অধ্যায় সাত
ওয়াল স্ট্রিটের অন্ধকার, কয়লাভরা সুড়ঙ্গগুলোর দিকে ছুটল স্টেশন ওয়াগনটা। ডাউনটাউন নিউ ইয়র্ক।
স্টিয়ারিং হুইলের উপর হালকা আঙুল নাচাল অ্যামেলিয়া স্যাক্স, কল্পনা করার চেষ্টা করল টি.জে. কোলফ্যাক্সকে কোথায় আটকে রাখা হতে পারে। তাকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব মনে হচ্ছে। সামনের ফাইন্যান্সিয়াল ডিস্ট্রিক্টকে আগে কখনও এত বিশাল, এত অলিগলিতে ভরা, এত ম্যানহোল আর দরজায় ভরতি, কালো জানালাওয়ালা দালানে ঠাসা মনে হয়নি। একজন জিম্মিকে লুকিয়ে রাখার মতো এত জায়গা এখানে!
মনের চোখে রেললাইনের পাশের কবর থেকে বেরিয়ে থাকা হাতটা দেখল সে। আঙুলের রক্তাক্ত হাড়ের উপর বসে আছে হীরের আংটি। গয়নাটা চিনতে পেরেছিল স্যাক্স। এগুলোকে সে সান্ত্বনা পুরস্কার বলে-নিঃসঙ্গ বড়লোক মেয়েরা নিজেদের জন্য কেনে ওসব। ও যদি বড়লোক হতো, তবে সে-ও পরতো অমন আংটি।
দক্ষিণে ছুটল গাড়ি, সাইকেল মেসেঞ্জার আর ট্যাক্সিগুলোকে পাশ কাটিয়ে। এমনকি এই ঝলমলে দুপুরে শ্বাসরোধী সূর্যের মধ্যেও শহরের এই অংশটা কেমন যেন ভূতুড়ে লাগছে। দালানগুলো থমথমে ছায়া ফেলছে, ওগুলোর গায়ে জমাট রক্তরঙা কালচে ধুলোর আস্তরণ।
ঘণ্টায় চল্লিশ মাইল বেগে বাঁক নিল স্যাক্স, স্পঞ্জি অ্যাসফল্টের উপর চাকা পিছলে গেল, অ্যাক্সিলারেটর চেপে ষাট মাইলে তুলল স্টেশন ওয়াগনের গতি। চমৎকার ইঞ্জিন, ভাবল সে। আর সত্তর মাইলে ওয়াগনটা কেমন চলে তা দেখার সিদ্ধান্ত নিল।
বছর কয়েক আগে তিনটা থেকে এগারোটা পর্যন্ত ডিউটি করে তার বাপ ঘুমাত যখন, তখন টিনএজার অ্যামি স্যাক্স তার ক্যামেরোর চাবি হাতিয়ে নিত। আর মা রোজকে বলত শপিং-এ যাচ্ছে, ফোর্ট হ্যামিলটন পর্ক স্টোর থেকে কিছু লাগবে কি না? আর মা ‘না, কিন্তু ট্রেনে যেও, ড্রাইভ কোরো না’ বলার আগেই দরজা দিয়ে হাওয়া হয়ে যেত সে, গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ছুটত পশ্চিম দিকে।
তিন ঘণ্টা পর মাংস ছাড়াই বাড়ি ফিরে পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠত অ্যামি, মুখোমুখি হতো আতঙ্কিত আর রাগান্বিত মায়ের। তার কাছে গর্ভবতী হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে লেকচার শুনে পেট ফেটে হাসি আসত ওর। মা বলত, বাচ্চা পেটে এলে নাকি সেটা তার সুন্দর মুখ দিয়ে মডেলিং করে মিলিয়ন ডলার কামানোর সুযোগ নষ্ট করে দেবে।
অবশেষে যখন মহিলা জানতে পারত যে তার মেয়ে কারো সাথে শুচ্ছে না, বরং কেবল লং আইল্যান্ড হাইওয়েতে ঘণ্টায় একশো মাইল বেগে গাড়ি চালাচ্ছে, তখন সে আরো বেশি রেগে যেত। আতঙ্কিতও হতো খুব। এরপর সুন্দর মুখ থেঁতলে যাওয়া এবং মডেলিং করে মিলিয়ন ডলার কামানোর সুযোগ নষ্ট হওয়া নিয়ে লেকচার দিত মেয়েকে। ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার পর অবস্থা আরো খারাপ হলো।
দুটো ডাবল-পার্ক করা ট্রাকের মাঝখান দিয়ে গাড়িটা গলিয়ে দিল স্যাক্স, মনে মনে আশা করল যাত্রী বা ড্রাইভার কেউ যেন দরজা না খোলে। ডপলার এফেক্টের শিস তুলে পার হয়ে গেল ওগুলোকে।
নড়াচড়ার উপর থাকলে ওরা তোমায় ধরতে পারবে না…
স্থুল আঙুলের ডগা দিয়ে নিজের গোলগাল মুখ ডলল লন সেলিটো, এই ইন্ডি ৫০০ রেসের মতো ড্রাইভিং-এ পাত্তাই দিল না। ব্যালেন্স শিট নিয়ে আলোচনা করা অ্যাকাউন্ট্যান্টের মতো কেসটা নিয়ে কথা বলতে লাগল পার্টনারের সাথে। ওদিকে স্যাক্সের চোখ আর ঠোঁটের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাতে ভুলে গেছে ব্যাংকস। প্রতি মিনিটে স্পিডোমিটার চেক করছে সে।
ব্রুকলিন ব্রিজের পাশ দিয়ে উন্মাদ গতিতে বাঁক নিয়ে রীতিমতো পিছলে চলে গেল তারা।
আবারো সেই বন্দি মেয়েটির কথা ভাবল সে, স্টিয়ারিং হুইলে নিজের খুবলে ফেলা আঙুলগুলো দিয়ে টোকা দিতে দিতে টি.জে.-র লম্বা, সুন্দর নখগুলোর ছবি ভাসল মনে। মনের পর্দায় সেই ছবিটা আবার দেখল। কিছুতেই সরতে চাইছে না ওটা: ভেজা কবর থেকে বেরিয়ে থাকা সাদা বার্চ গাছের ডালের মতো একটা হাত। একটাই রক্তাক্ত হাড়।
‘লোকটা একটু পাগলাটে,’ চিন্তার মোড় ঘোরাতে হঠাৎ বলে বসল সে।
‘কে?’ জিজ্ঞেস করল সেলিট্টো।
‘রাইম।’
ব্যাংকস যোগ করল, ‘আমাকে জিজ্ঞেস করলে বলব, ওকে হাওয়ার্ড হিউজের ছোট ভাইয়ের মতো দেখায়।’
‘হ্যাঁ, মানে… আমিও অবাক হয়েছি,’ স্বীকার করল বয়স্ক ডিটেকটিভ। ‘যদিও চেহারাটা এখন খুব একটা ভালো দেখায় না। তবে একসময় বেশ সুদর্শন ছিল। কিন্তু মানে, বুঝতেই পারছ…যা ধকল গেছে ওর উপর দিয়ে। ভালোই তো ড্রাইভ করো, স্যাক্স, তবে পেট্রোলে কেন?’
‘যেখানে অ্যাসাইনমেন্ট পেলাম আর কি। ওরা জিজ্ঞেস করেনি, হুকুম দিয়েছে আমাকে।’ ঠিক তোমার মতোই, মনে মনে ভাবল সে।
‘ও কি সত্যিই অতটা ভালো ছিল?’
‘রাইম? লোকে যা বলে তার চেয়েও ভালো। নিউ ইয়র্কের বেশিরভাগ সিএসইউ লোক বছরে দুশো লাশ সামলায়, বড়জোর। রাইম তার দ্বিগুণ করত। এমনকি যখন আইআরডি চালাত তখনো। পেরেত্তির কথাই ধরো। ও ভালো লোক, কিন্তু দুসপ্তাহে হয়তো একবার বেরোয়, তাও শুধু মিডিয়া কেসগুলোতে। আমি বলেছি এটা কাউকে বলা যাবে না কিন্তু।’
‘ওকে, স্যার।’
‘রাইম নিজে সিন পরিচালনা করত। আর যখন করত না, তখন বাইরে ঘুরে বেড়াত।’
‘কী করত?’
‘এমনিই হাঁটত। জিনিসপত্র দেখত। মাইলের পর মাইল হাঁটত ও। সারা শহর চষে বেড়াত। জিনিস কিনত, কুড়িয়ে পেত, সংগ্রহ করত।’
‘কী ধরনের জিনিস?’
‘এভিডেন্স স্ট্যান্ডার্ড। মাটি, খাবার, ম্যাগাজিন, চাকার হাবক্যাপ, জুতো, ডাক্তারি বই, ঔষধ, গাছপালা…যত কিছুর নাম মাথায় আসে, সব খুঁজে বের করে ক্যাটালগ করত সে। যাতে কোনো ফিজিক্যাল এভিডেন্স পেলে সে বুঝতে পারে আসামি কোথায় ছিল বা কী করছিল। ওকে পেজ করলে দেখা যেত হার্লেম বা লোয়ার ইস্ট সাইড বা হেলস কিচেনে আছে সে।’
‘ওর বংশে কেউ পুলিশ ছিল?’
‘উঁহু। বাবা কোনো ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি বা অমন কিছুর বিজ্ঞানী ছিল।’
‘রাইমের কি ওদিকেই পড়াশোনা? বিজ্ঞান?’
‘হ্যাঁ। শ্যাম্পেইন-আরবানায় স্কুলে গিয়েছিল, গোটাকয়েক দামি ডিগ্রি আছে। কেমিস্ট্রি আর ইতিহাস। কেন কে জানে। আমি যখন থেকে চিনি, তখন থেকেই ওর মা-বাবা নেই। তা ধরো… পনেরো বছর তো হবেই। আর কোনো ভাইবোনও নেই। ইলিনয়ে বড় হয়েছে সে। সেজন্যই নামটা লিংকন।’
ও বিবাহিত ছিল কি না জিজ্ঞেস করতে চাইল সে, কিন্তু করল না। তার বদলে জিজ্ঞেস করল, ‘ও কি সত্যিই ওরকম…’
‘বলেই ফেলো, অফিসার।’
‘বেয়াড়া?’
হেসে উঠল ব্যাংকস।
‘আমার মায়ের ভাষায় ওকে একরোখা বলা যায়,’ বলল সেলিটো। ‘একবার এক গাধা টেকনিশিয়ান আঙুলের ছাপের উপর নিনহাইড্রিনের বদলে লুমিনল-রক্তের রিএজেন্ট-স্প্রে করেছিল। ছাপটা নষ্ট করে দিয়েছিল। রাইম স্পটেই তাকে বরখাস্ত করেছিল। আরেকবার এক পুলিশ ক্রাইম সিনে বাথরুমে গিয়ে কমোড ফ্লাশ করেছিল। বাপরে, রাইম তো রেগে আগুন। ওকে বলল এক্ষুনি বেসমেন্টে গিয়ে সুয়্যারেজ ট্র্যাপে যা আছে সব তুলে আনতে।’
হাসল সেলিট্টো। ‘পুলিশটার র্যাংক ছিল। সে বলল, “আমি ওসব করব না! আমি একজন লেফটেন্যান্ট!” আর রাইম বলল, “ও তাই! এখন থেকে তুমি প্লাম্বার।” এমন হাজারটা গল্প বলতে পারি। মেরেছে! অফিসার, তুমি কি আশিতে চালাচ্ছ?’
বিগ বিল্ডিং বা হেডকোয়ার্টার পেরিয়ে গেল তারা ঝড়ের বেগে। স্যাক্সের বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠল। এখন তো আমার ওখানেই থাকার কথা ছিল। সহকর্মী ইনফরমেশন অফিসারদের সাথে দেখা করা, ট্রেনিং সেশনে বসে থাকা, এসির বাতাস খাওয়া…
লাল বাতি অমান্য করে হামাগুড়ি দিয়ে এগোনো একটা ট্যাক্সিকে ওস্তাদের মতো পাশ কাটিয়ে গেল সে।
খোদা, কী গরম। এখানকার ধুলো গরম, দুর্গন্ধ গরম, গ্যাসও গরম। শহরের জঘন্য সময় চলছে এখন। হার্লেমে ফায়ার হাইড্রেন্ট থেকে ছিটকে বেরোনো ধূসর পানির মতো মেজাজ চড়ে যাচ্ছে সবার।
দুই ক্রিসমাস আগে ও আর তার বয়ফ্রেন্ড সংক্ষিপ্ত একটা ছুটি কাটিয়েছিল-রাত এগারোটা থেকে বারোটা পর্যন্ত। দুইজনের ডিউটির ফাঁকে ওটুকুই ছিল ফাঁকা সময়। চার ডিগ্রি তাপমাত্রার রাতে সে আর নিক রকফেলার সেন্টারে স্কেটিং রিংকের কাছে বাইরে বসে কফি আর ব্র্যান্ডি খেয়েছিল। ওরা একমত হয়েছিল যে আগস্টের ভ্যাপসা গরমের চেয়ে এক সপ্তাহ হাড়কাঁপানো শীতই ভালো।
অবশেষে, পার্ল স্ট্রিট ধরে উড়ে গিয়ে হাউম্যানের কমান্ড পোস্ট দেখতে পেল সে। আট ফুট লম্বা স্কিড মার্ক রেখে ইএসইউ ক্যাপ্টেনের গাড়ি আর একটা ইএমএস বাসের মাঝখানের ফাঁকায় আরআরভিটা ঢোকাল স্যাক্স।
‘দারুণুণ চালাও তুমি, মানতেই হবে।’ নেমে পড়ল সেলিটো। পেছনের দরজা খোলার সময় জেরি ব্যাংকসের ঘর্মাক্ত আঙুলের ছাপ জানালার উপর জ্বলজ্বল করতে দেখে মন ভালো হয়ে গেল স্যাক্সের।
ইএমএস অফিসার আর পেট্রোল পুলিশ গিজগিজ করছে সবখানে, পঞ্চাশ-ষাটজন তো হবেই। আরো আসছে। মনে হলো পুলিশ প্লাজার পুরো মনোযোগ এখন ডাউনটাউন নিউ ইয়র্কে। স্যাক্স আনমনে ভাবল, কেউ যদি গ্রাসি ম্যানশন বা কোনো কনস্যুলেট দখল করতে চায় বা কাউকে খুন করতে চায়, তবে এটাই উপযুক্ত সময়।
স্টেশন ওয়াগনের কাছে দৌড়ে এল হাউম্যান। সেলিট্টোকে বলল, ‘আমরা ঘরে ঘরে গিয়ে খুঁজছি, পার্ল স্ট্রিটের কনস্ট্রাকশন সাইটগুলো দেখছি। কেউ অ্যাসবেস্টস কাজের ব্যাপারে কিছু জানে না, কেউ কোনো সাহায্যের চিৎকারও শোনেনি।’
নামার উপক্রম করল স্যাক্স, কিন্তু হাউম্যান বলল, ‘না, অফিসার। সিএস বা ক্রাইম সিন ভেহিকলের সাথে থাকার অর্ডার আছে আপনার।’
তারপরও নেমেই পড়ল সে। ‘ইয়েস, স্যার। কথাটা ঠিক কে বলেছে?’
