অধ্যায় দুই
ডানা ঝাপটানোর সংক্ষিপ্ত একটা শব্দ তুলে জানালার কার্নিশে নামল পেরিগ্রিন ফ্যালকনটা। বাইরে আলো ঝলমল করছে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে চলল। বাতাসের অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছে প্রচণ্ড গরম বাইরে।
‘এই তো তুমি,’ ফিসফিস করে বলল লোকটা। তারপর নিচতলার দরজায় কলিং বেলের শব্দ শুনে কান খাড়া করল সে। ‘ও কি এসেছে?’ সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল। ‘এসেছে?’
কোনো জবাব পেল না লিংকন রাইম, তাই জানালার দিকে ফিরল আবার। চট করে মাথা ঘোরাল পাখিটা, হ্যাঁচকা অথচ রাজকীয় একটা ভঙ্গি। রাইম খেয়াল করল, ওটার নখগুলো রক্তাক্ত। কালো শক্ত ঠোঁট থেকে ঝুলছে হলদে এক টুকরো মাংস। খাটো ঘাড়টা বাড়িয়ে দিয়ে বাসার দিকে সরে গেল পাখিটা। ভঙ্গিটা পাখির মতো নয়, বরং সাপের কথা মনে করিয়ে দিল। নীলচে লোমশ ছানার হাঁ করা মুখের ভেতর মাংসের টুকরোটা ফেলে দিল ওটা।
রাইম ভাবল, নিউ ইয়র্ক শহরের একমাত্র প্রাণীটার দিকে তাকিয়ে আছে সে, যার কোনো শত্রু বা শিকারি নেই। হয়তো খোদ ঈশ্বর ছাড়া।
সিঁড়ি ভেঙে কারো উপরে ওঠার শব্দ পেল রাইম। ‘ও কি এসেছিল?’ জিজ্ঞেস করল টমকে।
‘না,’ জবাব দিল ছেলেটা।
‘তাহলে কে? বেল বেজেছিল না?’
টমের চোখ জানালার দিকে। ‘পাখিটা ফিরে এসেছে। দেখুন, জানালার সিলে রক্তের দাগ। দেখতে পাচ্ছেন?’
আস্তে আস্তে দৃষ্টিসীমার মধ্যে এল মাদি ফ্যালকনটা। দেখতে মাছের মতো নীলচে ধূসর, গায়ে রামধনুর আভা। আকাশটা স্ক্যান করে নিচ্ছে মাথা ঘুরিয়ে।
‘ওরা সব সময় একসাথেই থাকে। সারা জীবন কি একটাই সঙ্গী থাকে এদের?’ অবাক হয়ে জানতে চাইল টম। ‘রাজহাঁসের মতো?’
রাইমের চোখ ফিরে এল টমের দিকে। ছিপছিপে কোমর বাঁকিয়ে জানালার ছিটে লাগা কাচের ভেতর দিয়ে পাখির বাসাটা দেখছে সে।
‘কে এসেছিল?’ আবারো জানতে চাইল রাইম। ছেলেটা কথা ঘোরাতে চাইছে বুঝতে পেরে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল তার।
‘একজন ভিজিটর।’
‘ভিজিটর? হাহ!’ নাক দিয়ে শব্দ করল রাইম। শেষ কবে তার এখানে ভিজিটর এসেছিল মনে করার চেষ্টা করল। মাস তিনেক আগে হবে হয়তো। কে ছিল? ঐ রিপোর্টারটা, নাকি কোনো… আচ্ছা, পিটার টেলর, রাইমের স্পাইনাল কর্ড স্পেশালিস্টদের একজন। আর ব্লেইন তো বেশ কয়েকবার এসেছে। তবে তাকে ঠিক ভিজিটর বলা চলে না।
‘খুব ঠান্ডা লাগছে,’ অভিযোগ করল টম। আর তার রিঅ্যাকশন হিসেবে জানালাটা খুলতে গেল সে। তাৎক্ষণিক আরাম। তারুণ্যের ধর্মই এমন।
‘জানালা খুলবে না,’ হুকুম দিল রাইম। ‘আর বলো কোন শালার ব্যাটা শালা এসেছে।’
‘ঠান্ডা লাগছে তো।’
‘পাখিটা বিরক্ত হবে। এসি কমিয়ে দাও। আমিই কমিয়ে দিচ্ছি।’
‘আমরা আগে এসেছি,’ বিশাল জানালার পাল্লাটা আরো খানিকটা তুলে দিয়ে বলল টম। ‘পাখিগুলো জেনেশুনেই আমাদের ডেরায় এসে বাসা গেড়েছে।’
শব্দের চোটে তাকাল ফ্যালকনগুলো, জ্বলজ্বলে চোখ দিয়ে যেন আগুন বেরোচ্ছে। অবশ্য, সব সময়ই এভাবে তাকায় ওরা। কার্নিশেই বসে রইল, যেন রক্তশূন্য গিঙ্কগো গাছ আর রাস্তার উল্টো দিকের পার্কিং লট-এই পুরো রাজত্বের অধীশ্বর ওরাই।
আবারো জিজ্ঞেস করল রাইম। ‘কে এসেছে?’
‘লন সেলিট্টো।’
‘লন?’ এখানে কী মনে করে?
ঘরটার উপর চোখ বোলাল টম। ‘জায়গাটা একদম নোংরা হয়ে আছে।’
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে আদিখ্যেতা পছন্দ নয় রাইমের। ঐ হুটোপুটি, ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের ভটভট আওয়াজ-সবই বিরক্তিকর লাগে তার কাছে। যা আছে তাতেই সে সন্তুষ্ট। এই ঘরটা, যাকে অফিস বলে ডাকে সে, সেন্ট্রাল পার্কের দিকে মুখ করা আপার ওয়েস্ট সাইডের গোথিক টাউনহাউজের দোতলায়। ঘরটা বেশ বড়, বিশ বাই বিশ ফুট, আর তার এক ইঞ্চি জায়গাও খালি নেই। মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে খেলার ছলে ঘরের নানান জিনিসের গন্ধ আলাদা করার চেষ্টা করে সে। হাজার হাজার বই আর ম্যাগাজিন, পিসার হেলানো টাওয়ারকেও হার মানানো ফটোকপির স্তূপ, টিভির গরম ট্রানজিস্টর, ধুলোজমা লাইটবাল্ব আর কর্কের নোটিশ বোর্ড। ভিনাইল, পারঅক্সাইড, ল্যাটেক্স, গৃহসজ্জার কাপড়। তিন রকমের সিঙ্গল-মল্ট স্কচ। বাজপাখির বিষ্ঠা।
‘ওর সাথে দেখা করব না। বলে দাও আমি ব্যস্ত।’
‘সঙ্গে একজন কমবয়সি পুলিশও আছে। আর্নি ব্যাংকস। না, ও তো বেসবল প্লেয়ার ছিল, তাই না? আমাকে ঘরটা পরিষ্কার করতে দেওয়া উচিত আপনার। মানব অভ্যাগমন না হওয়া পর্যন্ত টেরই পাই না জায়গাটা কত নোংরা।’
‘মানব অভ্যাগমন? বাপরে, কী সেকেলে কথাবার্তা! একদম ভিক্টোরিয়ান যুগের। এক কাজ করো, ওকে বলে দাও অতিসত্বর প্রস্থান করতে! উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগের শিষ্টাচার হিসেবে কেমন হলো কথাটা?’
নোংরা… ঘরের কথা বলছিল টম, কিন্তু রাইমের মনে হলো কথাটা এই ছেলে ইঙ্গিতে নিজের বসকেই বলেছে। রাইমের চুলগুলো কুড়ি বছরের যুবকের মতোই কালো আর ঘন-যদিও বয়স তার দ্বিগুণ-কিন্তু অবিন্যস্ত আর জট-পাকানো। ওগুলো ধোয়া আর ছাঁটা দরকার এখনই। মুখে তিন দিনের না কামানো কালো দাড়ি। কানের ভেতরে সুড়সুড়ি নিয়ে ঘুম ভেঙেছে তার, মানে ওখানকার লোমগুলোও ছাঁটতে হবে। হাতের আর পায়ের নখগুলো বড় বড়। তার উপর এক সপ্তাহ ধরে একই পোলকা-ডট দেওয়া জঘন্য পায়জামা পরে আছে সে। পিঙ্গল চোখদুটো ছোট ছোট। ব্লেইন তাকে বহুবার বলেছে চেহারাটা বেশ সুন্দর তার। কখনো আবেগের মুহূর্তে, কখনো বা এমনিই।
‘ওরা আপনার সঙ্গে কথা বলতে চায়,’ বলে চলল টম। ‘বলছে খুবই জরুরি।’
‘বটে, ওদের জন্য হাততালি।’
‘লনের সঙ্গে প্রায় এক বছর দেখা হয়নি আপনার।’
‘তার মানেই যে এখন দেখা করতে হবে, এমন কোনো কথা আছে? পাখিটাকে ভয় দেখাওনি তো? উড়িয়ে দিয়ে থাকলে কিন্তু খবর আছে।’
‘জরুরি, লিংকন।’
‘খুবই জরুরি, মনে আছে তুমি তাই বলেছিলে। ডাক্তারটা কোথায়? ফোন করার কথা ছিল। একটু ঝিমুনি এসেছিল আমার। তুমি ছিলে বাইরে।’
‘সকাল ছয়টা থেকে জেগে আছেন আপনি।’
‘না।’ একটু থামল সে। ‘জেগেছিলাম, হ্যাঁ। কিন্তু তারপর আবার চোখ লেগে এসেছিল। গভীর ঘুমে ছিলাম। মেসেজ চেক করেছ?’
‘হ্যাঁ,’ বলল টম। ‘কিছু জানায়নি।’
‘বলেছিল দুপুরের আগেই আসবে।’
‘বাজে সবে এগারোটা। এখনই এয়ার-সি রেসকিউ টিমকে খবর না দিলেও হয়, কী বলো?’
‘ফোনে ব্যস্ত ছিলে নাকি?’ আচমকা জিজ্ঞেস করল রাইম। ‘হয়তো লাইন এনগেজড পেয়েছিল।’
‘আমি কথা বলছিলাম…’
‘আমি কি বারণ করেছি?’ প্রশ্ন করল রাইম। ‘এখন রেগে যাচ্ছ তুমি। আমি তো বলিনি ফোন করা যাবে না। করতেই পারো। সব সময়েই পারো। আমি শুধু বলতে চাইছি, তুমি যখন ফোনে ছিলে, তখনই হয়তো ট্রাই করেছিল সে।’
‘না, আজ সকাল থেকেই আপনি আমার পিছে লেগে আছেন…’
‘এই তো আসল রূপ বেরিয়ে পড়েছে। জানো, কল ওয়েটিং বলে একটা জিনিস আছে এখন। একসাথে দুটো কল রিসিভ করা যায়। ইশ, আমাদের যদি ওটা থাকত! তা আমার পুরোনো বন্ধু লন কী চায়? আর তার ঐ বেসবল প্লেয়ার বন্ধু?’
‘ওদেরই জিজ্ঞেস করুন।’
‘তুমি বলো।’
‘আপনার সাথে দেখা করতে চায়। এর বেশি কিছু জানি না।’
‘বি-শা-ল জ-রু-রি কোনো ব্যাপার মনে হচ্ছে।’
‘লিংকন।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল টম। সোনালি চুলের ভেতর দিয়ে হাত চালাল। দেখতে বেশ সুন্দর ছেলেটা। তামাটে স্ন্যাকস আর সাদা শার্টের উপর নিখুঁত গিট দেওয়া নীল ফুলের নকশা করা টাই পরে আছে। বছরখানেক আগে যখন টমকে কাজে নিয়েছিল, রাইম বলেছিল চাইলে জিনস আর টি-শার্ট পরেই কাজ করতে পারবে। কিন্তু এক দিনের জন্যও তার পোশাকে কোনো খুঁত দেখা যায়নি। ছোকরাকে কাজে বহাল রাখার পেছনে এটাও একটা কারণ কি না জানে না রাইম, তবে কাজ দিয়েছে সেটা। টমের আগের কেউই ছয় সপ্তাহের বেশি টেকেনি। যারা কাজ ছেড়ে গেছে আর যাদের বরখাস্ত করা হয়েছে, তাদের সংখ্যা একদম সমান সমান।
‘ঠিক আছে, কী বলেছ ওদের?’
‘মিনিট কয়েক সময় দিতে বলেছি ওদের, যাতে আপনি তৈরি হয়ে নিতে পারেন। তবে বেশিক্ষণের জন্য নয়,’ বলল টম।
‘কাজটা করেছ তুমি আমাকে না জিজ্ঞেস করেই। অসংখ্য ধন্যবাদ।’
কয়েক পা পিছিয়ে সিঁড়ির দিকে মুখ করে নিচতলার উদ্দেশে হাঁক দিল টম, ‘চলে আসুন আপনারা।’
‘ওরা তোমাকে কিছু একটা বলেছে, তাই না? আমার কাছে গোপন করছ,’ বলল রাইম।
কোনো জবাব দিল না টম। দুই আগন্তুকের আগমন পথে তাকিয়ে রইল রাইম। ওরা ঘরে ঢুকতেই মুখ খুলল। টমকে বলল, ‘পর্দাটা টেনে দাও। পাখিদের এমনিতেই অনেক বিরক্ত করেছ তোমরা।’
***
বোবা।
আসলে এর মানে হলো, ঐ তিরতিরে রোদে আর পোষাচ্ছে না তার।
মুখের উপর সেই নোংরা, চটচটে টেপ সাঁটা থাকায় একটা কথাও বের করতে পারছে না সে। হাতের কবজিতে মেটাল হ্যান্ডকাফের বাঁধন আর বাইসেপে লোকটার খাটো অথচ শক্ত আঙুলের খামচির চেয়ে এই বোবা হয়ে থাকাটাই বেশি অসহায় করে তুলেছে তাকে। স্কি-মাস্ক পরা সেই ট্যাক্সি ড্রাইভার নোংরা, ভেজা করিডর দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে চলল তাকে, দুপাশে পাইপ আর ডাক্টের সারি। কোনো এক অফিস বিল্ডিংয়ের বেসমেন্টে রয়েছে তারা। জায়গাটা কোথায়, কোনো ধারণাই নেই তার।
যদি ওর সঙ্গে কথা বলতে পারতাম…টি.জে. কোলফ্যাক্স ঝানু খেলোয়াড়, মর্গান স্ট্যানলির থার্ড ফ্লোরে তার চাকরিস্থল। ডাকসাইটে নেগোশিয়েটর।
‘টাকা? টাকা চাই তোমার? আমি ব্যবস্থা করে দেবো, অনেক অনেক টাকা পাবে। বস্তাভরতি।’
মনে মনে ডজনখানেক বার আউড়ে গেল কথাটা, চেষ্টা করল লোকটার চোখে চোখ রাখার, যেন তাকিয়েই শব্দগুলো ওর মগজে ঢুকিয়ে দিতে পারে।
প্লিজ… মনে মনে মিনতি করল সে। ভাবল, কীভাবে তার চার লাখ ডলারের ফান্ড ভাঙাবে আর রিটায়ারমেন্টের সব টাকা দিয়ে দেবে লোকটাকে।
ওহ, প্লিজ… গত রাতের কথা মনে পড়ল তার: আতশবাজির দিক থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল লোকটা, ক্যাব থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়েছিল ওদের, পরিয়ে দিয়েছিল হাতকড়া। এরপর ওদের ট্রাংকে ছুঁড়ে ফেলে আবার চলতে শুরু করেছিল গাড়ি। প্রথমে এবড়োথেবড়ো ইট আর ভাঙা পিচঢালা রাস্তা, তারপর মসৃণ পথ, এরপর আবার ভাঙাচোরা রাস্তা। ব্রিজের উপর চাকার সাঁ-সাঁ আওয়াজ শুনতে পেয়েছিল সে। আরো কয়েকটা বাঁক, আরো খারাপ রাস্তা। অবশেষে ক্যাবটা থামল, নেমে কোনো একটা গেট বা দরজা খুলল ড্রাইভার। মনে হলো কোনো গ্যারেজে ঢুকেছে গাড়িটা। শহরের সব কোলাহল থেমে গেল আচমকা, ভটভট করতে থাকা একজস্টের শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশের দেয়াল।
এরপর ট্রাংকের ডালা খুলে তাকে বের করে আনল লোকটা। হ্যাঁচকা টানে আঙুল থেকে হীরের আংটিটা খুলে পকেটে পুরল। তারপর তাকে নিয়ে হাঁটা দিল ভূতুড়ে সব মুখ আঁকা দেয়ালের পাশ দিয়ে। ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া ছবিতে বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে কসাই, শয়তান আর তিনটা দুঃখী শিশু; পলেস্তারা খসে পড়া দেয়ালে আঁকা ওগুলো। টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেল ভ্যাপসা এক বেসমেন্টে, ফেলে রাখল মেঝের উপর। দুমদাম পা ফেলে উপরে চলে গেল সে, ওকে রেখে গেল অন্ধকারে। চারপাশে পচা মাংস আর আবর্জনার গন্ধে নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসছিল ওর। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওভাবেই পড়ে ছিল সে, সময় কেটেছে ঘুমিয়ে আর কেঁদে। আচমকা বিকট এক শব্দে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল তার। তীব্র বিস্ফোরণ হলো, খুব কাছেই। তারপর আবার সেই অস্থির ঘুম।
আধা ঘণ্টা আগে তাকে নিতে আবার এসেছিল লোকটা। ট্রাংকে তুলে ড্রাইভ করল আরো বিশ মিনিট। চলে এল এখানে। জায়গাটা যেখানেই হোক না কেন।
এবার একটা আবছা অন্ধকার বেসমেন্টের ঘরে ঢুকল তারা। মাঝখানে মোটা কালো একটা পাইপ। ওটার সাথে হাতকড়া দিয়ে তাকে আটকে দিল লোকটা। তারপর দুই পা ধরে হ্যাঁচকা টানে সোজা করে ছড়িয়ে দিল সামনে, বসিয়ে দিল মেঝের উপর। উবু হয়ে বসে সরু দড়ি দিয়ে তার পাদুটো বাঁধল সে। বেশ কয়েক মিনিট লাগল তাতে। হাতে চামড়ার গ্লাভস পরা লোকটার। কাজ শেষে উঠে দাঁড়াল, দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে, নিচু হয়ে ছিঁড়ে ফেলল তার জামা।
তার পেছনের দিকে চলে গেল লোকটা। ভয়ে শ্বাস আটকে এল তার, কাঁধের উপর অনুভব করল লোকটার হাত, খুঁটিয়ে দেখছে, চাপ দিচ্ছে কাঁধের হাড়ে। টেপের আড়ালে ককিয়ে উঠল সে, মিনতি করছে। নিজের নিয়তি টের পেয়ে গেছে। হাতটা নিচে নেমে এল, বাহু বেয়ে, তারপর বগলের নিচ দিয়ে শরীরের সামনের দিকে। কিন্তু তার স্তন স্পর্শ করল না সে। আঙুলগুলো মাকড়সার মতো তার চামড়ার উপর দিয়ে হেঁটে বেড়াল, পাঁজর খুঁজছে যেন। পাঁজরের হাড়গুলো টিপে টিপে দেখল, হাত বুলিয়ে দিল। শিউরে উঠে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল টি.জে.। তাকে শক্ত করে ধরল লোকটা, আদর করার ভঙ্গিতে হাত বুলাল আরো কিছুক্ষণ, জোরে চাপ দিয়ে হাড়ের গঠনটা বুঝে নিচ্ছে।
উঠে দাঁড়াল সে। দূরে মিলিয়ে যাওয়া পায়ের শব্দ কানে এল ওর। এসি আর এলিভেটরের গোঙানি ছাড়া দীর্ঘক্ষণ কোনো শব্দ নেই। আচমকা ঠিক পেছনেই একটা শব্দ শুনে ভয়ে কুকুরের মতো ঘোঁত করে উঠল ও। একঘেয়ে একটা শব্দ। উশশশ। উশশশ। খুব চেনা শব্দ, কিন্তু ঠিক ধরতে পারল না। ঘাড়ুরিয়ে দেখার চেষ্টা করল লোকটা কী করছে, কিন্তু পারল না।
কী ওটা?
ছন্দবদ্ধ শব্দটা শুনে গেল একনাগাড়ে। মায়ের বাড়ির স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল শব্দটা তাকে।
উশশশ। উশশশ।
বেডফোর্ড, টেনেসির ছোট্ট সেই বাংলো বাড়ির শনিবার সকাল। সপ্তাহে ঐ একটা দিনই কাজে যেত না মা, সারা দিন লাগিয়ে বাড়ি পরিষ্কার করত। চড়া রোদে ঘুম ভাঙত টি.জে.-র, টলতে টলতে নিচে নেমে আসত মাকে সাহায্য করতে। উশশশ। পুরোনো স্মৃতির কথা মনে করে কান্না পেল ওর। শব্দটা শুনতে শুনতে অবাক হয়ে ভাবল, ঝাড়ু দিয়ে এত যত্ন করে, এত নিখুঁতভাবে মেঝের ধুলো পরিষ্কার করছে কেন লোকটা?
ওদের চোখেমুখে বিস্ময় আর অস্বস্তি দেখতে পেল সে। নিউ ইয়র্ক সিটির হোমিসাইড পুলিশদের মধ্যে সচরাচর এমনটা দেখা যায় না। মাথার ঝাঁকড়া চুল দুলিয়ে ওদেরকে ধুলোমাখা বেতের চেয়ারে বসতে ইশারা করল রাইম। একটুও আরাম লাগে না ওগুলোয় বসতে। এরপরেও কোনো আপত্তি ছাড়াই সেখানে বসল লন সেলিট্টো আর ব্যাংকস (জেরি নামের ছোকরাটা এসেছে, আর্নি নয়)। শেষবার সেলিটো এখানে এসেছিল বেশ আগে, তখনকার চেয়ে অনেকখানি বদলে গেছে রাইম। নিজের বিস্মিত ভাবটা খুব একটা লুকাতে পারল না ডিটেকটিভ। ব্যাংকসের কাছে তুলনা করার মতো কোনো পূর্বস্মৃতি নেই, তবুও সে কম অবাক হলো না। ছন্নছাড়া ঘর, ভবঘুরের মতো দেখতে লোকটা সন্দেহ নিয়ে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। আর ঘরের মধ্যে বিটকেলে নাড়ি-পচা গন্ধ। গন্ধটা লিংকন রাইমের।
ওদের উপরে আসতে দেওয়ার জন্য নিজেকেই মনে মনে গালমন্দ করল সে। ‘আগে ফোন করোনি কেন, লন?’
‘তাহলে তো আসতে বারণ করে দিতে তুমি।’
সত্যি কথা।
সিঁড়ি দিয়ে উঠে এল টম, কিন্তু তাকে থামিয়ে দিল রাইম। ‘না, টম, তোমাকে আর দরকার নেই আমাদের।’ মনে পড়ে গেছে তার, অতিথিদের সব সময় কিছু পান করতে বা খেতে দেওয়া হবে কি না তা জিজ্ঞেস করার বদভ্যাস আছে ছোকরার। মার্থা স্টুয়ার্ট যেন পাকা রাঁধুনি।
কিছুক্ষণের নীরবতা। বিশালবপু, কুঁচকানো পোশাক পরা সেলিট্টো-বিশ বছরের অভিজ্ঞ ভেটেরান-বিছানার পাশে রাখা একটা বাক্সের দিকে চোখ ফেলে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু বয়স্কদের ব্যবহার্য ডিসপোজেবল ডায়াপারের প্যাকেটগুলো চোখে পড়তেই গলার কাছে আটকে গেল কথাটা।
‘স্যার, আমি আপনার বইটা পড়েছি,’ বলল জেরি ব্যাংকস। দাড়ি কামাতে গিয়ে বারবার গাল কেটে ফেলার অভ্যাস আছে ছোকরার। অনেকগুলো কাটার দাগ আছে তাই। মাথার চুলগুলো ভারি সুন্দর, ঘন, মোলায়েম! বারোর বেশি বয়স হতেই পারে না ওর। যতই দিন যাচ্ছে, রাইমের মনে হচ্ছে দুনিয়ার মানুষগুলোর বয়স যেন ততই কমছে।
‘কোন বইটা?’
‘আপনার ক্রাইম সিন ম্যানুয়ালটা আর কি। তবে আমি আসলে ছবির বইটার কথা বলছিলাম। বছর দুয়েক আগে যেটা বেরিয়েছিল।’
‘ওতে লেখাও ছিল। সত্যি বলতে, বেশিরভাগই তো লেখা। পড়েছিলে ওগুলো?’ ‘ওহ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই,’ তড়িঘড়ি করে জবাব দিল ব্যাংকস।
দেয়ালের একপাশে রাইমের লেখা দ্য সিনস অব দ্য ক্রাইম বইয়ের অবিক্রীত কপিগুলোর একটা বিশাল স্তূপ জমা হয়ে আছে।
‘আপনি আর লন যে বন্ধু, জানতাম না,’ যোগ করল ব্যাংকস।
‘আহা, লন তোমাকে ইয়ারবুক বের করে দেখায়নি? ছবিগুলো? আস্তিন গুটিয়ে নিজের কাটাছেঁড়া দাগগুলো দেখিয়ে বলেনি, দেখো, লিংকন রাইমের সাথে কাজ করতে গিয়ে এই চোটগুলো পেয়েছিলাম?’
হাসছে না সেলিট্টো। বেশ তো, ও চাইলে আরো গম্ভীর করে দেওয়া যাবে পরিবেশটা। অ্যাটাচি কেস হাতড়াচ্ছে সিনিয়র ডিটেকটিভ। কী আছে ওটার ভেতরে?
‘আপনারা কতদিন ধরে পার্টনার ছিলেন?’ কথা চালানোর জন্য জিজ্ঞেস করল ব্যাংকস। ‘ভার্ব হিসেবে শব্দটা মন্দ নয়,’ বলল রাইম। তাকাল ঘড়ির দিকে। ‘আমরা পার্টনার ছিলাম না,’ বলল সেলিট্টো। ‘আমি ছিলাম হোমিসাইডে, আর ও আইআরডি-র প্রধান।’
‘ওহ!’ ব্যাংকস আরো বেশি মুগ্ধ হলো। সেন্ট্রাল ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসোর্স ডিভিশন চালানো ডিপার্টমেন্টের অন্যতম সম্মানজনক কাজ।
‘হ্যাঁ,’ জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল রাইম, যেন তার ডাক্তার ফ্যালকনের পিঠে চড়ে এসে নামবে এখনই। ‘দ্য টু মাস্কেটিয়ার্স।’
রাইমের কথায় পিত্তি জ্বলে গেলেও শান্ত গলায় সেলিট্টো বলল, ‘সাতটা বছর ছাড়া-ছাড়াভাবে কাজ করেছি আমরা।’
‘আর বছরগুলো ছিলও দারুণ,’ বিদ্রুপের সুরে বলল রাইম।
চোখ রাঙাল টম, কিন্তু সেলিট্রো সেই শ্লেষ ধরতে পারল না। কিংবা হয়তো পাত্তাই দিল না। সে বলল, ‘একটা সমস্যায় পড়েছি আমরা, লিংকন। সাহায্য দরকার।’ ধপাস। কাগজের তোড়াটা এসে পড়ল বেডসাইড টেবিলে।
‘সাহায্য?’ সরু নাক দিয়ে ছিটকে বের হলো হাসির দমক। এলাইন সব সময় সন্দেহ করত কোনো সার্জনের জাদুকরী হাতের ছোঁয়ায় বানানো ঐ নাক, যদিও তা সত্যি নয়। ওর ঠোঁটদুটোকেও বড্ড বেশি নিখুঁত মনে হতো তার (একবার ঠাট্টা করে বলেছিল, একটা কাটা দাগ থাকলে মানাত ভালো, আর একবার ঝগড়ার সময় প্রায় দাগ বসিয়েই দিচ্ছিল)। আজ বারবার ঐ আবেদনময়ী ভূতটা কেন যে চোখের সামনে ভেসে উঠছে কে জানে? প্রাক্তন স্ত্রীর কথা ভাবতে ভাবতে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল তার, ইচ্ছা হয়েছিল একটা চিঠি লিখতে। ওটা এখন কম্পিউটার স্ক্রিনে ভাসছে। এক আঙুল দিয়ে কমান্ড টাইপ করে ডিস্কে সেভ করে রাখল ডকুমেন্টটা। সারা ঘরে নেমে এল নীরবতা। ‘লিংকন?’ ডাকল সেলিট্রো।
‘জি, স্যার। সাহায্য। আমার কাছ থেকে। শুনেছি আমি।’
চেয়ারে অস্বস্তিতে উশখুশ করতে করতে মুখের উপর একটা মেকি হাসি ঝুলিয়ে রাখল ব্যাংকস।
‘আমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে, মানে যেকোনো মুহূর্তেই এসে পড়বে,’ বলল রাইম।
‘অ্যাপয়েন্টমেন্ট।’
‘ডাক্তারের।’
‘তাই নাকি?’ আবারো সেই জেঁকে বসা নীরবতা কাটানোর জন্যই হয়তো জিজ্ঞেস করল ব্যাংকস। কথার আগাগোড়া কিছুই বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল সেলিট্টো, ‘কেমন আছ তুমি?’
আসার পর থেকে ব্যাংকস বা সেলিট্টো কেউই তার স্বাস্থ্যের খোঁজ নেয়নি। লিংকন রাইমকে দেখলে এই একটা প্রশ্ন সবাই এড়িয়ে চলতে চায়। কারণ উত্তরটা হতে পারে অত্যন্ত জটিল এবং প্রায় নিশ্চিতভাবেই অপ্রীতিকর।
সহজভাবে বলল সে, ‘ভালোই আছি, ধন্যবাদ। আর তোমরা? বেটি কেমন আছে?’ ‘আমাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে,’ চটজলদি বলল সেলিট্টো।
‘তাই নাকি?’
‘বাড়িটা পেয়েছে ও, আর আমি পেয়েছি বাচ্চার অর্ধেকটা।’ জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল মোটাসোটা পুলিশটা, যেন লাইনটা এর আগেও বহুবার ব্যবহার করেছে সে।
রাইমের মনে হলো এই বিচ্ছেদের পেছনে কোনো বেদনাদায়ক গল্প আছে, যেটা শোনার কোনো ইচ্ছাই নেই তার। তবে ওদের বিয়েটা যে টেকেনি, তাতে খুব একটা অবাক হলো না সে। সেলিট্রো কাজপাগল। ডিপার্টমেন্টের শখানেক ফার্স্ট-গ্রেড ডিটেকটিভের একজন সে, তাও বহু বছর ধরে। শুধু চাকরির বয়সের জন্য নয়, যোগ্যতার জোরেই ঐ গ্রেড পেয়েছে সে। সপ্তাহে প্রায় আশি ঘণ্টা কাজ করত। একসাথে কাজ করার প্রথম কয়েক মাস রাইম জানতই না যে লোকটা বিবাহিত।
‘কোথায় থাকছ এখন?’ রাইম জিজ্ঞেস করল। আশা করল, এই সামাজিক আলাপচারিতায় ক্লান্ত হয়ে ওরা বিদায় হবে।
‘ব্রুকলিন। দ্য হাইটস-এ। মাঝে মাঝে হেঁটেই কাজে যাই। মনে আছে, সব সময় ডায়েট করতাম আমি? আসলে ডায়েট করে লাভ নেই। আসল হলো এক্সারসাইজ।’ সাড়ে তিন বছর আগের লন সেলিট্রোর চেয়ে তাকে খুব একটা মোটা বা রোগা মনে হলো না। কিংবা পনেরো বছর আগের সেলিট্টোর চেয়েও।
‘তো ডাক্তারের কথা বলছিলেন,’ মুখ খুলল ব্যাংকস। ‘কীসের জন্য?’ ‘নতুন কোনো ট্রিটমেন্ট?’ প্রশ্নটা শেষ করে দিল রাইম। ‘ঠিক তাই।’
‘গুড লাক।’
‘তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।’
এখন ঘড়িতে ১১:৩৬। দুপুর হতে চলল। চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত একজন মানুষের এত দেরি করা অমার্জনীয়। রাইম লক্ষ করল ব্যাংকসের চোখদুটো দুবার তার পায়ের উপর দিয়ে ঘুরে গেল। দ্বিতীয়বার ছোকরাকে হাতেনাতে ধরে ফেলল সে, ডিটেকটিভকে লজ্জা পেতে দেখে অবাক হলো না একটুও।
‘তো,’ বলল রাইম, ‘তোমাদের সাহায্য করার মতো সময় আমার নেই বললেই চলে।’
‘কিন্তু তিনি তো এখনো আসেননি, তাই না? ডাক্তার?’ হোমিসাইড সাসপেক্টদের সাজানো গল্প ফুটো করে দেওয়ার জন্য যে অকাট্য সুর ব্যবহার করে সে, সেই সুরেই বলল লন সেলিটো।
কফিপট হাতে দরজায় উদিত হলো টম। হারামজাদা, ঠোঁট নাড়িয়ে নিঃশব্দে গালি দিল রাইম।
‘লিংকন আপনাদের কিছু দিতে ভুলে গেছে বোধহয়।’
‘টম আমাকে বাচ্চার মতো ট্রিট করে।’
‘যার যেমনটা প্রাপ্য,’ পাল্টা জবাব দিল সহকারী।
‘ঠিক আছে!’ ধমকে উঠল রাইম। ‘কফি খাও। আমি খাব মায়ের দুধ।’
‘অনেক সকাল এখন, টম বলল। ‘বার খোলেনি।’ রাইমের রাগী চাহনি বেশ ভালোভাবেই হজম করে নিল।
আবারো রাইমের শরীরটা মেপে নিল ব্যাংকস। হয়তো ভেবেছিল শুধু হাড় আর চামড়া দেখবে। কিন্তু দুর্ঘটনার পর খুব বেশি দিন পেশিগুলো শুকিয়ে যায়নি তার, প্রথম দিকের ফিজিক্যাল থেরাপিস্টরা তাকে ব্যায়াম করিয়ে করিয়ে প্রায় মেরে ফেলার দশা করেছিল। টম কখনো আস্ত শয়তানের মতো আচরণ করে, আবার কখনো বা বুড়ি মুরগির মতো আগলে রাখে। তবে সে ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে দারুণ দক্ষ। প্রতিদিন রাইমকে দিয়ে প্যাসিভ রম (ROM) এক্সারসাইজ করায়। গনিওমেট্রি বা হাড়ের জয়েন্টের রেঞ্জ অব মোশনের মাপজোকের নিখুঁত নোট রাখে। হাত-পাগুলো অনবরত নাড়ানো-চাড়ানোর সময় মাংসপেশির আড়ষ্টতা বা স্পাস্টিসিটি চেক করে সযত্নে। রম এক্সারসাইজ কোনো জাদুকরী সমাধান নয়, তবে এতে পেশির টানটান ভাব বা টোন বজায় থাকে, শরীর কুঁকড়ে যাওয়া রোধ করে আর রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখে। গত সাড়ে তিন বছর ধরে যার শারীরিক কসরত বলতে কেবল কাঁধ, মাথা আর বাঁ হাতের অনামিকা নাড়ানো, সেই হিসেবে লিংকন রাইমের শরীরের অবস্থা খুব একটা খারাপ নয়।
রাইমের আঙুলের কাছে থাকা ইসিইউ-র (এনভায়রনমেন্টাল কন্ট্রোল ইউনিট) কালো রঙের জটিল কন্ট্রোল প্যানেলটা থেকে চোখ সরিয়ে নিল তরুণ ডিটেকটিভ। ওটার সাথে তার দিয়ে লাগানো আরেকটা কন্ট্রোলার, যেখান থেকে একগুচ্ছ তার আর তারের নালি কম্পিউটার এবং দেয়ালের একটা প্যানেলের দিকে চলে গেছে। কোয়াড্রিপ্লিজিক বা পক্ষাঘাতগ্রস্তদের জীবনটা তারে বাঁধা। বহু বছর আগে এক থেরাপিস্ট রাইমকে বলেছিল কথাটা। অন্তত বড়লোক রোগীদের ক্ষেত্রে তো বটেই। যারা ভাগ্যবান।
সেলিত্তো বলল, ‘আজ খুব ভোরে ওয়েস্ট সাইডে একটা খুন হয়েছে।’
‘গত এক মাস ধরে ভবঘুরে পুরুষ আর মহিলার নিখোঁজ হওয়ার রিপোর্ট আসছিল আমাদের কাছে,’ ব্যাংকস বলল। ‘প্রথমে ভেবেছিলাম এটা তাদেরই একজন। কিন্তু তা নয়,’ নাটকীয় গলায় যোগ করল সে। ‘ভিকটিম গত রাতের ঐ দুজনের একজন।’
দাগওয়ালা মুখের ছোকরাটার দিকে ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রাইম। ‘ঐ দুজন মানে?’
‘খবর দেখেন না উনি,’ টম বলল। ‘কিডন্যাপের ঘটনার কথা বলে থাকলে উনি শোনেননি।’
‘তুমি খবর দেখো না?’ হেসে ফেলল সেলিট্টো। ‘তুমি সেই হারামজাদা যে কিনা দিনে চারটা পত্রিকা পড়ত আর বাড়ি ফিরে দেখার জন্য লোকাল নিউজ রেকর্ড করে রাখত। ব্লেইন বলেছিল, একবার সেক্স করার সময় তুমি নাকি ওকে “কেটি কারিক” বলে ডেকে ফেলেছিলে।’
‘আমি এখন শুধু সাহিত্য পড়ি,’ চালবাজের মতো বলল রাইম, কথাটা মিথ্যা যদিও।
টম যোগ করল, ‘সাহিত্য হলো এমন সংবাদ যা চিরকাল সংবাদ হিসেবেই থেকে যায়।’ তার কথা কানে তুলল না রাইম।
‘একজন পুরুষ আর মহিলা কোস্ট থেকে ব্যবসার কাজ সেরে ফিরছিল,’ বলল সেলিট্টো। ‘জেএফকে থেকে একটা হলুদ ক্যাব ধরেছিল তারা। কিন্তু বাড়ি পর্যন্ত আর পৌঁছাতে পারেনি।’
‘সাড়ে এগারোটা নাগাদ একটা রিপোর্ট এসেছিল। কুইন্সের বিকিউই ধরে আসছিল ক্যাবটা। পেছনের সিটে একজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ আর মহিলা। দেখে মনে হচ্ছিল জানালা ভাঙার চেষ্টা করছে ওরা। কাচে কিল মারছিল। কেউ গাড়ির নম্বর নিতে পারেনি।’
‘যে সাক্ষী ক্যাবটা দেখেছে… ড্রাইভারকে দেখতে পেয়েছিল সে?’ ‘না।’
‘মহিলা যাত্রী?’
