অধ্যায় দশ
ঘরের মধ্যে কিছু একটা বদলে গেছে, কিন্তু ঠিক ধরতে পারল না সে। তার চোখেমুখে সেই দ্বিধা দেখতে পেল লিংকন রাইম।
‘তোমাকে মিস করছিলাম আমরা, অ্যামেলিয়া,’ সলজ্জ ভঙ্গিতে বলল সে। ‘টুকটাক কাজ ছিল বুঝি?’
চোখ সরিয়ে নিল মেয়েটা। ‘মনে হয় আমার নতুন কমান্ডারকে কেউ জানায়নি যে আজ আমি কাজে যোগ দিচ্ছি না। ভাবলাম কারো তো জানানো উচিত।’
‘আহ, হ্যাঁ।’
দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে ব্যাপারটা বুঝতে পারল অ্যামেলিয়া। মেল কুপারের আনা যন্ত্রপাতির সঙ্গে যোগ হয়েছে এক্স-রে ইউনিটসহ স্ক্যানিং ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ, কাচ পরীক্ষার জন্য নোটেশন আর হট-স্টেজ স্কোপ সেটআপ, কম্পারিজন মাইক্রোস্কোপ, মাটি পরীক্ষার জন্য ডেনসিটি-গ্রেডিয়েন্ট টিউব আর শত শত বিকার, বয়াম আর কেমিক্যালের বোতল। আর ঘরের মাঝখানে আছে কুপারের গর্ব-কম্পিউটারাইজড গ্যাস ক্রোমাটোগ্রাফ আর মাস স্পেকট্রোমিটার। সেই সঙ্গে আরেকটা কম্পিউটার, আইআরডি ল্যাবে কুপারের টার্মিনালের সাথে অনলাইনে যুক্ত ওটা।
নিচতলা থেকে সাপের মতো পেঁচিয়ে উঠে আসা মোটা তারগুলো ডিঙিয়ে এল স্যাক্স। ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ ঠিকই আছে, কিন্তু বেডরুমের আউটলেটগুলো একাই এত লোড নিচ্ছে যে সার্কিটটা প্রায় তার সীমায় পৌঁছে গেছে।
সাবলীল ভঙ্গীতে তাকে পাশ কাটাতে দেখে রাইমের মনে হলো, কী ভীষণ সুন্দরী মেয়েটা! পুলিশ ডিপার্টমেন্টে এর চেয়ে সুন্দরী মেয়ে আর দেখেনি সে। মুহূর্তের জন্য মেয়েটার প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ করল সে। লোকে বলে যৌনতা ব্যাপারটা মনের খেলা। রাইম জানে কথাটা সত্যি। মেরুদণ্ডের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও তাড়না মরে না। দুর্ঘটনার ছয় মাস পরের এক রাতের কথা মনে পড়ে গেল তার। ব্যাপারটা ভাবতেই এখনো শিউরে ওঠে সে।
ব্লেইন আর সে চেষ্টা করেছিল, কী হয় দেখার জন্য। নিজেদের বুঝিয়েছিল, ব্যাপারটা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছিল। আহামরি কিছু নয়। কিন্তু ব্যাপারটা আহামরিই ছিল। এমনিতেই সেক্স বেশ ঝামেলার ব্যাপার, তার উপর ক্যাথেটার আর ইউরিন ব্যাগের সমীকরণ যোগ হলে প্রচুর স্ট্যামিনা আর রসবোধ থাকা চাই। আর ওদের যা ছিল তার চেয়ে শক্ত ভিত দরকার হয় সম্পর্কের।
তবে সব মাটি করে দিয়েছিল ব্লেইনের মুখভঙ্গি। ব্লেইন চ্যাপম্যান রাইমের স্বভাবসুলভ হাসির আড়ালে করুণা দেখতে পেয়েছিল সে, আর ওটাই বুকে বিঁধেছিল তীরের মতো। সপ্তাহ দুয়েক পরেই ডিভোর্সের আবেদন করেছিল লিংকন। ইলেইন প্রতিবাদ করেছিল বটে, কিন্তু প্রথম দফাতেই সই করে দিয়েছিল কাগজে।
ফিরে এসেছে সেলিট্রো আর ব্যাংকস, স্যাক্সের জোগাড় করা আলামতগুলো গুছিয়ে রাখছে তারা। খুবই কম আগ্রহ নিয়ে সবকিছু দেখছে মেয়েটা।
তাকে বলল রাইম, ‘ল্যাটেন্ট ইউনিট মাত্র আটটা সাম্প্রতিক আংশিক ছাপ পেয়েছে, আর ওগুলো দালানের দুই মেইনটেনেন্স কর্মীর।’
‘ওহ।’
জোরালোভাবে মাথা নাড়ল রাইম। ‘মাত্র আটটা!’
‘উনি আপনার প্রশংসাই করছেন,’ বুঝিয়ে দিল টম। ‘উপভোগ করুন। এর চেয়ে বেশি কিছু ওনার পেট থেকে বেরোবে না।’
‘অনুবাদকের দরকার নেই, প্লিজ। আর থ্যাংক ইউ, টম।’
জবাবে অ্যামেলিয়া বলল, ‘সাহায্য করতে পেরে ভালো লাগছে।’ খুব অমায়িক শোনাল গলাটা।
ব্যাপারটা কী?
রাইম ভেবেছিল ঝড় তুলে ঘরে ঢুকবে মেয়েটা, এভিডেন্স ব্যাগগুলো ছুঁড়ে মারবে বিছানায়। হয়তো করাতটা কিংবা ভিকটিমের কাটা হাত ভরতি প্লাস্টিকের ব্যাগটাই ছুঁড়ে মারবে। তুমুল ঝগড়ার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল সে; পঙ্গু মানুষের সাথে ঝগড়া করার সময় লোকে সচরাচর রেয়াত করে না। তার সাথে প্রথম দেখা হওয়ার সময় মেয়েটার চোখের সেই দৃষ্টিের কথা ভাবছিল সে। হয়তো তাদের দুজনের মধ্যে কোনো অস্পষ্ট মিল খুঁজে পেয়েছে মেয়েটা। কিন্তু না, এখন দেখল তার ধারণা ভুল ছিল। অ্যামেলিয়া স্যাক্স আর সবার মতোই-মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে পালানোর পথ খুঁজছে।
মট করে শব্দ হলো যেন, বরফ হয়ে গেল তার হৃৎপিণ্ড। উল্টো দিকের দেয়ালের উপরের দিকে ঝুলে থাকা মাকড়সার জালের দিকে তাকিয়ে মুখ খুলল সে। ‘পরবর্তী ভিকটিমের সময়সীমার ব্যাপারে কথা বলছিলাম আমরা, অফিসার। নির্দিষ্ট কোনো সময়ের উল্লেখ নেই।’
‘আমাদের ধারণা,’ যোগ করল সেলিট্টো, ‘পরের জনের জন্য এই শয়তান যাই প্ল্যান করে থাকুক না কেন, সেটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। মৃত্যুর সময়টা ঠিক কখন হবে সেটা সে নিজেও জানে না। লিংকনের ধারণা কোনো হতভাগাকে এমন জায়গায় কবর দিয়েছে যেখানে বাতাস খুব কম।’
এ কথায় চোখ সামান্য কুঁচকে গেল স্যাক্সের। লক্ষ্য করল রাইম।
জ্যান্ত কবর। ফোবিয়া হিসেবে এটা মন্দ নয়।
এমন সময় ধূসর স্যুট পরা দুজন লোক সিঁড়ি ভেঙে এমনভাবে ঘরে ঢুকল যেন এটাই তাদের বাড়ি।
‘আমরা নক করেছিলাম,’ বলল একজন।
‘বেলও বাজিয়েছিলাম,’ বলল অন্যজন।
‘সাড়া মেলেনি।’
দুজনেই চল্লিশের কোঠায়। একজন অন্যজনের চেয়ে লম্বা কিন্তু দুজনের চুলই বালিরঙা। একই রকম হাসি ঝুলছে মুখে, ব্রুকলিনের টানে কথা বলার আগেই রাইমের মনে এল কথাটা: গেঁও ভূত। একজনের ফ্যাকাশে নাকের উপর বাদামি দাগ পর্যন্ত আছে।
‘জেন্টলমেন।’
হার্ডি বয়েজ-এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিল সেলিট্টো: ডিটেকটিভ বেডিং আর সল, স্প্যাডওয়ার্ক টিম। ক্রাইম সিনের আশেপাশে জিজ্ঞাসাবাদ করায় ওস্তাদ এরা। এটা একটা শিল্প, কিন্তু রাইম কখনোই শিখতে চায়নি এসব। কঠিন সব তথ্য খুঁজে বের করে এদের মতো অফিসারদের হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকত সে, আর সেই তথ্যের জোরে জ্যান্ত লাই-ডিটেক্টর হয়ে উঠত এরা, আসামির সাজানো গল্পে ছিদ্র বের করত অনায়াসে।
বিছানায় পড়ে থাকা এক সিভিলিয়ানের কাছে রিপোর্ট করতে হচ্ছে দেখে এদের বিন্দুমাত্রও অস্বস্তি হচ্ছে বলে মনে হলো না।
দাগওয়ালা, লম্বাটে সল বলল, ‘ছত্রিশজনকে পেয়েছি আমরা…’
‘…আটত্রিশ, যদি গুটিকয়েক নেশাখোরকে ধরো। ও ধরে না। আমি ধরি।’
‘…সন্দেহভাজন। সবার ইন্টারভিউ নিয়েছি। খুব একটা সুবিধা হয়নি। বেশিরভাগই অন্ধ, বোবা, নয়তো স্মৃতিভ্রষ্ট। মানে, যা হয় আর কি।’
‘ট্যাক্সিটার কোনো খোঁজ নেই। ওয়েস্ট সাইড চষে ফেলেছি। কিচ্ছু নেই।’
বেডিং বলল, ‘তবে সুখবরটা বলো ওদের।’
‘একটা সাক্ষী পেয়েছি আমরা।’
‘সাক্ষী?’ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল ব্যাংকস। ‘ফ্যান-টাসটিক।’
অতটা উচ্ছ্বাস দেখাল না রাইম, বলল, ‘বলে যাও।’
‘আজ সকালে রেললাইনের ঐ ঘটনার সময়।’
‘লোকটা দেখেছে একজন ইলেভেনথ অ্যাভিনিউ দিয়ে হেঁটে গিয়ে বাঁক নিল…’
‘সাক্ষীর মতে, একদম হঠাৎ করেই,’ যোগ করল ফ্রিকলস-হীন বেডিং।
‘…ট্রেন আন্ডারপাসের দিকে যাওয়া এক গলির ভেতর ঢুকে পড়ল। কিছুক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে ছিল সে…’
‘নিচের দিকে তাকিয়ে।’
ব্যাপারটা খচখচ করছে রাইমের মনে। ‘আমাদের খোকাবাবু-র স্বভাবের সাথে মিলছে না। এভাবে মানুষজনের চোখে পড়ার ঝুঁকি নেওয়ার মতো বোকা সে নয়।’
‘কিন্তু…’ বলে চলল সল, আঙুল তুলে তাকাল পার্টনারের দিকে।
‘পুরো পাড়ায় একটাই জানালা ছিল যেখান থেকে ঐ জায়গাটা দেখা যায়।’
‘আর আমাদের সাক্ষী ঠিক ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিল।’
‘বেশ ভোরবেলাতেই উঠেছিল সে, বেঁচে থাকুক বেচারা।’
মেয়েটার উপর রাগ করার কথা মনে পড়েনি এখনো রাইমের, তার আগেই জিজ্ঞেস করে বসল, ‘তা অ্যামেলিয়া, কেমন লাগছে শুনে?’
‘মানে ?’ জানালা থেকে মনোযোগ ফেরাল সে।
‘ঠিক বলতে পেরে কেমন লাগছে?’ বলল রাইম। ‘থার্টি-সেভেনথ নয়, ইলেভেনথ অ্যাভিনিউয়ের কথাই ঠিক বলেছিলে তুমি।’
কী জবাব দেবে বুঝতে পারল না মেয়েটা। রাইম ততক্ষণে আবার যমজদের দিকে ফিরেছে। ‘বর্ণনা?’
‘সাক্ষী খুব একটা বলতে পারল না।’
‘নেশার ঘোরে ছিল। সকালবেলাতেই।’
‘বলল লোকটার নাকি বেঁটেখাটো গড়ন। চুলের রং বোঝা যায়নি। গায়ের রং-‘
‘সম্ভবত ফর্সা।’
‘পরনে?’ জানতে চাইল রাইম।
‘কালো কিছু। এর বেশি বলতে পারল না।’
‘আর করছিল কী?’ জিজ্ঞেস করল সেলিট্টো।
‘ও যা বলছিল তাই বলছি আমি। “লোকটা দাঁড়িয়ে ছিল কেবল, নিচের দিকে তাকিয়ে। মনে হচ্ছিল লাফ দেবে বুঝি। ট্রেনের সামনে আর কি। কয়েকবার ঘড়ির দিকেও তাকাল।” তারপর চলে গেল। সাক্ষী বলল সে নাকি বারবার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল। যেন কেউ দেখে ফেলার ভয়ে ছিল।’
কী করছিল সে? ভাবল রাইম। ভিকটিমের মৃত্যু দেখছিল? নাকি লাশ ফেলার আগেই জায়গাটা জনশূন্য কি না তা চেক করছিল?
সেলিট্টো জিজ্ঞেস করল, ‘হেঁটে এসেছিল নাকি গাড়িতে?’
‘হেঁটে। আমরা প্রতিটা পার্কিং লট চেক করেছি…’
‘আর গ্যারেজ।’
‘…আশেপাশের সব। কিন্তু ওটা কনভেনশন সেন্টারের কাছে বলে প্রচুর পার্কিং। এত লট যে অ্যাটেনডেন্টরা রাস্তায় কমলা পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে গাড়ি ডাকে।’
‘আর এক্সপোর কারণে সাতটার মধ্যেই অর্ধেক ভরে গিয়েছিল। প্রায় নয়সো গাড়ির নম্বরের লিস্ট পেয়েছি আমরা।’
মাথা নাড়ল সেলিটো। ‘খোঁজ নাও…’
‘কাজ চলছে,’ বলল বেডিং।
‘…তবে বাজি ধরে বলতে পারি এই আনসাব পার্কিং লটে গাড়ি রাখবে না,’ বলে চলল ডিটেকটিভ। ‘কিংবা পার্কিং টিকেটও খাবে না।’
মাথা নেড়ে সায় দিল রাইম, জিজ্ঞেস করল, ‘পার্ল স্ট্রিটের দালানটা?’
যমজদের একজন, বা দুজনেই বলল, ‘লিস্টে ওটাই পরের কাজ। আমরা যাচ্ছি ওদিকে।’
রাইম দেখল নিজের ঘড়ি চেক করছে স্যাক্স, ফর্সা কবজিতে বসে আছে ঘড়িটা, লাল টকটকে আঙুলগুলোর কাছেই।
টমকে নির্দেশ দিল আনসাবের প্রোফাইল চার্টে নতুন বৈশিষ্ট্যগুলো যোগ করতে।
‘লোকটার ইন্টারভিউ নিতে চাও?’ জিজ্ঞেস করল ব্যাংকস। ‘রেললাইনের ঐ সাক্ষী?’
‘না। সাক্ষীদের আমি বিশ্বাস করি না,’ গুরুগম্ভীর গলায় বলল রাইম। ‘কাজে ফিরতে চাই আমি।’ তাকাল মেল কুপারের দিকে।
‘চুল, রক্ত, হাড় আর কাঠের টুকরো। হাড়টা আগে দেখো,’ নির্দেশ দিল রাইম।
মরগেন…
ঝুলে পড়া বিছানায় চোখ মেলল তরুণী মনেল গ্যারগার, ধীরে ধীরে উঠে বসল। পূর্ব গ্রিনউইচ ভিলেজে দুই বছর থাকার পরেও সকালবেলার সাথে মানিয়ে নিতে পারেনি সে। একুশ বছর বয়সি গোলগাল শরীরটা সামনে ঝুঁকতেই জানালার ফাঁক গলে নির্মম আগস্টের রোদ এসে বিঁধল তার ঘোলাটে চোখে।
‘মাইন গট…’
ক্লাব থেকে বেরিয়েছিল পাঁচটায়, বাড়ি ফিরেছে ছয়টায়, ব্রায়ানের সাথে মাখামাখি করেছে সাতটা পর্যন্ত…
কয়টা বাজে এখন? ভোর হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। চোখ কুঁচকে ঘড়ি দেখল সে। ওহ। বিকেল সাড়ে চারটা। অতটাও ফুহ মরগেনস বা ভোরবেলা নয় তাহলে।
কফি খাবো নাকি কাপড় ধোবো?
দিনের এই সময়টায় সাধারণত ডোজো’স-এ গিয়ে ভেজি-বার্গার আর তিন কাপ কড়া কফি খায় সে। ওখানে চেনা লোকজনের দেখা মেলে, তার মতো ক্লাব-পাগল সব-ডাউনটাউনের লোক। কিন্তু ইদানীং অনেক কিছুই ছেড়ে দিয়েছে সে, সাংসারিক কাজকর্মে মন দিয়েছে। তাই ঢিলেঢালা দুটো টি-শার্ট চড়াল গায়ে, তার মেদবহুল শরীর আর জিনসটা ঢাকা পড়ে যাতে। গলায় পাঁচ-ছয়টা চেইন পরে লন্ড্রি বাস্কেটটা তুলে নিয়ে তার উপর উইল্ক ডিটারজেন্টটা ছুঁড়ে দিল।
দরজার তিনটা ডেড বোল্ট খুলল মনেল। লন্ড্রি বাস্কেটটা কাঁধে তুলে রেসিডেন্স হলের অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল। বেসমেন্টের তলায় এসে থামল সে।
ইরগেনডওয়াস স্টিমট হিয়ার নিস্ট (এখানে কিছু একটা ঠিক নেই)।
অস্বস্তি বোধ করল মনেল, জনমানবহীন সিঁড়ি আর আবছা করিডরের দিকে তাকাল। কী দেখে খটকা লাগছে মনে? বাতিগুলো, তাই তো! হলের বাতিগুলো ফিউজ হয়ে গেছে। না-ভালো করে দেখল সে-ওগুলো নেই। খুলে নিয়ে গেছে। ফাজিল বাচ্চাগুলো হাতের কাছে যা পায় তাই চুরি করে। অথচ এটা জার্মান আর্টিস্ট আর মিউজিশিয়ানদের স্বর্গরাজ্য ভেবেই এসেছিল সে। এসেই বুঝেছে এটাও ইস্ট ভিলেজের আর দশটা নোংরা, অতিরিক্ত ভাড়াওয়ালা বস্তি ছাড়া কিছু নয়। একমাত্র তফাত হলো, ম্যানেজারের সাথে নিজের মাতৃভাষায় ঝগড়া করতে পারে সে।
বেসমেন্টের দরজা দিয়ে ইনসিনারেটর রুমে ঢুকল সে, এতটাই অন্ধকার যে দেয়াল হাতড়ে এগোতে হলো যাতে মেঝের জঞ্জালে হোঁচট না খায়। দরজা ঠেলে লন্ড্রি রুমের করিডরে পা দিল সে।
পায়ের শব্দ। দ্রুত সরে যাওয়ার আওয়াজ।
ঝট করে ঘুরল সে, কিন্তু স্থির ছায়া ছাড়া আর কিছুই দেখল না। কেবল রাস্তার গাড়ির আওয়াজ আর পুরোনো দালানের গোঙানি। আবছা অন্ধকারের ভেতর দিয়ে এগোল। বাক্সের স্তূপ আর ভাঙা চেয়ার-টেবিলের পাশ কাটিয়ে। তেলচিটচিটে ধুলোমাখা তারের নিচ দিয়ে। লন্ড্রি রুমের দিকে এগিয়ে চলল মনেল। এখানেও বাল্ব নেই।
অস্বস্তি হচ্ছে তার, বহু বছর আগের একটা কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। বাবার সাথে চিড়িয়াখানায় যাওয়ার পথে ল্যাঞ্জ স্ট্রাসের সরু গলি দিয়ে হাঁটছিল, ওবারমেইন ব্রুকের কাছে। বয়স তখন পাঁচ বা ছয় হবে। বাবা হঠাৎ তার কাঁধ শক্ত করে ধরে ব্রিজের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছিলেন, ওটার নিচে এক ক্ষুধার্ত ট্রল থাকে। ফেরার পথে যখন ব্রিজটা পার হবে, তখন খুব জোরে হাঁটতে হবে, সাবধান করে দিয়েছিলেন তিনি।
মেরুদণ্ড বেয়ে ভয়ের একটা স্রোত উঠে এল তার ছোট করে ছাঁটা সোনালি চুলে। বোকা কোথাকার। ট্রল…
ভ্যাপসা করিডর ধরে এগিয়ে চলল সে, কোনো একটা ইলেকট্রিক যন্ত্রের ভনভন শব্দ শুনতে পাচ্ছে। দূরে ওয়েসিস ব্যান্ডের বিবাদমান ভাইদের গান বাজছে কোথাও। লন্ড্রি রুমটা অন্ধকার। বাল্বগুলো যদি না থাকে, তবে আজ আর কাপড় ধোয়া হবে না। উপরে গিয়ে হের নাইশেনের দরজায় এমন কিল মারবে যে ব্যাটা দৌড়ে আসবে। সামনের আর পেছনের দরজার ভাঙা ছিটকিনি আর বিয়ার-খোর ছোকরাগুলোকে সদর দরজা থেকে না তাড়ানোর জন্য এমনিতেই লোকটাকে ধুয়ে দিয়েছে সে। বাল্ব চুরির জন্যও ঝাড়বে আজ।
ভেতরে হাত বাড়িয়ে সুইচটা টিপল সে।
উজ্জ্বল সাদা আলো। সূর্যের মতো জ্বলে উঠল তিনটা বড় বাল্ব, দেখা গেল নোংরা কিন্তু জনশূন্য ঘরটা। চারটা মেশিনের সারির দিকে এগিয়ে গেল মনেল, একটায় সাদা আর অন্যটায় রঙিন কাপড়গুলো ঢালল। খুচরো পয়সা গুনল। স্লটে ফেলে লিভারটা সামনে ঠেলল।
কিছুই হলো না।
লিভারটা নাড়াচাড়া করল সে। তারপর মেশিনের গায়েই বাড়ি মারল একটা। কোনো সাড়াশব্দ নেই।
‘শিট। ঘোড়ার ডিমের জায়গা।’
তারপরই পাওয়ার কর্ডটা নজরে পড়ল তার। কোনো গাধা প্লাগ খুলে রেখেছে। সে জানে কে। নাইশেনের বারো বছরের ছেলেটা হবে, দালানের যত নষ্টের গোড়া ঐ বিচ্ছুটা। গত বছর কোনো একটা ব্যাপারে নালিশ করায় বিচ্ছুটা তাকে লাথি মারার চেষ্টা করেছিল। তারটা তুলে নিয়ে উবু হয়ে বসল সে, আউটলেট খোঁজার জন্য মেশিনের পেছনে হাত বাড়াল। তারপর প্লাগটা ঢুকিয়ে দিল।
আর তখনই ঘাড়ের উপর অনুভব করল লোকটার নিঃশ্বাস।
‘নাইন!’ (না!)
দেয়াল আর ওয়াশিং মেশিনের মাঝখানে চ্যাপ্টা হয়ে লুকিয়ে ছিল লোকটা। চিৎকার করে ওঠার আগেই এক ঝলক স্কি-মাস্ক আর কালো পোশাক দেখতে পেল সে, তারপর জানোয়ারের চোয়ালের মতো তার বাহুটা কামড়ে ধরল লোকটার হাত। ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল সে, সহজেই তাকে সামনে হেঁচড়ে আনল লোকটা। মেঝের উপর আছড়ে পড়ল, অমসৃণ কংক্রিটে ঠুকে গেল মুখ, গলার ভেতর দলা পাকিয়ে আটকে গেল চিৎকার।
মুহূর্তের মধ্যে তার উপর চেপে বসল লোকটা, কংক্রিটের সাথে তার হাতদুটো চেপে ধরল, মুখের উপর সেঁটে দিল মোটা ধূসর রঙের টেপ।
হিলফে! (বাঁচাও!)
নাইন, বিট্টে নিস্ট। (না, প্লিজ না।)
বিট্টে নিস্ট।
লোকটা খুব একটা বড়সড়ো নয়, কিন্তু গায়ে প্রচণ্ড জোর। সহজেই তাকে উল্টে উপুড় করে দিল সে, হাতকড়া লাগানোর ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ পেল মনেল।
তারপর উঠে দাঁড়াল লোকটা। দীর্ঘক্ষণ কোনো শব্দ নেই, কেবল পানি পড়ার টুপটুপ আওয়াজ, মনেলের খসখসে নিঃশ্বাস আর বেসমেন্টের কোথাও একটা ছোট্ট মোটরের ক্লিক ক্লিক শব্দ। অপেক্ষা করছে কখন গায়ে হাত দেবে লোকটা, ছিঁড়ে ফেলবে তার জামাকাপড়। পায়ের শব্দে বুঝল লোকটা দরজার দিকে গেছে, কেউ আছে কি না দেখে আসতে। ওহ, কেউ কোথাও নেই। সে জানে, নিজের উপরই রাগ হলো তার; এই লন্ড্রি রুমটা সে ছাড়া আর কেউ ব্যবহার করে না বললেই চলে। বেশিরভাগই এড়িয়ে চলে কারণ জায়গাটা বড্ড নির্জন, পেছনের দরজা আর জানালার খুব কাছে, আর সাহায্য পাওয়ার মতো জায়গা থেকে অনেক দূরে।
ফিরে এল লোকটা, তাকে চিত করে শোয়াল। ফিসফিস করে কিছু একটা বলল যা বুঝতে পারল না সে। তারপর বলল, ‘হ্যানা।’
হ্যানা?
ভুল হচ্ছে। ও আমাকে অন্য কেউ ভাবছে। জোরে জোরে মাথা নাড়ল সে, লোকটাকে বোঝানোর চেষ্টা করল। কিন্তু তারপর, ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল সে। স্কি-মাস্ক পরা থাকলেও এটা বুঝতে বাকি রইল না যে কোথাও একটা গন্ডগোল হয়েছে।
লোকটা হতাশ। তার আপাদমস্তক দেখল সে, মাথা নাড়ছে। গ্লাভস-পরা আঙুল দিয়ে তার মোটা বাহুটা খামচে ধরল। চাপ দিল ভারী কাঁধে, চিমটি কাটল চর্বিতে। ব্যথায় শিউরে উঠল সে। তাকে নিয়ে হতাশ লোকটা। তাকে ধরেছে বটে, কিন্তু এখন আর কী করবে বুঝতে পারছে না।
পকেটে হাত দিল লোকটা, তারপর ধীরে ধীরে বের করে আনল তার হাত। খটাস করে ছুরি খোলার শব্দটা শুনে মনেলের মনে হলো, ইলেকট্রিক শক দিয়েছে ওকে কেউ। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে।
নাইন, নাইন, নাইন!
শীতের গাছে বাতাসের শিসের মতো দাঁতের ফাঁক দিয়ে হিসহিস করে শ্বাস ফেলল লোকটা। তার উপর ঝুঁকে আছে, ভাবছে।
‘হ্যানা,’ ফিসফিস করে বলল সে। ‘কী করি এখন তোমাকে নিয়ে?’
তারপর হঠাৎই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল সে। ছুরিটা রেখে দিল। এক ঝটকায় তাকে পায়ে দাঁড় করিয়ে করিডর দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে চলল পেছনের দরজার দিকে, যেটার ভাঙা তালা সারানোর জন্য হের নাইশেনকে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে জ্বালিয়ে মারছে মনেল।
