অধ্যায় তিন
রাইমের দেখা সেরা বেডসাইড ম্যানার জানা লোক হলো এই ব্যক্তি। আর এই ব্যাপারে কারো অভিজ্ঞতা থাকলে সেটা লিংকন রাইমেরই আছে। একবার হিসাব করে দেখেছিল, গত সাড়ে তিন বছরে প্রায় আটাত্তরজন ডিগ্রিধারী ডাক্তারের পাল্লায় পড়েছে সে।
‘দৃশ্যটা চমৎকার,’ জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল বার্জার। ‘তাই না? সুন্দর।’
যদিও বিছানার উচ্চতার কারণে সেন্ট্রাল পার্কের উপর ঝুলে থাকা ধোঁয়াশাচ্ছন্ন আকাশ ছাড়া আর কিছুই দেখার উপায় নেই রাইমের। ঐ আকাশ আর পাখিগুলোই ওর গত আড়াই বছরের পৃথিবী, রিহ্যাব ছেড়ে এখানে আসার পর। তবে জানালার পর্দাটা নামানোই থাকে বেশিরভাগ সময়।
বসকে পাশ ফিরিয়ে শোয়াতে ব্যস্ত তখন টম-ফুসফুস পরিষ্কার রাখার জন্য জরুরি এটা। তারপর রাইমের মূত্রথলিতে ক্যাথেটার পরিয়ে দিল সে, প্রতি পাঁচ-ছয় ঘণ্টা পরপর যেটা করা লাগে। স্পাইনাল কর্ডে আঘাতের পর স্ফিংকটার বা পেশিগুলো হয় সব সময় খোলা থাকে, নয়তো একদম বন্ধ হয়ে যায়। রাইমের ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে গেছে। ভাগ্য ভালোই বলতে হবে। অবশ্য, যদি দিনে চারবার সেই ছোট পাইপটা খোলার জন্য কে-ওয়াই জেলি আর ক্যাথেটার হাতে কাউকে পাওয়া যায় তবেই।
ভাবলেশহীন মুখে পুরো প্রক্রিয়াটা দেখলেন ডাক্তার বার্জার, আর গোপনীয়তা নিয়ে রাইমেরও কোনো মাথাব্যথা নেই। পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পর লজ্জাটাই সবার আগে হারিয়ে ফেলে মানুষ। মাঝে মাঝে শরীর ঢাকার একটা লোকদেখানো চেষ্টা করা হয় বটে-পরিষ্কার করা বা পরীক্ষা করার সময়-কিন্তু সিরিয়াস পঙ্গু, আসল পঙ্গু, হিম্মতওয়ালা পঙ্গুরা ওসবের তোয়াক্কা করে না। রাইমের প্রথম রিহ্যাব সেন্টারে কেউ পার্টি বা ডেটে গেলে পরদিন সকালে ওয়ার্ডের বাকিরা তার বিছানার কাছে ভিড় জমাত প্রস্রাবের পরিমাণ দেখার জন্য; আউটিংটা কতটা সফল হয়েছে তার ব্যারোমিটার ছিল ওটা। একবার তো ১৪৩০ সিসি প্রস্রাব করে সঙ্গীদের চোখে হিরো বনে গিয়েছিল রাইম।
বার্জারকে বলল সে, ‘কার্নিশটা দেখুন, ডাক্তার। আমার নিজস্ব গার্ডিয়ান এঞ্জেল।’
‘বাহ। বাজপাখি?’
‘পেরিগ্রিন ফ্যালকন। সাধারণত আরো উঁচুতে বাসা বাঁধে এরা। কে জানে কেন আমার সঙ্গেই থাকাটা পছন্দ করল ওরা।’
পাখিগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে জানালা থেকে সরে এল বার্জার, ফেলে দিল পর্দাটা। পক্ষীকূল নিয়ে খুব একটা আগ্রহ নেই তার। বিশালদেহী নয় লোকটা, তবে শরীরটা বেশ ফিট। রাইমের ধারণা সে দৌড়বিদ। বয়স চল্লিশের কোঠার শেষের দিকে হতে পারে, কিন্তু কালো চুলে পাক ধরেনি একটুও, আর চেহারাটা একেবারে সংবাদ পাঠকদের মতো।
‘বিছানাটা তো বেশ।’
‘পছন্দ হয়েছে?’
ক্লিনিট্রন কোম্পানির বিছানা, বিশাল একটা আয়তাকার স্ল্যাব যেন। এয়ার- ফ্লুইডাইজড সাপোর্ট বেড, প্রায় এক টন সিলিকন কোটেড কাচের পুঁতি ভরা ওটার পেটে। বাতাসের চাপে ঐ পুঁতিগুলোর উপর ভেসে থাকে রাইমের শরীর। যদি স্পর্শানুভূতি থাকত, তবে মনে হতো যেন শূন্যে ভাসছে সে।
কফিতে চুমুক দিল বার্জার। রাইমের হুকুমে কফিটা এনে দিয়েছে টম, যদিও যাওয়ার আগে চোখ উল্টে ফিসফিস করে বলে গেছে, ‘হঠাৎ যে বড় সামাজিক হয়ে উঠলেন?’
ডাক্তার জিজ্ঞেস করল রাইমকে, ‘বলছিলেন আপনি পুলিশে ছিলেন।’
‘হ্যাঁ। এনওয়াইপিডি-র ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ছিলাম।’
‘গুলি লেগেছিল?’
