২
খুব একটা পীড়াপীড়ি কিছু করতে হয়নি, দীপকাকু রাজি হয়েছেন সেনগুপ্তবাবুর কেসে ঝিনুককে অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিতে। ঝিনুকের পড়াশোনার চাপ ও এখন কম। বাবা তো পারমিশন দিয়েই রেখেছেন। মা যথারীতি একটু গাঁইগুঁই করেছিলেন, “আচ্ছা দীপঙ্কর, প্রতিবারই তোমাদের কেস শেষ হওয়ার পর দেখি, ঝিনুক হাত-পা ছড়েকুটে এসেছে। তুমি থাকো একেবারে ফ্রেশ। ওকে কি মারদাঙ্গার জন্য সঙ্গে নাও?”
উত্তরে দীপকাকু বলেছিলেন, “ঝিনুকের কী মুশকিল হচ্ছে জানেন বউদি, কখনও কখনও একটু বেশিই উৎসাহ দেখিয়ে ফেলে, যার চিহ্ন হাতে-পায়ে রয়ে যায়।”
শুনে রাগ হয়ে গিয়েছিল ঝিনুকের। গতবার যখন অযোধ্যা পাহাড়ে দীপকাকুকে কটেজের মধ্যে বেঁধে রাখা হয়েছিল, দৌড়ে এসে জাম্প দিয়ে ঝিনুক দরজা না ভাঙলে ব্যাপারটা খারাপ দিকেই গড়াত। সে-সব মনে না করিয়ে ঝিনুক অপেক্ষা করছিল দীপকাকুর বাইকের পিছনে উঠে বসার।
আশা পূর্ণ হয়েছে। দীপকাকুর সঙ্গে ঝিনুক এসে পৌঁছেছে মির্জা গালিব স্ট্রিটে দেবাংশু সেনগুপ্তর অফিসে। ভদ্রলোক তাদের অপেক্ষাতেই ছিলেন, দীপকাকুকে দেখে চনমনে হয়ে উঠলেন। বিশেষ কথায় না গিয়ে দীপকাকু প্রথমেই বললেন, “ওয়েস্ট বক্সটা নিয়ে আসুন। ব্যাগের মধ্যে যে-সব কাগজ ছিল, দেখব।”
যে লোকটি ওয়েস্ট বক্সটা নিয়ে এল, সম্ভবত তার নামই নিতাই। সেনগুপ্তবাবুর অফিসের বেয়ারা। দীপকাকু ফ্লোরে উপুড় করে দিলেন বক্স। দোমড়ানো- মোচড়ানো নিউজ পেপারই বেশি। বাংলা, ইংরেজি মেশানো। কভার-ছেঁড়া ম্যাগাজিনও দেখা গেল। মেঝেতে উবু হয়ে বসে দীপকাকু এখন ওইসব কাগজপত্র সোজা করে নিয়ে মন দিয়ে এপিঠ-ওপিঠ দেখতে লাগলেন। কেন দেখছেন, ঝিনুক তখনও বুঝতে পারেনি। ঘরের বাকি তিনজনের ঝিনুকের মতোই অবস্থা। ওই তিনজনের মধ্যে একজন নিশ্চয়ই দেবাংশু সেনগুপ্তর টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট তথাগত। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ। একটু গোলগাল ভালমানুষ চেহারা। অভিব্যক্তি চেপে রাখতে জানে না। দীপকাকুর কাজকর্ম দেখে কেমন যেন একটু ‘হাঁ” হয়ে আছে! তুলনায় নিতাই অ্যাকটিভ এবং কৌতূহলপ্রবণ। দীপকাকুর চেয়ে একটু তফাতে নিলডাউন হয়ে এমনভাবে বসেছে, যেন যে-কোনও নির্দেশের জন্য সে প্রস্তুত।
ঝিনুক জানে, সেনগুপ্তবাবুর মতো অফিসের এই দু’জন স্টাফও দীপকাকুর সন্দেহের তালিকায় আছে। চেহারা এবং অভিব্যক্তির নিরিখে দেবাংশু সেনগুপ্তর অ্যাসিস্ট্যান্টটিকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়াই যায়। দীপকাকু কিন্তু দেবেন না। যেমন দেননি দেবাংশু সেনগুপ্তকেও।
