১. এক দিনের রাজা
২. লোকার্ডের নীতি
৩. দ্য পোর্টেবলস ডটার
8. ডাউন টু দ্য বোন
৫. নড়াচড়ার উপর থাকলে ওরা তোমায় ধরতে পারবে না

দ্য বোন কালেক্টর – ১৭

অধ্যায় সতেরো

আমাদেরই একজন।

বিছানার পাশে ডেলরেকে ঘুরঘুর করতে দেখে ঠিক এই ভাবটাই ওর চাহনিতে দেখতে পেল রাইম। কেউ কেউ এমনটা করে। পঙ্গুত্ব যেন একটা ক্লাব, আর ওরা সেখানে ঢুকে পড়ে মশকরা, মাথা নাড়া আর চোখ টেপাটিপি করে। যেন বলতে চায়, দোস্ত, তোমায় ভালোবাসি আমি, তাই তোমায় নিয়ে মজা করছি।

লিংকন রাইম জানে এই আদিখ্যেতা কত দ্রুত বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ক্লিনিট্রন বিছানায় টোকা দিয়ে ডেলরে বলল, ‘দেখো কাণ্ড, এ তো স্টার ট্রেকের জিনিস। কমান্ডার রাইকার, শাটলে উঠে পড়ো।’

পোলিং বলল, ‘ডেলরে, যাও তো। এটা আমাদের কেস।’

‘তা আমাদের এই রোগী কেমন আছে, ডাক্তার ক্রাশার?’

ঢ্যাঙা এফবিআই এজেন্টের সামনে লিলিপুটের মতো দেখাল ক্যাপ্টেনকে। এগিয়ে এল সে। ‘ডেলরে, কানে গেছে কথা? ভাগো।’

‘ম্যান, আমিও কিনব এমন একটা। পাছা এলিয়ে দিয়ে খেলা দেখব। লিংকন, কেমন আছ বলো তো? কত বছর হলো দেখা নেই।’

টমকে জিজ্ঞেস করল রাইম, ‘ওরা কি নক করেছিল?’

‘না, নক করেনি।’

‘নক করোনি তুমি,’ বলল রাইম। ‘তাই যদি বলি বেরিয়ে যাও?’

বুকপকেটের কাগজগুলোয় টোকা দিয়ে ডেলরে বিড়বিড় করল, ‘ওয়ারেন্ট আছে।’

অ্যামেলিয়া স্যাক্সের ডান হাতের তর্জনী বুড়ো আঙুলটাকে খুঁটছে। রক্ত বেরিয়ে এল বলে।

ঘরটা জরিপ করে নিল ডেলরে। ওদের এই কাজ চালানো গোছের ল্যাব দেখে সে যে বেশ মুগ্ধ তা বোঝা গেল, কিন্তু ভাবটা চেপে গেল চট করে। ‘আমরা দায়িত্ব নিচ্ছি। সরি।’

বিশ বছরের পুলিশ জীবনে এমন জবরদখল আগে কখনো দেখেনি রাইম।

আনসাব ৮২৩
চেহারাবাসাগাড়িঅন্যান্য
•ককেশিয়ান, পুরুষ, মধ্যম বয়স •গাঢ় রঙের পোশাক পরে, পুরোনো গ্লাভস, লালচে চামড়ার •আফটারশেভ (অন্য কোনো গন্ধ ঢাকার জন্য?) • স্কি মাস্ক? নেভি ব্লু? গাঢ় রঙের গ্লাভস• সম্ভবত সেফ হাউজ আছে • সম্ভাব্য অবস্থান: ব্রডওয়ে ও ৮২তম স্ট্রিট (শপরাইট), ব্রডওয়ে ও ৯৬তম স্ট্রিট (অ্যান্ডারসন ফুডস), গ্রিনউইচ ও ব্যাংক স্ট্রিট, (শপরাইট) ২য় এভিনিউ, ৭২-৭৩তম স্ট্রিট, (গ্রোসারি ওয়ার্ল্ড) ব্যাটারি পার্ক সিটি, জে অ্যান্ড জিস এম্পোরিয়াম (১৭০৯ ২য় এভিনিউ), অ্যান্ডারসন ফুডস (৩৪তম স্ট্রিট ও লেক্সিংটন এভিনিউ), ফুড ওয়‍্যারহাউজ (৮ম এভিনিউ ও ২৪তম স্ট্রিট), শপরাইট (হিউস্টন ও লাফায়েত স্ট্রিট), জে অ্যান্ড জি’স এম্পোরিয়াম (৬ষ্ঠ এভিনিউ ও হিউস্টন), গ্রোসারি ওয়ার্ল্ড (গ্রিনউইচ ও ফ্র্যাংকলিন)• হলুদ ক্যাব •নতুন মডেলের সেডান, রং: ধূসর/রুপালি/বেইজ•ক্রাইম সিন প্রসিডিউর সম্পর্কে জানে, সম্ভবত আগের ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে •ফিঙ্গারপ্রিন্ট অ্যানালাইসিস জানে •পিস্তল = .৩২ কোল্ট, ভিকটিমকে অদ্ভুতভাবে বাঁধে • প্রাচীন জিনিস তাকে টানে • কাজ চালানোর মতো জার্মান জানে, একজন ভিকটিমকে “হ্যানা” বলে ডেকেছে • মাটির নিচের দুনিয়া তার কাছে আকর্ষণীয় • দ্বৈত ব্যক্তিত্ব • সে একজন যাজক, সমাজকর্মী বা কাউন্সিলর হতে পারে •জুতোর তলায় অস্বাভাবিক ক্ষয়। প্রচুর বই পড়ে? •ভিকটিমের আঙুল ভাঙার শব্দ শুনেছে, তদন্তকারীদের ভ্যাংচানোর জন্য সাপ রেখে গেছে

‘ফালতু কথা, ডেলরে,’ শুরু করল সেলিট্টো। ‘তুমি কেসটা ছেড়ে দিয়েছিলে।’

চকচকে কালো মুখটা ডিটেকটিভের দিকে ফিরে গেল।

‘ছেড়ে দিয়েছি? কই, কেউ তো ফোন করে বলেনি। তুমি করেছিলে?’

‘না।’

‘তবে কে খবরটা দিল?’

‘ইয়ে…’ সেলিট্টো অবাক হয়ে পোলিংয়ের দিকে তাকাল। বলল, ‘তোমাকে অ্যাডভাইজরি পাঠানো হয়েছিল। ওটুকুই নিয়ম।’

সে-ও এখন রক্ষণাত্মক।

‘অ্যাডভাইজরি। হ্যাঁ। তা সেটা পাঠিয়েছিলে কীভাবে? পনি এক্সপ্রেসে? বুক-পোস্টে? বলো, জিম, যখন অপারেশন চলছে, তখন রাতারাতি অ্যাডভাইজরি পাঠিয়ে লাভ কী?’

