ফন্দিবাজ বন্দি – ১০

১০

অনিমেষবাবুর কেসটা সল্ভ হয়ে গিয়েছে ঠিক একমাস হল। বলা যেতে পারে আজ তার সেলিব্রেশন ডে। গাড়ি চেপে বাবা, ঝিনুক, দীপকাকু চলেছেন আনন্দানুষ্ঠানে যোগ দিতে। জায়গাটা আনন্দ পালিত রোডে অনিমেষবাবুর সেই অফিস। দীপকাকুর পরামর্শমতো অফিসঘরটায় সূর্যেন্দুবাবু শুরু করছেন নতুন বিজনেস। সেল্স-এর চাকরি ছেড়ে ওই কোম্পানিরই ডিলারশিপ নিয়েছেন। আজ ইনোগরেশন। প্রধান অতিথি দীপঙ্কর বাগচী।

ঝিনুক ভেবেছিল এই উপলক্ষে অন্তত দীপকাকু সুট, নিদেনপক্ষে ডিজাইনার পাঞ্জাবি-পাজামা পরবেন। কিন্তু কোথায় কী! সেই ইন না-করা কোঁচকানো শার্ট, ঢলঢলে ট্রাউজার, পায়ে কাবলি জুতো। তবু ভাল, সকালে উঠে শেভ করে নিয়েছেন। ঝিনুক কিন্তু পরেছে শাড়ি, অনেক দিন পর।

এবারের কেসটাতেও দীপকাকু তাঁর ধারালো বুদ্ধির পরিচয় রেখেছেন। মনে হয়, বুদ্ধিটা আরও শাণিত হয়েছে। কেসটা হাতে নেওয়ার পর প্রথমেই দীপকাকুর মনে হয়েছিল, অপরাধী নিজে যেহেতু বিবেকহীন, অসৎ, তার পক্ষে অন্য কাউকে চোখের বাইরে রেখে বিশ্বাস করা কঠিন। গোল্ডেন ইনভেস্টমেন্ট-এ রোজ ক্লায়েন্টদের টাকা জমা হত। শনাক্ত হয়ে যাওয়ার ভয়ে অপরাধী নিয়মিত হিসেব নিতে অফিসে যেতে পারত না। এদিকে বড়সড় অ্যামাউন্ট জমা হওয়ার পর যদি পালিয়ে যান অনিমেষবাবু, এই আশঙ্কায় পাহারাদার হিসেবে অপরাধী নিজের একান্ত ঘনিষ্ঠ কাউকে অনিমেষবাবুর পাশে রাখবেই! পহেলি জুয়েলার্সের ছেলেটাকে দেখে দীপকাকু প্রথমে ধরতে পারেননি, এই সেই ঘনিষ্ঠ লোক। ভেবেছিলেন, তৃতীয় কোনও ব্যক্তি, যাকে দিয়ে কাজটা করানো হচ্ছে। দীপকাকুর চোখ খুলে দিল পান-সিগারেটের দোকানদার। জানা গেল, সে যখন হীরালাল বসুর ব্যাগটা ফেরত দিতে এসেছিল, অনিমেষবাবু সুকুমার পাত্রকে দেখিয়ে বলেছিলেন, “ওকে দাও, পেয়ে যাবে।’

তখনই দীপকাকু বুঝে গেলেন, পাত্র হচ্ছে হীরালালের বিশ্বস্ত ঘনিষ্ঠ লোক। এমনকী, বাড়ির কেউ হতে পারে। তার আগে কল্লোল সেনের কাছ থেকে অনিমেষবাবুর দুই কর্মচারীর ফোন নাম্বার নিয়েছিলেন দীপকাকু। চন্দন রায়কে ফোনে পাওয়া গেলেও, সুকুমার পাত্রকে পাওয়া যায়নি। চন্দন রায় কোনও সন্ধান দিতে পারেনি তার। দীপকাকু মেসে গিয়েও পাত্রকে পাননি।

পাওয়া গেল হীরালাল বসুর বাড়ি গিয়ে। গাড়ির নাম্বার দিয়ে মোটর ভেহিকলস থেকে হীরালাল বসুর অফিস, বাড়ির ঠিকানা, ফোন নাম্বার সবই পাওয়া গিয়েছিল। সুকুমার পাত্র ওরফে অনির্বাণ বসু হল হীরালাল বসুর বড়ছেলে। দীপকাকু কুরিয়ার সার্ভিসের লোক সেজে অনির্বাণ বসুর নামে একটা চিঠি নিয়ে গেলেন। ফল্স কোম্পানির চিঠি, দীপকাকু নিজেই কম্পিউটারে তৈরি করেছিলেন।

অনির্বাণ বসু সই করে চিঠিটা নিয়েছিল। সই-এর স্যাম্পেল রয়ে গেল দীপকাকুর কাছে। যার সঙ্গে পহেলি জুয়েলার্স থেকে পাওয়া হাতের লেখার হুবহু মিল। আরও একটা অবজারভেশন মিলে গেল, ফোটোর ছেলেটা লেখার সময় তর্জনী ব্যবহার করেনি। মধ্যমা আর বুড়ো আঙুল দিয়ে পেন ধরে, সাপোর্ট নেয় অনামিকার। অনির্বাণ বসু ঠিক সেই ভাবেই পেন ধরেছিল।

দুই অপরাধী শনাক্ত হয়ে যেতেই দীপকাকু ওদের জন্য ফাঁদ পাতলেন। এ ব্যাপারে বাবার মন্তব্য হচ্ছে, “রিস্কটা তুমি বড্ড বেশি নিয়ে ফেলেছিলে দীপঙ্কর! এ তো প্রাণ নিয়ে খেলা! সামান্য ভুল হলেই মৃত্যু!”

দীপকাকু বললেন, “বাইক ভাঙার সময় ওরা যখন আপনার অফিসের গলির লোকজনকে পিস্তল দেখিয়েছিল, তখনই বুঝে যাই, এরা ফেরোসাস এলিমেন্ট। সামান্য বাধা পেলেই গুলি চালাতে দ্বিধা করবে না। ওদের প্রবৃত্তিকে প্রলোভিত করে টেনে নিয়ে আসি সূর্যেন্দুদের জানলার বাইরে। টাকার ব্যাপারে সূর্যেন্দুদের সঙ্গে কথা বলছি না দেখে ওরা অধৈর্য হয়ে উঠেছিল। বারবার ফোন করছিল আমাকে। আমি সময়টা নিচ্ছিলাম অনির্বাণকে শনাক্ত করার জন্য। মিশন সাকসেস হতেই ওদের বললাম, সূর্যেন্দুদের বাড়িতে কাল যাচ্ছি, ওখানেই ফোন করুন। জানতাম, আমার মোবাইলে ফোন করবে না, করবে জানলার পাশে থাকা সূর্যেন্দুদের ল্যান্ডসেটে। আমি ফোন ধরতে গেলেই, গুলি চালিয়ে সাবাড় করে দেবে। চান্সটা ওরা নেবেই। কেননা, রাস্তাঘাটে, বাড়িতে ঢুকে গুলি করে পালিয়ে যাওয়ার চেয়ে, ওখান থেকে পালানো সহজ। আততায়ীকে নিয়ে সরে পড়ার জন্য অনির্বাণ বসু একটু দূরে মারুতি ভ্যানে বসে ছিল। ওখান থেকেই সূর্যেন্দুদের ল্যান্ডলাইনে ফোন করছিল সে। ঝিনুক পিস্তলধারীকে ধরার আগে পর্যন্ত ফোনে কথা চালাই আমি। হামাগুড়ি দিয়ে ফোনের কাছে গিয়েছিলাম। কথা বলছিলাম বসে থেকে।”

মা-কে এসব কাণ্ডকারখানা কিছুই বলা হয়নি। বললে ঝিনুকের অ্যাসিস্ট্যান্টগিরি তো বন্ধ হবেই, দীপকাকুর জন্য ভাল ভাল রান্না করাও মুলতুবি রাখবেন মা।

এই কেসটা কল্লোলবাবুর খুব ফেভারে গিয়েছে। প্রমোশনও অসম্ভব নয়। পিস্তলধারীকে নিয়ে যখন ঝিনুকরা ট্যাক্সি করে হীরালাল বসুর বাড়ি যাচ্ছে, দীপকাকু ফোনে কল্লোলবাবুকে বলেছিলেন, হীরালাল বসুকে অফিস থেকে অ্যারেস্ট করতে। তারপরই যেন ওঁদের ভবানীপুরের বাড়িতে চলে আসেন।

ঝিনুকরা যখন পৌঁছল হীরালাল বসুর বাড়ি, ঢাউস ব্যাগ নিয়ে গেট থেকে বেরিয়ে আসছিল অনির্বাণ বসু। মনে নিরুদ্দেশ হওয়ার বাসনা। পিস্তল দেখিয়ে দীপকাকু তাকে আটকালেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দু’জন কনস্টেবল সমেত জিপ নিয়ে চলে এলেন কল্লোল সেন। অনির্বাণ বসু, পিস্তলধারী এবং পিস্তলটা হ্যান্ডওভার করে দীপকাকু বললেন, “অনির্বাণের ভয়েস রেকর্ড, হাতের লেখা, সই, পহেলি জুয়েলার্সের সিডি, সব আমার কাছে আছে। পরে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”

কল্লোল সেন তো খুব খুশি। দীপকাকুর কানের কাছে এসে বললেন, “আপনার কাছে অনেক কিছু শেখার আছে।”

পুলিশ অনেকটা ক্রেডিট নিয়ে চলে যাচ্ছে দেখে রাগ হচ্ছিল ঝিনুকের। বাড়ি ফেরার পথে দীপকাকুকে সে-কথা জানাতে দীপকাকু বললেন, “আমরা তো অর্ধেক কাজ করলাম। পুলিশ এখন এদের নামে কেস দেবে। দৌড়োদৌড়ি করবে কোর্ট-কাছারিতে। টাকা উদ্ধার করে ফেরত দেবে গোল্ডেন ইনভেস্টমেন্টের ক্লায়েন্টদের। এ কি কম কাজ?”

ঝিনুক আর কথা বাড়ায়নি। মানুষটি শুধু কাজ বোঝেন, প্রচারের কোনও আগ্রহ নেই।

ঝিনুকরা পৌঁছে গেল পরমা কমপ্লেক্সের গেটে। গাড়ি থেকে নামতেই এগিয়ে এলেন সূর্যেন্দুবাবুসহ অনেকে। ভিড়ের মধ্যে নির্মল জানাকেও দেখা গেল, ভয় ভাবটা আর নেই, মুখটা হাসি হাসি।

ঝিনুকরা অফিসঘরে পৌঁছনোর মুখে দেখা হল মীরাদেবী এবং তাঁর মেয়ের সঙ্গে। কৃতজ্ঞতা উপচে পড়ছে ওঁদের মুখে। সূর্যেন্দুবাবুর বোনের গলায় সেই হার, যেটা এই কেসের টার্নিং পয়েন্ট।

অফিসঘরের দরজায় লাল ফিতে লাগানো। সূর্যেন্দুবাবুর বোন থালায় রাখা কাঁচি এগিয়ে দীপকাকুকে বললেন, “আপনি কাটুন।”

কোনও জড়তা ছাড়াই ফিতে কাটলেন দীপকাকু। যেন আগে কতবার কেটেছেন! ফ্ল্যাশ জ্বলল, হাততালি দিল সবাই। বাবাকেও দেখা গেল, বেশ আপ্লুত হয়ে গিয়েছেন।

ঘরে ঢুকে ঝিনুক দেখল, চেয়ারে অনিমেষবাবুর বিশাল ফোটো। মালাটা ফ্রেমের নীচে জড়ো করা।

সূর্যেন্দুবাবু ঝিনুককে বললেন, “মালাটা তুমি পরাবে!”

ঝিনুক খানিক অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে আড়ষ্ট পায়ে এগিয়ে গেল। মালা পরানোর সময় অনিমেষবাবুর চোখে চোখ পড়ল, চোখের পাতা পড়ল যেন। বললেন, “অনেক দিন পর ফুলের গন্ধ পাচ্ছি। মানুষের মনের আঁস্তাকুড়ে পড়েছিলাম এতদিন। থ্যাঙ্ক ইউ, কিপ ইট আপ!”

প্রবল হাততালি। ঝিনুক ছাড়া বাকিরা কেউ শুনতেই পেল না কথাটা!

***