কাল দীপকাকুর অফিস থেকে বেরিয়ে ঝিনুকরা যখন রেস্তরাঁয় খেতে বসেছিল, বাবা বলেছিলেন, “আমার কী মনে হচ্ছে জানো তো দীপঙ্কর, সেনগুপ্তর কেসটা একেবারেই বোগাস। কেসটা নিয়ে ভাবার কোনও মানেই হয় না।”
“কেন এ-কথা বলছেন?” চামচে চিংড়ি গেঁথে মুখে তুলতে তুলতে জানতে চেয়েছিলেন দীপকাকু।
বাবা বললেন, “লোকটা বিচ্ছিরি রকমের ভুলো মনের। দেখলে না, ব্রিফকেস সঙ্গে নিয়ে এসেছে দেখানোর জন্য, অথচ ভুলে বসে আছে! আমার ধারণা, জিনিসপত্র ওই ব্যাগে সেনগুপ্ত রাখেইনি। অথবা বের করে অন্য কোথাও রেখেছে, এখন গিয়েছে ভুলে।”
খেতে খেতে দীপকাকু মিটিমিটি হাসছিলেন। বললেন, “আমিও তো কম ভুলো মনের নই। ঝিনুক বেশ কয়েকবার তার প্রমাণ পেয়েছে। কিন্তু আমি যখন কোনও ইনভেস্টিগেশনে জড়িয়ে থাকি, তার অতি ছোটখাটো তথ্যও ভুলি না। আসলে, নিজের কাজে অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে গিয়ে বাইরের কিছু ব্যাপার ভুলভাল হয়ে যায়। ঠিক তেমনই, স্পেয়ার পার্টস, ডায়াগ্রাম, সেনগুপ্ত ব্যাগেই রেখেছিলেন। জিনিসগুলো হারিয়ে যেতে, ব্যাগটা তাঁর কাছে মূল্যহীন হয়ে গিয়েছিল।”
হারিয়ে যাওয়া মূল্যবান জিনিসগুলো খুঁজে পেতে দীপকাকু কাজ শুরু করে দিয়েছেন সিরিয়াসলি। এখন যা যা দেখছেন, কিছুই ভুলছেন না। অথচ সেনগুপ্তর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভুলে ঝিনুকদের সঙ্গে খেতে চলে যাচ্ছিলেন। ক্লায়েন্ট এবং ডিটেকটিভের চরিত্রে বেশ মিল আছে।
কাগজগুলো দেখা হল দীপকাকুর। নিতাইকে বললেন, “এগুলো একটা প্যাকেটের মধ্যে রেখে দাও। পরে আমার কাজে লাগতে পারে।”
দীপকাকু উঠে দাঁড়াতেই সেনগুপ্তর অ্যাসিস্ট্যান্ট চেয়ার এগিয়ে দিলেন।
বসলেন দীপকাকু। অ্যাসিস্ট্যান্টকে দেখিয়ে সেনগুপ্তবাবুকে প্রশ্ন করলেন, “এঁর পরিচয়?”
“তথাগত বসু, যার কথা আপনাকে বলেছিলাম। আমার টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট।”
দেবাংশুবাবুর বলা শেষ হতেই তথাগত অতি বিনয়ে দীপকাকুর উদ্দেশে হাতজোড় করলেন। দীপকাকু আধো প্রতিনমস্কার জানিয়ে দেবাংশুবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, “ব্যাগটা অফিসে এনে প্রথমে কোথায় রেখেছিলেন?”
“সোজা ওয়ার্কশপে ঢুকেছিলাম ব্যাগটা নিয়ে।”
“ওয়ার্কশপটা কোনদিকে?”
“এই তো অফিসঘরের পিছনেই। যাবেন তো চলুন! তার আগে একটু চা খেলে হত না?”
“বলে দিন আনতে। ওয়ার্কশপে বসে খেয়ে নেব।” বলে, উঠে দাঁড়ালেন।
দীপকাকু নিতাইকে অর্ডার করতে হল না, চা আনতে বেরিয়ে যাচ্ছিল, ঝিনুক ইশারায় জানাল, সে চা খায় না। তারপর অনুসরণ করল দীপকাকুদের।
.
ওয়ার্কশপটা বেশ বড়। তুলনায় অফিস খুবই ছোট। দুটো রুমেই এসি আছে। ওয়ার্কশপ ভরতি ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি। এর মধ্যে কম্পিউটারের মনিটারটাই ঝিনুকের চেনা। ঘরটা দেখে ঝিনুকের মনে হচ্ছে, এখানে অনায়াসে রোবট তৈরি করা যায়। একটা বড়সড় টেবিলের কাছে এসে দাঁড়ালেন দেবাংশুবাবু। বললেন, “অফিসে ঢুকে ব্যাগটা এখানে নিয়ে এসে রেখেছিলাম।”
“তখনই খুলে দেখেছিলেন কি?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।
‘না। প্রায় ঘণ্টাদুয়েক পর। ব্যাগ এখানে রেখে অফিসের টেবিলে যাই, চারটে মেল করি। আর কিছু পেপারওয়ার্ক। হাত ফাঁকা করে ব্যাগটা খুলতে আসি।
“ইন দি মিন টাইম এই ঘরে কে কে ঢুকেছিল?” দীপকাকুর পরের প্রশ্ন। দেবাংশু সেনগুপ্ত বললেন, “ঢুকলে, আমার দু’জন স্টাফই ঢুকবে। দরজা খোলাই ছিল। ওদের মানাও করিনি ঘরে যেতে।”
“ওয়ার্কশপে ঢোকার কি একটাই এনট্রান্স?”
“হ্যাঁ। বাকি তিনটে দেওয়াল সিল্ড। দেওয়ালের ওপারে অন্য অফিস আছে।”
সেনগুপ্তবাবুর বলা শেষ হতে দীপকাকু এগিয়ে গেলেন দেওয়ালের দিকে। চোখ বুলিয়ে হাঁটতে লাগলেন। যে দেওয়ালে প্লিট এসি লাগানো, সেখানে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে ফের শুরু করলেন হাঁটা। ট্রে-তে দু’কাপ চা আর কোল্ড ড্রিঙ্ক নিয়ে ঢুকল নিতাই। ঠান্ডাটা নিশ্চয়ই ঝিনুকের জন্য।
দীপকাকু চায়ের কাপ তুলে নিয়ে সেনগুপ্তবাবুকে বললেন, “আপনি একটু বাইরে থাকুন। আপনার এই স্টাফটিকে আমি ক’টা কথা জিজ্ঞেস করব।”
“ওয়েল,” বলে, নিজের চায়ের কাপ নিয়ে দরজার দিকে হেঁটে গেলেন দেবাংশু সেনগুপ্ত। ঝিনুক কোল্ড ড্রিঙ্ক তুলে নিল। নিতাই ট্রে-টা টেবিলে রেখে মাথা নিচু করে হাতে হাত জড়িয়ে এমন ভঙ্গিতে দীপকাকুর সামনে দাঁড়াল, যেন এর আগে বহুবার পুলিশ বা গোয়েন্দার জেরার উত্তর দিয়েছে।
দীপকাকু চেয়ার টেনে নিয়ে বসেছেন। চায়ে চুমুক দিতে দিতে নিতাইকে তাঁর প্রথম প্রশ্ন, “আমরা কেন এসেছি, তুমি জানো তো?”
নিতাই ঘাড় কাত করল। অর্থাৎ, জানে।
দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “যখন জানা গেল ব্যাগ থেকে সবকিছু চুরি হয়ে গিয়েছে, তুমি তখন কোথায় ছিলে?”
“অফিসেই ছিলাম স্যার। একটা পার্সেল প্যাক করছিলাম। হঠাৎ শুনি ওয়ার্কশপ থেকে দাদাবাবুর গলা, ‘নিতাই!” বলে ডেকে উঠলেন। ঠিক ডাক নয়, হা-হুতাশের মতো। দৌড়ে গেলাম ওয়ার্কশপে। দেখি, সুটকেস খোলা, একগাদা কাগজ, দাদাবাবু মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন!”
“সুটকেসে কী ছিল তুমি জানতে?”
“না, নতুন ব্যাগ নিয়ে অফিসে ঢুকেছেন দেখেছিলাম। একবার জিজ্ঞেসও করেছিলাম, ‘বাইরে থেকে কিনলেন?”““
“তার মানে, তুমি জানতে দাদাবাবু সিঙ্গাপুর গিয়েছেন?”
“কেন জানব না! আমিই ট্রাভেল এজেন্সি থেকে টিকিট এনে দিই প্রতিবার।”
“এবার কোন কাজে গিয়েছিলেন, সে ব্যাপারে তোমার ধারণা আছে?”
“না। যন্ত্রপাতি কিনতে যান এটুকু জানি। এর বেশি আমার জানার দরকারও নেই, ইচ্ছেও নেই।”
দীপকাকুর চা শেষ হল। টেবিলে কাপ নামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি যখন এসে দেখলে দাদাবাবু মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন, তথাগত কোথায় ছিল?”
“তথাগতদা সিগারেট খেতে গিয়েছিল বাইরে। আমি ঢোকার একটু পরে ঢুকল ওয়ার্কশপে।”
“তথাগতর সঙ্গে দাদাবাবুর সম্পর্ক কেমন?”
“ভাল। তথাগতদা দাদাবাবুকে গুরু মানে। কখনও মুখে মুখে কথা বলে না।”
“তুমি বলো?”
“বলি। যখন দেখি দাদাবাবু আমাকে কোনও কাজের কথা বলতে ভুলে গিয়েছেন, অথচ বলছেন, আমি বলেছি। তখনই খটাখটি লাগে।”
দীপকাকুর ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। বললেন, “এবার তোমাকে একটা অন্য প্রশ্ন করি। কলকাতায় সবচেয়ে ভাল চাবি কোথায় তৈরি করে বলতে পারো?”
এই প্রথম একটু চমকাল নিতাই। বলল, “কেন স্যার? আপনি কি ভাবছেন আমি সুটকেসের ডুপ্লিকেট চাবি….”
কথা কেটে দীপকাকু বললেন, “তুমি সুটকেসটা ওই দিনই প্রথম দেখেছ, চাবি হাতে পাওয়া তো দূরের কথা! আমি একটা দরকারে জানতে চাইছি, কোথায় ভাল চাবি তৈরি করা যায়? তোমরা তো লোহালক্কড়ের মার্কেটে ঘোরাঘুরি করো।”
একুটা যেন নিশ্চিন্ত হল নিতাই। বলল, “চাঁদনি মার্কেটে কিছু ছোটখাটো দোকান আছে। শুনেছি, ভালই কাজ করে। আমি কখনও করাইনি।”
“ঠিক আছে। এবার তুমি যেতে পারো, তথাগতকে পাঠিয়ে দাও।” দীপকাকুর নির্দেশ শুনে ঘাড় হেলাল নিতাই, আচরণে আগের সেই এনার্জি নেই। একটু যেন ঝিমিয়ে পড়ে হেঁটে যাচ্ছে দরজার দিকে।”
ঝিনুক জিসের পকেট থেকে ছোট নোটবুকটা বের করে ইনভেস্টিগেশনের পয়েন্টগুলো লিখতে থাকল। দীপকাকুর সঙ্গে কাজ করতে গেলে এটা তার অবশ্যকর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখন হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসবেন, এতক্ষণ যা যা দেখলে, তাতে তোমার কী মনে হচ্ছে বলো? প্রশ্নটা দু’দিন পরেও আসতে পারে। ঝিনুককে সবসময় প্রস্তুত থাকতে হয়।
ঘরে ঢুকলেন তথাগত। থতমত ভাবটা এখনও ওঁর কাটেনি। হেঁটে আসছেন খুব ধীর পায়ে। যেন বাঘের খাঁচায় ঢুকেছেন। দীপকাকুর চেহারায় কিন্তু বাঘের কোনও ছায়াই নেই। তবে যখন কাজের মধ্যে থাকেন, ব্যক্তিত্বটা বদলে যায়।
তথাগত সামনে দাঁড়াতে দীপকাকু প্রশ্ন করলেন, “কতদিন কাজ করছেন এখানে?”
“তিন বছরের একটু বেশি।”
“অন্য কোথাও চাকরির চেষ্টা করছেন না? আমাকে নির্ভয়ে বলতে পারেন। দেবাংশুবাবুকে বলব না।”
“না স্যার, ট্রাই করিনি। দাদার কাছে ভালই আছি। অনেক কিছু শিখছি। এভাবে কেউ শেখাবে না।”
“ভবিষ্যতে কী পরিকল্পনা আছে? দাদার মতো একটা কোম্পানি খোলার?”
“এখনও সেরকম কিছু ঠিক করিনি।”
“দাদা কী কারণে সিঙ্গাপুর গিয়েছিলেন আপনি জানেন?”
“জানি। কাজের ব্যাপারে দাদা সব কথাই বলেন আমাকে।”
“তার মানে দেবাংশুবাবু কোন কোম্পানির কাজের বরাত পেয়েছিলেন, তাও জানেন?”
“হ্যাঁ, ‘গ্রেট বাইট’ বিস্কুট কোম্পানির।”
“কত টাকার কাজ। সেটা কি জানেন?”
“কোম্পানির টাকাপয়সার ব্যাপারে আমি খোঁজ রাখি না। টেকনিক্যাল কাজ ছাড়া দাদা আর কোনও ব্যাপারে আমার সঙ্গে আলোচনা করেন না। আমারও কোনও ইন্টারেস্ট নেই।”
“যে কাজের অর্ডার আপনার দাদা নিয়েছিলেন, সেটা করার মতো দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার আপনার জানা কেউ আছে কি?”
“না। দাদা ইলেকট্রনিক্সের যে লাইন ধরে কাজ করেন, সেরকম ইঞ্জিনিয়ার কলকাতায় খুব কম। যে ক’জন আছে, দাদার চেয়ে তারা শত মাইল পিছিয়ে।”
উত্তরটা পাওয়ার পর দীপকাকু থামলেন। কী একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “এবার আপনার ফ্যামিলি সম্বন্ধে কিছু বলুন। যদি মনে করেন এটা আপনার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার, না-ও বলতে পারেন।”
তথাগত বললেন, “ব্যক্তিগত কিছু নেই। দাদা সবই জানেন। শোভাবাজারে শরিকি বাড়িতে থাকি আমরা। বাবা মারা গিয়েছেন। আমি, মা। এক বোন, কলেজে পড়ে।”
“আর্নিং সোর্স?” জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু
তথাগত বললেন, “বাবার অফিস থেকে মা-র নামে আসা পেনশন। আর আমি এখান থেকে যা পাই।”
“এবার আমার লাস্ট কোয়েশ্চেন। দেবাংশুবাবুর পাসোনাল কম্পিউটারের পাসওয়ার্ড কি আপনি জানেন?”
“জানি। দাদা আমার কাছে কিছুই গোপন করেন না।”
“ঠিক আছে, এবার আপনি আসতে পারেন। দেবাংশুবাবুকে পাঠিয়ে দিন।” দীপকাকুর নির্দেশ শুনে, তথাগত ঘুরে গিয়ে হাঁটা দিলেন। লোকটার লুক বোকা বোকা হলে কী হবে, উত্তরগুলো দিলেন স্মার্টভাবে। ঝিনুক জিজ্ঞাসাবাদের শেষ অংশ তড়িঘড়ি নোট করছিল। দীপকাকু বলে উঠলেন, “কেসটা নির্ভেজাল। আমাকে ফাঁসানোর জন্য সাজানো হয়নি।”
ঝিনুকের মনে হল দীপকাকুর বুঝি একটু বেশিই অহংকার হয়ে গিয়েছে, তাই ভেবে ফেলছেন ওঁর রেপুটেশন নষ্ট করতে কেউ উঠেপড়ে লেগেছে। কথাটা ঘুরিয়ে তুলল ঝিনুক, “আচ্ছা, আপনি কেন ভাবছেন, ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে আপনাকে? কাদের হিংসার পাত্র হয়েছেন আপনি?”
দীপকাকু বললেন, “হিংসা নয় ঝিনুক, প্রতিহিংসা। তুমি তো সব কেসে আমার সঙ্গে থাকো না। অনেক উচ্চপদস্থ খারাপ লোকের স্বার্থে ঘা দিয়েছি আমি। তারা তো আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করবেই। এই চুরিটা এতই ফাঁকফোকরহীন, আমার মনে হচ্ছিল বুঝি কেউ আমার বুদ্ধির দৌড় পরীক্ষা করার জন্য কেসটা পাঠিয়েছে।”
“আর এখন কী করে বুঝছেন কেসটা জেনুইন?”
প্রশ্নের উত্তর পেল না ঝিনুক। ঘরে ঢুকে এসেছেন দেবাংশুবাবু। একটা প্লাস্টিকের টুল টেনে এনে দীপকাকুর সামনে বসলেন। গা থেকে সিগারেটের গন্ধ ভেসে আসছে। খেতে গিয়েছিলেন বাইরে। সেই জন্যই দেরি হল আসতে।
ঝিনুক দাঁড়িয়েই ছিল। একটু দূরে একটা চেয়ার আছে, বসতে ইচ্ছে করছিল না। দেবাংশুবাবু জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকুকে, “ওদের সঙ্গে কথা বলে কী মনে হল আপনার?”
দীপকাকু বললেন, “এমনিতে ঠিকই আছে। দু’জনেই বিশ্বাসী মনে হল। আপনাকে যথেষ্ট রেসপেক্ট করে। এখন দেখা যাক, তদন্ত যত এগোবে, স্পষ্ট হবে ওদের রূপ। আচ্ছা, আপনি বোধহয় চুরির পর থানায় কোনও ডায়েরি করেননি, না?”
“না, করিনি। করে কী হবে? চুরি যে হয়েছে, সেটাই প্রমাণ করতে পারব না।”
“তবু একটা এফআইআর করে রাখুন। ডায়েরি নেওয়ার সময় পুলিশ প্ৰমাণ চায় না। আপনার করা ডায়েরি আমার তদন্তে সাহায্য করবে।”
“কিন্তু কমপ্লেনটা করব কোন থানায়? চুরিটা বাড়িতে হয়েছে, নাকি অফিসে বা অন্য কোথাও, কিছুই তো বুঝতে পারছি না!”
“আপনি অফিস আসেন কীসে?”
“নিজের গাড়িতে। আমিই ড্রাইভ করি।”
“ব্যাগটা নিয়ে যেদিন অফিসে এসেছিলেন, রাস্তায় অন্তত পনেরো মিনিটের জন্য গাড়ি দাঁড় করিয়ে কোথাও গিয়েছিলেন?”
“না। বাড়ি থেকে সোজা অফিস। কোথাও গাড়ি রাখিনি।”
“আপনার বাড়িটা যেন কোথায়?”
“যাদবপুরে। সেন্ট্রাল পার্কের একটা কমপ্লেক্সের দোতলার ফ্ল্যাটে থাকি আমি।”
“আপনি যাদবপুর থানায় এফআইআর করুন।”
সামান্য উদ্বেগসহ দেবাংশুবাবু বললেন, “চুরি হয়েছে পাঁচদিন হয়ে গেল। পুলিশ যদি বলে, এতদিন পরে এলেন কেন?”
