ তার পিছু নিয়েছে বুঝতে পেরে সাপের মতোই আবার গর্তে লুকিয়েছিল জেমস স্নাইডার, শহরের অসংখ্য বস্তির কোনো একটার বেসমেন্টে আশ্রয় নিয়েছিল সে-এমনটাই ধারণা করা হয়। আর সেখানেই ঘাপটি মেরে ছিল কয়েক মাস।

বাড়ি ফেরার সময় বোন কালেক্টর তার চারপাশে ১৯৯০ সালের ম্যানহাটনকে দেখল না (কোরিয়ান ডেলি, স্যাঁতসেঁতে বেগল শপ, এক্স-রেটেড ভিডিও স্টোর, খালি বুটিক শপ)। তার বদলে দেখল বাউলার হ্যাট পরা পুরুষ, খসখসে ক্রিনোলিন পরা মহিলা, যাদের পোশাকের কিনারা আর হাতা রাস্তার ময়লায় মাখামাখি হয়ে আছে। হাজার হাজার জুড়িগাড়ি আর ওয়াগন, বাতাসে মিথেন গ্যাসের কখনো মিষ্টি, কখনো বা উৎকট গন্ধ।

কিন্তু নতুন করে সংগ্রহ শুরু করার সেই অদম্য, জঘন্য নেশা তাকে আবারো আস্তানা ছেড়ে বের হতে বাধ্য করল; এবার তার শিকার হলো শহরে সদ্য আসা এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র। কুখ্যাত এইটিনথ ওয়ার্ড দিয়ে ড্রাইভ করছে সে, একসময় যেখানে হাজারখানেক জরাজীর্ণ বস্তিতে গাদাগাদি করে থাকত প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ।

উনবিংশ শতাব্দীর কথা ভাবলেই মানুষের চোখে ভেসে ওঠে সেপিয়া রং-পুরোনো ছবির কারণে। কিন্তু ধারণাটা ভুল। পুরোনো ম্যানহাটনের রং ছিল পাথরের মতো। কারখানার ধোঁয়া, দামি রঙের অভাব আর টিমটিমে বাতির কারণে শহরটা ছিল ধূসর আর হলুদের নানান শেডে রাঙা।

ছাত্রটির পেছনে চুপিচুপি গিয়ে যখনই আঘাত করতে যাবে স্নাইডার, তখনই ভাগ্যদেবীর টনক নড়ল।

দুই কনস্টেবলের চোখে পড়ে গেল ঘটনাটা। স্নাইডারকে চিনে ফেলল তারা, ধাওয়া করল।

খুনি পালাল পূর্ব দিকে, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিস্ময় ম্যানহাটন ব্রিজের উপর দিয়ে। ১৯০৯ সালে তৈরি হয়েছিল ওটা, এই ঘটনার দুবছর আগে।

কিন্তু মাঝপথে থেমে গেল সে, দেখল ব্রুকলিন থেকে এগিয়ে আসছে তিনজন কনস্টেবল, ম্যানহাটনের সঙ্গীদের বাঁশি আর পিস্তলের আওয়াজ শুনে ছুটে এসেছে তারা।

নিরুপায় হয়ে নিরস্ত্র স্নাইডার ব্রিজের রেলিং বেয়ে উঠল। পুলিশ ঘিরে ফেলল তাকে।

কনস্টেবলদের উদ্দেশে পাগলের মতো গালিগালাজ শুরু করল সে, জীবনটা নষ্ট করে দেওয়ার জন্য অভিশাপ দিল তাদের। তার প্রলাপ ক্রমশ আরো অসংলগ্ন হয়ে উঠল।

পুলিশ কাছে আসতেই রেলিং থেকে নদীতে ঝাঁপ দিল সে।

এক সপ্তাহ পর ওয়েলফেয়ার আইল্যান্ড বা বর্তমান রুজভেল্ট আইল্যান্ডের তীরে তার লাশ খুঁজে পেল এক পাইলট, নরকের দরজাস্বরূপ বস্তিটার কাছে। খুব সামান্যই অবশিষ্ট ছিল তার, কাঁকড়া আর কচ্ছপেরা মিলে স্নাইডারকে সেই হাড়েই পরিণত করেছে, যা নিয়ে তার পাগলামির সীমা ছিল না।

ইস্ট ভ্যান ব্রেভোর্টের নির্জন পাথুরে রাস্তায় ট্যাক্সি ঘোরাল সে, দালানটার সামনে গিয়ে থামল। দরজার নিচে লাগানো দুটো নোংরা সুতো চেক করল সে, কেউ ঢোকেনি তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য।

হঠাৎ নড়াচড়া দেখে চমকে উঠল সে, আবারো শুনতে পেল কুকুরের সেই গলার ভেতর থেকে আসা গর্জন, হলুদ চোখ, বাদামি দাঁত, ক্ষতবিক্ষত শরীর। পিস্তলের দিকে হাত চলে গেল তার। কিন্তু দলটা হঠাৎ ঘুরে গলির ভেতর কোনো বিড়াল বা ইঁদুরের পেছনে ধাওয়া করে চলে গেল। তপ্ত ফুটপাতে কাউকে দেখতে পেল না সে। ক্যারেজ হাউজের দরজার তালা খুলে গাড়িতে উঠে গ্যারেজে ঢুকল, পার্ক করল তার টরাসের পাশে।

পিশাচটার মৃত্যুর পর তার জিনিসপত্র জব্দ করা হয়েছিল। খুঁটিয়ে দেখেছিলেন ডিটেকটিভরা। তার ডায়েরি থেকে জানা যায় যে সে শহরের আটজন সম্মানিত নাগরিককে খুন করেছে। কবর লুঠ করতেও দ্বিধা করেনি সে, কারণ তার ডায়েরির পাতা থেকে (যদি তার দাবি সত্য হয়) জানা যায় যে সে শহরের বিভিন্ন কবরস্থানে বেশ কয়েকটি পবিত্র সমাধি অপবিত্র করেছে। ভিকটিমদের কেউই তার কোনো ক্ষতি করেনি; বরং অধিকাংশই ছিল সম্মানিত, পরিশ্রমী এবং নির্দোষ নাগরিক। অথচ একবিন্দু অনুশোচনা ছিল না তার মনে। বরং সে এই বদ্ধমূল ধারণা পোষণ করত যে সে তার ভিকটিমদের উপকারই করছে।

থামল সে, মুখ থেকে ঘাম মুছল। স্কি মাস্কটায় চুলকাচ্ছে।

ট্রাংক থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করল মহিলা আর তার মেয়েকে, গ্যারেজের ভেতর দিয়ে নিয়ে এল। গায়ে জোর আছে মহিলার, খুব ধস্তাধস্তি করল। শেষে কোনোমতে হাতকড়া পরাতে পারল সে।

‘হারামজাদা কোথাকার!’ গর্জে উঠল সে। ‘আমার মেয়েকে ছোঁয়ার সাহস কোরো না। ওকে ছুঁলে আমি তোমাকে খুন করে ফেলব।’

বুক জাপটে ধরে মহিলার মুখে টেপ লাগাল সে। তারপর বাচ্চাটার মুখেও।

‘মাংস পচে যায়, দুর্বল হয়ে পড়ে,’ তার নিষ্ঠুর কিন্তু নিপুণ হাতে লিখেছিল পিশাচটা। ‘কিন্তু হাড় হলো শরীরের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ। রক্তমাংসে আমরা যতই বুড়ো হই না কেন, হাড়ে আমরা সব সময়ই তরুণ। আমার উদ্দেশ্য মহৎ ছিল, আর কেন যে কেউ এর বিরোধিতা করবে তা আমার বোধগম্য নয়। আমি তো ওদের সবার উপকারই করেছি। ওরা এখন অমর। আমি ওদের মুক্তি দিয়েছি। আমি ওদের হাড় বের করে এনেছি।’

ওদের টেনে বেসমেন্টে নিয়ে গেল সে, মেঝেতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল মহিলাকে। তার পাশেই ছুঁড়ে দিল মেয়েটাকেও। দড়ি দিয়ে হাতকড়াগুলো দেয়ালের সাথে বাঁধল। তারপর ফিরে গেল উপরে।

ক্যাবের পেছন থেকে হলুদ ন্যাপস্যাকটা তুলে নিল সে, ট্রাংক থেকে স্যুটকেসগুলো, তারপর বল্টু লাগানো কাঠের দরজা ঠেলে ঢুকল দালানের মেইন রুমে। কোনায় ছুঁড়ে ফেলে দিতে যাচ্ছিল ওগুলো। কিন্তু কেন যেন এই বিশেষ বন্দিদের ব্যাপারে কৌতূহল হলো তার।

একটা ম্যুরালের সামনে বসল সে। এক কসাইয়ের ছবি, হাতে চুরি, অন্য হাতে এক টুকরো মাংস, ভাবলেশহীন ভঙ্গি।

লাগেজ ট্যাগটা দেখল সে। ক্যারল গ্যানজ। ক্যারল বানানে একটা ‘ই’ বাড়তি। বাড়তি অক্ষরটা কেন? ভাবল সে।

স্যুটকেসে জামাকাপড় ছাড়া কিছু নেই। ন্যাপস্যাকটা ঘাঁটতে শুরু করল। নগদ টাকাগুলো পেয়ে গেল সাথে সাথেই। চার-পাঁচ হাজার হবে। জিপার দেওয়া পকেটে রেখে দিল ওগুলো।

বাচ্চার ডজনখানেক খেলনা ছিল: একটা পুতুল, ওয়াটার কালারের কৌটো, এক প্যাকেট মডেলিং ক্লে বা মাটি, একটা মিস্টার পটেটো হেড সেট। দামি ডিস্কম্যানও আছে, গোটা ছয়েক সিডি আর একটা সনি ট্র্যাভেল ক্লক রেডিও। ছবিগুলো দেখল সে। ক্যারল আর তার মেয়ের ছবি। বেশিরভাগ ছবিতেই মহিলাকে খুব গম্ভীর দেখাচ্ছে। কয়েকটাতে একটু খুশি মনে হলো। ক্যারল বিয়ের আংটি পরে থাকলেও স্বামীর সাথে কোনো ছবি নেই। অনেক ছবিতেই মা-মেয়ে এক দম্পতির সাথে আছে-ঢিলেঢালা মান্ধাতার আমলের পোশাক পরা এক মোটাসোটা মহিলা আর ফ্লানেল শার্ট পরা এক দাড়িওয়ালা, টেকো লোক।

দীর্ঘক্ষণ বাচ্চা মেয়েটার ছবির দিকে তাকিয়ে রইল বোন কালেক্টর।

বেচারি ম্যাগি ও’কনরের কপালে কী ঘটেছিল, ভাবলেই বড্ড কষ্ট হয়। বেচারির বয়স ছিল মাত্র আট বছর। পুলিশের ধারণা, এক ভিকটিমকে গুম করার সময়ে দুর্ভাগ্যবশত জেমস স্নাইডারের সামনে পড়ে গিয়েছিল সে। কুখ্যাত ‘হেলস কিচেন’ এলাকার বাসিন্দা ছিল মেয়েটা। শহরের ঐ দরিদ্র এলাকায় পড়ে থাকা অসংখ্য মরা পশুর লেজ থেকে চুল সংগ্রহ করতে বেরিয়েছিল সে। বাচ্চারা ঘোড়ার লেজের চুল দিয়ে আংটি আর ব্রেসলেট বানাত-ওটুকুই ছিল ঐ অনাথদের সম্বল, একমাত্র গয়না।

স্কিন অ্যান্ড বোন, স্কিন অ্যান্ড বোন…

ম্যানটেলপিসের উপর ছবিটা দাঁড়িয়ে করিয়ে রাখল সে, সকালে যে হাড়গুলো নিয়ে কাজ করছিল তার পাশে। যে দোকান থেকে সাপটা পেয়েছিল, সেখান থেকে কিছু হাড় চুরি করেছিল।

ধারণা করা হয় যে স্নাইডার তার আস্তানার কাছেই ম্যাগিকে দেখেছিল। মেয়েটা এক ভিকটিমকে খুন করার মতো বীভৎস দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে পড়েছিল। তাকে সে চটজলদি মেরেছিল নাকি ধীরে ধীরে, তা অনুমান করা অসম্ভব। কিন্তু অন্যান্য ভিকটিমদের দেহাবশেষ পাওয়া গেলেও কোঁকড়া চুলের ম্যাগি ও’কনরের কোনো চিহ্নই আর পাওয়া যায়নি।

নিচে নেমে এল বোন কালেক্টর।

মায়ের মুখ থেকে টেপটা ছিঁড়ে ফেলল সে, হাঁপাতে হাঁপাতে বাতাস টেনে নিল মহিলা, হিমশীতল রাগে তাকিয়ে রইল তার দিকে।

‘কী চান আপনি?’ খসখসে গলায় জানতে চাইল সে। ‘কী?’