‘উঁহু। একটা ক্রাইম সিনে তল্লাশি চালাচ্ছিলাম। সাবওয়ে কনস্ট্রাকশন সাইটে একটা লাশ পেয়েছিল শ্রমিকরা। এক তরুণ পেট্রোলম্যানের লাশ, ছয় মাস আগে নিখোঁজ হয়েছিল। আসলে পুলিশদেরই টার্গেট করে মারছিল এক সিরিয়াল কিলার। আমাকে অনুরোধ করা হলো কেসটা ব্যক্তিগতভাবে দেখার জন্য। আর সেখানে তল্লাশি চালানোর সময় একটা বিম ধসে পড়ে গায়ের উপর। প্রায় চার ঘণ্টা চাপা পড়ে ছিলাম আমি।’
‘সত্যিই পুলিশ খুন করে বেড়াচ্ছিল কেউ?’
‘তিনজনকে মেরেছিল, জখম করেছিল আরেকজনকে। আসামি নিজেও ছিল পুলিশ। ড্যান শেফার্ড। পেট্রোল সার্জেন্ট।’
রাইমের গলার গোলাপি দাগটার দিকে তাকাল বার্জার। কোয়াড্রিপ্লিজিকের ট্রেডমার্ক ওটা—ভেন্টিলেটর টিউব ঢোকানোর ক্ষত। দুর্ঘটনার পর মাসের পর মাস ওটা গেঁথে থাকে গলায়। কখনো বছরের পর বছর, কখনো বা আজীবন। তবে নিজের একগুঁয়ে স্বভাব আর থেরাপিস্টদের আপ্রাণ চেষ্টায় ভেন্টিলেটর থেকে মুক্তি পেয়েছে রাইম। এখন তার ফুসফুসের যে অবস্থা, বাজি ধরে বলা যায় পানির নিচে অনায়াসে পাঁচ মিনিট দম ধরে রাখতে পারবে সে।
‘তার মানে সার্ভাইক্যাল ট্রমা।’
‘সি-ফোর।’
‘আহ…হ্যাঁ।’
স্পাইনাল কর্ড ইনজুরির জগতে সি-ফোর হলো একেবারে ডিমিলিটারাইজড জোন। মেরুদণ্ডের চার নম্বর হাড়ের উপরে আঘাত লাগলে নির্ঘাত মারা পড়ত সে। আর সি-ফোর-এর নিচে হলে অন্তত হাতদুটো নাড়াতে পারত। কিন্তু ঐ কুখ্যাত চার নম্বরের আঘাতেই বেঁচে আছে সে, যদিও পুরোপুরি অচল হয়ে। হাত-পায়ের শক্তি গেছে। পেটের আর পাঁজরের পেশিও প্রায় অকেজো, শ্বাস নিচ্ছে ডায়াফ্রাম দিয়ে। ঘাড় আর মাথা নাড়াতে পারে, কাঁধ সামান্য। একমাত্র ব্যতিক্রম হলো সেই ওক কাঠের বিমটা দয়া করে মটর নিউরনের একটা সরু সুতো আস্ত রেখেছিল। যার কল্যাণে বাঁ হাতের অনামিকাটা নাড়াতে পারে সে।
দুর্ঘটনার পরের এক বছরের সেই করুণ উপাখ্যান আর শোনাল না রাইম। মাথার খুলি ফুটো করে চিমটা দিয়ে আটকে মেরুদণ্ড সোজা রাখার সেই মাসব্যাপী ট্রাকশন। বারো সপ্তাহ হ্যালো ডিভাইসের নরকযন্ত্রণা—প্লাস্টিকের ঘেরাটোপ আর স্টিলের খাঁচায় মাথা আটকে রাখা।
ফুসফুস চালু রাখার জন্য এক বছর বিশাল ভেন্টিলেটর, তারপর ফ্রেনিক নার্ভ স্টিমুলেটর। ক্যাথেটার। সার্জারি। প্যারালাইটিক ইলিয়াস, স্ট্রেস আলসার, হাইপোটেনশন আর ব্র্যাডিকার্ডিয়া, বেডসোর পচে গিয়ে ঘা, পেশি শুকিয়ে গিয়ে কুঁকড়ে যাওয়া, আঙুল নাড়াচাড়ার ক্ষমতাটুকুও চলে যাওয়া, আর সেই সাথে ফ্যান্টম পেইন—যেসব অঙ্গে অনুভূতি নেই সেখানেও জ্বালাপোড়া আর ব্যথার অনুভূতি।
তবে নতুন সমস্যাটার কথা বার্জারকে জানাল সে। ‘অটোনমিক ডিসরিফ্লেক্সিয়া।’ ইদানীং প্রায়ই হচ্ছে ব্যাপারটা। বুক ধড়ফড় করা, ব্লাড প্রেশার আকাশছোঁয়া হয়ে যাওয়া, মাথা ফেটে যাওয়ার মতো ব্যথা। সামান্য কোষ্ঠকাঠিন্য থেকেও হতে পারে এটা। স্ট্রেস আর শারীরিক চাপ এড়ানো ছাড়া এটা ঠেকানোর আর কোনো উপায় নেই বলে জানাল সে।
রাইমের এসসিআই স্পেশালিস্ট ডাক্তার পিটার টেলর ঘনঘন এই অ্যাটাক নিয়ে চিন্তিত। মাসখানেক আগে শেষবার যখন হয়েছিল, অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা না করে কীভাবে সামাল দিতে হবে তা টমকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন টেলর; স্পিড ডায়ালে ডাক্তারের নম্বর সেভ করে রাখতে বাধ্য করেছিলেন। টেলর সতর্ক করে দিয়েছেন, বাড়াবাড়ি হলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হয়ে যেতে পারে তার।
সব শুনে নিলেন বার্জার, সহানুভূতির সাথে বললেন, ‘বর্তমান পেশায় আসার আগে আমি জেরিয়াট্রিক অর্থোপেডিকসে স্পেশালিস্ট ছিলাম। হিপ আর জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট। নিউরোলজি খুব একটা বুঝি না। সেরে ওঠার সম্ভাবনা কতটুকু?’
‘শূন্য, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত,’ হয়তো একটু বেশিই দ্রুত জবাব দিল রাইম। যোগ করল, ‘আমার সমস্যাটা বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই?’
‘পারছি। তারপরও আপনার মুখেই শুনতে চাই।’
মাথা নেড়ে চোখের সামনে থেকে একগুচ্ছ চুল সরাল রাইম, বলল, ‘নিজেকে শেষ করে দেওয়ার অধিকার সবারই আছে।’
‘এ ব্যাপারে আমি একমত হতে পারলাম না,’ বলল বার্জার। ‘বেশিরভাগ সমাজেই আপনার ক্ষমতা থাকতে পারে, কিন্তু অধিকার নেই। দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে।’
তেতো হাসি হাসল রাইম। ‘আমি দার্শনিক নই। কিন্তু আমার তো সেই ক্ষমতাটুকুও নেই। সেজন্যই আপনাকে দরকার আমার।’
তাকে মেরে ফেলার জন্য চারজন ডাক্তারকে অনুরোধ করেছিল লিংকন রাইম। সবাই ফিরিয়ে দিয়েছে। সে ভেবেছিল, ঠিক আছে, নিজেই করবে কাজটা, খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু না খেয়ে মরার প্রক্রিয়াটা ছিল ভয়ানক। পেটের নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসত, অসহ্য মাথা ব্যথায় ছিঁড়ে যেত সব। ঘুমাতে পারত না। অগত্যা হাল ছেড়ে দিয়েছিল সে, আর অত্যন্ত বিশ্রী এক আলোচনার মাধ্যমে টমকে অনুরোধ করেছিল তাকে মেরে ফেলার জন্য। কেঁদে ফেলেছিল ছোকরা। ঐ একবারই এত আবেগ দেখিয়েছিল সে। বলেছিল, যদি পারত! সে নাকি প্রয়োজনে রাইমের মৃত্যু চেয়ে চেয়ে দেখবে, তাকে বাঁচানোর চেষ্টাও করবে না। কিন্তু নিজ হাতে মারতে পারবে না তাকে।
তারপর একটা মিরাকল ঘটল। যদি মিরাকল বলা যায় আর কি।
দ্য সিনস অব দ্য ক্রাইম বেরোনোর পর সাংবাদিকরা তার ইন্টারভিউ নিতে এসেছিল। নিউ ইয়র্ক টাইমসে ছাপা হওয়া একটা আর্টিকেলে লেখক রাইমের একটা সোজাসাপটা উদ্ধৃতি ছিল এমন:
‘না, আমি আর বই লেখার প্ল্যান করছি না। সত্যি বলতে, আমার পরবর্তী বড় প্রজেক্ট হলো নিজেকে খুন করা। কাজটা বেশ চ্যালেঞ্জিং। গত ছয় মাস ধরে কাউকে খুঁজছি যে আমাকে সাহায্য করতে পারবে।’
ব্রেক কষার মতো ঐ লাইনটা এনওয়াইপিডি কাউন্সেলিং সার্ভিসের নজর কাড়ল। যোগাযোগ করল রাইমের অতীতের কয়েকজন মানুষ, বিশেষ করে ব্লেইন (যে তাকে বলল এসব ভাবা পাগলামি, শুধু নিজের কথা ভাবা বন্ধ করা উচিত তার—ঠিক যেমনটা তারা একসাথে থাকার সময় বলত। সেই সাথে এও জানিয়ে গেল, আবারো বিয়ে করতে যাচ্ছে সে)।
উইলিয়াম বার্জারেরও নজরে পড়ল উদ্ধৃতিটা। সিয়াটল থেকে এক রাতে আচমকা ফোন করল সে। কিছুক্ষণ আলাপচারিতার পর বার্জার জানাল রাইমকে নিয়ে লেখা আর্টিকেলটা পড়েছে সে। তারপর একটা ফাঁকা বিরতি দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘লেথ সোসাইটির নাম শুনেছেন?’
শুনেছে রাইম। স্বেচ্ছামৃত্যু বা ইউথ্যানেশিয়া সমর্থনকারী একটা গ্রুপ। মাসখানেক ধরে ওটাকেই খুঁজছিল সে। সেফ প্যাসেজ বা হেমলক সোসাইটির চেয়েও অনেক বেশি আগ্রাসী এরা।
‘সারা দেশে আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে খুঁজছে পুলিশ। কয়েক ডজন স্বেচ্ছামৃত্যুতে সাহায্য করার জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছে ওরা,’ ব্যাখ্যা দিল বার্জার। ‘তাই একটু সাবধানে থাকতে হয় আমাদের।’
বার্জার বলল, রাইমের অনুরোধের ব্যাপারেই কথা বলতে এসেছে সে। তাড়াহুড়ো করে কোনো পদক্ষেপ নিতে রাজি হয়নি বার্জার, তাই গত সাত-আট মাস ধরে ফোনে বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে তাদের। আজই প্রথম সামনাসামনি দেখা হলো।
‘নিজের কাজটা নিজে করার কোনো উপায় নেই আপনার?’
নিজের কাজ…
‘জিন হ্যারডের মতো কিছু না করলে, না। আর সেটাও একটু গোলমেলে।’ বোস্টনের এক পক্ষাঘাতগ্রস্ত যুবক ছিল হ্যারড। আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে। সাহায্য করার মতো কাউকে না পেয়ে নিজের সাধ্যমতো একমাত্র উপায়টাই বেছে নিয়েছিল সে। যেটুকু নড়াচড়া করার ক্ষমতা ছিল তা দিয়েই নিজের অ্যাপার্টমেন্টে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল, তারপর দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের মধ্যে হুইলচেয়ার চালিয়ে দিয়েছিল। থার্ড-ডিগ্রি বার্ন নিয়ে মারা গিয়েছিল সে। ইউথ্যানেশিয়া বা স্বেচ্ছামৃত্যু বিরোধীদের আইনের ফলে কী ট্র্যাজেডি ঘটতে পারে, তার উদাহরণ হিসেবে রাইট-টু-ডেথ আন্দোলনকারীরা প্রায়ই এই কেসটার কথা তোলে।
ঘটনাটা বার্জারের জানা ছিল, তাই সহানুভূতির সঙ্গে মাথা নাড়ল সে। ‘না, ওভাবে মরা উচিত নয় কারো।’
রাইমের শরীর, তার কন্ট্রোল প্যানেল—সব খুঁটিয়ে দেখল সে। ‘আপনার মেকানিক্যাল স্কিল কেমন?’
ইসিইউ বা এনভায়রনমেন্টাল কন্ট্রোল ইউনিটগুলোর কথা বুঝিয়ে বলল রাইম। ই অ্যান্ড জে কন্ট্রোলার, যেটা তার অনামিকা দিয়ে অপারেট করে, মুখের জন্য সিপ-অ্যান্ড-পাফ কন্ট্রোল, চিবুকের জয়স্টিক, আর কম্পিউটার ডিকটেশন ইউনিট, যেটা তার মুখের কথা শুনে স্ক্রিনে টাইপ করতে পারে।
‘কিন্তু সবকিছুর সেটআপ তো অন্য কাউকে করে দিতে হয়, তাই না?’ বার্জার জিজ্ঞেস করল। ‘যেমন ধরুন, কাউকে দোকানে গিয়ে বন্দুক কিনে আনতে হবে, মাউন্ট করতে হবে, ট্রিগারে কারিকুরি করতে হবে আর আপনার কন্ট্রোলারের সঙ্গে জুড়ে দিতে হবে?’
‘হ্যাঁ।’
‘তার মানে সেই লোকটাকে খুনের ষড়যন্ত্র বা অনিচ্ছাকৃত নরহত্যার দায়ে ফাঁসিয়ে দেওয়া হবে।’
‘আপনার যন্ত্রপাতির কী খবর?’ রাইম জিজ্ঞেস করল। ‘কাজের তো?’
‘যন্ত্রপাতি?’
‘মানে আপনি যা ব্যবহার করেন? কাজটা… মানে, শেষ করার জন্য?’
‘খুবই কাজের। কোনো রোগী আজ পর্যন্ত অভিযোগ করেনি।’
চোখ পিটপিট করল রাইম, হেসে ফেলল বার্জার। যোগ দিল রাইমও। মৃত্যুকে নিয়ে যদি হাসাহাসি করা না যায়, তবে আর কী নিয়ে করা যাবে?
‘দেখে নিন।’
‘আপনার সঙ্গে আছে ওগুলো?’ রাইমের বুকে আশার সঞ্চার হলো। গত কয়েক বছরের মধ্যে এই প্রথম উষ্ণ একটা অনুভূতি টের পেল সে।
অ্যাটাচি কেসটা খুলল ডাক্তার। রাইমের মনে হলো বেশ ঘটা করেই টেবিলের উপর এক বোতল ব্র্যান্ডি রাখল সে। এক শিশি বড়ি। একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ আর একটা রাবার ব্যান্ড।
‘কী ঔষধ ওগুলো?’
‘সেকোনাল। এখন আর কেউ প্রেসক্রাইব করে না। আগে আত্মহত্যা করা অনেক সহজ ছিল। এই জিনিস একেবারে অব্যর্থ, কোনো সন্দেহ নেই। আজকালকার মডার্ন ট্রাংকুলাইজার দিয়ে আত্মহত্যা করা প্রায় অসম্ভব। হ্যালসিয়ন, লিউব্রিয়াম, ডালমেইন, জ্যানাক্স…ওসব খেয়ে আপনি হয়তো লম্বা সময়ের জন্য ঘুমিয়ে পড়বেন, কিন্তু শেষমেশ ঘুম ভাঙবেই।’
‘আর ব্যাগটা?’
‘আহ… ব্যাগ।’ ওটা তুলে নিল বার্জার। ‘এটা হলো লেথ সোসাইটির প্রতীক। অবশ্য, আনঅফিশিয়ালি। আমাদের কোনো লোগো নেই। যদি বড়ি আর ব্র্যান্ডিতে কাজ না হয়, তবে আমরা ব্যাগটা ব্যবহার করি। গলার কাছে রাবার ব্যান্ড দিয়ে টাইট করে আটকে দেই মাথার উপর। ভেতরে একটু বরফ দিয়ে দেই, কারণ মিনিটখানেক পর বেশ গরম হয়ে যায় ওটা।’
সরঞ্জাম তিনটা থেকে চোখ সরাতে পারছে না রাইম। মোটা প্লাস্টিকের ব্যাগ, দেখতে একেবারে পেইন্টারদের ড্রপ ক্লথের মতো। খেয়াল করল, ব্র্যান্ডিটা সস্তা আর ঔষধগুলো জেনেরিক।
‘চমৎকার বাড়ি তো,’ চারপাশে তাকিয়ে বলল বার্জার। ‘সেন্ট্রাল পার্ক ওয়েস্ট… ডিজেবিলিটি ভাতার টাকায় চলেন নাকি?’
‘কিছুটা। পুলিশ আর এফবিআই-এর কনসালট্যান্ট হিসেবেও কাজ করেছি। এক্সিডেন্টের পর…যে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি খোঁড়াখুঁড়ির কাজ করছিল, তারা তিন মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিয়ে রফা করেছিল। ওরা দিব্যি কেটে বলেছিল ওদের কোনো দোষ ছিল না, কিন্তু সম্ভবত আইনের কোনো এক ধারায় আছে যে কনস্ট্রাকশন কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীরা এমনিতেই জিতে যায়, দোষ যারই হোক না কেন। অন্তত যদি বাদী কোর্টে এসে ঠিকঠাক লালা ঝরাতে পারে।’
‘আর বইটাও তো আপনি লিখেছিলেন, তাই না?’
‘ওটা থেকেও কিছু টাকা পাই। তবে খুব বেশি না। ওটা বেটার-সেলার ছিল। বেস্ট-সেলার নয়।’
দ্য সিনস অব দ্য ক্রাইম বইটার একটা কপি তুলে নিয়ে পাতা ওল্টাতে লাগল বার্জার। ‘বিখ্যাত সব ক্রাইম সিন। দেখুন কাণ্ড।’ হাসল সে। ‘কয়টা আছে এতে, চল্লিশ-পঞ্চাশটা হবে?’
‘একান্নটা।’
দুর্ঘটনার পর লেখার কারণে নিউ ইয়র্ক সিটির যতগুলো পুরোনো ক্রাইম সিন মনে করতে পেরেছিল, সবগুলোতে কল্পনার চোখে ভ্রমণ করেছিল রাইম। কিছু সমাধান করা কেস, কিছু অমীমাংসিত। ওল্ড ব্রুয়ারির কথা লিখেছিল সে, ফাইভ পয়েন্টসের সেই কুখ্যাত বস্তি যেখানে ১৮৩৯ সালের এক রাতে তেরোটা ভিন্ন ভিন্ন খুন হয়েছিল। আছে চার্লস অব্রিজ ডিকনের কথা, যে ১৮৬৩ সালের ১৩ জুলাই সিভিল ওয়ার ড্রাফট দাঙ্গার সময় নিজের মাকে খুন করেছিল এবং দাবি করেছিল যে প্রাক্তন ক্রীতদাসরা মেরেছে তাকে, যা কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে দাঙ্গাকে উসকে দিয়েছিল। আছে আর্কিটেক্ট স্ট্যানফোর্ড হোয়াইটের ত্রিভুজ প্রেমের খুনের কথা, যা ঘটেছিল আসল ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের ছাদে। জাজ ক্রুটারের নিখোঁজ রহস্যও রেখেছে। লিখেছে পঞ্চাশের দশকের ম্যাড বম্বার জর্জ মেটাস্কি আর হীরাচোর মার্ফ দ্য সার্ফের কথা, ‘স্টার অব ইন্ডিয়া’ চুরি করেছিল সে।
‘ঊনবিংশ শতাব্দীর নির্মাণ সামগ্রী, ভূগর্ভস্থ ঝরনা, বাটলার স্কুল,’ বইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আউড়ে গেল বার্জার। ‘গে বাথ, চায়নাটাউনের পতিতালয়, রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চ…শহর সম্পর্কে এত কিছু জানলেন কী করে?’
কাঁধ ঝাঁকাল রাইম (যদিও আসলে শুধু মাথাটা নাড়ল সে)। আইআরডি প্রধান হিসেবে ফরেনসিকের পাশাপাশি শহরটাকেও খুঁটিয়ে পড়েছিল সে। এর ইতিহাস, রাজনীতি, ভূতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, অবকাঠামো। ‘ক্রিমিনালিস্টিকস বা অপরাধবিজ্ঞান তো আর শূন্য থেকে আসে না। নিজের পরিবেশ সম্পর্কে যত বেশি জানা থাকবে, তত ভালোভাবে অ্যাপ্লাই করা যাবে…’
নিজের কণ্ঠস্বরে উৎসাহের ছোঁয়া পেতেই আচমকা থেমে গেল সে। এত সহজে ফাঁদে পা দেওয়ায় নিজের উপরই রাগ হলো তার।
‘ভালোই চেষ্টা করেছেন, ডাক্তার বার্জার,’ ওপরে ওঠা গলায় বলল রাইম।
‘আহ, বাদ দিন তো। আমাকে বিল বলে ডাকুন। প্লিজ।’
লাইনচ্যুত হতে রাজি নয় রাইম। ‘এসব আমি আগেও শুনেছি। একটা বড়, পরিষ্কার, মসৃণ কাগজ নিন আর তাতে লিখুন কেন আমার আত্মহত্যা করা উচিত নয়।
তারপর আরেকটা কাগজে লিখুন কেন উচিত। প্রোডাক্টিভ, ইউজফুল, ইন্টারেস্টিং, চ্যালেঞ্জিং—এসব শব্দ আসবে মাথায়। ভারী ভারী শব্দ। দশ ডলার দামি শব্দ। কিন্তু আমার কাছে ওগুলোর কানাকড়িও দাম নেই। তাছাড়া, নিজের আত্মা বাঁচানোর জন্য একটা পেনসিলও তোলার মুরোদ নেই আমার।’
‘লিংকন,’ নরম গলায় বলে চলল বার্জার, ‘প্রোগ্রামের জন্য আপনি উপযুক্ত ক্যান্ডিডেট কি না, সেটা আমাকে নিশ্চিত হতে হবে।’
‘ক্যান্ডিডেট? প্রোগ্রাম? বাহ, শ্রুতিমধুর সব শব্দ,’ তিক্ত গলায় বলল রাইম। ‘ডাক্তার, আমি মনস্থির করে ফেলেছি। আমি আজই কাজটা করতে চাই। এখনই।’
‘আজই কেন?’
বোতল আর ব্যাগের দিকে আবার চোখ চলে গেছে রাইমের। ফিসফিস করে বলল, ‘কেন নয়? আজ কী বার? তেইশে আগস্ট? মরার জন্য দিনটা তো মন্দ নয়।’
সরু ঠোঁটে টোকা দিল ডাক্তার। ‘আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলতে হবে আমাকে, লিংকন। যদি আমি নিশ্চিত হই যে সত্যিই আপনি এটা চাইছেন…’
‘আমি চাই,’ বলল রাইম, খেয়াল করল শারীরিক অঙ্গভঙ্গি ছাড়া মানুষের মুখের কথা কতটা দুর্বল শোনায়। খুব ইচ্ছা হলো হাত বাড়িয়ে বার্জারের বাহু স্পর্শ করার কিংবা মিনতি করে করজোড় করার।
অনুমতি না নিয়েই এক প্যাকেট মার্লবোরো বের করে একটা সিগারেট ধরাল বার্জার। পকেট থেকে একটা ফোল্ডিং মেটাল অ্যাশট্রে বের করে খুলল। সরু পাদুটো একটার উপর আরেকটা তুলে বসল। দেখে মনে হচ্ছে আইভি লিগের কোনো শৌখিন ছাত্র আয়েশ করে ধূমপান করছে। ‘লিংকন, সমস্যাটা কোথায় বুঝতে পারছেন তো, তাই না?’
নিশ্চয়ই বুঝতে পারছে সে। সেই কারণেই তো বার্জার এখানে এসেছে, আর রাইমের নিজের ডাক্তাররা কেউ ‘কাজটা’ করে দেয়নি। মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর মরণ ত্বরান্বিত করা এক জিনিস; টার্মিনাল রোগীদের চিকিৎসা করেন এমন ডাক্তারদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই কখনো না কখনো প্রাণঘাতী ডোজ প্রেসক্রাইব বা প্রয়োগ করেছেন। বেশিরভাগ প্রসিকিউটর বা সরকারি আইনজীবী এসব দেখেও না দেখার ভান করেন, যদি-না কোনো ডাক্তার সেটা নিয়ে বড়াই করে বেড়ান—কেভোরকিয়ানের মতো।
কিন্তু একজন কোয়াড্রিপ্লিজিক? হেমি? প্যারা? বা ক্রিপ? ওহ, সেটা আলাদা ব্যাপার। লিংকন রাইমের বয়স চল্লিশ। ভেন্টিলেটর থেকেও ছাড়া পেয়েছে সে। রাইম বংশের কোনো গুপ্ত জিনঘটিত রোগ না থাকলে আশি বছর পর্যন্ত না বাঁচার কোনো মেডিক্যাল কারণ নেই তার।
বার্জার যোগ করল, ‘সোজাসাপটা বলি, লিংকন। আমাকে নিশ্চিত হতে হবে এটা কোনো ফাঁদ কি না।’
‘ফাঁদ?’
‘প্রসিকিউটরদের চাল। এর আগেও আমাকে ফাঁসানো হয়েছে।’
হেসে ফেলল রাইম। ‘নিউ ইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যস্ত মানুষ। একজন ইউথ্যানাসিস্ট বা মরণ-ডাক্তারকে ধরার জন্য কোনো পঙ্গুর শরীরে তিনি আড়ি পাতা যন্ত্র ফিট করতে যাবেন না,’ বলল সে।
ক্রাইম সিন রিপোর্টের দিকে আনমনে তাকাল সে।
…লাশ থেকে দশ ফুট দক্ষিণ-পশ্চিমে, সাদা বালির ছোট্ট একটা ঢিবির উপর একসঙ্গে দলা পাকানো অবস্থায় পাওয়া গেছে: সুতোর একটা বল, ব্যাস আনুমানিক ছয় সেন্টিমিটার, রং অফ-হোয়াইট। এনার্জি-ডিসপারসিভ এক্স-রে ইউনিটে সুতোর নমুনা পরীক্ষা করে পাওয়া গেছে A2B5 (Si, Al)g O22 (OH)2। উৎসের কোনো হদিস নেই এবং সুতোগুলো আলাদা করা সম্ভব হয়নি। বিশ্লেষণের জন্য নমুনা পাঠানো হয়েছে এফবিআই-এর পিইআরটি অফিসে।
‘আমাকে শুধু একটু সাবধান থাকতে হয়,’ বলে চলল বার্জার। ‘এখন এটাই আমার পেশাগত জীবন। অর্থোপেডিকস ছেড়ে দিয়েছি পুরোপুরি। তাছাড়া, এটা চাকরির চেয়েও বেশি কিছু। সিদ্ধান্ত নিয়েছি, অন্যদের জীবন শেষ করতে সাহায্য করার কাজেই নিজের জীবন উৎসর্গ করব আমি।’
এই সুতোর তালের ঠিক পাশেই আনুমানিক তিন ইঞ্চি দূরে পাওয়া গেছে কাগজের দুটো টুকরো। একটা সাধারণ নিউজপ্রিন্ট, তাতে টাইমস রোমান হরফে ছাপা রয়েছে ‘বিকেল তিনটা’; কালিটা সাধারণত কমার্শিয়াল সংবাদপত্রে যেমন ব্যবহার করা হয়, তেমন। অন্য টুকরোটা কোনো বইয়ের পাতার কোনা বলে মনে হচ্ছে, তাতে পৃষ্ঠা নম্বর ‘৮২৩’ ছাপা। হরফটা গ্যারামন্ড এবং কাগজটা মসৃণ। এএলএস (অতিবেগুনি রশ্মি দিয়ে দেখে) এবং পরবর্তী নিনহাইড্রিন পরীক্ষা করেও আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়নি। আলাদা করা বা শনাক্ত করাও সম্ভব হয়নি।
বেশ কয়েকটা ব্যাপার খচখচ করছে রাইমের মনে। প্রথমত, সুতোর দলাটা। ওটা আসলে কী, পেরেত্তি কেন সেটা ধরতে পারল না? জিনিসটা তো পানির মতো পরিষ্কার। আর এই ফিজিক্যাল এভিডেন্সগুলো (কাগজের টুকরো আর সুতোর দলা) সব একসঙ্গে জড়ো করা কেন? কোথাও কোনো গড়বড় আছে এখানে।
‘লিংকন?’
‘সরি।’
‘আমি বলছিলাম… আপনি তো আর আগুনে পোড়া কোনো রোগী নন যে অসহ্য যন্ত্রণায় ভুগছেন। আপনি গৃহহীনও নন। টাকা আছে আপনার, আছে মেধা। পুলিশের কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করে অনেক মানুষের উপকার করছেন। চাইলে আপনি একটা কর্মমুখর জীবন পেতে পারেন। একটা দীর্ঘ জীবন।’
‘দীর্ঘ, হ্যাঁ। সমস্যা তো ওটাই। দীর্ঘ জীবন।’ ভালোমানুষি দেখাতে দেখাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে। খেঁকিয়ে উঠল, ‘কিন্তু আমি দীর্ঘ জীবন চাই না। ব্যাপারটা খুব সহজ,’ বলল সে।
‘আপনার সিদ্ধান্তের জন্য যদি বিন্দুমাত্রও অনুশোচনা হওয়ার সুযোগ থাকে, তবে ভেবে দেখুন,’ ধীরে ধীরে বলল বার্জার, ‘সেটার বোঝা কিন্তু আমাকেই বয়ে বেড়াতে হবে। আপনাকে নয়।’
‘এসব ব্যাপারে কে আর কবে নিশ্চিত হতে পেরেছে?’
ওর চোখজোড়া আবার চলে গেল রিপোর্টের দিকে।
কাগজের টুকরো দুটোর উপর একটা লোহার বল্টু পাওয়া গেছে। হেক্স বল্টু, মাথায় খোদাই করা আছে ‘সিই’ (CE) বর্ণ দুটো। লম্বায় দুই ইঞ্চি, ক্লকওয়াইজ প্যাঁচ, ব্যাস ১৫/১৬ ইঞ্চি।
‘আগামী কয়েক দিন খুব ব্যস্ত শিডিউল আমার,’ নিজের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল বার্জার। রোলেক্স ঘড়ি; হবে নাই বা কেন… মৃত্যু ব্যবসাটা সব সময়ই লাভজনক। ‘আপাতত ঘণ্টাখানেক বসা যাক। কথাবার্তা বলি, তারপর একটা দিন সময় নিন ভাবার জন্য। পরে আবার আসব আমি।’
কিছু একটা খোঁচা দিচ্ছে রাইমকে। এমনিতে চুলকানি সব কোয়াড্রিপ্লিজিকের অভিশাপ। তবে এবারের চুলকানিটা হচ্ছে মগজে। এই জিনিস সারা জীবন জ্বালিয়েছে তাকে।
‘আচ্ছা, ডাক্তার, একটা উপকার করবেন আমার? ঐ রিপোর্টটা। একটু পাতা উল্টে দেখবেন? বল্টুটার কোনো ছবি পাওয়া যায় কি না?’
ইতস্তত করল বার্জার। ‘ছবি?’
‘পোলারয়েড। পেছনের দিকে কোথাও আঠা দিয়ে সাঁটা থাকবে। টার্নিং ফ্রেমে বড্ড সময় লাগে।’
ফ্রেম থেকে রিপোর্টটা বের করে রাইমের জন্য পাতা ওল্টাতে লাগল বার্জার।
‘ঐ তো। থামুন।’ ছবিটার দিকে তাকাতেই কিছু একটা খোঁচা দিল তাকে। ‘ওহ, এখানে নয়, এখন নয়। প্লিজ, না। সরি, আমরা যে পাতায় ছিলাম সেখানে কি একটু ফিরে যাবেন?’
বার্জার তাই করল।
কিছু বলল না রাইম, শুধু মন দিয়ে পড়ল। কাগজের টুকরো…বিকেল তিনটা…৮২৩ নম্বর পৃষ্ঠা।
বুক ধড়ফড় করছে রাইমের, কপালে জমে উঠেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। কানের ভেতর ভোঁ-ভোঁ শব্দ শুনতে পেল সে। ট্যাবলয়েড পত্রিকার জন্য দারুণ শিরোনাম হবে। মরণ-ডাক্তারের সাথে কথা বলতে বলতে মরে গেল রোগী…
চোখ পিটপিট করল বার্জার। ‘লিংকন? আপনি ঠিক আছেন?’ সতর্ক চোখে রাইমকে খুঁটিয়ে দেখল লোকটা।
যথাসম্ভব স্বাভাবিক থাকার ভান করে রাইম বলল, ‘ইয়ে, ডাক্তার, আমি দুঃখিত। কিন্তু কাজ সারা বাকি আছে।’
ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল বার্জার, দোটানায় পড়েছে। ‘তার মানে বিষয়-আশয় এখনো গুছিয়ে উঠতে পারেননি?’
হাসল সে। ভাবলেশহীন। ‘ভাবছি আপনাকে যদি কয়েক ঘণ্টা পর আসতে বলি…’ খুব সাবধান। যদি সে টের পায় রাইমের জীবনের কোনো উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছে, তবে আত্মহত্যাকারী হিসেবে বাতিল করে দেবে তাকে। নিজের বোতল আর প্লাস্টিক ব্যাগ বগলে নিয়ে আবার ফিরে যাবে স্টারবাকসের দেশে।
দিনপঞ্জি খুলে বার্জার বলল, ‘আজকের বাকি সময়টা হবে না। কাল…না। মনে হয় সোমবারের আগে সম্ভব নয়। পরশু দিন।’
ইতস্তত করল রাইম। ‘লর্ড…’ মনের গভীরতম ইচ্ছাটা অবশেষে হাতের মুঠোয় এসেছিল, গত এক বছর ধরে প্রতিদিন যার স্বপ্ন দেখেছে সে। হ্যাঁ নাকি না? সিদ্ধান্ত নাও।
অবশেষে নিজের কানেই নিজের গলা শুনতে পেল রাইম। ‘ঠিক আছে। সোমবার।’ মুখে একটা আশাহত হাসি ফুটিয়ে তুলল সে।
‘সমস্যাটা ঠিক কী?’
‘একজনের সঙ্গে কাজ করতাম আগে। কিছু পরামর্শ চেয়েছিল। যতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল, দেইনি। তাকে একটা ফোন করতে হবে আমার।’
না, ডিসরিফ্লেক্সিয়া বা অ্যাংজাইটি অ্যাটাক—কোনোটাই নয়। বহু বছর পর এমন একটা অনুভূতি হচ্ছে লিংকন রাইমের। প্রচণ্ড তাড়া অনুভব করছে সে।
‘টমকে একটু পাঠিয়ে দেবেন উপরে? মনে হয় নিচতলায় কিচেনে আছে ও।’
‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। খুশি মনেই দেবো।’
বার্জারের চোখে অদ্ভুত কিছু একটা দেখতে পেল রাইম। কী ওটা? সতর্কতা? হতে পারে। দেখে মনে হলো যেন হতাশ হয়েছে লোকটা। কিন্তু এসব নিয়ে ভাবার সময় এখন নেই তার। সিঁড়ি দিয়ে ডাক্তারের পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই ভরাট গলায় চিৎকার করে উঠল রাইম, ‘টম? টম!’
‘কী হলো?’ নিচ থেকে ভেসে এল যুবকের গলা।
‘লনকে ফোন করো। ফিরে আসতে বলো। এক্ষুনি!’
ঘড়ির দিকে তাকাল রাইম। দুপুর গড়িয়ে গেছে। তিন ঘণ্টারও কম সময় আছে ওদের হাতে।