‘তার কোনো চিহ্ন নেই।’
এগারোটা একচল্লিশ বাজে এখন। ডাক্তার উইলিয়াম বার্জারের উপর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে রাইমের। ‘জঘন্য ব্যাপার,’ অন্যমনস্কভাবে বিড়বিড় করে বলল সে।
জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সেলিট্টো। ‘বলো আর কী বলবে,’ রাইম বলল।
‘ওর আংটিটা আঙুলে ছিল তার,’ বলল ব্যাংকস।
‘কার?’
‘ভিকটিমের। আজ সকালে যাকে পাওয়া গেছে। সে ঐ মহিলার আংটি পরে ছিল। অন্য যাত্রীর।’
‘নিশ্চিত যে ওটা ওরই আংটি?’
‘ভেতরে নাম লেখা ছিল।’
‘তার মানে তোমাদের হাতে এমন এক আনসাব আছে,’ বলে চলল রাইম, ‘যে কিনা তোমাদের জানাতে চায় যে মেয়েটা ওর কাছেই আছে এবং এখনো জ্যান্ত।’
‘আনসাব কী?’ জিজ্ঞেস করল টম। রাইম জবাব দিচ্ছে না দেখে সেলিট্টো বলল, ‘আননোন সাবজেক্ট বা অজ্ঞাত আসামি।’
‘কিন্তু আপনি কী করে বুঝলেন যে ওটা তার আঙুলে ফিট করেছিল?’ জিজ্ঞেস করল ব্যাংকস। ছেলেটার চোখ একটু বেশিই বড় বড়। ব্যাটাছেলেদের এমন ডাগর চোখ ভালো লাগে না রাইমের।
‘হার মানলাম।’
‘লোকটার আঙুলের চামড়া চেঁছে ফেলেছিল। পুরোটা। একদম হাড় পর্যন্ত।’ ম্লান হাসল রাইম। ‘বাহ, বেশ চতুর তো লোকটা, তাই না?’
‘চতুর কেন?’
‘যাতে কেউ এসে আংটিটা নিয়ে না যায়, সেটা নিশ্চিত করতে। রক্তমাখা ছিল নিশ্চয়ই?’
‘জঘন্য অবস্থা।’
‘প্রথমত আংটিটা খেয়াল করাই কঠিন। তার উপর এইডস, হেপাটাইটিসের ভয়…যদি কারো চোখে পড়েও, ঐ ট্রফিটা কেউ নিতে চাইবে না। নাম কী ওর, লন?’
সঙ্গীর দিকে মাথা নাড়ল বয়স্ক ডিটেকটিভ, ওয়াচবুকটা খুলে ধরল সে। ‘ট্যামি জিন কোলফ্যাক্স। সবাই টি.জে. বলে ডাকে। আটাশ বছর বয়স। মর্গান স্ট্যানলিতে কাজ করে।’
রাইম খেয়াল করল, ব্যাংকসের হাতেও একটা আংটি আছে। কোনো এক স্কুল রিং হবে। ছোকরা একটু বেশিই শৌখিন, শুধু হাই স্কুল আর পুলিশ অ্যাকাডেমি পাস মনে হচ্ছে না ওকে। আর্মির কোনো ছাপ নেই ওর মধ্যে। আংটিতে ‘ইয়েল’ নামটা খোদাই করা থাকলে অবাক হবে না সে। পড়ুয়া ছেলে থেকে হোমিসাইড ডিটেকটিভ? দুনিয়াটা যাচ্ছে কোথায়?
হাতের কাপটা ধরে আছে তরুণ পুলিশ, মাঝে মাঝে কাঁপছে ওটা। এভারেস্ট অ্যান্ড জেনিংস ইসিইউ প্যানেলের সাথে বাঁ হাতটা স্ট্র্যাপ দিয়ে আটকানো রাইমের, অনামিকা দিয়ে সামান্য একটু নড়াচড়া করে কয়েকটা সেটিং বদলে এসি কমিয়ে দিল সে। হিটিং বা এসি কন্ট্রোলের জন্য ও সাধারণত প্যানেল নষ্ট করে না; ওগুলো লাইট, কম্পিউটার আর বইয়ের পাতা উল্টানোর ফ্রেমের মতো জরুরি কাজের জন্য বরাদ্দ। কিন্তু ঘর বেশি ঠান্ডা হয়ে গেলে নাক দিয়ে পানি গড়ায় তার। আর একজন কোয়াড্রিপ্লিজিকের জন্য সেটা নরক যন্ত্রণার শামিল।
‘কোনো মুক্তিপণ বা র্যানসাম নোট?’ জানতে চাইল রাইম। ‘কিছু না।’
‘কেস অফিসার কি তুমি?’ সেলিট্টোকে জিজ্ঞেস করল রাইম।
‘জিম পোলিংয়ের আন্ডারে। আর আমরা চাই তুমি ক্রাইম সিন রিপোর্টটা একটু দেখে দাও।’
যেবারো হাসির শব্দ। ‘আমি? তিন বছর ধরে ক্রাইম সিনের রিপোর্ট চোখে দেখিনি। আমি আর কী বলব তোমাদের?’
‘তুমি অনেক কিছু বলতে পারবে, লিংক।’
‘আইআরডি-র হেড এখন কে?’
‘ভিন্স পেরেত্তি।’
‘কংগ্রেসম্যানের ছেলে,’ মনে পড়ল রাইমের। ‘ওকেই দেখতে বলো।’ এক মুহূর্তের দ্বিধা। ‘আমরা চাইছি তুমিই দেখো।’
‘আমরা মানে?’
‘চিফ। আর এই অধম।’
‘আর এই অনাস্থা প্রস্তাব সম্পর্কে ক্যাপ্টেন পেরেত্তির কী মতামত?’ স্কুলের বালিকার মতো ফিক করে হেসে ফেলল রাইম।
উঠে দাঁড়িয়ে সারা ঘরে পায়চারি করতে শুরু করল সেলিটো, ম্যাগাজিনের স্তূপগুলোর উপর চোখ বোলাল। ফরেনসিক সায়েন্স রিভিউ। হার্ডিং অ্যান্ড বয়েল সায়েন্টিফিক ইকুইপমেন্ট কোম্পানির ক্যাটালগ। দ্য নিউ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড ফরেনসিক ইনভেস্টিগেশন অ্যানুয়াল। আমেরিকান কলেজ অব ফরেনসিক এক্সজামিনার্স জার্নাল। রিপোর্ট অব দ্য আমেরিকান সোসাইটি অব ক্রাইম ল্যাব ডিরেক্টরস। সিআরসি প্রেস ফরেনসিকস। জার্নাল অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ফরেনসিক সায়েন্স।
‘কী অবস্থা দেখো ওগুলোর,’ রাইম বলল। ‘সাবস্ক্রিপশন বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে। ধুলো জমে অবস্থা খারাপ।’
‘এই ঘরের সবকিছুই ধুলোয় ভরতি, লিংক। অলস পাছাটা তুলে এই শুয়োরের খোঁয়াড়টা একটু পরিষ্কার করতে পারো না?’
আতঙ্কিত দেখাল ব্যাংকসকে। হাসির দমকটা ভেতরেই চেপে গেল রাইম, অনেক দিন পর হাসতে গিয়ে কেমন যেন অচেনা লাগল নিজের কাছেই। মনের দেয়ালটা আলগা হয়ে গিয়েছিল একটু, বিরক্তিটা পরিণত হয়েছিল কৌতুকবোধে। সেলিট্টোর সাথে দূরত্ব হওয়ার জন্য মনে মনে আফসোসও হলো একটু। পরক্ষণেই অনুভূতিটাকে গলা টিপে মারল সে। গজগজ করে বলল, ‘তোমাদের সাহায্য করতে পারব না আমি। সরি।’
‘সোমবার থেকে শান্তি সম্মেলন শুরু হচ্ছে। আমরা…’
‘কীসের সম্মেলন?’
‘জাতিসংঘের। রাষ্ট্রদূত, রাষ্ট্রপ্রধানরা আসবেন। প্রায় দশ হাজার গণ্যমান্য ব্যক্তি থাকবেন শহরে। দুদিন আগে লন্ডনের ঘটনার কথা শোনোনি?’
