দ্য পোর্টেবলস ডটার
‘ওলট-পালট, ওলট-পালট, ওলট-পালট! এটাই নিউ ইয়র্কের মূলমন্ত্র। এমনকি আমাদের পূর্বপুরুষদের হাড়গোড়কেও সিকি শতাব্দী শান্তিতে শুয়ে থাকতে দেওয়া হয় না। এদিকে এক প্রজন্মের মানুষ যেন তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের সমস্ত স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।’
—ফিলিপ হোন, নিউ ইয়র্কের মেয়রের ডায়েরি, ১৮৪৫
অধ্যায় আঠারো
শনিবার, রাত ১০:১৫ থেকে রবিবার, ভোর ৫:৩০ পর্যন্ত
‘আরেকবার দাও, লন।’
রাইম স্ট্র দিয়ে পান করল, সেলিট্টো গ্লাস থেকে। দুজনেই কড়া মদ খাচ্ছে। ক্যাঁচক্যাঁচে বেতের চেয়ারে বসে পড়ল ডিটেকটিভ। রাইমের মনে হলো তাকে ক্যাসাব্লাংকার পিটার লরের মতো দেখাচ্ছে।
টেরি ডবিন্স চলে গেছে—নার্সিসিজম আর সরকারি চাকুরেদের সম্পর্কে কিছু কটু মনস্তাত্ত্বিক মন্তব্য করে। জেরি ব্যাংকসও চলে গেছে। মেল কুপার তার যন্ত্রপাতিগুলো যত্নসহকারে খুলে গুছিয়ে রাখছে।
‘জিনিসটা দারুণ, লিংকন।’ স্কচে চুমুক দিল সেলিটো। ‘খাইছে। এই জিনিস কেনার সামর্থ্য নেই আমার। বয়স কত এটার?’
‘আমার মনে হয় কুড়ি।’
তামাটে মদটার দিকে তাকাল ডিটেকটিভ। ‘জাহান্নামে যাক, এটা যদি কোনো মেয়ে হতো, তবে সে সাবালিকা তো হতোই, আরো বেশি কিছু হতো।’
‘একটা কথা বলো, লন। পোলিং? ওর ঐ তর্জন-গর্জন। ব্যাপারটা কী ছিল?’
‘খুদে জিমি?’ হাসল সেলিটো। ‘এখন বিপদে পড়েছে সে। পেরেত্তিকে কেস থেকে সরিয়ে ফেডদের হাত থেকে এটা বাঁচানোর জন্য সে-ই কলকাঠি নেড়েছিল। অনেক বড় ঝুঁকি নিয়েছিল। তোমাকে চেয়েছিল, সেটাও সহজ ছিল না। এর জন্য অনেকেরই আঁতে ঘা লেগেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে তোমাকে বোঝাচ্ছি না। আসলে এমন একটা গরম কেসে একজন সিভিলিয়ানকে জড়ানো ঠিক হয়নি আর কি।’
‘পোলিং আমাকে চেয়েছিল? আমি ভেবেছিলাম চিফ চেয়েছেন…’
‘হ্যাঁ, কিন্তু পোলিংই প্রথমে তার কানে মন্ত্র দিয়েছিল। কিডন্যাপিং আর ভুয়া আলামতের কথা শোনার পরপরই ফোন করেছিল সে।’
আর আমাকে চাইল? অবাক হলো রাইম। অদ্ভুত ব্যাপার। গত কয়েক বছরে পোলিংয়ের সাথে কোনো যোগাযোগ ছিল না তার—সেই পুলিশ-খুনি কেসটার পর থেকে, যাতে জখম হয়েছিল রাইম। পোলিংই কেসটা চালিয়েছিল আর শেষমেশ ড্যান শেফার্ডকে ধরেছিল।
‘তোমাকে অবাক মনে হচ্ছে,’ বলল সেলিট্টো।
‘ও আমাকে চেয়েছে বলে। আমাদের সম্পর্কটা খুব একটা ভালো ছিল না। অন্তত আগে ছিল না।’
‘কেন?’
‘আমি ওর বিরুদ্ধে ১৪-৪৩ ঠুকেছিলাম।’
এনওয়াইপিডি-র অভিযোগনামা।
‘পাঁচ-ছয় বছর আগে, যখন ও লেফটেন্যান্ট ছিল, আমি দেখেছিলাম একটা সংরক্ষিত ক্রাইম সিনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে জেরা করছে এক সন্দেহভাজনকে। জায়গাটা নষ্ট করে ফেলেছিল। আমার মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল দেখে। রিপোর্ট করে দিয়েছিলাম আর তার এক আইএ রিভিউতে ওটার উল্লেখও ছিল—যেটায় সে ঐ নিরস্ত্র লোকটাকে মেরেছিল।’
‘যাক, মনে হয় সব মাফ করে দিয়েছে, কারণ সে তোমাকে খুব করে চেয়েছিল।’
‘লন, আমার হয়ে একটা ফোন করে দাও না?’
‘নিশ্চয়ই।’
‘না,’ ডিটেকটিভের হাত থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে বলল টম। ‘ওকে নিজেকেই করতে দিন।’
‘কীভাবে কাজ করে সেটা শেখার সময় পাইনি,’ ডায়ালিং ইসিইউ-র দিকে মাথা নেড়ে বলল রাইম।
‘আপনি সময় দেননি। দুটোর মধ্যে অনেক তফাত। কাকে ফোন করছেন?’
