অধ্যায় ষোলো
‘ওহ, ফর ক্রাইস্ট সেক। ব্লেডটা নতুন না পুরোনো?’
‘কোনো শ্বাস নেবেন না একদম…এই তো হয়ে গেছে। বাচ্চার পাছার মতো মসৃণ,’ বলল সে।
কাজটা ফরেনসিক নয়, সেলফকেয়ার সংক্রান্ত। এক সপ্তাহ পর রাইমকে শেভ করাচ্ছে টম। চুলগুলো ধুয়ে আঁচড়েও দিয়েছে সে।
আধঘণ্টা আগে স্যাক্স আর আলামত আসার অপেক্ষায় থাকার সময় কুপারকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল রাইম; টম তখন ক্যাথেটার পরিষ্কার করে টিউব লাগিয়ে দিয়েছে। কাজ শেষে রাইমের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘তোমাকে জঘন্য দেখাচ্ছে। জানো সেটা?’
‘আমি পরোয়া করি না। কেন করব?’
হঠাৎ বুঝতে পারল, সে আসলে পরোয়া করে।
‘একটু শেভ করে দেবো?’ জানতে চাইল যুবকটি।
‘সময় নেই।’
রাইমের আসল চিন্তা হলো, ডাক্তার বার্জার যদি তাকে পরিপাটি দেখেন, তবে হয়তো আত্মহত্যায় সাহায্য করতে রাজি হবেন না। অগোছালো রোগী মানেই হতাশ রোগী।
‘একটু ধুয়ে দেই।’
‘না।’
‘মেহমান আসবে, লিংকন।’
অবশেষে গজগজ করে রাইম বলল, ‘ঠিক আছে।’
‘আর ঐ পায়জামাটা ছাড়ন তো, নাকি?’
‘ওটায় কোনো সমস্যা নেই।’
কিন্তু এর মানেও হলো ‘ঠিক আছে’।
এখন, ঘষামাজা আর কামানোর পর, জিনস আর সাদা শার্ট পরানো হয়েছে তাকে; সামনে ধরা আয়নাটা পাত্তাই দিল না রাইম।
‘সরিয়ে নাও ওটা।’
‘চেহারায় জেল্লা এসে গেছে।’
নাক দিয়ে অবজ্ঞাসূচক শব্দ করল লিংকন রাইম। ‘ওরা না ফেরা পর্যন্ত আমি একটু হাঁটতে বেরোব,’ ঘোষণা করে বালিশে মাথা এলিয়ে দিল সে।
অবাক হয়ে তাকাল মেল কুপার।
‘ওর মাথার ভেতরে,’ ব্যাখ্যা দিল টম।
‘আপনার মাথায়?’
‘আমি কল্পনা করি,’ বলল রাইম।
‘দারুণ ভেলকি তো,’ বলল কুপার।
‘আমি যেকোনো পাড়ায় হাঁটতে পারি, কেউ ছিনতাই করবে না। পাহাড়ে চড়তে পারি, ক্লান্ত হব না। চাইলে পর্বতও জয় করতে পারি। ফিফথ অ্যাভিনিউয়ের দোকানে ঢুঁ মারতে পারি। অবশ্য, আমি যা দেখি তা সেখানে সত্যিই আছে কি না তার ঠিক নেই। কিন্তু তাতে কী? নক্ষত্রও তো নেই।’
‘তার মানে?’ জানতে চাইল কুপার।
‘আমরা তারার যে আলো দেখি তা হাজার বা লক্ষ বছরের পুরোনো। সেই আলো যখন পৃথিবীতে পৌঁছায়, তারাগুলো নিজেরা তখন সরে গেছে। আমরা যেখানে দেখি, আসলে সেখানে নেই ওগুলো।’
ক্লান্তি গ্রাস করতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল রাইম। ‘আমার ধারণা ওগুলোর কয়েকটা হয়তো জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে হারিয়েও গেছে।’
চোখ বন্ধ করল সে।
‘কাজটা কঠিন করে দিচ্ছে সে।’
‘ঠিক তা বলা যায় না,’ লন সেলিট্টোর কথার জবাব দিল রাইম।
স্টকইয়ার্ড সিন থেকে ফিরে এসেছে সেলিট্টো, ব্যাংকস আর স্যাক্স।
‘আন্ডারওয়্যার, চাঁদ আর একটা চারাগাছ,’ হতাশ গলায় বলল জেরি ব্যাংকস। ‘এ দিয়ে কোনো পথ মেলে?’
‘মাটিও আছে,’ মনে করিয়ে দিল মাটিপ্রেমী রাইম।
‘কোনো ধারণা আছে এসবের মানে কী?’ জানতে চাইল সেলিট্টো।
‘এখনো না,’ বলল রাইম।
‘পোলিং কোথায়?’ বিড়বিড় করল সেলিটো। ‘পেজ করলাম, জবাব দিচ্ছে না।’
‘দেখিনি,’ বলল রাইম।
দরজায় উদিত হলো এক ছায়ামূর্তি।
‘বহাল তবিয়তেই আছি!’ ভরাট গলায় বলল আগন্তুক।
মাথা নেড়ে লম্বা লোকটাকে ভেতরে আসতে ইশারা করল রাইম। টেরি ডবিন্স। এনওয়াইপিডি-র বিহেভিওরাল সায়েন্স বা আচরণবিজ্ঞান বিভাগের সর্বেসর্বা সে। এফবিআই-এর কোয়ান্টিকো থেকে পড়াশোনা করেছে, সেই সাথে ফরেনসিক সায়েন্স আর সাইকোলজিতে ডিগ্রি আছে তার। অপেরা আর টাচ ফুটবল পছন্দ করে এই সাইকোলজিস্ট। সাড়ে তিন বছর আগে দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার সময় রাইম দেখেছিল পাশে বসে ওয়াকম্যানে আইডা শুনছে ডবিল। তারপর তিন ঘণ্টা ধরে রাইমের ইনজুরি নিয়ে কাউন্সেলিং করেছিল।
‘যারা ফোন কল ব্যাক করে না, তাদের ব্যাপারে টেক্সট বইয়ে যেন কী লেখা আছে?’
‘আমার সাইকো-অ্যানালাইসিস পরে কোরো, টেরি। আমাদের আনসাবের ব্যাপারে শুনেছ?’
‘অল্প,’ রাইমকে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে বলল ডবিন্স। এমডি না হলেও শরীরতত্ত্ব বোঝে সে। ‘তুমি ঠিক আছ তো, লিংকন? একটু কাহিল দেখাচ্ছে।’
‘আজ একটু বেশিই ধকল যাচ্ছে,’ স্বীকার করল রাইম। ‘একটু ঘুমিয়ে নিতে পারলে ভালো হতো। জানোই তো আমি কেমন কুঁড়ে।’
‘হ্যাঁ, তা তো বটেই। তুমিই সেই লোক যে রাত তিনটার সময় কোনো আসামিকে নিয়ে উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করতে ফোন দিতে আর আমি কেন ঘুমাচ্ছি তা বুঝতে পারতে না। তা কী খবর? প্রোফাইল লাগবে নাকি?’
‘যা বলতে পারো তাতেই লাভ।’
ডবিন্সকে ব্রিফ করল সেলিট্টো। রাইমের মনে আছে, একসাথে কাজ করার সময় ডবিন্স কখনো নোট নিত না, অথচ সব মনে রাখতে পারত ঐ লালচুলো মাথার ভেতর। দেয়ালের চার্টের সামনে পায়চারি করতে লাগল সাইকোলজিস্ট, ডিটেকটিভের কথা শুনতে শুনতে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে ওটার দিকে।
হাতের আঙুল তুলে সেলিট্টোকে থামিয়ে দিল সে। ‘ভিকটিমগুলো…সবাইকে মাটির নিচে পাওয়া গেছে। কবরে, বেসমেন্টে, স্টকইয়ার্ডের সুড়ঙ্গে।’
‘ঠিক,’ সায় দিল রাইম।
‘বলে যাও।’
মনেল গ্যারগারকে উদ্ধারের ঘটনা বলল সেলিটো।
‘বেশ,’ আনমনে বলল ডবিন্স। তারপর থামল, ঘুরল দেয়ালের দিকে। পা ফাঁক করে, কোমরে হাত দিয়ে আনসাব ৮২৩-এর অল্প কয়টা তথ্যের দিকে তাকিয়ে রইল।
‘সে পুরোনো জিনিস পছন্দ করে, এই ব্যাপারটা ভেঙে বলো তো।’
‘ঠিক মেলাতে পারছি না। এখন পর্যন্ত তার সব ক্রুর সাথে প্রাচীন নিউ ইয়র্কের একটা যোগসূত্র আছে। গত শতাব্দীর শুরুর দিকের নির্মাণ সামগ্রী, স্টকইয়ার্ড, স্টিম সিস্টেম।’
হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে চার্টে টোকা দিল ডবিন্স। ‘হানা। হানার ব্যাপারে বলো।’
‘অ্যামেলিয়া?’ জানতে চাইল রাইম।
ডবিন্সকে সে জানাল কীভাবে আনসাব কোনো কারণ ছাড়াই মনেল গ্যারগারকে ‘হানা’ বলে ডাকছিল। ‘মেয়েটা বলেছে নামটা উচ্চারণ করতে খুব পছন্দ করছিল লোকটা। আর জার্মান ভাষায় কথা বলছিল।’
‘আর তাকে কিডন্যাপ করার জন্য বেশ ঝুঁকি নিয়েছিল সে, তাই না?’ নোট করল ডবিন্স। ‘এয়ারপোর্টে ক্যাব থেকে তোলা-ওটা তেমন কঠিন না। কিন্তু লন্ড্রি রুমে লুকিয়ে থাকা… জার্মান কাউকে তোলার জন্য নিশ্চয়ই খুব বড় কোনো মোটিভেশন ছিল তার।’
আঙুলে চুল প্যাঁচাতে লাগল ডবিন্স, তারপর ক্যাঁচক্যাঁচে বেতের চেয়ারে ধপাস করে বসে পা ছড়িয়ে দিল।
‘ওকে, এটা মিলিয়ে দেখো। মাটির নিচে… এটাই আসল চাবিকাঠি। এর মানে সে এমন কেউ যে কিছু একটা লুকাচ্ছে। আর এসব শুনলে আমার প্রথমেই মনে পড়ে হিস্টিরিয়ার কথা।’
‘কিন্তু ওর আচরণে তো হিস্টিরিয়ার লক্ষণ নেই কারসন,’ বলল সেলিট্টো। ‘বরং বেশ ঠান্ডা মাথার খুনি মনে হচ্ছে তাকে।’
‘সেই অর্থে হিস্টিরিয়া নয়। এটা এক ধরনের মানসিক বিকার। রোগীর জীবনে কোনো ট্রমা ঘটলে তার অবচেতন মন সেটাকে অন্য কিছুতে রূপান্তরিত করে। রোগীকে রক্ষা করার চেষ্টা আর কি। সাধারণ কনভার্শন হিস্টিরিয়ার ক্ষেত্রে শারীরিক লক্ষণ দেখা যায়-বমি ভাব, ব্যথা, পক্ষাঘাত। কিন্তু আমার মনে হয় এখানে আমরা এর সাথে সম্পর্কিত অন্য কোনো সমস্যার মোকাবেলা করছি। ডিসোসিয়েশন-ট্রমা যখন শরীরের বদলে মনের উপর প্রভাব ফেলে, তখন আমরা একে তাই বলি। হিস্টোরিক্যাল অ্যামনেসিয়া, ফিউগ স্টেট। এবং মাল্টিপল পার্সোনালিটি।’
‘জেকিল আর হাইড?’ ব্যাংকসের আগেই বলে উঠল মেল কুপার।
‘না, আমার মনে হয় না ওর সত্যি সত্যি মাল্টিপল পার্সোনালিটি আছে,’ বলে চলল ডবিন্স। ‘ওটা খুব বিরল রোগ আর ক্লাসিক মাল্টিপল পার্সোনালিটির রোগীরা কমবয়সি হয়, আইকিউও তোমাদের এই খোকা-র চেয়ে কম থাকে।’ চার্টের দিকে মাথা নাড়ল সে। ‘এ বেশ ধুরন্ধর আর বুদ্ধিমান। গোছানো অপরাধী।’
জানালার বাইরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ডবিন্স। ‘ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং, লিংকন। আমার ধারণা তোমাদের এই আনসাব সুবিধামতো তার দ্বিতীয় সত্তাটাকে ব্যবহার করে-বিশেষ করে যখন খুন করার ইচ্ছা জাগে তার। আর এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
‘কেন?’
‘দুটো কারণে। প্রথমত, এটা তার মূল সত্তা সম্পর্কে ধারণা দেয়। সে এমন কেউ যাকে মানুষকে সাহায্য করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে-হয়তো পেশাগতভাবে, কিংবা পারিবারিকভাবে। অর্থাৎ, মানুষকে আঘাত করা তার স্বভাব নয়। যাজক, কাউন্সিলর, রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী। আর দুই, আমার মনে হয় সে একটা ব্লু-প্রিন্ট বা নকশা খুঁজে পেয়েছে। সেটা কী তা বের করতে পারলে হয়তো তার হদিসও পাওয়া যাবে।’
‘কী ধরনের ব্লু-প্রিন্ট?’
‘হয়তো অনেক দিন ধরেই খুন করার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু যতদিন না কোনো রোল মডেল খুঁজে পেয়েছে ততদিন কাজটা করেনি। হয়তো কোনো বই বা সিনেমা থেকে। কিংবা চেনা কেউ। এমন কেউ যার সাথে নিজেকে মেলাতে পারে সে, যার অপরাধগুলো তাকে খুন করার অনুমতি দেয়। আমি কিন্তু আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ছি…’
‘ছোঁড়ো,’ বলল রাইম। ‘চালিয়ে যাও।’
‘ইতিহাসের প্রতি তার এই অবসেশন বা ঘের দেখে মনে হচ্ছে তার ঐ দ্বিতীয় সত্তাটা অতীতের কোনো চরিত্র।’
‘বাস্তব চরিত্র?’
‘তা বলতে পারব না। কাল্পনিকও হতে পারে। হানা, সে যে-ই হোক, এই গল্পের কোনো একটা চরিত্র। জার্মানিও। বা জার্মান আমেরিকান।’
‘কী কারণে এমনটা হতে পারে কোনো ধারণা?’
‘ফ্রয়েডের মতে এর কারণ হলো ইডিপাল স্টেজে সেক্সুয়াল কনফ্লিক্ট। আজকাল অবশ্য সবাই মনে করে যে বিকাশের সমস্যাগুলো যেকোনো ট্রমা থেকেই হতে পারে। আর সেটা যে একটা নির্দিষ্ট ঘটনা হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। পার্সোনালিটি বা ব্যক্তিত্বের ত্রুটি, ব্যক্তিগত বা পেশাগত জীবনে দীর্ঘদিনের হতাশা থেকেও হতে পারে। বলা কঠিন।’
প্রোফাইলের দিকে তাকাতে তাকাতে চোখদুটো জ্বলে উঠল তার। ‘তবে আমি চাই তোমরা ওকে জ্যান্ত ধরো, লিংকন। ঘণ্টাখানেকের জন্য আমার কাউচে শোয়াতে পারলে দারুণ হতো।’
‘টম, লিখছ তো?’
‘জি, বস।’
‘একটা প্রশ্ন,’ শুরু করল রাইম।
ঘুরে দাঁড়াল ডবিন্স। ‘লিংকন, আমি বলব ওটাই আসল প্রশ্ন: সে কুগুলো ফেলে যাচ্ছে কেন?’
‘হ্যাঁ। কুগুলো কেন?’
‘সে যা করেছে তা নিয়ে ভাবো…সে তোমার সাথে কথা করছে। সন অব স্যাম বা জোডিয়াক কিলারের মতো অসংলগ্ন প্রলাপ বকছে না। ও সিজোফ্রেনিক নয়। সে যোগাযোগ করছে তোমার ভাষায়। ফরেনসিকের ভাষায়। কেন?’ আবার পায়চারি শুরু করল সে, চার্টের উপর চোখ বোলাচ্ছে। ‘আমার শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছে। সে তার অপরাধবোধটা ভাগ করে নিতে চাইছে। দেখো, খুন করা তার জন্য কঠিন। আমাদের যদি সহযোগী বানাতে পারে, তবে কাজটা সহজ হয়ে যায়। আমরা যদি ভিকটিমদের সময়মতো বাঁচাতে না পারি, তবে তাদের মৃত্যুর দায় আমাদের উপরও বর্তায়।’
‘কিন্তু সেটা তো ভালো, তাই না?’ জানতে চাইল রাইম। ‘তার মানে সে এমন সব কু দেবে যা সমাধান করা সম্ভব। কারণ ধাঁধাটা বড্ড কঠিন হলে তো আর সে বোঝা ভাগ করতে পারবে না।’
‘তা ঠিক,’ বলল ডবিন্স, মুখের হাসি মিলিয়ে গেছে। ‘তবে আরেকটা ব্যাপারও আছে এখানে।’
উত্তরটা দিল সেলিটো। ‘সিরিয়াল অ্যাক্টিভিটি বাড়তেই থাকে।’
‘ঠিক,’ নিশ্চিত করল ডবিন্স।
‘এর চেয়ে আর কত বাড়াবে?’ বিড়বিড় করল ব্যাংকস। ‘তিন ঘণ্টা পরপর হামলা কি যথেষ্ট নয়?’
‘ওহ, সে উপায় বের করে নেবে,’ বলে চলল সাইকোলজিস্ট। ‘সম্ভবত সে একসাথে একাধিক ভিকটিমকে টার্গেট করা শুরু করবে।’
চোখ কুঁচকে তাকাল সাইকোলজিস্ট। ‘অ্যাই লিংকন, ঠিক আছ তো?’ ক্রিমিনালিস্টের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, চোখদুটো কুঁচকে আছে। ‘ক্লান্ত। বুড়ো পঙ্গু মানুষের জন্য একটু বেশিই উত্তেজনা হয়ে যাচ্ছে।’
‘শেষ একটা কথা। সিরিয়াল ক্রাইমের ক্ষেত্রে ভিকটিম প্রোফাইল খুব জরুরি। কিন্তু এখানে আমরা বিভিন্ন লিঙ্গ, বয়স আর অর্থনৈতিক শ্রেণির মানুষ পাচ্ছি। সবাই শ্বেতাঙ্গ, তবে সে এমন এলাকায় শিকার ধরছে যেখানে শ্বেতাঙ্গদের সংখ্যাই বেশি, তাই এটা পরিসংখ্যানগতভাবে খুব একটা তাৎপর্যপূর্ণ নয়। এখন পর্যন্ত যা জানি তাতে বোঝা যাচ্ছে না কেন সে বিশেষ করে এদেরই বেছে নিল। যদি এটা বের করতে পারো, তবে হয়তো তার চেয়ে একধাপ এগিয়ে থাকতে পারবে।’
‘ধন্যবাদ, টেরি,’ বলল রাইম। ‘থাকো কিছুক্ষণ।’
‘নিশ্চয়ই, লিংকন। যদি তুমি চাও।’
তারপর হুকুম দিল রাইম, ‘স্টকইয়ার্ড সিনের ফিজিক্যাল এভিডেন্সগুলো দেখা যাক। কী আছে আমাদের হাতে? আন্ডারওয়্যারটা?’
স্যাক্সের আনা ব্যাগগুলো জড়ো করল মেল কুপার। আন্ডারওয়্যারের ব্যাগটার দিকে তাকাল সে। ‘ক্যাটরিনা ফ্যাশনসের ডি’আমোর লাইন,’ ঘোষণা করল সে। ‘শতভাগ সুতি, ইলাস্টিক ব্যান্ড। কাপড়টা আমেরিকার, তবে কাটছাঁট আর সেলাই হয়েছে তাইওয়ানে।’
‘শুধু তাকিয়েই এত কিছু বলে দিলেন?’ স্যাক্স অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘নাহ, পড়লাম আর কি,’ লেবেলটা দেখিয়ে বলল সে।
‘ওহ।’ হেসে ফেলল পুলিশরা।
‘তার মানে সে বলছে তার হাতে আরেকজন মহিলা আছে?’ জানতে চাইল স্যাক্স।
‘সম্ভবত,’ বলল রাইম।
ব্যাগটা খুলল কুপার। ‘তরলটা কী জানি না। ক্রোমাটোগ্রাফ করে দেখব।’
টমকে কাগজের টুকরোটা উঁচিয়ে ধরতে বলল রাইম, যাতে চাঁদের দশা আঁকা আছে। খুঁটিয়ে দেখল সে। এ ধরনের টুকরো চমৎকার একটা সূত্র। যে কাগজ থেকে ছেঁড়া হয়েছে সেটার সাথে মিলিয়ে নিলে সেটা আঙুলের ছাপের মতোই নিশ্চিত আলামত। সমস্যা হলো, আসল কাগজটা তাদের কাছে নেই। আদৌ সেটা পাওয়া যাবে কি না ভাবল সে। হয়তো ছিঁড়ে ফেলার পর বাকিটা নষ্ট করে ফেলেছে আনসাব। তবে লিংকন রাইম তা ভাবতে চাইল না। সে কল্পনা করতে ভালোবাসে যে সেটা কোথাও আছে। কেবল খুঁজে পাওয়ার অপেক্ষায়। উৎসগুলো সব সময় এভাবেই কল্পনা করে সে: যে গাড়ি থেকে রঙের চিপটা খসে পড়েছে, যে আঙুল থেকে নখটা উপড়ে এসেছে, যে বন্দুকের নল থেকে গুলিটা বেরিয়ে ভিকটিমের শরীরে ঢুকেছে। এরকম যে উৎসগুলো সব সময় আনসাবের খুব কাছাকাছি থাকে, সেগুলো রাইমের মনে নিজস্ব এক ব্যক্তিত্ব নিয়ে ধরা দেয়।
হতে পারে তা উদ্ধত বা নিষ্ঠুর।
না।
কিংবা রহস্যময়।
চাঁদের দশা।
ডবিন্সকে জিজ্ঞেস করল রাইম, আনসাবের কাজগুলো কোনো চক্র মেনে চলে কি না।
‘না। চাঁদ এখন কোনো বড় দশায় নেই। অমাবস্যার চার দিন পেরিয়েছে।’
‘তার মানে চাঁদগুলোর অন্য কোনো অর্থ আছে।’
‘যদি ওগুলো আদৌ চাঁদ হয়ে থাকে,’ বলল স্যাক্স। নিজের উপর খুশি সে, এবং হওয়াটাই স্বাভাবিক, ভাবল রাইম।
সে বলল, ‘ভালো পয়েন্ট, অ্যামেলিয়া। হয়তো সে বৃত্ত বোঝাচ্ছে। বা কালি। কাগজ। জ্যামিতি। প্ল্যানেটেরিয়াম…’
রাইম খেঁয়াল করল মেয়েটা তার দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো এইমাত্র খেয়াল করল যে সে শেভ করেছে, চুল আঁচড়েছে, কাপড় বদলেছে। এখন মেজাজ কেমন মেয়েটার? ভাবল সে। রাগ, নাকি নির্লিপ্ততা? বোঝা যাচ্ছে না। এই মুহূর্তে আনসাব ৮২৩-এর মতোই দুর্বোধ্য অ্যামেলিয়া স্যাক্স।
হলওয়েতে ফ্যাক্স মেশিনের আওয়াজ হলো। টম গিয়ে নিয়ে এল। দুটো কাগজ হাতে ফিরল একটু পরেই।
‘এমা রলিন্স পাঠিয়েছে,’ ঘোষণা করল সে। রাইমের দিকে তুলে ধরল কাগজগুলো। ‘আমাদের গ্রোসারি স্ক্যানার সার্ভে। ম্যানহাটনের এগারোটা দোকান গত দুদিনে পাঁচটার কম আইটেম কেনা কাস্টমারের কাছে বাছুরের হাড় বিক্রি করেছে।’ পোস্টারে লিখতে গিয়েও রাইমের দিকে তাকাল সে। ‘দোকানের নামগুলো?’
‘অবশ্যই। পরে মিলিয়ে দেখার জন্য লাগবে।’
প্রোফাইল চার্টে নামগুলো লিখল টম।
ব্রডওয়ে ও ৮২তম, শপরাইট ব্রডওয়ে ও ৯৬তম, অ্যান্ডারসন ফুডস গ্রিনউইচ ও ব্যাংক, শপরাইট সেকেন্ড অ্যাভিনিউ, ৭২-৭৩তম, গ্রোসারি ওয়ার্ল্ড ব্যাটারি পার্ক সিটি, জে অ্যান্ড জি’স এম্পোরিয়াম ১৭০৯ সেকেন্ড অ্যাভিনিউ, অ্যান্ডারসন ফুডস ৩৪তম ও লেক্সিংটন, ফুড ওয়্যারহাউজ ৮ম অ্যাভিনিউ ও ২৪তম, শপরাইট হিউস্টন ও লাফায়েত, শপরাইট ৬ষ্ঠ অ্যাভিনিউ ও হিউস্টন, জে অ্যান্ড জি’স এম্পোরিয়াম গ্রিনউইচ ও ফ্র্যাংকলিন, গ্রোসারি ওয়ার্ল্ড।
‘এতে তো পুরো শহরের লিস্ট ধরিয়ে দিয়েছে,’ বলল স্যাক্স।
‘ধৈর্য,’ বলল অস্থিরমতি লিংকন রাইম।
মেল কুপার স্যাক্সের খুঁজে পাওয়া খড়টা পরীক্ষা করছিল। ‘বিশেষ কিছু নেই।’ ছুঁড়ে ফেলে দিল ওটা।
‘নতুন?’ জিজ্ঞেস করল রাইম। নতুন হলে হয়তো যে দোকান থেকে ঝাঁটা আর হাড় কেনা হয়েছে সেগুলো ক্রস-রেফারেন্স করা যেত।
কিন্তু কুপার বলল, ‘ভেবেছিলাম। কিন্তু এটা ছয় মাস বা তারও বেশি পুরোনো।’
জার্মান মেয়েটার কাপড়ের ধুলোবালির উপর চোখ বোলাল সে।
‘অনেক কিছু আছে এখানে,’ বলল সে। ‘মাটি।’
‘ডেনসিটি-গ্রেডিয়েন্ট করার মতো যথেষ্ট আছে?’
‘উঁহু। শুধুই ধুলো। সম্ভবত সিনের।’
রক্তমাখা কাপড় থেকে ঝেড়ে ফেলা বাকি ময়লাগুলো দেখল কুপার।
‘ইটের গুঁড়ো। এত ইট কেন?’
‘আমি যে ইঁদুরগুলো মেরেছিলাম। দেয়ালটা ইটের ছিল।’
‘তুমি গুলি করেছ? সিনে?’ আঁতকে উঠল রাইম।
আত্মপক্ষ সমর্থন করে স্যাক্স বলল, ‘হ্যাঁ, মানে… ইঁদুরগুলো ওর গায়ের উপর ছিল।’
রাগ হলেও চেপে গেল সে। শুধু যোগ করল, ‘গুলির বারুদ থেকে সব দূষিত হয়ে গেছে। সিসা, আর্সেনিক, কার্বন, সিলভার।’
‘আর এই যে… গ্লাভসের লাল চামড়ার আরেকটা টুকরো। আর… আরেকটা সুতো পাওয়া গেছে। অন্য রকম।’
ক্রিমিনালিস্টরা সুতো ভালোবাসে। এটা একটা ধূসর রঙের সুতো, খালি চোখে প্রায় দেখাই যায় না।
‘চমৎকার,’ ঘোষণা করল রাইম। ‘আর কী?’
‘আর এই যে সিনের ছবি,’ বলল স্যাক্স, ‘আর আঙুলের ছাপগুলো। ওর গলার ছাপ আর যেখান থেকে সে গ্লাভস তুলেছিল সেখানকার।’ তুলে ধরল সে।
‘গুড,’ ভালো করে ওগুলো দেখতে দেখতে বলল রাইম।
মেয়েটার চোখেমুখে এক অনিচ্ছুক বিজয়ের আভা-জেতার আনন্দ, যার উল্টো পিঠেই আছে অপেশাদার হওয়ার গ্লানি।
ছাপের পোলারয়েডগুলো দেখছিল রাইম, এমন সময় সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শোনা গেল, জিম পোলিং এসেছে। ঘরে ঢুকে ফিটফাট লিংকন রাইমকে দেখে একবার থমকাল, তারপর এগিয়ে গেল সেলিট্টোর দিকে।
‘এইমাত্র সিন থেকে এলাম,’ বলল সে। ‘ভিকটিমকে বাঁচিয়েছ তোমরা। দারুণ কাজ।’ স্যাক্সের দিকেও মাথা নাড়ল সে। ‘কিন্তু হারামজাদাটা আরেকজনকে তুলেছে?’
‘কিংবা তুলবে,’ ছাপগুলোর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল রাইম।
‘আমরা ক্রুগুলো নিয়ে কাজ করছি,’ বলল ব্যাংকস।
‘জিম, তোমাকে খুঁজছিলাম,’ বলল সেলিট্টো। ‘মেয়রের অফিসে ফোন করেছিলাম।’
‘চিফের সাথে ছিলাম। বাড়তি লোক চেয়ে প্রায় পায়ে ধরতে হয়েছে। ইউএন সিকিউরিটি থেকে আরো পঞ্চাশজন পেয়েছি।’
‘ক্যাপ্টেন, একটা কথা আছে। একটা সমস্যা হয়েছে। গত সিনের সময় কিছু একটা ঘটেছে…’
ঐ দিন পর্যন্ত শোনা যায়নি এমন একটা গলা গমগম করে উঠল সারা ঘরে। ‘সমস্যা? কার সমস্যা? আমাদের তো কোনো সমস্যা নেই, তাই না? একদমই না।’
দরজায় দাঁড়ানো লম্বা, রোগা লোকটার দিকে তাকাল রাইম। কুচকুচে কালো গায়ের রং, পরনে বিদঘুটে সবুজ স্যুট আর আয়নার মতো চকচকে বাদামি জুতো।
রাইমের বুকটা ধক করে উঠল। ‘ডেলরে।’
‘লিংকন রাইম। নিউ ইয়র্কের নিজস্ব আয়রনসাইড। হেই, লন। আর জিম পোলিং, কী খবর দোস্ত?’
ডেলরের পেছনে জনা ছয়েক লোক আর একজন মহিলা। এফবিআই এজেন্টরা কেন এখানে, বুঝতে বাকি রইল না রাইমের। ঘরের অফিসারদের উপর চোখ বোলাল ডেলরে, স্যাক্সের উপর মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি আটকে সরে গেল।
‘কী চাও তুমি?’ জানতে চাইল পোলিং।
ডেলরে বলল, ‘আন্দাজ করতে পারোনি? তোমাদের দিন শেষ। দোকান বন্ধ করে দিচ্ছি আমরা। ইয়েস, স্যার। একদম বুকিদের মতো।’