পোলিং বলল, ‘আমরা দরকার মনে করিনি।’

‘আমরা?’ চট করে ধরল ডেলরে। ঠিক যেন আণুবীক্ষণিক টিউমার খুঁজে পাওয়া সার্জন।

‘আমি দরকার মনে করিনি!’ খেঁকিয়ে উঠল পোলিং। ‘মেয়রকে বলেছি এটাকে লোকাল অপারেশন হিসেবে রাখতে। সব নিয়ন্ত্রণে আছে আমাদের। এবার বিদায় হও, ডেলরে।’

‘আর তুমি ভেবেছিলে এয়ারপোর্টের খবরের আগেই কেসটা শেষ করে ফেলবে।’

‘আমরা কী ভেবেছিলাম তাতে তোমার বাবার কী!’ পোলিং-এর চিৎকারে চমকে উঠল রাইম। ‘এটা আমাদের কেস।’

ক্যাপ্টেনের কুখ্যাত মেজাজের কথা জানত সে, কিন্তু স্বচক্ষে দেখেনি কখনো।

‘আস-লে, এটা এখন আ-মা-দের কেস।’ কুপারের টেবিলের পাশ দিয়ে পায়চারি করতে করতে বলল ডেলরে।

রাইম বলল, ‘এমন কোরো না, ফ্রেড। লোকটাকে বাগে আনছি আমরা। আমাদের সাথে কাজ করো, কিন্তু কেড়ে নিও না। এই আনসাব তোমার চেনা অপরাধীদের মতো নয়।’

হাসল ডেলরে। ‘দেখি, এই বালের কেসের কী অবস্থা? তোমরা নাকি এক সিভিলিয়ানকে দিয়ে ফরেনসিক করাচ্ছ।’

ক্লিনিট্রন বিছানাটার দিকে তাকাল না এজেন্ট। ‘একজন পেট্রোল পুলিশকে দিয়ে ক্রাইম সিন করাচ্ছ। সৈন্যদের দিয়ে মুদি বাজার করাচ্ছ।’

‘এভিডেন্স স্ট্যান্ডার্ড, ফ্রেডরিক,’ কড়া গলায় মনে করিয়ে দিল রাইম। ‘ওটাই নিয়ম।’

হতাশ দেখাল ডেলরেকে।

‘কিন্তু ইএসইউ, লিংকন? পাবলিকের এতগুলো টাকা। তার উপর ঐ টেক্সাস চেইন স-এর মতো মানুষ কাটাকাটি…’

খবরটা রটল কী করে? অঙ্গচ্ছেদের ব্যাপারে সবাই গোপনীয়তার শপথ নিয়েছিল।

‘আর এটাও শুনলাম হাউম্যানের ছেলেরা ভিকটিমকে খুঁজে পাওয়ার পরেও সাথে সাথে গিয়ে বাঁচায়নি? চ্যানেল ফাইভের কাছে বিগ ইয়ার মাইক ছিল। তোমরা লোক পাঠানোর আগে প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে মেয়েটার চিৎকার রেকর্ড করেছে ওরা।’

বাঁকা হেসে সেলিটোর দিকে তাকাল সে। ‘লন, দোস্ত, একটু আগে যে সমস্যার কথা বলছিলে, এটা কি সেটাই?’

অনেক দূর এগিয়েছে তারা, ভাবছিল রাইম। লোকটাকে বুঝতে শুরু করেছে, আনসাবের ভাষা শিখতে শুরু করেছে। তাকে দেখতে পাচ্ছে। বিস্মিত হলো সে। আবারো নিজের প্রিয় দুনিয়াটায় ঢুকতে পেরেছে। এতগুলো বছর পর। আর এখন কেউ একজন সেটা কেড়ে নিতে এসেছে। রাগের ঢেউ খেলে গেল তার ভেতরে।

‘কেসটা নাও, ফ্রেড,’ গজগজ করল রাইম। ‘কিন্তু আমাদের বাদ দিও না। কোরো না এ কাজ।’

‘দুটো ভিকটিম হারিয়েছ তোমরা ইম,’ মনে করিয়ে দিল ডেলরে।

‘একজনকে হারিয়েছি,’ শুধরে দিল সেলিট্টো। পোলিংয়ের দিকে আড়চোখে তাকাল। সে তখনো ফুঁসছে। ‘প্রথমজনের ব্যাপারে আমাদের কিছু করার ছিল না। ওটা ছিল ওর জানান দেওয়ার পদ্ধতি।’

হাত আড়াআড়ি ভাঁজ করে ঝগড়াটা দেখছে ডবিন্স।

ঝাঁপিয়ে পড়ল জেরি ব্যাংকস। ‘আমরা ওর রুটিন ধরে ফেলেছি। আর কাউকে মরতে দেবো না।’

‘দেবে, যদি ইএসইউ বসে বসে ভিকটিমদের চিৎকার শোনে।’

সেলিট্টো বলল, ‘ওটা আমার…’

‘আমার সিদ্ধান্ত,’ বলে উঠল রাইম। ‘আমার।’

‘কিন্তু তুমি সিভিলিয়ান, লিংকন। তাই ওটা তোমার সিদ্ধান্ত হতে পারে না। তোমার পরামর্শ হতে পারে। সুপারিশ হতে পারে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নয়।’

ডেলরের মনোযোগ আবার স্যাক্সের দিকে। তার দিকে তাকিয়ে রাইমকে বলল, ‘তুমি পেরেত্তিকে সিন চালাতে বারণ করেছ? ব্যাপারটা তো বেশ অদ্ভুত, লিংকন। এমন করতে গেলে কেন?’

রাইম বলল, ‘ওর চেয়ে আমি ভালো।’

‘পেরেত্তি কিন্তু খুশি নয় একদমই। একার্টের সাথে আমার আর ওর একটু কথাবার্তা হয়েছে।’

একার্ট? ডেপুটি কমিশনার? সে জড়াল কী করে?

