১. এক দিনের রাজা
২. লোকার্ডের নীতি
৩. দ্য পোর্টেবলস ডটার
8. ডাউন টু দ্য বোন
৫. নড়াচড়ার উপর থাকলে ওরা তোমায় ধরতে পারবে না

দ্য বোন কালেক্টর – ৩৩

অধ্যায় তেত্রিশ

অবশেষে ক্যারল গার্ডেনস, ব্রুকলিনে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরল অ্যামেলিয়া স্যাক্স। বাবা-মায়ের বাড়ি থেকে ঠিক ছয় ব্লক দূরে, মা এখনো ওখানেই থাকে। ঘরে ঢুকেই কিচেন ফোনের স্পিড-ডায়ালের প্রথম বোতামটা টিপল সে।

‘মা। আমি বলছি। বুধবার প্লাজায় ব্রাঞ্চ খাওয়াতে নিয়ে যাচ্ছি তোমাকে। আমার ডে অফ।’

‘কীসের জন্য? নতুন অ্যাসাইনমেন্টের খুশিতে? পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কেমন চলছে? ফোনও করিসনি।’

দ্রুত হাসল সে। স্যাক্স বুঝতে পারল গত দেড় দিন সে কী করেছে তার কোনো ধারণাই নেই মায়ের। ‘খবর দেখছিলে, মা?’

‘দেখব না? ব্রোকাও-এর উপর ক্রাশ আমার, জানোই তো।’

ব্রোকাও হলো মায়ের প্রিয় সংবাদ পাঠক।

‘গত কয়েক দিন ধরে একটা কিডন্যাপারকে নিয়ে নরক গুলজার হয়ে যাচ্ছে, শুনেছ?’

‘কে শোনেনি? কী বলতে চাইছ, সোনা?’

‘ভেতরের খবর আছে আমার কাছে।’

অবাক হওয়া মাকে পুরো গল্পটা শোনাল সে—ভিকটিমদের বাঁচানো আর লিংকন রাইমের কথা। আর কিছুটা কাঁটছাঁট করে ক্রাইম সিনের কথাও বলল।

‘অ্যামি, তোমার বাবা থাকলে কী গর্বিতই না হতো!’

‘তো বুধবার অসুস্থতার দোহাই দিয়ে ছুটি নাও। প্লাজা। ওকে?’

‘বাদ দাও, সোনা। টাকা বাঁচাও। ফ্রিজারে ওয়াফল আর বব এভান্স আছে। এখানেই এসো।’

‘অত টাকা লাগে না, মা।’

‘কে বলেছে? একগাদা টাকা।’

‘আচ্ছা, “পিংক টি-কাপ” তো তোমার পছন্দ, তাই না?’

ওটা ওয়েস্ট ভিলেজের ছোট্ট একটা জায়গা, যেখানে নামমাত্র দামে ইস্ট কোস্টের সেরা প্যানকেক আর ডিম পাওয়া যায়।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রাজি হয়ে গেল মা। ‘মন্দ হবে না।’

এই কৌশলটা গত কয়েক বছর ধরে সফলভাবে ব্যবহার করে আসছে স্যাক্স।

‘একটু রেস্ট নিতে হবে, মা। কাল ফোন করব।’

‘বড্ড খাটুনি করো তুমি। অ্যামি, তোর এই কেসটা… বিপজ্জনক ছিল বেশি?’

‘আমি তো শুধু টেকনিক্যাল কাজ করেছি, মা। ক্রাইম সিন। এর চেয়ে নিরাপদ আর কিছু হয় না।’

‘আর ওরা বিশেষ করে তোকেই চেয়েছিল।’ বললেন ভদ্রমহিলা। ‘আহারে, তোর বাবা দেখে যেতে পারলেন না।’

ফোন রেখে বেডরুমে গিয়ে বিছানায় ধপাস করে পড়ে গেল স্যাক্স।

প্যামির রুম থেকে বেরোনোর পর আনসাবের কাছ থেকে বেঁচে যাওয়া অন্য দুই ভিকটিমকেও দেখতে গিয়েছিল স্যাক্স। মনেল গ্যারগার, ব্যান্ডেজ আর র‍্যাবিস সিরামে ঝাঁঝড়া হয়ে ছাড়া পেয়েছে অবশেষে। ফ্রাংকফুর্টে পরিবারের কাছে ফিরে যাচ্ছে। ‘তবে শুধু গরমের ছুটির জন্য,’ জোর দিয়ে বলেছিল সে। ‘একেবারে চলে যাচ্ছি না।’ ডয়েচে হাউজের সেই জরাজীর্ণ ফ্ল্যাটে নিজের স্টেরিও আর সিডি কালেকশন দেখিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে নিউ ওয়ার্ল্ডের কোনো সাইকো তাকে শহর থেকে চিরতরে তাড়াতে পারবে না।

উইলিয়াম এভারেট এখনো হাসপাতালে। ভাঙা আঙুলটা অবশ্য সিরিয়াস কিছু না, কিন্তু হার্টের সমস্যাটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। স্যাক্স অবাক হয়ে জানতে পারল যে বহু বছর আগে হেলস কিচেনে তার একটা দোকান ছিল এবং তার বাবাকে হয়তো চিনত সে। ‘সব বিট পুলিশকেই চিনতাম,’ বলেছিল সে। ওয়ালেট থেকে বাবার ইউনিফর্ম-পরা ছবিটা দেখাল স্যাক্স। ‘মনে হয়। নিশ্চিত না। তবে মনে হয় চিনতাম।’ সৌজন্যমূলকভাবে দেখা করতে গেলেও সাথে ওয়াচবুক নিয়ে গিয়েছিল স্যাক্স। কিন্তু ভিকটিমদের কেউই আনসাব ৮২৩ সম্পর্কে নতুন কিছু বলতে পারল না।

নিজের ফ্ল্যাটে বসে এখন জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে স্যাক্স। ঝোড়ো বাতাসে গিঙ্কগো আর ম্যাপল গাছগুলোকে কাঁপতে দেখল সে। ইউনিফর্ম খুলে বুকের নিচে চুলকাল—বডি আর্মারের চাপে চ্যাপ্টা হয়ে থাকায় সব সময়ই ভয়ানক চুলকায় জায়গাটা। বাথরোব পরে নিল আস্তে আস্তে।

লোকটা পালানোর জন্য খুব বেশি সময় পায়নি কিন্তু ওটুকুই যথেষ্ট ছিল। ভ্যান ব্রেভোর্টের সেফ হাউজটা একেবারে ধুয়েমুছে সাফ করে ফেলেছে সে। যদিও বাড়িওয়ালা বলেছিল সে অনেক দিন আগেই উঠেছে—গত জানুয়ারিতে (ভুয়া আইডি দিয়ে, শুনে অবাক হয়নি কেউ)—তবুও ৮২৩ তার আনা সবকিছু নিয়ে গেছে, আবর্জনা সমেত। ও সিন প্রসেস করার পর এনওয়াইপিডির ছাপ বিশেষজ্ঞ দল হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল এবং বাসাটার প্রতিটি কোনার ধুলো পর্যন্ত সংগ্রহ করেছে। এখনো পর্যন্ত প্রাথমিক রিপোর্টগুলো আশাব্যঞ্জক নয়।

‘মনে হয় মলত্যাগের সময়ও গ্লাভস পরে ছিল,’ রিপোর্ট দিয়েছিল তরুণ ব্যাংকস। একটা মোবাইল ইউনিট তার ট্যাক্সি আর সেডানটা খুঁজে পেয়েছে। অ্যাভিনিউ ডি আর নাইনথ স্ট্রিটের কাছে খুব কায়দা করে পার্ক করেছিল আনসাব। সেলিট্টোর ধারণা লোকাল কোনো গ্যাং হয়তো সাত-আট মিনিটে ওগুলোর ভবলীলা সাঙ্গ করে কঙ্কালসার করে ফেলেছে। গাড়িগুলো থেকে যেসব ফিজিক্যাল এভিডেন্স পাওয়া যেত তা এখন ছড়িয়ে আছে শহরের ডজনখানেক চোরাই পার্টসের দোকানে।

টিভি অন করে খবর খুঁজল স্যাক্স। কিডন্যাপিংয়ের কোনো খবর নেই। সব খবরই ইউএন পিস কনফারেন্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নিয়ে। ব্রায়ান্ট গাম্বল, ইউএন সেক্রেটারি জেনারেল আর মধ্যপ্রাচ্যের কোনো এক রাষ্ট্রদূতের দিকে তাকিয়ে রইল সে, প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগ দিয়ে। এমনকি বিজ্ঞাপনগুলোও এমনভাবে দেখল যেন মুখস্থ করছে। ও আসলে একটা জিনিস মন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছে। লিংকন রাইমের সাথে তার চুক্তি। চুক্তিটা পরিষ্কার ছিল। এখন যেহেতু ক্যারল আর প্যামি নিরাপদ, তাই তার কথা রাখার পালা। ডাক্তার বার্জারের সাথে তাকে এক ঘণ্টা একা থাকতে দিতে হবে। আর ঐ ডাক্তারটাকে তার একদমই পছন্দ হয়নি। তার আঁটোসাঁটো, অ্যাথলেটিক গড়ন, চঞ্চল চোখ-সবকিছুর মধ্যেই এক বিশাল ইগো দেখতে পাচ্ছিল সে। নিখুঁতভাবে আঁচড়ানো কালো চুল। দামি পোশাক। কেভোরকিয়ানের মতো কাউকে খুঁজে পেল না কেন রাইম? লোকটা হয়তো অদ্ভুত, কিন্তু অন্তত জ্ঞানী দাদুর মতো দেখতে।

চোখ বন্ধ করল সে।

মৃতদের মায়া ত্যাগ করা…

চুক্তি তো চুক্তিই। কিন্তু রাইম, ধুর, অসহ্য… যাক, শেষ একটা চেষ্টা না করে তাকে মরতে দেবে না সে। নিজের বেডরুমে ওকে সেদিন বুঝিয়ে ফেলেছিল রাইম। ভড়কে গিয়েছিল সে। ভালো কোনো যুক্তি মাথায় আসেনি তখন।

সোমবার। আগামীকাল পর্যন্ত সময় আছে তাকে বোঝানোর। বা অন্তত কিছুদিন অপেক্ষা করানোর। এক মাস। বা এক দিন। কী বলবে তাকে? যুক্তিগুলো টুকে রাখবে সে। ছোট্ট একটা বক্তব্য লিখবে।

চোখ খুলে বিছানা থেকে নামল সে, কলম আর কাগজ খোঁজার জন্য। আমি চাইলে-

জমে গেল স্যাক্স, বাইরের বাতাসের মতো ফুসফুসে শিস দিয়ে ঢুকল বাতাস। কালো পোশাক পরা, তেলের মতো কালো স্কি মাস্ক আর গ্লাভস। তার শোবার ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আনসাব ৮২৩। হাতটা নিজের অজান্তেই চলে গেল বেডসাইড টেবিলের দিকে-গ্লক আর ছুরিটা ওখানেই। কিন্তু তৈরিই ছিল সে। বেলচাটা দ্রুত চালিয়ে দিল। স্যাক্সের মাথার একপাশে লাগল ওটা। হলুদ আলো বিস্ফোরিত হলো চোখে। হাত আর হাঁটুর উপর ভর দিয়ে পড়ে গেল অ্যামেলিয়া। ঠিক তখনই পাঁজরে লাথিটা এসে লাগল। উপুড় হয়ে গেল সে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। টের পেল হাতদুটো পেছনে মুড়ে হাতকড়া পরানো হচ্ছে। মুখের উপর ডাক্ট টেপ সেঁটে দেওয়া হলো। দ্রুত, দক্ষ হাতে। তাকে চিত করে দিল সে; বাথরোবটা খুলে গেল। পাগলের মতো লাথি ছুঁড়ল অ্যামেলিয়া, হাতকড়া খোলার জন্য ধস্তাধস্তি করল।

পেটে আরেকটা ঘুসি পড়তেই ওয়াক করে উঠল সে। লোকটা যখন তাকে ধরার জন্য হাত বাড়াল, তখন নিস্তেজ হয়ে পড়ল। বগলের নিচে ধরে তাকে টেনেহিঁচড়ে পেছনের দরজা দিয়ে ফ্ল্যাটের পেছনের বড় বাগানটায় নিয়ে গেল। চোখদুটো তার মুখের উপরই স্থির। তার বুক, মেদহীন পেট বা অল্প কিছু লাল লোমওয়ালা জায়গাটার দিকে একটাবারও তাকাল না। জীবন বাঁচানোর জন্য ওসব নির্দ্বিধায় দিয়ে দিতে পারত সে। কিন্তু না, রাইমের ডায়াগনসিস ঠিকই ছিল। ৮২৩ আসলেই লালসা দ্বারা চালিত নয়। অন্য কিছু আছে তার মনে। তার ছিপছিপে শরীরটাকে চিত করে ফেলে দিল সে, ব্ল‍্যাক-আইд সুজান আর প্যাসিসান্দ্রা ফুলের ঝোপের মধ্যে, প্রতিবেশীদের দৃষ্টির আড়ালে। চারপাশে তাকাল আততায়ী, দম নিচ্ছে। বেলচাটা তুলে মাটিতে কোপ বসাল। কাঁদতে শুরু করল অ্যামেলিয়া স্যাক্স। বালিশে মাথার পেছনটা ঘষছে।

একবার এক ডাক্তার এই আচরণ দেখে বলেছিল কম্পালসিভ। ঐ মতামত রাইম চায়নি। বা পছন্দ করেনি। এই ঘষাঘষি, রাইম ভাবল, অ্যামেলিয়া স্যাক্সের নখ দিয়ে নিজের চামড়া ছেঁড়ারই আরেক রূপ। ঘাড়ের পেশিগুলো স্ট্রেচ করল সে, মাথা ঘোরাল, তাকিয়ে রইল দেয়ালের প্রোফাইল চার্টের দিকে। রাইম বিশ্বাস করে, লোকটার পাগলামির পুরো গল্পটা এখানেই আছে, তার সামনে। কালো, প্যাঁচানো হাতের লেখা, আর শব্দগুলোর মাঝখানের ফাঁকফোকরে। কিন্তু গল্পের শেষটা দেখতে পাচ্ছে না সে। এখনো না।

কুগুলোর উপর আবার চোখ বোলাল সে। অল্প কয়েকটাই ব্যাখ্যার বাইরে রয়ে গেছে। আঙুলের কাটা দাগ। গিট। আফটারশেভ। কাটা দাগটা কোনো কাজে আসবে না, যতক্ষণ না কোনো সন্দেহভাজনের আঙুল পরীক্ষা করতে পারছে তারা। আর গিটটা শনাক্ত করার ব্যাপারেও কোনো কপাল খোলেনি-শুধু কেতাদুরস্ত ব্যাংকসের মত যে ওটা নাবিকদের নয়। সপ্তা আফটারশেভটার কী হবে? ধরে নেওয়া যাক বেশিরভাগ আনসাব কিডন্যাপ করতে বেরোনোর আগে গায়ে সুগন্ধি মাখে না। তাহলে সে কেন মেখেছিল? রাইম আবারো এই সিদ্ধান্তে এল যে অন্য কোনো বিশেষ গন্ধ ঢাকতেই ওটা ব্যবহার করেছে সে। সম্ভাবনাগুলো খতিয়ে দেখল রাইম: খাবার, মদ, কেমিক্যাল, তামাক… কারো দৃষ্টি অনুভব করে ডানে তাকাল।

র‍্যাটলস্নেকের চোখের কোটরের কালো বিন্দুগুলো ক্লিনিট্রনের দিকে তাকিয়ে আছে। এই একটা কু বড় বেমানান। আমাদের টিটকারি মারা ছাড়া এর কোনো उद्देश्य নেই। কিছু একটা মনে পড়ল তার। কষ্টকর টার্নিং ফ্রেম ব্যবহার করে ধীরে ধীরে ক্রাইম ইন ওল্ড নিউ ইয়র্ক বইয়ের পাতা ওল্টাতে লাগল রাইম। সোজা চলে গেল জেমস স্নাইডারের অধ্যায়টায়। মনে রাখা প্যারাগ্রাফগুলো খুঁজে পেল সে।

এক বিখ্যাত মানসিক চিকিৎসক (‘সাইকি-লজি’ নামক বিদ্যার চর্চা করেন তিনি, ইদানীং এটা নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে) মত দিয়েছেন যে জেমস স্নাইডারের চূড়ান্ত লক্ষ্যের সাথে তার ভিকটিমদের ক্ষতি করার খুব একটা সম্পর্ক ছিল না। এই জ্ঞানী ডাক্তারের মতে, ভিলেন তাদের উপর প্রতিশোধ নিতে চাইছিল যারা তার ক্ষতি করেছে বলে সে মনে করত। তার রাগ ছিল শহরের কনস্টেবলদের উপর, কিংবা গোটা সমাজের উপরই। এই ঘৃণার উৎস কোথায়, কে বলতে পারে? হয়তো, প্রাচীন নীল নদের মতো, এর উৎসও পৃথিবীর কাছে গোপন ছিল; এবং হয়তো খোদ ভিলেনের কাছেও। তবুও একটা স্বল্পজাত তথ্যে এর কারণ খুঁজে পাওয়া যেতে পারে: দশ বছর বয়সের কোমলমতি জেমস স্নাইডার দেখেছিল চুরির অভিযোগে তার বাবাকে কনস্টেবলরা টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। জেলেই মারা যান তিনি। পরে জানা যায় তিনি নিরপরাধ ছিলেন। এই দুর্ভাগ্যজনক গ্রেপ্তারের পর ছেলেটার মা রাস্তায় নেমে পড়েন এবং ছেলেকে ত্যাগ করেন। পরে সে সরকারি আশ্রয়ে বড় হয়। পাগলটা কি সেই কনস্টেবলদের মুখের উপর উপহাস ছুঁড়ে দেওয়ার জন্যই এই অপরাধগুলো করেছিল যারা তার পরিবারকে ধ্বংস করার জন্য দায়ী? আমরা হয়তো কোনোদিনই জানতে পারব না। তবে যা পরিষ্কার মনে হয় তা হলো, নাগরিক সমাজের রক্ষকদের অক্ষমতাকে ব্যঙ্গ করে জেমস স্নাইডার-দ্য বোন কালেক্টর-তার নির্দোষ ভিকটিমদের মতোই শহরটার উপরও তার প্রতিশোধ নিচ্ছিল।

বালিশে গা এলিয়ে দিয়ে আবার প্রোফাইল চার্টের দিকে তাকাল লিংকন রাইম।

মাটি সবকিছুর চেয়ে ভারী। এটা খোদ পৃথিবী, লৌহখণ্ডের কণা। এটা ফুসফুস থেকে বাতাস বের করে শ্বাসরোধ করে মারে না। বরং কোষগুলোকে চেপে ধরো। অবশেষে নড়াচড়া করতে না পারার আতঙ্কে মারা যায় তারা। স্যাক্স চাইল যেন সে মারা যায়। প্রার্থনা করল যেন সত্যিই মরে যায়। দ্রুত। ভয়ে কিংবা হার্ট অ্যাটাকে। প্রথম বেলচার মাটি মুখে পড়ার আগেই। লিংকন রাইম তার বড়ি আর মদের জন্য যতটা প্রার্থনা করেছিল, তার চেয়েও বেশি করে প্রার্থনা করল সে। নিজের বাড়ির উঠোনে আনসাবের খোঁড়া কবরে শুয়ে স্যাক্স অনুভব করল উর্বর মাটির স্তর। ঘন আর পোকাভরতি মাটি তার শরীরকে ছেয়ে ফেলছে।

নিষ্ঠুরভাবে, ধীরে ধীরে তাকে কবর দিচ্ছে সে, একবারে অল্প এক কোপ মাটি ফেলছে, সাবধানে ছড়িয়ে দিচ্ছে তার চারপাশে। পা দিয়ে শুরু করেছিল লোকটা। এখন বুক পর্যন্ত উঠে এসেছে। তার রোবের ভেতর ঢুকে পড়ছে মাটি, প্রেমিকের আঙুলের মতো জমছে স্তনের চারপাশে। ভারী থেকে আরো ভারী হচ্ছে, চেপে ধরছে, ফুসফুস আটকে ফেলছে। একবারে এক বা দুই আউন্সের বেশি বাতাস টানতে পারছে না অ্যামেলিয়া। এক-দুবার থামল আততায়ী, তাকে দেখল, তারপর আবার শুরু করল। ও দেখতে পছন্দ করে…

হাতদুটো নিচে, ঘাড় টানটান করে মাথাটা মাটির উপরে রাখার চেষ্টা করছে মেয়েটা। তারপর তার বুক পুরোপুরি ঢাকা পড়ে গেল। কাঁধ, গলা। ঠান্ডা মাটি তার মুখের গরম চামড়া পর্যন্ত উঠে এল, মাথার চারপাশে এমনভাবে চেপে বসল যে নড়তে পারছে না সে। অবশেষে নিচু হয়ে মুখের টেপটা ছিঁড়ে ফেলল আততায়ী। স্যাক্স চিৎকার করার চেষ্টা করতেই এক মুঠো মাটি তার মুখে ফেলে দিল সে। শিউরে উঠল অ্যামেলিয়া, কালো মাটিতে বিষম খেল। কানে তালা লেগে যাচ্ছে, কেন যেন ছোটবেলার একটা গান শুনতে পাচ্ছে-‘দ্য গ্রিন লিভস অব সামার’। রেকর্ড প্লেয়ারে বারবার গানটা বাজাত বাবা। দুঃখভরা, ভূতুড়ে। চোখ বন্ধ করল সে। সব কালো হয়ে আসছে। একবার মুখ খুলতেই আরো এক কাপ পরিমাণ মাটি গেল পেটে।

মৃতদের মায়া ত্যাগ করা…

আর তারপর সে তলিয়ে গেল। একদম শান্ত। বিষম খাওয়া বা হাঁপানো বন্ধ। মাটিটা যেন এক নিখুঁত ছিপি। ফুসফুসে বাতাস নেই, কোনো শব্দও করতে পারছে না। নীরবতা, কেবল সেই ভূতুড়ে সুর আর কানে বাড়তে থাকা গর্জনের শব্দ ছাড়া। তারপর মুখের উপর চাপটা থেমে গেল, শরীরটা অবশ হয়ে যাওয়ার কারণে লিংকন রাইমের মতোই অবশ লাগছে তার। মনের দরজা বন্ধ হতে শুরু করল। অন্ধকার, অন্ধকার। বাবার কোনো কথা নেই। নিকও বলছে না কিছু… পাঁচ থেকে চারে গিয়ার কমিয়ে স্পিডোমিটারের কাঁটা তিন অঙ্কে তোলার কোনো স্বপ্ন নেই। অন্ধকার। মায়া ত্যাগ…

মাটি তার উপর ডেবে বসেছে, চাপ দিচ্ছে, আরো চাপ দিচ্ছে… কেবল একটা ছবি ভাসছে চোখে: গতকাল সকালে কবর থেকে উঠে আসা হাতটা, করুণার ভিক্ষা চেয়ে নড়ছিল। এমন কারো প্রতি যে করুণা করবে না তাকে। হাতটা ডাকছে স্যাক্সকে, অনুসরণ করতে বলছে। রাইম, তোমাকে মিস করব আমি। মায়া ত্যাগ…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *