অধ্যায় পাঁচ
‘পরিস্থিতি হলো, একজন অপহৃতকে বাঁচাতে হবে, সময়সীমা আজ বিকেল তিনটা পর্যন্ত,’ ঘোষণা করল লিংকন রাইম।
‘কোনো মুক্তিপণও চায়নি ব্যাটা,’ যোগ করল সেলিট্টো, তারপর একপাশে সরে গিয়ে রিসিভ করল বেজে ওঠা ফোনটা।
‘জেরি,’ ব্যাংকসকে বলল রাইম, ‘আজ সকালের সিন সম্পর্কে সংক্ষেপে বলো ওদের।’
লিংকন রাইমের অন্ধকার ঘরটায় আজ যেন একটু বেশিই ভিড়ভাট্টা। দুর্ঘটনার পর বন্ধুরা মাঝেসাঝে না বলেকয়ে চলে আসত (রাইমকে যে বাড়িতে পাওয়া যাবে সে ব্যাপারে বাজি ধরা যেত নিশ্চিন্তে)। কিন্তু সেসব কখনোই পছন্দ করেনি সে। ফোন রিসিভ করাও বন্ধ করে দিয়েছিল একসময়, ক্রমশ গুটিয়ে নিয়েছিল নিজেকে, ডুব দিয়েছিল নিঃসঙ্গতায়।
বই লিখে সময় কাটাত রাইম, আর যখন লেখার মুড থাকত না, তখন পড়ত। আর সেটাও যখন একঘেয়ে লাগত, তখন ভাড়ায় আনা সিনেমা, পে-পার-ভিউ চ্যানেল আর মিউজিক তো ছিলই। তারপর একসময় টিভি আর স্টেরিও থেকেও মন উঠে গেল তার, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেবল তাকিয়ে থাকত উল্টো দিকের দেয়ালে সযত্নে সাঁটানো আর্ট প্রিন্টগুলোর দিকে।
অবশেষে ওগুলোও নামিয়ে ফেলা হয়েছে।
নিঁসঙ্গতা।
ওটাই একমাত্র কাম্য ছিল তার, আর এখন ওটাকেই ভীষণ মিস করছে সে।
পায়চারি করছে জিম পোলিং, খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে তাকে। কেস অফিসার লন সেলিট্টো হলেও এই ধরনের ঘটনায় একজন ক্যাপ্টেনকে টিমে দরকার হয়, তাই নিজে থেকেই এই কাজের দায়িত্ব নিয়েছে পোলিং। কেসটা একটা টাইম বোমার মতো, বিস্ফোরিত হলে চোখের পলকে ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যাবে, তাই চিফ আর ডেপুটি কমিশনাররা খুশিই হয়েছে পোলিংকে সামনে এগিয়ে দিয়ে নিজেরা আড়ালে থাকতে পেরে। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার শিল্পটা ভালোই রপ্ত করেছে তারা; বেটা-ক্যামেরার সামনে প্রেস কনফারেন্সে ‘অর্পিত দায়িত্ব’, ‘পরামর্শ গ্রহণ’-এই জাতীয় শব্দ ব্যবহার করে হাত ধুয়ে ফেলবে, আর কঠিন কোনো প্রশ্ন ধেয়ে এলে চট করে তাকিয়ে পোলিংয়ের দিকে ঠেলে দেবে।
রাইম ভেবে পায় না দুনিয়ার কোন পুলিশ স্বেচ্ছায় এমন একটা কেসের ঘানি নিজের কাঁধে নিতে চায়।
বিস্তৃতকিমাকার চরিত্র এই পোলিং। শহরের অন্যতম সফল এবং কুখ্যাত হোমিসাইড ডিটেকটিভ হিসেবে মিডটাউন নর্থ প্রিসিংক্টে নিজের জায়গা করে নিয়েছে বেঁটেখাটো লোকটা। মেজাজটা তিরিক্ষি, একবার এক নিরস্ত্র সন্দেহভাজনকে মেরে ফেলায় ভয়ানক বিপদে পড়েছিল সে। কিন্তু শেফার্ড কেসে (সেই পুলিশ খুনি সিরিয়াল কিলার, যার কারণে রাইমের এই দশা) শাস্তি নিশ্চিত করে নিজের ডুবতে বসা ক্যারিয়ারটা অবিশ্বাস্যভাবে বাঁচিয়ে নিয়েছিল সে।
সেই বহুল আলোচিত ঘটনার পর প্রমোশন পেয়ে ক্যাপ্টেন হয়েছে পোলিং, আর তারপরই মধ্যবয়সের সেই স্বভাবসুলভ পরিবর্তন এসেছে তার মধ্যে। জিনস আর সস্তা স্যুটের বদলে এখন সে পরে ব্রুকস ব্রাদার্সের পোশাক (আজ তার পরনে নেভি-ব্লু ক্যালভিন ক্লাইন ক্যাজুয়াল)। ওয়ান পুলিশ প্লাজার উপরতলার আলিশান কর্নার অফিস এখন নিয়মিত গন্তব্য তার।
কাছাকাছি একটা টেবিলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন অফিসার। ছোট করে ছাঁটা চুল, ছিপছিপে বো হাউম্যান, ইমার্জেন্সি সার্ভিসেস ইউনিটের ক্যাপ্টেন সে। এনওয়াইপিডি-র সোয়াট টিম।
সেলিট্টো ফোন রেখে ভাঁজ করতেই নিজের বক্তব্য শেষ করল ব্যাংকস। ‘হার্ডি বয়েজ।’
‘ক্যাবটার ব্যাপারে আর কিছু জানা গেল?’ জানতে চাইল পোলিং।
‘কিচ্ছু না। এখনো অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ছে ওরা।’
‘মেয়েটার কোনো ঝামেলা ছিল কি না জানা গেছে? মানে অবৈধ কোনো সম্পর্ক?’ জিজ্ঞেস করল পোলিং। ‘সাইকো বয়ফ্রেন্ড-টয়ফ্রেন্ড?’
‘উঁহু, বয়ফ্রেন্ড নেই। টুকটাক ডেটিং করত, এই আর কি। কোনো স্টকার বা অমন কিছু নেই বলেই মনে হয়।’
‘আর এখনো কোনো মুক্তিপণ চায়নি?’ জানতে চাইল রাইম।
‘না।’
দরজায় বেল বাজতেই খুলতে গেল টম।
সিঁড়ি দিয়ে ভেসে আসা গলার স্বর শুনে ওদিকে তাকাল রাইম। একটু পরেই ইউনিফর্ম-পরা এক পুলিশ অফিসারকে নিয়ে উপরে উঠে এল সহকারী। দূর থেকে দেখে খুব কমবয়সি মনে হলেও কাছে আসতেই রাইম বুঝল বয়স ত্রিশের কোঠায় হবে মেয়েটার। বেশ লম্বা। ফ্যাশন ম্যাগাজিনের পাতা থেকে উঠে আসা মডেলদের মতো, মুখ গোমড়া করে রাখলেও আকর্ষণীয় লাগে।
আমরা অন্যদের সেভাবেই দেখি যেভাবে নিজেদের দেখি-আর তাই দুর্ঘটনার পর থেকে লিংকন রাইম অন্যদের শরীর নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না। তবে মেয়েটার উচ্চতা, ছিপছিপে কোমর আর আগুনের মতো লাল চুল নজর এড়াল না তার। অন্য কেউ হলে হয়তো মেপেঝুপে রায় দিত, ‘কী দারুণ মাল রে বাবা!’ কিন্তু রাইমের মাথায় ওসব এল না। তার নজর কাড়ল মেয়েটার দৃষ্টি। মেয়েটার চোখে বিস্ময় নেই।
এমন একটা ভাব আগে কখনো দেখেনি সে। মনে হচ্ছে রাইমের এই অবস্থা দেখে কিছুটা স্বস্তিই পাচ্ছে মেয়েটা। বেশিরভাগ মানুষ ঠিক উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখায়। ঘরে ঢুকে অনেকটাই সহজ হয়ে এল সে।
‘অফিসার স্যাক্স?’ জিজ্ঞেস করল রাইম।
‘ইয়েস, স্যার,’ হাত বাড়াতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল সে। ‘ডিটেকটিভ রাইম।’স
পোলিং আর হাউম্যানের সাথে স্যাক্সের পরিচয় করিয়ে দিল সেলিট্টো। নাম না জানলেও শেষের দুজনের কুখ্যাতি সম্পর্কে নিশ্চয়ই জানে সে, তাই আবার সতর্ক হয়ে উঠল তার চোখদুটো। ঘরটা জরিপ করে নিল সে-ধুলোবালি, অন্ধকার ভাব। চোখ বোলাল আর্ট পোস্টারগুলোর একটায়। টেবিলের নিচে আধো-খোলা অবস্থায় পড়ে আছে ওটা। এডওয়ার্ড হপারের ‘নাইটহকস’। অনেক রাতে ডিনারে বসে থাকা কয়েকজন নিঃসঙ্গ মানুষ। ওটাই সবার শেষে নামানো হয়েছিল দেয়াল থেকে।
তিনটার সময়সীমার ব্যাপারটা সংক্ষেপে বুঝিয়ে বলল রাইম। শান্তভাবে মাথা নাড়ল স্যাক্স, কিন্তু রাইম দেখতে পেল তার চোখের তারায় ঝিলিক খেলছে কিছু একটা-ভয়? নাকি ঘৃণা?
জেরি ব্যাংকস, যার আঙুলে বিয়ের আংটি না থাকলেও ক্লাস রিং শোভা পাচ্ছে, মেয়েটার রূপে মুগ্ধ হয়ে বিশেষ এক হাসি উপহার দিল তাকে। কিন্তু জবাবে স্যাক্সের চাহনি বুঝিয়ে দিল, এখন কোনো প্রেম-পিরিতি চলবে না। এবং সম্ভবত কখনোই না।
‘হয়তো এটা কোনো ফাঁদ,’ বলল পোলিং। ‘ও আমাদের যেখানে নিয়ে যেতে চাইছে, সেখানে ঢুকলেই হয়তো বোম ফাটবে।’
‘মনে হয় না।’ কাঁধ ঝাঁকাল সেলিট্টো। ‘এত কষ্ট করতে যাবে কেন? পুলিশ মারতে চাইলে তো রাস্তায় যাকে পাবে, তাকেই গুলি করলে হয়।’
মুহূর্তের জন্য অস্বস্তিকর নীরবতা নামল ঘরে, সেলিট্টো আর রাইমের দিকে দ্রুত চোখ বোলাল পোলিং। সবার মনেই উঁকি দিয়ে গেল সেই শেফার্ড কেসের কথা, যেখানে জখম হয়েছিল রাইম।
কিন্তু এসব নিয়ে বিন্দুমাত্রও মাথাব্যথা নেই লিংকন রাইমের। সে বলল, ‘লনের সাথে আমি একমত। তবে সার্চ অ্যান্ড সার্ভেইল্যান্স টিমকে বলে দেবো চোরাগোপ্তা হামলার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে। আমাদের এই খোকা নিজের নিয়ম নিজেই তৈরি করছে বলে মনে হচ্ছে।’
আবারো হপারের পোস্টারটার দিকে তাকাল স্যাক্স। তার দৃষ্টি অনুসরণ করল রাইম। ডিনারের ঐ মানুষগুলো হয়তো আদতে নিঃসঙ্গ ছিল না, ভাবল সে। বরং এখন মনে হচ্ছে বেশ সন্তুষ্টই দেখাচ্ছে ওদের।
‘আমাদের হাতে দুধরনের ফিজিক্যাল এভিডেন্স আছে,’ বলে চলল রাইম। ‘স্ট্যান্ডার্ড মানের। মানে যা আনসাব ইচ্ছা করে ফেলে যায়নি। চুল, সুতো, আঙুলের ছাপ, হয়তো রক্ত বা জুতোর ছাপ। যদি যথেষ্ট পরিমাণ পাওয়া যায়, আর যদি কপাল ভালো থাকে, তবে ওগুলো আমাদের প্রাইমারি ক্রাইম সিনে নিয়ে যাবে। যেখানে সে থাকে।’
‘অথবা তার গোপন আস্তানায়,’ মত দিল সেলিট্টো। ‘অস্থায়ী কোনো জায়গা।’
‘সেফ হাউজ?’ মাথা নেড়ে বিড়বিড় করল রাইম। ‘বাজি ধরে বলতে পারি তোমার কথা ঠিক। কাজ চালানোর জন্য কোনো একটা জায়গা তো তার লাগবেই। তারপর আছে সাজানো কু বা এভিডেন্স। কাগজের টুকরোগুলো-যা আমাদের সময় আর তারিখ জানাচ্ছে। তা ছাড়াও আছে একটা বল্টু, অ্যাসবেস্টসের দলা আর বালি।’
‘বালছাল সব ধাঁধা,’ গজগজ করে বলল হাউম্যান, ছোট করে ছাঁটা চুলে হাত বুলাল সে। ড্রিল সার্জেন্ট হিসেবে তাকে যেমন দেখাত, এখনো ঠিক তেমনই দেখাচ্ছে।
‘তার মানে আমি উপরমহলকে জানাতে পারি যে ভিকটিমকে সময়মতো খুঁজে পাওয়ার একটা সুযোগ আছে?’ জানতে চাইল পোলিং।
‘আমার তো তাই মনে হয়, হ্যাঁ।’
ফোন করল ক্যাপ্টেন, কথা বলতে বলতে এগিয়ে গেল ঘরের এক কোণে। লাইন কেটে দিয়ে ঘোঁৎ করে শব্দ করল সে, ‘মেয়র। চিফও আছে সাথে। এক ঘণ্টা পর প্রেস কনফারেন্স হবে, আমাকে থাকতে হবে সেখানে, যাতে ওরা উল্টোপাল্টা কিছু বলে না বসে। বড়কর্তাদের আর কিছু বলার আছে?’
রাইমের দিকে তাকাল সেলিট্টো। মাথা নাড়ল রাইম।
‘এখনো না,’ বলল ডিটেকটিভ।
সেলিট্টোকে নিজের সেলফোন নম্বর দিয়ে বেরিয়ে গেল পোলিং, আক্ষরিক অর্থেই দৌড় দিল দরজার দিকে।
একটু পরেই সিঁড়ি ভেঙে উঠে এল ত্রিশোর্ধ্ব এক রোগা, টাকপড়া লোক। মেল কুপার, দেখতে বরাবরের মতোই হাস্যকর, সিটকমের বোকাসোকা প্রতিবেশী চরিত্রের মতো। তার পেছনে বিশাল এক স্টিমার ট্রাংক আর দুটো স্যুটকেস নিয়ে ঢুকল দুজন অল্পবয়সি পুলিশ, দেখে মনে হচ্ছে হাজার পাউন্ড ওজন ওগুলোর। মালপত্র নামিয়ে রেখে চলে গেল অফিসাররা।
‘মেল।’
‘ডিটেকটিভ।’
রাইমের কাছে এগিয়ে এসে তার অকেজো ডান হাতটা ধরল কুপার। খেয়াল করল রাইম, আজকের দিনে এই প্রথম কোনো মেহমান তাকে স্পর্শ করল। কুপারের সাথে বহু বছর কাজ করেছে সে। অর্গানিক কেমিস্ট্রি, অঙ্ক আর ফিজিক্সে ডিগ্রি আছে লোকটার, আইডেন্টিফিকেশন-ফ্রিকশন রিজ প্রিন্ট, ডিএনএ এবং ফরেনসিক রিকনস্ট্রাকশন আর ফিজিক্যাল এভিডেন্স অ্যানালাইসিস-দুটিতেই ওস্তাদ সে।
‘কেমন আছ, দুনিয়ার সেরা ক্রিমিনালিস্ট?’ জানতে চাইল কুপার।
মৃদু হাসল রাইম। খেতাবটা বছর কয়েক আগে তাকে দিয়েছিল প্রেস, যখন খবর রটেছিল যে এফবিআই তাদের পিইআরটি বা ফিজিক্যাল এভিডেন্স রেসপন্স টিম গঠনের জন্য এই সিটি কপকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। ‘ফরেনসিক সায়েন্টিস্ট’ বা ‘ফরেনসিক স্পেশালিস্ট’ বলে মন ভরেনি তাদের, তাই সাংবাদিকরা রাইমকে বানিয়ে দিয়েছিল ‘ক্রিমিনালিস্ট’। শব্দটা অবশ্য বহু বছর আগে থেকেই চালু ছিল, আমেরিকায় সর্বপ্রথম পল লেল্যান্ড কার্কের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছিল, যিনি ইউসি বার্কলি স্কুল অফ ক্রিমিনোলজি চালাতেন। ইদানীং উপাধিটা বেশ ফ্যাশনেবল হয়ে দাঁড়িয়েছে, ককটেল পার্টিতে টেকনিশিয়ানরা সুন্দরী মেয়েদের পাশে গিয়ে নিজেদের ফরেনসিক সায়েন্টিস্ট না বলে ক্রিমিনালিস্ট হিসেবে পরিচয় দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
‘সবার দুঃস্বপ্ন,’ কুপার বলল, ‘ট্যাক্সিতে উঠলেন আর দেখলেন ড্রাইভারের সিটে বসে আছে এক সাইকো। আর ঐ কনফারেন্সের কারণে পুরো দুনিয়া তাকিয়ে আছে এই নিউ ইয়র্কের দিকে। ভাবছিলাম এই কেসের জন্য আপনাকে অবসর ভেঙে ফিরিয়ে আনা হয় কি না।’
‘তোমার মা কেমন আছেন?’ জানতে চাইল রাইম।
‘এখনো ব্যথা-বেদনা নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করেন। তবে আমার চেয়ে শরীর-স্বাস্থ্য ভালোই।’
কুইন্সের যে বাংলোয় জন্ম কুপারের, সেখানেই বয়স্ক মায়ের সাথে থাকে সে। বলরুম ড্যান্সিং তার নেশা-ট্যাঙ্গোতে বিশেষ পারদর্শী। পুলিশের গুঞ্জন যেমন হয় আর কি, আইআরডি-তে অনেকেই লোকটার যৌন পছন্দ নিয়ে কানাঘুষা করত। কর্মচারীদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কোনো আগ্রহ ছিল না রাইমের, তবে কলম্বিয়াতে উচ্চতর গণিত পড়ানো এক ডাকসাইটে সুন্দরী স্ক্যান্ডিনেভিয়ান গ্রেটাকে কুপারের প্রেমিকা হিসেবে দেখে সবার মতোই সে-ও অবাক হয়েছিল।
ভেলভেটে মোড়ানো ট্রাংকটা খুলল কুপার। তিনটা বড় মাইক্রোস্কোপের পার্টস বের করে ফিট করতে শুরু করল।
‘ওহ, হাউজ কারেন্ট।’ আউটলেটগুলোর দিকে তাকিয়ে হতাশ হলো সে। নাকের উপর ঠেলে দিল ধাতব ফ্রেমের চশমাটা।
‘কারণ এটা একটা হাউজ বা বাসা, মেল,’ বলল রাইম। ‘আমি ভেবেছিলাম তুমি কোনো ল্যাবে থাকো। থাকতে দেখলে অবাক হতাম না।’
ধূসর আর কালো রঙের জরাজীর্ণ যন্ত্রগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল রাইম। পনেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে এগুলোর সাথেই ঘর করেছে সে। একটা স্ট্যান্ডার্ড কম্পাউন্ড মাইক্রোস্কোপ, একটা ফেইজ-কন্ট্রাস্ট স্কোপ আর একটা পোলারাইজড-লাইট মডেল।
স্যুটকেসগুলো খুলল কুপার, ভেতরে জাদুকরের ঝোলার মতো হরেক কিসিমের বোতল, বয়াম আর বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি। মুহূর্তের মধ্যে শব্দগুলো ফিরে এল রাইমের মাথায়, একসময় যা ছিল তার নিত্যদিনের বুলি। ইডিটিএ ভ্যাকুয়াম ব্লাড-কালেকশন টিউব, অ্যাসিটিক অ্যাসিড, অর্থোটলিডিন, লুমিনল রিএজেন্ট, ম্যাগনা-ব্রাশ, রুহম্যানস পার্পল ফেনোমেনন…
চারপাশে চোখ বোলাল রোগা লোকটা। ‘দেখতে তো তোমার পুরোনো অফিসের মতোই লাগছে, লিংকন। কোনো কিছু খুঁজে পাও কী করে? আমার একটু জায়গা দরকার…’
‘টম।’
সবচেয়ে কম জঞ্জালপূর্ণ টেবিলটার দিকে মাথা নাড়ল রাইম। ম্যাগাজিন, কাগজ আর বইপত্র সরিয়ে ফেলল তারা, বেরিয়ে পড়ল টেবিলের উপরিভাগ যা গত এক বছরে চোখে দেখেনি রাইম।
ক্রাইম সিন রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে রইল সেলিট্টো। ‘আনসাবকে কী নামে ডাকব আমরা? এখনো তো কোনো কেস নম্বর পড়েনি।’
ব্যাংকসের দিকে তাকাল রাইম। ‘একটা নম্বর বেছে নাও। যেকোনো একটা।’
‘পৃষ্ঠা নম্বরটা হলে কেমন হয়?’ প্রস্তাব দিল ব্যাংকস। ‘মানে, ঐ তারিখটা।’
‘আনসাব ৮২৩। মন্দ নয়।’
রিপোর্টের উপর ওটাই টুকে নিল সেলিট্টো।
‘উম, মাফ করবেন? ডিটেকটিভ রাইম?’
সেই পেট্রোলওম্যান কথা বলছে। তার দিকে ফিরল রাইম।
‘দুপুর বারোটায় আমার বিগ বিল্ডিংয়ে থাকার কথা ছিল।’ ওয়ান পুলিশ প্লাজাকে পুলিশি ভাষায় ওটাই বলা হয়।
‘অফিসার স্যাক্স…’ মেয়েটার কথা ভুলেই গিয়েছিল সে। ‘আজ সকালে ফার্স্ট অফিসার কি তুমি ছিলে? রেললাইনের ধারের ঐ খুনের ঘটনায়।’
‘হ্যাঁ, আমিই কল নিয়েছিলাম,’ কথাগুলো সে বলল টমের উদ্দেশে।
‘আমি এখানে, অফিসার,’ কড়া গলায় মনে করিয়ে দিল রাইম, মেজাজটা কোনোমতে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। ‘এদিকে।’
সুস্থ-সবল মানুষের মাধ্যমে কেউ তার সাথে কথা বলতে চাইলে মেজাজ খারাপ হয়ে যায় তার।
ঝট করে ঘুরল মেয়েটার মাথা, রাইম বুঝতে পারল শিক্ষাটা কাজে লেগেছে।
‘ইয়েস, স্যার,’ তার গলায় নরম সুর, কিন্তু চোখের চাহনি বরফশীতল। ‘আমি এখন আর চাকরিতে নেই। আমাকে লিংকন বলে ডাকলেই চলবে। তুমি করে বলবে।’
‘ঝামেলাটা কি চুকিয়ে ফেলা যায়, প্লিজ?’
‘কীসের ঝামেলা?’ জানতে চাইল সে।
‘আমাকে এখানে ডেকে আনার কারণটা। আমি দুঃখিত। আমার মাথায় ছিল না। চাইলে আমি লিখিত ক্ষমা চাইব। আসলে আমার নতুন অ্যাসাইনমেন্টে দেরি হয়ে যাচ্ছে, আর আমি এখনো আমার কমান্ডারকে ফোন করতে পারিনি।’
‘ক্ষমা?’ জিজ্ঞেস করল রাইম।
‘ব্যাপারটা হলো, আমার ক্রাইম সিনের কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল না। আসলে আন্দাজে ঢিল ছুঁড়েছিলাম।’
‘কীসের কথা বলছ তুমি?’
‘ট্রেন থামানো আর ইলেভেনথ অ্যাভিনিউ বন্ধ করার কথা বলছি। আমার ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই সিনেটর নিউ জার্সিতে তার বক্তৃতা মিস করেছেন আর জাতিসংঘের কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা নিউআর্ক এয়ারপোর্ট থেকে সময়মতো মিটিংয়ে পৌঁছাতে পারেননি।’
মৃদু হাসল রাইম। ‘তুমি কি জানো আমি কে?’
‘তোমার কথা শুনেছি অবশ্যই। আমি ভেবেছিলাম তুমি…’
‘মরে গেছি?’ জানতে চাইল রাইম।
‘না। আমি ওটা বোঝাতে চাইনি।’ যদিও ওটাই ভেবেছিল সে। তাড়াতাড়ি বলে চলল সে, ‘অ্যাকাডেমিতে আমরা সবাই তোমার বই পড়েছি। কিন্তু তোমার সম্পর্কে খুব একটা শোনা যায় না। ব্যক্তিগতভাবে আর কি…’ দেয়ালের দিকে তাকিয়ে কাঠখোট্টা গলায় বলল সে, ‘ফার্স্ট অফিসার হিসেবে আমার মনে হয়েছিল ক্রাইম সিন রক্ষা করার জন্য ট্রেন থামানো আর রাস্তা বন্ধ করাটাই সেরা কাজ হবে। আর আমি সেটাই করেছি। স্যার।’
‘আমাকে লিংকন বলে ডেকো। আর তুমি…’
‘আমি…’
‘তোমার নাম?’
‘অ্যামেলিয়া।’
‘অ্যামেলিয়া। ঐ বৈমানিক মহিলার নামে?’
‘না, স্যার। পারিবারিক নাম।’
‘অ্যামেলিয়া, আমি কোনো ক্ষমা-টমা চাই না। ওখানে তুমিই ঠিক ছিলে। ভুল ছিল ভিন্স পেরেত্তি।’
এই অবিবেচকের মতো মন্তব্যে নড়েচড়ে বসল সেলিট্টো, কিন্তু লিংকন রাইম তোয়াক্কা করল না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ঘরে ঢুকলেও যে গুটিকয়েক মানুষ নিজের পাছার উপর বহাল তবিয়তে বসে থাকতে পারে, সে তাদেরই একজন।
আবার মুখ খুলন লিংকন। ‘পেরেত্তি সিনটা এমনভাবে প্রসেস করেছে যেন মেয়র তার ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলছে, আর ওটাই হলো কাজটা পণ্ড করার এক নম্বর রাস্তা। অতিরিক্ত লোক ছিল তার সাথে, ট্রেন আর গাড়ি চলাচল করতে দিয়ে মস্ত বড় ভুল করেছে সে। এত তাড়াতাড়ি সিনটা পুলিশের জিম্মা থেকে ছেড়ে দেওয়াও উচিত হয়নি তার। আমরা যদি রেললাইনটা আটকে রাখতাম, কে জানে, হয়তো নাম লেখা কোনো ক্রেডিট কার্ডের রসিদ পেয়ে যেতাম। কিংবা কোনো বড়সড়ো সুন্দর আঙুলের ছাপ।’
‘হতেও পারে,’ সাবধানে বলল সেলিট্টো। ‘তবে কথাটা আমাদের মধ্যেই থাকুক।’ চোখ দিয়ে ইশারা করে সে স্যাক্স, কুপার আর ছোকরা জেরি ব্যাংকসকে চুপ থাকার নির্দেশ দিল।
অবজ্ঞার হাসি হাসল রাইম।
তারপর ফিরল স্যাক্সের দিকে। সকালেই ব্যাংকস যেমন করেছিল, সেভাবেই মেয়েটা এখন তার অ্যাপ্রিকট রঙের কম্বলের নিচে ঢাকা পা আর শরীরটার দিকে তাকিয়ে আছে।
রাইম তাকে বলল, ‘পরের ক্রাইম সিনটা প্রসেস করার জন্য তোমাকে এখানে ডেকেছি আমি।’
‘কী?’
এবার আর দোভাষীর দরকার হলো না।
‘আমাদের হয়ে কাজ করবে তুমি,’ ছোট্ট করে বলল সে। ‘পরের ক্রাইম সিনটায়।’
‘কিন্তু,’ হেসে ফেলল মেয়েটা, ‘আমি আইআরডি-র লোক নই। পেট্রোলে কাজ করি। কখনো ক্রাইম সিনের কাজ করিনি।’
‘এটা একটা অদ্ভুত কেস। ডিটেকটিভ সেলিট্টোই তোমাকে বলবে। সত্যিই খুব আজব। তাই না, লন? সত্যি বলতে, এটা যদি কোনো সাধারণ ক্রাইম সিন হতো, তবে তোমাকে আমি চাইতাম না। কিন্তু এই কেসটার জন্য অভিনব কাউকে দরকার।’ সেলিট্টোর দিকে তাকাল সে, কিন্তু ডিটেকটিভ কোনো কথা বলল না।
‘আসলে… আমি পারব না ওসব। আমি নিশ্চিত।’
‘ঠিক আছে,’ ধৈর্য ধরে বলল রাইম। ‘সত্যি কথাটা বলব?’
মাথা নাড়ল সে।
‘আমার এমন কাউকে দরকার যার একটা ক্রাইম সিন রক্ষা করার জন্য চলন্ত ট্রেন থামানোর মতো কলিজা আছে এবং পরে উপরমহলের ঝাড়ি খাওয়ার মতো মানসিকতা আছে।’
‘সুযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ, স্যার। লিংকন। কিন্তু…’
ছোট্ট করে রাইম বলল, ‘লন।’
‘অফিসার,’ স্যাক্সের দিকে তাকিয়ে ঘোঁৎ করে উঠল ডিটেকটিভ, ‘তোমাকে কোনো অপশন দেওয়া হচ্ছে না। ক্রাইম সিনে সাহায্য করার জন্য এই কেসে তোমাকে অ্যাসাইন করা হয়েছে।’
‘স্যার, প্রতিবাদ করতে বাধ্য হচ্ছি। আমি পেট্রোল থেকে ট্রান্সফার হয়ে যাচ্ছি। আজই। আমার মেডিক্যাল ট্রান্সফার হয়েছে। এক ঘণ্টা আগেই কার্যকর হয়েছে সেটা।’
‘মেডিক্যাল?’ জানতে চাইল রাইম।
ইতস্তত করল সে, অনিচ্ছাসত্ত্বেও আবার তাকাল রাইমের পায়ের দিকে। ‘আমার আর্থ্রাইটিস আছে।’
‘তাই নাকি?’ জিজ্ঞেস করল রাইম।
‘ক্রনিক আর্থ্রাইটিস।’
‘শুনে খারাপ লাগল।’
মেয়েটা তাড়াতাড়ি বলল, ‘একজন অসুস্থ ছিল বলে ডিউটিতে আসেনি। তাই আজ সকালে কলটা নিয়েছিলাম। আমার প্ল্যান ছিল না।’
‘হ্যাঁ, সেরকম তো আমারও অন্য প্ল্যান ছিল,’ লিংকন রাইম বলল। ‘এবার আসো, কিছু এভিডেন্সে চোখ বোলানো যাক।’
