১. এক দিনের রাজা
২. লোকার্ডের নীতি
৩. দ্য পোর্টেবলস ডটার
8. ডাউন টু দ্য বোন
৫. নড়াচড়ার উপর থাকলে ওরা তোমায় ধরতে পারবে না

দ্য বোন কালেক্টর – ১

এক দিনের রাজা

নিউ ইয়র্কের আধুনিকতা এতটাই প্রবল যে অতীত সেখানে হারিয়ে যায়।
-জন জে চ্যাপম্যান

অধ্যায় এক

শুক্রবার রাত ১০:৩০ থেকে শনিবার দুপুর ৩:৩০

ঘুমে চোখ ভেঙে আসছিল ওর। প্লেনটা নেমেছে দুই ঘণ্টা দেরিতে, লাগেজ পেতেও অপেক্ষা করা লাগল বহুক্ষণ। এরপর কার সার্ভিসও গোলমাল পাকিয়ে বসল; ঘণ্টাখানেক আগেই নাকি চলে গেছে লিমোটা। অগত্যা এখন একটা ট্যাক্সির আশায় দাঁড়িয়ে আছে তারা। যাত্রীদের লাইনে ঠায় দাঁড়িয়ে ল্যাপটপ কম্পিউটারের ভারে ছিপছিপে শরীরটা একদিকে হেলিয়ে দিয়েছে সে। সুদের হার আর ডিল রিস্ট্রাকচার করার নতুন সব ফন্দিফিকির নিয়ে একনাগাড়ে বকবক করেই চলেছে জন, কিন্তু শুক্রবার রাত সাড়ে দশটায় ঢিলেঢালা পোশাকে বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই মাথায় ঢুকছে না তার।

ও তাকিয়ে আছে হলুদ ক্যাবগুলোর অফুরান স্রোতের দিকে। গাড়িগুলোর রং আর গড়নের মধ্যে এমন কিছু একটা ছিল যা পোকামাকড়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে তাকে। পাহাড়ের কোলে কাটানো ছোটবেলার সেই গা-শিরশিরে অনুভূতির কথা মনে করে শিউরে উঠল সে; ভাইয়ের সঙ্গে যখন নাড়িভুঁড়ি বের করা মৃত ভোঁদড় খুঁজে পেত কিংবা লাল পিঁপড়ের বাসায় লাথি মেরে দেখত কিলবিল করতে থাকা ভেজা শরীর আর ঠ্যাং-এর জটলা।

একটা ক্যাব তীব্র আওয়াজ তুলে সামনে এসে থামতেই পা টেনে টেনে এগিয়ে গেল টি.জে. কোলফ্যাক্স। ট্রাংকটা খুলে দিলেও গাড়ি থেকে বেরোল না ক্যাব-ড্রাইভার। নিজেদের লাগেজ নিজেদেরই তুলতে হবে দেখে চটে গেল জন। বরাবরই অন্যদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে অভ্যস্ত সে। তবে এসব নিয়ে বিন্দুমাত্রও মাথাব্যথা নেই ট্যামি জিনের; টাইপ করা বা ফাইল গুছিয়ে দেওয়ার জন্য তার নিজেরও যে একজন সেক্রেটারি আছে, সেটা ভেবেই বরং অবাক হয় মাঝেমধ্যে। স্যুটকেসটা ভেতরে ছুঁড়ে দিল সে, ডালা বন্ধ করে উঠে বসল গাড়িতে। তার পিছু পিছু উঠে দড়াম করে দরজা বন্ধ করল জন, তারপর গোলগাল মুখ আর টাক-পড়া মাথাটা এমনভাবে মুছতে লাগল যেন স্যুট-ব্যাগটা ট্রাংকে তুলতে গিয়েই জান বেরিয়ে গেছে তার।

‘প্রথমে ইস্ট সেভেন্টি-সেকেন্ড,’ ডিভাইডারের ফাঁক দিয়ে বিড়বিবিড় করে বলল জন।

‘তারপর আপার ওয়েস্ট সাইড,’ যোগ করল টি.জে.।

সামনের আর পেছনের সিটের মাঝখানের প্লেক্সিগ্লাসটায় প্রচুর দাগ, তাই চালককে দেখা যাচ্ছে না বললেই চলে। কার্ব থেকে ছিটকে বেরিয়ে ম্যানহাটনের দিকে এক্সপ্রেসওয়ে ধরে ছুট লাগাল ক্যাবটা।

‘দেখো,’ জন বলল, ‘এজন্যই এত ভিড়।’

নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া জাতিসংঘের শান্তি সম্মেলনের প্রতিনিধিদের স্বাগত জানিয়ে টাঙানো একটা বিলবোর্ডের দিকে আঙুল তাক করে আছে সে। শহরে প্রায় দশ হাজার দর্শনার্থীর সমাগম হতে যাচ্ছে। বিলবোর্ডের দিকে তাকিয়ে রইল টি.জে.-কালো, সাদা আর এশীয়রা হাত নেড়ে হাসছে সেখানে। তবে ছবিটার মধ্যে কিছু একটা গড়বড় আছে। অনুপাত আর রংগুলো ঠিকঠাক মিলছে না। আর মুখগুলো সব কেমন যেন ফ্যাকাশে।

এলিয়েনের সেই মুভিটার কথা মনে করে বিড়বিড় করে টি.জে. বলল, ‘বডি স্ন্যাচার।’

চওড়া হাইওয়ে ধরে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলল গাড়িটা। রাস্তার বাতির নিচে এক অস্বস্তিকর হলুদ আভা ছড়িয়ে রয়েছে চারপাশে। ওরা চলেছে পুরোনো নেভি ইয়ার্ড ছাড়িয়ে, ব্রুকলিন পিয়ার পার হয়ে…

টেক্সাস ইন্সট্রুমেন্টস ক্যালকুলেটরটা বের করে অঙ্ক কষতে শুরু করল জন। অবশেষে থামল তার বকবকানি।

সিটে গা এলিয়ে দিয়েছে টি.জে., হাইওয়ের উপর ঝুঁকে থাকা ব্রাউনস্টোন বাড়ির বারান্দায় বসে থাকা মানুষগুলোর থমথমে মুখ আর ভ্যাপসা গরম ওঠা ফুটপাতের দিকে তাকিয়ে আছে। গরমে যেন আধা-বেহুঁশ দশা ওদের। ক্যাবের ভেতরেও জঘন্য গরম, জানালা নামানোর বোতামের দিকে হাত বাড়াল টি.জে.। ওটা কাজ করছে না দেখে মোটেও অবাক হলো না সে। জনের পাশ দিয়ে হাত বাড়িয়ে অপর পাশের বোতামটা টিপে দেখল। অকেজো ওটাও। ঠিক তখনই নজরে পড়ল, দরজায় লক বলে কিছু নেই। নেই কোনো হাতলও। দরজার গায়ে হাত বুলিয়ে হাতল বা অমন কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করল। কিছু নেই-যেন হ্যাকস ব্লেড দিয়ে চেঁছে ফেলা হয়েছে ওগুলো।

‘কী হলো?’ জানতে চাইল জন।

‘দরজাগুলো…’ বিড়বিড় করে বলল টি.জে., ‘ওগুলো খুলব কী করে আমরা?’

এ দরজা থেকে ও দরজার দিকে তাকাচ্ছিল জন, তখনই চোখের পলকে পেছনে পড়ে গেল মিডটাউন টানেলের সাইনবোর্ড।

‘এই যে!’ ডিভাইডারে টোকা দিল জন। ‘রাস্তা ভুল করলেন তো। যাচ্ছেনটা কোথায়?’

‘হয়তো কুইন্সবরো ব্রিজ ধরবে,’ মত দিল টি.জে.। টানেলের টোল বাঁচানো যাবে, যদিও রাস্তাটা একটু ঘুরপথের। সামনের দিকে ঝুঁকে হাতের আংটি দিয়ে প্লেক্সিগ্লাসে ঠকঠক শব্দ করল সে। ‘ব্রিজ দিয়ে যাবেন নাকি?’

কোনো জবাব দিল না ড্রাইভার।

‘এই যে!’ পর মুহূর্তেই কুইন্সবরো যাওয়ার মোড়টাও পেরিয়ে গেল গাড়িটা। ‘শিট!’ চেঁচিয়ে উঠল জন। ‘কোথায় নিয়ে যাচ্ছ আমাদের? হার্লেম? বাজি ধরে বলতে পারি ব্যাটা আমাদের হার্লেমে নিয়ে যাচ্ছে।’

জানালার বাইরে তাকাল টি.জে.। পাশাপাশি চলছে আরেকটা গাড়ি, ধীরে ধীরে পার হয়ে যাচ্ছে ওদের। ধড়াস ধড়াস করে জানালায় কিল মারতে শুরু করল সে। ‘বাঁচান! বাঁচান!’ চিৎকার করে উঠল সে। ‘প্লিজ…’

একবার তাকাল ঐ গাড়ির ড্রাইভার, তারপর ভ্রু কুঁচকে তাকাল আবার। গতি কমিয়ে ওদের পেছনে চলে গেল লোকটা, কিন্তু ঠিক তখনই বিশাল এক ঝাঁকুনি দিয়ে এক্সিট র‍্যাম্প ধরে কুইন্সের দিকে নেমে গেল ক্যাবটা; ঢুকে পড়ল এক সরু গলিতে, তারপর জনমানবহীন এক ওয়্যারহাউজ ডিস্ট্রিক্টের ভেতর দিয়ে ছুটল ঝড়ের বেগে। গতি তখন ঘণ্টায় অন্তত ষাট মাইল।

‘করছেন কী আপনি?’ ডিভাইডারে আছাড় মারল টি.জে.। ‘গাড়ি থামান! কোথায়…’

‘ওহ, গড! না!’ বিড়বিড় করে উঠল জন। ‘দেখো!’

মাথায় একটা স্কি-মাস্ক চড়িয়ে নিয়েছে ড্রাইভার।

‘কী চান আপনি?’ চিৎকার করে উঠল টি.জে.। ‘টাকা? আমরা টাকা দেবো আপনাকে।’

কেবল নীরবতা ভেসে এল ক্যাবের সামনের দিক থেকে।

টারগাস ব্যাগটা ছিঁড়েখুঁড়ে কালো ল্যাপটপটা বের করে আনল টি.জে.। হাতটা পেছনের দিকে নিয়ে প্রচণ্ড শক্তিতে কম্পিউটারের কোনা দিয়ে আঘাত করল জানালায়। কাচ ভাঙল না বটে, কিন্তু সেই বিকট শব্দে ভড়কে গেল ড্রাইভার। এঁকেবেঁকে গিয়ে পাশ কাটাল ক্যাবটা, অল্পের জন্য ইটের দেয়ালে ধাক্কা খাওয়া থেকে বাঁচল ওরা।

‘টাকা! কত চাই? আমি অনেক টাকা দেবো!’ তোতলাতে তোতলাতে বলল জন, ফোলা ফোলা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে চোখের পানি।

ল্যাপটপ দিয়ে আবারো জানালায় ঘা দিল টি.জে.। প্রচণ্ড আঘাতে উড়ে গেল মনিটর স্ক্রিনটা, কিন্তু অটুট রইল জানালা। আরেকবার চেষ্টা করল সে, এবার হাতের মুঠোয় দ্বিখণ্ডিত হয়ে খুলে এল কম্পিউটারের বডি।

‘ওহ, শিট…’ দুজনেই ছিটকে গিয়ে সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। নোংরা, অন্ধকার এক কানাগলিতে ব্রেক কষেছে ক্যাবটা।

হাতে ছোট একটা পিস্তল নিয়ে ক্যাব থেকে নেমে এল ড্রাইভার।

‘প্লিজ, না!’ অনুনয় করে উঠল টি.জে.।

হেঁটে ক্যাবের পেছনের দিকে এল লোকটা, নিচু হয়ে তেল চিটচিটে কাচের ভেতর দিয়ে উঁকি দিল ভেতরে। ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল দীর্ঘক্ষণ, ওদিকে উল্টো দিকের দরজার সাথে সেঁটে গিয়ে আরো পিছিয়ে গেল টি.জে. আর জন, চাপের কারণে একে অপরের সাথে লেপটে আছে ওদের ঘর্মাক্ত শরীর। রাস্তার আলোর ঝলকানি আড়াল করতে চোখের সামনে হাতদুটো জড়ো করে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখল ড্রাইভার।

আচমকা চাবুক মারার মতো একটা শব্দে যেন ফাটল ধরল বাতাসে। চমকে উঠল টি.জে.। ছোট্ট করে আর্তনাদ করে উঠল জন। দূরে, ড্রাইভারের পেছনে, লাল আর নীল আগুনের শিখায় ভরে উঠল আকাশটা। দড়াম করে কানফাটানো শব্দ হলো। সেদিকে ঘুরে তাকাল লোকটা। ঠিক তখনই শহরের উপর বিশাল দুটো ডানা মেলে একটা কমলা রঙের মাকড়সা।

আতশবাজি, টাইমস-এ পড়েছিল টি.জে.। কনফারেন্সের প্রতিনিধিদের স্বাগত জানাতে মেয়র আর জাতিসংঘের মহাসচিবের উপহার-পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শহরে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে ওদের।

ক্যাবের দিকে ফিরল ড্রাইভার। খটাস করে ল্যাচটা টেনে আস্তে করে খুলে দিল দরজাটা।

ফোনটা কে করেছিল জানা যায়নি। বরাবরের মতোই। কাজেই কোন ফাঁকা লটের কথা ‘আরপি’ বা রিপোর্টিং পার্টি বলেছে, তা যাচাই করার কোনো উপায় নেই। সেন্ট্রাল থেকে ওয়ারলেসে জানিয়েছে, ‘লোকটা বলেছে ইলেভেনের কাছে থার্টি-সেভেনে। ব্যস, এটুকুই।’ ক্রাইম সিনের নিখুঁত রাস্তা বাতলে দেওয়ার জন্য খুব একটা সুনাম নেই রিপোর্টিং পার্টিদের।

সকাল নয়টা বাজতেই দরদর করে ঘামতে শুরু করেছে অ্যামেলিয়া স্যাক্স। লম্বা ঘাস ঠেলে এগিয়ে চলেছে। ইংরেজি ‘এস’ অক্ষরের মতো চক্কর দিয়ে খুঁজছে সে। ক্রাইম সিনের লোকেরা একে বলে স্ট্রিপ সার্চ। কিচ্ছু নেই।

নেভি-ব্লু ইউনিফর্ম শার্টে লাগানো স্পিকার বা মাইকের দিকে মুখ নামাল সে। ‘পোর্টেবল ৫৮৮৫। কিছুই পাচ্ছি না, সেন্ট্রাল। আর কোনো ইনফো আছে?’

যান্ত্রিক খসখসে গলায় জবাব দিল ডিসপ্যাচার, ‘লোকেশন সম্পর্কে আর কিছু নেই, ৫৮৮৫। তবে একটা কথা…আরপি বলেছে, ভিক্টিম মারা গেলেই ভালো। ওভার।’

‘আবার বলো, সেন্ট্রাল।’

‘আরপি আশা করছে, ভিকতিম যেন মরে গিয়ে থাকে। তার ভালোর জন্যই। ওভার।’

‘OVER।’

ভিকতিম মরে গেলেই ভালো?

শুকিয়ে যাওয়া চেইন-লিংক বেড়া টপকে আরেকটা ফাঁকা লটে তল্লাশি চালাল স্যাক্স। কিচ্ছু নেই। ইচ্ছা করছে সব ছেড়েছুঁড়ে চলে যায়। টেন-নাইনটি বা ভিত্তিহীন রিপোর্ট বলে কল দিয়ে ফিরে যায় ডিউস-এ, ওটাই তার নিয়মিত কাজ। হাঁটুতে ব্যথা করছে, তার উপর আগস্টের জঘন্য ভ্যাপসা গরম। ইচ্ছা করছে পোর্ট অথরিটিতে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে, বাচ্চাগুলোর সঙ্গে আড্ডা মারে আর এক ক্যান অ্যারিজোনা আইসড টি গলায় ঢালে। তারপর সাড়ে এগারোটায়-যার আর মাত্র ঘণ্টা দুয়েক বাকি-মিডটাউন সাউথের লকার খালি করে ট্রেনিং সেশনের জন্য ডাউনটাউনের দিকে রওয়ানা দেবে সে।

কিন্তু কলটা অগ্রাহ্য করল না সে-করতে পারল না আসলে। এগিয়ে চলল তপ্ত ফুটপাত ধরে, দুটো পরিত্যক্ত বাড়ির মাঝখানের ফাঁকফোকর গলে, আগাছায় ভরা আরেকটা মাঠের ভেতর দিয়ে। ইউনিফর্মের চ্যাপ্টা টুপির নিচে তর্জনী ঢুকিয়ে দিল সে, মাথার উপর স্তূপ করে রাখা লাল চুলের জঙ্গল চুলকাল। একবার শুরু করতেই যেন নেশা পেয়ে বসল। টুপির নিচে হাত ঢুকিয়ে চুলকাল আরো কিছুক্ষণ। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে, সুড়সুড়ি দিচ্ছে, তাই ভ্রুতেও নখ চালাল সে।

ভাবল, রাস্তায় আর মাত্র দুঘণ্টা। এটুকু সহ্য করে নেয়া যাবে।

ঝোপঝাড়ের ভেতর আরো একটু এগোতেই সকালের প্রথম অস্বস্তিটা টের পেল স্যাক্স। কেউ একজন নজরে রাখছে তার উপর। গরম বাতাসে খসখস করছে শুকনো ঝোপ, লিংকন টানেল দিয়ে আসা-যাওয়া করা গাড়ি আর ট্রাকগুলোর বিকট আওয়াজ। পেট্রোল অফিসাররা সচরাচর যা ভাবে, মনে মনে তাই ভাবল: এই শহরে আওয়াজ বড্ড বেশি। কেউ একেবারে পেছনে এসে দাঁড়ালেও বোঝা যাবে না, ছোরার নাগালের মধ্যে চলে আসবে…আর ঘুণাক্ষরেও টের পাবে না সে। কিংবা কে জানে, হয়তো পিঠ লক্ষ্য করে তাক করবে বন্দুকের নল…

পাঁই করে ঘুরে দাঁড়াল সে।

পাতা, মরচেধরা যন্ত্রপাতি আর আবর্জনা ছাড়া কিচ্ছু নেই।

পাথরের স্তূপ বেয়ে ওঠার সময় ব্যথায় মুখ কুঁচকে গেল। মায়ের ভাষায় ‘মাত্র একত্রিশ’ বছর বয়সেই আর্থ্রাইটিসে ধরেছে অ্যামেলিয়া স্যাক্সকে। দাদা ওটা উপহার দিয়ে গেছে তাকে, যেমন মায়ের কাছ থেকে পেয়েছে ছিপছিপে গড়ন আর বাবার কাছ থেকে রূপ এবং ক্যারিয়ার (লাল চুলটা কার দান কে জানে!)।

মরা ঝোপের জঙ্গল ঠেলে এগোতে গিয়ে ব্যথায় আরেকবার টনটন করে উঠল শরীর। ভাগ্যিস থামতে পেরেছিল, আর এক পা এগোলেই খাড়া ত্রিশ ফুট নিচে আছড়ে পড়ত সে।

নিচে এক অন্ধকার খাদ-ওয়েস্ট সাইডের শক্ত পাথুরে মাটি কেটে বানানো। উত্তরগামী ট্রেনের জন্য ওখান দিয়ে চলে গেছে অ্যামট্র্যাকের লাইন। চোখ কুঁচকে রেললাইনের বেশ কাছেই থাকা খাদের পৃষ্ঠের দিকে তাকাল সে। কী ওটা? গোল করে খোঁড়া মাটি, মাঝখান দিয়ে একটা গাছের ডাল বেরিয়ে আছে যেন? দেখতে অনেকটা-ওহ, খোদা… দৃশ্যটা দেখে শিউরে উঠল সে। বমি বমি ভাবটা আগুনের হলকার মতো চামড়ায় বিঁধতে শুরু করেছে। মনের যে অংশটুকু উল্টো ঘুরে পালাতে চাইছিল, ভান করতে চাইছিল যেন কিছুই দেখেনি, জোর করে সেটাকে দাবিয়ে রাখল সে।

সেও আশা করছে ভিকতিম যেন মরে গিয়ে থাকে। তার ভালোর জন্যই।

ফুটপাত থেকে নিচে নামার লোহার মইটার দিকে ছুটল সে। রেলিং ধরতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে হাত সরিয়ে নিল। এই পথেই হয়তো পালিয়েছে আসামি। হাত দিলে আলামত নষ্ট হয়ে যেতে পারে তার। ঠিক আছে, কঠিন পথেই কাজ সারবে সে। জয়েন্টের ব্যথা কমানোর জন্য বুকভরে শ্বাস নিল, তারপর পাথর বেয়েই নামতে শুরু করল নিচে। নতুন অ্যাসাইনমেন্টের প্রথম দিন বলে ইস্যু করা জুতোজোড়া রুপার মতো চকচক করছে। পাথরের খাঁজে সেই জুতোর ডগা গুঁজে দিল সে। শেষ চার ফুট লাফিয়ে নামল রেললাইনের উপর, তারপর দৌড় দিল সেই কবরের দিকে।

‘হায় খোদা…’

মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে থাকা জিনিসটা গাছের ডাল নয়, একটা হাত। শরীরটাকে খাড়াভাবে পুঁতে ফেলা হয়েছে, মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে এমনভাবে যাতে কেবল হাতের কনুই, কবজি আর পাঞ্জাটা বেরিয়ে থাকে। অনামিকার দিকে তাকিয়ে রইল সে; মাংস চেঁছে ফেলা হয়েছে ওটার। আর সেই রক্তাক্ত, মাংসহীন হাড়ের উপর পরিয়ে দেওয়া হয়েছে মেয়েদের হীরের ককটেল আংটি।

হাঁটু গেড়ে বসে মাটি খুঁড়তে শুরু করল স্যাক্স। কুকুরের মতো দুই হাতে মাটি সরানোর সময় খেয়াল করল, বাকি অক্ষত আঙুলগুলো ছড়িয়ে আছে। স্বাভাবিকভাবে যতটা বাঁকানো সম্ভব তার চেয়েও বেশি টানটান হয়ে আছে ওগুলো। তার মানে শেষ বেলচা মাটি যখন মুখের উপর ফেলা হচ্ছিল, তখনো জীবিত ছিল ভিকতিম। হয়তো এখনো বেঁচে আছে।

পাগলের মতো আলগা মাটি সরাতে লাগল স্যাক্স, ভাঙা বোতলের টুকরোয় কেটে গেল হাত, কালচে মাটির সঙ্গে মিশে গেল তার গাঢ় রঙের রক্ত। তারপর হাতে ঠেকল চুল, আর তার নিচে কপাল, অক্সিজেনের অভাবে কালচে নীল হয়ে গেছে চামড়া। আরো খানিকটা খুঁড়তেই বেরিয়ে এল নিষ্প্রভ চোখ আর মুখটা, বীভৎস এক হাসিতে বেঁকে আছে ঠোঁটজোড়া। শেষ মুহূর্তগুলোতে কালো মাটির স্রোত থেকে ভেসে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল বেচারা। মেয়ে নয়, যদিও আংটিটা মেয়েদের। পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ভারী শরীরের পুরুষ। যে মাটিতে ভাসছে, ঠিক তার মতোই নিথর।

পিছিয়ে এল সে, চোখ সরাতে পারছে না মরা মুখটা থেকে, প্রায় হোঁচট খেল রেললাইনের উপর। পুরো এক মিনিট কিছুই ভাবতে পারল না। শুধু মনে হলো, এভাবে মরতে কেমন লাগে।

তারপর ধমক দিল নিজেকে: কাম অন, হানি। একটা হোমিসাইড ক্রাইম সিন পেয়েছ, আর তুমিই ফার্স্ট অফিসার। কী করতে হবে জানা আছে তোমার।

‘অ্যাডাপ্ট’ (ADAPT)। এ-তে অ্যারেস্ট, মানে আসামি হাতের নাগালে থাকলে গ্রেফতার করো। ডি-তে ডিটেইন, মানে সাক্ষী আর সন্দেহভাজনদের আটকে রাখো। এ-তে অ্যাসেস, ক্রাইম সিন পর্যবেক্ষণ করো। পি-তে…পি-তে যেন কী?

মাইকের দিকে মুখ নামিয়ে আনল সে। ‘পোর্টেবল ৫৮৮৫ টু সেন্ট্রাল। ফারদার-টু। থ্রি-এইট আর ইলেভেনের কাছে ট্রেন লাইনের পাশে একটা ১০-২৯ পেয়েছি আমি। হোমিসাইড, ওভার। ডিটেকটিভ, সিএস, বাস আর ট্যুর ডক্টর লাগবে। ওভার।’

‘রজার, ৫৮৮৫। আসামি কি কাস্টডিতে, ওভার?’

‘আসামি নেই।’

‘ফাইভ-এইট-এইট-ফাইভ, ওভার।’

হাড়গোড় বেরিয়ে পড়া আঙুলটার দিকে তাকিয়ে রইল স্যাক্স। বেমানান আংটি। চোখগুলো। আর ঐ হাসি…ওহ, জঘন্য ঐ হাসিটা। সারা শরীরে একটা কাঁপুনি খেলে গেল তার। সামার ক্যাম্পের নদীতে সাপের সঙ্গে সাঁতার কেটেছে অ্যামেলিয়া স্যাক্স, বুক ফুলিয়ে বলত যে একশো ফুট উঁচু ব্রিজ থেকে বাঞ্জি-জাম্প দিতেও ভয় পাবে না। সত্যি কথাই সেটা। কিন্তু আটকে পড়ার কথা ভাবলেই… নড়াচড়া করতে পারছে না, আটকা পড়ে আছে-ভাবলেই ইলেকট্রিক শকের মতো প্যানিক অ্যাটাক আছড়ে পড়ে তার উপর। সেজন্যই হাঁটার সময় জোরে হাঁটে স্যাক্স, আর গাড়ি চালায় যেন আলোর গতিতে। নড়াচড়ার উপর থাকলে ওরা তোমায় ধরতে পারবে না…

একটা শব্দ শুনে কান খাড়া করল সে। একটা গুরগম্ভীর আওয়াজ, ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। রেললাইনের উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে ছেঁড়া কাগজের টুকরো। খেপে ওঠা ভূতের মতো ধুলোর ঘূর্ণি পাক খাচ্ছে তার চারপাশে। তারপর একটা নিচু হর্নের আওয়াজ… পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি উচ্চতার পেট্রোল অফিসার অ্যামেলিয়া স্যাক্স দেখল তার দিকেই ধেয়ে আসছে ত্রিশ টনের এক অ্যামট্র্যাক লোকোমোটিভ; লাল, সাদা আর নীলরঙা ইস্পাতের দানবটা এগিয়ে আসছে ঘণ্টায় দশ মাইল বেগে।

‘থামুন বলছি!’ চিৎকার করে উঠল সে। পাত্তাই দিল না ইঞ্জিনিয়ার।

রেললাইনের উপর উঠে দৌড় দিল স্যাক্স, সোজা ট্র্যাকের মাঝখানে গিয়ে পা ফাঁক করে দাঁড়াল; হাত নেড়ে থামার ইশারা করল ড্রাইভারকে। ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ তুলে থেমে গেল লোকোমোটিভটা। জানালা দিয়ে মাথা বের করে দিল ইঞ্জিনিয়ার।

‘এদিক দিয়ে যাওয়া যাবে না,’ সাফ জানিয়ে দিল স্যাক্স।

কারণ জানতে চাইল লোকটা। স্যাক্সের মনে হলো, এত বড় একটা ট্রেন চালানোর জন্য বড্ড কাঁচা বয়স ছেলেটার।

‘এটা একটা ক্রাইম সিন। ইঞ্জিন বন্ধ করুন, প্লিজ।’

‘ম্যাডাম, আমি তো কোনো ক্রাইম দেখছি না।’

কিন্তু স্যাক্স তখন তার কথা কানেই তুলছে না। ট্রেন ভায়াডাক্টের পশ্চিম দিকে, মানে উপরের দিকে ইলেভেনথ অ্যাভিনিউয়ের কাছে চেইন-লিংক বেড়ার একটা ফাঁকের দিকে তাকিয়ে আছে সে। কাউকে না দেখিয়ে লাশটা এখানে নিয়ে আসার ওটাই সম্ভবত একমাত্র রাস্তা; ইলেভেনথে গাড়ি পার্ক করে লাশটা টেনেহিঁচড়ে সরু গলি দিয়ে খাদের কাছে নিয়ে আসা। কারণ থার্টি-সেভেনে, মানে ক্রস স্ট্রিটে গাড়ি রাখলে আশেপাশের দুই ডজন অ্যাপার্টমেন্টের জানালা থেকে কারো না কারো চোখে পড়ত ব্যাপারটা।

‘ট্রেনটা, স্যার…ওটা ওভাবেই রেখে দিন।’

‘আমি এখানে ট্রেন ফেলে রাখতে পারব না।’

‘ইঞ্জিনটা বন্ধ করুন, প্লিজ।’

‘আমরা এই ধরনের ট্রেনের ইঞ্জিন কখনো বন্ধ করি না। সব সময় চালু থাকে।’

‘তাহলে ডিসপ্যাচারকে কল দিন। বা অন্য কাউকে। দক্ষিণগামী ট্রেনগুলোও যেন থামিয়ে রাখে।’

‘তা হয় না।’

‘এখনই করুন, স্যার। আপনার গাড়ির নম্বর আমি নিয়ে রেখেছি।’

‘গাড়ি?’

‘যা বলেছি এক্ষুনি করুন!’ ধমকে উঠল স্যাক্স।

‘কী করবেন, ম্যাডাম? মামলা ঠুকে দেবেন?’

পাত্তা না দিয়ে আবারো পাথুরে দেয়াল বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করল অ্যামেলিয়া, হাড়ের জোড়াগুলো মটমট করছে, ঠোঁটে টের পাচ্ছে চুনাপাথরের গুঁড়ো, কাদা আর নিজের ঘামের নোনা স্বাদ। রেললাইনের উপর থেকে যে গলিটা চোখে পড়েছিল, দৌড়ে সেখানে গেল সে, তারপর ঘুরে ইলেভেনথ অ্যাভিনিউ আর উল্টো দিকের জাভিটস সেন্টারের দিকে তাকাল। ভিড়ে গিজগিজ করছে হলটা-দর্শক আর সাংবাদিকদের ভিড়। বিশাল একটা ব্যানারে লেখা: ‘স্বাগত জাতিসংঘ প্রতিনিধিদল।’ কিন্তু আজ ভোরে, যখন রাস্তাটা জনশূন্য ছিল, তখন আসামি সহজেই এখানে পার্কিং স্পেস পেয়ে গেছে, আর তারপর লাশটা অলক্ষ্যে টেনে নিয়ে গেছে লাইনের দিকে।

ইলেভেনথের দিকে লম্বা লম্বা পা ফেলে এগোল স্যাক্স, ভালো করে তাকিয়ে দেখল ছয় লেনের অ্যাভিনিউটাকে। গাড়ির জ্যামে আটকে আছে পুরো রাস্তা।

শুরু করা যাক তাহলে।

গাড়ি আর ট্রাকের সমুদ্রের মধ্যে নেমে পড়ল সে, উত্তরগামী লেনগুলোর গাড়ি একেবারে থামিয়ে দিল। কয়েকজন ড্রাইভার পাশ কাটিয়ে পালানোর চেষ্টা করছিল, অগত্যা দুটো সাইটেশন দিতে হলো তাকে। সবশেষে সুনাগরিকরা যাতে তাদের দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হয়, তা নিশ্চিত করতে রাস্তার মাঝখানে আবর্জনার ক্যান টেনে এনে ব্যারিকেড তৈরি করল।

অ্যাডাপ্ট (ADAPT) রুলের পরের নিয়মটা অবশেষে মনে পড়েছে স্যাক্সের। পি-তে প্রটেক্ট, ক্রাইম সিন রক্ষা করো।

হর্ন বাজানোর ক্রুদ্ধ আওয়াজে ভরে উঠতে লাগল কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরের আকাশ, একটু পরেই তার সঙ্গে যোগ হলো ড্রাইভারদের রাগী চিৎকার-চেঁচামেচি। কিছুক্ষণ পর সেই হট্টগোলের মধ্যে সাইরেনের শব্দও মিশে গেল, এসে পৌঁছাতে শুরু করেছে ইমার্জেন্সি গাড়িগুলো।

চল্লিশ মিনিট পেরিয়েছে ততক্ষণে। জায়গাটা ইউনিফর্ম-পরা পুলিশ আর তদন্তকারী দিয়ে গিজগিজ করছে, অন্তত ডজনখানেক তো হবেই। হেলস কিচেন এলাকায় একটা খুনের জন্য যত লোক থাকা দরকার, তার চেয়ে অনেক বেশি। তবে আরেকজন পুলিশের কাছ থেকে স্যাক্স জানতে পারল, এটা হাই-প্রোফাইল কেস, মিডিয়া হুমড়ি খেয়ে পড়বে। গত রাতে জেএফকে এয়ারপোর্টে নামা দুই যাত্রীর একজন এই ভিকটিম, ক্যাব নিয়ে শহরে আসছিল তারা। কিন্তু কেউই আর বাড়ি পৌঁছায়নি।

‘সিএনএন নজর রাখছে,’ ফিসফিস করে বলল ঐ পুলিশ।

তাই সেন্ট্রাল ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসোর্স ডিভিশনের চিফ, সোনালি চুলের ভিন্স পেরেত্তিকে বাঁধের উপর দিয়ে উঠে আসতে দেখে মোটেও অবাক হলো না অ্যামেলিয়া স্যাক্স। ক্রাইম সিন ইউনিট দেখাশোনার দায়িত্ব তার উপরই। হাজার ডলারের স্যুটের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে থামল লোকটা। তবে অবাক হলো তখন, যখন দেখল পেরেত্তি তাকে লক্ষ করেছে এবং ইশারা করে কাছে ডাকছে। তার ক্লিন-শেভড মুখে এক চিলতে হাসি। স্যাক্সের মনে হলো, এই খাড়া পাহাড় বাওয়ার কসরতের জন্য বুঝি বাহবা পেতে যাচ্ছে সে। মইয়ের উপর থাকা আঙুলের ছাপগুলো বাঁচিয়ে দিয়েছে সে। হয়তো বা জুটবে একটা প্রশংসাপত্রও। পেট্রোল ডিউটির শেষ দিনের শেষ ঘণ্টায়… একেবারে বীরের বেশে বিদায়।

আপাদমস্তক তাকে মেপে নিল পেরেত্তি। ‘পেট্রোলওম্যান, আপনি তো আর নতুন নন, তাই না? ধরে নিচ্ছি আমি ঠিকই বলছি।’

‘স্যার, বুঝলাম না।’

‘ধরে নিচ্ছি আপনি নতুন নন।’

টেকনিক্যালি সে নতুন নয়, যদিও তার বয়সি অন্য পেট্রোল অফিসারদের মতো নয় বা দশ বছরের অভিজ্ঞতা নেই তার। মাত্র তিন বছর হয়েছে চাকরিতে। পুলিশ অ্যাকাডেমিতে ঢোকার আগে কয়েক বছর নষ্ট করেছিল স্যাক্স। ‘আপনি কী জানতে চাইছেন ঠিক বুঝতে পারছি না।’

বিরক্ত দেখাল পেরেত্তিকে, মুখের হাসি উধাও হয়ে গেছে। ‘ফার্স্ট অফিসার কি আপনি ছিলেন?’

‘জি, স্যার।’

‘ইলেভেনথ অ্যাভিনিউ বন্ধ করলেন কেন? কী ভেবেছিলেন?’

চওড়া রাস্তাটার দিকে তাকাল সে, ময়লার ক্যানের ব্যারিকেডে এখনো রাস্তাটা বন্ধ। হর্নের আওয়াজ শুনতে শুনতে কান সয়ে গিয়েছিল, কিন্তু এখন বুঝতে পারছে শব্দটা আসলে বেশ জোরালো; মাইলের পর মাইল জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির সারি।

‘স্যার, ফার্স্ট অফিসারের কাজ হলো আসামিকে গ্রেফতার করা, সাক্ষীদের আটকে রাখা, রক্ষা করা…’

‘আমি অ্যাডাপ্ট রুল জানি, অফিসার। ক্রাইম সিন রক্ষা করার জন্যই কি রাস্তা বন্ধ করেছেন আপনি?’

‘ইয়েস, স্যার। আমার মনে হয়নি আসামি ক্রস স্ট্রিটে গাড়ি পার্ক করবে। ওদিকের অ্যাপার্টমেন্টগুলো থেকে খুব সহজেই চোখে পড়ে যাবে। দেখুন, ঐ যে। তাই ইলেভেনথ অ্যাভিনিউই ভালো অপশন বলে মনে হলো।’

‘ভুল অপশন ছিল ওটা। লাইনের ঐ পারে কোনো পায়ের ছাপ পাওয়া যায়নি, বরং যে মইটা থার্টি-সেভেনে উঠে গেছে, সেদিকে দুজোড়া ছাপ গেছে।’

‘আমি থার্টি-সেভেনও বন্ধ করে দিয়েছি।’

‘সেটাই তো বলছি। শুধু ওটুকুই বন্ধ করার দরকার ছিল। আর ট্রেন?’ জিজ্ঞেস করল সে। ‘ওটা থামালেন কেন?’

‘আসলে, স্যার…আমি ভাবলাম ট্রেনের চাকায় হয়তো আলামত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বা অমন কিছু।’

‘বা অমন কিছু, অফিসার?’

‘আমি হয়তো ঠিকমতো বোঝাতে পারিনি, স্যার। মানে…’

‘নিউআর্ক এয়ারপোর্টের কী খবর?’

‘জি, স্যার।’ সাহায্যের আশায় এদিক-সেদিক তাকাল সে। আশেপাশেই অফিসাররা ছিল, কিন্তু তারা খুব মনোযোগ দিয়ে এই ঝাড়ি খাওয়ার দৃশ্যটা না দেখার ভান করছে।

‘নিউআর্কের ঠিক কী খবর জানতে চাইছেন?’

‘ওটা বন্ধ করে দেননি কেন?’

বাহ, চমৎকার। একেবারে স্কুলমাস্টারের মতো আচরণ। জুলিয়া রবার্টসের মতো ঠোঁটদুটো শক্ত হয়ে এল তার, তবে শান্ত রাখল নিজেকে, ‘স্যার, আমার বিবেচনায় মনে হয়েছে যে…’

‘নিউ ইয়র্ক ওয়ে বন্ধ করলেও ভালো হতো। সঙ্গে জার্সি পাইক আর লং আইল্যান্ড এক্সপ্রেসওয়ে। সেইন্ট লুইস পর্যন্ত আই-৭০ পুরোটা। পালানোর জন্য ওগুলোই তো ভালো রাস্তা।’

মাটা সামান্য নামিয়ে পেরেত্তির দিকে তাকিয়ে রইল সে। দুজনেই লম্বায় সমান, যদিও পেরেত্তির জুতোয় হিল একটু বেশি।

‘কমিশনারের কাছ থেকে ফোন পেয়েছি আমি,’ বলে চলল সে। ‘পোর্ট অথরিটির প্রধান, জাতিসংঘের মহাসচিবের অফিস, ঐ এক্সপোর প্রধান…’ জাভিটস সেন্টারের দিকে মাথা নাড়ল সে। ‘কনফারেন্সের শিডিউল, একজন ইউ.এস. সেনেটরের ভাষণ আর পুরো ওয়েস্ট সাইডের ট্রাফিক-সবকিছুর বারোটা বাজিয়ে দিয়েছি আমরা। লাশ থেকে রেললাইনের দূরত্ব পঞ্চাশ ফুট, আর আপনি যে রাস্তা বন্ধ করেছেন সেটা প্রায় দুশো ফুট দূরে আর ত্রিশ ফুট উঁচুতে। মানে, হ্যারিকেন ইভাও অ্যামট্র্যাকের নর্থ-ইস্ট করিডরের এমন হাল করতে পারেনি।’

‘আমি শুধু ভেবেছিলাম…’

হেসে ফেলল পেরেত্তি। যেহেতু স্যাক্স একজন সুন্দরী, যে আবার অ্যাকাডেমিতে যোগ দেওয়ার আগে ম্যাডিসন অ্যাভিনিউয়ের শ্যান্টেল মডেলিং এজেন্সির হয়ে নিয়মিত কাজ করত, তাই ওকে মাফ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল পুলিশ কর্মকর্তাটি।

‘পেট্রোলওম্যান স্যাক্স’-বুকের উপর আমেরিকান বডি আর্মার ভেস্টের চাপে লেপটে থাকা নেম ট্যাগটার দিকে তাকাল সে-একটা শিক্ষা নিয়ে যান। ক্রাইম সিনের কাজ মানে হলো ভারসাম্য বজায় রাখা। প্রতিটা খুনের পর যদি পুরো শহর ঘিরে ফেলা যেত আর ত্রিশ লক্ষ মানুষকে আটকে রাখা যেত, তবে বেশ হতো। কিন্তু আমরা তা পারি না। আপনার ভালোর জন্যই বলছি কথাটা।’

‘আসলে, স্যার,’ কাঠখোট্টা গলায় বলল সে, ‘আমি পেট্রোল থেকে ট্রান্সফার হয়ে যাচ্ছি। আজ দুপুর বারোটা থেকে।’

মাটা নাড়ল সে, হাসিখুশি মুখে বলল, ‘তাহলে তো আর কিছুই বলার নেই। তবে রেকর্ডবুকের জন্য বলছি, ট্রেন থামানো আর রাস্তা বন্ধ করার সিদ্ধান্তটা আপনারই ছিল।’

‘ইয়েস, স্যার, আমারই ছিল,’ চটপট জবাব দিল সে। ‘ওতে কোনো ভুল নেই।’

ঘর্মাক্ত কলম দিয়ে খোঁচা মেরে কালো ওয়াচবুকে নোটটা টুকে নিল পেরেত্তি। ওতে আমার কিছুই ছেঁড়া যাবে না!

‘যান, এবার ঐ গারবেজ ক্যানগুলো সরান। রাস্তা ক্লিয়ার না হওয়া পর্যন্ত ট্রাফিক সামলান। আমার কথা কানে গেছে?’

কোনো ‘জি, স্যার’ বা ‘জি না, স্যার’ বা অন্য কোনো সম্মতিসূচক শব্দ ছাড়াই ইলেভেনথ অ্যাভিনিউয়ের দিকে এগিয়ে গেল সে, ধীরে ধীরে সরাতে শুরু করল ময়লার ক্যানগুলো। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় প্রত্যেকটা ড্রাইভার হয় চোখ রাঙিয়ে তাকাচ্ছে, নয়তো বিড়বিড় করে কিছু একটা বলছে। ঘড়ির দিকে তাকাল স্যাক্স। আর মাত্র এক ঘণ্টা। এটুকু সহ্য করে নিতে পারবে সে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *