অধ্যায় পঁয়ত্রিশ
পরদিন সকালে আবারো একা হয়ে পড়ল লিংকন রাইম। কেনাকাটা করতে গেছে টম, মেল কুপার ডাউনটাউনে আইআরডি ল্যাবে। ইস্ট ভ্যান ব্রেভোর্টের ম্যানশন আর স্যাক্সের বাসায় ক্রাইম সিনের কাজ শেষ করেছে ভিন্স পেরেত্তি। খুব সামান্য পাওয়া গেছে। তবে এর জন্য পেরেত্তির অযোগ্যতার চেয়ে আনসাবের চাতুর্যকেই দায়ী করল রাইম। ক্রাইম সিন রিপোর্টের অপেক্ষায় আছে সে। তবে ডবিন্স আর সেলিটো দুজনেই মনে করছে যে ৮২৩ আপাতত গা ঢাকা দিয়েছে। গত বারো ঘণ্টায় পুলিশের উপর আর কোনো হামলা হয়নি, নতুন করে কেউ নিখোঁজও হয়নি। স্যাক্সের পাহারাদার-মিডটাউন সাউথের এক বিশালবপু পেট্রোল অফিসার-তাকে নিয়ে ব্রুকলিনের এক হাসপাতালে গেছে, নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞকে দেখাতে; মাটি গেলায় গলার বারোটা বেজে গেছে তার।
রাইমের নিজেরও এক দেহরক্ষী আছে-টোয়েন্টিয়েথ প্রিসিংকটের এক ইউনিফর্ম-পরা পুলিশ, টাউনহাউজের সামনে পাহারায় আছে সে। বছরের পর বছর ধরে চেনে তাকে রাইম। আইরিশ নাকি স্কটিশ হুইস্কি সেরা, তা নিয়ে সব সময় তর্কে মাতে দুজন। মেজাজটা ফুরফুরে রাইমের। ইন্টারকমে নিচের তলায় কল দিল সে। ‘ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে এক ডাক্তার আসবে। তাকে উপরে পাঠিয়ে দিও।’ দেবে বলল পুলিশটি।
ডাক্তার উইলিয়াম বার্জার কথা দিয়েছে আজ ঠিক সময়েই আসবে। বালিশে মাথা এলিয়ে দিল রাইম, খেয়াল করল পুরোপুরি একা নয় সে। জানালার কার্নিশে পায়চারি করছে বাজপাখিগুলো। সচরাচর এমন ছটফট করে না ওরা, মনে হলো যেন চিন্তিত। আরেকটা নিম্নচাপ আসছে। রাইমের জানালায় আকাশটা শান্ত দেখালেও পাখিদের বিশ্বাস করে সে; অব্যর্থ ব্যারোমিটার ওরা।
| আনসাব ৮২৩ | |||
| চেহারা | বাসা | গাড়ি | অন্যান্য |
| • শ্বেতাঙ্গ পুরুষ, হালকা গড়ন, মধ্যম স্বাস্থ্য • পোশাক: কালো, গাঢ় রঙের পোশাক পরে • পুরোনো গ্লাভস, লালচে কিডস্কিন • আফটারশেভ (অন্য কোনো গন্ধ ঢাকার জন্য?) • স্কি মাস্ক? নেভি ব্লু? • গাঢ় রঙের গ্লাভস • আফটারশেভ-ব্রুট • চুলের রং বাদামি নয় • তর্জনিতে গভীর ক্ষত • ক্যাজুয়াল পোশাক পরে • গ্লাভসের রং কালো | • সম্ভবত সেফ হাউজ আছে • সম্ভাব্য অবস্থান: ব্রডওয়ে ও ৮২তম স্ট্রিট (শপরাইট) • গ্রিনউইচ ও ব্যাংক স্ট্রিট (শপরাইট) • ৮ম এভিনিউ ও ২৪তম স্ট্রিট (শপরাইট) • হিউস্টন ও লাফায়েট স্ট্রিট (শপরাইট) • পুরোনো বিল্ডিং, গোলাপি মার্বেল • শত বছরের পুরোনো ম্যানশন অথবা প্রতিষ্ঠান • লোয়ার ইস্ট সাইডে অবস্থিত ফেডারেল-স্টাইল বিল্ডিং • প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটের আশেপাশে অবস্থিত | • হলুদ ক্যাব • নতুন মডেলের সেডান • রং: ধূসর/রুপালি/বেইজ • রেন্টাল কার: সম্ভবত চুরি করা • হার্টজ, সিলভার টরাস, এই বছরের মডেল | • ক্রাইম সিন প্রসিডিউর সম্পর্কে জানে • সম্ভবত আগের ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে • ফিঙ্গারপ্রিন্ট অ্যানালাইসিস জানে • পিস্তল = .৩২ কোল্ট • ভিকটিমকে অদ্ভুতভাবে বাঁধে • প্রাচীন জিনিস তাকে টানে • কাজ চালানোর মতো জার্মান জানে • একজন ভিকটিমকে ‘হ্যানা’ বলে ডেকেছে • মাটির নিচের দুনিয়া তার কাছে আকর্ষণীয় • দ্বৈত ব্যক্তিত্ব • সে একজন যাজক, সমাজকর্মী বা কাউন্সিলর হতে পারে • জুতোর তলায় অস্বাভাবিক ক্ষয় • প্রচুর বই পড়ে? • ভিকটিমের আঙুল ভাঙার শব্দ শুনেছে, তদন্তকারীদের ভ্যাংচানোর জন্য সাপ রেখে গেছে • ভিকটিমের পা ছিলার ইচ্ছা ছিল • ভিকটিমকে “ম্যাগি” নামে ডেকেছে • মা ও সন্তানের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা? • ক্রাইম ইন ওল্ড নিউ ইয়র্ক বইটা কি তার মডেল? • জেমস স্লাইডার বা বোন ‘কালেক্টর’-এর কায়দায় অপরাধ করছে • পুলিশের প্রতি ঘৃণা আছে |
দেয়ালঘড়ির দিকে তাকাল সে। সকাল এগারোটা। দুদিন আগের মতোই বার্জারের অপেক্ষায় আছে। জীবনটা এমনই, ভাবল সে। কেবলই পিছিয়ে যাওয়া, কিন্তু শেষমেশ, কপাল ভালো থাকলে, যেখানে পৌঁছানোর কথা সেখানেই পৌঁছে যাই আমরা।
মিনিট বিশেক টিভি দেখল সে, কিডন্যাপিংয়ের খবরের আশায় চ্যানেল ঘুরাল। কিন্তু সব চ্যানেলেই ইউএন কনফারেন্সের উদ্বোধনী দিনের বিশেষ খবর চলছে। বিরক্ত হয়ে ম্যাটলক-এর পুনঃপ্রচার দেখল কিছুক্ষণ, তারপর ইউএন হেডকোয়ার্টারের সামনে দাঁড়ানো এক সুন্দরী সিএনএন রিপোর্টারকে দেখে ‘ধুর’ বলে বন্ধ করে দিল টিভিটা।
ফোন বাজতেই অনেক কসরত করে রিসিভ করল সে। ‘হ্যালো।’
একটু বিরতি দিয়ে ওপাশ থেকে এক পুরুষের গলা ভেসে এল, ‘লিংকন?’
‘বলছি?’
‘জিম পোলিং। কেমন আছ?’
রাইম খেয়াল করল গতকাল ভোরের পর থেকে ক্যাপ্টেনের সাথে খুব একটা দেখা হয়নি তার, কেবল গত রাতের সংবাদ সম্মেলনে মেয়র আর চিফ উইলসনকে ফিসফিস করে কিছু পরামর্শ দিতে দেখেছিল।
‘ভালোই। আমাদের আনসাবের কোনো খবর আছে?’ জানতে চাইল রাইম।
‘এখনো না। তবে ধরে ফেলব।’ আরেকটু বিরতি। ‘হেই, একা নাকি তুমি?’
‘হ্যাঁ।’
আরেকটু লম্বা বিরতি।
‘একটু আসব? অসুবিধা হবে?’
‘এসো।’
‘আধঘণ্টা?’
