অধ্যায় ছয়
‘বল্টুটা দেখো।’
ক্রাইম সিনের সেই সনাতন নিয়মটা মনে পড়ে গেল: সবার আগে সবচেয়ে অদ্ভুত আলামতটা পরীক্ষা করো। প্লাস্টিকের ব্যাগটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখছিল টম, ওদিকে আধা মরচেধরা ধাতব রডটা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছিল রাইম।
নিষ্প্রভ। ক্ষয়ে যাওয়া।
‘ছাপের ব্যাপারে নিশ্চিত তো? স্মল-পার্টিকল রিয়েজেন্ট ব্যবহার করেছিলে? খোলা বাতাসে পড়ে থাকা আলামতের জন্য ওটাই সবচেয়ে ভালো,’ জানতে চাইল সে।
‘হ্যাঁ,’ নিশ্চিত করল মেল কুপার।
‘টম,’ হুকুম দিল রাইম, ‘চোখের সামনে থেকে চুলগুলো সরাও! ওগুলো আঁচড়ে দাও। সকালেই তো বলেছিলাম আঁচড়ে দিতে।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে জট-পাকানো কালো চুলগুলো ব্রাশ করে দিল সহকারী।
‘সাবধানে,’ বসকে ভয় দেখানোর ভান করে ফিসফিসিয়ে বলল টম। জবাবে মাথাটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে নিল রাইম, এতে চুলগুলো আরো এলোমেলো হয়ে গেল তার।
কোনায় দম ধরে বসে আছে অ্যামেলিয়া স্যাক্স। দৌড়বিদদের মতো পজিশন নিয়ে চেয়ারের নিচে পা গুটিয়ে রেখেছে, দেখেই মনে হচ্ছে এই বুঝি দৌড় দেবে সে।
আবার বল্টুটার দিকে মনোযোগ দিল রাইম।
আইআরডি-র প্রধান থাকাকালে নানা রকম ডেটাবেস তৈরি শুরু করেছিল রাইম। ফেডারেল অটো-পেইন্ট-চিপ ইনডেক্স বা বিএটিএফ-এর টোব্যাকো ফাইলের মতো। বুলেটের স্ট্যান্ডার্ড ফাইল, সুতো, কাপড়, টায়ার, জুতো, যন্ত্রপাতি, মোটর অয়েল, ট্রান্সমিশন ফ্লুইড-সবকিছুর তালিকা বানিয়েছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করেছে তালিকা তৈরি, ইনডেক্স আর ক্রস-রেফারেন্সের কাজে। তবে রাইমের সেই পাগলামির সময়েও হার্ডওয়্যার বা যন্ত্রাংশের ক্যাটালগ বানানোর ফুরসত পায়নি আইআরডি। কেন করা হয়নি ভেবে অবাক হলো, সময় বের না করার জন্য নিজের উপর রাগ হলো। আর ভিন্স পেরেত্তিও যে এ নিয়ে মাথা ঘামায়নি, তা ভেবে আরো বেশি রাগ হলো তার।
‘নর্থ-ইস্টের সব বল্টু প্রস্তুতকারক আর পাইকারি বিক্রেতাদের ফোন করতে হবে। না, গোটা দেশের সবাইকে। জিজ্ঞেস করো এমন মডেল ওরা বানায় কি না আর কাদের কাছে বিক্রি করে। কমিউনিকেশন্সের ডিসপ্যাচারদের কাছে বল্টুটার একটা ছবি আর বিবরণ ফ্যাক্স করে দাও।’
‘সর্বনাশ, এমন বল্টু তো লাখ লাখ থাকতে পারে,’ বলল ব্যাংকস। ‘দেশের সব হার্ডওয়্যার আর সিয়ার্সের দোকানে পাওয়া যাবে।’
‘আমার তা মনে হয় না,’ জবাব দিল রাইম। ‘এটা নিশ্চয়ই কোনো কাজের সূত্র। বেদরকারি হলে সে এটা ফেলে রাখত না। এই বল্টুর উৎস সীমিত। বাজি ধরতে পারি আমি।’
ফোন করল সেলিট্টো, মিনিট কয়েক পর মুখ তুলে চাইল।
‘তোমার জন্য ডিসপ্যাচার জোগাড় হয়েছে, লিংকন। চারজন। প্রস্তুতকারকদের তালিকা কোথায় পাব?’
‘ফরটি-সেকেন্ড স্ট্রিটে একটা পেট্রোলম্যান পাঠাও,’ জবাব দিল রাইম। ‘পাবলিক লাইব্রেরি। ওখানে কর্পোরেট ডিরেক্টরি আছে। ওটা না পাওয়া পর্যন্ত ডিসপ্যাচারদের বলো “বিজনেস-টু-বিজনেস ইলো পেজেস” দেখে কাজ শুরু করতে।’
ফোনে নির্দেশটা জানিয়ে দিল সেলিট্টো।
ঘড়ির দিকে তাকাল রাইম। দেড়টা বাজে।
‘এবার, অ্যাসবেস্টস।’
মুহূর্তের জন্য শব্দটা জ্বলে উঠল মস্তিষ্কে। একটা ঝটকা অনুভব করল-শরীরের এমন জায়গায় যেখানে ঝটকা অনুভব করার কথা নয় তার। অ্যাসবেস্টসের ব্যাপারটা চেনা চেনা লাগছে কেন? কিছুদিন আগে হয়তো পড়েছে বা শুনেছে, যদিও সময়ের হিসাবের উপর আর ভরসা নেই লিংকন রাইমের। মাসের পর মাস একই জায়গায় জমে থাকলে সময় জিনিসটা মৃত্যুর মতোই ধীর হয়ে যায়। হয়তো দুবছর আগে পড়া কোনো জিনিসের কথা ভাবছে সে।
‘অ্যাসবেস্টস সম্পর্কে আমরা কী জানি?’ বিড়বিড় করল সে।
কেউ জবাব দিল না, তবে তাতে কিছু যায় আসে না। নিজেই নিজের জবাব দিল সে। ওভাবেই পছন্দ করে ও।
অ্যাসবেস্টস হলো এক জটিল মলিকিউল, সিলিকেট পলিমার। কাচের মতো এটাও আগে থেকেই অক্সিডাইজড বা জারিত হয়ে থাকে বলে এতে আগুন ধরে না। পুরোনো খুনের ক্রাইম সিন-যেখানে ফরেনসিক অ্যানথ্রোপলজিস্ট আর ওডোনটোলজিস্টদের সাথে কাজ করতে হতো-সেসব জায়গায় প্রায়ই অ্যাসবেস্টস মোড়ানো দালানে কাজ করতে হয়েছে রাইমকে। খোঁড়াখুঁড়ির সময় যে মুখোশ পরতে হতো, সেটার অদ্ভুত স্বাদের কথা মনে পড়ে গেল। আসলে, এখন মনে পড়েছে, সাড়ে তিন বছর আগে সিটি হল সাবওয়ে স্টপে অ্যাসবেস্টস পরিষ্কার করার সময়ই ড্যান শেফার্ডের হাতে খুন হওয়া এক পুলিশের লাশ জেনারেটর রুমে খুঁজে পেয়েছিল কর্মীরা। লাশের গায়ে হালকা নীল জ্যাকেট থেকে একটা সুতো তোলার জন্য যখন ধীরে ধীরে নিচু হচ্ছিল রাইম, ঠিক তখনই ওক কাঠের বিমটা মটমট শব্দে আর্তনাদ করে ধসে পড়েছিল। ধুলোবালি আর আবর্জনার নিচে চাপা পড়ার সময় ঐ মুখোশটাই দম আটকে মরা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল তাকে।
‘হয়তো কোনো ক্লিন-আপ সাইটে রেখেছে ওকে,’ বলল সেলিট্টো।
‘হতে পারে,’ সায় দিল রাইম।
তরুণ সহকারীকে হুকুম দিল সেলিট্টো, ‘ইপিএ আর সিটি এনভায়রনমেন্টালে ফোন করো। খোঁজ নাও শহরের কোথায় কোথায় এখন ক্লিন-আপের কাজ চলছে।’ ফোনটা করল ডিটেকটিভ।
‘বো,’ হাউম্যানকে জিজ্ঞেস করল রাইম, ‘টিম নামাতে পারবে?’
‘রওয়ানা হওয়ার জন্য রেডি,’ নিশ্চিত করল ইএসইউ কমান্ডার। ‘তবে বলে রাখি, ফোর্সের অর্ধেক লোক ঐ জাতিসংঘের ঝামেলার জন্য আটকা পড়ে আছে। সিক্রেট সার্ভিস আর ইউএন সিকিউরিটির কাছে ধারে দেওয়া হয়েছে ওদের।’
‘ইপিএ-র কিছু ইনফো পেয়েছি।’ হাউম্যানকে ইশারা করল ব্যাংকস, ঘরের এক কোণে সরে গেল দুজনে। বইয়ের কয়েকটা স্তূপ সরাল তারা। নিউ ইয়র্কের একটা ইএসইউ ট্যাকটিক্যাল ম্যাপ খোলার সময় মেঝের উপর কিছু একটা পড়ার খটাস শব্দ হলো।
লাফিয়ে উঠল ব্যাংকস। ‘জিসাস।’
শুয়ে থাকার কারণে কী পড়েছে দেখতে পেল না রাইম। ইতস্তত করে নিচু হলো হাউম্যান, তুলে নিল মেরুদণ্ডের হাড়ের সেই সাদা টুকরোটা, টেবিলে ফেরত রাখল ওটা। অনেকে চোখ তার উপর নিবদ্ধ টের পেল রাইম, কিন্তু হাড়টা নিয়ে কিছুই বলল না সে।
ম্যাপের উপর ঝুঁকে পড়ল হাউম্যান, ফোনে অ্যাসবেস্টস ক্লিন-আপ সাইটের তথ্য শুনে শুনে তাকে জানাচ্ছে ব্যাংকস। গ্রিজ পেনসিল দিয়ে জায়গাগুলো দাগিয়ে নিল কমান্ডার। মনে হলো প্রচুর সাইট আছে, শহরের পাঁচটা অঞ্চলেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সেগুলো।
হতাশাজনক।
‘আমাদের আরো নির্দিষ্ট হতে হবে। দেখা যাক, বালি, কুপারকে বলল রাইম। মাইক্রোস্কোপে দেখো। কী মনে হয় বলো।’
আলামতের খামটা টেকনিশিয়ানের হাতে দিল সেলিট্টো। এনামেলের ট্রে-তে ওটা ঢেলে দিল সে। চকচকে পাউডার থেকে ধুলোর মেঘ উড়ল। বালির স্তূপের মাঝখানে মসৃণ, ক্ষয়ে যাওয়া একটা পাথরও গড়িয়ে এল।
শ্বাস আটকে এল লিংকন রাইমের। যা দেখল তার জন্য নয়-সে তখনো জানে না ওটা কী। বরং মস্তিষ্ক থেকে একটা ত্রুটিপূর্ণ স্নায়ু-সংকেত ছুটে গিয়ে তার অকেজো ডান বাহুর মাঝপথে মিলিয়ে গেল বলে; সংকেতটা হাতকে বলছিল পেনসিল তুলে নিয়ে খোঁচা দিয়ে দেখতে। গত এক বছরের মধ্যে এই প্রথম এমন তীব্র ইচ্ছা হলো তার। কান্না পেয়ে গেল প্রায়, সান্ত্বনা কেবল ডাক্তার বার্জারের সাথে আনা সেকোনালের ছোট্ট বোতল আর প্লাস্টিক ব্যাগটা-ঘরের মধ্যে যেন রক্ষাকবচ হয়ে ঝুলে আছে ঐ ছবিগুলো।
গলাখাকারি দিল সে। ‘ছাপ তোলো!’
‘কী?’ জিজ্ঞেস করল কুপার।
‘পাথরটার।’
প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল সেলিট্টো।
‘পাথরটা ওখানে মানায় না,’ বলল রাইম। ‘দুটো দুই মেরুর জিনিস। কেন ওখানে ছিল জানতে চাই। ওটার ছাপ তোলো।’
চিমটা দিয়ে পাথরটা তুলে পরীক্ষা করল কুপার। গগলস পরে পলি-লাইট দিয়ে পাথরটার উপর আলো ফেলল সে-গাড়ির ব্যাটারির সমান সাইজের একটা পাওয়ার প্যাক, সাথে আলোর দণ্ড লাগানো।
‘কিছু নেই,’ বলল কুপার।
‘ভিএমডি?’
অমসৃণ তলে আঙুলের ছাপ তোলার জন্য ভ্যাকুয়াম মেটাল ডিপোজিশন বা ভিএমডি হলো সেরা পদ্ধতি। ভ্যাকুয়াম চেম্বারে সোনা বা দস্তা বাষ্পায়িত করা হয়; সেই ধাতু আঙুলের সুপ্ত ছাপের উপর প্রলেপ ফেলে রেখা আর খাঁজগুলোকে দৃশ্যমান করে তোলে। কিন্তু কুপারের সঙ্গে ভিএমডি নেই।
‘কী আছে তোমার কাছে?’ খুশি হতে পারল না রাইম।
‘সুদান ব্ল্যাক, স্টেবিলাইজড ফিজিক্যাল ডেভেলপার, আয়োডিন, অ্যামিডো ব্ল্যাক, ডিএফও আর জেনশিয়ান ভায়োলেট, ম্যাগনা-ব্রাশ।’ খসখসে তলে ছাপ তোলার জন্য নিনহাইড্রিন আর মসৃণ তলের জন্য সুপার গ্লু ফ্রেমও এনেছে সে।
বছর কয়েক আগের এক চাঞ্চল্যকর খবরের কথা মনে পড়ল রাইমের: জাপানের ইউ.এস. আর্মি ল্যাবের এক টেকনিশিয়ান ভাঙা ক্যামেরা জোড়া লাগাতে গিয়ে সুপার গ্লু ব্যবহার করেছিল এবং অবাক হয়ে দেখেছিল আঠার ধোঁয়ায় আঙুলের ছাপ ফুটে উঠছে, যা এই কাজের জন্য তৈরি কেমিক্যালের চেয়েও ভালো কাজ করে।
কুপার এখন সেই পদ্ধতিই ব্যবহার করল। চিমটা দিয়ে পাথরটা একটা কাচের বাক্সে রাখল, ভেতরের হট প্লেটে এক ফোঁটা আঠা দিল। মিনিট কয়েক পর পাথরটা বের করে আনল।
‘কিছু একটা পাওয়া গেছে,’ বলল সে।
লং-ওয়েভলেংথ ইউভি পাউডার ছড়িয়ে দিয়ে পলি-লাইটের আলো ফেলল ওটার উপর। একটা ছাপ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। একদম মাঝখানে। পোলারয়েড সিইউ-৫ ক্যামেরা দিয়ে ছবিটা তুলল কুপার। ছবিটা রাইমকে দেখাল সে।
‘আরো কাছে ধরো।’ চোখ কুঁচকে ওটা পরীক্ষা করল রাইম। ‘হ্যাঁ! গড়িয়ে দিয়েছে সে।’
কোনো কিছু তোলার সময় যে ছাপ পড়ে, তার চেয়ে আঙুল গড়িয়ে দিলে ভিন্ন ছাপ পড়ে। পার্থক্যটা খুবই সূক্ষ্ম… প্যাটার্নের বিভিন্ন বিন্দুতে রেখার বিস্তারে সেই তফাতটা ধরা পড়ে। কিন্তু রাইম এখন সেটা পরিষ্কার বুঝতে পারল।
‘আর ওটা কী? ঐ দাগটা?’ ভাবল সে। ‘ঐ রেখাটা।’ ছাপের উপর অস্পষ্ট চাঁদের মতো একটা দাগ।
‘দেখতে অনেকটা…’
‘হ্যাঁ,’ বলল রাইম, ‘ওটা ওর নখের দাগ। সাধারণত এমন দাগ পাওয়া যায় না। তবে আমার ধারণা পাথরটা যে কুড়িয়ে নেওয়া হবে, তা নিশ্চিত করতেই ওটা কাত করে রেখেছিল সে। এতে একটা তেলের ছাপ পড়েছে। অনেকটা ফ্রিকশন রিজের মতো।’
‘অমন করতে যাবে কেন সে?’ জানতে চাইল স্যাক্স।
কেউ তার মতো দ্রুত ব্যাপারটা ধরতে পারছে না দেখে আবারো মেজাজ খারাপ হলো তার। কাঠখোট্টা গলায় ব্যাখ্যা দিল, ‘দুটো জিনিস জানাচ্ছে সে। প্রথমত, সে নিশ্চিত করছে যাতে আমরা বুঝতে পারি ভিকটিম একজন মহিলা। যদি সকালের লাশের সাথে এর যোগসূত্র বের করতে না পারি, সেই ভয়ে।’
‘তাতে লাভ?’ প্রশ্ন করল ব্যাংকস।
‘বাজির দর বাড়ানোর জন্য,’ বলল রাইম। ‘আমাদের আরো বেশি ঘামানোর জন্য। সে জানাচ্ছে একজন মহিলা বিপদে আছে। ভিকটিমের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে সে-ঠিক যেমনটা আমরা সবাই করি-যদিও মুখে স্বীকার করি না।’
স্যাক্সের হাতের দিকে চোখ পড়ল রাইমের। অবাক হলো দেখে, এত সুন্দরী একটা মেয়ে, অথচ আঙুলগুলোর কী বেহাল দশা! চারটা আঙুলে ব্যান্ড-এইড প্যাঁচানো, বাকিগুলো কামড়ে খুবলে ফেলা হয়েছে। একটার চামড়ায় জমাটবাঁধা কালচে রক্ত। ভ্রুর নিচেও লালচে ফোলা ভাব লক্ষ্য করল সে-নিশ্চয়ই প্লাক করার ফল। কানের পাশে একটা খামচির দাগ। সব আত্মধ্বংসী স্বভাব। বড়ি আর আরমানিয়াক ছাড়াও নিজেকে শেষ করার হাজারটা উপায় আছে।
ঘোষণা করল রাইম, ‘দ্বিতীয় যে কথাটা সে বলছে, সেটা সম্পর্কে আগেই সতর্ক করেছি তোমাদের। সে আলামত সম্পর্কে জানে। বলছে, সাধারণ ফরেনসিক আলামত খুঁজে সময় নষ্ট কোরো না। আমি ওসব রেখে আসব না। এটা অবশ্য সে ভাবছে, সরাসরি বলছে না। কিন্তু আমরা কিছু না কিছু খুঁজে বের করবই। বাজি ধরে বলতে পারি।’
হঠাৎ ভ্রু কুঁচকে এল রাইমের। ‘ম্যাপটা! ম্যাপটা দরকার আমাদের। টম!’
সহকারী বলে উঠল, ‘কোন ম্যাপ?’
‘তুমি জানো কোন ম্যাপ।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলল টম। ‘কোনো ধারণা নেই, লিংকন।’
জানালার বাইরে তাকিয়ে বিড়বিড় করল রাইম, নিজের সাথেই কথা বলছে যেন, ‘রেললাইনের আন্ডারপাস, চোরাই মদের সুড়ঙ্গ আর দরজা, অ্যাসবেস্টস-সবই পুরোনো আমলের। প্রাচীন নিউ ইয়র্ক পছন্দ তার। র্যান্ডেল ম্যাপটা চাই আমার।’
‘সেটা কোথায়?’
‘আমার বইয়ের রিসার্চ ফাইলে। আর কোথায়?’
ফোল্ডার ঘেঁটে ম্যানহাটনের লম্বা, আড়াআড়ি একটা ম্যাপের ফটোকপি বের করল টম। ‘এটা?’
‘ওটাই, হ্যাঁ!’
১৮১১ সালে ম্যানহাটনের রাস্তাঘাটের নকশা করার জন্য সিটি কমিশনারদের নির্দেশে তৈরি হয়েছিল র্যান্ডেল সার্ভে ম্যাপ। ম্যাপটা আড়াআড়িভাবে প্রিন্ট করা, বাঁ দিকে ব্যাটারি পার্ক বা দক্ষিণ, আর ডান দিকে হার্লেম বা উত্তর। এভাবে দেখলে দ্বীপটাকে মনে হয় একটা উল্লম্ফনরত কুকুর, আক্রমণের জন্য সরু মাথাটা উঁচু করে আছে।
‘ওখানে টাঙিয়ে দাও। গুড।’
সহকারী যখন কাজটা করছে, তখন রাইম বলল, ‘টম, তোমাকে আমরা ডেপুটি বানিয়ে নেব। ওকে একটা চকচকে ব্যাজ বা অমন কিছু দিয়ে দাও, লন।’
‘লিংকন,’ বিরক্তিভরা কণ্ঠে বিড়বিড় করল সে।
‘তোমাকে দরকার আমাদের। আরে, স্যাম স্পেড বা কোজাক হওয়ার শখ না ছিল তোমার?’
‘শুধু জুডি গারল্যান্ড হওয়ার শখ ছিল,’ জবাব দিল সহকারী।
‘তাহলে গোয়েন্দা জেসিকা ফ্লেচারই সই। তুমি প্রোফাইল লিখবে। চলো এবার, শার্টের পকেটে যে ম ব্লাঁ কলমটা সাজিয়ে রাখো সেটা বের করো।’
চোখ উল্টে পার্কার কলমটা বের করল যুবকটি, টেবিলের নিচ থেকে ধুলোমাখা হলুদ প্যাড টেনে নিল।
‘না, আরো ভালো বুদ্ধি আছে,’ ঘোষণা করল রাইম। ‘ঐ পোস্টারগুলোর একটা টাঙাও। ঐ আর্ট পোস্টারগুলো। উল্টো করে লাগাও, পেছনের সাদা দিকটায় মার্কার দিয়ে লেখো। বড় বড় করে লিখবে। যাতে দেখতে পাই আমি।’
মনে-র আঁকা শাপলা ফুলের একটা পোস্টার বেছে নিয়ে দেয়ালে সাঁটাল টম।
‘উপরে লেখো: আনসাব ৮২৩,’ হুকুম দিল ক্রিমিনালিস্ট। ‘তারপর চারটা কলাম। চেহারা। বাসস্থান। গাড়ি। অন্যান্য। চমৎকার। এবার শুরু করা যাক। ওর ব্যাপারে কী জানি আমরা?’
সেলিট্টো বলল, ‘গাড়ি… একটা ইয়েলো ক্যাব আছে ওর।’
‘ঠিক। আর অন্যান্য-র নিচে লেখো সে ক্রাইম সিন পদ্ধতি জানে।’
‘যার মানে,’ যোগ করল সেলিট্টো, ‘হয়তো জেল খেটেছে সে।’
‘কীভাবে?’ জানতে চাইল টম।
‘ওর রেকর্ড থাকতে পারে,’ ব্যাখ্যা দিল ডিটেকটিভ।
ব্যাংকস বলল, ‘ও যে পয়েন্ট থ্রি-টু কোল্ট ব্যবহার করে সেটা কি লেখা উচিত?’
‘অবশ্যই,’ সায় দিল তার বস।
রাইম যোগ করল, ‘আর সে এফআর চেনে…’
‘কী?’ টম জিজ্ঞেস করল।
‘ফ্রিকশন রিজেস-আঙুলের ছাপ। ওগুলোকে তাই বলে, জানো তো, হাত আর পায়ের রেখা যা আমাদের ঘর্ষণ বা গ্রিপ দেয়। আর লেখো যে সম্ভবত কোনো সেফ হাউজ বা গোপন আস্তানা থেকে কাজ চালাচ্ছে সে। দারুণ কাজ করছ, টম। দেখো ওকে। জন্মগত আইনের রক্ষক।’
চোখ পাকিয়ে তাকাল টম, দেয়াল থেকে সরে এসে শার্ট থেকে মাকড়সার ঝুল ঝাড়ল।
‘এই তো হয়ে গেল,’ বলল সেলিট্টো। ‘মিস্টার ৮২৩-এর প্রথম ঝলক।’
মেল কুপারের দিকে ফিরল রাইম।
‘এবার, বালিটা। ওটা সম্পর্কে কী জানা গেল?’
কপালে গগলস তুলে দিল কুপার। স্লাইডে কিছুটা স্যাম্পল নিয়ে পোলারাইজড-লাইট মাইক্রোস্কোপের নিচে রাখল। ডায়ালগুলো ঠিক করল।
‘হুম। অদ্ভুত। কোনো বাইরিফ্রিঞ্জেন্স নেই।’
ক্রিস্টাল, সুতো বা অন্য কোনো পদার্থের ডাবল রিফ্র্যাকশন বা আলোর প্রতিসরণ ধরা পড়ে পোলারাইজিং মাইক্রোস্কোপে। সমুদ্রতীরের বালিতে প্রচুর বাইরিফ্রিঞ্জেন্স থাকে।
‘তার মানে ওটা বালি নয়,’ বিড়বিড় করল রাইম। ‘গুঁড়ো করা কিছু একটা…এটাকে কি ইনডিভিজুয়েট করা যাবে?’
ইনডিভিজুয়েট… ক্রিমিনালিস্টদের লক্ষ্যই ওটা। বেশিরভাগ ফিজিক্যাল এভিডেন্সই শনাক্ত করা যায়। কিন্তু জিনিসটা কী তা জানলেও সেটা হাজার হাজার উৎসের যেকোনো একটা থেকে আসতে পারে। ইনডিভিজুয়েটেড এভিডেন্স হলো এমন কিছু যা কেবল একটা উৎস বা খুবই সীমিতসংখ্যক উৎস থেকে আসতে পারে। আঙুলের ছাপ, ডিএনএ প্রোফাইল, বা গাড়ির রঙের চিপ যা আসামির গাড়ির ফাঁকা জায়গায় ধাঁধার টুকরোর মতো খাপ খেয়ে যায়।
‘হয়তো,’ টেকনিশিয়ান জবাব দিল, ‘যদি জিনিসটা কী তা বুঝতে পারি।’
‘কাচের গুঁড়ো?’ ধারণা করল রাইম।
কাচ মূলত গলানো বালি, কিন্তু কাচ তৈরির প্রক্রিয়ায় বালির ক্রিস্টাল স্ট্রাকচার বদলে যায়। কাচের গুঁড়োতে বাইরিফ্রিঞ্জেন্স পাওয়া যায় না।
নমুনাটা ভালো করে দেখল কুপার।
‘না, কাচ বলে মনে হচ্ছে না। জিনিসটা কী বুঝতে পারছি না। ইশ, এখানে যদি একটা ইডিএক্স থাকত!’
স্ক্যানিং ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের সাথে এনার্জি-ডিসপারসিভ এক্স-রে ইউনিট জুড়ে দেওয়া ক্রাইম ল্যাবের জনপ্রিয় এক যন্ত্র; ক্রাইম সিনে পাওয়া ট্রেস বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র নমুনায় কী কী উপাদান আছে তা বলে দিতে পারে ওটা।
‘ওকে একটা এনে দাও,’ সেলিট্টোকে হুকুম দিল রাইম, তারপর চোখ বোলাল ঘরের ভেতর। ‘আরো যন্ত্রপাতি লাগবে। একটা ভ্যাকুয়াম মেটাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট ইউনিটও চাই। আর একটা জিসি-এমএস।’
গ্যাস ক্রোমাটোগ্রাফ যেকোনো পদার্থকে ভেঙে তার উপাদানে আলাদা করে ফেলে, আর মাস ফটোস্পেকট্রোমেট্রি আলো ব্যবহার করে সেগুলোকে শনাক্ত করে। এই যন্ত্রগুলো দিয়ে এক গ্রামোস-এর দশ লক্ষ ভাগের এক ভাগ নমুনাও পরীক্ষা করা যায় এবং এক লাখ জানা পদার্থের ডেটাবেসের সাথে মিলিয়ে দেখা যায়।
সিএসইউ ল্যাবে ফোন করে ফর্দটা জানিয়ে দিল সেলিটো।
‘কিন্তু ঐসব খেলনার জন্য বসে থাকা যাবে না, মেল। পুরোনো পদ্ধতিতেই কাজ চালাতে হবে। ঐ নকল বালি সম্পর্কে আর কী জানো বলো।’
‘একটু মাটির সাথে মেশানো। দোআঁশ মাটি, কোয়ার্টজ, ফেল্ডস্পার আর মাইকার কণা আছে। তবে পাতা বা পচা উদ্ভিদের অংশ খুব কম। এখানে কিছু কণা আছে যা বেনটোনাইট হতে পারে।’
‘বেনটোনাইট।’ খুশি হলো রাইম। ‘ওটা এক ধরনের আগ্নেয় ছাই যা শহরের জলা জায়গায়, যেখানে বেডরক বা শক্ত মাটি অনেক গভীরে, সেখানে ভিত্তি খোঁড়ার সময় স্লারি বা কাদার মিশ্রণে ব্যবহার করে নির্মাতারা। এতে মাটি ধসে পড়া আটকায়। তার মানে, আমরা এমন কোনো উন্নত এলাকা খুঁজছি যেটা পানির কাছে বা উপরে, সম্ভবত থার্টি-ফোরথ স্ট্রিটের দক্ষিণে। ওটার উত্তরে বেডরক মাটির অনেক কাছে, তাই স্লারি দরকার হয় না।’
স্লাইডটা সরাল কুপার। ‘অনুমান করতে বললে বলব এটা মূলত ক্যালসিয়াম। দাঁড়ান, আঁশজাতীয় কিছু একটা আছে এখানে।’
নবটা ঘোরাল সে। রাইম ঐ আইপিস দিয়ে দেখার জন্য যা খুশি তাই দিতে রাজি। সেইসব সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে গেল যখন ধূসর স্পঞ্জ রাবারের উপর মুখ চেপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে সুতো, হিউমাস, রক্তের কোষ বা ধাতুর কণা ফোকাসে আসা-যাওয়া করতে দেখত।
‘এখানে আরো কিছু আছে। একটা বড় দানা। তিনটা স্তর। একটা শিং-এর মতো, তারপর ক্যালসিয়ামের দুটো স্তর। রঙের সামান্য তফাত। অন্যটা স্বচ্ছ।’
‘তিনটা স্তর?’ রাগে ফুঁসে উঠল রাইম। ‘আরেশশালা, ওটা তো ঝিনুকের খোলস!’ নিজের উপরেই রাগ হলো। আগেই বোঝা উচিত ছিল তার।
‘হ্যাঁ, ওটাই।’ মাথা নাড়ল কুপার। ‘ঝিনুক বলেই মনে হচ্ছে।’
শহরের আশেপাশে ঝিনুকের বেডগুলো মূলত লং আইল্যান্ড আর নিউ জার্সির উপকূলে। রাইম আশা করেছিল আনসাব তার ভৌগোলিক এলাকা কেবল ম্যানহাটন-এই সীমাবদ্ধ রাখবে-যেখানে আজ সকালে লাশটা পাওয়া গেছে।
বিড়বিড় করল সে, ‘যদি পুরো মেট্রো এলাকা চষে বেড়ায়, তবে খোঁজাখুঁজি করে লাভ নেই।’
কুপার বলল, ‘অন্য কিছু একটা দেখছি। মনে হয় চুন। তবে অনেক পুরোনো। দানাযুক্ত।’
‘কংক্রিট হতে পারে?’ মত দিল রাইম।
‘সম্ভবত। হ্যাঁ।’
‘তাহলে ঝিনুকের ব্যাপারটা মিলছে না,’ চিন্তিতভাবে বলল কুপার। ‘নিউ ইয়র্কের আশেপাশে ঝিনুকের বেডগুলো উদ্ভিদ আর কাদায় ভরতি থাকে। এটা কংক্রিটের সাথে মেশানো এবং এতে উদ্ভিদজাতীয় কিছু নেই বললেই চলে।’
আচমকা চেঁচিয়ে উঠল রাইম: ‘ঝিনুকের ধারগুলো কেমন, মেল?’
আইপিসে চোখ রাখল টেকনিশিয়ান। ‘ভাঙা, ক্ষয়ে যাওয়া নয়। শুকনো চাপে গুঁড়ো করা হয়েছে। পানিতে ক্ষয়ে যায়নি।’
র্যান্ডেল ম্যাপের উপর দিয়ে চোখ বোলাল রাইম, ডানে-বাঁয়ে স্ক্যান করল। লাফানো কুকুরের পাছার দিকে নজর স্থির করল।
‘পেয়েছি!’ চিৎকার করে উঠল সে।
১৯১৩ সালে এফ. ডব্লিউ. উলওয়ার্থ ষাট তলা যে দালানটা বানিয়েছিলেন সেটা এখনো তার নাম বহন করছে। পোড়ামাটির কাজ করা, গারগয়েল আর গোথিক ভাস্কর্যে মোড়ানো। ষোলো বছর ধরে ওটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু দালান। ম্যানহাটনের ঐ অংশে বেডরক ব্রডওয়ের একশো ফুটেরও বেশি নিচে হওয়ায় দালানটা গেঁথে রাখার জন্য শ্রমিকদের গভীর খাদ খুঁড়তে হয়েছিল।
কাজ শুরুর কিছুদিন পরেই ১৯০৬ সালে অপহৃত ম্যানহাটনের শিল্পপতি ট্যালবট সোমসের দেহাবশেষ আবিষ্কার করে শ্রমিকরা। লোকটার লাশ পাওয়া গিয়েছিল সাদা বালির মতো দেখতে এক পুরু স্তরের নিচে, যা আসলে ছিল গুঁড়ো করা ঝিনুকের খোলস। এই ঘটনা নিয়ে ট্যাবলয়েডগুলো বেশ মুখরোচক খবর ছেপেছিল, বিশেষ করে মোটা টাইকুনের ভোজনবিলাসের কথা উল্লেখ করে।
ম্যানহাটনের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে এই খোলসগুলো এতই সহজলভ্য ছিল যে মাটি ভরাটের কাজে ওগুলো ব্যবহার করা হতো। ওগুলোর কারণেই পার্ল স্ট্রিটের ঐ নাম।
‘ডাউনটাউনের কোথাও আছে মেয়েটা,’ ঘোষণা করল রাইম। ‘সম্ভবত ইস্ট সাইডে। আর হয়তো পার্ল স্ট্রিটের আশেপাশে। মাটির নিচে রাখা হয়েছে তাকে… পাঁচ থেকে পনেরো ফুট নিচে। হয়তো কোনো কনস্ট্রাকশন সাইট, কিংবা কোনো বেসমেন্ট। পুরোনো কোনো দালান বা সুড়ঙ্গ।’
‘ইপিএ ডায়াগ্রামের সাথে মিলিয়ে দেখো, জেরি,’ নির্দেশ দিল সেলিট্টো। ‘কোথায় কোথায় অ্যাসবেস্টস পরিষ্কার করা হচ্ছে।’
‘পার্ল স্ট্রিট বরাবর? কিচ্ছু নেই।’ হাউম্যানের সাথে যে ম্যাপটা দেখছিল সেটা তুলে ধরল তরুণ অফিসার। ‘তিন ডজন ক্লিন-আপ সাইট আছে-মিডটাউন, হার্লেম আর ব্রঙ্কসে। কিন্তু ডাউনটাউনে কিচ্ছু নেই।’
কেন?
‘অ্যাসবেস্টস… অ্যাসবেস্টস…’ আবারো ভাবল রাইম। ব্যাপারটা এত চেনা লাগছে
ঘড়িতে ২:০৫ বাজে।
‘বো, আমাদের বেরোতে হবে। তোমার লোকজনকে ওখানে পাঠাও, সার্চ শুরু করো। পার্ল স্ট্রিট ধরে সব দালানে। ওয়াটার স্ট্রিটেও।’
‘ম্যান।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল পুলিশ অফিসার। ‘সে তো প্রচুর দালান।’ দরজার দিকে পা বাড়াল সে।
সেলিট্টোকে বলল রাইম, ‘লন, তোমারও যাওয়া উচিত। শেষ মুহূর্তে ফয়সালা হবে মনে হচ্ছে। যত লোক পাওয়া যায় লাগবে ওদের। অ্যামেলিয়া, আমি চাই তুমিও ওখানে যাও।’
‘দেখো, আমি ভাবছিলাম…’
‘অফিসার!’ ধমকে উঠল সেলিট্টো। ‘অর্ডার মানো।’
সুন্দরীর মুখের উপর দিয়ে এক ঝলক বিরক্তি খেলে গেল।
কুপারকে বলল রাইম, ‘মেল, তুমি কি বাসে করে এসেছ?’
‘একটা আরআরভি,’ জবাব দিল সে।
শহরের বড় ক্রাইম সিন বাসগুলো আসলে বড় ভ্যান, চিমনিগুলো আর আলামত সংগ্রহের সরঞ্জামে ঠাসা, আর অনেক ছোট শহরের ল্যাবের চেয়েও উন্নত। কিন্তু রাইম যখন আইআরডি চালাত, তখন ছোট ক্রাইম সিন ভেহিকল বা গাড়ির অর্ডার দিয়েছিল-মূলত স্টেশন ওয়াগন-যাতে দরকারি কালেকশন আর অ্যানালাইসিস ইকুইপমেন্ট থাকত। র্যাপিড রেসপন্স ভেহিকল বা আরআরভিগুলো দেখতে সাধারণ হলেও রাইম ট্রান্সপোর্ট বিভাগকে দিয়ে ওগুলোতে টার্বোচার্জড পুলিশ ইন্টারসেপ্টর ইঞ্জিন লাগিয়ে নিয়েছিল। পেট্রোল স্কোয়াড কারের আগেই ওগুলো প্রায়ই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যেত; একাধিকবার ফার্স্ট অফিসার হিসেবে অভিজ্ঞ ক্রাইম সিন টেকনিশিয়ানরাই আগে পৌঁছেছে। যা কিনা যেকোনো প্রসিকিউটরের স্বপ্ন।
‘অ্যামেলিয়াকে চাবিটা দাও।’
স্যাক্সের হাতে চাবিটা দিল কুপার। এক মুহূর্ত রাইমের দিকে তাকিয়ে রইল স্যাক্স, তারপর ঝটকা মেরে ঘুরে গটগট করে নেমে গেল সিঁড়ি দিয়ে। এমনকি তার পায়ের শব্দেও যেন রাগ ঝরছে।
‘ঠিক আছে, লন। কী বলবে বলো?’
খালি হলওয়ের দিকে তাকাল সেলিট্টো, তারপর রাইমের কাছে এগিয়ে এল। ‘তুমি সত্যিই পি.ডি.-কে চাইছ? এই কাজের জন্য?’
‘পি.ডি.?’
‘মানে ওকে। স্যাক্সকে। পি.ডি. ওর ডাকনাম।’
‘মানে কী?’
‘ওর সামনে বোলো না। ক্ষেপে যায়। ওর বাবা চল্লিশ বছর বিট পুলিশ ছিল। তাই ওকে সবাই পোর্টেবলস ডটার বা পি.ডি. বলে ডাকে।’
‘তোমার কি মনে হয় ওকে বেছে নেওয়া উচিত হয়নি আমার?’
‘না, হয়নি। ওকে কেন চাইছ?’
‘কারণ সিন যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য ত্রিশ ফুট খাড়া বাঁধ বেয়ে নেমেছিল সে। একটা বড় রাস্তা আর অ্যামট্র্যাক লাইন বন্ধ করে দিয়েছিল। একেই বলে উদ্যোগী।’
‘আরে রাখো তো, লিংক। ডজনখানেক সিএস পুলিশ চিনি যারা এমনটা করত।’
‘যাই হোক, ওকেই চেয়েছি আমি।’
সেলিট্টোর দিকে গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকাল রাইম, কথা না বাড়িয়ে বুঝিয়ে দিল তাদের চুক্তির শর্ত কী ছিল।
‘আমি শুধু এটুকুই বলব,’ বিড়বিবিড় করল ডিটেকটিভ, ‘একটু আগে পোলিংয়ের সাথে কথা হলো। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার জন্য পেরেত্তি ভয়ানক ক্ষেপে আছে। আর যদি উপরমহল জানতে পারে যে পেট্রোলের কেউ ক্রাইম সিনের দায়িত্বে আছে, তখন কেলেঙ্কারি বেঁধে যাবে।’
‘সম্ভবত,’ প্রোফাইল পোস্টারটার দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বলল রাইম। ‘তবে আমার মনে হচ্ছে আজকের দিনে ওটা আমাদের সবচেয়ে ছোট সমস্যা হতে যাচ্ছে।’
এই বলে ক্লান্ত মাথাটা এলিয়ে দিল নরম পালকের বালিশে।
