অধ্যায় চব্বিশ
রাইম জ্ঞান হারানোর পর সবার আগে ফোনের কাছে পৌঁছাল সেলিট্টো।
‘ইএমএসের জন্য ৯১১-এ ফোন দিন,’ নির্দেশ দিল টম। ‘তারপর স্পিড ডায়ালের ঐ নম্বরটা টিপুন। ওটা পিট টেলর, আমাদের স্পাইনাল কর্ড স্পেশালিস্ট।’ ফোন করায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল সেলিট্টো।
চিৎকার করছে টম, ‘সাহায্য লাগবে আমার! কেউ একজন আসুন!’ কাছেই ছিল স্যাক্স। মাথা নেড়ে এগিয়ে গেল সে রাইমের দিকে।
বগলের নিচে ধরে অজ্ঞান মানুষটাকে বিছানার উপরের দিকে টেনে তুলল টম। একটানে শার্টটা ছিঁড়ে ফেলে ফ্যাকাশে বুকে টোকা দিল সে, বলল, ‘বাকিরা যদি আমাদের একটু একা থাকতে দেন…’ সেলিট্টো, ব্যাংকস আর কুপার একটু ইতস্তত করে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। বেরিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল সেলিট্টো।
টমের হাতে একটা হালকা বাদামি বাক্স। উপরে সুইচ আর ডায়াল, আর সেটা থেকে একটা তার বেরিয়ে চ্যাপ্টা চাকতির মতো কিছু একটায় গিয়ে শেষ হয়েছে। ওটা রাইমের বুকের উপর টেপ দিয়ে আটকে দিল সে। ‘ফ্রেনিক নার্ভ স্টিমুলেটর। এটা শ্বাসপ্রশ্বাস চালু রাখবে।’ machineটা চালু করল সে।
রাইমের হাতির দাঁতের মতো সাদা বাহুতে ব্লাড-প্রেশার কাফ জড়াল টম। চমকে উঠে স্যাক্স খেয়াল করল, রাইমের শরীরে বলিরেখা নেই বললেই চলে। চল্লিশের কোঠায় বয়স হলেও শরীরটা পঁচিশ বছরের যুবকের মতো। ‘ওর মুখটা এমন লাল কেন? দেখে মনে হচ্ছে এখনই ফেটে যাবে।’
‘যাবেই তো,’ নির্বিকার গলায় বলল টম, বেডসাইড টেবিলের নিচ থেকে একটা ডাক্তারের কিট টেনে বের করল। কিটটা খুলে প্রেশার মাপতে লাগল সে। ‘ডিসরিফ্লেক্সিয়া… আজ সারা দিনের ধকল। মানসিক আর শারীরিক। ওসবে অভ্যস্ত নন তিনি।’
‘ও বারবার বলছিল ক্লান্ত লাগছে।’
‘জানি। আমিই ঠিকমতো খেয়াল করিনি। চুপ। শুনতে হবে আমাকে।’ কানে স্টেথোস্কোপ গুঁজে দিয়ে কাফটা ফোলাল সে, তারপর আস্তে আস্তে বাতাস বের করে দিল। তাকিয়ে আছে ঘড়ির দিকে। হাতদুটো পাথরের মতো স্থির। ‘শিট! ডায়াস্টোলিক একশো পঁচিশ। শিট!’
হায় খোদা! ভাবল স্যাক্স। স্ট্রোক করবে এখনই।
কালো ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল টম। ‘নিফেডিপিনের বোতলটা বের করুন। আর একটা সিরিঞ্জ খুলুন।’
স্যাক্স যখন খুঁজছে, তখন টম একটানে রাইমের পায়জামা নামিয়ে বিছানার পাশ থেকে একটা ক্যাথেটার নিল, ছিঁড়ে ফেলে দিল ওটার প্লাস্টিকের প্যাকেটও। মাথায় কে-ওয়াই জেলি মাখিয়ে রাইমের ফ্যাকাশে পুরুষাঙ্গ তুলে ধরল সে, সাবধানে কিন্তু দ্রুত আগায় ঢুকিয়ে দিল ক্যাথেটারটা। ‘এটাই সমস্যার একটা কারণ। মলমূত্রের চাপ অ্যাটাক শুরু করে দিতে পারে। যতটুকু উচিত তার চেয়ে অনেক বেশি পানি খেয়ে ফেলেছেন।’
ইনজেকশনের সিরিঞ্জ খুলল সে, কিন্তু বলল, ‘আমি তো ইনজেকশন দিতে জানি না।’
‘আমি দিচ্ছি।’ স্যাক্সের দিকে তাকাল সে। ‘একটা অনুরোধ করতে পারি… কাজটা একটু করবেন? আমি চাই না টিউবটা বেঁকে যাক।’
‘ওকে। ঠিক আছে।’
‘গ্লাভস লাগবে?’
