হেঁয়ালির অন্ধকারে – ৩

পরের দিন বিকেল চারটের বদলে সাড়ে তিনটে নাগাদ দীপকাকুর বাইক এসে থামল ঝিনুকদের বাড়ির সামনে। বাইকের আওয়াজটা মেঘের গুরুগুরু ডাকের মতো ভয় ধরিয়ে দিল ঝিনুকের বুকে। হোমওয়ার্ক কমপ্লিট হয়নি। যতবারই আবিরবাবুর কেসটা নিয়ে ভাবতে গিয়েছে, চোখের সামনে চলে এসেছে দীপকাকুর ব্ল্যাকবোর্ড, যেখানে কষা ছিল আজব অঙ্ক। মাধ্যমিকে ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছিল ঝিনুক। আনন্দে একটু বেশি লাফালাফি করে ফেলে। মা বলেছিলেন, “এমন করছিস যেন প্রথম দশজনের মধ্যে আছিস!”

মা তো বোঝেননি ঝিনুকের এত আনন্দের আসল কারণ, আর কোনওদিন অঙ্ক করতে হবে না। সেই ঝিনুক কিনা কাল সারা বিকেল, আজ সারা সকাল জুড়ে দীপকাকুর অঙ্কটা করে গিয়েছে। আবিরবাবুর কেসটা নিয়ে ভাবতে বসেছে দুপুরের পরে। দুটো পয়েন্ট এখনও লেখা বাকি।

লেখা শেষ করে, পয়েন্টগুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে, নোটবুক হাতে বাইরের ঘরে এল ঝিনুক। বাবা যথারীতি দাবার বোর্ড সাজিয়ে দীপকাকুকে খেলায় ব্যস্ত করছেন।

দীপকাকুর চোখ পড়ল ঝিনুকের উপর। অবাক হয়ে বললেন, “এ কী, তুমি রেডি হওনি?”

ঝিনুকের পরনে নাইট গাউন। সোফায় বসতে বসতে বলল, “আগে থেকে রেডি হয়ে কী লাভ? আমার পয়েন্টস পড়ে দেখুন। স্যাটিসফ্যাক্টরি লাগলে তবেই তো আপনাকে অ্যাসিস্ট করার চান্স পাব?”

ঝিনুকের অভিমানটা সম্ভবত অনুভব করলেন দীপকাকু। অনাবিল হাসছেন। বললেন, “দাও, দেখি তোমার কেস স্টাডি।”

দাবার বোর্ডে চোখ রেখে বাবা বলে উঠলেন, “ওসব পরে দেখলে হয় না দীপঙ্কর? খেলাটা শেষ করে নাও না আগে!”

“চেকটা তো সামলান। তারপর খেলার প্রশ্ন!” বলে, দীপকাকু ঝিনুকের নোটবুকটা নিলেন।

পেজ ওপেন করে রেখেছিল ঝিনুক। দীপকাকু চোখ বোলাতে থাকলেন। ঝিনুক ওখানে লিখেছে:

(১) এখন অবধি একটা বিষয় বোঝা যাচ্ছে না, চোরের কোন জিনিসটা চুরি করার উদ্দেশ্য ছিল, মূর্তি না গয়না?

(২) গয়নার পরিমাণ আবিরবাবু যা বলছেন, তার চেয়েও বেশি ছিল কি?

(৩) ভল্ট লুটের চক্রান্তের সঙ্গে আবিরবাবুর মূর্তি চুরির কোনও একটা সম্পর্ক আছে মনে হচ্ছে।

(৪) সুরেশ থাপার ছেলেকে যে ব্যক্তি অপহরণ করার চেষ্টা করেছিল, নিশ্চয়ই পরিচিত কেউ। কেননা, সে জানে, থাপার ছেলে বাইক চাপতে পছন্দ করে। অর্থাৎ যা দাঁড়াল, অপরাধী সুরেশ থাপার পরিচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এই সব সূত্র থেকে আমার মনে হচ্ছে, আপনার কথাই ঠিক। কেসটা নিতান্ত সাদামাটা। অপরাধী এক-দু’দিনের মধ্যে ধরা পড়ে যাবে।

.

লেখাটা পড়ে মুখ তুললেন দীপকাকু। মোটা কাচের আড়ালে চোখ দুটো নিস্তেজ। অর্থাৎ খুশি হননি। বললেন, “পুয়োর অ্যানালিসিস। একশোয় দশের বেশি দেওয়া যাচ্ছে না।”

ঝিনুকের হয়ে তর্কে নামলেন বাবা, “কেন দশ পাবে দীপঙ্কর? বেচারি কাল থেকে এটা নিয়ে পড়ে আছে। আজ কলেজ পর্যন্ত যায়নি।”

হাতে নোটবুক, নীচের ঠোঁট ওলটানো, কপালে ভাঁজ ফেলে বসে আছেন দীপকাকু। স্পষ্টতই হতাশ। বললেন, “এত খারাপ অ্যানালিসিস ও করে না। মনে হচ্ছে মনঃসংযোগ করতে পারছে না।”

একদম সঠিক কথাই বলেছেন দীপকাকু। প্রমাণ হিসেবে ঝিনুক দীপকাকুর হাতে ধরে থাকা নোটবুকের একটা পাতা উলটে দিল। সেখানে সল্ভ করা আছে দীপকাকুর বোর্ডের অঙ্ক, FORTY+TEN+TEN= SIXTY= 29786+85০+85০= 31486.

এতক্ষণে দীপকাকুর মুখে হাসি ফিরে এল। বললেন, “SIXTY-র মান জেনে গিয়েছিলে তুমি। তার মানে পাঁচটা অ্যালফাবেটের সংখ্যা বেরিয়ে গেল। বার করেছ বাকি পাঁচটা। মন্দ নয়। বাকি অঙ্কটা পারার সুবাদে তোমাকে এই কেসে অ্যাসিস্ট করতে নিচ্ছি। যাও, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।”

একগাল হেসে ঝিনুক ঝড়ের গতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

.

দীপকাকুর বাইকের পিছনে বসে ঝিনুক চলেছে ই এম বাইপাসের সেই ব্যাঙ্কে। দীপকাকু ইতিমধ্যে একটা কথাই শুধু বলেছেন, “অঙ্কটা মনে রেখো। ওটা আমরা নিজেদের মধ্যে কোড হিসেবে ব্যবহার করব। প্রত্যেকটা অ্যালফাবেটের নির্দিষ্ট সংখ্যাটা ভুলো না। দরকারে কাজে লাগতে পারে।”

পিছনের সিটে বসে হেলমেট পরা মাথাটা হেলিয়েছিল ঝিনুক। অনেকক্ষণ হল বাইপাসে উঠে পড়েছে বাইক। স্বভূমি পেরিয়ে গেল। রাস্তার বাঁ দিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখেছে ঝিনুক। ব্যাঙ্কটা না পেরিয়ে যায়! দীপকাকু ব্যাঙ্কটা চেনেন না। আগে কখনও আসেননি। ভাবনার মাঝে গাড়ি স্লো করে থামালেন দীপকাকু। ঝিনুক জানতে চাইল, “কী হল, দাঁড়িয়ে পড়লেন….?”

দু’হাতে হেলমেট খুলে দীপকাকু বললেন, “ব্যাঙ্কটা আমরা পেরিয়ে এসেছি। আবিরবাবুকে দেখেছি ব্যাঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে। প্রথমে তুমি গিয়ে দেখা করো ওঁর সঙ্গে। বলবে, একলাই এসেছ। কাকু একটা কাজে আটকে পড়েছেন, মিনিট পনেরোর মধ্যে আসছেন।”

ঝিনুক বাইকের সিট থেকে নেমে পড়েছে। জানতে ইচ্ছে করছে, এই পনেরো মিনিট কী করবেন দীপকাকু? জিজ্ঞেস করা যাবে না। তদন্ত চলাকালীন প্ৰশ্ন করলে বিরক্ত হন দীপকাকু। ঝিনুক নিজের ডিউটি বুঝে নিতে বলল, “এই সময়টুকু আবিরবাবুর সঙ্গে আমি কীধরনের কথা বলব? ক্যাজুয়াল কিছু, নাকি ঘুরিয়েফিরিয়ে কোনও বিষয় জানতে হবে?”

“না, কিছুই জানতে হবে না। দু’জনে ম্যানেজারের ঘরে গিয়ে বসবে। আবিরবাবুকে বলবে, চুরির ঘটনাটা বন্ধুকে জানাতে। আমি তদন্তে নেমেছি এবং কিছুক্ষণের মধ্যে আসছি, সেটাও যেন বলে রাখেন।”

দীপকাকুর নির্দেশ শুনে এগিয়ে যাচ্ছিল ঝিনুক। কাকু বললেন, “কী হল, হেলমেট পরেই চললে যে! খুলে যাও।”

ঝিনুক জিভ কাটল। আসলে তদন্তের সময় ঝিনুকের মাথা এমনিতেই এত ভারী থাকে, অন্য কিছুর ভার আলাদা করে টের পায় না। হেলমেটটা দীপকাকুর হাতে দিয়ে ঝিনুক এগিয়ে গেল ব্যাঙ্কের দিকে।

.

ঝিনুক, আবিরবাবু এখন ম্যানেজারের ঘরে। চুরির পুরো ঘটনাটা বন্ধুকে জানালেন আবিরবাবু। অমিতাভবাবু খুবই অবাক হলেন, একই সঙ্গে দুঃখিতও। বললেন, “আমার জন্যেই তোর এরকম হল। কেন যে বললাম ওগুলো নিয়ে যেতে….!” একই সঙ্গে দীপকাকু আসছেন শুনে উৎসাহ পেলেন। বললেন, “ভালই করেছিস ডিটেকটিভ অ্যাপয়েন্ট করে। পুলিশের পাল্লায় পড়লে নাজেহাল হয়ে যেতিস!” এ সমস্ত কথা কাজ করতে করতে বলছিলেন অমিতাভ। কখনও ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, ফের এসে যোগ দিচ্ছিলেন আলোচনায়। ঝিনুকের উপস্থিতি তাঁকে কৌতূহলী করে তুলছিল। একসময় জিজ্ঞেস করে বসলেন, “কে হয় তোর? দাদার মেয়ে? পুরুলিয়া থেকে বেড়াতে এসেছে বুঝি?”

এই প্রথম আবিরবাবু একটু সহজ হলেন। অল্প হেসে বললেন, “ওর পরিচয় এখনই দেব না। মিনিট কুড়ি পর নিজেই জানতে পারবি।”

ম্যানেজারবাবু এখন ঘরে নেই। ঝিনুকের মন পড়ে আছে দীপকাকুর দিকে। কোথায় যে গেলেন! এখনও কেন আসছেন না! আবিরবাবুর সেলফোন থেকে একটা ফোন করবে কি?

করতে হল না। সুইংডোর ঠেলে চেম্বারে পা রাখলেন দীপকাকু। চেয়ার টেনে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলেন, “ম্যানেজারবাবু কোথায়?”

“এসে পড়বে এক্ষুনি। ব্রাঞ্চেই আছে। বলেছি, আপনি আসছেন।” বললেন আবিরবাবু।

দীপকাকুকে একটু যেন অস্থির লাগছে! দু’হাতের আঙুলে টেবিল বাজাচ্ছেন আর চোখ বোলাচ্ছেন গোটা ঘরে।

ম্যানেজারবাবু চেম্বারে এলেন। ঝিনুক, দীপকাকু চেয়ার ছেড়ে একটু উঠে সম্মান জানাতেই, বললেন, “বসুন, বসুন।”

নিজের চেয়ারে বসে ম্যানেজারবাবু প্রথমেই দীপকাকুকে বললেন, “আপনার একটা কার্ড দিন তো আমাকে, প্লিজ। উড়োফোনটার পর আপনার মতো কাউকে আমার দরকার ছিল।”

দীপকাকু পার্স থেকে কার্ড বার করে ম্যানেজারকে দিলেন। তারপর চলে গেলেন সরাসরি প্রশ্নে, “ভল্ট লুটের আগাম ইনফরমেশন এবং সুরেশ থাপার ছেলেকে কিডন্যাপিং-এর চেষ্টা, এসব পুলিশকে জানিয়েছেন?”

দীপকাকুর কার্ড থেকে চোখ তুলে ম্যানেজার বললেন, “হ্যাঁ, জানিয়েছি।”

“পুলিশ কী অ্যাকশন নিল?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

“তেমন কিছু না। বলল, বার্গলার অ্যালার্মটা চালু আছে কিনা ভাল করে দেখে নিতে। আর যদি কিছু ঘটে, থানায় জানাতে।”

“থাপা ছুটি চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাংশান করলেন কেন? এত বড় একটা চক্রান্ত চলছে, তদন্তের স্বার্থে ওকে তো ভীষণ দরকার। পুলিশ এ বিষয়ে আপনাকে কিছু বলেনি?”

“বলেছে, ছুটি দেওয়া ভুল হয়েছে আমার। কিন্তু কোনও উপায় ছিল না। থাপা এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল, ছুটি না দিলে রিজাইন করত চাকরিতে। খুবই বিশ্বস্ত এবং কাজের ছেলে থাপা। ওরকম লোক সহজে পাওয়া যায় না।”

“বুঝলাম।” বলে, চুপ করে গেলেন দীপকাকু। ঝিনুক নিজের কাজ শুরু করে দিয়েছে। নোটবুকে লিখে যাচ্ছে ইম্পর্ট্যান্ট পয়েন্টস। দীপকাকু ফের শুরু করলেন, “উড়োফোনটা আপনার মোবাইলে এসেছিল, নাকি অফিসের ফোনে?”

“অফিসের নম্বরে। কলটা আমার ঘরে ট্রান্সফার করা হয়।”

“অপারেটরকে নম্বরটা নোট করতে বলেছিলেন?”

“না বলে পারি! ওরকম একটা মারাত্মক কল। তবে লাভ হয়নি। বুথের নম্বর। পুলিশকেও দিয়েছি নম্বরটা। ওঁরাই বললেন বুথটা বেলেঘাটা অঞ্চলের।”

দীপকাকুর পরের প্রশ্ন, “ফোনের গলা শুনে কি মনে হয়েছিল লোকটি বাঙালি? বয়স কীরকম?”

“বোধহয় মাঝবয়সি হবে। খুব ধীরেসুস্থে কথা বলছিল। ভাষাটাও শিক্ষিত মানুষের মতো। বাঙালি।”

“থ্যাঙ্কস! আপনিও আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দিচ্ছেন। এবার আর-একটা ব্যাপারে আপনার মতামত নেব। আপনার কী মনে হয়, আবিরবাবুর মূর্তিটা চুরি করার জন্যই কি ফোনটা করা হয়েছিল?”

দীপকাকুর কথার পর ভাবতে একটু সময় নিলেন ম্যানেজার। তারপর বললেন, “অ্যাপারেন্টলি তাই তো মনে হচ্ছে। তবে এর মধ্যে কিছু কিন্তু আছে।”

“যেমন?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

ম্যানেজারবাবু বললেন, “আমি যেদিন আবিরকে ডেকে পাঠালাম, সেদিনই যে আবিরের কাছে লকারের চাবি থাকবে এবং ভল্টের জিনিসপত্তর নিয়ে যাবে, এটা বাইরের লোকের পক্ষে জানা অসম্ভব।”

“তা হলে কি আপনি বলছেন, আবিরবাবুর খুব ঘনিষ্ঠ কেউ এ কাজ করেছে?”

ম্যানেজারবাবু মিটিমিটি হাসতে শুরু করলেন। বললেন, “ব্যাগে চাবি আছে কিনা জানার মতো ঘনিষ্ঠ মানুষ আবিরের একজনই আছে, ওর বউ। তা বলে সুমনাকে তো সন্দেহ করা যায় না!”

“তা হলে কাকে করা যায় বলুন তো?” দীপকাকু এমন অসহায় বালকের মতো প্রশ্নটা করলেন, লজ্জায় পড়ে গেল ঝিনুক।

অমিতাভবাবু মার্জিতভাবে বললেন, “সন্দেহ করার কাজটা তো আপনার। আমি এখানে কী বলি বলুন তো!”

কথাটা দীপকাকুর কানে গেল না সম্ভবত। ভ্রু দুটো জোড়া করে দৃষ্টি নিবদ্ধ করছেন টেবিলের কোনও তুচ্ছ জিনিসের উপর। এই ভঙ্গিটার অর্থ ঝিনুক জানে, দীপকাকু ডুব দিয়েছেন গভীর চিন্তায়। সমস্যার কূলকিনারা পাচ্ছেন না। ঝিনুক খুশিই হল, কেসটা তার মানে বেশ জটিল। এক-দু’দিনে সমাধানের কোনও চান্স নেই।”

চিন্তার ঘোর কাটিয়ে দীপকাকু বললেন, “একবার কি লকার রুমটা দেখা যেতে পারে?”

“অফকোর্স! হোয়াই নট? চলুন আমার সঙ্গে।” বলে, চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিলেন অমিতাভবাবু

দীপকাকু বললেন, “আরও দুটো জিনিস লাগবে আমার। বুথের নম্বর আর সুরেশ থাপার দেশের বাড়ির ঠিকানা।”

টেবিলের কাগজপত্তরের ভিতর থেকে দুটো তথ্য বার করে কাগজে লিখে দীপকাকুকে দিলেন অমিতাভবাবু। বললেন, “চলুন, ভল্টের ঘরটা দেখিয়ে আনি।”

লকার রুমে দাঁড়িয়ে অনাস্বাদিত একটা অনুভূতি হচ্ছে ঝিনুকের। এ যেন রহস্যের স্টোর রুম! প্রত্যেক দেরাজে আছে গোপনীয় বস্তু। কী আছে, লকারের মালিক ছাড়া কেউ জানে না। আইন মতো ম্যানেজারেরও জানার কথা নয়। বন্ধু বলেই আবিরবাবু ম্যানেজারকে মূর্তিটা দেখিয়েছিলেন। আবিরবাবুর বন্ধ লকারটা দেখা হল। সাইজ মিডিয়াম। যারা বড় লকার নিয়েছে কত সোনাদানা রেখেছে, কে জানে!

দীপকাকুর অনুসন্ধান পর্ব শেষ হল। চেহারা, চোখের চাউনির মধ্যে কীরকম একটা বিহ্বল ভাব।

ঝিনুকরা লকার রুম থেকে বেরিয়ে এসেছে। তালা লাগাচ্ছেন অমিতাভবাবু। দীপকাকু বললেন, “আজকের মতো কাজ শেষ ম্যানেজারবাবু। তবে আবার আসতে হতে পারে।”

লক করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন অমিতাভবাবু। হাত বাড়িয়ে দীপকাকুর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে বললেন, “বিনা দ্বিধায় চলে আসবেন। আমিও খবর নেব, তদন্তের কী হল না হল। আবিরের জিনিসটা না পাওয়া পর্যন্ত আমার মনেও অশান্তি থেকে যাবে।”

আবিরবাবু বন্ধুর উদ্দেশে হাত তুলে বললেন, “চলি তা হলে।”

“আয়।” বলে, অমিতাভবাবু ঘুরলেন ঝিনুকের দিকে। ঠোঁটে হাসি নিয়ে বললেন, “এতক্ষণে কিন্তু তোমার আসল পরিচয়টা আমি বুঝে গিয়েছি। নামটা কী?”

“ঝিনুক, ভাল নাম আঁখি সেন।”

“দুটো নামই খুব সুন্দর। কাজটাও সাহসের। কিপ ইট আপ। উইশ ইউ গুডলাক।”

“থ্যাঙ্ক ইউ।” বলে, ঘুরে গেল ঝিনুক। দেখল, দীপকাকু, আবিরবাবু দু’জনেই হাওয়া।

.

ঝিনুক আবার দীপকাকুর বাইকের পিছনে। আবিরবাবু দীপকাকুকে অ্যাডভান্সের খাম দিয়ে চলে গিয়েছেন কলেজে। ই এম বাইপাস ধরে আসতে আসতে সন্ধে ফুরিয়ে আঁধার নেমে এল। ঝিনুক খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল, পার্ক সার্কাস কানেক্টর ধরে দীপকাকু কখন যে সৈয়দ আমির আলি অ্যাভিনিউ-এ চলে এসেছেন খেয়াল করেনি। একটা রেস্টুরেন্টের সামনে বাইক স্ট্যান্ড করলেন কাকু। অল্প খিদে খিদে পাচ্ছিল ঝিনুকের। ভেবেছিল খাওয়াটা বুঝি বাড়িতেই হবে। বদলে রেস্টুরেন্টে হতে যাচ্ছে দেখে আহ্লাদিত হল।

কিন্তু না। দীপকাকু ঢুকলেন না রেস্তরাঁয়। পাশেই একটা স্টেশনারি দোকানে দাঁড়িয়ে চকলেট বার কিনলেন। মাথা গরম হয়ে গেল ঝিনুকের। কিছুতেই সে এখন চকলেট-ফকলেট খাবে না।

আন্দাজ আবারও মিলল না। চকলেট পকেটে পুরে ফুটপাত ধরে হাঁটতে লাগলেন দীপকাকু। একটা পুরনো বাড়ির বিশাল দরজায় এসে থামলেন। চারতলা বাড়ি। দরজা খোলাই আছে। দীপকাকু ঢুকে গেলেন। ঝিনুক কিছু বুঝে উঠতে পারল না। দীপকাকুকে অনুসরণ করতে করতে জিজ্ঞেস করল, “কোথায়, কার কাছে যাচ্ছি আমরা?”

“একটু পরেই জানতে পারবে!” বলে, আলো-অন্ধকার করিডর ধরে এগোতে থাকলেন দীপকাকু। বাড়িটা নিদেনপক্ষে দেড়শো বছরের পুরনো। বহু পরিবারের বাস। বেশ খানিকটা এগোনোর পর বাঁ দিকে সিঁড়ি পাওয়া গেল। দীপকাকু উঠতে শুরু করলেন। পিছনে ঝিনুক। সিঁড়ির মাথায় হলুদ বাবের ঝিমানো আলো। দু’তলায় উঠে এল ঝিনুকরা।

দোতলার একটা ঘরের সামনে দাঁড়ালেন দীপকাকু। দরজা বন্ধ। ডোরবেলে হাত রাখলেন। একটু পরে খুলে গেল দরজা। দাঁড়িয়ে আছে একজন মধ্যবয়স্ক অবাঙালি পুরুষ। জিজ্ঞেস করল, “কেয়া চাহিয়ে?”

দীপকাকু জানতে চাইলেন, “ইয়ে সুনীল ছেত্রী কা ঘর হ্যায় তো?”

মানুষটির মুখে আশঙ্কার ছায়া। তারা যে তেমন অবস্থাপন্ন নয়, সেটা ওর চেহারা এবং কাঁধের উপর থেকে ঘরটার যতটুকু দেখা যাচ্ছে, তাতেই মালুম হচ্ছে। একটু বিবেচনা করে নিয়ে লোকটি বলল, “ম্যায় হুঁ সুনীল ছেত্রী। বলিয়ে কেয়া বাত হ্যায়?”

দীপকাকু বললেন, “সুরেশ থাপা কো একবার ভেজ দিজিয়ে।”

ঝিনুক চলে গেল বিস্ময়ের শেষ সীমায়। সুরেশ থাপার তো দেশে থাকার কথা, এখানে এল কী করে! দীপকাকুই-বা জানলেন কীভাবে?

সুনীল ছেত্রী দাঁড়িয়েই আছে। দীপকাকু একটু ধমকের সুরে বললেন, “যাইয়ে, বুলাইয়ে থাপা কো!”

ধমকে কাজ হল। লোকটা ঘাবড়ে গিয়ে দৌড়ল ঘরের ভিতরে। এই ফাঁকে কৌতূহল মিটিয়ে নিতে ঝিনুক দীপকাকুকে জিজ্ঞেস করল, “থাপা এখানে গা-ঢাকা দিয়ে আছে কেন? আপনি খবর পেলেন কীভাবে?”

“বলেছি না, তদন্ত চলাকালীন কোনও প্রশ্ন নয়। সময়মতো সব উত্তর পাবে।”

“সরি!” বলে, চুপ করে গেল ঝিনুক। দীপকাকুর নিয়মটা সে মেনেই চলে। কিন্তু এক-একসময় উনি এমন কাণ্ডকারখানা করেন, প্রশ্ন না করে থাকাও যায় না।

বছর তিরিশেকের নেপালি একটা লোক দরজার সামনে এসে দাঁড়াল, “বলুন?”

“তুমিই সুরেশ থাপা?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

“হ্যাঁ, স্যার।”

দীপকাকু নিজের কার্ডটা থাপাকে দিলেন। বললেন, “তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে। ঘরে বসতে পারি?”

কার্ডটা পড়ার সময় পায়নি থাপা। তার আগেই ঝিনুকদের ডেকে নিল, “আসুন।” একই সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, “আপনারা কি পুলিশের লোক?”

“না, পুলিশ আমাদের খুব কাছের লোক।” বলে, ঘরে পা রাখলেন দীপকাকু। ঝিনুকও ঢুকে এল। শোওয়া-বসা দুটোই হয় এ ঘরে। ঝিনুকরা গিয়ে বসল সোফায়। সুরেশ থাপা কাঁচুমাচুভাবে দাঁড়িয়ে রইল সামনে। দীপকাকুর কথার প্যাঁচ ধরতে পারেনি, পুলিশের লোক বলেই মনে করছে ঝিনুকদের। পুরো ঘরটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে দীপকাকু থাপাকে জিজ্ঞেস করলেন, “বাড়িটা কার?”

“কাকার স্যার। নিজের কাকা নন। একই গ্রামে আমাদের বাড়ি।”

“ছুটি নিয়ে দেশে গেলে না কেন?”

“কাকা মানা করলেন। বললেন, ‘ছেলেকে চুরি করতে চাইলে ট্রেন থেকেই নেওয়া সহজ। বরং তুই ক’দিন এখানে এসে লুকিয়ে থাক, আমরা তো আছি!”

“কেন তোমার ছেলেকে কিডন্যাপিং-এর চেষ্টা হল, বলতে পারো?” জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু।

সুরেশ থাপা বলল, “না, স্যার। তবে আমি শিয়োর, ম্যানেজারবাবু জানেন। আগের দিনই আমাকে বলেছিলেন ছেলেকে চোখে চোখে রাখতে।”

“তোমার ছেলেকে একবার নিয়ে এসো তো!” বললেন দীপকাকু।

“কেন স্যার?”

“সেদিনের ঘটনা নিয়ে দু’-একটা কথা জিজ্ঞেস করব।”

দীপকাকুকে পুলিশ ভেবেছে বলেই নির্দেশ অমান্য করতে পারছে না থাপা। তেতো খাওয়া মুখ করে চলে গেল আরও ভিতরের ঘরে। পকেট থেকে চকলেট বার করে দীপকাকু ঝিনুকের হাতে দিলেন। বললেন, “বাচ্চাটার সঙ্গে প্রথমে তুমি ভাব জমাবে। তার ফাঁকে আমি যা জানার জেনে নেব।”

এতক্ষণে ঝিনুক বুঝল চকলেটটা কার জন্য কেনা হয়েছিল। সুরেশ থাপা ছেলের হাত ধরে নিয়ে এল এ ঘরে। ভীষণ মিষ্টি ছেলেটি। ছোট ছোট চোখ, টোপলা গাল, খুব ফরসা। ঝিনুক সোফা থেকে একটু উঠে ছেলেটাকে কাছে টেনে নিল। হাতে চকলেট বার দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কী?”

“সুমন থাপা।” আধো উচ্চারণে উত্তর দিল ছেলেটি।

ঝিনুক জিজ্ঞেস করল, “কোন ক্লাসে পড়ো?”

“ক্লাস ওয়ান।”

এবার দীপকাকু এন্ট্রি নিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি যে সেদিন একজনের বাইকে চেপে স্কুলে গিয়েছিলে, সে কি তোমাকে নিয়ে পালাচ্ছিল?”

সুমন মাথা উপর-নীচ করে ‘হ্যাঁ’ বলল।

দীপকাকু বললেন, “তখন কি তুমি খুব চেঁচাচ্ছিলে?”

সুমন মাথা নেড়ে এবার ‘না’ বলল। দীপকাকু একবার সুরেশ থাপার দিকে তাকালেন। ফের সুমনকে জিজ্ঞেস করলেন, “বাইককাকু হেলমেট পরে ছিল?”

সুমন মাথা নেড়ে ‘না’ বলল।

দীপকাকু সামান্য বিরতি নিয়ে তাকিয়ে থাকলেন সুমনের দিকে। আচম্বিতে প্রশ্ন করলেন, “কাকুটির নাম কী?”

উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকল সুমন। দীপকাকুর আচমকা প্রশ্ন করার উদ্দেশ্যটা ধরতে পারল ঝিনুক। সুমন মুখ ফসকে বাইক-আরোহীর নামটা যদি বলে দেয়! এত দিন হয়তো চেপে রেখেছিল। সুমন কিছু বলছে না দেখে ধরে নেওয়া গেল লোকটা তার অচেনা। দীপকাকু অন্য প্রশ্নে গেলেন, “বাইকের কালারটা মনে আছে?”

“ব্ল্যাক।” চট করে উত্তরটা দিল সুমন। এতেই বোঝা যায় বাইকের ব্যাপারে ও কতটা আগ্রহী।

দীপকাকুর পরের প্রশ্ন, “ওই কাকু কি তোমার স্কুলটা চেনে?”

সুমন প্রথমে মাথা নাড়ল। তারপর বলল, “আমি আঙ্কলকে স্কুলে নিয়ে গিয়েছি।”

দীপকাকুর ঠোঁটে হাসি ছড়াল। সুরেশ থাপাকে জিজ্ঞেস করলেন, “ওর স্কুলটা কোথায়?”

“থ্রি-এ বাসস্ট্যান্ডের কাছে।” বলার পর থাপা অভিযোগের সুরে জানাল, “এখন সব ভুলভাল বলছে। আমাদের অন্যরকম বলেছিল।”

মাথা নাড়লেন দীপকাকু। বললেন, “এখন যা বলল, এটাই সঠিক। ছেলে অজানা লোকের বাইকে স্কুলে গিয়েছে শুনে তোমরা এতটাই ঘাবড়ে গিয়েছিলে, বিশেষ করে তুমি যখন দেখলে মিলে যাচ্ছে ম্যানেজারবাবুর কথা, টেনশনে তখন ছেলেকে ঠিকঠাক প্রশ্ন করতে পারোনি। নিজেরাই, খারাপ যা হতে পারত, সেগুলোই উত্তর হিসেবে ছেলের মুখে বসিয়ে দিয়েছিলে। ও বেচারি সবেতেই ‘হ্যাঁ” করে গিয়েছে।”

দীপকাকুর পর্যালোচনা তেমন প্রভাব ফেলতে পারল না থাপার মনে। মুখটা ব্যাজার করেই আছে। পাশের ঘরের পরদা সরিয়ে বেশকিছু কৌতূহলী মুখ ঝিনুকদের দেখছে।

সুমনের মাথার চুল ঘেঁটে দিয়ে দীপকাকু বললেন, “এবার তুমি যাও। তোমার ছুটি।”

ভারী বয়ে গেছে সুমনের ছুটি নিতে। সে আরও ঝিনুকের কোল ঘেঁষে দাঁড়াল। দীপকাকু সুরেশ থাপাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কোনও রিলেটিভের কালো বাইক আছে?”

একটু ভেবে নিয়ে মাথা নাড়ল থাপা। বলল, “দাদার ছেলে সন্তুর বাইক আছে। কিন্তু সেটার রং লাল। সন্তু যদি সেদিন কোনও বন্ধুর গাড়ি নিয়েও আসে, সুমন ওর কথা আমাদের বলত।”

দীপকাকু সোফা ছেড়ে উঠে পড়লেন। থাপাকে বললেন, “ছেলেকে স্কুলে পাঠাও। অযথা পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে ওর। তুমিও জয়েন করে যাও অফিসে। চিন্তার কোনও কারণ নেই।”

“বলছেন?” সুরেশ থাপা আশ্বাস চাইল।

দীপকাকু বললেন, “হ্যাঁ, বিপদের আর কোনও আশঙ্কা নেই। সুমনকে কিডন্যাপ করার প্ল্যান লোকটার ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল অন্য।”

দরজার দিকে ঘুরে গেলেন দীপকাকু। সুমনের টোপলা গালে আলতো করে টোকা দিয়ে ঝিনুক হাত নেড়ে টা-টা করতে করতে চৌকাঠ পেরোল। একগাল হাসি নিয়ে সুমনও হাত নাড়ল। বাড়ি গিয়েই সুমনের কথা মা-কে বলতে হবে। মায়ের ধারণা, ঝিনুকদের অভিযান মানেই টেনশন, মারপিট, বুদ্ধির প্যাঁচ। এর মধ্যেও যে ফুলের মতো শিশুদের দেখা পাওয়া যায়, জানলে মায়ের ভাল লাগবে।

.

বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এসেছে ঝিনুকরা। যেন কলকাতার ইতিহাস থেকে বেরিয়ে এল। আলো ঝলমলে ফুটপাত ধরে হাঁটছে এখন। দীপকাকুর হাঁটাচলায় রিল্যাক্সড ভাব। মুখে প্রাথমিক সাফল্যের খুশি। বলে উঠলেন, “বেশি ভাবনা-চিন্তা করলে দেখেছি বড্ড খিদে পেয়ে যায়। চলো, কিছু খাওয়া যাক।

ভালই হল। রাস্তার ধারে যে রেস্টুরেন্টটা দেখে খাওয়ার বাসনা জেগেছিল ঝিনুকের মনে, সেখানেই ঢুকলেন দীপকাকু। দুটো চিকেন কাটলেটের অর্ডার দেওয়া হল। ঝিনুকের মাথায় খইয়ের মতো প্রশ্ন ফুটছে। বয় টেবিলে দু’গ্লাস জল দিয়ে যাওয়ার পর শুরু করল ঝিনুক, “আপনি কী করে জানলেন, সুরেশ থাপা এই অ্যাড্রেসে আছে?”

গ্লাস তুলে অর্ধেক জল খেলেন দীপকাকু। টেবিলে গ্লাসটা রেখে বললেন, “ব্যাঙ্কে তোমাদের আগে ঢুকিয়ে দিয়ে আমি গেটকিপারের সঙ্গে আলাপ জমালাম। জেনারেলি নেপালি দরোয়ানরা যখন দেশে যায়, দেশোয়ালি কাউকে রেখে যায় তার কাজে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। নতুন গেটকিপারের নাম নরেন্দ্র থাপা। ওকে গিয়ে বললাম, ‘সুরেশ কোথায়?’

“নরেন্দ্র বলল, ছুটিতে আছে।’

“আমি বললাম, “সে কী! ও যে ক’দিন আগেই বলল, হাজার পাঁচেক টাকা দরকার। ওর পলিসি থেকে লোন বার করে আনলাম আমি। এখন কী হবে? টাকাটা কীভাবে দেব ওকে?”

“টাকার কথা শুনে নরেন্দ্রর মনে দোনোমোনো ভাব শুরু হল। এরই মধ্যে আমি নিজের পরিচয় দিয়েছি জীবন বিমার এজেন্ট বলে। বললাম, ‘সুরেশ আমার কাছে পলিসি করিয়েছিল। সুরেশ বলেছিল টাকাটা তার ভীষণ দরকার।’

“দেশোয়ালি ভাই নরেন্দ্রর মন টলে গেল। ওকে নিশ্চয়ই বলা ছিল সুরেশের বর্তমান ঠিকানা কাউকে না জানাতে। সুরেশের উপকার হবে চিন্তা করে নরেন্দ্র ঠিকানাটা বলে দিল। তারপরে আমি যখন অন্য কাজের ছুতো দেখিয়ে ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করতে চাই, নরেন্দ্র আমাকে বলল, ম্যানেজারকে সুরেশের ঠিকানা না দিতে। আমি ওকে আশ্বস্ত করেছিলাম।”

বয় দু’প্লেট কাটলেট নিয়ে এল। দীপকাকু বললেন, “খাওয়া শেষ হলে এক কাপ কফি আর একটা আইসক্রিম দিয়ো।”

“কী আইসক্রিম স্যার?”

আইসক্রিম যেহেতু ঝিনুকের জন্য, দীপকাকু বললেন, “বাটার স্কচ কাপ দেবেন।”

বয় চলে গেল। দীপকাকুর মেজাজটা খুশ বলেই মনে হচ্ছে। ঝিনুকের পছন্দ মনে করে অর্ডার দিলেন। তদন্তের প্রাথমিক ধাপ বোধহয় পার হয়েছেন। কিন্তু ঝিনুক যে এখনও পড়ে আছে অগাধ জলে! কাটলেটে ছুরি বসিয়ে ঝিনুক জানতে চাইল, “সুরেশ থাপা দেশে গেছে জেনেও কেন ওর খোঁজ করছিলেন?”

কাঁটাচামচ গাঁথা কাটলেটের টুকরো মুখে পুরে দীপকাকু বললেন, “এই কেসে সুরেশ থাপার সাক্ষ্য আমার ভীষণ দরকার ছিল। এমনটাও আমি আন্দাজ করেছিলাম, সুরেশ থাপা দেশে যায়নি।”

“কী করে গেস করলেন?”

দীপকাকু বলতে থাকলেন, “আজকালকার সব বাবা-মা বাচ্চার পড়াশোনার ব্যাপারে সিরিয়াস। থাপার ছেলেকে যখন স্কুলবাস নিতে আসে, ধরে নেওয়া যায়, মোটামুটি স্ট্যান্ডার্ড স্কুলেই পড়ে। ছেলের পড়াশোনার কথা মাথায় রেখেই থাপা এক মাসের জন্য দেশে যাবে না। বিশেষ করে এখন ফুল সিজন চলছে, লম্বা কোনও ছুটিছাটা নেই। সুমনকে লুকিয়ে রাখতে দেশে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। কলকাতায় অথবা কাছাকাছি কোনও শহরে আত্মীয়র বাড়িতে থাকলেই চলবে। পরিস্থিতি বুঝে থাপা নিজেই ক’দিন পর সুমনকে স্কুলে দেওয়া-নেওয়া করত।”

“সুরেশ থাপার সঙ্গে কথা বলার কেন এত দরকার ছিল?”

ঝিনুকের প্রশ্নের উত্তরে দীপকাকু বললেন, “ম্যানেজারবাবু সুরেশ থাপার বিষয়ে যা যা বলেছেন, তা কতটা সঠিক, জানার একমাত্র উপায় থাপার সঙ্গে দেখা করা। আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণে থাপার ছেলেকে আমার দরকার ছিল।”

“কী কারণে?”

“বিকজ অফ বাইক। আমার মনে হয়েছিল, মূর্তি চুরি এবং কিডন্যাপিং-এ একই গাড়ি ব্যবহার হয়েছিল কিনা সেটা জানা যাবে সুমনের সঙ্গে কথা বললে। আমরা আবিরবাবুর কাছে জেনেছি, বাইকটার রং কালো। সুমনও তাই বলছে। আপাতত ধরে নেওয়া যায়, একই বাইক ব্যবহৃত হয়েছে। আরোহী একজনই। সম্ভাবনাটা অবশ্য না-ও মিলতে পারে। তদন্তে আরও খানিকটা এগোলে বোঝা যাবে।’

ঝিনুকের কাটলেট শেষ। দীপকাকুর কথায় এতটাই ডুবে গিয়েছিল, কখন যে প্লেট ফাঁকা করে ফেলেছে খেয়ালই নেই। আইসক্রিম আর কফি নিয়ে এল বয়। ঝিনুক আইসক্রিমটা অন্তত মন দিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করল। কফিতে চুমুক দিয়ে দীপকাকু বলতে থাকলেন, “আর-একটা সন্দেহ ঘোচাতেও সুমনকে আমার দরকার ছিল।”

“কী সেটা?” জানতে চাইল ঝিনুক।

দীপকাকু বললেন, “কিডন্যাপিং-এর ঘটনাটা শোনার পর থেকেই আমার খুব সাজানো মনে হয়েছে। যে চক্র এত বুদ্ধি করে আবিরবাবুর ব্যাগটা হাতাল, তারা বাইক চেপে অপহরণ করতে আসবে না। বাচ্চাটা চেঁচিয়ে উঠতেই পারে, পাবলিকের কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। সত্যি সত্যি কিডন্যাপ করার হলে ওরা চার চাকার ঢাকা গাড়ি নিয়ে আসত।”

“অর্থাৎ আপনি বলছেন, কিডন্যাপিং-এর ঘটনাটা পুরোপুরি নাটক?”

“ইয়েস, এই সন্দেহটা আমার প্রথম থেকেই হয়েছিল।”

ঝিনুক বলল, “তার মানে যা প্রমাণ হল, ভল্ট লুটের ব্যাপারটা ফল্স। আবিরবাবুর ব্যাগ হাতানোটাই মূল উদ্দেশ্য। ম্যানেজারের কাছে যে ফোন কল এসেছিল, সেটা ব্যাগ চুরির চক্রান্তের অঙ্গ। ওই ফোনটা করেই অপরাধী বাধ্য করেছিল আবিরবাবুকে ভল্ট থেকে জিনিসপত্তর সরিয়ে নিতে।”

“একদম ঠিক।” বললেন দীপকাকু।

ঝিনুকের আইসক্রিম ফিনিশ। এবারও টেস্টটা খেয়াল করা হল না। ইতিমধ্যে পুরনো প্রশ্ন ফের এসে গেল মাথায়। ঝিনুক জানতে চাইল, “একটা বিষয় কিন্তু এখনও ক্লিয়ার হল না। ম্যানেজার যেদিন ডেকে পাঠালেন আবিরবাবুকে, সেদিনই লকার থেকে সবকিছু সরিয়ে নেবেন আবিরবাবু, এটা তো বাইরের লোকের পক্ষে কিছুতেই আন্দাজ করা সম্ভব নয়, তাই না?”

“দু’জনের পক্ষে সম্ভব। এক, ম্যানেজার। যিনি জিনিসগুলো বার করে নিতে দেখেছেন। দুই, আবিরবাবুর স্ত্রী।”

দ্বিতীয়জনের ক্ষেত্রে তীব্র আপত্তি জানাল ঝিনুক। বলল, “স্বামীর সম্পত্তি স্ত্রী কেন চুরি করতে যাবে, এই সন্দেহ একেবারেই অবাস্তব!”

দীপকাকু বললেন, “আমি নিরুপায়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন আমরা জানি না। দু’জনের মধ্যে দীর্ঘকালীন বিবাদ থাকতে পারে। সুমনাদেবী জানতেন লকারের চাবি আবিরবাবুর ব্যাগে আছে। দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তির সাহায্যে পুরো নাটকটা তিনি সাজালেন। ফোন করানো, কিডন্যাপিং-এর অ্যাক্টিং। এসব যেমন সুমনাদেবী করাতে পারেন, ম্যানেজারও পারেন। আবার দু’জনে এক হয়েও ঘটাতে পারেন অপরাধটা। এমনকী, সুরেশও থাকতে পারে এই প্ল্যানে।”

“কীভাবে?”

দীপকাকু বললেন, “হতে পারে, ম্যানেজার সুরেশের সাহায্য নিয়ে চক্রান্তটা করেছেন। ফোন হয়তো আসেইনি। ম্যানেজার সুরেশকে যা যা করতে বলেছেন, সে করে যাচ্ছে। পুলিশের এবং আমাদের দৃষ্টি ঘুরে যাচ্ছে অজানা কোনও একজনের উপর।”

ঝিনুক বলল, “কিন্তু সুমন তো মিথ্যে বলবে না। ও একটা বাচ্চা ছেলে। কেউ একজন ওকে বাইকে চাপিয়ে স্কুলে পৌঁছে দেয়। এটা একশো ভাগ সত্যি।

“মানছি। ম্যানেজারের ফাঁদা গল্পটাকে মজবুত করতে সুরেশই হয়তো কাউকে দিয়ে কিডন্যাপিং-এর নাটকটা করিয়েছে।”

ঝিনুক এতক্ষণে একটু অসহিষ্ণু হয়ে পড়ল। শ্লেষ মিশিয়ে বলল, “আপনার সন্দেহের তালিকা যেভাবে বাড়ছে, আমি না ঢুকে যাই!”

কথাটা গায়ে না মেখে দীপকাকু হাসলেন। বললেন, “আর-একজনকে সন্দেহের তালিকায় রাখছি আমি, স্বয়ং আবিরবাবু।”

“যুক্তিটা জানতে পারি?” কপট বিনয়ে জানতে চাইল ঝিনুক।

দীপকাকু বললেন, “মূর্তিটা হয়তো খুবই দামি। আমি অর্থমূল্যের কথাও বলছি। আবিরবাবু ঠিক করেছেন, ওটা বিক্রি করবেন। ব্যাপারটা জানাজানি হলে ওঁর জেঠুমণি কষ্ট পাবেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা যদি জেনে গিয়ে থাকে মূর্তিটার মালিকানা পেয়েছেন আবিরবাবু, বংশের স্মৃতি বিক্রি করে দিয়েছেন, নিন্দা করবেন তাঁরা। তেমন দামি হলে ভাগ চাইবেন। তার চেয়ে চুরির নাটক অনেক প্রশ্নের জবাব দিয়ে দেবে। যদি এই ঘটনা ঘটে থাকে, তা হলে আবিরবাবুকে সঙ্গ দিয়েছেন হয় ব্যাঙ্ক ম্যানেজার-বন্ধু অথবা স্ত্রী।”

ঝিনুক বুঝতে পারছে, বিশ্লেষণ ও অনুধাবন করে ওঠার শেষ সীমায় চলে এসেছে সে। দীপকাকু এরপর যা কিছু বলবেন, সব মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে যাবে। দীপকাকুকে থামানোর জন্য ঝিনুক বলল, “আপাতত তিনজনকে সন্দেহের তালিকায় রেখে এগোনো যাক।”

ঝিনুকের কথার পিঠে দীপকাকু যোগ করলেন, “তিনজনের মধ্যে দু’জনের সঙ্গে আমাদের আলাপ হয়েছে। বাকি আছেন আবিরবাবুর স্ত্রী সুমনা। চলো, কাল তাঁর সঙ্গে কথা বলি। যদি মনে হয় তালিকার বাইরে রাখা যাবে তাঁকে, রাখব।”

ঝিনুক নিজের ছোট্ট কাঁধব্যাগটা থেকে আবিরবাবুর কার্ড বার করল। দীপকাকুর দিকে এগিয়ে ধরে বলল, “ফোন করে বলে দিন, কাল ক’টায় যাব ওঁদের ফ্ল্যাটে।”

“ফোন করব না। সারপ্রাইজ ভিজিট দেব। যাতে নিজেদের গুছিয়ে নিতে না পারেন।” বললেন দীপকাকু।

ঝিনুক জিজ্ঞেস করল, “কাল তা হলে ক’টায় রেডি থাকব বাড়িতে?”

উত্তর না দিয়ে দীপকাকু স্বগতোক্তির ঢঙে বলতে থাকলেন, “কেসটা যখন প্রথম হাতে নিয়েছিলাম, মনে হয়েছিল খুবই সাদামাটা। তদন্তে নেমে বুঝতে পারছি, কতটা জটিল। যে মূর্তিটা চুরি গেছে, তার একটা ইতিহাস আছে। সেখানে অনেক চরিত্র। মনে হচ্ছে, সেইসব চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে আমাদের। অনেকটা যেন ক্রিপ্টেরিদমের অঙ্ক। চরিত্রগুলো অ্যালফাবেট, চরিত্রের মনোভাব হচ্ছে সংখ্যা। জটিল পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে সমাধানে পৌঁছতে হবে।”

ঝিনুকের গলা শুকিয়ে এল। আবার সেই অঙ্ক। জিজ্ঞেস করল, “কাল কি আমাকে বাড়ি থেকে তুলবেন, নাকি আশুদাকে নিয়ে আমি যাব আপনার বাড়ি?”

“না, আমিই তুলে নেব তোমাকে। সাড়ে সাতটা নাগাদ তৈরি থেকো। আবিরবাবুর কলেজে বেরনোর আগে আমাদের পৌঁছতে হবে।