স্যাক্সের দিকে এক নজর তাকিয়েই বুঝে ফেলল সে। এলোমেলো লাল চুলের নিচে থাকা ঐ নীল চোখদুটো তাকাতে পারছে না তার দিকে। দৃষ্টি দিয়ে তাকে বিঁধল রাইম। সেটা চটজলদি এড়িয়ে গেল মেয়েটা।

ডেলরেকে বলল রাইম, ‘দেখি… পেরেত্তি? ও-ই তো সেই লোক যে ট্রাফিক চালু করে দিয়েছিল ঠিক সেই জায়গায় যেখানে দাঁড়িয়ে আনসাব প্রথম ভিকটিমকে দেখেছিল? ও-ই তো সেই লোক যে আমরা গুরুত্বপূর্ণ আলামত পাওয়ার আগেই সিন ছেড়ে দিয়েছিল? যে সিনটা সিল করার মতো দূরদর্শিতা এই স্যাক্সের ছিল। আমার এই অফিসার স্যাক্স ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিল। আর আমার এই স্যাক্সই ক্রাইম সিনটা রক্ষা করেছিল। মানে, ভিন্স পেরেত্তি আর বাকি সবার বুঝতে ভুল হয়েছে।’

নিজের বুড়ো আঙুলের দিকে তাকিয়ে আছে অ্যামেলিয়া, যেন আগেও বহুবার দেখেছে এই দৃশ্য। পকেট থেকে একটা টিস্যু বের করে রক্তাক্ত আঙুলটা পেঁচিয়ে নিল তাতে।

সারসংক্ষেপ টানল ডেলরে, ‘শুরুতেই আমাদের ডাকলে ভালো করতে।’

‘বেরিয়ে যাও,’ বিড়বিড় করল পোলিং। চোখের মণি জ্বলে উঠল তার, চড়ল গলা। ‘জাহান্নামে যাও!’ চিৎকার করে উঠল সে।

এমনকি ঠান্ডা মাথার ডেলরেও ক্যাপ্টেনের মুখ থেকে ছিটকে আসা থুতু দেখে চোখ পিটপিট করে পিছিয়ে গেল।

রাইমের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল রাইম। কেসটার কিছু অংশ হয়তো বাঁচানো যেত, কিন্তু পোলিং মেজাজ দেখালে তা আর হবে না।

‘জিম…’

তাকে পাত্তাই দিল না ক্যাপ্টেন। ‘আউট!’ আবার চিৎকার করল সে। ‘আমাদের কেস তুমি নিতে পারবে না!’ সবাইকে চমকে দিয়ে সামনে লাফ দিল সে, সবুজ ল্যাপেল ধরে এজেন্টকে দেয়ালে ঠেসে ধরল।

মুহূর্তের স্তব্ধতার পর আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো ধাক্কায় ক্যাপ্টেনকে সরিয়ে দিল ডেলরে, সেলফোন বের করল। বাড়িয়ে দিল পোলিংয়ের দিকে।

‘মেয়রের ফোন দাও। বা চিফ উইলসনকে।’

সহজাত প্রবৃত্তিতেই ডেলরের কাছ থেকে সরে এল পোলিং। লম্বা লোকের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে আসা বেঁটে লোকেরা যেমন করে।

‘কেসটা চাও? নিয়ে নাওগে তাহলে।’ গটগট করে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল ক্যাপ্টেন, নেমে গেল নিচে। দড়াম করে বন্ধ হলো সদর দরজা।

‘জিসাস, ফ্রেড,’ বলল সেলিট্টো। ‘আমাদের সাথে কাজ করো। আমরা ধরতে পারব হারামজাদাকে।’

‘ব্যুরোর অ্যান্টি-টেরর ইউনিট দরকার আমাদের,’ এখন বেশ যুক্তিবাদী শোনাল ডেলরেকে। ‘টেরোরিস্ট দিকটা সামলানোর সেটআপ তোমাদের নেই।’

‘কীসের টেরোরিস্ট?’ জানতে চাইল রাইম।

‘ইউএন পিস কনফারেন্স। আমার এক সোর্স বলেছে এয়ারপোর্টে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। যেখান থেকে ও ভিকটিমদের তুলেছিল।’

‘আমি ওকে টেরোরিস্ট বলব না,’ বলল ডবিন্স। ‘ওর ভেতরে যাই চলুক না কেন, তা মনস্তাত্ত্বিক। কোনো আদর্শগত ব্যাপার নয়।’

‘দেখো, আসল কথা হলো, কোয়ান্টিকো আর আমরা একদিকে এগোচ্ছি। তোমাদের ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু আমরা এভাবেই কাজটা করব।’

হাল ছেড়ে দিল রাইম। ক্লান্তি গ্রাস করছে তাকে। মনে হলো আজ সকালে সেলিট্টো আর তার ঐ দাগী সহকারী না এলেই ভালো হতো। মনে হলো অ্যামেলিয়া স্যাক্সের সাথে দেখা না হলেই ভালো হতো। মনে হলো এই হাস্যকর কড়কড়ে সাদা শার্টটা না পরলেই ভালো হতো।

খেয়াল করল ডেলরে তার সাথে কথা বলছে।

‘সরি?’

‘মানে, রাজনীতিও তো একটা মোটিভ হতে পারে, তাই না?’ পেশিবহুল নাচাল রাইম।

‘মোটিভ নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই,’ বলল রাইম। ‘আমার আগ্রহ এভিডেন্সে।’

আবারো কুপারের টেবিলের দিকে তাকাল ডেলরে। ‘তো কেসটা আমাদের। সবাই একমত তো?’

‘আমাদের কী করার আছে?’ জানতে চাইল সেলিট্টো।

‘সার্চার দিয়ে ব্যাকআপ দিতে পারো। কিংবা পুরোপুরি সরে যেতে পারো। এটুকুই। আমরা এখন ফিজিক্যাল এভিডেন্স নিয়ে নেব, যদি আপত্তি না থাকে।’

ইতস্তত করল ব্যাংকস।

‘দিয়ে দাও,’ হুকুম দিল সেলিটো।

শেষ সিনের এভিডেন্স ব্যাগগুলো তুলে বড় একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরল তরুণ পুলিশ। হাত বাড়িয়ে দিল ডেলরে। সরু আঙুলগুলোর দিকে তাকিয়ে টেবিলে ব্যাগটা ছুঁড়ে দিল ব্যাংকস, তারপর ঘরের উল্টো দিকে সরে গেল—পুলিশদের দিকে।

লিংকন রাইম এখন তাদের মাঝখানে এক ডিমিলিটারাইজড জোন। অ্যামেলিয়া স্যাক্স ঠায় দাঁড়িয়ে আছে রাইমের বিছানার পায়ের কাছে।

ডেলরে তাকে বলল, ‘অফিসার স্যাক্স?’

একটু থেমে রাইমের দিকে তাকিয়ে সে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ?’

‘কমিশনার একার্ট ক্রাইম সিনের ব্যাপারে বিস্তারিত বলার জন্য আপনাকে চাইছেন। সোমবার আপনার নতুন অ্যাসাইনমেন্ট শুরুর ব্যাপারে কিছু বলছিলেন উনি।’

মাথা নাড়ল সে।

রাইমের দিকে ফিরে আন্তরিকভাবে বলল ডেলরে, ‘চিন্তা কোরো না, লিংকন। আমরা ধরে ফেলব ওকে। এরপর শুনবে, শহরের গেটে ওর মাথা লটকে আছে।’

সঙ্গী এজেন্টদের দিকে মাথা নাড়ল সে, ওরা এভিডেন্স গুছিয়ে নিয়ে নিচে নামতে শুরু করল।

হলওয়ে থেকে স্যাক্সকে ডাকল ডেলরে, ‘আসছেন তো, অফিসার?’

