১. এক দিনের রাজা
২. লোকার্ডের নীতি
৩. দ্য পোর্টেবলস ডটার
8. ডাউন টু দ্য বোন
৫. নড়াচড়ার উপর থাকলে ওরা তোমায় ধরতে পারবে না

দ্য বোন কালেক্টর – ৩৪

অধ্যায় চৌত্রিশ

কপালে কিছু একটা লাগল। জোরে। ধপ করে শব্দটা টের পেল কিন্তু ব্যথা পেল না। কী, কী? ওর বেলচা? ইট? হয়তো এক মুহূর্তের দয়ায় ৮২৩ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে এই ধীর মৃত্যু অসহ্য এবং শিরা কেটে ফেলার জন্য গলায় আঘাত করছে। আরেকটা আঘাত। আরেকটা। চোখ খুলতে পারছে না, কিন্তু চারপাশে আলো বাড়তে দেখল সে। রং। আর বাতাস। মুখের ভেতর থেকে মাটির দলাটা ঠেলে বের করে দিল সে আর ছোট ছোট শ্বাস নিল, যতটুকু নিতে পারে। জোরে কাশতে শুরু করল, ওয়াক করে থুতু ফেলল।

চোখের পাতা খুলে গেল তার। অশ্রুসজল চোখে লন সেলিট্টোর কাদামাখা চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল স্যাক্স। তার উপর ঝুঁকে আছে সে। পাশে দুজন ইএমএস মেডিক, যাদের একজন ল্যাটেক্স পরা আঙুল দিয়ে তার মুখের ভেতর থেকে আরো গাদ বের করে আনছে, অন্যজন অক্সিজেন মাস্ক আর সবুজ ট্যাংক তৈরি করছে। সেলিট্টো আর ব্যাংকস তার শরীর থেকে মাটি সরাতে লাগল, পেশিবহুল হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে। তাকে টেনে তুলল তারা, খোলসের মতো রোবটা ওখানেই পড়ে রইল। সেলিট্টো, পুরোনো দিনের ডিভোর্সি লোক, ভদ্রভাবে চোখ সরিয়ে নিল তার শরীর থেকে, কাঁধে জ্যাকেট পরিয়ে দিল। তরুণ জেরি ব্যাংকস অবশ্য তাকাল, কিন্তু তাতেও তার উপর রাগ করল না অ্যামেলিয়া।

‘আপনারা…কি…?’ জোরে কাশির দমক আসায় হাল ছেড়ে দিল সে।

প্রত্যাশা নিয়ে ব্যাংকসের দিকে তাকাল সেলিট্টো, দুজনকে একটু বেশিই হাঁপাতে দেখা যাচ্ছে। আনসাবের পেছনে নিশ্চয়ই ও-ই সবচেয়ে বেশি দৌড়েছে। তরুণ ডিটেকটিভ মাথা নাড়ল। ‘পালিয়েছে।’

উঠে বসে কিছুক্ষণ অক্সিজেন নিল সে।

‘কীভাবে?’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল সে। ‘জানলেন কী করে?’

‘রাইম,’ উত্তর দিল সে। ‘কীভাবে তা জিজ্ঞেস করবেন না। টিমের সবার জন্য ১০-১৩ কল করেছিল সে। আমরা ঠিক আছি শোনার পর যত দ্রুত সম্ভব এখানে পাঠিয়ে দিল।’

তারপর অবশ ভাবটা কেটে গেল চট করে, এক পলকে। আর প্রথমবারের মতো ও বুঝতে পারল কী হতে যাচ্ছিল। অক্সিজেন মাস্কটা ফেলে দিল সে, আতঙ্কে পিছিয়ে গেল। পানি গড়িয়ে পড়ছে চোখ দিয়ে, আতঙ্কের আর্তনাদ ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।

‘না, না, না…’ হাত আর উরুতে থাপড়াচ্ছে, উন্মাদপ্রায়, মৌমাছির ঝাঁকের মতো লেপটে থাকা বিভীষিকাটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছে। ‘ওহ খোদা, ওহ…না…’

‘স্যাক্স?’ চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল ব্যাংকস। ‘হেই, স্যাক্স?’