এক জোড়া গ্লাভস পরে নিল সে, সাবধানে বাঁ হাতে ধরল রাইমের পুরুষাঙ্গ। টিউবটা ধরল ডান হাতে। অনেক, অনেক দিন হলো কোনো পুরুষকে এভাবে ধরেনি সে। চামড়াটা নরম, ভাবল সে। কী অদ্ভুত যে পুরুষের সত্তার এই কেন্দ্রবিন্দুটা বেশিরভাগ সময়ই রেশমের মতো নাজুক থাকে।
পটু হাতে ঔষধটা পুশ করল টম। ‘ফিরে আসুন, লিংকন…’
দূরে সাইরেন বেজে উঠল।
‘ওরা প্রায় এসে গেছে,’ জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল সে। ‘এখনই যদি জ্ঞান ফেরাতে না পারি, তবে ওরা আর কিছুই করতে পারবে না।’
‘ঔষধটা কাজ করতে কতক্ষণ লাগে?’
রাইমের অসাড় দেহের দিকে তাকিয়ে টম বলল, ‘এতক্ষণে কাজ করার কথা। কিন্তু ডোজ বেশি হয়ে গেলে আবার শকে চলে যাবেন।’ নিচু হয়ে চোখের পাতা তুলল সহকারী। নীল মণিটা ঘোলাটে, ফোকাস নেই। ‘লক্ষণ ভালো নয়।’ আবার প্রেশার মাপল সে। ‘একশো পঞ্চাশ। ক্রাইস্ট!’
‘মারা যাবে তো,’ বলল মেয়েটা।
‘ওহ। ওটা সমস্যা নয়।’
‘কী?’ ফিসফিস করে বলল স্তম্ভিত অ্যামেলিয়া স্যাক্স।
‘মরতে আপত্তি নেই ওনার।’ টম এমনভাবে তাকাল যেন স্যাক্স ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি দেখে অবাক হয়েছে সে। ‘উনি শুধু এখন যতটা পঙ্গু তার চেয়ে বেশি পঙ্গু হতে চান না।’ আরেকটা ইনজেকশন তৈরি করল সে। ‘তবে হয়তো এরমধ্যে হয়েই গেছেন। আর ওটাকেই ভয় পান তিনি।’
সামনে ঝুঁকে আরো ঔষধ দিল টম। সাইরেনটা এখন আরো কাছে। হর্নও বাজছে। রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্সের পথ আটকে আছে গাড়িগুলো, সরে যাওয়ার কোনো তাড়া নেই। শহরটার এই একটা জিনিস অসহ্য লাগে স্যাক্সের।
‘ক্যাথেটারটা বের করে নিতে পারেন এখন।’
সাবধানে টিউবটা বের করে নিল সে। ‘আমি কি…’ ইউরিন ব্যাগের দিকে ইঙ্গিত করল সে।
ম্লান হাসল টম। ‘ওটা আমার কাজ।’
কেটে গেল কয়েক মিনিট। মনে হলো অ্যাম্বুলেন্সটা এগোচ্ছেই না, তারপর স্পিকারে ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ শোনা যেতেই ক্রমশ কাছে এল সাইরেন। হঠাৎ নড়ে উঠল রাইম। মাথাটা সামান্য ঝাঁকাল। তারপর বালিশে চেপে এপাশ-ওপাশ করতে লাগল। চামড়ার সেই টকটকে লাল ভাবটা কিছুটা কমেছে।
‘লিংকন, শুনতে পাচ্ছেন?’
গোঙাল সে, ‘টম…’
প্রচণ্ড কাঁপছে রাইম। চাদর দিয়ে তাকে ঢেকে দিল টম। স্যাক্স দেখল সে রাইমের এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে দিচ্ছে। তারপর টিস্যু নিয়ে কপাল মুছে দিল।
সিঁড়িতে দুপদাপ পায়ের আওয়াজ হলো, রেডিওর ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ তুলে হাজির হলো দুজন তাগড়া ইএমএস মেডিক। দ্রুত ঘরে ঢুকে রাইমের ব্লাড প্রেশার মাপল তারা, চেক করল নার্ভ স্টিমুলেটর। একটু পরেই ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকলেন ডাক্তার পিট টেলর।
‘পিটার,’ বলল টম। ‘ডিসরিফ্লেক্সিয়া।’
‘প্রেশার?’
‘কমেছে। তবে অবস্থা খারাপ ছিল। একশো পঞ্চাশে উঠে গিয়েছিল।’ মুখ কুঁচকে ফেললেন ডাক্তার।
ইএমএস টেকনিশিয়ানদের সাথে টেলরের পরিচয় করিয়ে দিল টম। একজন বিশেষজ্ঞকে পেয়ে খুশিই হলো তারা। টেলর বিছানার কাছে যেতেই পিছিয়ে গেল।
‘ডাক্তার,’ জড়ানো গলায় বলল রাইম।
‘চোখদুটো দেখি।’ রাইমের চোখে আলো ফেললেন টেলর। ডাক্তারের মুখের ভাব বোঝার চেষ্টা করল স্যাক্স, তার কপালে ভাঁজ দেখে চিন্তিত হলো।
‘নার্ভ স্টিমুলেটর লাগবে না,’ ফিসফিস করে বলল রাইম।
‘তুমি আর তোমার ফুসফুস, তাই না?’ বাঁকা হেসে বললেন ডাক্তার। ‘আচ্ছা, আর কিছুক্ষণ থাকুক না, ক্ষতি কী? দেখি আসলে কী ঘটছে।’ স্যাক্সের দিকে তাকালেন তিনি। ‘আপনি চাইলে নিচে অপেক্ষা করতে পারেন।’
সামনে ঝোঁকায় ডাক্তার টেলরের পাতলা চুলের নিচে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে দেখল রাইম। পটু হাতে চোখের পাতা তুলে আবার মণি পরীক্ষা করলেন তিনি, একবার এ চোখ, একবার ও চোখ। স্ফিগমোম্যানোমিটার লাগিয়ে রাইমের প্রেশার মাপলেন তিনি, চোখে সেই নিবিষ্ট দৃষ্টি যা ডাক্তারদের থাকে যখন তারা ছোটখাটো কিন্তু জরুরি কাজে মগ্ন থাকে।
‘স্বাভাবিকের দিকে যাচ্ছে,’ ঘোষণা করলেন তিনি। ‘প্রস্রাব কেমন?’
‘এগারোশো সিসি,’ বলল টম।
চোখ রাঙালেন টেলর। ‘অবহেলা করছিলে? নাকি অতিরিক্ত গিলছিলে?’
পাল্টা চোখ রাঙাল রাইম। ‘অন্যমনস্ক ছিলাম, ডাক্তার। খুব ব্যস্ত রাত গেছে।’
রাইমের দৃষ্টি অনুসরণ করে অবাক হয়ে ঘরের চারপাশে তাকালেন টেলর। তার অগোচরে যেন কেউ নিয়ে এসেছে যন্ত্রপাতিগুলো।
‘এসব কী?’
‘আমাকে অবসর ভেঙে টেনে এনেছে ওরা।’
টেলরের চিন্তিত মুখে হাসি ফুটল। ‘যাক, সময় হয়েছে। কত মাস ধরে তোমাকেও বলছিলাম জীবনটা নিয়ে কিছু একটা করো। এখন বলো, পেট পরিষ্কারের কী অবস্থা?’
টম বলল, ‘সম্ভবত বারো ঘণ্টা, বা চৌদ্দ।’
‘খুবই দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ,’ বকা দিলেন টেলর।
‘ওর দোষ নয়!’ খেঁকিয়ে উঠল রাইম। ‘সারা দিন ঘরভরতি লোক ছিল।’
‘কোনো অজুহাত শুনতে চাই না,’ পাল্টা ধমক দিলেন ডাক্তার। ইনি সেই পিট টেলর, যিনি রাইমের সাথে কথা বলার সময় কখনো মাধ্যম ব্যবহার করেন না এবং তার বদরাগী রোগীকে কখনো মাথায় চড়তে দেন না। ‘কাজটা সেরে ফেলাই ভালো।’
সার্জিক্যাল গ্লাভস পরে নিলেন তিনি, ঝুঁকে পড়লেন রাইমের ধড়ের উপর। অসাড় অন্ত্রকে কাজ করানোর জন্য পেটে ম্যাসাজ করতে শুরু করলেন এরপর। চাদর সরিয়ে ডিসপোজেবল ডায়াপার আনল টম। একটু পরেই কাজ শেষ হলো। বসকে পরিষ্কার করে দিল টম।
হঠাৎ টেলর বললেন, ‘আশা করি ঐ পাগলামিটা ছেড়ে দিয়েছ?’ উনি খুঁটিয়ে দেখছেন রাইমকে।
ঐ পাগলামি… আত্মহত্যার কথাই বলছেন তিনি। টমের দিকে একবার তাকিয়ে রাইম বলল, ‘কিছুদিন ওসব ভাবিনি আর।’
‘ভালো।’ টেবিলের উপর রাখা যন্ত্রপাতিগুলো দেখলেন টেলর। ‘এটাই তোমার করা উচিত। হয়তো ডিপার্টমেন্ট তোমাকে আবার বেতনভুক্ত করবে।’
‘মনে হয় না শারীরিক পরীক্ষায় পাস করব।’
‘মাথার কী অবস্থা?’
‘মনে হচ্ছে যেন এক ডজন হাতুড়ি পেটাচ্ছে কেউ। ঘাড়টাতেও। আজ দুবার বাজেভাবে ক্র্যাম্প হয়েছিল।’
ক্লিনিট্রনের পেছনে গেলেন টেলর, রাইমের মেরুদণ্ডের দুপাশে আঙুল দিয়ে চাপ দিলেন। রাইমের ধারণা, সেখানে বছরের পর বছর অপারেশনের ফলে গভীর কাটা দাগ রয়েছে। নিজে কখনো দেখেনি যদিও। রাইমকে এক ওস্তাদি ম্যাসাজ দিলেন টেলর, কাঁধ আর ঘাড়ের টানটান পেশির গভীরে আঙুল চালালেন। ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল ব্যথা। টের পেল ডাক্তারের বুড়ো আঙুল থামল সেই জায়গায় যেখানে তার ভাঙা হাড়টা আছে।
স্পেসশিপ, স্টিংরে…
‘একদিন ওরা এটা ঠিক করে ফেলবে,’ বললেন টেলর। ‘একদিন পা ভাঙার চেয়ে বেশি কিছু মনে হবে না এটাকে। আমার কথা লিখে রাখো। আমি ভবিষ্যদ্বাণী করলাম।’
পনেরো মিনিট পর নিচে নেমে পুলিশদের সাথে ফুটপাতে যোগ দিলেন পিট টেলর।
‘উনি কি ঠিক আছেন?’ উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইল অ্যামেলিয়া স্যাক্স।
‘প্রেশার কমেছে। মূলত বিশ্রাম দরকার।’ সাদাসিধে চেহারার ডাক্তার হঠাৎ খেয়াল করলেন তিনি এক অসামান্য সুন্দরী মহিলার সাথে কথা বলছেন। পাতলা হয়ে আসা ধূসর চুলে হাত বুলিয়ে তিনি আড়চোখে মেয়েটার ছিপছিপে শরীরের দিকে তাকালেন। তারপর টাউনহাউজের সামনে দাঁড়ানো স্কোয়াড কারগুলোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোন কেসে সাহায্য করছে ও?’
প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেল সেলিট্টো, সিভিলিয়ানদের প্রশ্নের মুখে সব ডিটেকটিভই এমনটা করে থাকে।
কিন্তু স্যাক্স আন্দাজ করেছিল টেলর আর রাইম ঘনিষ্ঠ, তাই সে বলল, ‘কিডন্যাপিং? শুনেছেন ওটার ব্যাপারে?’
‘ট্যাক্সি ড্রাইভার কেসটা? সব খবরের চ্যানেলে দেখাচ্ছে। ওর জন্য ভালোই হয়েছে। কাজই ওর জন্য সবচেয়ে বড় ঔষধ। বন্ধু আর জীবনের লক্ষ্য-দুটোই দরকার ওর।’
সিঁড়ির মাথায় উদিত হলো টম। ‘ও ধন্যবাদ জানিয়েছে, পিট। মানে, মুখে ধন্যবাদ বলেনি। কিন্তু ওটাই বুঝিয়েছে। চেনেনই তো ওকে।’
‘সত্যি করে বলো তো,’ নিচু গলায়, ষড়যন্ত্রের সুরে জানতে চাইলেন টেলর, ‘ও কি এখনো ওদের সাথে কথা বলার প্ল্যান করছে?’
আর টম যখন বলল, ‘না, করছে না’, তখন তার গলার স্বর শুনেই স্যাক্স বুঝে গেল সে মিথ্যা বলছে। কীসের ব্যাপারে বা এর গুরুত্ব কী, তা সে জানে না। কিন্তু খচখচ করতে লাগল। ওদের সাথে কথা বলার প্ল্যান?
যাই হোক, সহকারীর ছলচাতুরী টেলর ধরতে পেরেছেন বলে মনে হলো না। তিনি বললেন, ‘কাল আবার আসব, দেখে যাব কী অবস্থা।’
বিদায় জানাল টম। ব্যাগটা কাঁধে ফেলে ফুটপাত ধরে হাঁটতে শুরু করলেন টেলর। সেলিট্টোকে ইশারা করল সহকারী। ‘আপনার সাথে মিনিটখানেক কথা বলতে চায় ও।’
দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে গেল ডিটেকটিভ। ঘরের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল সে, মিনিট কয়েক পর টমের সাথে বেরিয়ে এল বাইরে। সেলিটো বেশ গম্ভীর মুখে তাকাল তার দিকে। ‘এবার তোমার পালা।’ সিঁড়ির দিকে মাথা নাড়ল সে।
বিশাল বিছানায় শুয়ে আছে রাইম, চুল এলোমেলো, মুখটা আর লাল নয়, হাতদুটোও আর হাতির দাঁতের মতো সাদা নয়। ঘরটায় একটা কটু, নাড়িভুঁড়ির গন্ধ। বিছানায় পরিষ্কার চাদর, কাপড় আবার বদলে দেওয়া হয়েছে। এবারের পায়জামাটা ডেলরের স্যুটের মতোই সবুজ।
‘এগুলো আমার দেখা সবচেয়ে কুৎসিত পায়জামা,’ বলল অ্যামেলিয়া। ‘তোমার এক্স-ওয়াইফ দিয়েছিল, তাই না?’
‘বুঝলে কী করে? বিবাহবার্ষিকীর উপহার… ভয় পাইয়ে দেওয়ার জন্য সরি,’ বলল রাইম, চোখ সরিয়ে নিল তার দিক থেকে। হঠাৎ তাকে খুব ভীতু মনে হলো, আর তাতে মন খারাপ হয়ে গেল মেয়েটার। স্লোন-কেটারিং হাসপাতালের প্রি-অপারেশন রুমের কথা মনে পড়ে গেল, বাবাকে সেই এক্সপ্লোরেটরি সার্জারির জন্য নিয়ে যাওয়ার আগের সময়টা, যেখান থেকে আর জ্ঞান ফেরেনি তার।
‘সরি?’ অশুভ গলায় জানতে চাইল সে। ‘আর কখনো ওসব বালছাল করবে না, রাইম।’
মিনিটখানেক তাকে মেপে নিয়ে বলল রাইম, ‘তোমরা দুজনে ভালোই সামলাতে পারবে।’
‘আমরা দুজনে?’
‘তুমি আর লন। মেলও থাকবে অবশ্যই। আর জিম পোলিং।’
‘কী বলতে চাইছ?’
‘আমি অবসরে যাচ্ছি।’
‘তুমি কী?’
‘পুরোনো সিস্টেমের উপর বড্ড বেশি চাপ পড়ছে, বুঝলে।’
‘কিন্তু তাই বলে তুমি হাল ছেড়ে দিতে পারো না।’ ক্লদ মনে-র আঁকা পোস্টারটার দিকে হাত নাড়ল স্যাক্স। ‘দেখো ৮২৩ সম্পর্কে কত কিছু পেয়েছি আমরা। খুব কাছাকাছি চলে গেছি।’
‘তার মানে আমাকে দরকার নেই তোমাদের। শুধু একটু কপাল ভালো হওয়া চাই।’
‘কপাল? বান্ডিকে ধরতেই তো কত বছর লেগে গিয়েছিল। আর জোডিয়াক কিলারের কী হলো? আর ওয়্যারউলফ?’
‘আমাদের হাতে ভালো ইনফরমেশন আছে। সলিড তথ্য। তোমরা ভালো কিছু সূত্র পাবে। ওকে ধরে ফেলতে পারবে। স্যাক্স, পাবলিক অ্যাফেয়ার্স তোমাকে গিলে খাওয়ার আগে এটাই তোমার শেষ কাজ। আমার মনে হচ্ছে আনসাব ৮২৩ বেপরোয়া হয়ে উঠছে; চার্চেই হয়তো ওকে ধরে ফেলবে ওরা।’
‘তোমাকে বেশ সুস্থই দেখাচ্ছে,’ কিছুক্ষণ পর বলল অ্যামেলিয়া। দেখাচ্ছে না যদিও।
হাসল রাইম। তারপর মিলিয়ে গেল হাসিটা। ‘আমি খুব ক্লান্ত। আর ব্যথা করছে। শরীরের এমন সব জায়গায় ব্যথা করছে যেখানে ডাক্তারদের মতে ব্যথা করারই কথা নয়।’
‘আমি যা করি তাই করো। একটু ঘুমিয়ে নাও।’
নাক দিয়ে বিদ্রুপের হাসি হাসার চেষ্টা করল সে, কিন্তু খুব দুর্বল শোনাল। তাকে এভাবে দেখতে খুব খারাপ লাগছে অ্যামেলিয়ার। একটু কাশল সে, নার্ভ স্টিমুলেটরের দিকে তাকিয়ে মুখ ভ্যাংচালো, যেন মেশিনের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে বলে লজ্জা পাচ্ছে।
‘স্যাক্স… আমাদের আর একসাথে কাজ করা হবে বলে মনে হয় না। শুধু বলতে চাই, তোমার সামনে উজ্জ্বল ক্যারিয়ার পড়ে আছে, সঠিক সিদ্ধান্ত নিও।’
‘আচ্ছা, হারামিটাকে ধরার পর ফিরে আসব তোমার সাথে দেখা করতে।’
‘ভালো লাগবে তাহলে। আমি খুশি যে গতকাল সকালে তুমিই ফার্স্ট অফিসার ছিলে। গ্রিড ধরে হাঁটার জন্য তোমার চেয়ে যোগ্য আর কাউকে পেতাম না।’
‘আমি-‘
‘লিংকন,’ একটা গলা শোনা গেল।
ঘুরে দরজায় এক লোককে দেখতে পেল অ্যামেলিয়া। কৌতূহল নিয়ে ঘরের চারপাশে দেখছে লোকটা, সব যন্ত্রপাতি দেখছে।
‘মনে হচ্ছে বেশ উত্তেজনা বয়ে গেছে এখানে।’
‘আরে ডাক্তার!’ বলল রাইম। মুখে হাসি ফুটে উঠল তার। ‘আসুন ভেতরে।’
ঘরে ঢুকল সে। ‘টমের মেসেজ পেলাম। ইমার্জেন্সি বলল যে ও?’
‘ডাক্তার উইলিয়াম বার্জার, ও হলো অ্যামেলিয়া স্যাক্স।’
কিন্তু স্যাক্স বুঝতে পারল লিংকন রাইমের জগত থেকে মুছে গেছে সে। আরো অনেক কথা বলার ছিল, টের পাচ্ছে ভালোই। কিন্তু এখন সেই মুহূর্তটা কেটে গেছে। দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল সে। বাইরে বিশাল হলওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা টম তার পেছনে দরজাটা বন্ধ করে দিল, এবং বরাবরের মতোই ভদ্রতা বজায় রেখে থামল, তাকে আগে যাওয়ার জন্য ইশারা করল।
ভ্যাপসা গরমের রাতে বেরিয়ে আসতেই কাছেই একটা গলা শুনতে পেল স্যাক্স। ‘মাফ করবেন।’
ঘুরে দেখে, ডাক্তার পিটার টেলর একা দাঁড়িয়ে আছেন একটা গিঙ্কগো গাছের নিচে।
‘একটু কথা বলা যাবে?’
কয়েকটা বাড়ির পরের ফুটপাত পর্যন্ত টেলরকে অনুসরণ করল স্যাক্স।
‘বলুন?’ জানতে চাইল সে।
পাথুরে দেয়ালে হেলান দিয়ে চুলে হাত বোলালেন তিনি, অস্বস্তি বোধ করছেন। স্যাক্সের মনে পড়ল কতবার শুধু একটা কথা বা চাহনি দিয়েই পুরুষদের ঘাবড়ে দিয়েছে সে। প্রায়ই যা ভাবে, আজও তাই ভাবল: সৌন্দর্য কী অনায়াসলব্ধ এক ক্ষমতা।
‘আপনি ওর বন্ধু, তাই না?’ ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন তাকে। ‘মানে, একসাথে কাজ করেন ঠিকই, কিন্তু আপনি তো বন্ধুও।’
‘তাই তো মনে হয়।’
‘যিনি এইমাত্র ভেতরে ঢুকলেন। চেনেন তাকে?’
‘বার্জার, মনে হয়। ডাক্তার তিনি।’
‘বলেছেন কোথায় থাকেন?’
‘না।’
রাইমের শোবার ঘরের জানালার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন টেলর। জিজ্ঞেস করলেন, ‘লেথ সোসাইটির নাম শুনেছেন?’
‘না। ওহ, মনে পড়েছে… স্বেচ্ছামৃত্যু গ্রুপ, তাই না?’
মাথা নাড়লেন টেলর। ‘লিংকনের সব ডাক্তারকে আমি চিনি। আর বার্জারের নাম
আমি শুনিনি। ভাবছিলাম উনি হয়তো ওদেরই লোক।’
‘কীহ!’
সে কি এখনো ওদের সাথে কথা বলছে… তার মানে এই-ই ছিল আলোচনার বিষয়!
স্থির হয়ে গেল সে। ‘ও কি…ও কি আগেও এ ব্যাপারে সিরিয়াসলি কথা বলেছে?’
‘হ্যাঁ।’ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন টেলর, তাকিয়ে রইলেন ধোঁয়াশাচ্ছন্ন রাতের আকাশের দিকে। ‘বলেছে তো।’ নিজের নেম ব্যাজটার দিকে তাকালেন ডাক্তার। ‘অফিসার স্যাক্স, আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। দিনের পর দিন। বহু বছর ধরে কোয়াড্রিপ্লিজিকদের সাথে কাজ করছি তো, আমি জানি ওরা কতটা একগুঁয়ে হয়। হয়তো আপনার কথা শুনবে। অল্প কয়েকটা কথা। ভাবছিলাম…আপনি কি…’
‘ওহ, গডড্যাম ইট, রাইম Carson,’ বিড়বিড় করে বলল সে, তারপর ডাক্তারকে মাঝপথেই ফেলে রেখে ছুট দিল ফুটপাত ধরে।
টাউনহাউজের সদর দরজায় যখন পৌঁছাল, টম তখন দরজা বন্ধ করছে। তাকে ঠেলে ভেতরে ঢুকল সে। ‘ওয়াচবুকটা ফেলে গেছি।’
‘আপনার…’
‘এই তো আসছি।’
‘উপরে যাওয়া যাবে না। ডাক্তার আছেন সাথে।’
‘এক সেকেন্ড লাগবে।’
টম তার পিছু নেওয়ার আগেই ল্যান্ডিংয়ে পৌঁছে গেল সে। ছেলেটা নিশ্চয়ই বুঝেছে এটা একটা চাল, কারণ একলাফে দুটো করে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে শুরু করল সে। কিন্তু স্যাক্স অনেকটা এগিয়ে ছিল, সহকারীটা সিঁড়ির মাথায় পৌঁছানোর আগেই রাইমের দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেলল সে।
ভিতরে ঢুকে পড়ল সে, চমকে দিল রাইম আর ডাক্তার দুজনকে। ডাক্তার টেবিলটায় হেলান দিয়ে হাত আড়াআড়ি করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দরজা বন্ধ করে লক করে দিল সে। দরজায় ধাক্কা দিতে শুরু করল টম। কৌতূহল নিয়ে তার দিকে ফিরল বার্জার।
‘স্যাক্স!’ বলে উঠল রাইম।
‘কথা আছে।’
‘কী নিয়ে?’
‘তোমাকে নিয়ে।’
‘পরে।’
‘কত পরে, রাইম?’ ব্যঙ্গ করে জানতে চাইল সে। ‘কাল? আগামী সপ্তাহে?’
‘কী বোঝাতে চাইছ?’
‘নিশ্চয়ই চাইছ এক সপ্তাহ পরের কোনো মিটিং ঠিক করতে? তখন কি আদৌ পারবে? থাকবে ততদিন?’
‘স্যাক্স-‘
‘কথা বলতে চাই। একা।’
‘না।’
‘তাহলে কঠিন পথেই কাজটা করা লাগবে।’ বার্জারের দিকে এগিয়ে গেল সে। ‘আপনাকে অ্যারেস্ট করা হলো। অভিযোগ হলো আত্মহত্যার চেষ্টা ও সহায়তা।’
চোখের পলকে ঝলসে উঠল হাতকড়া। রুপালি ঝিলিক তুলে ক্লিক, ক্লিক শব্দে আটকে গেল ডাক্তারের কবজিতে।
ওর মনে হলো দালানটা একটা চার্চ।
বেসমেন্টের মেঝেতে শুয়ে আছে ক্যারল গ্যানজ। দেয়ালের উপর তির্যকভাবে এসে পড়েছে এক চিলতে ঠান্ডা আলো। তাতে আলোকিত হয়েছে যীশুর এক জরাজীর্ণ ছবি আর ছত্রাকধরা গোল্ডেন বুক বাইবেলের গল্পের স্তূপ। গোটা ছয়েক খুদে চেয়ার ঘরের মাঝখানে জড়ো করা। সানডে স্কুলের ছাত্রদের জন্য হবে হয়তো।
হাতে হাতকড়া আর মুখে টেপ এখনো আছে। চার ফুট লম্বা এক টুকরো নাইলনের দড়ি দিয়ে দেয়ালের কাছের একটা পাইপের সাথেও বেঁধে রাখা হয়েছে তাকে। কাছেই একটা উঁচু টেবিলের উপর বড় একটা কাচের জগের উপরের অংশ দেখতে পাচ্ছে সে। যদি ওটা ফেলে দিতে পারে, তবে কাচের টুকরো দিয়ে হয়তো দড়িটা কাটতে পারবে।
টেবিলটা নাগালের বাইরে মনে হলেও সে কাত হয়ে শুয়ে শুঁয়াপোকার মতো শরীর মোচড়াতে মোচড়াতে ওদিকে এগোতে লাগল। প্যামি যখন খুব ছোট ছিল, বিছানায় তার আর রনের মাঝখানে গড়াগড়ি খেত, সেই কথা মনে পড়ে গেল। তার বাচ্চাটা সেই ভয়ানক বেসমেন্টে একা পড়ে আছে। কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। প্যামি, পুহ, পার্স।
মুহূর্তের জন্য, ক্ষণিকের জন্য, দুর্বল হয়ে পড়ল সে। মনে হলো শিকাগো ছেড়ে না এলেই ভালো হতো।
না, ওভাবে ভেবো না! নিজের জন্য দুঃখ করা বন্ধ করো! এটাই সঠিক কাজ ছিল। রনের জন্যই তো করেছ সব। আর নিজের জন্যও। ও তোমাকে নিয়ে গর্বিত হতো, কেট হাজারবার বলেছে কথাটা। আর সে নিজেও তা বিশ্বাস করে।
আবার চেষ্টা শুরু করল সে। টেবিলের দিকে আরো এক ফুট এগুলো। মাথা ঝিমঝিম করছে, ঠিকমতো চিন্তা করতে পারছে না। প্রচণ্ড পিপাসায় গলা জ্বলছে। সাথে বাতাসের সেই শ্যাওলা আর ভ্যাপসা গন্ধ। আরো খানিকটা এগোল, তারপর কাত হয়ে শুয়ে দম নিল, তাকিয়ে রইল টেবিলের দিকে।
অসম্ভব মনে হচ্ছে। লাভ কী? ভাবল সে। সেই সাথে ভাবছে প্যামির মনের ভেতর কী চলছে।
হারামজাদা কোথাকার! ভাবল ক্যারল। এর জন্য খুন করব তোকে আমি! মোচড়ামুচড়ি করল সে, মেঝের উপর দিয়ে আরো এগোনোর চেষ্টা করল। কিন্তু তার বদলে ভারসাম্য হারিয়ে চিত হয়ে পড়ে গেল। চমকে উঠল সে, জানে কী হতে যাচ্ছে। না!
মট করে একটা শব্দ হলো, কবজিটা ভেঙে গেল তার। টেপের আড়ালে চিৎকার করে উঠল ক্যারল। এরপর জ্ঞান হারাল।
খানিক বাদে জ্ঞান ফিরতেই বমি ভাবটা চেপে ধরল তাকে। না, না, না… বমি করলে মরে যাবে সে। মুখে টেপ লাগানো অবস্থায় দম আটকে যাবে।
দাবিয়ে রাখো! লড়ো। লড়তে থাকো। পারবে তুমি। এই তো আমি… একবার উঁকি দিল বমি। তারপর আবার।
না! দমাও। গলায় উঠে আসছে।
দমাও…
দমিয়ে রাখো…
পারল অবশেষে। নাক দিয়ে শ্বাস নিল জোরে। সব চিন্তা সরিয়ে কেবল কেট, এডি আর প্যামির কথা ভাবতে লাগল। তার সব দামি জিনিসপত্রওয়ালা সেই হলুদ ন্যাপস্যাকের কথা ভাবতে লাগল। দেখতে পাচ্ছে ওটা, সব দিক থেকে কল্পনা করছে। তার পুরো জীবনটা ওটার ভেতরে। তার নতুন জীবন।
রন, আমি এটা নষ্ট করতে চাই না। তোমার জন্যই তো এখানে আসা, হানি… চোখ বন্ধ করল সে। মনকে বলল: বুকভরে শ্বাস নাও। ভেতরে, বাইরে।
অবশেষে বমি ভাবটা কমল। একটু পরে ভালো বোধ করতে শুরু করল সে। ভাঙা হাতের যন্ত্রণায় চোখ দিয়ে পানি গড়াচ্ছে, তবুও শুঁয়াপোকার মতো টেবিলের দিকে এগোতে থাকল।
এক ফুট।
দুই ফুট।
মাঠাটা টেবিলের পায়ে ঠুকতেই থপ করে আওয়াজ হলো। কোনোমতে ওটার নাগাল পেয়েছে সে, কিন্তু আর নড়তে পারছে না। মাথাটা সামনে-পেছনে দোলাল। জোরে ধাক্কা দিল টেবিলে। টেবিলের উপর বোতলটা নড়ে উঠতেই ছলকে ওঠার শব্দ শুনতে পেল। উপর দিকে তাকাল। টেবিলের কিনারার বাইরে বেরিয়ে এসেছে জগের কিছুটা অংশ।
মাথাটা পেছনের দিকে নিল ক্যারল। শেষবারের মতো ঘা দিল টেবিলের পায়ে।
না! পা-টা নাগালের বাইরে ছিটকে গেল। মুহূর্তের জন্য টলমল করল জগটা, কিন্তু পড়ল না।
দড়িটা ঢিল করার জন্য টানাটানি করল ক্যারল। পারল না।
অসহ্য!
হতাশ হয়ে নোংরা বোতলটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে খেয়াল করল, ওটা কোনো তরল দিয়ে ভরা। আর ভেতরে কী যেন ভাসছে। কী ওটা?
আরো ফুট দুয়েক দেয়ালের দিকে পিছিয়ে গেল সে। উপরে তাকাল। ভেতরে একটা লাইটবাল্বের মতো মনে হলো। না, পুরো বাল্ব নয়, শুধু ফিলামেন্ট আর বেজটা, একটা সকেটে লাগানো। সকেট থেকে একটা তার জগ থেকে বেরিয়ে টাইমারের সাথে যুক্ত আছে, ছুটিতে বাইরে গেলে বাতি নেভানো-জ্বালানোর জন্য যেমনটা ব্যবহার করা হয়। দেখতে অনেকটা…
বোমা! পেট্রোলের হালকা গন্ধটা চিনতে সময় লাগল না তার।
না, না… মরিয়া হয়ে টেবিল থেকে যতটা সম্ভব দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল ক্যারল। কাঁদছে ফুঁপিয়ে। দেয়ালের কাছে একটা ফাইলিং ক্যাবিনেট আছে। ওটা কিছুটা আড়াল দেবে। পাদুটো গুটিয়ে আনল সে।
হঠাৎ আতঙ্কের এক শিহরন খেলে গেল শরীরে। পাগলের মতো পা ছুঁড়ল। ছুঁড়তে গিয়ে ভারসাম্য হারাল সে। আতঙ্কের সাথে খেয়াল করল, আবার চিত হয়ে পড়ে যাচ্ছে।
ওহ, না! থামো… এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে রইল সে। কাঁপছে, চেষ্টা করছে শরীরের ভর সামনের দিকে নেওয়ার জন্য। পারল না। গড়িয়ে হাতকড়া পরা হাতের উপরেই আছড়ে পড়ল সে। ভাঙা কবজির উপর পড়ল পুরো শরীরের ভার। অসহ্য যন্ত্রণার এক মুহূর্ত কেটে গেল। তাও ভালো যে আবারো জ্ঞান হারাল সে।