হাতদুটো একসাথে জড়ো করে দাঁড়িয়ে রইল সে, যেন কোনো পার্টিতে এসে আফসোস করছে এক স্কুলছাত্রী।

‘আসছি।’

সিঁড়ি দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল ডেলরে।

‘শুয়োরের বাচ্চাগুলো,’ ওয়াচবুকটা টেবিলে ছুঁড়ে মেরে বিড়বিবি করল ব্যাংকস। ‘ভাবা যায়?’

গোড়ালির উপর ভর দিয়ে দুলল স্যাক্স।

‘যাওয়াই ভালো, অ্যামেলিয়া,’ বলল রাইম। ‘তোমার রত্ন দাঁড়িয়ে আছে।’

‘লিংকন।’ বিছানার কাছে এগিয়ে এল সে।

‘ঠিক আছে,’ বলল সে। ‘তুমি যা করার করেছ।’

‘ক্রাইম সিনের কাজ আমার নয়,’ ফস করে বলে ফেলল মেয়েটা। ‘আমি কখনো চাইনি।’

‘আর করতেও হবে না তোমাকে। ভালোই হলো, তাই না?’

দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করেও ঘুরে দাঁড়াল অ্যামেলিয়া, বলে উঠল, ‘এভিডেন্স ছাড়া আর কোনো কিছুর মূল্য নেই তোমার কাছে, তাই না?’

নড়েচড়ে বসল সেলিট্টো আর ব্যাংকস। কিন্তু সে পাত্তাই দিল না।

‘টম, আমাদের মেহমানকে একটু পথ দেখিয়ে দেবে?’

বলে চলল স্যাক্স, ‘এসবই তোমার কাছে একটা খেলা, তাই না? মনেল…’

‘কে?’

জ্বল উঠে উঠল তার চোখ। ‘ঐ তো! দেখলে? নামটাও মনে নেই তোমার। মনেল গ্যারগার। টানেলের ঐ মেয়েটা…তোমার কাছে ও ছিল পাজলের একটা টুকরো মাত্র। ওর গায়ের উপর দিয়ে ইঁদুর হাঁটছিল, আর তা দেখে তুমি বললে, “ওটাই ওদের স্বভাব।” ওটাই ওদের স্বভাব? মেয়েটা আর কখনো আগের মতো হতে পারবে না, আর তোমার চিন্তা কেবল তোমার ঐ সাধের এভিডেন্স নিয়ে।’

‘জীবিত ভিকটিমের ক্ষেত্রে,’ মাস্টারের মতো আউড়ে গেল সে, ‘ইঁদুরের কামড় বেশি গভীর হয় না। প্রথম প্রাণীটা লালা লাগানোর পরই র‍্যাবিস ভ্যাকসিন লাগত ওর। আরো কয়েকটা কামড়ে কী আর এমন তফাত হয়েছে?’

‘ওর মতামত জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়?’

স্যাক্সের হাসিটা এখন অন্য রকম লাগছে। বিষাক্ত, ঠিক সেই নার্স আর থেরাপি এইডদের মতো, যারা পঙ্গুদের ঘৃণা করে। রিহ্যাব ওয়ার্ডে ওরা এমন হাসিমুখ নিয়েই ঘোরে। বেশ, ঐ ভদ্র অ্যামেলিয়া স্যাক্সকে তার পছন্দ হচ্ছিল না; এই লড়াকু মেজাজটাই চেয়েছিল সে…

‘একটা উত্তর দাও, রাইম। আমাকেই কেন চেয়েছিলে?’

‘টম, আমাদের মেহমান বেশি সময় নষ্ট করছে। তুমি কি…?’

‘লিংকন,’ শুরু করল সহকারী।

‘টম!’ ধমকে উঠল রাইম। ‘যা বলছি করো।’

‘কারণ আমি কিচ্ছু জানি না,’ বলে উঠল স্যাক্স। ‘সেজন্যই! তুমি কোনো আসল সিএস টেকনিশিয়ান চাওনি। তাহলে আর মাতব্বরি করতে পারতে না। কিন্তু যেখানে খুশি সেখানে পাঠাচ্ছ। যা চাইবে তা তো হবে না সব সময়ে।’

‘আহ, সৈন্যটা বিদ্রোহ করে বসেছে…’ সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলল রাইম। ‘কিন্তু আমি সৈন্যদলের কেউ নই। আমি প্রথমেই বলেছিলাম আমি এটা চাই না।’

‘আইমিও চাইনি। কিন্তু আমরা এখানে আছি এই মুহূর্তে। একসাথে, একই জায়গায়।’ হিমশীতল হাসি দিল রাইম। এই হাসির কাছে মেয়েটার শীতল ভঙ্গি কিছুই না। ‘তুমি তো একটা বখে যাওয়া পুলিশ।’

‘হেই, অফিসার, থামো!’ ধমক দিল সেলিট্টো।

কিন্তু সে থামল না। ‘আর ক্রাইম সিনে যেতে পারো না সেটা দুঃখজনক। কিন্তু নিজের ইগো সামলাতে তদন্তের বারোটা বাজাচ্ছ তুমি। চুলোয় যাক সব!’

পেট্রোল হ্যাটটা ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।

নিচতলা থেকে দড়াম করে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ, হয়তো বা কাচ ভাঙার আওয়াজ শোনার অপেক্ষায় রইল রাইম। কিন্তু একটা মৃদু ক্লিক শব্দ হলো শুধু, তারপর সব চুপচাপ।

অস্বস্তি তাড়াতে ওয়াচবুক তুলে নিয়ে অযথাই মনোযোগ দিয়ে পাতা ওল্টাতে লাগল ব্যাংকস। মুখ খুলল সেলিট্টো, ‘লিংকন, আমি দুঃখিত। আমি…’

‘সমস্যা নেই,’ বুকের ভেতরের চিন-চিনে ব্যথাটা কমবে এই মিথ্যা আশায় বিশাল এক হাই তুলে বলল রাইম। ‘আমার কিছু হয়নি।’

আধখালি টেবিলটার পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল পুলিশরা। অস্বস্তিকর নীরবতা ঝুলে রইল কিছুক্ষণ। তারপর কুপার বলল, ‘গুছিয়ে নেওয়াই ভালো।’

কালো এক স্কোপ কেস টেবিলের উপর তুলে স্যাক্সোফোন খোলার মতো পরম মমতায় একটা আইপিস খুলতে শুরু করল সে।

‘আচ্ছা, টম,’ রাইম বলল, ‘সূর্য ডুবে গেছে। জানো এর মানে কী? বার খুলেছে।’

ওদের ওয়ার রুমটা দারুণ। লিংকন রাইমের বেডরুমকে এক তুড়িতে হারিয়ে দেয়। ফেডারেল বিল্ডিংয়ের অর্ধেক ফ্লোর জুড়ে এখন জনা ত্রিশেক এজেন্ট, কম্পিউটার আর ইলেকট্রনিক প্যানেল। মনে হচ্ছে, টম ক্ল্যান্সির কোনো সিনেমার দৃশ্য। এজেন্টদের দেখতে উকিল বা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকারদের মতো লাগছে। সাদা শার্ট, টাই। কেতাদুরস্ত বললেই বেশি মানায়। আর মাঝখানে অ্যামেলিয়া স্যাক্স, নেভি-ব্লু ইউনিফর্মে বেমানান, গায়ে ইঁদুরের রক্ত, ধুলো আর একশো বছরের পুরোনো গরুর গু লেগে আছে।

রাইমের সাথে ঝগড়ার রেশ কেটে গেছে। মনে মনে শত শত কথা পাক খাচ্ছে এখনো। এগুলোও ঝেড়ে আসতে পারলে ভালো হতো। ওসব চিন্তা সরিয়ে জোর করে সে মন দিল চারপাশের ঘটনায়।

ধোপদুরস্ত ধূসর স্যুট পরা এক লম্বা এজেন্ট নিচু স্বরে কথা বলছে ডেলরের সাথে—দুজনেই বিশালদেহী, মাথা নিচু, গম্ভীর। ম্যানহাটন অফিসের স্পেশাল এজেন্ট ইন চার্জ থমাস পারকিন্স হবে হয়তো, নিশ্চিত নয় সে। ড্রাই ক্লিনার বা ইনস্যুরেন্স সেলসম্যানের এফবিআই-এর সাথে যতটুকু যোগাযোগ থাকে, একজন পেট্রোল অফিসারের তার চেয়ে বেশি থাকে না। লোকটাকে নিরস আর কাজের মানুষ মনে হলো, বারবার তাকাচ্ছে দেয়ালে সাঁটানো ম্যানহাটন-এর বিশাল ম্যাপটার দিকে।

ব্রিফিং শেষ হতেই মাথা নাড়ল পারকিন্স, তারপর ম্যানিলা ফোল্ডার ছড়ানো ফাইবারবোর্ডের টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, এজেন্টদের দিকে তাকিয়ে কথা শুরু করল।

‘সবাই একটু মনোযোগ দেবেন… ওয়াশিংটনে ডিরেক্টর আর এজি-র সাথে এইমাত্র কথা হলো। কেনেডি এয়ারপোর্টের আনসাবের কথা সবাই শুনেছেন। প্রোফাইলটা অস্বাভাবিক। কোনো সেক্সুয়াল এলিমেন্ট ছাড়া কিডন্যাপিং সচরাচর সিরিয়াল অ্যাক্টিভিটির ভিত্তি হয় না। আসলে সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টে এ ধরনের আনসাব এই প্রথম। এই সপ্তাহে ইউএন-এর ঘটনার সাথে এর যোগসূত্র থাকার সম্ভাবনার কারণে আমরা হেডকোয়ার্টার, কোয়ান্টিকো আর মহাসচিবের অফিসের সাথে সমন্বয় করছি। আমাদের বলা হয়েছে এই কেসে সম্পূর্ণ প্রোঅ্যাক্টিভ বা অগ্রণী ভূমিকা নিতে। সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এটাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’

ডেলরের দিকে তাকাল এসএসি। সে বলল, ‘এনওয়াইপিডি-র কাছ থেকে কেসটা আমরা নিয়ে নিয়েছি, তবে ব্যাকআপ আর লোকবলের জন্য ওদের ব্যবহার করব। সিন সম্পর্কে ব্রিফ করার জন্য ক্রাইম সিন অফিসার আমাদের সাথে আছেন।’

এখানে ডেলরের গলা একদম অন্য রকম। আন্ডারকাভার এজেন্টের ভাবটা উধাও।

‘ফিজিক্যাল এভিডেন্স কি ভাউচার করেছেন?’ স্যাক্সকে জিজ্ঞেস করল পারকিন্স।

স্যাক্স স্বীকার করল সে করেনি। ‘আমরা ভিকটিমদের বাঁচাতে ব্যস্ত ছিলাম।’

বিরক্ত হলো এসএসি। ফিজিক্যাল এভিডেন্সের চেইন অব কাস্টডি ঠিকঠাক না থাকায় আদালতে অনেক শক্ত কেসও প্রায়ই ভেস্তে যায়। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সবার আগে ওটা নিয়েই চিল্লাচিল্লি করে।

‘যাওয়ার আগে কাজটা অবশ্যই সেরে যাবেন।’

‘ইয়েস, স্যার।’

আমিই একার্টের কাছে অভিযোগ করেছি, এটা বোঝার পর রাইমের চেহারাটা যা হয়েছিল, ভাবল সে। আমার এই অফিসার স্যাক্স ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিল। আর আমার এই স্যাক্সই ক্রাইম সিনটা রক্ষা করেছিল।

আবার নখ খুঁটতে শুরু করল সে।

থামো! নিজেকে ধমক দিল সে, বরাবরের মতোই, তারপরেও খুঁটে চলল। ব্যথাটা ভালো লাগছে। থেরাপিস্টরা এটা কখনোই বোঝেনি।

এসএসি বলল, ‘এজেন্ট ডেলরে? আমরা কীভাবে এগোব সে ব্যাপারে রুমকে ব্রিফ করবেন কি।’

এসএসি থেকে অন্য এজেন্টদের দিকে তাকাল ডেলরে, বলল, ‘এই মুহূর্তে আমাদের ফিল্ড এজেন্টরা শহরের প্রতিটি টেরোরিস্ট সেলে হানা দিচ্ছে এবং আনসাবের বাসস্থানের হদিস পেতে পারে এমন সব সূত্রের পিছু নিয়েছে। সব সিআই, সব আন্ডারকাভার এজেন্ট। এর ফলে কিছু চলমান অপারেশন হয়তো ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কিন্তু আমরা ঝুঁকিটা নেওয়া দরকার মনে করেছি। এখানে আমাদের কাজ হলো দ্রুত সাড়া দেওয়া। ছয়জন এজেন্টের এক-একটা দলে ভাগ হয়ে যাবেন আপনারা এবং যেকোনো সূত্র পাওয়ামাত্র যাওয়ার জন্য তৈরি থাকবেন। আপনাদের সাথে থাকবে পূর্ণাঙ্গ হোস্টেজ-রেসকিউ এবং ব্যারিকেড-এন্ট্রি সাপোর্ট।’

‘স্যার,’ বলল স্যাক্স।

কুঁচকে তাকাল পারকিন্স। প্রশ্নোত্তর পর্বের আগে ব্রিফিংয়ে বাধা দেওয়া নিয়ম নয়। ‘হ্যাঁ, কী ব্যাপার, অফিসার?’

‘মানে, ভাবছিলাম স্যার। ভিকটিমের কী হবে?’

‘কে, ঐ জার্মান মেয়েটা? আপনি কি মনে করেন ওকে আবার জেরা করা উচিত?’

‘না, স্যার। আমি পরবর্তী ভিকটিমের কথা বলছিলাম।’

পারকিন্স জবাব দিল, ‘ওহ, আরো টার্গেট থাকতে পারে সে ব্যাপারে আমরা অবশ্যই সজাগ থাকব।’

স্যাক্স বলে চলল, ‘তার হাতে এখন একজন আছে।’

‘আছে?’ ডেলরের দিকে তাকাল এসএসি। কাঁধ ঝাঁকাল সে। স্যাক্সকে জিজ্ঞেস করল পারকিন্স, ‘জানলেন কী করে?’

‘ঠিক জানি না, স্যার। কিন্তু গত সিনে সে কিছু রেখে গেছে, আর হাতে আরেকজন ভিকটিম না থাকলে বা এখনই কাউকে তোলার প্ল্যান না থাকলে সে তা করত না।’

‘নোট করা হলো, অফিসার,’ বলল এসএসি। ‘ওদের যাতে কিছু না হয় সেজন্য আমরা যথাসম্ভব দ্রুত ব্যবস্থা নেব।’

ডেলরে তাকে বলল, ‘আমাদের মনে হয় জানোয়ারটার উপর ফোকাস করাই সবচেয়ে ভালো হবে।’

‘ডিটেকটিভ স্যাক্স—’ শুরু করল পারকিন্স।

‘আমি ডিটেকটিভ নই, স্যার। পেট্রোলে আছি।’

‘হ্যাঁ, তো,’ ফাইলের স্তূপের দিকে তাকিয়ে বলল এসএসি, ‘আপনি যদি আপনার পয়েন্টগুলো সংক্ষেপে বলেন, তবে উপকার হয়।’

ত্রিশজন এজেন্ট তাকিয়ে আছে তার দিকে। তাদের মধ্যে দুজন মহিলা।

‘যা দেখেছেন শুধু তাই বলুন,’ বলল ডেলরে, উঁচু দাঁতের ফাঁকে একটা নেভানো সিগারেট কামড়ে ধরে আছে।

ক্রাইম সিনগুলোয় সে কী খুঁজে পেয়েছে এবং রাইম ও টেরি ডবিন্স কী সিদ্ধান্তে এসেছে তার একটা সারসংক্ষেপ শোনাল সে। আনসাবের অদ্ভুত কার্যপদ্ধতি নিয়ে চিন্তিত হলো বেশিরভাগ এজেন্ট।

‘গেম খেলছে যেন আমাদের সাথে,’ বিড়বিড় করল একজন।

একজন জানতে চাইল ক্রুগুলোর মধ্যে কোনো রাজনৈতিক বার্তা আছে কি না।

‘স্যার, সে সত্যিই কোনো টেরোরিস্ট তা আমি মনে করি না,’ জোর দিয়ে বলল স্যাক্স।

তার দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকাল পারকিন্স। ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করি, অফিসার। এই আনসাব খুব চতুর এটা তো মানছেন?’

‘খুবই চতুর।’

‘ডাবল ব্লাফ হতে পারে না এটা?’

‘কীভাবে?’

‘আপনারা…মানে এনওয়াইপিডি ভাবছে ও শুধুই একটা পাগল। মানে, ক্রিমিনাল পার্সোনালিটি। কিন্তু এটা কি সম্ভব নয় যে ও আপনাদের সেটাই ভাবাতে চাইছে? আসলে অন্য কিছু ঘটছে।’

‘যেমন?’

‘সে যে কুগুলো রেখে গেছে, ওগুলো কি মনোযোগ ঘোরানোর চাল হতে পারে না?’

‘না, স্যার, ওগুলো নির্দেশনা,’ বলল স্যাক্স। ‘আমাদের ভিকটিমদের কাছে নিয়ে যাচ্ছে।’

‘বুঝলাম,’ চটপট বলল থমাস পারকিন্স। ‘কিন্তু তা করে সে আমাদের অন্য টার্গেট থেকেও দূরে সরিয়ে নিচ্ছে, তাই না?’

এটা ভাবেনি সে। ‘হতে পারে।’

‘আর চিফ উইলসন কিডন্যাপিং নিয়ে কাজ করার জন্য ইউএন সিকিউরিটি ডিটেইল থেকে দেদারসে লোক সরাচ্ছেন। এই আনসাব হয়তো সবার মনোযোগ অন্য দিকে ব্যস্ত রাখছে, যাতে সে তার আসল মিশন চালাতে পারে।’

স্যাক্সের মনে পড়ল আজ সকালেই তারও এমন মনে হয়েছিল, পার্ল স্ট্রিটে এত সার্চার দেখে। ‘আর তার আসল টার্গেট ইউএন?’

‘আমাদের তাই ধারণা,’ ডেলরে বলল। ‘লন্ডনে ইউনেস্কো বম্বিংয়ের পেছনে যারা ছিল, তারা হয়তো আবার চেষ্টা করতে চায়।’

তার মানে রাইম সম্পূর্ণ ভুল পথে এগোচ্ছে। অপরাধবোধের ভারটা একটু কমল তার।

‘এবার, অফিসার, এভিডেন্সগুলোর তালিকাটা কি একটু বলবেন?’ পারকিন্স জিজ্ঞেস করল।

যা যা পেয়েছে তার একটা ইনভেন্টরি শিট তার হাতে দিল ডেলরে। এক এক করে পড়ে শোনাল সে। কথা বলার সময় চারপাশের ব্যস্ততা টের পাচ্ছিল স্যাক্স—কেউ ফোন ধরছে, কেউ দাঁড়িয়ে ফিসফিস করছে, কেউ নোট নিচ্ছে। কিন্তু যখন শিটটার দিকে তাকিয়ে সে যোগ করল ‘তারপর আমি শেষ সিনে তার এই আঙুলের ছাপটা পেলাম’, তখন সে বুঝতে পারল সারা ঘরে পিনপতন নীরবতা নেমে এসেছে।

মুখ তুলল সে। অফিসের প্রতিটি মুখ তার দিকে তাকিয়ে আছে, প্রায় স্তম্ভিত সবাই—যদি ফেডারেল এজেন্টদের পক্ষে আদৌ তা হওয়া সম্ভব হয় আর কি।

অসহায়ভাবে ডেলরের দিকে তাকাল সে। মাথা কাত করল ডেলরে। ‘বলতে চাইছ একটা প্রিন্ট পেয়েছ তুমি?’

‘হ্যাঁ, পেয়েছি। শেষ ভিকটিমের সাথে ধস্তাধস্তির সময় তার গ্লাভস খুলে পড়ে গিয়েছিল আর সেটা তোলার সময় মেঝের সাথে হাত ঘষা লেগেছিল।’

‘কোথায় ওটা?’ চটজলদি জিজ্ঞেস করল ডেলরে।

‘জিসাস,’ এক এজেন্ট বলল। ‘আগে বলেননি কেন?’

‘মানে, আমি—’

‘খুঁজে বের করুন, বের করুন!’ অন্য কেউ হাঁক দিল।

গুঞ্জন উঠল ঘরে। কাঁপা হাতে এভিডেন্স ব্যাগগুলো ঘেঁটে আঙুলের ছাপের পোলারয়েডটা ডেলরের হাতে দিল সে। তুলে ধরল ডেলরে, ভালো করে দেখল। একজনকে দেখাল, স্যাক্সের ধারণা সে ফ্রিকশন-রিজ এক্সপার্ট। ‘গুড,’ মত দিল এজেন্ট। ‘একেবারে এ-গ্রেড।’

স্যাক্স জানে ছাপগুলোকে এ, বি এবং সি গ্রেডে ভাগ করা হয়, নিছু গ্রেডের ছাপ বেশিরভাগ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু এভিডেন্স জোগাড় করার দক্ষতায় যেটুকু গর্ববোধ করছিল, আগে কেন বলেনি তা নিয়ে সবার হতাশায় তা ধূলিসাৎ হয়ে গেল।

তারপর সবকিছু একসাথে ঘটতে শুরু করল। এক এজেন্টের হাতে ছবিটা দিল ডেলরে, সে দৌড়ে অফিসের কোনায় এক জটিল কম্পিউটারের কাছে গেল এবং অপটি-স্ক্যান নামের এক বড়, বাঁকানো জিনিসের উপর পোলারয়েডটা রাখল। আরেক এজেন্ট কম্পিউটার চালু করে কমান্ড টাইপ করতে শুরু করল, ওদিকে ডেলরে ছোঁ মেরে তুলে নিল ফোন। অধৈর্য হয়ে পায়ে টোকা দিচ্ছে সে, তারপর মাথা নামাল, কোথাও লাইন কানেক্ট হয়েছে।

‘জিনি, ডেলরে বলছি। জানি খুব জ্বালাচ্ছি, কিন্তু নর্থ-ইস্ট রিজিয়নের সব এফিস (AFIS) রিকোয়েস্ট বন্ধ করে দাও, আর আমি যেটা পাঠাচ্ছি সেই কাজ আগে করো।… পারকিন্স আছে আমার সাথে। সে ওকে করবে, আর তাতে কাজ না হলে আমি খোদ ওয়াশিংটনে বড়কর্তাকে ফোন দেবো।… ইউএন-এর ব্যাপার।’

স্যাক্স জানে ব্যুরোর অটোমেটেড ফিঙ্গারপ্রিন্ট আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম সারা দেশের পুলিশ ব্যবহার করে। সেটাই এখন থামিয়ে দিচ্ছে ডেলরে।

কম্পিউটারের সামনে থাকা এজেন্ট বলল, ‘স্ক্যান হয়ে গেছে। ট্রান্সমিট করছি।’

‘কতক্ষণ লাগবে?’

‘দশ-পনেরো মিনিট।’

ধুলোমাখা আঙুলগুলো একসাথে চাপল ডেলরে। ‘প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ।’

স্যাক্সের চারপাশে যেন ঘূর্ণিঝড় শুরু হলো। অস্ত্রের কথা, হেলিকপ্টার, গাড়ি, অ্যান্টি-টেরর নেগোশিয়েটরদের কথা শুনতে পেল স্যাক্স। ফোন কল, কিবোর্ডের খটখট, ম্যাপ খোলার শব্দ, পিস্তল চেক করা। ফোনে কথা বলছে পারকিন্স, হোস্টেজ-রেসকিউয়ের লোকজনের সাথে, কিংবা ডিরেক্টর বা মেয়রের সাথে। হয়তো প্রেসিডেন্টের সাথে। কে জানে?

ডেলরেকে বলল স্যাক্স, ‘জানতাম না ছাপটা এত বড় ব্যাপার।’

‘সব সময়ই বড় ব্যাপার। অন্তত এফিস আসার পর তো বটেই। আগে তো ছাপ নেওয়া হতো শুধু দেখানোর জন্য। ভিকটিম আর প্রেসকে বোঝানো যে কিছু একটা করা হচ্ছে।’

‘ইয়ার্কি করছেন।’

‘না, একদম না। নিউ ইয়র্ক সিটির কথাই ধরো। কোল্ড সার্চ—মানে যখন কোনো সাসপেক্ট নেই—ম্যানুয়ালি করলে সব প্রিন্ট কার্ড ঘাঁটতে টেকনিশিয়ানের পঞ্চাশ বছর লেগে যাবে। মশকরা নয়। আর অটোমেটেড সার্চ? পনেরো মিনিট। আগে সাসপেক্ট আইডেন্টিফাই করা যেত বড়জোর দুই-তিন পার্সেন্ট। এখন বিশ-বাইশ পার্সেন্টের কাছাকাছি। প্রিন্ট মানেই সোনা। রাইমকে বলোনি?’

‘সে জানত, অবশ্যই।’

‘তাও সে সবাইকে কাজে লাগায়নি? বাপরে বাপ, লোকটার মরচে ধরে গেছে।’

‘এই যে অফিসার,’ ফোনের মাউথপিসে হাত চাপা দিয়ে ডাকল এসএসি পারকিন্স, ‘চেইন-অব-কাস্টডি কার্ডগুলো এবার পূরণ করে ফেলুন। ফিজিক্যাল এভিডেন্সগুলো পিইআরটি (PERT)-এর কাছে পাঠাতে চাই।’

ফিজিক্যাল এভিডেন্স রেসপন্স টিম। মনে পড়ল স্যাক্সের, এই টিমটা গড়তে সাহায্য করার জন্যই ফেডরা লিংকন রাইমকে ভাড়া করেছিল।

‘করছি। নিশ্চয়ই।’

‘ম্যালরি, কেম্পল, ঐ ফিজিক্যাল এভিডেন্সগুলো অফিসে নিয়ে যাও আর আমাদের মেহমানকে কিছু সিওসি কার্ড দাও। কলম আছে, অফিসার?’

‘হ্যাঁ, আছে।’

ছোট একটা অফিসে লোক দুটোর পিছু নিল সে, নার্ভাস হয়ে বলপয়েন্ট কলমটা টিপছে। ওরা খুঁজে এক প্যাকেট ফেডারেল-ইস্যু চেইন-অব-কাস্টডি কার্ড এনে দিল। বসে প্যাকেটটা খুলল সে।

পেছনে কেতাদুরস্ত ডেলরের গলা, এই রূপটাই যেন বেরিয়ে আসার জন্য ছটফট করে সব সময়ে। গাড়িতে আসার সময় কেউ একজন তাকে বহুরূপী বলেছিল, এখন বুঝতে পারছে কেন।

‘পারকিন্সকে আমরা ডাকি বিগ ডিক্ট। ডিক না কিন্তু। ডিক্ট মানে ডিকশনারি। তবে ওকে নিয়ে ভেবো না। এজেন্ট স্যান্ডউইচের চেয়েও বেশি বুদ্ধি ওর পেটে। আর সবচেয়ে বড় কথা, ও ডি.সি. পর্যন্ত কলকাঠি নেড়েছে। এ ধরনের কেসে সেখানে নাড়তেই হয়।’

নাকের নিচে সিগারেট-টা ঘষল ডেলরে, যেন ওটা দামি সিগার। ‘জানো, অফিসার, তুমি যা করছ তা শেয়ালের মতো ধূর্ত কাজ।’

‘কোনটা?’

‘মেজর ক্রাইমস থেকে বেরিয়ে যাওয়া। ওটা তোমার জন্য নয়।’

রোগা, কালো, তেলতেলে মুখটাকে এই প্রথম আন্তরিক মনে হলো। ‘পাবলিক অ্যাফেয়ার্সে যাওয়াটাই তোমার জীবনের সেরা কাজ। ওখানে কিছু ভালো কাজ করতে পারবে। ওটা তোমাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেবে না। এটাই হয়, বাজি ধরতে পারো। এই কাজ তোমাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেবে।’

জেমস স্নাইডারের পাগলামির অন্যতম শেষ শিকার, ওর্তেগা নামের এক যুবক, মেক্সিকো সিটি থেকে ম্যানহাটনে এসেছিল; সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা (বহুল আলোচিত জনবাদী অভ্যুত্থান, যা আগের বছর শুরু হয়েছিল) বাণিজ্যের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল। উচ্চাভিলাষী এই উদ্যোক্তা শহরে আসার এক সপ্তাহ পার হতে না হতেই নিখোঁজ হয়ে যায়। জানা যায়, শেষবার তাকে ওয়েস্ট সাইডের এক সরাইখানার সামনে দেখা গিয়েছিল এবং কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে সন্দেহ করে যে সে স্নাইডারের আরেক শিকার। দুঃখজনকভাবে, সেটাই সত্য প্রমাণিত হয়।

এনওয়াইইউ, ওয়াশিংটন স্কয়ারের আশেপাশে পনেরো মিনিট ধরে রাস্তায় চক্কর দিল বোন কালেক্টর। প্রচুর মানুষ আড্ডা দিচ্ছে। তবে বেশিরভাগই বাচ্চা-কাচ্চা। সামার স্কুলের ছাত্র। স্কেটবোর্ডার। উৎসবমুখর, অদ্ভুত। গায়ক, জাদুকর, অ্যাক্রোব্যাট। বাউয়ারির ‘মিউজিয়াম’-গুলোর কথা মনে করিয়ে দিল তাকে, ১৮০০ সালের দিকে জনপ্রিয় ছিল ওগুলো। ওগুলো মোটেও মিউজিয়াম ছিল না, ছিল তোরণ, বার্লেস্ক শো, বিকলাঙ্গ আর দুঃসাহসী দড়বাজিকরদের প্রদর্শনী, সাথে ফ্রেঞ্চ পোস্টকার্ড থেকে শুরু করে যীশুর ক্রুশের টুকরো—সবকিছুর পসরা সাজিয়ে বসা হকারদের ভিড়।

এক-দুবার গতি কমাল সে, কিন্তু কেউ ক্যাব চাইল না। হয়তো ভাড়ার সামর্থ্য নেই। দক্ষিণে মোড় নিল সে।

সেনর ওর্তেগার পায়ে ইট বেঁধে পিয়ারের নিচে হাডসন নদীতে গড়িয়ে ফেলে দিয়েছিল স্নাইডার, যাতে নোংরা পানি আর মাছে খেয়ে হাড়ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট না রাখে। নিখোঁজ হওয়ার দুই সপ্তাহ পর লাশ পাওয়া গিয়েছিল। তাই হতভাগ্য ভিকটিমকে যখন পানিতে ফেলা হয়েছিল, তখন সে জীবিত ছিল কি না বা জ্ঞান ছিল কি না তা জানা যায়নি। তবে সন্দেহ করা হয় যে তেমনই ঘটেছিল। কারণ স্নাইডার নিষ্ঠুরভাবে দড়িটা ছোট করে রেখেছিল যাতে সেনর ওর্তেগার মুখ পানির তলের কয়েক ইঞ্চি নিচে থাকে। বাতাসের জন্য তার হাত পাগলের মতো ছটফট করেছিল নিশ্চয়ই।

ফুটপাতের পাশে দাঁড়ানো এক রুগ্ন যুবককে দেখল বোন কালেক্টর। এইডস, ভাবল সে। কিন্তু তোমার হাড়গুলো সুস্থ… এবং বেশ প্রকট। তোমার হাড় চিরকাল টিকবে। লোকটা ক্যাব চাইল না। পাশ কাটিয়ে গেল ট্যাক্সিটাকে। রিয়ারভিউ মিররে তার জীর্ণ শরীরের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বোন কালেক্টর।

রাস্থার দিকে তাকাতেই দেখল ফুটপাত থেকে নেমে এসেছে এক বয়স্ক লোক, ক্যাব থামানোর জন্য জীর্ণ হাত তুলেছে। লাফিয়ে পিছিয়ে গেল লোকটা, যতটা পারে আর কি, আর ঠিক তার পাশেই ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে থামল ক্যাবটা।

পেছনের দরজা খুলে ভেতরে ঝুঁকল লোকটা। ‘সামনে দেখে চালানো উচিত,’ উপদেশের সুরে বলল সে। রাগের সুরে নয়।

‘সরি,’ অনুতপ্ত হওয়ার ভান করে বিড়বিড় করল বোন কালেক্টর।

একটু ইতস্তত করল বয়স্ক লোকটা, রাস্তার দিকে তাকাল, কিন্তু আর কোনো ট্যাক্সি দেখল না। উঠে বসল সে। দড়াম করে বন্ধ হলো দরজা।

বুড়ো আর রোগা, ভাবল সে। হাড়ের উপর চামড়াটা সিল্কের মতো লেগে থাকবে। ‘তো কোথায় যাবেন?’ ডাকল সে।

‘ইস্ট সাইড।’

‘হয়ে যাবে,’ স্কি মাস্কটা পরতে পরতে বলল সে এবং চাকাটা সজোরে ডান দিকে ঘোরাল। পশ্চিমে ছুটল ক্যাবটা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *