হেঁয়ালির অন্ধকারে – ৮

গত পরশু মানে শুক্রবার বিষ্ণুমূর্তিসহ পুরুলিয়া থেকে কলকাতায় ফিরেছে ঝিনুকরা। ফণিবাবু এখন পুলিশের হেফাজতে। জেঠুমণির শরীর ভালর দিকে। আরও এক সপ্তাহ থাকতে হবে নার্সিংহোমে। উনি বাড়ি ফিরলে আবিরবাবু যাবেন দেখা করতে।

হিসেবমতো পরশু দিনই কেসের যবনিকা পতন হয়েছে। পুরুলিয়াতেই বিষ্ণুমূর্তিটা আবিরবাবুর হাতে দিয়ে দীপকাকু বলেছিলেন, “আমার কাজ তা হলে শেষ!”

বিস্মিত আবিরবাবু বলেন, “সে কী মশাই! কেসের তো এখন অর্ধেকটাই বাকি। মূর্তিটা কেন দামি, বাবার লেখা হেঁয়ালিটার মানে, কিছুই তো জানা হল না!”

“এত কিছু তো কন্ট্রাক্টে ছিল না। আপনি শুধু আমাকে মূর্তিটা খুঁজে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। নাউ ডিল ইজ ওভার।” বলেন দীপকাকু।

আবিরবাবু বলেন, “তা আবার হয় নাকি মশাই! মূর্তিরহস্য আপনি ভেদ করে বসে থাকবেন, আমি কিছুই জানব না, কৌতূহল দমন করার এত ক্ষমতা আমার নেই। তা ছাড়া বিষ্ণুমূর্তির প্রকৃত দাম আপনি যদি না বলে দেন, আমার বংশপরম্পরায় ব্যাপারটা অজানা থেকে যাবে। আপনার সঙ্গে থেকে তো দেখলাম, কী ভয়ংকর জটিল এই কেস!” একটু থেমে আবার বলেন, “ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, একটা কথা বলি?”

“বলুন!” বলেন দীপকাকু

আবিরবাবু বলেন, “কন্ট্রাক্টে যখন ছিল না বলছেন, বাকিটুকু জানার জন্য আমি আপনাকে এক্সট্রা চার্জ দিতে রাজি আছি। যদিও আপনি যা করেছেন, টাকা দিয়ে তার হিসেব হয় না।”

উত্তর দেওয়ার আগে কিছুক্ষণ ভেবে নেন দীপকাকু। বলেন, “আসলে কী জানেন, কেসের বাকি অংশটা আপনার এখন না জানলেও চলত। মূৰ্তিটা ভীষণ দামি, এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। মূর্তির অধিকার সম্পূর্ণ আপনার। উইল করে দিয়েছেন জেঠুমণি। আপনি আবার ওটা ব্যাঙ্কের ভল্টে রেখে দিতে পারেন। একই সঙ্গে এটাও ঠিক বলেছেন, আমি যদি পুরো রহস্য উন্মোচন না করি, আপনার বংশের কেউ হয়তো মূর্তিটার মূল্য না বুঝে কাউকে গিফ্ট করে দেবে, অথবা বিক্রি করে দেবে নামমাত্র দামে।”

“তা হলেই বলুন, আমি ঠিক বলছি কি না?” ফের একবার সায় চেয়েছিলেন আবিরবাবু।

দীপকাকু বলেন, “ঠিক আছে। কালকের দিনটা একটু রেস্ট নিয়ে নিই। রবিবার আপনি মূর্তিটা নিয়ে ঝিনুকদের বাড়ি চলে আসুন। আপনার মেয়ে এবং মিসেসকেও নিয়ে আসবেন। আমি কথা দিচ্ছি, নাটকের শেষ অঙ্কটা খুবই জমজমাট হবে। রজতদা, মানে ঝিনুকের বাবাও থাকবেন। ওঁর সামনে কেসের পরিসমাপ্তি করতে আলাদা তৃপ্তি পাই আমি।”

সেদিনই ঠিক হয়েছিল আজ সকাল ন’টায় দীপকাকু আসবেন ঝিনুকদের বাড়িতে। পৌনে দশটা বাজতে চলল, এখনও দেখা নেই। এদিকে বাড়িভরতি লোক তাঁর অপেক্ষায়। বিষ্ণুমূর্তি নিয়ে চলে এসেছেন আবিরবাবু। সুমনাকাকিমা, মেয়ে তিতলিও এসেছে। তিতলি ভীষণ কিউট, কী টক-টকর করে কথা বলে! আরও পাঁচজন এসেছে বাড়িতে। এরা দর্শক হিসেবে থাকবে, দীপকাকু এখনও জানেন না। জানাতে গেলে যদি আপত্তি করেন, সেই ভয়ে জানায়নি ঝিনুক। এই পাঁচমূর্তি হচ্ছে— শ্রবণা, রুদ্রাণী, এলা, রাহুল, অয়ন। এরা সুযোগ পেলেই ঝিনুকের অ্যাসিস্ট্যান্টগিরি নিয়ে মজা করে। ঝিনুক ঠিক করেছে, আজ ওদের দেখাবে রহস্য উন্মোচনের সময়টা কী এক্সাইটিং আর আনন্দের!

দীপকাকুর দেরি দেখে ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠছে ঝিনুক। বাকিরা নিজেদের মধ্যে একটা আড্ডার পরিবেশ তৈরি করে নিয়েছেন। এক রাউন্ড চা ইতিমধ্যে সাপ্লাই দিয়েছেন মা। দীপকাকুর অপেক্ষাতেই এক্সক্লুসিভ জলখাবারটা এখনও সার্ভ করেননি। খানিকটা অস্থির হয়েই ঝিনুক বাবাকে বলল, “কী ব্যাপার বলো তো! এত দেরি করছেন কেন! একটা ফোন করে দেখি?”

বাবা বললেন, “দরকার নেই। এসে যাবে। আসলে জিনিয়াসদের এরকমই হয়! যখন কাজের মধ্যে থাকেন নাওয়া-খাওয়ার খেয়াল থাকে না। কাজ শেষ হলে বিশ্রাম একটু লম্বা নিয়ে ফেলেন। দ্যাখো, আজ হয়তো ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়েছে।”

বাবার কথা শেষ হতেই বাইকের আওয়াজ এসে থামল বাড়ির গেটে। ঝিনুক লাফিয়ে উঠে দরজা খুলতে গেল। ব্যথায় টনটন করে উঠল পা। পুরুলিয়ায় লাগা চোটের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছে সে।

দীপকাকুই এসেছেন। বেশি দর্শক সমাগম দেখে কপালে ভাঁজ পড়ল। বাবা ডেকে নিলেন, “এসো দীপঙ্কর, সবাই তোমার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।”

সোফায় গিয়ে বসলেন দীপকাকু। কপালের ভাঁজ এখনও মেলায়নি। ঝিনুক বুঝতেই পারল, বন্ধুদের উপস্থিতি কাকু পছন্দ করছেন না। বিষয়টা সহজ করার জন্য ঝিনুক প্রথমে বন্ধুদের নাম বলে বলে দীপকাকুর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। তারপর বলল, “আমার কাছে গল্প শুনে এরা সকলেই আপনার ফ্যান। এবারের কেসের শুরুতে ওরাই ছিল আমার সঙ্গে। যখন আবিরবাবুর গাড়ি থেকে ব্যাগ চুরি যায়। ওদের অনেক দিনের ইচ্ছে, আপনার সঙ্গে আলাপ করার। এই কেসের ঘটনাগুলো ওদের বলেছি।”

কপাল স্বাভাবিক হল দীপকাকুর। বললেন, “আমি চাইছিলাম আজকের আলোচনাটা নির্দিষ্ট ক’জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক। কারণ, এখন যা জানা যাবে, যদি বাইরে প্রকাশ হয়ে যায়, বিপর্যস্ত হতে পারে আবিরবাবুর ব্যক্তিগত জীবন।”

রাহুল বলে উঠল, “দীপকাকু, আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, এই মিটিং-এর কোনও কথাই আমাদের কাছ থেকে বাইরে বেরবে না।”

“প্রমিস করছ সবাই?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

পাঁচজনই একবার করে ‘প্রমিস’ শব্দটা উচ্চারণ করল। দীপকাকুর মুখ দেখে বোঝা গেল, ভরসা পেলেন। আবিরবাবুকে বললেন, “মূর্তিটা সেন্টার টেবিলে রাখুন। হেঁয়ালি লেখা চিরকুট আমার হাতে দিন।”

নির্দেশ মতো কাজ করলেন আবিরবাবু। দীপকাকু শুরু করলেন, “এবারের কেসটা কত অ্যাডভেঞ্চারাস ছিল, তার চিহ্ন হাতে-পায়ে নিয়ে এসেছে ঝিনুক। সে-সব ঘটনা নিশ্চয়ই ওর থেকে শোনা হয়ে গিয়েছে সকলের?”

কথার মাঝে হাতে ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন মা। ট্রে-তে জলখাবারের প্লেট। ঝিনুক মা-কে হেল্প করতে উঠে গেল। মনের মধ্যে অস্বস্তি শুরু হয়েছে ঝিনুকের। দীপকাকু এমন একটা প্রসঙ্গ দিয়ে কথা শুরু করেছেন, ফল্স পজিশনে পড়ে যেতে পারে ঝিনুক। হাত-পায়ের চোটের ব্যাপারে মা-কে বলেছে এক কথা, বন্ধুদের কাছে গেয়েছে অন্য সুর। ব্যান্ডেজ, ব্যান্ডএডে ওকে দেখে আঁতকে উঠেছিলেন মা। ঝিনুক বলেছিল, ‘সামান্য হোঁচট খেয়েছি। পাহাড়ের রাস্তায় ওরকম একটু হয়!’ ওই চিহ্নগুলোই বন্ধুদের দেখিয়ে ঘটনার বর্ণনা অতিরঞ্জিত করেছে। যেমন, ‘খড়্গপুরে লোকটাকে এমন মারলাম, আট ফুট ছিটকে গিয়ে পড়ল। পরেরবার এক কিক-এ লোকটাকে চলন্ত বাইক থেকে ফেলে দিলাম।’ শেষবারের অ্যাকশনটা বলতে গিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছে। ‘দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে দেখি, আটজন লোক। নানারকম স্ট্রোক মেরে পাঁচ মিনিটের মধ্যে ধরাশায়ী করলাম সকলকে!

“ফ্যান্টাস্টিক!”

দীপকাকুর গলা শুনে চমকে উঠল ঝিনুক, মনের কথা পড়ে নিলেন নাকি? না, তা নয়। মায়ের তৈরি মাংসের চপ মুখে পুরে কমপ্লিমেন্ট দিলেন।

সবাইকে প্লেট সার্ভ করে ঝিনুক নিজের জায়গায় বসল। দীপকাকু বললেন, “খেতে খেতেই কথা হোক।”

তিতলি ছাড়া সকলেই ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল। ছোট্টটা এখন খাওয়ায় মন দিয়েছে। ফের শুরু করলেন কাকু, “আমাদের তদন্তের স্টেপগুলো ঝিনুক আপনাদের জানিয়েছে। অপরাধীর নামও আপনারা জানেন। আমি বলব মোটিভ। কেন আবিরবাবুর বড়দা এই কাজটা করলেন? কারণ, মানুষটি প্রকৃত ব্যবসায়ী ছিলেন না। উনি মনে করতেন, বিজনেসে উন্নতি করতে হলে অসৎ উপায় একমাত্র পথ। এই বুদ্ধিতে পারিবারিক সূত্রে পাওয়া কাঠের ব্যাবসাটা ডুবিয়েছেন। পরে ট্রান্সপোর্ট এবং গাড়ি মেরামতির ব্যাবসায় নামেন। সেটাও ভাল চলছিল না। টাকাপয়সার জন্য প্রায়ই দ্বারস্থ হতেন জেঠুমণির। এ ব্যাপারে ছোটভাই, আবিরবাবুর ভাইপো, কেউ কম যেতেন না। ওঁদের ধারণা ছিল, জেঠুমণির কাছে সঞ্চিত বেশকিছু অর্থ আছে। ট্রেনের ডাকাতিতে সব সম্পত্তি খোয়া যায়নি। জেঠুমণির ত্যাগ, কর্তব্যপরায়ণতাকে ওঁরা সম্মান জানাননি। এদিক থেকে আবিরবাবু ছিলেন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র স্বভাবের। ন্যায্য কারণে জেঠুমণি তাঁকে স্নেহ করতেন সবচেয়ে বেশি। সেই স্নেহভাজনকে কিচ্ছু না দিয়ে দুই ভাইকে সমস্ত সম্পত্তি ভাগ করে দেওয়াটাকে সন্দেহের চোখে দেখেছিলেন বড়ভাই ফণিভূষণ। সেই জন্যেই পুরুলিয়া-ফেরত ছোটভাইয়ের পিছনে লোকে লাগিয়ে দেন। লোকটি আবিরবাবুর ফ্ল্যাটের উলটো দিকে রামকৃষ্ণ লজে ওঠে। সর্বক্ষণ নজর রাখত আবিরবাবুর উপর। ফণিভূষণ একবার ওই লজে যান। নান্টুর দেওয়া চেহারার বর্ণনা থেকে মোটামুটি আন্দাজ করা যায়। চুরি হয় মূর্তি। গোটা প্ল্যানটা সাজান ফণিভূষণ। ব্যাঙ্ক ম্যানেজারকে ফোন করেন উনিই। ম্যানেজার আমাদের বলেছিলেন, ফোনের গলা শুনে মনে হয়েছিল, মাঝবয়সি শিক্ষিত বাঙালির কণ্ঠ। ফোনটা করা হয় বেলেঘাটার ফুলবাগান অঞ্চলের বুথ থেকে।” দম নিতে থামলেন দীপকাকু। ফাঁকা প্লেট নামিয়ে রাখলেন মেঝেয়। আবার শুরু করলেন, “মূর্তিটা পেয়ে ধন্ধে পড়ে যান ফণিভূষণ। যারা অ্যান্টিক জিনিস সংগ্রহ করে, তাদের দেখিয়ে জানতে পারেন, মূর্তিটার প্রত্নমূল্য প্রায় নেই। ধাতুবিশেষজ্ঞ জানান, এটা নেহাতই পিতলের তৈরি। বিশ্বাস হয় না ফণিবাবুর। কারণটা যুক্তিসংগত। ফণিবাবু দেখেছেন, ছোটভাইকে আসল মূর্তি দিয়ে জেঠুমণি সিংহাসনে রেখেছেন নকল মূর্তি। এই গোপনীয়তা থেকেই আন্দাজ করা সহজ, আসল মূর্তির নিশ্চয়ই কোনও বৈশিষ্ট্য আছে। সেটা জানার জন্য ফণিবাবু চড়াও হন জেঠুমণির ঘরে। সঙ্গে আসল মূর্তিটাও নিয়ে যান। মূর্তি বেহাত হয়ে গেছে দেখে অসুস্থ হয়ে পড়েন জেঠুমণি। ওঁর শেষ চেষ্টা ছিল নারায়ণবাবুর দেওয়া চিরকুটটা বাঁচানো। পৌঁছতে চেয়েছিলেন ঠাকুরঘরে, তার আগেই পড়ে যান। ছুটে আসে সরলামাসি। ‘সিংহ’ কথাটা দু’বার উচ্চারণ করেন জেঠুমণি। তারপরই জ্ঞান হারান। আমি জেঠুমণির ডায়েরি পড়ে জেনেছি, অসমের সম্পদ নষ্ট হয়নি। ওই ‘সিংহ’ শব্দটাই আমাকে ঠাকুরের সিংহাসনের কাছে নিয়ে যায়। পেয়ে যাই হেঁয়ালি লেখা কাগজটা। আমাদের পুরুলিয়া যাওয়াটা প্রথম থেকেই সন্দেহের চোখে দেখেছেন ফণিবাবু। জেঠুমণির কাছে শুনেছিলেন, ছোটভাই বন্ধু নিয়ে আসছে। মূর্তি খুইয়ে ভাই তো আর নিশ্চিন্তে বেড়াতে আসবে না। জেঠুমণিকে বলবে ঘটনাটা। তখন জেঠুমণি যদি আসল ব্যাপারটা বলে দেন, এই আশঙ্কায় খড়্গপুর স্টেশনেই আমাদের আসাটা বানচাল করতে চেয়েছিলেন। ঝিনুকের মার এবং বুদ্ধি করে পুরুলিয়ার আগের স্টেশনে আমাদের নেমে যাওয়া দেখে ফণিবাবু বুঝে যান, আমরা সাধারণ লোক নই। আমাদের উপর নজর রাখা শুরু হয়। যার সুফলে উনি চ্যালা মারফত খবর পান, মূর্তিরহস্য ভেদ করা আমার পক্ষে সম্ভব। চাপ দিয়ে কথা বার করার জন্য আমাকে অপহরণ করা হয়। ঝিনুকের বুদ্ধি, সাহস এবং পুলিশের তৎপরতায় আমি মুক্তি পাই। আবিরবাবুকেও ধন্যবাদ জানানো উচিত। যে-কোনও পরিস্থিতিতে ঠান্ডা মাথায় উনি তদন্তে সাহায্য করে গিয়েছেন।”

থামলেন দীপকাকু। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে সবাই। টেবিলে রাখা বিষ্ণুমূর্তিটাকেও মনে হচ্ছে নীরব শ্রোতা। জানলা গলে আলো এসে পড়েছে মূর্তির পাশে, বেশ চকচক করছে। মূর্তিটা যেন উদ্‌গ্রীব হয়ে চাইছে, ওকে ঘিরে থাকা রহস্য এখনই উন্মোচিত হোক। তিতলিটা কী বুঝছে কে জানে! চুপ করে আছে সেই থেকে।

চা খাওয়া প্রায় শেষ হতে চলল দীপকাকুর, কিছু বলছেন না। ঝিনুক খেয়াল করিয়ে দিল, “হেঁয়ালির মানেটা?”

“বলছি।” বলে, চা শেষ করে কাপ নামালেন দীপকাকু। চিরকুটটা বুকপকেট থেকে বার করে হাতে রাখলেন। না দেখেই বলতে লাগলেন, “প্রথম দুটো লাইন হচ্ছে: ‘হরিণের শিঙে মাছি বসে না/ তোমার আলো কখনও নেভে না। অর্থাৎ…”

বাদ সাধলেন আবিরবাবু, “আচ্ছা, হরিণের শিঙে কি সত্যিই মাছি বসে না?” দীপকাকু বললেন, “বসে। বসতেই পারে। এই লাইনটা কোনও প্ৰবাদ থেকে নেওয়া। প্রতীকী অর্থে বলা হয়েছে। হরিণ চঞ্চল, তাই মাছি বসতে পারে না অথবা হরিণের শিং এতই মসৃণ, মাছি পিছলে যায়। দুটোর মধ্যেই ততটা সত্যতা নেই। হরিণ শান্ত হয়ে দাঁড়িয়েও থাকে, শিং তেমন মসৃণও নয়। দ্বিতীয় লাইনটাও প্রতীকী: ‘তোমার আলো কখনও নেভে না।’ নারায়ণ বসু যার অথবা যে বস্তুর উদ্দেশে কথাটা বলছেন, তার আলোও নেভানো যায়। সেটা ক্রমশ প্রকাশ্য। আসলে প্রথম লাইনটা দিয়েই হেঁয়ালিটাকে কঠিন করে দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের চল বাঙালিদের মধ্যে পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে খুব চলত। এবার আসি পরের দুটো লাইনে। সেটা খুবই সোজা: ‘হরি বোসের তিন ভাই/ এক আনিও ভাগ নাই।’ ভগবান হরির আর-এক নাম ‘নারায়ণ’। হরি বোস মানে নারায়ণ বোস। জেঠুমণির ডায়েরি থেকে জেনেছি, নারায়ণবাবুর তিন ভাই ছিলেন। তাঁরা থাকতেন কলকাতায়। ‘এক আনিও ভাগ নাই’ মানে স্বোপার্জিত যে সম্পদ তিনি লুকিয়ে রাখছেন তার উপর কোনও অধিকার নেই ভাইদের। পরের লাইন দুটো হচ্ছে: ‘থাকলে হরির অন্তরে/ বেরবে না কোনও মন্তরে।’ দু’বার ‘হরি’ কথাটা থাকায় ধাঁধাটা বিষম জটিল আকার নেয়। এখানে এসে প্রচুর মাথা খাটাতে হয়েছে আমাকে। দ্বিতীয় ‘হরি’র অর্থ বিষ্ণু। মানে বিষ্ণুমূর্তির মধ্যে রাখা থাকল সম্পত্তি, যতই উনি ভগবান হোন, মন্তর দিয়ে সম্পদ বার করা যাবে না। বাস্তব উপায় নিতে হবে। বাকিটা নিশ্চয়ই সবাই আন্দাজ করতে পারছেন?”

ঝিনুক বলল, “পারছি না। যতদূর মনে পড়ছে পরের দুটো লাইন ছিল: ‘কপাল দোষে আসে যদি অনটন/ ভাঙলেই পাবে ললাটিকা তখন।’ মূর্তিটা তার মানে ভাঙতে হবে। প্রায় একই কথা মূর্তিটা আবিরবাবুকে দেওয়ার সময় বলেছিলেন জেঠুমণি। কিন্তু ললাটিকা জিনিসটা কী? এটা তো জেঠুমণির নির্দেশে ছিল না!”

দীপকাকু বললেন, “এটাও একটা ইঙ্গিতময় ব্যাপার। ললাটিকার অর্থ যেমন ‘তিলক’, শ্রেষ্ঠ অলংকারের অভিধা দিতেও শব্দটা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এখন দেখা যাক, এই বিষ্ণুমূর্তির অন্তরে কী আছে?”

প্যান্টের পকেট থেকে স্টিলের ছোট হাতুড়ি বার করলেন দীপকাকু। মূর্তিটা ভাঙার জন্য তৈরি হয়ে এসেছেন। সোফা থেকে নেমে এলেন নীচে। মূর্তিটা মেঝেয় রেখে হাতুড়ির ঘা মারার আগে বললেন, “ভগবান, অপরাধ নিয়ো না!”

হাতুড়ির আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল মূর্তি। ঘরময় এখন নানা রঙের আলো। লাল, নীল, সবুজ, বেগুনি… মূর্তি ভেঙে বেরিয়েছে পিংপং বলের চেয়ে একটু ছোট হিরে। ঘরের সবাই সম্মোহিত। টেবিলের রোদ্দুরটাও যেন অতি আগ্ৰহে নেমে এসেছে নীচে। দীপকাকু ঘোর-লাগা গলায় বললেন, “প্রায় ষাট ক্যারাট হবে! অসমের সম্পত্তি বিক্রি করে এটা কিনেছিলেন। বিচক্ষণ মানুষ, ক্যারি করতে সুবিধে হয়েছিল।’

সম্মোহন যেন কাটছে না কারওর! নিস্তব্ধ ঘর। হাসছে হিরেটা, আর হাসছেন দীপকাকু। হিরের দিকে বেশিক্ষণ তাকাতে পারল না ঝিনুক। তার চেয়ে দীপকাকুর মুখে সাফল্যের হাসিটা অনেক বেশি মনোরম!