‘আমি তো আছিই,’ হাসিখুশি গলায় বলল রাইম।
পুরু বালিশে মাথাটা এলিয়ে দিল সে, চোখ চলে গেল প্রোফাইল পোস্টারের পাশে ঝুলতে থাকা গিঁট দেওয়া দড়িটার দিকে। গিটটার কোনো কূল-কিনারা করা গেল না। এটা একটা ‘আলগা সুতো’। কৌতুকটা করে নিজের মনেই হাসল সে। কেসটা অসমাপ্ত রেখে যাওয়ার কথা ভাবতেই খারাপ লাগছে তার, বিশেষ করে গিটটা কী ধরনের তা না জенেই। তারপর মনে পড়ল পোলিং তো মৎস্যশিকারি। হয়তো সে চিনতে পারবে-
পোলিং, ভাবল রাইম। জেমস পোলিং…
ব্যাপার্টা অদ্ভুত, কীভাবে ক্যাপ্টেন জেদ ধরেছিল যে রাইমকেই কেসটা দেখতে হবে। কীভাবে সে লড়াই করেছিল তাকে কেসে রাখার জন্য, পেরেত্তির বদলে-যে কিনা পোলিংয়ের জন্য রাজনৈতিকভাবে অনেক নিরাপদ চয়েস হতো। মনে পড়ল, ডেলরে যখন এনওয়াইপিডি-র হাত থেকে তদন্তটা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, তখন কী পরিমাণ রেগে গিয়েছিল সে। এখন ভাবলে মনে হয়, এই কেসে পোলিংয়ের জড়িয়ে পড়ার পুরো ব্যাপারটাই রহস্যজনক। ৮২৩ এমন কোনো আসামি নয় যার দায়িত্ব কেউ সেধে কাঁধে নেবে। এমনকি সে যদি নিজের রেকর্ড ভারী করার জন্য ভালো কেস খুঁজেও বেড়ায়, তবুও। ভিকটিম হারানোর ঝুঁকি বড্ড বেশি, প্রেস আর উপরমহলের কাছে নাস্তানাবুদ হওয়ার সুযোগও প্রচুর।
পোলিং… হুটহাট রাইমের বেডরুমে ঢুকে পড়ে, কাজের অগ্রগতি দেখে চলে যায়। মেয়র আর চিফকে রিপোর্টও করছিল অবশ্য। কিন্তু-হঠাৎ একটা চিন্তা উঁকি দিল রাইমের মাথায়-পোলিং কি অন্য কাউকেও রিপোর্ট করছিল? এমন কেউ যে তদন্তের উপর নজর রাখতে চায়? খোদ আনসাব? কিন্তু ৮২৩-এর সাথে পোলিংয়ের কী সম্পর্ক থাকতে পারে? ব্যাপারটা-
এবং তারপরই মাথায় এল চিন্তাটা। পোলিংই কি আনসাব?
অবশ্যই না। ব্যাপারটা হাস্যকর। আজগুবি। মোটিভের কথা বাদ দিলেও সুযোগের প্রশ্নটা থেকেই যায়। কয়েকটা কিডন্যাপিংয়ের সময় তো ক্যাপ্টেন এখানেই ছিল, রাইমের ঘরে… নাকি ছিল না?
প্রোফাইল চার্টটার দিকে তাকাল রাইম। কালো পোশাক আর কুঁচকানো সুতি প্যান্ট। গত কয়েক দিন ধরে পোলিং কালো রঙের স্পোর্টস পোশাকই পরছে। তাতে কী?
আরো অনেকেই তো-
নিচতলায় দরজা খোলার আর বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
‘টম?’
কোনো উত্তর নেই। সহকারীর ফিরতে এখনো কয়েক ঘণ্টা বাকি।
‘লিংকন?’
ওহ, নো। হেল। ইসিইউ-তে ডায়াল করতে শুরু করল সে। ৯-১-
চিবুকের ধাক্কায় কার্সারটা ২-এর ঘরে চলে গেল।
সিঁড়িতে পায়ের শব্দ।
রি-ডায়াল করার চেষ্টা করল সে, কিন্তু মরিয়া হয়ে নড়তে গিয়ে জয়স্টিকটা নাগালের বাইরে ঠেলে দিল।
তখুনি ঘরে ঢুকল জিম পোলিং। রাইম ভেবেছিল পাহারাদার পুলিশটা অন্তত আগে উপরে ফোন করবে। কিন্তু একজন বিট পুলিশ তো আর একজন পুলিশ ক্যাপ্টেনকে আটকাবে না। পোলিংয়ের কালো জ্যাকেটটা খোলা, কোমরে গোঁজা自动 পিস্তলটা দেখতে পেল রাইম। ইস্যু করা অস্ত্র কি না বোঝা গেল না। তবে সে জানে পয়েন্ট থ্রি-টু কোল্ট এনওয়াইপিডি-র অনুমোদিত ব্যক্তিগত অস্ত্রের তালিকায় আছে।
‘লিংকন,’ বলল পোলিং। স্পষ্টতই অস্বস্তিতে আছে সে, সতর্ক। তার চোখ পড়ল টেবিলের উপর রাখা মেরুদণ্ডের হাড়ের সাদা টুকরোটার উপর।
‘কেমন আছ, জিম?’ জানতে চাইল সে।
‘মন্দ না।’
শিকারি পোলিং। আঙুলের ছাপের ঐ কাটা দাগটা কি বছরের পর বছর ছিপ ফেলার সময় হয়েছে? নাকি শিকারি ছুরি দিয়ে কোনো দুর্ঘটনার ফল? দেখার চেষ্টা করল রাইম, কিন্তু পকেটে হাত ঢুকিয়ে রেখেছে পোলিং। কী ধরে আছে ওখানে? ছুরি?
পোলিং ফরেনসিক আর ক্রাইম সিন সম্পর্কে ভালোই জানে। কীভাবে এविडেন্স না রেখে কাজ সারতে হয় তা তার নখদর্পণে। স্কি মাস্ক? পোলিং যদি আনসাব হয়, তবে অবশ্যই তাকে মাস্ক পরতে হবে, যাতে কোনো ভিকটিম পরে তাকে চিনতে না পারে। আর ঐ আফটারশেভ… হয়তো আনসাব ওটা ব্যবহারই করে না। শুধু সাথে একটা বোতল রেখে ঘটনাস্থলে স্প্রে করে দিয়ে আসে, যাতে সবাই ভাবে সে ব্রুট মাখে! তাই পোলিং যখন এখানে আসবে, তার গা থেকে কোনো গন্ধ না এলেও কেউ সন্দেহ করবে না।
‘একা তুমি?’ পোলিং জিজ্ঞেস করল।
‘আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট-‘
‘নিচের পুলিশটা বলল ও ফিরতে দেরি করবে।’
ইতস্তত করল রাইম। ‘হ্যাঁ।’
পোলিং হালকা গড়নের কিন্তু গায়ে জোর আছে, বালুরঙা চুল। টেরি ডবিন্সের কথাগুলো মনে পড়ল: এমন কেউ যে সাহায্যপরায়ণ, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি। সমাজকর্মী, কাউন্সিলর, রাজনীতিবিদ। এমন কেউ যে মানুষকে সাহায্য করে। পুলিশের মতো।
কপালে খারাবি আছে তার, বুঝল রাইম। সেই সাথে অবাক হয়ে খেয়াল করল, সে মরতে চায় না। এভাবে নয়, অন্য কারো হাতে নয়।
বিছানার দিকে এগিয়ে এল পোলিং। তবুও কিছুই করার নেই তার। পুরোপুরি এই লোকটার দয়ার উপর নির্ভরশীল সে।
‘লিংকন,’ গম্ভীর গলায় বলল পোলিং।
চোখে চোখ পড়ল দুজনের, বৈদ্যুতিক সংযোগের মতো একটা অনুভূতি খেলে গেল। শুকনো স্ফুলিঙ্গ। চট করে জানালার বাইরে তাকাল ক্যাপ্টেন। ‘তুমি নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছ, তাই না?’
‘অবাক?’
‘কেন আমি তোমাকে কেসটায় চাইলাম।’
‘ভেবেছিলাম আমার ব্যক্তিত্বের জন্য চেয়েছ,’ বলল সে।
কথাটায় হাসল না ক্যাপ্টেন।
‘কেন আমাকে চেয়েছিলে, জিম?’ জিজ্ঞেস করল রাইম।
ক্যাপ্টেনের আঙুলগুলো পরস্পরের সাথে জট পাকাল। সরু কিন্তু শক্তিশালী। মৎস্যশিকারির হাত-এমন এক খেলা যা দেখতে ভদ্রস্থ হলেও যার উদ্দেশ্য হলো এক বেচারা প্রাণীকে তার ঘর থেকে হ্যাঁচকা টানে বের করে এনে সরু ছুরি দিয়ে তার পেট চিরে ফেলা।
‘চার বছর আগের শেফার্ড কেস। আমরা একসাথে ছিলাম ওটায়।’
মাথা নাড়ল রাইম।
‘কর্মীরা সাবওয়ে স্টপে ঐ পুলিশের লাশ খুঁজে পেয়েছিল।’
একটা গোঙানির শব্দ মনে পড়ল রাইমের, টাইটানিক ডোবার সময় যেমন শব্দ হয়েছিল। তারপর বন্দুকের গুলির মতো বিকট শব্দে বিমটা আছড়ে পড়েছিল তার ঘাড়ের উপর, আর মাটি চাপা পড়েছিল সে।
‘আর তুমি সিনটা চালিয়েছিলে। তুমি নিজে, যেমনটা সব সময় করতে।’
‘চালিয়েছিলাম, হ্যাঁ।’
‘শেফার্ডকে আমরা দোষী সাব্যস্ত করেছিলাম কীভাবে জানো? আমাদের একটা সাক্ষী ছিল।’
সাক্ষী? তার কথা তো শোনেনি রাইম। দুর্ঘটনার পর কেসটার কোনো খবরই রাখেনি সে, শুধু জানত শেফার্ডের সাজা হয়েছিল এবং তিন মাস পর রাইকার্স আইল্যান্ডে এক কয়েদি তাকে ছুরিকাঘাত করে মেরে ফেলেছিল, যাকে আর ধরা যায়নি।
‘একজন প্রত্যক্ষদর্শী,’ বলে চলল পোলিং। ‘সে শেফার্ডকে এক ভিকটিমের বাড়িতে দেখেছিল, খুনে ব্যবহৃত অস্ত্রসহ।’
বিছানার আরো কাছে এগিয়ে এল ক্যাপ্টেন, হাত আড়াআড়ি করে বুকে রাখল।
‘শেষ লাশটা, মানে সাবওয়ের লাশটা পাওয়ার একদিন আগেই আমরা সাক্ষী পেয়েছিলাম। তোমাকে সিনটা প্রসেস করার অনুরোধ পাঠানোর আগেই।’
‘কী বলতে চাইছ, জিম?’
ক্যাপ্টেনের চোখদুটো মেঝেতে গেঁথে রইল।
‘তোমাকে দরকার ছিল না আমাদের। তোমার রিপোর্টের কোনো প্রয়োজন ছিল না।’
কিছু বলল না রাইম।
মাঠা নাড়ল পোলিং। ‘বুঝতে পারছ আমি কী বলছি? ঐ হারামি শেফার্ডকে আমি এত বেশি করে ধরতে চেয়েছিলাম… আমি চেয়েছিলাম কেসটা যেন একেবারে নিশ্চিদ্র হয়। আর তুমি তো জানো লিংকন রাইমের ক্রাইম সিন রিপোর্ট দেখলে ডিফেন্স লয়ারদের কেমন প্যান্ট নষ্ট হয়ে যায়। ভয়ে আধমরা হয়ে যায় ওরা।’
‘কিন্তু সাবওয়ে সিনের রিপোর্ট ছাড়াও তো শেফার্ডের সাজা হতো।’
‘ঠিক তাই, লিংকন। কিন্তু ব্যাপারটা তার চেয়েও খারাপ। এমটিএ ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে আমাকে জানিয়েছিল যে সাইটটা নিরাপদ নয়।’
‘সাবওয়ে সাইটটা। আর তুমি ওটা ঠিক করার আগেই আমাকে দিয়ে কাজ করিয়েছিলে?’
‘শেফার্ড ছিল পুলিশ-খুনি।’ ঘৃণায় মুখ কুঁচকে গেল পোলিংয়ের। ‘ওকে ধরার জন্য আমি পাগল ছিলাম। যা খুশি তাই করতে পারতাম। কিন্তু…’ দুহাতে মাথা নিচু করল সে।
কিছু বলল না রাইম। শুনতে পেল বিমটার গোঙানি, কাঠ ভাঙার সেই বিস্ফোরণ। তারপর তার চারপাশে মাটির ঝুরঝুরে শব্দ। অদ্ভুত এক উষ্ণ প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ল শরীরে। হৃৎপিণ্ডটা ভয়ে লাফাচ্ছে। ‘জিম-‘
‘সেজন্যই এই কেসে তোমাকে চেয়েছিলাম আমি, লিংকন। বুঝলে?’ করুণ একটা ছায়া পড়ল ক্যাপ্টেনের কঠিন মুখে। টেবিলের উপর রাখা মেরুদণ্ডের চাকতিটার দিকে তাকিয়ে রইল সে। ‘আমি শুনছিলাম তোমার জীবনটা নাকি দুর্বিষহ হয়ে গেছে। এখানে পড়ে পড়ে ধুঁকছ তুমি। আত্মহত্যার কথা ভাবছ। আমার এত অপরাধবোধ হতো! চেয়েছিলাম তোমার জীবনটা কিছুটা হলেও ফিরিয়ে দিতে।’
রাইম বলল, ‘আর গত সাড়ে তিন বছর ধরে তুমি এই বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছ।’
‘তুমি আমাকে চেনো, লিংকন। সবাই চেনে। আমি কাউকে ধরলে, সে যদি ট্যাঁ-ফুঁ করে, তবে তার খবর আছে। কোনো আসামির উপর ক্ষেপে গেলে তাকে জেলে না পোরা পর্যন্ত আমি থামি না। নিজেকে সামলাতে পারি না। আমি জানি মাঝেমধ্যে বাড়াবাড়ি করে ফেলি। কিন্তু ওরা আসামি ছিল-অন্তত সন্দেহভাজন। ওরা আমার নিজের লোক ছিল না, পুলিশ ছিল না। তোমার সাথে যা হলো…সেটা পাপ। জঘন্য অন্যায়।’
‘আমি তো আর নবিশ ছিলাম না,’ রাইম বলল। ‘আমি যদি মনে করতাম সিনটা নিরাপদ নয়, তবে কাজটা না-ও করতে পারতাম।’
‘কিন্তু’
‘অসময়ে এলাম?’
দরজা থেকে অন্য একটা গলা ভেসে এল।
তাকাল রাইম, ভাবল বার্জার এসেছে। কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে উঠে এল পিটার টেলর।
আজ তার আসার কথা ছিল, মনে পড়ল রাইমের। ডিসরিফ্লেক্সিয়া অ্যাটাকের পর রোগীকে চেক করার জন্য। সে এও ধরে নিল যে ডাক্তার তাকে বার্জার আর লেথ সোসাইটি নিয়ে আচ্ছামতো ঝাড়বে। ওসব শোনার মুড নেই এখন। একা থাকতে চায় সে-পোলিংয়ের স্বীকারোক্তি হজম করার জন্য। এই মুহূর্তে অনুভূতিটা তার অসাড় উরুর মতোই ভোঁতা হয়ে আছে। তারপরেও বলল, ‘ভেতরে এসো, পিটার।’
‘তোমার সিকিউরিটি সিস্টেমটা বড়ই অদ্ভুত, লিংকন। গার্ড জিজ্ঞেস করল আমি ডাক্তার কি না আর অমনি ছেড়ে দিল। কেন? উকিল আর অ্যাকাউন্ট্যান্টদের কি ঢুকতে দেওয়া হয় না?’
হাসল রাইম। ‘এক সেকেন্ড লাগবে।’ পোলিংয়ের দিকে ফিরল রাইম। ‘ওটা নিয়তি ছিল, জিম। আমার কপালে ওটাই ছিল। ভুল সময়ে ভুল জায়গায় ছিলাম আমি। অমন হয়।’
‘ধন্যবাদ, লিংকন।’ রাইমের ডান কাঁধে হাত রাখল পোলিং, আলতো চাপ দিল।
মাঠা নাড়ল রাইম এবং অস্বস্তিকর কৃতজ্ঞতা এড়াতে দুজনকে পরিচয় করিয়ে দিল। ‘জিম, ইনি পিট টেলর, আমার ডাক্তারদের একজন। আর ইনি জিম পোলিং, আমরা একসাথে কাজ করতাম।’
‘দেখা হয়ে ভালো লাগল,’ ডান হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল টেলর।
ভঙ্গীটা একটু বেশিই আন্তরিক লাগল রাইমের কাছে। ওর চোখ অনুসরণ করল ওদেরকে, কেন যেন টেলরের ডান হাতের তর্জনীতে একটা গভীর বাঁকা কাটা দাগ নজরে পড়ল তার।
‘না!’ চিৎকার করে উঠল রাইম।
‘আপনিও তাহলে পুলিশ।’ পোলিংয়ের হাতটা শক্ত করে ধরে রাখল টেলর, এরপর বাঁ হাতে ধরা ছুরিটা তিনবার ক্যাপ্টেনের বুকে আমূল বসিয়ে দিল। পাঁজরের হাড় এড়িয়ে এত নিখুঁতভাবে ছুরিটা চালাল যেন ও কোনো সার্জন। এমনভাবে, যাতে হাড়ের কোনো ক্ষতি না হয়।