‘ঘটনা?’ প্রতিধ্বনি করল রাইম।
‘ইউনেস্কোর মিটিং চলাকালীন কেউ হোটেলে বোমা মারার চেষ্টা করেছিল। মেয়র তো ভয়ে অস্থির, ভাবছে কেউ এখানেও কনফারেন্সের সময় হামলা চালাবে। পত্রিকার পাতায় আজেবাজে শিরোনাম দেখতে চায় না সে।’
‘তবে একটা ছোট্ট সমস্যাও আছে,’ কটু শ্লেষের সাথে বলল রাইম। ‘মিস ট্যামি জিন হয়তো বাড়ি ফেরাটা খুব একটা উপভোগ করছেন না।’
‘জেরি, ওকে কিছু ডিটেইলস বলো। ওর খিদেটা একটু বাড়িয়ে দাও।’
রাইমের পা থেকে বিছানার দিকে মনোযোগ ফেরাল ব্যাংকস। রাইম নির্দ্বিধায় স্বীকার করে যে দুটোর মধ্যে বিছানাটাই বেশি ইন্টারেস্টিং। বিশেষ করে কন্ট্রোল প্যানেলটা। স্পেস শাটল থেকে খুলে আনা কোনো যন্ত্রের মতো দেখতে ওটা, দামও তেমনই।
‘কিডন্যাপ হওয়ার দশ ঘণ্টা পর আমরা পুরুষ যাত্রী, জন আলব্রেখটকে থার্টি-সেভেনথ আর ইলেভেনথের কাছে অ্যামট্র্যাকের লাইনের পাশে জ্যান্ত কবর দেওয়া অবস্থায় খুঁজে পাই। মানে, আমরা যখন পাই, তখন সে মৃত। জ্যান্ত কবর দেওয়া হয়েছিল তাকে। গুলিটা পয়েন্ট থ্রি-টু বোরের।’
ব্যাংকস মুখ তুলে যোগ করল, ‘গুলি জগতের হোন্ডা অ্যাকর্ড আর কি, অনেকেই চালায় এটা।’
তার মানে হলো, এমন কোনো আজব অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি যা দিয়ে আনসাব সম্পর্কে চটজলদি কোনো সিদ্ধান্তে আসা যাবে। এই ব্যাংকস ছেলেটা বেশ বুদ্ধিমান, ভাবল রাইম। ওর একমাত্র সমস্যা হলো তারুণ্য, যেটা বয়সের সাথে হয়তো কাটবে, আবার না-ও কাটতে পারে। লিংকন রাইম বিশ্বাস করে, ও নিজে কখনো তরুণ ছিল না।
‘গুলির গায়ে কি প্যাঁচকাটা দাগ ছিল?’ জিজ্ঞেস করল রাইম।
‘ছয়টা ল্যান্ডস আর গ্রুভস, বাঁ-হাতি মোচড়।’
‘তার মানে লোকটার কাছে একটা কোল্ট আছে,’ ক্রাইম সিন ডায়াগ্রামের উপর চোখ বোলাতে বোলাতে বলল রাইম।
‘আপনি বললেন লোকটা,’ বলল ব্যাংকস। ‘আসলে হবে লোক দুটো।’ ‘কী?’
‘আনসাব। দুজন আছে ওরা। কবরের পাশ থেকে রাস্তার উপরে ওঠার লোহার মই পর্যন্ত দুজোড়া পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে,’ ক্রাইম সিনের ডায়াগ্রামের দিকে আঙুল তাক করে বলল ব্যাংকস।
‘মইয়ের গায়ে কোনো আঙুলের ছাপ?’
‘একটাও না। মুছে ফেলা হয়েছে। বেশ ভালোভাবেই কাজটা সেরেছে। পায়ের ছাপগুলো কবর পর্যন্ত গিয়ে আবার মইয়ের দিকে ফিরে এসেছে। তাছাড়া, ভিকটিমকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুজন লোক তো লাগবেই। লোকটার ওজন দুশো পাউন্ডের বেশি। একা কারো পক্ষে সম্ভব নয়।’
‘বলে যাও।’
‘ওরা ওকে কবরের কাছে নিয়ে ভেতরে ফেলে গুলি করেছে। তারপর মাটিচাপা দিয়ে মইয়ের কাছে ফিরে উপরে উঠে গায়েব হয়ে গেছে।’
‘কবরের ভেতরে গুলি করেছে?’ জানতে চাইল রাইম।
‘হ্যাঁ। মইয়ের আশেপাশে বা কবরে যাওয়ার রাস্তায় কোনো রক্তের দাগ ছিল না।’
আগ্রহ জাগছে তার, টের পেল রাইম। তারপরেও বলল, ‘আমাকে কী দরকার তোমাদের?’
হলদেটে দাঁত বের করে হাসল সেলিট্টো। ‘একটা রহস্য পেয়েছি আমরা, লিংক। একগাদা ফিজিক্যাল এভিডেন্স পাওয়া গেছে যার কোনো মাথামুণ্ডু নেই।’
‘তো?’ এমন ক্রাইম সিন কদাচিৎ মেলে যেখানে প্রতিটি আলামতেরই অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়।
‘না, এটা সত্যিই অদ্ভুত। রিপোর্টটা পড়ো। প্লিজ। আমি এখানে রাখছি। জিনিসটা কাজ করে কীভাবে?’ টমের দিকে তাকাল সেলিটো। ও পেজ-টার্নিং ফ্রেমে রিপোর্টটা ফিট করে দিল।
‘আমার সময় নেই, লন,’ প্রতিবাদ করল রাইম।
‘যন্ত্রটা তো বেশ,’ ফ্রেমটার দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করল ব্যাংকস।
কোনো জবাব দিল না রাইম। প্রথম পৃষ্ঠায় চোখ বোলাল, তারপর মন দিয়ে পড়ল। অনামিকাটা এক মিলিমিটার বাঁয়ে সরাল নিখুঁত মাপে। একটা রাবারের দণ্ড পাতা উল্টে দিল। পড়তে পড়তে ভাবছে, হুম, ব্যাপারটা অদ্ভুত তো!
‘ঘটনাস্থলের দায়িত্বে কে ছিল?’
‘স্বয়ং পেরেত্তি। ভিকটিম যে ট্যাক্সির যাত্রী ছিল এটা শোনার পরেই নিজে এসে দায়িত্ব নিয়েছে।’
পড়তে লাগল রাইম। মিনিটখানেকের জন্য পুলিশি ভাষায় লেখা সেই নীরস গদ্য আটকে রাখল তাকে। তারপর দরজায় বেল বাজল, আর তার হৃৎপিণ্ডটা সজোরে লাফিয়ে উঠল একরাশ কাঁপুনি নিয়ে। টমের দিকে চোখ চলে গেল তার। দৃষ্টিটা হিমশীতল, বুঝিয়ে দিল ইয়ার্কি-ফাজলামির সময় শেষ। মাথা নেড়ে তৎক্ষণাৎ নিচে নেমে গেল টম।
লিংকন রাইমের ক্ষুরধার মস্তিষ্ক থেকে ক্যাব ড্রাইভার, ফিজিক্যাল এভিডেন্স আর অপহৃত ব্যাংকার-সব উধাও হয়ে গেল নিমিষে।
‘ডাক্তার বার্জার এসেছেন,’ ইন্টারকমে ঘোষণা করল টম।
অবশেষে। বহু অপেক্ষার পর।
‘দুঃখিত, লন। তোমাদের এখন যেতে হবে। আবার দেখা হয়ে ভালো লাগল,’ এক চিলতে হাসি দিয়ে বলল রাইম। ‘কেসটা কিন্তু ইন্টারেস্টিং।’
একটু ইতস্তত করে উঠে দাঁড়াল সেলিট্টো। ‘রিপোর্টটা একটু পড়বে, লিংকন? পড়ে জানাবে তোমার কী মনে হয়?’
‘নিশ্চয়ই,’ বলল রাইম, তারপর বালিশে মাথা এলিয়ে দিল। রাইমের মতো কোয়াড্রিপ্লিজিক, যাদের ঘাড় ও মাথা নাড়ানোর ক্ষমতা আছে, তারা কেবল মাথা ঘুরিয়েই ডজনখানেক কন্ট্রোল বা বোতাম অপারেট করতে পারে। কিন্তু মাথাকে কাজে লাগাতে ইচ্ছা করে না তার। জীবনে উপভোগ করার মতো শারীরিক সুখ খুব সামান্যই অবশিষ্ট আছে তার, তাই দুশো ডলার দামের পালকের বালিশে মাথা এলিয়ে দেওয়ার আরামটুকু কিছুতেই ছাড়তে রাজি নয় সে। দর্শনার্থীরা ক্লান্ত করে দিয়েছে তাকে। দুপুরও হয়নি এখনো, অথচ কেবলই ঘুম পাচ্ছে। ঘাড়ের পেশিগুলো যন্ত্রণায় দপদপ করছে।
সেলিট্টো আর ব্যাংকস দরজার কাছে পৌঁছাতে রাইম ডাকল, ‘লন, দাঁড়াও।’ ঘুরে দাঁড়াল ডিটেকটিভ।
‘একটা কথা জেনে রাখা ভালো। ক্রাইম সিনের অর্ধেকটা খুঁজে পেয়েছ তোমরা। আসলটা অন্য কোথাও আছে-প্রাইমারি সিন। ওটা তার ডেরা। ওখানেই থাকবে সে। আর জায়গাটা খুঁজে পাওয়া হবে ভয়ানক কঠিন।’
‘অন্য সিন আছে বলে মনে করছ কেন?’
‘কারণ সে ভিকটিমকে কবরের ভেতর গুলি করেনি। গুলি করেছে ওখানে-ঐ প্রাইমারি সিন-এ। আর সম্ভবত ওখানেই আটকে রেখেছে মেয়েটাকে। জায়গাটা মাটির নিচে কিংবা শহরের কোনো জনমানবহীন এলাকায় হবে। অথবা দুটোই…কারণ-‘ তরুণ ডিটেকটিভ প্রশ্ন করার আগেই বলে দিল রাইম-‘নির্জন আর গোপন জায়গা না হলে কাউকে গুলি করার বা বন্দি করে রাখার ঝুঁকি সে নিত না।’
‘হয়তো সাইলেন্সার ব্যবহার করেছে।’
‘গুলির গায়ে রাবার বা সুতোর কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি,’ ঝটপট বলল রাইম।
‘কিন্তু লোকটাকে অন্য কোথাও গুলি করা হলো কী করে?’ পাল্টা যুক্তি দিল ব্যাংকস। ‘মানে, ঘটনাস্থলে তো কোনো রক্তের ছিটে ছিল না।’
‘আমার ধারণা ভিকটিমের মুখে গুলি করা হয়েছে,’ ঘোষণা করল রাইম।
‘হ্যাঁ, তাই তো হয়েছে,’ বোকার মতো হেসে জবাব দিল ব্যাংকস। ‘জানলেন কী করে?’
‘.৩২ বোরের গুলিতে যন্ত্রণা হয় সাংঘাতিক, মানুষ অচল হয়ে যায়, কিন্তু রক্ত বেরোয় খুব কম। যদি ব্রেইনে না লাগে, তবে চট করে মরে না কেউ। ভিকটিমের ঐ অবস্থায় তাকে যেখানে খুশি নিয়ে যেতে পারত আনসাব। আমি আনসাব একবচনে বলছি, কারণ আততায়ী একজনই।’
একটু সময়ের জন্য নীরবতা। তারপর এমনভাবে ফিসফিস করে উঠল ব্যাংকস যেন ল্যান্ড মাইন নিষ্ক্রিয় করছে। ‘কিন্তু… দুজোড়া পায়ের ছাপ ছিল সেখানে।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলল রাইম। ‘জুতোর তলা হুবহু এক। একই লোক দুবার যাওয়া-আসা করায় তৈরি হয়েছে ওগুলো। আমাদের বোকা বানাতে চেয়েছে সে। উত্তরের দিকে যাওয়া ছাপগুলোর গভীরতা আর দক্ষিণের ছাপগুলোর গভীরতা একদম সমান। অর্থাৎ, দুশো পাউন্ডের বোঝা এক পিঠে বয়ে নিয়ে গেছে আর ফেরার পথে খালি গায়ে ছিল, এমনটা নয়। ভিকটিম কি খালি পায়ে ছিল?’
নোটবুকের পাতা উল্টাল ব্যাংকস। ‘মোজা পরা ছিল।’
‘বেশ, তার মানে ঐ চালাকিটা করার জন্য মই পর্যন্ত হেঁটে যেতে আর ফিরে আসতে ভিকটিমের জুতোজোড়াই পরেছিল অপরাধী।’
‘যদি মই দিয়ে না নামে, তবে কবরের কাছে পৌঁছাল কী করে সে?’
‘ট্রেনের লাইন ধরে হাঁটিয়ে এনেছে লোকটাকে। সম্ভবত উত্তর দিক থেকে এসেছিল তারা।’
‘কিন্তু দুপাশে কয়েক ব্লকের মধ্যে রেললাইনের বেডে নামার মতো আর কোনো মই নেই।’
‘তবে লাইনের সমান্তরালে সুড়ঙ্গ আছে,’ বলে চলল রাইম। ‘ইলেভেনথ অ্যাভিনিউয়ের পুরোনো কিছু ওয়্যারহাউজের বেসমেন্টের সাথে ওগুলোর যোগ আছে। প্রহিবিশনের আমলে এক গ্যাংস্টার-ওনি ম্যাডেন-খুঁড়েছিল ওগুলো; যাতে নিউ ইয়র্ক সেন্ট্রাল ট্রেনে করে অ্যালবানি আর ব্রিজপোর্টে চোরাই হুইস্কির চালান পাঠাতে পারে সে।’
‘কিন্তু সুড়ঙ্গের কাছেই ভিকটিমকে কবর দিল না কেন? লোকটাকে টেনেহিঁচড়ে ওভারপাস পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে লোকের চোখে পড়ার ঝুঁকি কেন নিল?’
অধৈর্য হয়ে উঠল এবার রাইম। ‘ও আমাদের কী বলতে চাইছে বুঝতে পারছ না তোমরা?’
কিছু বলতে গিয়েও মাথা ঝাঁকাল ব্যাংকস।
‘লাশটা এমন জায়গা রাখার দরকার ছিল যাতে চোখে পড়ে,’ বলল রাইম। ‘সে চেয়েছিল কেউ যেন খুঁজে পায় ওটা। সেজন্যই হাতটা বাতাসে ভাসিয়ে রেখেছে। আমাদের হাত নেড়ে ইশারা করছে। আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাইছে সে। সরি, তোমাদের আনসাব হয়তো একজন, কিন্তু বুদ্ধিতে দুজনকে টেক্কা দেয়ার সামর্থ্য রাখে। কাছেপিঠেই সুড়ঙ্গে ঢোকার কোনো দরজা আছে। ওখানে যাও আর আঙুলের ছাপ খোঁজো। কিছুই পাওয়া যাবে না। তবুও কাজটা করতেই হবে। বুঝতেই পারছ, প্রেসের ব্যাপার। গল্পটা যখন জানাজানি হবে…যাই হোক, গুড লাক। এবার আমাকে মাফ করতে হবে। লন?’
‘বলো?’
‘প্রাইমারি ক্রাইম সিনের কথা ভুলে যেও না। যাই ঘটুক না কেন, খুঁজে বের করতেই হবে ওটা। এবং দ্রুত।’
‘ধন্যবাদ, লিংক। রিপোর্টটা শুধু একটু পড়ে দেখো তুমি।’
রাইম বলল অবশ্যই দেখবে, আর খেয়াল করল যে মিথ্যাটা পুরোপুরি বিশ্বাস করেছে তারা।