পার্টনারকে সরিয়ে দিল বয়স্ক ডিটেকটিভ। ‘সব ঠিক আছে।’ তার কাঁধে হাত রাখল সেলিটো।

হামাগুড়ি দিয়ে বসে গলগল করে বমি করে ফেলল স্যাক্স। ফোঁপানি থামাতে পারছে না। মাটিকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরেছে যেন ওটার গলা টিপে মারতে চায়। অবশেষে শান্ত হলো ও। নগ্ন নিতম্বের উপর ভর দিয়ে বসল। এরপর হাসতে শুরু করল। প্রথমে আস্তে। তারপর দম ফাটিয়ে, অনেকটা হিস্টিরিয়া রোগীর মতো। অবাক হয়ে দেখল আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে-বিশাল বিশাল গরম ফোঁটা-অথচ ও টেরও পায়নি।

তার কাঁধ জড়িয়ে ধরে আছে স্যাক্স। মুখের সাথে মুখ লাগিয়ে রেখেছে। দীর্ঘক্ষণ ওভাবেই রইল তারা। তারপর ক্লিনিট্রন থেকে সরে গিয়ে কোনা থেকে একটা পুরোনো আর্মচেয়ার টেনে আনল মেয়েটা। এরপর ধপাস করে চেয়ারটায় বসল। নেভি সোয়েটপ্যান্ট আর হান্টার কলেজ টি-শার্ট গায়ে। স্কুলের মেয়ের মতো হাতলের উপর তার চমৎকার পাদুটো ঝুলিয়ে দিল।

‘আমরাই কেন, রাইম? আমাদের পেছনে লাগল কেন ও?’ মাটি গেলার কারণে ওর গলাটা খসখসে হয়ে গেছে।

‘কারণ ও যাদের কিডন্যাপ করেছে, তারা আসল ভিকটিম নয়। ওর শত্রু হলাম আমরা।’

‘আমরা কারা?’ জানতে চাইল সে।

‘আমি নিশ্চিত নই। সমাজ হতে পারে। বা শহর। বা ইউএন। পুলিশ। আমি ওর বাইবেলটা আবার পড়েছি-জেমস স্লাইডারের চ্যাপ্টারটা। কুগুলো কেন রেখে যাচ্ছে সে ব্যাপারে টেরির থিওরিটা মনে আছে?’

সেলিট্টো বলল, ‘আমাদের অনেকটা সহযোগী বানানোর মতো। অপরাধবোধ ভাগ করে নেওয়ার জন্য। যাতে খুন করাটা সহজ হয়।’

মাঠা নাড়ল রাইম। বলল, ‘আমার অবশ্য তা মনে হয় না। কুগুলো সম্ভবত আমাদের আক্রমণ করার একটা উপায়। প্রতিটি মৃত ভিকটিম ছিল আমাদের পরাজয়।’ পুরোনো পোশাকে, পনিটেইল করা চুলে স্যাক্সকে গত দুদিনের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সুন্দর লাগছে আজ। কিন্তু তার চোখদুটো টিনের মতো স্থির। মাটির কথা আবার মনে করছে সে, ভাবল রাইম। ওর জ্যান্ত কবর হওয়ার ব্যাপারটা মনে আসায় এতই অস্বস্তি লাগল যে চোখ সরিয়ে নিতে বাধ্য হলো সে।

‘আমাদের বিরুদ্ধে ওর কী ক্ষোভ?’ জানতে চাইল মেয়েটা।

‘জানি না। স্লাইডারের বাবা ভুল করে গ্রেপ্তার হয়েছিল আর জেলে মারা গিয়েছিল। কিন্তু আমাদের আনসাব? কে জানে কেন? আমি শুধু এভিডেন্স নিয়ে ভাবি-‘

‘-মোটিভ নিয়ে নয়।’ বাক্যটা শেষ করল অ্যামেলিয়া স্যাক্স।

‘সরাসরি আমাদের উপর হামলা করতে এল কেন?’ স্যাক্সের দিকে মাথা নেড়ে জিজ্ঞেস করল ব্যাংকস।

‘কারণ আমরা ওর আস্তানা খুঁজে পেয়েছি, আর বাচ্চা মেয়েটাকে বাঁচিয়েছি। মনে হয় না ও এত তাড়াতাড়ি আমাদের আশা করেছিল। হয়তো ক্ষেপে গিয়েছিল। লন, আমাদের সবার জন্য চব্বিশ ঘণ্টা পাহারার ব্যবস্থা করতে হবে। বাচ্চাটাকে বাঁচানোর পর সে পালিয়ে যেতে পারত, কিন্তু ক্ষতি করার জন্য থেকে গিয়েছিল। তুমি আর জেরি, আমি, কুপার, হাউম্যান, পোলিং-আমরা সবাই ওর লিস্টে আছি, বাজি ধরতে পারি। আপাতত পেরেত্তির ছেলেদের স্যাক্সের ওখানে পাঠাও। আমি নিশ্চিত ও জায়গাটা পরিষ্কার রেখেছে, কিন্তু কিছু হয়তো পাওয়া যেতে পারে। প্ল্যানের চেয়ে অনেক দ্রুত কেটে পড়তে হয়েছে ওকে।’

‘ওখানে যাওয়া দরকার আমার,’ বলল স্যাক্স।

‘না,’ বলল রাইম।

‘সিনটা নিয়ে কাজ করতে হবে আমাকে।’

‘তোমাকে বিশ্রাম নিতেই হবে, স্যাক্স,’ আদেশ দিল সে। ‘কিছু মনে কোরো না, তোমাকে জঘন্য দেখাচ্ছে।’

‘হ্যাঁ, অফিসার,’ বলল সেলিট্রো। ‘এটা আমাদের অর্ডার। দিনের বাকি সময়ের জন্য ছুটি তোমার। দুইশো লোক খুঁজছে ওকে। আর ফ্রেড ডেলরের হাতে আছে আরো একশো কুড়িজন ফেবি।’

‘আমার নিজের উঠোনে ক্রাইম সিন আর আপনারা আমাকে গ্রিড ধরে হাঁটতে দেবেন না?’

‘এককথায় তাই,’ বলল রাইম।

দরজার দিকে এগোল সেলিট্টো। ‘কোনো সমস্যা আছে, অফিসার?’

‘নো, স্যার।’

‘চলো, ব্যাংকস, কাজ আছে। লিফট লাগবে, স্যাক্স? নাকি ওরা এখনো তোমাকে গাড়ি চালাতে দিচ্ছে?’

‘না, ধন্যবাদ, নিচে গাড়ি আছে,’ বলল সে।

দুই ডিটেকটিভ চলে গেল। খালি হলওয়েতে ওদের গলার প্রতিধ্বনি শুনতে পেল রাইম। তারপর দরজা বন্ধ হতেই চলে গেল তারা। রাইম খেয়াল করল মাথার উপরের কড়া আলোগুলো জ্বলছে। কয়েকটা কমান্ড দিয়ে আলো কমিয়ে দিল সে।

আড়মোড়া ভাঙল স্যাক্স। ‘বেশ,’ বলল সে।

ঠিক তখনই রাইম বলল, ‘তাহলে।’

ঘড়ির দিকে তাকাল মেয়েটা। ‘দেরি হয়ে গেছে।’

‘তা তো বটেই।’

উঠে দাঁড়াল অ্যামেলিয়া, টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল যেখানে তার পার্স রাখা। তুলে নিল ওটা। খুলল, প্রসাধন বাক্স বের করে আয়নায় কাটা ঠোঁটটা দেখল।

‘খুব একটা খারাপ লাগছে না,’ বলল রাইম।

‘ফ্রাংকেনস্টাইন,’ ব্যঙ্গ করে বলল স্যাক্স। ‘ওরা চামড়ার রঙের সেলাই ব্যবহার করে না কেন?’ আয়নাটা রেখে দিল সে, কাঁধে ঝোলাল পার্সটা। ‘বিছানাটা সরিয়েছ।’ খেয়াল করল মেয়েটা। জানালার কাছে আনা হয়েছে ওটা।

‘টম করেছে। ইচ্ছামতো পার্ক দেখতে পারি যাতে।’

‘ভালোই তো।’ জানালার কাছে গেল সে। নিচে তাকাল।

खोদার দোহাই, অ্যামেলিয়া, মনে মনে ভাবল রাইম। বলেই ফেলো। কী আর হবে? তারপর হড়বড় করে নিজেই বলে ফেলল, ‘থাকতে চাও এখানে? মানে, রাত হয়ে গেছে। আর ল্যাটেন্টস তোমার ওখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ডাস্টিং করবে।’

ভেতরে এক পাগলাটে প্রত্যাশা অনুভব করল রাইম। ধুর, বাদ দাও ওসব, ভাবল সে। নিজের উপরই রাগ হলো। অ্যামেলিয়ার মুখের হাসিতে রাগ চলে গেল অবশ্য। ‘থাকতে পারলে ভালোই লাগত।’

‘গুড।’ অ্যাড্রেনালিনে কাঁপছে তার চোয়াল। ‘চমৎকার। টম!’ গান শুনবে, একটু স্কচ খাবে। হয়তো বিখ্যাত সব ক্রাইম সিনের গল্প আরো শোনাতে পারবে অ্যামেলিয়াকে। মেয়েটা তার বাবার ব্যাপারে কৌতূহলী, ইতিহাস আর ষাট-সত্তর দশকের পুলিশের কাজ নিয়ে কথা বলা যাবে। পুরোনো দিনের কুখ্যাত মিডটাউন সাউথ প্রিসিংক্ট নিয়েও। চিৎকার করে উঠল রাইম, ‘টম! চাদর বের করো। আর একটা কম্বল। টম! ব্যাটা করছেটা কী কে জানে। টম!’

স্যাক্স কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু দরজায় উদিত হলো সহকারী এবং ঝাঁঝালো গলায় বলল, ‘অভদ্রভাবে একবার ডাকলেই হয়, এতবার ডাকা লাগে না।’

‘অ্যামেলিয়া আবারো থাকছে। সোফার জন্য কিছু কম্বল আর বালিশ দিতে পারবে?’

‘না, সোফায় আর নয়,’ বলল স্যাক্স। ‘পাথরের উপর ঘুমানোর মতো লাগে।’

প্রত্যাখ্যাত হওয়ার খোঁচা খেল রাইম। দুঃখের সাথে ভাবল, কয়েক বছর হলো এই অনুভূতিটা হয়নি। হাল ছেড়ে দিয়ে হাসল সে, বলল, ‘নিচে একটা বেডরুম আছে। টম তৈরি করে দিতে পারবে।’

কিন্তু পার্সটা নামিয়ে রাখল স্যাক্স। ‘ইটস ওকে, টম। দরকার নেই।’

‘কোনো ঝামেলা না।’

‘ইটস অল রাইট। গুড নাইট, টম।’ দরজার দিকে এগোল মেয়েটা। ‘মানে, আমি…’

হাসল মেয়েটা।

‘কিন্তু…’ বলতে শুরু করল টম। প্রথমে অ্যামেলিয়ার দিকে তাকাল, তারপর রাইমের দিকে, যে এখন কুঁচকে মাথা নাড়াচ্ছে।

‘গুড নাইট, টম,’ দৃঢ় গলায় বলল মেয়েটা। ‘পা সামলে।’ টম ওপাশে সরে যেতেই দরজাটা আস্তে করে বন্ধ করে দিল। তারপর জোরে লক করার শব্দ হলো।

জুতো খুলে ফেলল স্যাক্স, সোয়েটপ্যান্ট আর টি-শার্টও। লেসের ব্রা আর ঢিলেঢালা সুতির প্যান্টি পরা সে। রাইমের পাশে ক্লিনিট্রনে উঠে এল সাবলীলভাবে। কোনো পুরুষের সাথে বিছানায় যাওয়ার সময় সুন্দরী মেয়েদের যে কর্তৃত্ব থাকে তার পুরোটাই দেখা গেল তার মধ্যে। পুঁতিগুলোর মধ্যে গা এলিয়ে দিয়ে হাসল সে। ‘বিছানাটা তো দারুণ,’ বিড়ালের মতো আড়মোড়া ভেঙে বলল।

চোখ বন্ধ করে স্যাক্স জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার আপত্তি নেই তো?’

‘একদমই না।’

‘রাইম?’

‘কী?’

‘তোমার বইয়ের ব্যাপারে আরো কিছু বলো তো? ক্রাইম সিনের গল্প?’

কুইন্সের এক চতুর সিরিয়াল কিলারের বর্ণনা দিতে শুরু করল সে। এক মিনিটেরও কম সময়ে ঘুমিয়ে পড়ল মেয়েটা। নিচের দিকে তাকিয়ে রাইম দেখল, মেয়েটার বুক রাইমের বুকে লেগে আছে, হাঁটু তার উরুর উপর। কত বছর পর কোনো নারীর চুল তার মুখের উপর ছড়িয়ে আছে। সুড়সুড়ি দিচ্ছে। সে ভুলেই গিয়েছিল এমনটা হওয়া সম্ভব। অতীতেই বাস ওর, স্মৃতিশক্তি অসম্ভব প্রখর, কিন্তু অবাক হয়ে দেখল শেষ কবে এই অনুভূতিটা হয়েছিল তা মনে করতে পারছে না। যা মনে করতে পারল তা হলো ব্লেইনের সাথে কাটানো সন্ধ্যাগুলোর এক জগাখিচুড়ি স্মৃতি, দুর্ঘটনার আগে। মনে পড়ল সুড়সুড়িটা সহ্য করার সিদ্ধান্ত নিত সে। চুলগুলো সরাত না, তাতে যদি বউয়ের ঘুম ভেঙে যায়। এখন অবশ্য স্যাক্সের চুল সরানোর ক্ষমতাও তার নেই। কিন্তু সরাতে চাইবেও না সে। বরং চাইবে, অনুভূতিটা যেন মহাবিশ্বের শেষ দিন পর্যন্ত টিকে থাকে।
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *