নড়াচড়ার উপর থাকলে ওরা তোমায় ধরতে পারবে না
‘চিকিৎসকের দায়িত্ব কেবল জীবন দীর্ঘায়িত করা নয়, যন্ত্রণা লাঘব করাও বটে।’
-ডাক্তার জ্যাক কেভোরকিয়ান
অধ্যায় সাঁইত্রিশ
সোমবার, সন্ধ্যা ৭:১৫ থেকে রাত ১০:০০ পর্যন্ত
সূর্যাস্তের সময় অ্যামেলিয়া স্যাক্স তার দরজায় এসে দাঁড়াল। এখন আর সোয়েটপ্যান্ট বা ইউনিফর্ম পরা নেই। জিনস আর ঘন সবুজ শার্ট পরেছে। তার সুন্দর মুখে কয়েকটা আঁচড়ের দাগ। এগুলো আগে দেখেনি রাইম। তবে গত তিন দিনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আন্দাজ করল ওগুলো সে নিজের হাতে করেনি।
‘ইয়াক,’ মেঝের যেখানটায় স্ট্যান্টন আর পোলিং মারা গিয়েছিল সেদিক দিয়ে যাওয়ার সময় বলল সে। ব্লিচ দিয়ে মোছা হয়েছে-আসামি বডি-ব্যাগে ঢোকার পর ফরেনসিকের আর দরকার পড়েনি-তবুও গোলাপি দাগটা বেশ বড়।
রাইম দেখল, স্যাক্স থেমে ডাক্তার উইলিয়াম বার্জারকে একটা শুকনো অভিবাদন জানাল। নিজের কুখ্যাত ব্রিফকেস পাশে নিয়ে ফ্যালকন জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছে সে।
‘ওকে তো শেষ করেছ, তাই না?’ রক্তের দাগটার দিকে মাথা নেড়ে জিজ্ঞেস করল সে।
‘হ্যাঁ,’ রাইম বলল। ‘শেষ।’
‘একাই?’
‘ঠিক সমানে সমান লড়াই ছিল না,’ বলল সে। ‘ইচ্ছা করেই শক্তি কম খাটিয়েছি।’
বাইরে, ডুবতে বসা সূর্যের তরল, লালচে আলোয় জ্বলে উঠেছে গাছের মাথা আর পার্কের ওপারে ফিফথ অ্যাভিনিউয়ের অভিজাত দালানগুলোর সারি।
বার্জারের দিকে তাকাল স্যাক্স, বলল, ‘লিংকন আর আমি একটু কথা বলছিলাম।’
‘তাই বুঝি?’
এরপর বেশ কিছুক্ষণ কিছু বলল না কেউই।
‘অ্যামেলিয়া,’ বলতে শুরু করল রাইম। ‘আমি কাজটা করছি। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।’
‘বুঝলাম।’
ছোট সেলাইয়ের কালো দাগওয়ালা অপূর্ব ঠোঁটটা সামান্য শক্ত হলো। ওটুকুই যা প্রতিক্রিয়া দেখাল স্যাক্স। ‘আমার নামের প্রথম অংশ ধরে ডাকলে আমার ভয়ানক রাগ হয়, জানোই তো। জঘন্য লাগে।’
সে যে মৃত্যুর পথে এগোচ্ছে তার জন্য মেয়েটাই যে অনেকাংশে দায়ী, সেটা তাকে কী করে বোঝাবে সে? আজ সকালে ঘুম ভাঙার পর ওকে পাশে দেখে এক তীব্র বিষাদ মনে জেগেছিল তার। রাইম বুঝতে পেরেছিল যে একটু পরেই স্যাক্স বিছানা ছেড়ে উঠবে, পোশাক পরে সোজা বেরিয়ে যাবে দরজা দিয়ে। চলে যাবে তার নিজের জীবনে, স্বাভাবিক এক জীবনে। কারণ প্রেমিক-প্রেমিকা হিসেবে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই-যদি আদৌ নিজেকে প্রেমিক ভাবার সাহস করে রাইম। সময়ের ব্যাপার মাত্র। অচিরেই আরেকটা নিকের সাথে দেখা হবে তার, প্রেমে পড়বে সে। ৮২৩-এর কেস শেষ, আর ঐ বাঁধনটুকু ছাড়া তাদের জীবন আলাদা হতে বাধ্য। এটা অনিবার্য।
ধারণার চেয়েও অনেক বেশি চতুর ছিল স্ট্যান্টন। বাস্তব জগতের কিনারায় টেনে এনেছিল রাইমকে, আর, হ্যাঁ, কিনারা থেকে অনেক দূরে ঠেলেও দিয়েছে।
স্যাক্স, আমি মিথ্যা বলেছিলাম। মাঝে মাঝে মৃতদের মায়া ত্যাগ করা যায় না। মাঝে মাঝে তাদের সাথেই চলে যেতে হয়…
হাত মুষ্টিবদ্ধ করে জানালার কাছে গেল স্যাক্স। ‘তোমাকে থামানোর জন্য একটা মোক্ষম যুক্তি খুঁজছিলাম। জবরদস্ত কিছু একটা। কিন্তু পেলাম না। শুধু এটুকুই বলতে পারি, আমি চাই না তুমি এটা করো।’
‘চুক্তি তো চুক্তিই, স্যাক্স।’ বার্জারের দিকে তাকাল সে।
‘শিট, রাইম।’
বিছানার কাছে গিয়ে উবু হয়ে বসল স্যাক্স। তার কাঁধে হাত রাখল, কপাল থেকে চুল সরিয়ে দিল।
‘আমার জন্য একটা কাজ করবে?’
‘কী?’
‘কয়েকটা ঘণ্টা সময় দাও আমাকে।’
‘মত বদলাচ্ছি না আমি।’
‘বুঝতে পারছি। মাত্র দুঘণ্টা। একটা কাজ করার আছে তোমার।’
বার্জারের দিকে তাকাল রাইম। ডাক্তার বলল, ‘আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারব না, লিংকন। আমার প্লেন…যদি এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে চাও, তবে ফিরে আসতে পারি…’
‘ঠিক আছে, ডাক্তার,’ স্যাক্স বলল। ‘আমি ওকে সাহায্য করব।’
‘তুমি?’ সাবধানে জানতে চাইল ডাক্তার।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাথা নাড়ল সে। ‘হ্যাঁ।’
এটা ওর স্বভাববিরুদ্ধ। পরিষ্কার বুঝতে পারল রাইম। কিন্তু মেয়েটার নীল চোখের দিকে তাকাল সে, ছলছল করলেও ওদুটো আশ্চর্য রকম স্বচ্ছ। মেয়েটা বলল, ‘যখন আমি… যখন ও আমাকে কবর দিচ্ছিল, রাইম, একচুলও নড়তে পারছিলাম না। এক মুহূর্তের জন্য মৃত্যুর আশায় পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। বাঁচার জন্য নয়, শুধু শেষ হওয়ার জন্য। তোমার অনুভূতিটা বুঝেছি আমি।’
ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল রাইম, তারপর বার্জারকে বলল, ‘ঠিক আছে, ডাক্তার। আপনি কি শুধু-আজকের সভ্য নামটা যেন কী?’
‘সরঞ্জাম কেমন শোনায়?’ প্রস্তাব দিল বার্জার।
‘ওগুলো কি টেবিলে রেখে যেতে পারবেন?’
‘আপনি নিশ্চিত?’ স্যাক্সকে জিজ্ঞেস করল সে।
আবার মাথা নাড়ল মেয়েটা।
টেবিলের উপর ব্র্যান্ডি, বড়ি আর প্লাস্টিক ব্যাগ রাখল ডাক্তার। তারপর ব্রিফকেস হাতড়াল। ‘আমার কাছে কোনো রাবার ব্যান্ড নেই।’
‘সমস্যা নেই,’ জুতোর দিকে তাকিয়ে বলল স্যাক্স। ‘আমার কাছে আছে।’
বিছানার কাছে এল ডাক্তার, রাইমের কাঁধে হাত রাখল। ‘আপনার স্বেচ্ছা-মুক্তি শান্তিপূর্ণ হোক,’ বলল সে।
‘স্বেচ্ছা-মুক্তি,’ বার্জার চলে যেতেই বাঁকা হেসে বলল রাইম। ‘এবার বলো। কী কাজ করতে হবে আমাকে?’
পঞ্চাশ মাইল গতিতে বাঁক নিল সে, বাজেভাবে স্কিড করল, তারপর মসৃণভাবে চলে গেল ফোর্থ গিয়ারেরে। খোলা জানালা দিয়ে বাতাস এসে ঝাপটা মারল, চুলগুলো উড়িয়ে দিল পেছনে। বাতাসের তোেড় মারাত্মক, কিন্তু জানালা লাগানোর কথা কানেই তুলল না অ্যামেলিয়া স্যাক্স।
‘আমেরিকানরা জানালা তুলে গাড়ি চালায় না,’ ঘোষণা করল সে। ১০০ মাইলের কাঁটা পার হলো অচিরেই।
নড়াচড়ার উপর থাকলে…
এনওয়াইপিডি ট্রেনিং কোর্সে চক্কর দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল রাইম। তবে স্যাক্স যখন বলল ওটা বাচ্চাদের জায়গা, তখন অবাক হয়নি সে। অ্যাকাডেমির প্রথম সপ্তাহেই ওখানে ধুলো উড়িয়ে দিয়ে এসেছে সে। তাই লং আইল্যান্ডে এসেছে তারা, নাসাউ কাউন্টি পুলিশের জন্য তাদের কভার স্টোরি তৈরি, রিহার্সাল করা এবং মোটামুটি বিশ্বাসযোগ্য।
‘ফাইভ-স্পিডের ব্যাপারটা হলো, টপ গিয়ারটা সবচেয়ে ফাস্ট নয়। ওটা মাইলেজ গিয়ার। আর মাইলেজ নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।’ রাইমের বাঁ হাতটা নিয়ে গোল কালো নবটার উপর রাখল সে, নিজের হাত দিয়ে চেপে ধরল, গিয়ার কমাল। ইঞ্জিনটা গর্জন করে উঠতেই ১২০-এ পৌঁছে গেল গাড়ি। গাছপালা আর বাড়িঘর সরে যাচ্ছে চোখের পলকে, মাঠে চরতে থাকা ঘোড়াগুলো কালো শেভ্রোলে গাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে।
‘রাইম, দারুণ না?’ চিৎকার করে বলল সে। ‘সেক্স এর কাছে কিছুই না।’
‘কম্পন অনুভব করতে পারছি,’ বলল রাইম। ‘একটু একটু। আঙুলে।’
হাসল মেয়েটা। রাইমের মনে হলো তার হাত মুঠোয় নিয়েছে স্যাক্স।
অবশেষে নির্জন রাস্তা শেষ হয়ে এল, লোকালয় দেখা দিল, আর অনিচ্ছাসত্ত্বেও গতি কমাল স্যাক্স। গাড়ি ঘুরিয়ে অস্পষ্ট চাঁদের দিকে মুখ করল। দূরের শহরের দিকে উঠছে ওটা, গরম আগস্টের বাতাসে প্রায় অদৃশ্য।
‘চলো দেড়শো তোলার চেষ্টা করি,’ প্রস্তাব দিল অ্যামেলিয়া।
চোখ বন্ধ করল লিংকন রাইম। হারিয়ে গেল শোঁ শোঁ বাতাস, সদ্য কাটা ঘাসের গন্ধ আর গতির মাঝে। মাসের সবচেয়ে গরম রাত আজকে।
লিংকন রাইমের নতুন জায়গা থেকে পার্কের দিকে তাকালে বেঞ্চে বসা অদ্ভুত সব লোক, যেমন ক্লান্ত জগার আর ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা বারবিকিউ আগুনের চারপাশে শুয়ে থাকা পরিবারগুলোকে মধ্যযুগীয় যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া সৈনিকের মতো দেখাচ্ছে। রাতের গরম কমার অপেক্ষায় থাকা কিছু কুকুর মালিক তাদের সান্ধ্যভ্রমণ সেরে নিচ্ছে, হাতে ব্যাগ।
টম একটা সিডি ছেড়েছে। স্যামুয়েল বারবারের শোকের গান ‘অ্যাডাজিও ফর স্ট্রিংস’। বিদ্রুপের হাসি হেসে ওটাকে বস্তাপচা ক্লিশে বলে রায় দিয়েছে রাইম। গারশুইন বাজাতে বলছে।
সিঁড়ি বেয়ে বেডরুমে এল অ্যামেলিয়া স্যাক্স, তাকে বাইরে তাকিয়ে থাকতে দেখল। ‘কী দেখছ?’ জানতে চাইল সে।
‘গরমে অতিষ্ঠ লোকজনকে।’
‘আর পাখিগুলো? ফ্যালকন?’
‘আহ, হ্যাঁ, ওরাও আছে।’
‘গরম লাগছে ওদের?’
পুরুষটাকে দেখল রাইম। ‘মনে হয় না। কেন যেন ওসবের উর্ধ্বে ওরা।’
বিছানার পায়ার কাছে ব্যাগটা রাখল মেয়েটা, ভেতরের জিনিস বের করল। এক বোতল দামি ব্র্যান্ডি। রাইম স্কচের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু স্যাক্স বলেছে মদটা সে-ই দেবে। বড়ি আর প্লাস্টিক ব্যাগের পাশে রাখল ওটা। দেখে মনে হচ্ছে কর্মব্যস্ত গৃহিণী, বালদুচ্চি থেকে একগাদা সবজি আর সামুদ্রিক মাছ কিনে ফিরেছে আর রাঁধারও সময় নেই। কিছু বরফও কিনেছে সে, রাইমের অনুরোধে। ব্যাগের ভেতরের গরমের ব্যাপারে বার্জারের কথাটা মনে ছিল তার।
কুরভোয়াসিয়ের-এর ছিপি খুলল সে, নিজের জন্য এক গ্লাস ঢালল আর রাইমের গ্লাসটাও ভরে দিল। তারপর স্ট্র-টা এগিয়ে দিল তার মুখের কাছে।
‘টম কোথায়?’ জানতে চাইল মেয়েটা।
‘বাইরে।’
‘ও জানে?’
‘হ্যাঁ।’
ব্র্যান্ডিতে চুমুক দিল তারা।
‘তোমার স্ত্রীকে কি কিছু বলতে হবে?’
দীর্ঘক্ষণ ভাবল রাইম। আমাদের হাতে বছরের পর বছর সময় থাকে। কারো সাথে কথা বলার জন্য, আবোল-তাবোল বকার জন্য, রাগ আর অভিমান প্রকাশ করার জন্য। অথচ আমরা হেলায় হারাই সেই মুহূর্তগুলো। অ্যামেলিয়া স্যাক্সের সাথে ওর পরিচয় মাত্র তিন দিনের। অথচ গত এক দশকে ব্লেইনের সাথে যা বলেনি তার চেয়ে বেশি মনের কথা আদান-প্রদান করেছে ওরা।
“না,” বলল সে। “ই-মেইল করেছি ওকে।” হাসলো একটু। “আমাদের সময়েরই তো চল ওটা।”
আরো ব্র্যান্ডি নিতেই মুখের ভেতর কষা ভাবটা কেটে যাচ্ছে। মসৃণ, ভোঁতা, হালকা হচ্ছে। বিছানার উপর ঝুঁকে নিজের গ্লাসটা রাইমের গ্লাসে ঠুকল স্যাক্স।
‘আমার কিছু টাকা আছে,’ শুরু করল রাইম। ‘বেশিরভাগটাই ব্লেইন আর টমকে দিচ্ছি। আমি-‘
কিন্তু কপালে চুমু খেয়ে তাকে থামিয়ে দিল মেয়েটা, মাথা নাড়ল। ছোট ছোট নুড়িপাথরের মতো সেকোনালগুলো হাতে ঢালল সে। রাইমের মনে হলো: ডিলি-কোপানি কালার টেস্ট রিএজেন্ট। সন্দেহজনক উপাদানে মিথানলে ১ শতাংশ কোবাল্ট অ্যাসিটেট মেশাও, তারপর মিথানলে ৫ শতাংশ আইসোপ্রোপিলামাইন। যদি বার্বিচুরেট হয়, তবে রিএজেন্টটা সুন্দর ভায়োলেট-নীল রং ধারণ করে।
‘কীভাবে করব?’ বড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল সে।
‘ঠিক জানি না।’
‘মদের সাথে মিশিয়ে দাও,’ পরামর্শ দিল রাইম।
অ্যামেলিয়া ওগুলোকে গ্লাসে ফেলতেই গলে গেল দ্রুত। কী ভঙ্গুর ওগুলো। বড়িগুলো খেলে যে স্বপ্নের জগতে হারায় মানুষ, সেই স্বপ্নের মতোই।
স্ট্র দিয়ে নাড়ল মেয়েটা। স্যাক্সের জখম হওয়া নখগুলোর দিকে তাকাল রাইম। কিন্তু তাতেও দুঃখ হলো না তার। এ রাত বড় আনন্দের তার জন্য।
শৈশবের ইলিনয়ের কথা মনে পড়ে গেল লিংকন রাইমের। দুধ খেতে চাইত না সে। মা স্ট্র কিনে দিত আর ওগুলোর ভেতরে স্বাদ লাগানো থাকত। স্ট্রবেরি, চকলেট। এই মুহূর্তের আগে ওগুলোর কথা মনেই পড়েনি তার। দারুণ আবিষ্কার ছিল ওটা। স্ট্র-এর স্বাদ পাওয়ার জন্য বিকেলের দুধের জন্য অপেক্ষা করে থাকত সে।
স্ট্র-টা তার মুখের কাছে ধরল স্যাক্স। ঠোঁটের ফাঁকে নিল সে। তার বাহুতে হাত রাখল মেয়েটা। আলো না অন্ধকার, সংগীত না নীরবতা, স্বপ্ন না স্বপ্নহীন ঘুমের ধ্যান? কী আছে সামনে?
চুমুক দিতে শুরু করল সে। স্বাদটা সাধারণ মদের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। হয়তো একটু বেশি তেতো। যেন-
নিচতলা থেকে দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কার শব্দ এল। হাত আর পাদুটো দিয়েই মনে হলো। চিৎকারও শোনা যাচ্ছে।
স্ট্র থেকে ঠোঁট সরাল সে। তাকাল আবছা সিঁড়ির দিকে। ভ্রু কুঁচকে তাকাল স্যাক্সও।
‘গিয়ে দেখো,’ তাকে বলল রাইম।
নিচে গিয়ে একটু পরেই বিমর্ষ মুখে ফিরে এল সে। লন সেলিট্টো আর জেরি ব্যাংকস রয়েছে তার পেছনে। রাইম খেয়াল করল তরুণ ডিটেকটিভ আবারো রেজার দিয়ে গাল কেটে ফেলেছে।
ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণে আনা দরকার ওর।
বোতল আর ব্যাগের দিকে তাকাল সেলিট্টো। চোখদুটো স্যাক্সের দিকে গেল। কিন্তু হাত আড়াআড়ি করে নিজের অবস্থানে অটল রইল মেয়েটা, নিঃসব্দে তাকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে। এটা র্যাংকের বিষয় নয়, চাহনিটা বুঝিয়ে দিল ডিটেকটিভকে। আর এখানে যা ঘটছে তা তার দেখার বিষয়ও নয়।
বার্তাটা বুঝল সেলিট্টো, কিন্তু এখনই যাওয়ার পাত্র সে নয়। ‘লিংকন, কথা আছে।’
‘বলো। তবে তাড়াতাড়ি, লন। আমরা ব্যস্ত।’
ক্যাঁচক্যাঁচে বেতের চেয়ারটায় ভারী শরীর এলিয়ে দিল ডিটেকটিভ। ‘ঘণ্টাখানেক আগে ইউনাইটেড নেশনস-এ বোমা ফেটেছে। ব্যাংকোয়েট হলের ঠিক পাশে। শান্তি সম্মেলনের প্রতিনিধিদের ওয়েলকাম ডিনারের সময়।’
‘ছয়জন মৃত, চুয়ান্নজন আহত,’ যোগ করল ব্যাংকস। ‘বিশজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।’
‘মাই গড!’ ফিসফিস করে বলল স্যাক্স।
‘ওকে বলো,’ বিড়বিড় করল সেলিট্টো।
банкস বলে চলল, ‘কনফারেন্সের জন্য ইউএন কিছু অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ দিয়েছিল। আসামি তাদেরই একজন-রিসেপশনিস্ট। জনা ছয়েক লোক তাকে ন্যাপস্যাক নিয়ে কাজে আসতে দেখেছে আর ব্যাংকোয়েট হলের কাছে স্টোররুমে রাখতে দেখেছে। বিস্ফোরণের ঠিক আগে আগে বেরিয়ে গেছে সে। বোম্ব স্কোয়াডের ধারণা প্রায় দুই পাউন্ড সি-ফোর বা সেমটেক্স ছিল ওতে।’
সেলিট্টো বলল, ‘লিংক, বোমাটা, ওটা একটা হলুদ ন্যাপস্যাক ছিল, সাক্ষীরা বলেছে।’
‘হলুদ?’ চেনা চেনা লাগছে কেন?
‘ইউএন হিউম্যান রিসোর্স ঐ রিসেপশনিস্টকে ক্যারল গ্যানজ হিসেবে শনাক্ত করেছে।’
‘সেই বাচ্চার মা!’ রাইম আর স্যাক্স একসাথে বলে উঠল।
‘হ্যাঁ। চার্চে যাকে বাঁচিয়েছিলে সেই মহিলা। তবে গ্যানজ একটা ছদ্মনাম। আসল নাম শার্লট উইলোবি। রন উইলোবির বউ ছিল। মনে পড়ছে?’
রাইম বলল মনে পড়ছে না।
‘বছর দুয়েক আগে খবরে এসেছিল। বার্মায় ইউএন পিসকিপিং ফোর্সে অ্যাসাইন করা এক আর্মি সার্জেন্ট ছিল সে।’
‘বলে যাও,’ বলল ক্রিমিনালিস্ট।
‘উইলোবি যেতে চায়নি। সে মনে করত আমেরিকান সৈনিকের ইউএন ইউনিফর্ম পরা উচিত নয় এবং ইউ.এস. আর্মি ছাড়া অন্য কারো হুকুম মানাও ঠিক নয়। আজকাল এটা ডানপন্থীদের বড় ইস্যু। কিন্তু তবুও গিয়েছিল। সপ্তাহখানেকও হয়নি, রেঙ্গুনে এক পুঁচকে ছোকরা তাকে উড়িয়ে দিল। পিঠে গুলি করেছিল। রক্ষণশীলদের শহীদ বনে গেল সে। অ্যান্টি-টেরর বলছে তার বিধবাকে শিকাগো শহরতলির এক উগ্রপন্থী দল রিক্রুট করেছে। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর স্নাতক তারা, আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে।
‘এডওয়ার্ড আর ক্যাথরিন স্টোন।’
তার কথার রেশ ধরল ব্যাংকস। ‘বাচ্চাদের ক্লের প্যাকেটে ছিল বিস্ফোরক, সাথে আরো কিছু খেলনা। আমাদের ধারণা সে ছোট মেয়েটাকে সাথে নিতে চেয়েছিল, যাতে হলের গেটে সিকিউরিটি মাটির ব্যাপারে সন্দেহ না করে। কিন্তু প্যামি হাসপাতালে থাকায় কভার স্টোরিটা খাটল না, তাই হল বাদ দিয়ে স্টোররুমেই প্ল্যান্ট করল। তাতেই যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে।’
‘ভেগেছে?’
‘হ্যাঁ। কোনো চিহ্ন নেই।’
‘আর ছোট মেয়েটা?’ স্যাক্স জিজ্ঞেস করল। ‘প্যামি?’
‘নেই। বিস্ফোরণের সময় মহিলা ওকে হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে। দুজনেই গায়েব।’
রাইম জিজ্ঞেস করল, ‘আর ঐ দলটা?’
‘শিকাগোর গ্রুপটা? ওরাও নেই। উইসকনসিনে একটা সেফ হাউজ ছিল, ওটাও ধুয়েমুছে সাফ। কোথায় আছে জানি না।’
‘তার মানে ডেলরের টিকটিকি ঐ গুজবই শুনেছিল।’ হাসল রাইম। ‘ক্যারলই এয়ারপোর্টে আসছিল। আনসাব ৮২৩-এর সাথে এর কোনো সম্পর্কই ছিল না।’ ব্যাংকস আর সেলিট্টোকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখল সে।
ওহ, সেই পুরোনো নীরবতার চাল আবারো…
‘লন, আমি আর এসবের মধ্যে নেই,’ হাতের কাছে রাখা গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে বলল রাইম। ওকে সম্মোহন করছে যেন ওটা। ‘অসম্ভব।’
ঘর্মাক্ত শার্টটা শরীর থেকে টেনে সরাল বয়স্ক ডিটেকটিভ, কুঁকড়ে গেল। ‘লিংকন, ভয়ানক ঠান্ডা এখানে। যাই হোক, একটু ভেবে দেখো। ক্ষতি কী?’
‘সাহায্য করতে পারব না আমি।’
সেলিটো বলল, ‘একটা নোট ছিল ওখানে। ক্যারল ওটা লিখে ইন্টারঅফিস এনভেলপে সেক্রেটারি জেনারেলের কাছে পাঠিয়েছিল। বিশ্ব সরকার, আমেরিকানদের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া-এসব বালছাল লেখা ছিল ওতে। লন্ডনের ইউনেস্কো বম্বিংয়ের দায়ও স্বীকার করেছে সে, আর বলেছে আরো হামলা হবে। ওদের ধরতেই হবে, লিংক।’
নিজেকে জাহির করার সুযোগ পেয়ে গেল ব্যাংকস। ‘সেক্রেটারি জেনারেল আর মেয়র দুজনেই আপনাকে চেয়েছেন। এসএসি পারকিন্সও। আর হোয়াইট হাউজ থেকেও ফোন আসবে, যদি আরো তোষামোদ দরকার হয়। আশা করি তার দরকার হবে না, ডিটেকটিভ।’
পদমর্যাদা নিয়ে ভুল করায় কোনো মন্তব্য করল না রাইম।
‘ব্যুরোর পিইআরটি টিম রেডি আছে। ফ্রেড ডেলরে কেসটা চালাচ্ছে। অনুরোধ করেছেন আপনাকে। সত্যি বলছি, আপনাকে ফরেনসিক কাজটা দেখতে অনুরোধ করেছেন তিনি। সিনটা অক্ষত একদম, শুধু লাশ আর আহতদের সরানো হয়েছে।’
‘তাহলে ওটা অক্ষত নয়!’ ধমকে উঠল রাইম। ‘নষ্ট হয়ে গেছে সব।’
‘সেজন্যই আপনাকে আরো বেশি দরকার আমাদের, স্যার।’ রাইমের রাগী চাহনি দেখে ‘স্যার’ সম্বোধনটা যোগ করল ব্যাংকস।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল রাইম, গ্লাস আর স্ট্র-এর দিকে তাকাল। শান্তিটা হাতের মুঠোতেই ছিল। আর ব্যথাটাও। দুটোর ভান্ডারই অসীম।
চোখ বন্ধ করল সে। পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে ঘরে।
‘শুধু মহিলা হলে তেমন কোনো ব্যাপার হতো না,’ যোগ করল সেলিট্টো। ‘কিন্তু মেয়েটাও আছে সাথে। আন্ডারগ্রাউন্ডে, ছোট একটা মেয়ের সাথে? জানো ঐ বাচ্চার জীবনটা কেমন হবে?’
তার জন্যও আমি শোধ নেব, লন।
বিলাসবহুল বালিশে মাথা গুঁজল রাইম। অবশেষে চোখ খুলল। ‘কিছু শর্ত আছে।’
‘বলে ফেলো।’
‘প্রথমত,’ সে বলল, ‘আমি একা কাজ করি না।’
অ্যামেলিয়া স্যাক্সের দিকে তাকাল রাইম।
একটু ইতস্তত করল মেয়েটা। তারপর হেসে উঠে দাঁড়াল, স্ট্র-এর নিচ থেকে সরিয়ে নিল বিষাক্ত ব্র্যান্ডির গ্লাসটা। জানালাটা হাট করে খুলে দিল সে। টাউনহাউজের পাশের গলির ভ্যাপসা গরম বাতাসে ছুঁড়ে দিল তামাটে তরলটা। মাত্র কয়েক ফুট দূরের বাজপাখিটা রেগেমেগে তাকাল ওর দিকে। ধূসর মাথাটা কাটল একবার, তারপর আবার ক্ষুধার্ত ছানাকে খাওয়ানোয় মন দিল।
সমাপ্ত
