অধ্যায় আটাশ
পাঁচটা গুলি। কাচে তারার মতো নকশা ফুটে উঠেছে, তবুও জেনারেল মোটরসের সেই সাচ্চা কাচ অটুট রয়েছে এখনো। আরো তিনটা গুলি, গাড়ির বদ্ধ জায়গায় কানে তালা লাগিয়ে দিল তার। ভাগ্য ভালো গ্যাসোলিনে আগুন ধরেনি। আবার লাথি মারতে শুরু করল সে। অবশেষে নীলচে সবুজ বরফকুচির মতো ঝনঝন করে ভেঙে বাইরের দিকে খসে পড়ল জানালাটা। গড়িয়ে বাইরে পড়তেই হাঁপিয়ে ওঠা এক ‘উশশ’ শব্দে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল ওয়াগনের ভেতরটা।
গ্যাসোলিনে ভেজা ইউনিফর্মের শার্ট আর বুলেটপ্রুফ ভেস্ট খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল সে, সাথে হেডসেট মাইকটাও; টি-শার্ট গায়েই দৌড় দিল চার্চের সদর দরজার দিকে, পাশ কাটাল আতঙ্কিত প্রার্থনাকারী আর গায়কের দলকে। গোড়ালির ব্যথাটা টের পেল এতক্ষণে।
নিচতলায় কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উড়ছে। কাছেই মেঝের একটা অংশ ফুঁসে উঠল, ভাপ ছাড়ল সে, তারপর দপ করে জ্বলে উঠল আগুন। হঠাৎ ধোঁয়ার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন পাদ্রি, কাশছেন, চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। তিনি পেছনে টেনে আনছেন একজনকে—অজ্ঞান এক মহিলা। তাকে দরজার কাছে নিতে সাহায্য করল স্যাক্স।
‘বেসমেন্ট কোন দিকে?’ জানতে চাইল সে।
কাশতে কাশতে মাথা নাড়লেন তিনি।
‘কোথায়?’ ক্যারল গ্যানজ আর তার ছোট মেয়েটার কথা ভেবে চিৎকার করে উঠল সে। ‘বেসমেন্টটা?’
‘ওদিকে। কিন্তু…’
মেঝের যে অংশটায় আগুন জ্বলছে তার ঠিক ওপাশেই। ধোঁয়ার কারণে প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছে না স্যাক্স। সামনের একটা দেয়াল ধসে পড়ল। পেছনের পুরোনো কড়িকাঠ আর খুঁটিগুলো মটমট শব্দে ভেঙে আগুনের ফুলকি আর গরম গ্যাসের হলকা ছড়াতে লাগল সারা ঘরে। একটু ইতস্তত করল সে, তারপর পা বাড়াল বেসমেন্টের দরজার দিকে। হাত খামচে ধরলেন পাদ্রি। ‘দাঁড়ান।’
দেয়াল আলমারি খুলে একটা ফায়ার এক্সটিংগুইশার বের করলেন তিনি, টান দিয়ে পিনটা খুললেন। ‘চলুন।’
মাথা নাড়ল স্যাক্স। ‘আপনি না। উপরে আর কেউ আছে কি না দেখুন। ফায়ার ডিপার্টমেন্টকে বলবেন বেসমেন্টে একজন পুলিশ অফিসার আর আরেকজন ভিকটিম আছে।’
দৌড় দিল স্যাক্স। নড়াচড়ার উপর থাকলে…
আগুনের উপর দিয়ে লাফ দিল সে। কিন্তু ধোঁয়ার কারণে দেয়ালের দূরত্বটা ঠিকঠাক আন্দাজ করতে পারল না; ভেবেছিল দূরে, কিন্তু আসলে কাছেই ছিল ওটা। কাঠের প্যানেলে সজোরে ধাক্কা খেয়ে চিত হয়ে পড়ে গেল সে, গড়ানোর সময় চুলে আগুন লেগে গেল তার, জ্বলে উঠল কয়েকটা গোছা। গন্ধে বমি এসে গেল ওর, তাড়াতাড়ি আগুন নিভিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল সে।
মেঝের নিচে আগুন জ্বলছিল বলে কাঠ দুর্বল হয়ে গিয়েছিল, তার ভার সইতে না পেরে ভেঙে গেল ওক কাঠের পাটাতন, আর হুমড়ি খেয়ে পড়ল সে। বেসমেন্টের আগুনের লেলিহান শিখা হাত আর বাহু স্পর্শ করতেই ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে নিল সে। গড়িয়ে গর্ত থেকে সরে এল, উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়াল বেসমেন্টের দরজার নবের দিকে। হঠাৎ থামল।
মাথা খাটাও, মেয়ে, মাথা খাটাও! খোলার আগে দরজাটা ছুঁয়ে দেখো। যদি ওপাশটা বেশি গরম হয় আর দরজা খোলার সাথে সাথে অতি উত্তপ্ত ঘরে অক্সিজেন ঢুকে পড়ে, তবে আগুনের বিপরীতমুখী ঝটকায় কয়লা হয়ে যাবে সে। কাঠে হাত রাখল স্যাক্স। জ্বলে যাওয়ার মতো গরম। কিন্তু খোলা ছাড়া আর উপায়ই বা কী? হাতে থুতু লাগিয়ে নবটা শক্ত করে ধরল সে, মোচড় দিয়ে খুলে ফেলল এবং তালু পুড়ে যাওয়ার আগেই ছেড়ে দিল হাতলটা। দড়াম করে খুলে গেল দরজা, একরাশ ধোঁয়া আর আগুনের ফুলকি ছিটকে এল বাইরে।
‘নিচে কেউ আছেন?’ ডাক দিল সে, নামতে শুরু করল সিঁড়ি দিয়ে। সিড়ির নিচের ধাপগুলো জ্বলছে। কার্বন ডাইঅক্সাইডের একটা ছোটখাটো ব্লাস্ট দিয়ে আগুনটা দমিয়ে ধোঁয়াটে বেসমেন্টে লাফিয়ে নামল সে। নিচ থেকে দ্বিতীয় ধাপটা ভেঙে গেল তার পায়ের চাপে, হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। হাত থেকে এক্সটিংগুইশারটা ছিটকে পড়ে গেল মেঝের উপর, রেলিংটা খপ করে ধরে কোনোমতে পা ভাঙার হাত থেকে বাঁচল। ভাঙা ধাপ থেকে নিজেকে টেনে তুলে ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে তাকানোর চেষ্টা করল সে। নিচে ধোঁয়া কিছুটা কম—উপরে উঠে যাচ্ছে সব—কিন্তু চারদিকে দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। গড়িয়ে জ্বলন্ত এক টেবিলের নিচে চলে গেছে এক্সটিংগুইশারটা। বাদ দাও ওটা! ধোঁয়ার ভেতর দিয়েই দৌড় দিল সে।
‘হ্যালো?’ চিৎকার করল সে। কোনো উত্তর নেই।
তারপর মনে পড়ল, আনসাব ৮২৩ ডাক্ট টেপ ব্যবহার করে; ভিকটিমদের চুপ করিয়ে রাখতে পছন্দ করে সে। লাথি মেরে ছোট একটা দরজা খুলল অ্যামেলিয়া, উঁকি দিল বয়লার রুমে। বাইরে যাওয়ার একটা দরজা আছে, কিন্তু জ্বলন্ত আবর্জনার স্তূপ পথ আটকে রেখেছে পুরোপুরি। পাশে তেলের ট্যাংকে লকলক করছে আগুনের শিখা।
বিস্ফোরণ হবে না, অ্যাকাডেমির অগ্নিসংযোগ ক্লাসের কথা মনে পড়ল স্যাক্সের। জ্বালানি তেল বিস্ফোরিত হয় না। আবর্জনার সরিয়ে দরজাটা খোলো। পালানোর রাস্তা তৈরি করো। তারপর মহিলা আর মেয়েটাকে খুঁজতে যাও। ইতস্তত করল সে, তেলের ট্যাংকের গা বেয়ে আগুন উঠতে দেখছে। বিস্ফোরণ হবে না, হবে না। দরজার দিকে এগোতে শুরু করল সে। হবে না…
হঠাৎ গরম সোডা ক্যানের মতো ফুলে উঠলタンクটা, ফেটে গেল মাঝ বরাবর। বাতাসে ছিটকে গেল তেল, বিশাল কমলা রঙের ফোয়ারা হয়ে জ্বলে উঠল আগুন। মেঝের উপর আগুনের নদী তৈরি হয়ে স্যাক্সের দিকে ধেয়ে এল। বিস্ফোরণ হয় না। ঠিক আছে। কিন্তু দিব্যি জ্বলে তো। লাফিয়ে দরজার ওপাশে সরে এল সে, দড়াম করে বন্ধ করে দিল ওটা। পালানোর রাস্তা তৈরির বারোটা বেজে গেল।
পিছিয়ে সিঁড়ির দিকে এল সে, কাশছে নিচু হয়ে আছে, খুঁজছে আতিপাতি করে। ক্যারল আর প্যামির কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না। ৮২৩ কি নিয়ম বদলেছে? বেসমেন্ট বাদ দিয়ে ভিকটিমদের কি চার্চের চিলেকোঠায় রেখেছে?
মটমট শব্দ হলো। চট করে উপরে তাকাল সে। আগুনের শিখায় মোড়ানো বিশাল এক ওক কাঠের বিম খসে পড়তে শুরু করেছে। চিৎকার করে একপাশে ঝাঁপ দিল স্যাক্স, কিন্তু পায়ে কিছু একটা বেঁধে আছাড় খেল পিঠের উপর। দেখল বিশাল কাঠের বারটা সরাসরি তার মুখ আর বুকের দিকে নেমে আসছে। নিজের অজান্তেই হাত তুলে আটকাতে গেল সে। বিকট শব্দে বিমটা আছড়ে পড়ল সানডে স্কুলের একটা ছোট চেয়ারের উপর। স্যাক্সের মাথা থেকে ইঞ্চিখানেক দূরে থেমে গেল ওটা। নিচ থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল সে, গড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। চারপাশে তাকাল, ঘন কালো ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে।
না, কিছুতেই না, হঠাৎ ভাবল সে। আরেকজনকে মরতে দেবো না আমি।
কাশতে কাশতে আগুনের দিকে ফিরল স্যাক্স, টলতে টলতে এগিয়ে গেল সেই কোনার দিকে যেটা দেখা হয়নি। দৌড় শুরু করতেই ফাইলিং ক্যাবিনেটের আড়াল থেকে একটা পা বেরিয়ে এসে ল্যাং মারল তাকে। হাত ছড়িয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল স্যাক্স, জ্বলন্ত তেলের পুকুর থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে তার মুখ। কাত হয়ে গড়িয়ে সরে এল সে, অস্ত্র বের করে সোজা চালিয়ে দিল উঠে বসার চেষ্টা করা এক স্বর্ণকেশী মহিলার আতঙ্কিত মুখের দিকে।
মুখ থেকে টেপটা ছিঁড়ে ফেলল স্যাক্স। সাথে সাথে একদলা কালো শ্লেষ্মা থুতুর সাথে ছিটিয়ে দিল মহিলা। শ্বাস আটকে আসার শব্দ করল সে কিছুক্ষণ—এ এক গভীর, মুমূর্ষু শব্দ।
‘ক্যারল গ্যানজ?’
মাথা নাড়ল সে।
‘আপনার মেয়ে?’ চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল স্যাক্স।
‘এখানে…নেই। আমার হাত! হাতকড়া।’
‘সময় নেই। আসুন।’ সুইচব্লেড দিয়ে ক্যারলের পায়ের বাঁধন কেটে দিল স্যাক্স।
ঠিক তখনই জানালার পাশে দেয়াল ঘেঁষে একটা গলে যাওয়া প্লাস্টিকের ব্যাগ নজরে পড়ল তার। সাজানো কু! ওগুলোই বলে দেবে ছোট মেয়েটা কোথায় আছে। ওটার দিকে পা বাড়াল সে। শেষ রক্ষা হলো না। কানফাটানো শব্দে মাঝখান দিয়ে ভেঙে গেল বয়লার রুমের দরজাটা। ছয় ইঞ্চি উঁচু ঢেউয়ের মতো জ্বলন্ত তেল ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে, ঘিরে ফেলল ব্যাগটাকে। মুহূর্তের মধ্যে ভস্ম হয়ে গেল ওটা।
এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল স্যাক্স, তারপর শুনতে পেল মহিলার চিৎকার। সব কটা সিঁড়িতে এখন দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। ধোঁয়া উঠতে থাকা টেবিলের নিচ থেকে লাথি মেরে ফায়ার এক্সটিংগুইশারটা বের করল স্যাক্স। হাতল আর নজল গলে গেছে, আর মেটালের ক্যানিস্টারটা এত গরম যে ধরার উপায় নেই। ছুরি দিয়ে ইউনিফর্মের শার্ট থেকে এক টুকরো কাপড় কেটে নিল সে। সেটা দিয়ে হিসহিস করতে থাকা এক্সটিংগুইশারটার গলা পেঁচিয়ে ধরল, ছুঁড়ে দিল জ্বলন্ত সিঁড়ির মাথায়। বোলিং পিনের মতো কিছুক্ষণ টলমল করল ওটা, তারপর গড়িয়ে নামতে শুরু করল।
গুলি।
গ্লক বের করল স্যাক্স, লাল সিলিন্ডারটা যখন সিঁড়ির মাঝখানে, তখন চালাল এক গুলি। বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হলো এক্সটিংগুইশারটা; কভারের লাল টুকরোগুলো শিস কেটে উড়ে গেল ওদের মাথার উপর দিয়ে। সিঁড়ির উপর কার্বন ডাইঅক্সাইড আর পাউডারের একটা মাশরুম ক্লাউড তৈরি হলো, নিভিয়ে দিল আগুনের তোড়।
‘এবার দৌড় দিন!’ চিৎকার করে উঠল স্যাক্স।
এক লাফে দুটো করে সিঁড়ি টপকাল তারা। নিজের এবং মহিলার অর্ধেক ওজন বয়ে উপরে উঠল স্যাক্স, দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল নিচতলার নরককুণ্ডে। দেয়াল ঘেঁষে হোঁচট খেতে খেতে এগোতে লাগল তারা এক্সিটের দিকে। ওদিকে উপরের স্টেইনড গ্লাস জানালাগুলো বিস্ফোরিত হচ্ছে। যীশু, ম্যাথু, মেরি আর খোদ ঈশ্বরের রঙিন শরীর এখন গরম কাচের বৃষ্টি হয়ে ঝড়ছে পলায়নপর দুই নারীর নত পিঠের উপর।