‘ডিটেকটিভ রাইম। এইমাত্র কথা হলো ওর সাথে। সিপিতে পৌঁছালে আপনাকে সেন্ট্রালে কল করতে বলেছে।’
হেঁটে চলে গেল হাউম্যান। সেলিট্টো আর ব্যাংকস দ্রুত পায়ে কমান্ড পোস্টের দিকে গেল।
‘ডিটেকটিভ সেলিটেট্টা,’ ডাকল স্যাক্স।
ঘুরল সে।
‘আমার ওয়াচ কমান্ডার কে আসলে? আমি কার কাছে রিপোর্ট করব?’
‘রাইমের কাছে,’ ছোট্ট করে বলল সেলিটো।
হেসে ফেলল স্যাক্স। ‘কিন্তু আমি তো ওর কাছে রিপোর্ট করতে পারি না।’
ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে রইল সেলিটো।
‘মানে, আইনি দায়বদ্ধতার ব্যাপার নেই? জুরিসডিকশন বা এখতিয়ার? ও একজন সাধারণ নাগরিক। রিপোর্ট করার জন্য আমার এমন কাউকে লাগবে যার ব্যাজ আছে।’
সেলিট্টো শান্ত গলায় বলল, ‘অফিসার, কান খাড়া করে শুনে রাখো। আমরা সবাই লিংকন রাইমের কাছে রিপোর্ট করছি। ও সিভিলিয়ান না চিফ নাকি কেপড ক্রুসেডার ব্যাটম্যান তাতে আমাদের কিচ্ছু যায় আসে না। বোঝা গেছে?’
‘কিন্তু…’
‘অভিযোগ করতে চাইলে লিখিতভাবে করবে এবং সেটা কাল করবে।’ এই বলে চলে গেল সে।
কিছুক্ষণ তার গমনপথের দিকে তাকিয়ে রইল স্যাক্স, তারপর ওয়াগনের সামনের সিটে ফিরে এসে সেন্ট্রালে জানাল যে সে ঘটনাস্থলে ১০-৮৪ বা উপস্থিত। নির্দেশের অপেক্ষায়।
মহিলা কণ্ঠস্বর রিপোর্ট করল, ‘টেন-ফোর, পোর্টেবল ৫৮৮৫। জেনে রাখুন। ডিটেকটিভ রাইম শীঘ্রই যোগাযোগ করবেন, কে।’
শুনে বিষণ্ণ হাসি হাসল সে। ডিটেকটিভ রাইম।
‘টেন-ফোর, কে,’ জবাব দিল স্যাক্স আর ওয়াগনের পেছনের দিকে তাকাল, আনমনে ভাবল কালো স্যুটকেসগুলোর ভেতরে কী আছে।
দুপুর দুটো চল্লিশ।
রাইমের টাউনহাউজে ফোন বাজতেই ধরল টম। ‘হেডকোয়ার্টার থেকে একজন ডিসপ্যাচার।’
‘লাইন দাও।’
স্পিকারফোন জীবন্ত হয়ে উঠল। ‘ডিটেকটিভ রাইম, আমাকে মনে থাকার কথা নয় আপনার, কিন্তু আপনি যখন আইআরডি-তে ছিলেন, তখন আমিও ছিলাম। সিভিলিয়ান। ফোন ডিটেইলে কাজ করতাম। এমা রলিন্স।’
‘অবশ্যই। বাচ্চারা কেমন আছে, এমা?’ রাইমের মনে পড়ল এক বিশালবপু, হাসিখুশি কৃষ্ণাঙ্গ মহিলার কথা, দুই জায়গায় চাকরি করে পাঁচ বাচ্চাকে মানুষ করছে। তার ভোঁতা আঙুল দিয়ে এত জোরে বোতাম টিপত যে একবার সরকারি ফোনই ভেঙে ফেলেছিল সে।
‘জেরেমি সপ্তাহ দুয়েক পর কলেজে যেতে শুরু করেছে, আর ডোরা এখনো অভিনয় করছে, বা ও তাই মনে করে আর কি। ছোটরা ভালোই আছে।’
‘লন সেলিট্টো রিক্রুট করেছে তোমাকে, তাই না?’
‘না, স্যার। শুনলাম আপনি কেসটা নিয়ে কাজ করছেন, তাই এক বাচ্চাকে খেদিয়ে নাইন-ওয়ান-ওয়ানে পাঠিয়ে দিলাম। বললাম এমা এই কাজটা নিচ্ছে।’
‘আমাদের জন্য কী পেলে?’
‘বল্টু বানায় এমন কোম্পানির ডিরেক্টরি ধরে কাজ করছি। আর পাইকারি বেচে এমন জায়গার তালিকা ধরে এই-ই যা পেলাম। অক্ষরগুলোই সাহায্য করল… বল্টুর উপর খোদাই করা অক্ষরগুলো। সিই (CE)। ওগুলো বিশেষ করে কন এড-এর জন্য তৈরি।’
ঐ জন্যই!