এস্থারের মতো অতটা রোগা নয় সে, তবে থ্যাংক গড, হানা গোল্ডস্মিটের মতো মোটাও নয়। ওর হাড়ের গঠন খুব পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে সে। সরু চোয়াল, কলার বোন। আর পাতলা নীল স্কার্টের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে ইনোমিটি হাড়ের আভাস-ইলিয়াম, ইস্কিয়াম আর পিউবিসের মিলনস্থল। যেন রোমান দেবতাদের নাম।

নড়েচড়ে উঠল বাচ্চাটা। সামনে ঝুঁকে ওর মাথায় হাত রাখল সে। মাথার খুলি এক টুকরো হাড় দিয়ে তৈরি হয় না, আটটা আলাদা হাড় দিয়ে হয়, আর চাঁদিটা অ্যাস্ট্রোডোম স্টেডিয়ামের ছাদের মতো ত্রিকোণ স্লাব হয়ে জেগে ওঠে। মেয়েটার অক্সিপিটাল হাড় স্পর্শ করল সে, খুলির উপরের প্যারাইটাল হাড়গুলো। তারপর ধরল তার অতি পছন্দের জিনিস, চোখের কোটরের সেই সংবেদনশীল হাড়গুলো-স্কেনয়েড আর এথময়েড।

‘থামুন!’

প্রচণ্ড রাগে মাথা নাড়ল ক্যারল। ‘ওকে ছোঁবেন না।’

‘শশশশ,’ বলল সে, গ্লাভস-পরা আঙুল ঠোঁটে ছোঁয়াল।

মেয়েটার দিকে তাকাল সে, মায়ের কাছ ঘেঁষে কাঁদছে।

‘ম্যাগি ও’কনর,’ আদুরে গলায় ডাকল সে, মেয়েটার মুখের গড়ন দেখছে। ‘আমার

ছোট্ট ম্যাগি।’

তার দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছে মহিলা।

‘ভুল সময়ে ভুল জায়গায় এসে পড়েছিলে, বাছা। আমাকে কী করতে দেখেছ তুমি?’ হাড়ে তরুণ…

‘কীসব বলছেন আপনি?’ ফিসফিস করে বলল ক্যারল। তার দিকে মনোযোগ দিল সে।

বোন কালেক্টর সব সময়ই ম্যাগি ও’কনরের মায়ের কথা ভাবত।

‘তোমার স্বামী কোথায়?’

‘মারা গেছে,’ যেন ছিটকে বেরিয়ে এল উত্তরটা। ছোট মেয়েটার দিকে তাকিয়ে গলা নামাল মহিলা। ‘দুবছর আগে খুন হয়েছে। দেখুন, আমার মেয়েটাকে যেতে দিন। আপনার ব্যাপারে ও কিছুই বলতে পারবে না কাউকে। আপনি কি…আমার কথা শুনছেন? কী করছেন আপনি?’

ক্যারলের হাতদুটো মুঠোয় পুরে তুলে ধরল সে। মেটাকার্পালগুলোয় আদর করল। ছোট ছোট আঙুলগুলোয়। হাড়গুলোয় চাপ দিচ্ছে।

‘না, করবেন না অমন। আমার ভালো লাগছে না। প্লিজ!’ আতঙ্কে ফেটে পড়ল তার গলা।

নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে বলে মনে হলো তার। অনুভূতিটা মোটেও পছন্দ হলো না। যদি এখানে সফল হতে হয়, ভিকটিমদের নিয়ে, তার পরিকল্পনা নিয়ে, তবে এই লোলুপ ভাবকে দমন করতে হবে তার। পাগলামিটা তাকে অতীতের আরো গভীরে ঠেলে দিচ্ছে, অতীত আর বর্তমান গুলিয়ে যাচ্ছে। অতীত আর বর্তমান…

শুরু করা কাজটা শেষ করার জন্য তার সমস্ত বুদ্ধি আর চাতুর্যের প্রয়োজন। তবুও… তবুও… বড্ড রোগা সে, শরীরটা কী টানটান। চোখ বন্ধ করে কল্পনা করল সে, টিবিয়া বা পায়ের হাড়ের উপর ছুরির ফলা চালালে কেমন পুরোনো বেহালার ছড়ের মতো গান গেয়ে উঠবে ওটা।

শ্বাস দ্রুত হয়ে এল তার, ঘামে ভিজে যাচ্ছে শরীর।

অবশেষে চোখ খুলল সে। মহিলার স্যান্ডেলের দিকে তাকাল। ভালো মানের পায়ের হাড় খুব একটা নেই তার সংগ্রহে। গত কয়েক মাস ধরে যেসব গৃহহীন মানুষকে শিকার বানিয়েছে সে…রিকেট আর অস্টিওপোরোসিসে ভুগত তারা, বেমাপের জুতোর চাপে চ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছিল পায়ের আঙুল।

‘তোমার সাথে একটা রফা করতে পারি,’ নিজেকে বলতে শুনল সে।

মেয়ের দিকে তাকাল মহিলা। আরো কাছে ঘেঁষে এল।

‘একটা রফা। তোমাকে ছেড়ে দেবো যদি আমাকে একটা কাজ করতে দাও।’

‘কী?’ ফিসফিস করে বলল ক্যারল।

‘তোমার চামড়া ছিলতে দাও আমাকে।’ চোখ পিটপিট করল সে। ফিসফিস করে বলল, ‘দাও না। প্লিজ? একটা পা। শুধু একটা পায়ের। যদি দাও, তবে তোমাকে ছেড়ে দেবো।’

‘কী…?’

‘একদম হাড় পর্যন্ত।’

আতঙ্কিত চোখে তাকাল মহিলা। ঢোক গিলল। তাতে কী আসে যায়? ভাবল সে। এমনিতেই তো প্রায় হাড় জিরজিরে সে, এত রোগা আর কোনাকৃতির মুখ।

হ্যাঁ, অন্য ভিকটিমদের চেয়ে আলাদা কিছু একটা আছে ওর মধ্যে।

পিস্তলটা রেখে পকেট থেকে ছুরি বের করল সে। খট করে খুলল ওটা। নড়ল না সে, চোখদুটো চলে গেল ছোট মেয়েটার দিকে। তারপর আবার তার দিকে।

‘আমাদের যেতে দেবেন তাহলে?’

মাটা নাড়ল সে। ‘তুমি আমার মুখ দেখোনি। জানো না জায়গাটা কোথায়।’

দীর্ঘ একটা মুহূর্ত কেটে গেল এভাবেই।

বেসমেন্টের চারপাশে তাকাল মহিলা। বিড়বিড় করে একটা শব্দ বলল। কোনো নাম হবে হয়তো। রন বা রব। তারপর তার চোখে চোখ রেখে পাদুটো বাড়িয়ে দিল তার দিকে।

ডান পায়ের জুতোটা খুলে নিল সে। পায়ের আঙুলগুলো ধরল। নরম ডালপালার মতো ম্যাসাজ করল।

পেছনে হেলান দিল ক্যারল। ঘাড় থেকে টেন্ডনের তারগুলো কী সুন্দর ভেসে উঠেছে। চোখদুটো খিঁচে বন্ধ করল।

আততায়ী ব্লেড দিয়ে আদর করল চামড়ায়। ছুরিটা শক্ত করে ধরল।

চোখ বন্ধ করল মহিলা, শ্বাস নিয়ে অস্ফুট গোঙানি দিল! ‘করুন,’ ফিসফিস করে বলল। মেয়েটার মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিল সেই সাথে। ওকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে।

বোন কালেক্টর ভিক্টোরিয়ান পোশাকে কল্পনা করল তাকে, ক্রিনোলিন আর কালো লেস। তিনজনকে একসাথে দেখল সে, ডেলমনিকোতে বসে আছে কিংবা ফিফথ অ্যাভিনিউ দিয়ে হাঁটছে। সাথে ছোট্ট ম্যাগি, ফিনফিনে লেসের পোশাক পরা, লাঠি দিয়ে চাকা গড়াচ্ছে। ক্যানেল ব্রিজের উপর দিয়ে হাঁটছে তারা। তখন আর এখন…

ও পায়ের খিলানে বসাল ব্লেডটা।

‘মাম্মি!’ চিৎকার করে উঠল মেয়েটা।

কিছু একটা ছিঁড়ে গেল তার ভেতরে। মুহূর্তের জন্য নিজের কাজে প্রচণ্ড ঘেন্না লাগল তার। নিজের উপর।

না!

পারবে না সে। ওর সাথে নয়। এস্থার বা হানা হলে পারত। বা পরের জন। কিন্তু ও নয়।

দুঃখের সাথে মাথা নাড়ল বোন কালেক্টর, হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মহিলার গাল স্পর্শ করল। তারপর আবার ক্যারলের মুখে টেপ সেঁটে দিল সে, পায়ের বাঁধন কেটে দিল।

‘এসো,’ বিড়বিড় করে বলল।

প্রচণ্ড ধস্তাধস্তি করল মহিলা, কিন্তু তার মাথাটা চেপে ধরে নাকের ফুটো বন্ধ করে দিল লোকটা, যতক্ষণ না জ্ঞান হারাল সে। তারপর তাকে কাঁধে তুলে নিল, সাবধানে পাশের ব্যাগটা তুলে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে লাগল। খুব সাবধানে। এই জিনিসটা হাত থেকে ফেলতে চায় না সে।

উপরে উঠতে উঠতে শুধু একবার থামল। কোঁকড়া চুলের ছোট্ট ম্যাগি ও’কনরের দিকে তাকানোর জন্য। বেচারি ধুলোয় বসে হতাশ চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *