অদৃশ্য নজরদার – ৬

চারটে দিন কেটে গেল। এই ক’দিন ঝিনুককে একদম নিষ্ক্রিয় করে রাখলেন দীপকাকু। তদন্তের অগ্রগতি সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যাচ্ছে না। বাবাও কেমন যেন উৎসাহ হারিয়েছেন অ্যারোর ব্যাপারে। প্রসঙ্গ তুললে বলছেন, “যত সব বোগাস কেস। তিনজন শিক্ষিত বয়স্ক লোক নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করে ব্যাবসা তুলে দেওয়ার বন্দোবস্ত করছে, আমরা কেন খামোখা মাথা খাটিয়ে মরব! এমনিতে বাইরের লোক বদনাম করে, বাঙালির দ্বারা ব্যাবসা হয় না। ওঁরা সেটা আরও প্রমাণ করে ছাড়ছেন।”

“তুমি তা হলে বলছ, কেসটা দীপকাকুর ছেড়ে দেওয়া উচিত?” বলেছিল ঝিনুক।

বাবা বলেন, “অবশ্যই। তবে পঞ্চাশ হাজার টাকার টোপটা গিলে নিয়ে। তিনজনের মধ্যে যিনি টাকাটা দিতে চাইছেন, ব্যাবসা উঠে গেলে কোনও না-কোনওভাবে লাভবান হবেন।”

বাবার দৃঢ় বিশ্বাস, ওই তিন পার্টনারের মধ্যে একজন অপরাধী। সুযোগ বুঝে ফেভারিট দেশটার কথাও তুললেন, “এই কেসটাই যদি জাপানে হত, দু’দিনের বেশি সময় লাগত না সল্ভ করতে।”

“কীভাবে?” বাবা বানিয়ে কিছু বলবেন জেনেও জিজ্ঞেস করেছিল ঝিনুক। বাবা নির্দ্বিধায় বলেন, “ওদেশে ফোনের গলা শুনে, মানুষটার ছবি আঁকার মেশিন বেরিয়ে গিয়েছে। তোদের কেসের কালপ্রিট কবে ধরা পড়ে যেত।”

“ইনফরমেশনটা কোথায় পেলে?” চেপে ধরেছিল ঝিনুক। সঙ্গে সঙ্গে কল্পনার ডানা গুটিয়ে বাবা বলেছিলেন, “মেশিনটা এখনও পরীক্ষামূলক অবস্থায় আছে।” বাবার সঙ্গে আলোচনা করে কোনও লাভ হবে না বুঝে ঝিনুক ফোন করেছিল দীপকাকুকে, “তদন্তের কতদূর কী এগোল, কিছু বলছেন না তো!”

দীপকাকু বলেন, “তদন্ত মোটামুটি শেষ। অপরাধীকে ধরার জন্য অঙ্কের ফাঁদ পাতছি এখন।”

ঝিনুকের ডায়েরিতে কেসের সবিশেষ লেখা আছে, চোখ বুলিয়ে ঝিনুক পেয়েছে দুটো ইম্পর্ট্যান্ট পয়েন্ট, যার অনুসন্ধান এখনও বাকি। ফোনে পয়েন্ট দুটো মনে করিয়ে দেয় দীপকাকুকে।

“এক নম্বর, গ্লাস এবং হ্যান্ডবিলের হাতের ছাপ কি একই লোকের?” দীপকাকু বলেন, “হ্যাঁ, ল্যাবের রিপোর্ট তাই বলছে।”

“পয়েন্ট নম্বর টু, তিন পার্টনারের মধ্যে কারও কি সাদা অ্যাম্বাসাডর আছে?” দীপকাকু উত্তর দিলেন, “না, নেই। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি।”

সত্যিই অনুসন্ধানের আর তেমন কিছুই বাকি নেই, যদি না এর মাঝে কোনও ঘটনা ঘটে। ঝিনুক জানতে চেয়েছিল, “আমাদের এর পরের স্টেপ কী হবে?”

“ফাঁদটা ভাল করে গুছিয়ে নিই, তোমাকে ডেকে পাঠাব।”

.

আজ পঞ্চম দিন। সকালে ফোন এসেছিল দীপকাকুর। ‘গ্রিনপ্লেস’ হোটেলে আসতে বললেন। বাইশ নম্বর রুমে তিন পার্টনারকে নিয়ে গোপন মিটিং হবে। “রজতদা যদি রাজি থাকেন, ওঁকেও নিয়ে এসো,” বলেছিলেন দীপকাকু।

বাবা আসতে চাননি। বলেছেন, “তুই আশুকে নিয়ে চলে যা। গ্রিনপ্লেস দামি হোটেল, ট্যাক্সি থেকে নামলে ঠিক মানাবে না।”

দুরুদুরু বুকে গাড়িতে বসে আছে ঝিনুক। গ্রিনপ্লেসের মতো অভিজাত হোটেলে একা-একা যাওয়া মুখের কথা নয়। দীপকাকু না অদ্ভুত! কখনও ঝিনুককে ছোট্ট মেয়ে বলে গণ্য করেন, কখনও লেডি! ফোনে ঝিনুক বলেছিল, “আপনি আমাদের বাড়ি হয়ে যান, একসঙ্গেই যাব।”

উত্তরে দীপকাকু বলেছিলেন, “আমি জানি, কেন তুমি হেজিটেড করছ। উঁচু মহলে ঢোকার জড়তা তোমাকে কাটাতে হবে। এটাও এক ধরনের ইনভেস্টিগেটরদের শিক্ষা বলতে পারো।”

লিন্ডসে স্ট্রিট ডান দিকে রেখে এগিয়ে যাচ্ছে গাড়ি, ঝিনুক মন ঘুরিয়ে নেয় তদন্তের দিকে, আজকের মিটিংটা কীসের, কেনই-বা অ্যারোর অফিসের বদলে হোটেলের রুম বেছে নেওয়া হল?

পাঁচতারা হোটেলের জৌলুস এবং রাশভারী পরিবেশের ভিতর দিয়ে ঝিনুক পৌঁছে গিয়েছে বাইশ নম্বর ঘরে। পরিবেশ যতই গম্ভীর হোক, হোটেলের কর্মীরা অত্যন্ত অতিথিবৎসল।

মিটিং রুমের যে ছবি (আলো-অন্ধকার ঘর) ঝিনুক মাথায় করে এনেছিল, একেবারেই মিলল না। দুটো বড় বড় কাচের জানলা, নীচে দেখা যাচ্ছে হোটেলের পুল সাইড। নীল টলটলে জল। এখন অবশ্য কেউ সুইমিং করছে না। তিন পার্টনারসহ দীপকাকু সোফায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে খোশমেজাজে গল্প করছেন। চা, স্ন্যাকস চলছে। ঘরের মাঝে কারুকাজ করা বিশাল টেবিলে প্রচুর কাগজপত্তর।

ঝিনুক সোফায় গিয়ে বসতে দীপকাকুর উদ্দেশে পার্থবাবু বললেন, “আপনার ভাইঝিটি খুবই স্মার্ট অ্যান্ড সিরিয়াস। একে অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিয়ে ভালই করেছেন। মহিলা সহকারী খুব একটা দেখা যায় না। নিজেদের পরিচয় গোপন করতে সুবিধে হয় আপনাদের।”

গৌতমবাবু বললেন, “তবে বড্ড অল্পবয়সে চলে এসেছে এই কাজে। কত গুন্ডা-বদমাইশদের সঙ্গে পাল্লা দিতে হয়। ওর তো এখন পড়াশোনা করার বয়স।”

দীপকাকু বললেন, “না, না, ওকে বিশেষ বিশেষ কেসে সঙ্গে রাখি। মাথাটা শার্প, সাহস আছে, ক্যারাটে, কুংফু জানে। আমার ইচ্ছে, ভবিষ্যতে কলকাতাকে একটা চৌকস লেডি ডিটেকটিভ উপহার দেওয়ার।”

দীপকাকুর ঠাট্টা অনেক সময় ধরা যায় না, এমন সিরিয়াসলি বলেন। প্রসঙ্গ ঘোরায় ঝিনুক। গলা নিচু রেখে দীপকাকুর কাছে জানতে চায়, “হঠাৎ এখানে মিটিং কেন?”

দীপকাকু বললেন, “গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্য। দেখা গিয়েছে, অ্যারোর অফিসে বসে যে আলোচনাই হোক, বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে।”

“আজকের মিটিংয়ের অ্যাজেন্ডা কী?”

“সেরকম কিছুই না, আমি ওঁদের বলেছি, আপনাদের হাতে এখন যে-সব কাজ আছে, নিয়ে আসুন। ওর মধ্যে থেকে একটা কাজ আমি বেছে নেব। সেই বিজ্ঞাপনটা পার্টিকে পছন্দ করানো থেকে প্রচার করা অবধি আমার দায়িত্ব। অ্যাজ ইফ আমি ফোর্থ পার্টনার। এখানে একটাই শর্ত, অ্যাডটা বাজারে আসার আগে পর্যন্ত আমার সঙ্গে ওই বিষয়ে কথা বলা চলবে না। সম্পূর্ণ ভুলে যেতে হবে।”

ঝিনুক বুঝতেই পারে, অঙ্কের ফাঁদ বিছাতে শুরু করে দিয়েছেন দীপকাকু। তিন পার্টনার অঙ্কের ব্যাপারে কিছুই জানেন না, যে-কোনও মুহূর্তে একজন ফাঁদে পড়তে পারেন। আপাতত মন খুলে গল্প করছেন নিজেদের মধ্যে। ভাবটা এমন যেন চেঞ্জে এসেছেন!

পাখির ডাকের মতো বেল বাজে। কে এল এখন? দরজা খুলতে যান গৌতমবাবু

রুম সার্ভিসের বয় এসেছে, ট্রে-র উপর এক গ্লাস শরবত, প্লেটে পেস্ট্রি জাতীয় কিছু। বয় ট্রে-টা নামিয়ে রাখে ঝিনুকের পাশে ছোট্ট টুলে। মনে হচ্ছে অর্ডার দেওয়া ছিল, ঝিনুক এলে এটা দিতে হবে।

বয় চলে গেল। দরজা বন্ধ করে গৌতমবাবু বসলেন নিজের জায়গায়। ঝিনুক গ্লাস তুলে নিয়ে সিপ দিচ্ছে, দৃষ্টি যায় সেন্টার টেবিলের কাগজপত্তরে, একটা দারুণ ফোটোগ্রাফ সেখানে।

সোফা থেকে উঠে ফোটোটা নিয়ে আসে ঝিনুক, কালো শু-র মধ্যে বসে একটা বিড়াল আড়মোড়া ভাঙছে। কী কিউট!

দীপকাকু ঝিনুকের হাত থেকে ফোটোটা নিয়ে দেখতে থাকেন। ঝিনুক জিজ্ঞেস করে, “কীসের অ্যাড এটা?”

“নিশ্চয়ই বিড়ালের নয়!” কটাক্ষ করেন দীপকাকু। ওঁর এই এক দোষ, পাঁচজনের সামনে বোকা বানাতে খুব ভালবাসেন।

সুজয়বাবু বসে থেকে হাত বাড়ালেন, “দেখি, কোন ফোটোটা?”

দীপকাকু ফোটোটা ওঁর হাতে দিলেন। সুজয়বাবু দেখার পর বাকি দুই পার্টনারও দেখলেন। দীপকাকু বলতে শুরু করেছেন, “ফোটোটা যখন ঝিনুকের নজর কেড়েছে, এটা নিয়েই কাজে নামব আমি। মনে হচ্ছে, কাস্টমার সহজেই পছন্দ করবে। কোন কোম্পানির জন্য অ্যাডটা তৈরি করছিলেন?”

সুজয়বাবু বললেন, “আমাদের পুরনো ক্লায়েন্ট রোডস্টার কোম্পানি। পুজোর আগে ওরা আমাদের দিয়েই বিজ্ঞাপন করায়।

“কাজটা কত দূর এগিয়েছে?” জানতে চান দীপকাকু।

উত্তর দেন গৌতমবাবু, “পার্টিকে জুতোর মধ্যে বিড়ালের আড়মোড়া ভাঙার আইডিয়াটা মুখে বলেছিলাম। পছন্দ করেছে। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে চারটে ফোটো তোলা হয়। ফোটোগুলো এখনও রোডস্টার কোম্পানি দ্যাখেনি।’

“আমি দেখি। আছে এখানে?” বললেন দীপকাকু।

সুজয়বাবু টেবিলের কাগজপত্তর ঘেঁটে বাকি তিনটে ফোটো বের করলেন। প্রায় একই রকম ছবি, অ্যাঙ্গেলগুলো আলাদা, দীপকাকু ফোটোগুলো নিজের কাছে নিয়ে জানতে চাইলেন, “এই বিজ্ঞাপনের কী কী কাজ বাকি আছে?”

গৌতমবাবু বললেন, “ফোটো শুট তো হয়েই গিয়েছে, এরপর পার্টি সিলেক্ট করবে কোন ফোটোটা যাবে বিজ্ঞাপনে। বাকি রয়েছে ক্যাপশন দেওয়া।”

“অ্যাডটা কোন মিডিয়ায় প্রচার হবে? টিভি, নিউজ পেপার, হোর্ডিং…”

“কাস্টমার বলে দেবে সেটা,” বললেন গৌতমবাবু।

দীপকাকু বললেন, “ঠিক আছে, সে-সব আমি পার্টির থেকে জেনে নেব। আপনারা এখন ক্যাপশন দিন কয়েকটা। দেখি, পার্টি কোনটা পছন্দ করে!”

“এখনই দিতে হবে?” একটু যেন অসহায় কণ্ঠে বললেন সুজয়বাবু। এত তাড়াতাড়ি ভেবে উঠতে হবে বুঝে ভয় পাচ্ছেন মনে হয়।

দীপকাকু বললেন, “হ্যাঁ, এখনই ক্যাপশন চাই আমার। এই রুম থেকে বেরনোর সঙ্গে সঙ্গে আপনারা ভুলে যাবেন অ্যাডটার কথা। বাকি যা করার আমি করব। আপনারা শুধু ফোনে কাস্টমারকে বলে দেবেন, আমাকে প্ৰতিনিধি হিসেবে পাঠাচ্ছেন। অবশ্যই আমার আসল পরিচয় গোপন রাখবেন।”

দীপকাকুর কথা শেষ হতেই পার্থবাবু বলে ওঠেন, “বেডরুম কমফোর্ট’, কেমন হবে ক্যাপশনটা?”

“দারুণ! গৌতমবাবু, আপনি বলুন।” দীপকাকু যেন ওরাল টেস্টের টিচার। একটু ভেবে নিয়ে গৌতমবাবু বললেন, “আমার ক্যাচলাইন হচ্ছে ‘আফটার আ নাইস ড্রিম’।’

“এটাও ভাল!” বললেন দীপকাকু। ফোটোগুলো এখন ঝিনুকের হাতে। ক্যাপশন দুটো আশ্চর্যভাবে ম্যাচ করে গেল। বিজ্ঞাপনের সঙ্গে ওঠাবসা করতে করতে এঁদের মাথা কাজ করছে প্রায় যন্ত্রের মতো। এবার পালা সুজয়বাবুর। বেশ খানিকক্ষণ ভেবে বললেন, “আমি বাংলায় ক্যাচলাইন দেব।”

“ভালই তো। ভ্যারাইটি হবে!” বললেন দীপকাকু

“আপনার পা জোড়া/ দেবে শুধু আড়মোড়া!” ছড়া কেটে বললেন সুজয়বাবু। জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন লাগল?”

“ভাল, খুব ভাল!” বললেন দীপকাকু। বাকি দুই পার্টনার সায় দিলেন। ঝিনুকেরও সুজয়বাবুর ক্যাপশনটা সবচেয়ে ভাল লেগেছে, বিড়ালের আড়মোড়ার সঙ্গে পায়ের আরাম কী সুন্দর মেলালেন। দৃশ্যত গম্ভীর দেখতে মানুষটির মধ্যে এত মজা লুকিয়ে আছে বোঝাই যায়নি!

“ঝিনুক, তুমি কোনও স্লোগান দেবে?” জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু।

অপ্রস্তুত বোধ করে ঝিনুক, “না, আমি আবার কেন!”

“ট্রাই করো। যাচাই করা যাবে তোমার উদ্ভাবনী ক্ষমতা।”

চেষ্টা একবার করাই যাক, মন দিয়ে চারটে ফোটো বারবার দ্যাখে ঝিনুক। নাঃ, কোনও ক্যাপশনই মাথায় আসছে না। সপ্তাহখানেক ধরে ভাবলে হয়তো আসবে।

দীপকাকু বুঝলেন, ঝিনুকের দ্বারা হবে না। আগের ক্যাপশন তিনটে নোট করে নিলেন একটা কাগজে। তিন পার্টনারের উদ্দেশে বললেন, “তা হলে ওই কথা রইল, এই ঘর থেকে বেরিয়ে আপনারা বিজ্ঞাপনটা ভুলে যাবেন।”

প্রায় একসঙ্গে ঘাড় হেলালেন তিন বন্ধু। ঝিনুকের বুঝতে অসুবিধে হল না, দীপকাকু অঙ্কের আর-একটা ধাপে গিয়ে পৌঁছলেন।

রুম থেকে বেরনোর আগে আর-এক রাউন্ড চা হল। ঝিনুকের জন্য এসেছিল আইসক্রিম। তিন পার্টনার গাড়ি অবধি পৌঁছে দিলেন ঝিনুকদের। দীপকাকু বাইক আনেননি। পার্থবাবু ওঁকে বাড়ি থেকে তুলেছিলেন।

গাড়ি স্টার্ট দিয়ে মেন রাস্তায় এসে পড়ল আশুদা। তখনই হাত পিছন করে একটা ভাঁজ করা কাগজ দিল দীপকাকুকে। বলল, “একটু আগে একটা লোক এসে দিয়ে গেল। বলল, আপনাকে দিতে।”

ঝিনুক নিশ্চিত হয়, এটা আর-একটা হুমকির চিঠি। ভ্রু কুঁচকে কাগজের ভাঁজ খুললেন দীপকাকু। ঝিনুকের আন্দাজ মিলে গেল। আগের মতো কম্পিউটারে বাংলা হরফে লেখা, “আমি একটা ক্যাপশন দিই। দ্যাখো, পছন্দ হয় কিনা— ইয়োর ফিট/ ডিজ়ার্ভ ইট।”

দীপকাকুকে নিয়ে নিদারুণ মশকরায় মেতেছে অপরাধী। অপমানে থমথম করছে দীপকাকুর মুখ। আশুদাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন দেখতে লোকটাকে?”

আশুদা যা বর্ণনা দিল, হুবহু মিলে যায় আগের লোকটার সঙ্গে। আর-একবার যদি বাছাধনকে পেয়ে যায় ঝিনুক, মজা বের করে দেবে হুমকির চিঠি দেওয়ার। নার্সিংহোমে একটুর জন্য হাত ফসকে বেরিয়ে গিয়েছিল।

কাগজটা হাতে নিয়ে গুম মেরে বসে আছেন দীপকাকু। তিন পার্টনারের জন্য যে ফাঁদ তিনি পেতেছিলেন, বড়সড় ফাঁক রয়ে গিয়েছে তাতে। ঝিনুক বলে, “তা হলে কি চতুর্থ কোনও ব্যক্তি অপরাধী? কেননা তিন পার্টনারই তো আজ আমাদের সামনে ছিলেন। মিটিংয়ে জুতোর বিজ্ঞাপন নিয়ে কথা হবে, সেটাও তো আগে থেকে ঠিক করা ছিল না। কথাটা বেরল কী করে?”

চিন্তামগ্ন গলায় দীপকাকু বললেন, “আলোচনা চলাকালীন অন্তত দু’বার গৌতমবাবু টয়লেট যান।”

এবার ঝিনুককে বেশ নিশ্চিন্ত দেখায়, বলে, “তা হলে তো মিটেই গেল! গৌতমবাবুই অপরাধী! টয়লেট থেকে ফোন করে দিয়েছিলেন লোকটাকে, প্রথমবারের হুমকির চিঠির ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল।”

“মোটিভটা কী, কেন গৌতমবাবু চাইবেন কোম্পানিটা ডুবে যাক? কী লাভ হবে ওঁর? অপরাধের উদ্দেশ্য যতক্ষণ না জানা যাচ্ছে কাউকেই দায়ী করতে পারছি না।”

গাড়ি পার হয়ে গেল বিড়লা তারামণ্ডল। চিরকুটটা এখন ঝিনুকের হাতে। আজকের চিঠিটায় সেই অর্থে হুমকি দেওয়া হয়নি। অক্ষরগুলো থেকে ফুটে বের হচ্ছে অপরাধীর স্পর্ধা। দীপকাকুর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, ভীষণ অশান্ত হয়ে আছে মন। এই চিঠিটা একটু হলেও দীপকাকুর আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ঝিনুক বলে, “ক্যাচলাইনটা কিন্তু ভালই, ‘এই আরামের যোগ্য আপনার পা’। সত্যি, মানুষের পায়ের খাটুনি সবচেয়ে বেশি।”

চলন্ত গাড়ির জানলার বাইরে তাকিয়ে দীপকাকু বললেন, “আমি এই কেসের যোগ্য কিনা, প্রমাণ দিতে হবে এবার। যদি কেসটা সল্ভ করতে পারি, গোয়েন্দাজীবনের স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে।”