‘বার্জারকে।’
‘না, করবেন না,’ টম বলল। ‘অনেক রাত হয়েছে।’
‘ঘড়ি দেখতে জানি আমি,’ শান্ত গলায় জবাব দিল রাইম। ‘ফোন করো। প্লাজায় আছে সে।’
‘না।’
‘তোমাকে ফোন করতে বলেছি।’
‘এই নিন।’ টেবিলের এক প্রান্তে এক টুকরো কাগজ নামিয়ে রাখল সহকারী, কিন্তু সহজেই পড়ে ফেলল রাইম।
ঈশ্বর লিংকন রাইমের কাছ থেকে অনেক কিছুই কেড়ে নিলেও যুবকের মতো দৃষ্টিশক্তি দিয়েছেন তাকে। কন্ট্রোল স্টকের উপর গাল ঠেকিয়ে ডায়াল করল সে। কাজটা ভাবনার চেয়েও সহজ ছিল, কিন্তু ইচ্ছা করেই বেশি সময় নিল সে আর বিড়বিড় করতে লাগল। ওকে পাত্তাই দিল না টম, সোজা নেমে গেল নিচে।
হোটেল রুমে নেই বার্জার।
লাইন কেটে দিল রাইম, ফোনটা আছাড় মারতে পারল না বলে রাগ হলো তার। ‘সমস্যা?’ জিজ্ঞেস করল সেলিট্টো।
‘না,’ গজগজ করল রাইম।
গেল কোথায় লোকটা? বিরক্ত হয়ে ভাবল রাইম। অনেক রাত হয়েছে। এতক্ষণে হোটেল রুমে থাকার কথা বার্জারের। অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো রাইমের—ঈর্ষা। তার মরণ-ডাক্তার হয়তো অন্য কাউকে মরতে সাহায্য করতে গেছে।
হঠাৎ মৃদু হেসে উঠল সেলিট্টো। মুখ তুলল রাইম। একটা ক্যান্ডি বার চিবুচ্ছে পুলিশটা।
ভুলে গিয়েছিল যে একসাথে কাজ করার সময় জাংক ফুডই ছিল বিশালদেহী লোকটার প্রধান খাবার।
‘ভাবছিলাম… বেনি পনজোর কথা মনে আছে?’
‘দশ-বারো বছর আগের ওসি টাস্ক ফোর্সের?’
‘হ্যাঁ।’
অর্গানাইজড ক্রাইমের কাজ বেশ উপভোগ করত রাইম। আসামিরা সব পেশাদার। ক্রাইম সিনগুলো চ্যালেঞ্জিং। আর ভিকটিমরা কদাচিৎ নির্দোষ হতো।
‘কে সেটা?’ জানতে চাইল মেল কুপার।
সেলিট্টো বলল, ‘আমরা তখন সেন্ট্রাল বুকিংয়ে ছিলাম, লিংকন আর আমি, সাথে আরো কয়েকজন। আর বেনি, মনে আছে তো, বিশাল সাইজের লোক ছিল, কুঁজো হয়ে বসে পেটে হাত বোলাচ্ছিল। হঠাৎ বলে উঠল, “খিদে পেয়েছে আমার, একটা ক্যান্ডি স্যান্ডউইচ খাব।” আর আমরা তখন একে অপরের দিকে তাকাচ্ছি। আমি বললাম, “ক্যান্ডি স্যান্ডউইচ আবার কী জিনিস?” তখন সে আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন আমি মঙ্গলগ্রহ থেকে এসেছি। বলল, “কী মনে হয় তোমার? একটা হার্শি চকলেট বার দুপিস রুটির মাঝখানে ঢোকালেই তো ক্যান্ডি স্যান্ডউইচ হয়ে যায়।”‘
হেসে উঠল তারা। বারটা কুপারের দিকে বাড়িয়ে ধরল সেলিট্টো। কুপার মাথা ঝাঁকাল প্রথমে। তারপর ইঙ্গিত করল রাইমের দিকে। তা দেখে হঠাৎ এক কামড় দেওয়ার ইচ্ছা জাগল রাইমের।
এক বছরের বেশি সময় ধরে চকলেট খায়নি সে। এ ধরনের খাবার এড়িয়ে চলত সে—চিনি, ক্যান্ডি। ঝামেলার খাবার। জীবনের ছোটখাটো বিষয়গুলোই সবচেয়ে বড় বোঝা, ওগুলোই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় আর ক্লান্ত করে তোলে। ঠিক আছে, তুমি স্কুবা-ডাইভ করতে পারবে না বা আল্পসে চড়তে পারবে না। তাতে কী? অনেকেই পারে না। কিন্তু সবাই দাঁত মাজে। ডেনটিস্টের কাছে যায়, ফিলিং করায়, ট্রেন ধরে বাড়ি ফেরে। দাঁতের ফাঁক থেকে বাদামের টুকরো খুঁচিয়ে বের করে সবার অলক্ষ্যে। সবাই, শুধু লিংকন রাইম ছাড়া।
সেলিট্টোর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল সে, আর স্কচে লম্বা একটা চুমুক দিল।
কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে চোখ ফেরাল সে, এলাইনের উদ্দেশে লেখা বিদায়ী চিঠিটার কথা মনে পড়ল, আজ সকালে সেলিটো আর ব্যাংকস যখন বাধা দিয়েছিল, তখন ওটাই লিখছিল সে। আরো কিছু চিঠি লেখার ইচ্ছা ছিল তার। পিট টেলর, স্পাইনাল কর্ড ট্রমা স্পেশালিস্টের চিঠিটাই ফেলে রেখেছিল সে।
বেশিরভাগ সময় টেলর আর রাইম রোগীর অবস্থা নিয়ে নয়, কথা বলত মৃত্যু নিয়ে। স্বেচ্ছামৃত্যুর ঘোর বিরোধী ডাক্তার। রাইমের মনে হলো তাকে একটা চিঠি লিখে জানানো উচিত কেন সে আত্মহত্যার পথই বেছে নিয়েছে।
আর অ্যামেলিয়া স্যাক্স? പোর্টেবলস ডটারও একটা চিঠি পাবে, ঠিক করল সে।
পঙ্গুরা উদার, পঙ্গুরা দয়ালু, পঙ্গুরা লোহার মতো দৃঢ়চরিত্রের… পঙ্গুরা ক্ষমাশীল।
প্রিয় অ্যামেলিয়া/আমার প্রিয় অ্যামেলিয়া/অ্যামেলিয়া/প্রিয় অফিসার স্যাক্স, একসাথে কাজ করে আনন্দ পেয়েছি। তাই এই সুযোগে একটা কথা জানিয়ে দেই। তোমাকে আমি বিশ্বাসঘাতক জুডাস মনে করলেও মনে মনে ক্ষমা করে দিয়েছি। তদুপরি মিডিয়ার পা-চাটা গোলাম হিসেবে তোমার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের জন্য শুভকামনা রইল…
‘ওর কাহিনি কী, লন? স্যাক্সের।’
‘ওর আগুন মেজাজের কথা জিজ্ঞেস করছ?’
‘বিয়ে করেছে?’
‘উঁহু। অমন চেহারা আর ফিগার, মনে হবে নিশ্চয়ই কোনো সুদর্শন পুরুষ এতদিনে পটিয়ে ফেলেছে। কিন্তু ও ডেটিং পর্যন্ত করে না। শুনেছিলাম বছর কয়েক আগে কারো সাথে সম্পর্ক ছিল, কিন্তু ওসব নিয়ে কখনো কথা বলে না সে।’
তারপর আচমকা গলা নামিয়ে আনল সে। ‘গুঞ্জন হলো, সে নাকি লেসবো। তবে আমি ওসবের কিছু জানি না বাপু—শনিবার রাতে লন্ড্রিম্যাট থেকে মেয়ে পটানোই আমার সামাজিক জীবন। হেই, কাজ হয় কিন্তু। কী আর বলব?’
মৃতদের মায়া ত্যাগ করা শিখতে হবে তোমাকে…
কথাটা বলার সময় মেয়েটার মুখের ভাবের কথা ভাবছিল রাইম। ব্যাপারটা কী ছিল? তারপর তার কথা ভেবে সময় নষ্ট করার জন্য নিজের উপরই রাগ হলো। আর স্কচে বড়সড়ো একটা চুমুক দিল সে।
দরজার বেল বাজল, তারপর সিঁড়িতে পায়ের শব্দ।
দরজার দিকে তাকাল রাইম আর সেলিট্টো। শব্দটা এক লম্বা লোকের বুটের, সিটি-ইস্যু জোধপুর প্যান্ট আর নীল হেলমেট পরা। এনওয়াইপিডি-র এলিট মাউন্টেড পুলিশের একজন। মোটা একটা খাম সেলিট্টোর হাতে ধরিয়ে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল সে।
খামটা খুলল ডিটেকটিভ। ‘দেখো কী এসেছে।’ ও টেবিলের উপর ঢেলে দিল ভেতরের জিনিসপত্র।
বিরক্তি নিয়ে তাকাল রাইম। তিন-চার ডজন প্লাস্টিকের এভিডেন্স ব্যাগ, সবগুলোতে লেবেল সাঁটা। প্রতিটিতে সেলোফেনের টুকরো, বাছুরের হাড়ের প্যাকেট থেকে নেওয়া, যা কিনতে পাঠিয়েছিল তারা ইএসইউ-কে।
‘হাউম্যানের একটা নোট।’ ওটা পড়ল সে: ‘টু: এল. রাইম, এল. সেলিট্টো, ফ্রম: বি. হাউম্যান, টিএসআরএফ।’
‘ওটা আবার কী?’ জানতে চাইল কুপার। পুলিশ ডিপার্টমেন্ট হলো সংক্ষিপ্ত নামের আখড়া। আরএমপি-রিমোট মোবাইল পেট্রোল—মানে স্কোয়াড কার। আইইডি—ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস মানে বোমা। কিন্তু টিএসআরএফ নতুন শুনল।
কাঁধ ঝাঁকাল রাইম।
পড়তে লাগল সেলিট্টো, হাসছে। ‘ট্যাকটিক্যাল সুপারমার্কেট রেসপন্স ফোর্স। বিষয়: ভিল শ্যাঙ্ক বা বাছুরের হাড়। শহরজুড়ে তল্লাশি চালিয়ে ছেচল্লিশ জন সন্দেহভাজন পাওয়া গেছে, যাদের সবাইকে ন্যূনতম বল প্রয়োগে আটক ও নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। আমরা তাদের অধিকার পড়ে শুনিয়েছি এবং অফিসার টি. পি. জিয়ানকার্লোর মায়ের রান্নাঘরের ডিটেনশন ফেসিলিটিতে চালান করে দিয়েছি। জেরা শেষ হলে আধা ডজন সন্দেহভাজনকে আপনাদের জিম্মায় হস্তান্তর করা হবে। সাড়ে তিনশো ডিগ্রিতে তিরিশ মিনিট গরম করুন।’
হেসে উঠল রাইম। তারপর আরো স্কচ পান করল, উপভোগ করল ধোঁয়াটে স্বাদটা। এই একটা জিনিস সে মিস করবে। (যদিও অনুভূতিহীন ঘুমের প্রশান্তিতে, কোনো কিছু কি মিস করা সম্ভব? ঠিক এভিডেন্সের মতো, বেসলাইন স্ট্যান্ডার্ড সরিয়ে নিলে আর ক্ষতির তুলনা করার মতো কিছুই থাকে না; অনন্তকালের জন্য নিরাপদ তুমি।)
নমুনাগুলো ছড়িয়ে দিল কুপার। ‘সেলোফেনের ছেচল্লিশটা স্যাম্পল। প্রতিটা চেইন আর বড় ইনডিপেনডেন্ট দোকান থেকে একটা করে।’
স্যাম্পলগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল রাইম। ক্লাস আইডেন্টিফিকেশনের সম্ভাবনা ভালো। সেলোফেন আলাদা করা বেশ কঠিন। হাড়ের গায়ে পাওয়া টুকরোটা অবশ্য এগুলোর একটার সাথেও হুবহু মিলবে না। কিন্তু যেহেতু মূল কোম্পানিগুলো তাদের সব দোকানের জন্য একই সাপ্লাই কেনে, তাই হয়তো জানা যাবে কোন চেইনশপ থেকে ৮২৩ মাংসটা কিনেছিল। তখন সে কোন পাড়ায় থাকতে পারে তা আন্দাজ করা যাবে। ব্যুরোর ফিজিক্যাল-এভিডেন্স টিমকে কল করা উচিত—
না, না। মনে রেখো: এটা এখন তাদের কেস।
কুপারকে হুকুম দিল রাইম, ‘ওগুলো বেঁধে আমাদের ফেডারেল ভাইদের কাছে পাঠিয়ে দাও।’
কম্পিউটারটা বন্ধ করতে চাইল রাইম, আর তার মাঝেমধ্যে বিগড়ে যাওয়া অনামিকা দিয়ে ভুল বোতাম টিপে দিল। ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে চালু হয়ে গেল স্পিকারফোনটা।
‘শিট,’ বিড়বিড় করল রাইম। ‘যাচ্ছেতাই মেশিন।’
রাইমের হঠাৎ রাগে অস্বস্তি বোধ করল সেলিট্টো, গ্লাসের দিকে তাকিয়ে রসিকতা করল, ‘আরে, লিংক, এত ভালো স্কচ তো তোমাকে চনমনে করার কথা।’
‘উনি চনমনেই আছেন,’ জবাব দিল টম।
***
বিশাল ড্রেনপাইপটার কাছে পার্ক করল সে। ক্যাব থেকে নামতেই পচা পানির গন্ধ পেল, পিচ্ছিল আর ভ্যাপসা। একটা কানাগলিতে আছে তারা। ওয়েস্ট সাইড হাইওয়ে থেকে হাডসন নদী পর্যন্ত বিস্তৃত চওড়া ড্রেনেজ পাইপটার দিকে গেছে সেটা। এখানে কেউ দেখতে পাবে না ওদের।
ক্যাবের পেছনের দিকে এগিয়ে গেল বোন কালেক্টর, বয়স্ক বন্দিটিকে দেখে বেশ মজা পাচ্ছে সে। ঠিক যেমন স্টিম পাইপের সামনে মেয়েটাকে বেঁধে রেখে মজা পেয়েছিল। আর আজ সকালে রেললাইনের পাশে নড়তে থাকা হাতটা দেখে।
তাকিয়ে আছে ভীত চোখগুলোর দিকে। যতটা ভেবেছিল তার চেয়েও বেশি রোগা লোকটা। বেশি পাকা চুল। উশকোখুশকো। চামড়ায় বুড়ো কিন্তু হাড়গুলো তরুণ…
পিছিয়ে গেল লোকটা, সরু বুকের উপর আড়াআড়ি হাত রেখে আত্মরক্ষা করতে চাইছে।
দরজা খুলে লোকটার বুকের হাড়ের উপর পিস্তল চেপে ধরল বোন কালেক্টর।
‘প্লিজ,’ ফিসফিস করে বলল তার বন্দি, কাঁপছে গলা। ‘আমার কাছে বেশি টাকা নেই, কিন্তু যা আছে সব নিয়ে নাও। আমরা এটিএম-এ যেতে পারি। আমি…’
‘বেরোও।’
‘প্লিজ, আমাকে মেরো না।’
মাথা নেড়ে ইশারা করল বোন কালেক্টর। অসহায়ভাবে চারপাশে তাকাল দুর্বল লোকটা, তারপর এগিয়ে এল। গাড়ির পাশে জড়সড়ো হয়ে দাঁড়াল, হাতদুটো এখনো আড়াআড়ি করা, অসহ্য গরমের মধ্যেও কাঁপছে সে।
‘কেন করছ এসব?’
পিছিয়ে এসে পকেট থেকে হাতকড়া বের করল বোন কালেক্টর। মোটা গ্লাভস পরা থাকায় ক্রোম লিংকগুলো খুঁজে পেতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। ওগুলো বের করার সময় তার মনে হলো হাডসন দিয়ে একটা চার-মাস্তুলের জাহাজ পাল তুলে যাচ্ছে। এখানকার উল্টো স্রোত ইস্ট রিভারের মতো অতটা তীব্র নয়, যেখানে পালতোলা জাহাজগুলোর ইস্ট, মন্টগোমারি আর আউট ওয়ার্ড ওয়ার্ফ থেকে উত্তরে যেতে জান বেরিয়ে যেত।
চোখ কুঁচকে তাকাল সে। না, দাঁড়াও…ওটা পালতোলা জাহাজ নয়, একটা কেবিন ক্রুজার, যার সামনের লম্বা ডেকে আয়েশ করছে ইয়াপিরা।
হাতকড়া নিয়ে এগোতেই লোকটা খপ করে তার শার্ট চেপে ধরল। ‘প্লিজ। আমি হাসপাতালে যাচ্ছিলাম। সেজন্যই হাত দেখিয়েছিলাম। বুকে ব্যথা করছে আমার।’
‘চুপ।’
আচমকা বোন কালেক্টরের মুখের দিকে হাত বাড়াল লোকটা, মেছতা-পড়া হাতদুটো দিয়ে তার ঘাড় আর কাঁধ খামচে ধরল শক্ত করে। হলদে নখগুলো যেখানে বিধল সেখান থেকে ব্যথার একটা ঝিলিক ছড়িয়ে পড়ল। রাগে ফেটে পড়ে ভিকটিমের হাত ছাড়িয়ে নিল সে, কর্কশভাবে হাতকড়া পরাল। লোকটার মুখে এক টুকরো টেপ সেঁটে দিয়ে তাকে নুড়িভরা বাঁধের নিচে পাইপের মুখের দিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে চলল বোন কালেক্টর। চার ফুট ব্যাস ওটার। থামল সে, দ্য বোন কালেক্টর।
ভালো করে দেখল বুড়োকে।
তোমাকে হাড় পর্যন্ত নামিয়ে আনা কতই না সহজ। হাড়…ওটা ছোঁয়া। ওটার শব্দ শোনা।
লোকটার হাত তুলে ধরল সে। আতঙ্কিত চোখদুটো চেয়ে আছে, ঠোঁট কাঁপছে। লোকটার আঙুলেরগুলোতে হাত বোলাল বোন কালেক্টর, আঙুলের হাড়গুলো নিজের আঙুলের ফাঁকে টিপল (ইচ্ছা হলো গ্লাভসটা খুলে ফেলতে, কিন্তু সাহস করল না)। তারপর লোকটার তালু তুলে নিজের কানের সাথে জোরে চেপে ধরল।
‘কী-‘
হতভম্ব বন্দির কড়ে আঙুলটা পেঁচিয়ে ধরল তার বাঁ হাত, ধীরে ধীরে টান দিল। অবশেষে কানের এল মট করে হাড় ভাঙার তৃপ্তিদায়ক সেই আওয়াজ।
চিৎকার করে উঠল লোকটা, টেপের আড়াল থেকে অস্ফুটে বেরোল এক চাপা কান্না। তার পরেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সে।
হ্যাঁচকা টানে তাকে দাঁড় করাল বোন কালেক্টর, টলতে থাকা লোকটাকে নিয়ে ঢুকল পাইপের মুখে। গুঁতো দিয়ে সামনে বাড়াল তাকে।
পুরোনো, পচা পিয়ারের নিচে বেরিয়ে এল তারা। জঘন্য একটা জায়গা, পশু আর মাছের পচাগলা লাশে ভরতি, ভেজা পাথরের উপর আবর্জনা, সামুদ্রিক আগাছার ধূসর-সবুজ কাদা। পানির উপর ওঠানামা করছে একদলা শ্যাওলা, যেন এক মেদবহুল প্রেমিক। শহরের বাকি অংশে সন্ধ্যার ভ্যাপসা গরম থাকলেও এখানে মার্চের দিনের মতোই ঠান্ডা। সেনর ওর্তেগা…
ও নদীতে নামিয়ে দিল লোকটাকে, পিয়ারের একটা খুঁটির সাথে হাতকড়া দিয়ে আটকে দিল। কবজিতে ব্রেসলেটটা আবার চেপে দিল শক্ত করে। পানির উপর ফুট তিনেক ভেসে রইল বন্দির ধূসর মুখটা।
পিচ্ছিল পাথর মাড়িয়ে সাবধানে ড্রেনপাইপের দিকে গেল বোন কালেক্টর। ঘুরে এক মুহূর্তের জন্য থামল সে, দেখছে, শুধুই দেখছে। কনস্টেবলরা অন্যদের খুঁজে পেল কি না তা নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না তার। হানা, ট্যাক্সির সেই মহিলা। কিন্তু এ… একে যেন ওরা সময়মতো খুঁজে না পায়, আশা করল সে। আসলে, একদমই না পেলে আরো ভালো। যাতে মাস দুয়েক পর ফিরে এসে সে দেখতে পারে চতুর নদী কঙ্কালটাকে পরিষ্কার করে দিয়েছে কি না।
নুড়িবিছানো রাস্তায় ফিরে মাস্কটা খুলে ফেলল সে, গাড়ি পার্ক করার জায়গার কাছেই রেখে দিল পরবর্তী সিনের ক্রুগুলো। কনস্টেবলদের উপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত সে, তাই এবার লুকিয়ে রাখল ক্রুগুলো। আর একটা বিশেষ চমকও রাখল সাথে। এমন কিছু যা ওদের জন্যই জমিয়ে রেখেছিল সে। ট্যাক্সিতে ফিরে এল এরপর।
মৃদু বাতাস বইছে, সাথে বয়ে আনছে নদীর টক টক গন্ধ। সাথে ঘাসের খসখস শব্দ, আর শহরে সব সময় যেমন থাকে, গাড়ির চাকার শশশশ আওয়াজ।
যেন হাড়ের উপর শিরিষ কাগজ ঘষছে কেউ।
থামল সে, কান পেতে শুনল শব্দটা, মাথা কাত করে তাকিয়ে রইল দালানগুলোর কোটি কোটি বাতির দিকে। যেন উত্তরে প্রসারিত এক আয়তাকার ছায়াপথ।
ঠিক তখনই ড্রেনপাইপের পাশের জগিং পথ ধরে দ্রুত দৌড়ে এল এক মেয়ে। প্রায় ধাক্কাই লেগে যাচ্ছিল তার সাথে। বেগুনি শর্টস আর টপস-পরা রোগা-শ্যামলা মেয়েটা নেচে সরে গেল তার পথ থেকে। হাঁপাতে হাঁপাতে থামল সে, মুখ থেকে ঘাম ঝাড়ল। শরীরটা বেশ ফিট-টানটান পেশি-তবে সুন্দরী নয়। বাঁকানো নাক, চওড়া ঠোঁট, ছোপ ছোপ দাগওয়ালা চামড়া।
কিন্তু তার নিচে…
‘আপনার তো…এখানে পার্ক করা উচিত নয়। এটা জগিংয়ের রাস্তা…’
তার কথা মিলিয়ে গেল, চোখে ফুটে উঠল ভয়। চোখের দৃষ্টি তার মুখ থেকে ট্যাক্সি, তারপর হাতের দলাপাকানো স্কি মাস্কের উপর পড়ল।
টের পেয়ে গেছে সে। হাসল বোন কালেক্টর, মেয়েটার স্পষ্ট কলার বোনের দিকে তাকাল।
ডান গোড়ালিটা সামান্য সরলো মেয়েটার, দৌড় দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু তার আগেই ধরে ফেলল তাকে। ট্যাকল করার জন্য নিচু হলো সে, আর মেয়েটা যখনই চিৎকার করে তাকে আটকানোর জন্য হাত নামাল, বোন কালেক্টর চট করে সোজা হয়ে কনুই দিয়ে গুঁতো মারল তার রগে। বেল্ট দিয়ে চাবুক মারার মতো একটা চটাস শব্দ হলো।
নুড়ির উপর আছড়ে পড়ল সে, জোরে, তারপর স্থির হয়ে গেল।
আতঙ্কিত হয়ে হাঁটু গেড়ে বসল বোন কালেক্টর, কোলে তুলে নিল তার মাথা। গোঙাতে লাগল সে। ‘না, না, না…’ এত জোরে মারার জন্য নিজের উপরই ক্ষেপে গেল খুব। ভেবে কষ্ট পেল যে দড়ির মতো চুল আর সাধারণ চেহারার নিচে হয়তো নিখুঁত একটা খুলি ভেঙে ফেলেছে সে।
***
আরো একটা সিওসি কার্ড পূরণ করে বিরতি নিল অ্যামেলিয়া স্যাক্স। একটু থামল, ভেন্ডিং মেশিন খুঁজে বের করে এক কাপ জঘন্য কফি কিনল। জানালাবিহীন অফিসে ফিরে এসে জড়ো করা আলামতগুলোর উপর চোখ বোলাল সে। এই বীভৎস সংগ্রহটার প্রতি অদ্ভুত এক মায়া অনুভব করল সে। হয়তো এগুলো জোগাড় করতে গিয়ে যে ধকল গেছে তার উপর দিয়ে, সেজন্যই। ব্যথায় টনটন করছে হাড়ের জোড়াগুলো, এখনো শিউরে উঠছে সকালের সেই কবর দেওয়া লাশটার কথা ভেবে। মাথায় আসছে রক্তাক্ত ডালপালার মতো হাতটা, আর টি.জে. কোলফ্যাক্সের ঝুলে থাকা মাংস।
আজকের আগে ফিজিক্যাল এভিডেন্স কথাটার কোনো মানেই ছিল না তার কাছে। এর মানে ছিল অ্যাকাডেমির অলস বসন্তের দুপুরের একঘেয়ে সব লেকচার। অঙ্ক, চার্ট, গ্রাফ, বিজ্ঞান। মৃত সব জিনিস।
না, অ্যামি স্যাক্স হতে চেয়েছিল ‘পিপলস কপ’-মানুষের পুলিশ। বিট টহল দেবে, যারা অপমান করে তাদের পাল্টা জবাব দেবে, নেশাখোরদের ধরবে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ছড়াবে, বাবার মতো। কিংবা পিটিয়ে সোজা করবে ওদের। সুদর্শন নিক কারেলির মতো, পাঁচ বছরের অভিজ্ঞ ভেটেরান, স্ট্রিট ক্রাইমসের স্টার, যে কিনা দুনিয়ার দিকে তাকিয়ে সেই বিশেষ হাসিটা হাসত-‘তোমাদের-কি-কোনো-সমস্যা?’ মার্কা হাসি। ঠিক অমনটাই হতে চেয়েছিল সে।
স্টকইয়ার্ডের সুড়ঙ্গে পাওয়া সেই মচমচে বাদামি পাতাটার দিকে তাকাল সে। ৮২৩ যে ক্লুগুলো রেখে গিয়েছিল তার একটি। আর ঐ আন্ডারওয়্যারটাও। মনে পড়ল এফবিআই তার আগেই ফিজিক্যাল এভিডেন্সগুলো হাতিয়ে নিয়েছে, কুপার টেস্ট শেষ করার আগেই…মেশিনটার নাম যেন কী? ক্রোমাটোগ্রাফ? তুলোয় মাখানো তরলটা কী ছিল কে জানে।
কিন্তু এসব ভাবলেই লিংকন রাইমের কথা মনে পড়ে যায়, আর এই মুহূর্তে ঐ লোকটার কথা একদমই ভাবতে চায় না সে।
বাকি ফিজিক্যাল এভিডেন্সগুলোর ভাউচার করতে শুরু করল সে। প্রতিটি সিওসি কার্ডে বেশ কিছু খালি লাইন থাকে যেখানে এভিডেন্সের জিম্মাদারদের নাম ক্রমানুসারে লেখা হয়, সিন থেকে পাওয়া থেকে শুরু করে ট্রায়াল পর্যন্ত। স্যাক্স আগেও বেশ কয়েকবার এভিডেন্স আনা-নেওয়া করেছে এবং সিওসি কার্ডে তার নামও ছিল। কিন্তু এই প্রথম এ. স্যাক্স, এনওয়াইপিডি ৫৮৮৫ নামটা সবার উপরের স্লটে বসল।
আবারো পাতাভরতি প্লাস্টিকের ব্যাগটা তুলে ধরল সে। সে ছুঁয়েছিল এটা। সে। যে টি.জে. কোলফ্যাক্সকে খুন করেছে। যে মনেল গ্যারগারের মোটা বাহুটা চেপে ধরেছিল আর গভীরভাবে কেটে দিয়েছিল। যে এখন বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে আরেকজন ভিকটিমের খোঁজে-যদি-না এরই মধ্যে কাউকে তুলে নিয়ে থাকে। যে আজ সকালে ঐ বেচারাকে জ্যান্ত কবর দিয়েছে, যে কিনা করুণার ভিক্ষা চেয়ে হাত নেড়েছিল কিন্তু পায়নি।
লোকার্ডস এক্সচেঞ্জ প্রিন্সিপলের কথা ভাবল সে। দুজন মানুষ সংস্পর্শে এলে একে অপরের কাছে কিছু না কিছু বদল করে। বড় কিছু, ছোট কিছু। খুব সম্ভবত তারা নিজেরাও জানে না সেটা কী। ৮২৩-এর কিছু কি লেগে আছে এই পাতায়? চামড়ার কোষ? এক ফোঁটা ঘাম? চিন্তাটা চমকে দেওয়ার মতো। উত্তেজনা আর ভায়ের একটা শিহরন খেলে গেল শরীরে, যেন এই দম বন্ধ করা ছোট্ট ঘরটায় তার সাথেই আছে খুনিটা।
আবার সিওসি কার্ডে মন দিল। দশ মিনিট ধরে লিখল সে, শেষ কার্ডটা যখন প্রায় শেষ করে এনেছে, তখনই দড়াম করে খুলে গেল দরজাটা। দেখে চমকে উঠল সে। ঘুরে দাঁড়াল।
দরজায় দাঁড়িয়ে ফ্রেড ডেলরে, সবুজ জ্যাকেটটা খুলে ফেলেছে, কড়কড়ে শার্টটা কুঁচকে গেছে। কানের পেছনে গোঁজা সিগারেটটা আঙুল দিয়ে টিপছে। ‘মিনিট দুয়েকের জন্য ভেতরে এসো, অফিসার। ফল পাওয়ার সময় হয়েছে। ভাবলাম তুমি হয়তো থাকতে চাইবে।’
ছোট্ট করিডর ধরে তাকে অনুসরণ করল স্যাক্স, তার লম্বা পা ফেলার সাথে তাল মেলাতে দুই কদম পিছিয়ে রইল।
‘এফিস রেজাল্ট আসছে,’ বলল ডেলরে।
ওয়ার রুম আগের চেয়েও বেশি ব্যস্ত। জ্যাকেটবিহীন এজেন্টরা ডেস্কের উপর ঝুঁকে আছে। অন-ডিউটি অস্ত্র ঝুলছে সবার কোমরে-বড়সড়ো সিগ-সাউয়ার আর স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন অটোমেটিক, টেন এমএম আর পয়েন্ট ফোর-ফাইভ। অপটি-স্ক্যানের পাশে রাখা কম্পিউটার টার্মিনালটা ঘিরে আছে জনা ছয়েক এজেন্ট।
ডেলরে যেভাবে তাদের হাত থেকে কেসটা ছিনিয়ে নিয়েছে সেটা পছন্দ হয়নি স্যাক্সের, কিন্তু স্বীকার করতেই হবে যে ঐ বাচাল হিপস্টারের খোলসের নিচে ডেলরে আসলে জাঁদরেল এক পুলিশ। তরুণ আর বয়স্ক এজেন্টরা তার কাছে প্রশ্ন নিয়ে আসছে আর ধৈর্য ধরে জবাব দিচ্ছে সে। ক্র্যাডল থেকে ফোন তুলে ওপাশের লোকটাকে তোষামোদ বা ধমক দিয়ে দরকারি কাজটা আদায় করে নিচ্ছে। মাঝে মাঝে ব্যস্ত ঘরটার দিকে তাকিয়ে হুংকার ছাড়ছে, ‘আমরা কি এই পিশাচটাকে ধরতে যাচ্ছি? হ্যাঁ, বাজি ধরে বলতে পারি যাচ্ছি।’ আর নিয়মনিষ্ঠরা তার দিকে অস্বস্তি নিয়ে তাকালেও মনে মনে ভাবছে যে যদি কেউ হারামজাদাটাকে ধরতে পারে তবে সে ডেলরেই।
‘এই যে এসে গেছে!’ হাঁক দিল এক এজেন্ট।
ধমকে উঠল ডেলরে, ‘নিউ ইয়র্ক, জার্সি আর কানেকটিকাট ডিএমভি-তে ওপেন লাইন চাই। কারেকশন আর প্যারোল। আইএনএস-ও। ওদের বলো ইনকামিং আইডি রিকোয়েস্টের জন্য তৈরি থাকতে। বাকি সব হোল্ডে রাখো।’
দলছুট হয়ে ফোন করতে শুরু করল এজেন্টরা। ভরে উঠল কম্পিউটার স্ক্রিন। ডেলরে যে আসলেই ফিঙ্গার ক্রস করে রেখেছে, না দেখলে বিশ্বাস করত না স্যাক্স। পিনপতন নীরবতা নেমে এল ঘরে।
‘পেয়েছি!’ চিৎকার করে উঠল কিবোর্ডে থাকা এজেন্ট।
‘আর কোনো আনসাব নয়,’ সুর করে গেয়ে উঠল ডেলরে, ঝুঁকে পড়ল স্ক্রিনের উপর। ‘সবাই শোনো। নাম পাওয়া গেছে: ভিক্টর পিটর্স। জন্ম এখানেই, ১৯৪৮ সালে। বাবা-মা বেলগ্রেডের। অর্থাৎ, সার্বিয়ান কানেকশন। আইডি দিয়েছে নিউ ইয়র্ক ডি অফ সি। ড্রাগ, মারামারি আর প্রাণঘাতী অস্ত্র দিয়ে হামলার দায়ে জেল খেটেছে। দুবার সাজা হয়েছে। ওকে, এটা শোনো-মানসিক রোগের ইতিহাস আছে, তিনবার জোর করে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। বেলভিউ আর ম্যানহাটন সাইকিয়াট্রিক। শেষবার ছাড়া পেয়েছে তিন বছর আগে। শেষ জানা ঠিকানা ওয়াশিংটন হাইটস।’
মুখ তুলল সে। ‘ফোন কোম্পানি দেখছে কে?’
হাত তুলল কয়েকজন এজেন্ট।
‘ফোন লাগাও,’ হুকুম দিল ডেলরে।
अंतহীন পাঁচটা মিনিট।
‘নেই। নিউ ইয়র্ক টেলিফোনে কোনো লিস্টিং নেই।’
‘জার্সিতেও কিছু নেই,’ প্রতিধ্বনি করল আরেক এজেন্ট।
‘কানেকটিকাট নেগেটিভ।’
‘ধুর বাল,’ বিড়বিড় করল ডেলরে। ‘নামগুলো উল্টেপাল্টে দেখো। ভ্যারিয়েশন ট্রাই করো। আর দেখো গত এক বছরে বিল না দেওয়ায় লাইন কাটা গেছে কি না।’
মিনিটখানেক ধরে গলার স্বর জোয়ার-ভাটার মতো ওঠানামা করল। পাগলের মতো পায়চারি করছে ডেলরে, স্যাক্স বুঝতে পারল কেন এরকম হাড়গিলে দশা ওর।
হঠাৎ চিৎকার করে উঠল এক এজেন্ট, ‘পেয়েছি!’ সবাই ঘুরে তাকাল।
‘নিউ ইয়র্ক ডিএমভি-র সাথে আছি,’ বলল আরেক এজেন্ট। ‘ওরা পেয়েছে। এই তো আসছে…লোকটা ক্যাব চালায়। হ্যাক লাইসেন্স আছে।’
‘শুনে অবাক হলাম না কেন,’ বিড়বিড় করল ডেলরে। ‘আগেই বোঝা উচিত ছিল। সুখের পায়রা থাকে কোথায়?’
‘মর্নিং সাইড হাইটস। নদী থেকে এক ব্লক দূরে।’ এজেন্ট ঠিকানাটা লিখে কাগজটা উচিয়ে ধরল, ছোঁ মেরে নিয়ে নিল ডেলরে। ‘এলাকাটা চিনি। বেশ নির্জন। নেশাখোরদের আড্ডা।’
আরেক এজেন্ট ঠিকানাটা তার কম্পিউটারে টাইপ করল। ‘ওকে, দলিল চেক করছি… পুরোনো বাড়ি। ব্যাংকের কাছে টাইটেল আছে। ভাড়া থাকে নিশ্চয়ই।’
‘এইচআরটি লাগবে?’ ব্যস্ত রুমের ওপাশ থেকে জানতে চাইল এক এজেন্ট। ‘কোয়ান্টিকো লাইনে আছে।’
‘সময় নেই,’ ঘোষণা করল ডেলরে। ‘ফিল্ড অফিসের সোয়াট ব্যবহার করো। তৈরি হতে বলো।’
স্যাক্স জিজ্ঞেস করল, ‘আর পরের ভিকটিম?’
‘কীসের পরের ভিকটিম?’
‘সে এর মধ্যেই কাউকে তুলে নিয়েছে। ও জানে ঘণ্টা দুয়েক আগেই আমরা কুগুলো পেয়েছি। এতক্ষণে ভিকটিমকে কোথাও প্ল্যান্ট করে ফেলেছে সে।’
‘মিসিং রিপোর্ট নেই কোনো,’ বলল এজেন্ট। ‘আর যদি তুলেও থাকে, তবে সম্ভবত নিজের বাড়িতেই রেখেছে।’
‘না, রাখবে না।’
‘কেন নয়?’
‘প্রচুর ফিজিক্যাল এভিডেন্স লেগে যাবে গায়ে,’ বলল সে। ‘লিংকন রাইম বলেছে ওর সেফ হাউজ আছে।’
‘বেশ, তাহলে ওর পেট থেকেই কথা বের করব আমরা।’
আরেক এজেন্ট বলল, ‘আমরা খুব ভালো খাতিরযত্ন করতে পারি।’
‘চলো এবার,’ ডাক দিল ডেলরে। ‘ইয়ো, সবাই শোনো, অফিসার অ্যামেলিয়া স্যাক্সকে ধন্যবাদ দাও। ও-ই প্রিন্টটা খুঁজে বের করে তুলে এনেছিল।’
কান গরম হয়ে গেল তার। টের পেল, ওর ঘৃণা হচ্ছে নিজের প্রতি। কিন্তু আটকাতে পারল না। নিচের দিকে তাকাতেই জুতোর উপর অদ্ভুত দাগ দেখতে পেল। চোখ কুঁচকে দেখল, এখনো রাবার ব্যান্ডগুলো পরে আছে সে।
মুখ তুলে দেখল একঘর ভাবলেশহীন ফেডারেল এজেন্ট অস্ত্র চেক করছে আর দরজার দিকে এগোচ্ছে, যাওয়ার সময় তার দিকে তাকাচ্ছে। ঠিক যেভাবে কাঠুরেরা কাঠের গুঁড়ির দিকে তাকায়, সেভাবে।