‘ওভাবে মার্ক করা কারণ এই কোম্পানি যেসব বল্টু বেচে তার চেয়ে এগুলোর সাইজ আলাদা-এক ইঞ্চির পনেরো-ষোলো ভাগ, আর অন্য বল্টুর চেয়ে প্যাঁচ অনেক বেশি। ডেট্রয়েটের মিশিগান টুল অ্যান্ড ডাই বানায় ওগুলো। নিউ ইয়র্কের শুধু পুরোনো পাইপেই ব্যবহার করা হয় ওগুলো। ষাট-সত্তর বছর আগে যেগুলো বসানো হয়েছিল। পাইপের অংশগুলো যেভাবে জোড়া লাগানো হয় তাতে খুব টাইট সিল দরকার হয়। বাসর রাতে বর-বউয়ের চেয়েও বেশি টাইট ফিট হতে হয়-লোকটা তাই বলল আমাকে। আমাকে লজ্জা দেওয়ার চেষ্টা করছিল আর কি।’
‘এমা, তোমাকে ভালোবাসি আমি। লাইনে থেকো, থাকবে তো?’
‘নিশ্চয়ই থাকব।’
‘টম!’ চেঁচিয়ে উঠল রাইম। ‘এই ফোন দিয়ে কাজ হবে না। আমাকেই ফোন করতে হবে। কম্পিউটারের ঐ ভয়েস-অ্যাক্টিভেশন জিনিসটা। ওটা ব্যবহার করতে পারি?’
‘আপনি তো ওটা অর্ডার করেননি কখনো।’
‘করিনি?’
‘না।’
‘আচ্ছা, ওটা আমার লাগবে।’
‘কিন্তু আমাদের তো নেই ওটা।’
‘কিছু একটা করো। আমি নিজে ফোন করতে চাই।’
‘মনে হয় কোথাও একটা ম্যানুয়াল ইসিইউ আছে।’
দেয়ালের কাছে রাখা একটা বাক্স হাতড়াল টম। ছোট একটা ইলেকট্রনিক কনসোল বের করল, যার এক প্রান্ত ফোনে গুঁজে অন্য প্রান্তটা একটা দণ্ড বা স্টকের সাথে লাগাল যেটা রাইমের গালের কাছে মাউন্ট করা হলো।
‘বড্ড ঝামেলার!’
‘এটুকুই আছে আমাদের কাছে। আমার কথামতো যদি ভ্রুর উপরে ইনফ্রারেডটা লাগাতেন, তবে গত দুই বছর ধরে ফোন-সেক্স করতে পারতেন।’
‘বড্ড বেশি তার!’ খিঁচিয়ে উঠল রাইম।
হঠাৎ ঘাড় শক্ত হয়ে খিঁচুনি হলো তার, ধাক্কা লেগে কন্ট্রোলারটা নাগালের বাইরে চলে গেল। ‘ফাক।’
মিশন তো দূরের কথা, হঠাৎ করে এই সামান্য কাজটাকেই লিংকন রাইমের কাছে অসম্ভব মনে হলো। ক্লান্ত সে, ঘাড়ে ব্যথা, মাথায় ব্যথা। চোখগুলো বিশেষ করে খুব জ্বালাপোড়া করছে। চোখ বন্ধ করে ডলতে ইচ্ছা হচ্ছে ভীষণ। আরামের জন্য দুনিয়ার বাকি সবাই প্রতিদিন করে যে কাজ।
জয়স্টিকটা যথাস্থানে রাখল টম।
কোথাও থেকে ধৈর্য সঞ্চয় করে রাইম তার সহকারীকে জিজ্ঞেস করল, ‘কাজ করে কীভাবে এটা?’
‘ঐ তো স্ক্রিন। কন্ট্রোলারে দেখতে পাচ্ছেন? স্টিকটা নেড়ে একটা নম্বরের উপর নিন, এক সেকেন্ড অপেক্ষা করুন, প্রোগ্রাম হয়ে যাবে। তারপর পরের নম্বরটা একইভাবে। সাতটা নম্বর হয়ে গেলে ডায়াল করার জন্য স্টিকটা এখানে চাপ দিন।’
খেঁকিয়ে উঠল সে, ‘কাজ করছে না!’
‘প্র্যাকটিস করুন।’
‘আমাদের হাতে সময় নেই!’
টমও গর্জে উঠল, ‘আপনার হয়ে অনেক দিন ফোন ধরেছি আমি।’
‘ঠিক আছে,’ গলা নামিয়ে বলল রাইম-এটাই তার ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গি। ‘পরে প্র্যাকটিস করব। কন এড-কে একটু ধরিয়ে দেবে, প্লিজ? সুপারভাইজারের সাথে কথা বলতে হবে।’
দড়িটা ব্যথা দিচ্ছিল আর হাতকড়াও, কিন্তু শব্দটাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দিল। শরীরের সমস্ত ঘাম যেন মুখ, বুক আর হাত বেয়ে নামছে-মরচেধরা বল্টুর উপর হাতকড়ার শিকল ঘষতে ঘষতে অনুভব করল ট্যামি জিন কোলফ্যাক্স। কবজি অবশ হয়ে গেছে, কিন্তু মনে হলো শিকলটা কিছুটা ক্ষয় করতে পেরেছে সে।
থামল সে, ক্লান্ত, ক্র্যাম্প বা খিল ধরা এড়াতে হাতদুটো এদিক-ওদিক নাড়াল। আবার কান পাতল। শ্রমিকরা বল্টু টাইট দিচ্ছে আর হাতুড়ি দিয়ে পার্টস বসাচ্ছে, শব্দটা তেমনই মনে হলো তার কাছে। হাতুড়ির শেষ বাড়িগুলো। কল্পনা করল ওরা পাইপের কাজ শেষ করে ফেলেছে, বাড়ি যাওয়ার কথা ভাবছে।
যেয়ো না, মনে মনে চিৎকার করে উঠল সে। আমাকে ফেলে যেয়ো না। যতক্ষণ লোকগুলো ওখানে আছে, কাজ করছে, ততক্ষণ সে নিরাপদ। শেষ একটা দড়াম শব্দ, তারপর রিনরিনে নীরবতা।
বেরিয়ে যা ওখান থেকে, মেয়ে! এক্ষুনি যা!
মা…
মিনিট কয়েক কাঁদল টি.জে., পূর্ব টেনেসির বাড়ির কথা ভাবল। নাক বন্ধ হয়ে এল। দম আটকে আসতেই সজোরে নাক ঝাড়ল সে, কান্না আর সর্দির বিস্ফোরণ টের পেল। আবার শ্বাস নিতে পারছে। এতে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল সে। ফিরে পেল শক্তি। তারপর আবার ঘষতে শুরু করল মেয়েটা।
‘জরুরি ব্যাপারটা বুঝতে পারছি, ডিটেকটিভ। কিন্তু আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি জানি না। আমরা সারা শহরেই বল্টু ব্যবহার করি। তেলের লাইন, গ্যাসের লাইন…’
‘ঠিক আছে,’ সংক্ষেপে বলল রাইম। তারপর ফোরটিনথ স্ট্রিটে কোম্পানির হেডকোয়ার্টারে থাকা কন এড সুপারভাইজারকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনারা কি ওয়্যারিং ইনসুলেট বা আবৃত করার জন্য অ্যাসবেস্টস ব্যবহার করেন?’
একটু ইতস্তত ভাব।
‘আমরা ওটার নব্বই ভাগ পরিষ্কার করে ফেলেছি স্মৃতিগুলো,’ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুরে বলল মহিলা। ‘পঁচানব্বই।’
মানুষগুলো যে কী বিরক্তিকর হতে পারে।
‘সেটা আমি জানি। আমি শুধু জানতে চাই ইনসুলেশনের জন্য অ্যাসবেস্টস এখনো ব্যবহার করা হয় কি না।’
‘না,’ জোর দিয়ে বলল সে। ‘মানে, বিদ্যুতের জন্য কক্ষনো না। শুধু বাষ্প বা স্টিমের জন্য আর সেটা আমাদের সার্ভিসের খুব সামান্য অংশ।’
স্টিম!
শহরের ইউটিলিটিগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে কম পরিচিত এবং সবচেয়ে ভীতিকর। পানি ১,০০০ ডিগ্রি পর্যন্ত গরম করে তারপর ম্যানহাটনের নিচ দিয়ে চলে যাওয়া একশো মাইলের পাইপ নেটওয়ার্কের ভেতর দিয়ে সেটা ছোটায় কন এড। ফোসকা ফেলা স্টিম নিজেই ভীষণ উত্তপ্ত-প্রায় ৩৮০ ডিগ্রি। সেটা শহরের ভেতর দিয়ে ঘণ্টায় পঁচাত্তর মাইল বেগে রকেটের মতো ছুটে চলে।
পত্রিকায় পড়া একটা আর্টিকেলের কথা মনে পড়ে গেল রাইমের। ‘গত সপ্তাহে আপনাদের লাইনে ফাটল ধরেনি?’
‘ইয়েস, স্যার। কিন্তু কোনো অ্যাসবেস্টস লিক হয়নি। ঐ জায়গাটা বছর কয়েক আগেই পরিষ্কার করা হয়েছিল।’
‘তো?’
‘কিন্তু ডাউনটাউনে সিস্টেমে আপনাদের কিছু পাইপের চারপাশে অ্যাসবেস্টস আছে’
ইতস্তত করল সে। ‘মানে…’
‘ফাটলটা কোথায় ছিল?’ দ্রুত বলে গেল রাইম।
‘ব্রডওয়ে। চেম্বার্সের এক ব্লক উত্তরে।’
‘ওটা নিয়ে টাইমস-এ একটা আর্টিকেল ছিল না?’
‘জানি না। হতে পারে। হ্যাঁ।’
‘আর আর্টিকেলটাতে কি অ্যাসবেস্টসের কথা উল্লেখ ছিল?’
‘ছিল,’ স্বীকার করল সে, ‘তবে শুধু বলেছিল যে অতীতে অ্যাসবেস্টস দূষণ একটা সমস্যা ছিল।’
‘যে পাইপটা ফেটেছিল, সেটা কি… আরো দক্ষিণে পার্ল স্ট্রিট ক্রস করেছে?’
‘আচ্ছা, দেখি। হ্যাঁ, করেছে। হ্যানোভার স্ট্রিটে। উত্তর দিকে।’
টি.জে. কোলফ্যাক্সের ছবিটা মনে ভাসল তার। সরু আঙুল আর লম্বা নখের সেই মেয়েটা এখন মরতে বসেছে।
‘আর তিনটায় স্টিম আবার চালু হচ্ছে?’
‘ঠিক তাই। এই যেকোনো মুহূর্তে।’
‘এ হতে পারে না!’ চেঁচিয়ে উঠল রাইম। ‘কেউ লাইনটার সাথে কারসাজি করেছে। আপনারা ঐ স্টিম চালু করতে পারেন না!’
মাইক্রোস্কোপ থেকে মুখ তুলে উদ্গ্রীব হয়ে তাকাল কুপার।
সুপারভাইজার বলল, ‘দেখুন, আমি তো জানি না…’
টমকে ধমক দিল রাইম, ‘লনকে ফোন করো, বলো হ্যানোভার আর পার্লের একটা বেসমেন্টে আছে মেয়েটা। উত্তর দিকে।’ স্টিমের কথাও বলল তাকে। ‘ফায়ার ডিপার্টমেন্টকেও ওখানে যেতে বলো। হিট-প্রটেক্টিভ গিয়ারসহ।’
স্পিকারফোনে চিৎকার করে উঠল রাইম। ‘ওয়ার্ক ক্রু বা কর্মীদের ফোন করুন! এখনই! ওরা স্টিম চালু করতে পারবে না। পারবে না!’
আনমনে কথাগুলো আউড়ে গেল সে। নিজের নিখুঁত কল্পনাশক্তিকে ঘৃণা হচ্ছে এখন। মনের পর্দায় অন্তহীন লুপে দেখছে, মেয়েটার চামড়া গোলাপি হয়ে গেল, তারপর লাল, তারপর ফেটে যাচ্ছে ঐ থুতু ছেটানো সাদা বাষ্পের ভয়ানক মেঘের নিচে।
স্টেশন ওয়াগনে রেডিও ক্যাঁচক্যাঁচ করে উঠল। স্যাক্সের ঘড়িতে তখন তিনটা বাজতে তিন মিনিট বাকি। কলটা রিসিভ করল সে।
‘পোর্টেবল ৫৮৮৫, কে…’
‘অফিশিয়াল বুলি বাদ দাও, অ্যামেলিয়া,’ রাইম বলল। ‘সময় নেই আমাদের।’
‘আমি…’
‘আমরা মনে হয় জানি ও কোথায়। হ্যানোভার অ্যান্ড পার্ল।’
ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল সে, দেখল ডজনখানেক ইএসইউ অফিসার জানপ্রাণ দিয়ে ছুটছে একটা পুরোনো দালানের দিকে।
‘আপনি কি চান আমি…’
‘ওরা খুঁজবে ওকে। তোমাকে সিন প্রসেস করার জন্য তৈরি হতে হবে।’
‘কিন্তু আমি সাহায্য করতে পারি…’
‘না। আমি চাই তুমি স্টেশন ওয়াগনের পেছনে যাও। ওতে জিরো-টু লেখা একটা স্যুটকেস আছে। ওটা সাথে নাও। আর একটা ছোট কালো কেসে একটা পলি-লাইট আছে। আমার ঘরে একটা দেখেছিলে। মেল ব্যবহার করছিল। ওটাও নাও। জিরো-থ্রি লেখা স্যুটকেসে একটা হেডসেট আর স্টক মাইক পাবে। তোমার মটোরোলার সাথে ওটা লাগাও আর অফিসাররা যে দালানে আছে সেখানে যাও। তৈরি হয়ে আমাকে কল করবে। চ্যানেল থার্টি-সেভেন। আমি ল্যান্ডলাইনে থাকব, কিন্তু তোমাকে আমার সাথে প্যাচ বা কানেক্ট করে দেওয়া হবে।’
চ্যানেল থার্টি-সেভেন। স্পেশাল অপস সিটিওয়াইড ফ্রিকোয়েন্সি। প্রায়োরিটি ফ্রিকোয়েন্সি।
‘কী…’ জিজ্ঞেস করল সে। কিন্তু মরা রেডিও কোনো জবাব দিল না।
ইউটিলিটি বেল্টে একটা লম্বা কালো হ্যালোজেন টর্চলাইট আছে তার, তাই ওয়াগনের পেছনে ভারী টুয়েলভ-ভোল্টারটা রেখে পলি-লাইট আর ভারী স্যুটকেসটা তুলে নিল সে। ওজন পঞ্চাশ পাউন্ড হবে নির্ঘাত। আমার জখম জয়েন্টগুলোর জন্য একেবারে উপযুক্ত দাওয়াই।
গ্রিপটা ঠিক করে নিল সে, ব্যথায় দাঁতে দাঁত চেপে ছুটল মোড়ের দিকে। হাঁপাতে হাঁপাতে দালানটার কাছে পৌঁছাল সেলিট্টো। যোগ দিল ব্যাংকসও।
‘শুনেছ?’ বয়স্ক ডিটেকটিভ জিজ্ঞেস করল।
মাথা নাড়ল স্যাক্স।
‘এটাই সেই জায়গা?’ জিজ্ঞেস করল মেয়েটা।
গলির দিকে মাথা নাড়ল সেলিট্টো। ‘আততায়ী এই পথেই নিয়েছে মেয়েটাকে। কারণ লবিতে গার্ড আছে।’
ছায়াঘেরা, খোয়া-বাঁধানো সুড়ঙ্গের মতো রাস্তা দিয়ে ছুটল তারা, ভ্যাপসা গরম, প্রস্রাব আর আবর্জনার গন্ধ। কাছেই নীলরঙা সব ভাঙাচোরা ডাম্পস্টার বা ময়লা ফেলার পাত্র।
‘ঐ যে!’ চিৎকার করে উঠল সেলিট্টো। ‘ঐ দরজাগুলো।’
ছড়িয়ে পড়ল পুলিশরা, ছুটছে।
চারটা দরজার তিনটাই ভেতর থেকে শক্ত করে আটকানো। চতুর্থটা জিম্মি করে বা জোর করে খোলা হয়েছিল এবং এখন শিকল দিয়ে আটকানো। শিকল আর তালাটা নতুন।
‘এটাই!’
দরজার দিকে হাত বাড়াল সেলিট্টো, ইতস্তত করল। সম্ভবত আঙুলের ছাপের কথা ভাবছে। তারপর হাতল ধরে হ্যাঁচকা টান দিল। কয়েক ইঞ্চি খুললেও শিকলটা আটকে রাখল। সামনের দিক দিয়ে ঘুরে ভেতরে ঢুকে বেসমেন্টে যাওয়ার জন্য তিনজন ইউনিফর্ম পরা পুলিশকে পাঠাল সে।
এক পুলিশ গলির মেঝের একটা পাথর আলগা করে দরজার হাতলে বাড়ি মারতে শুরু করল। আধ-ডজন বাড়ি, এক ডজন… আচমকা তার হাত দরজায় বাড়ি খেতেই মুখ কুঁচকে ফেলল সে। ছিঁড়ে যাওয়া আঙুল থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে এখন।
এক ফায়ারম্যান ছুটে এল হ্যালিগান টুল হাতে-গাঁইতি আর শাবলের এক কম্বিনেশন। শিকলের ভেতর ওটার আগা ঢুকিয়ে দিয়ে তালাটা ভেঙে ফেলল সে।
প্রত্যাশা নিয়ে স্যাক্সের দিকে তাকাল সেলিট্টো। সে-ও তাকিয়ে রইল।
‘কী হলো, অফিসার, যাও!’ ধমকে উঠল সে।
‘কী?’
‘তোমাকে বলেনি ও?’
‘কে?’
‘রাইম।’
ধুর, হেডসেটটা প্লাগ ইন করতে ভুলে গেছে সে। ওটা নিয়ে ধস্তাধস্তি করে অবশেষে লাগাল। শুনতে পেল: ‘অ্যামেলিয়া, কোথায়…’
‘আমি এখানে।’
‘তুমি কি দালানটায় আছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘ভেতরে যাও। ওরা স্টিম বন্ধ করেছে, কিন্তু সময়মতো হয়েছে কি না জানি না। একজন মেডিক আর একজন ইএসইউ ট্রুপারকে সাথে নাও। বয়লার রুমে যাও। হয়তো শুরুতেই দেখতে পাবে ওকে, ঐ কোলফ্যাক্স মহিলাকে। ওর দিকে হেঁটে যাবে কিন্তু সোজাসুজি নয়। মানে দরজা থেকে ওর দিকে সোজা লাইনে যাবে না। অপহরণকারী কোনো পায়ের ছাপ রেখে গেলে সেটা নষ্ট হোক, তা আমি চাই না। বুঝেছ?’
‘হ্যাঁ।’ জোর দিয়ে মাথা নাড়ল সে, খেয়ালই করল না যে রাইম তাকে দেখতে পাচ্ছে না।
মেডিক আর ইমার্জেন্সি সার্ভিসেস ট্রুপারকে ইশারা করে আব্বা করিডরে পা বাড়াল স্যাক্স। চারদিকে ছায়া, যন্ত্রপাতির গোঙানি, টপটপ করে পড়া পানি।
‘অ্যামেলিয়া,’ বলল রাইম।
‘হ্যাঁ।’
‘আগে আমরা চোরাগোপ্তা হামলার কথা বলছিলাম। এখন ওর সম্পর্কে যা জেনেছি তাতে মনে হয় না তেমন কিছু হবে। ও সেখানে নেই, অ্যামেলিয়া। থাকলে সেটা অযৌক্তিক হতো। কিন্তু তোমার শুটিং হ্যান্ড খালি রেখো।’
অযৌক্তিক।
‘ঠিক আছে।’
‘এবার যাও! জলদি।’