“বলবেন, এই ক’দিন নিজের ক্ষমতামতো চোর ধরার চেষ্টা করেছি। আন্দাজ করছিলাম, চোর আমার ঘনিষ্ঠ কেউ। তাকে সামাজিকভাবে অপদস্থ করতে চাইনি। আমার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, তাই আপনাদের কাছে এসেছি। এতেও যদি থানা ডায়েরি নিতে না চায়, অফিসারের সঙ্গে ফোনে আমায় কথা বলিয়ে নেবেন।”
দীপকাকুর কথায় ভরসা পেলেন দেবাংশুবাবু। বললেন, “ওকে। তা হলে তো আর কোনও প্রবলেমই রইল না।”
উঠে দাঁড়ালেন দীপকাকু। বললেন, “চলুন, অফিসঘরে যাই। আপনি আমাকে তিনজনের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর দেবেন।”
“কোন তিনজনের?” জিজ্ঞেস করলেন দেবাংশুবাবু।
দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে দীপকাকু বলতে লাগলেন, “আপনার দুই কম্পিটিটর ইঞ্জিনিয়ারের, আর গ্রেট বাইট কোম্পানির মালিকের। আর-একটা জিনিস আমার লাগবে, যে ব্যাগ থেকে আপনার জিনিসপত্র খোয়া গিয়েছে, তার একটা চাবি।”
“সব এখনই দিয়ে দিচ্ছি আপনাকে,” বললেন দেবাংশু সেনগুপ্ত।
ঝিনুকরা ওয়ার্কশপ থেকে বেরিয়ে দেবাংশুবাবুর কেবিনে ঢুকলেন। চেয়ারে বসে দীপকাকু বললেন, “ঠিকানা আর চাবি নিয়ে আমি ইনভেস্টিগেশনে বেরিয়ে যাব। আপনি যাবেন থানায়। কমপ্লেন লেখানোর পর ফোনে আমায় এফআইআর নম্বরটা বলবেন।”
এত দ্রুত নির্দেশগুলো দিচ্ছেন দীপকাকু, দেবাংশুবাবু ঠিক যেন ফলো করে উঠতে পারছেন না! চেয়ারে বসে হাঁ করে তাকিয়ে আছেন দীপকাকুর দিকে, অপেক্ষা করছেন আরও কোনও নির্দেশের।
দীপকাকুর গলায় ধমকের সুর এসে গেল, “কী হল, দিন জিনিসগুলো!”
শশব্যস্ত হয়ে পড়লেন দেবাংশুবাবু। বললেন, “হ্যাঁ, এই তো দিই!”
কাগজ, পেন টেনে নিয়ে নাম-ঠিকানা লিখতে শুরু করলেন দেবাংশুবাবু। ঝিনুকের মন ফিরে গেল একটু আগের জিজ্ঞাসাবাদের সেশনে। সেখানে এমন কিছু প্রশ্ন করেছেন দীপকাকু, যার কোনও কারণ খুঁজে পায়নি ঝিনুক। চান্স পেলেই প্রশ্নগুলো করার অর্থ দীপকাকুর থেকে জেনে নিতে হবে।
.
দুপুর একটা। ঝিনুক, দীপকাকু এখন ধর্মতলার রেস্তরাঁয়। দীপকাকু মেনু দেখে খাবার অর্ডার দিয়েছেন। বিরিয়ানি, চিকেন চাপ, ফিরনি… এলাহি সব আইটেম। অর্ডার দেওয়ার ধরন দেখে ঝিনুকের মনে হচ্ছিল, দেবাংশু সেনগুপ্তর কেসটা আর ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যেই দীপকাকু সল্ভ করে ফেলবেন। তাই বেশ খোশমেজাজে আছেন। বাস্তবে তা কিন্তু নয়। তদন্ত মোটেই এগোয়নি। দেবাংশুবাবুর অফিস থেকে বেরিয়ে বাইক চেপে ঝিনুকরা এসেছিল চাঁদনি মার্কেটে। দেবাংশুবাবুর স্টাফ নিতাইয়ের কথামতো দীপকাকু চাবি তৈরির দোকানের খোঁজ করলেন। পাওয়া গেল গোটাপাঁচেক দোকান। দেবাংশুবাবুর থেকে নেওয়া ব্যাগের চাবিটা সবক’টা দোকানদারকে দেখিয়ে বলা হল ডুপ্লিকেট তৈরি করতে। পাঁচজনই জানাল, তারা পারবে না। খুবই ক্রিটিকাল নাকি চাবি। এটা তৈরি করতে গেলে আরও যন্ত্রপাতি লাগবে। দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “এই চাবি কলকাতায় কে তৈরি করতে পারবে?” দোকানদারদের মধ্যে একজন বলল, “মল্লিকবাজারে মিস্টার আফাং-এর কাছে চলে যান। উনি চাবি তৈরির ব্যাপারে কলকাতায় এক নম্বর।”
দীপকাকু মিস্টার আফাংয়ের ঠিকানা লিখে নিয়ে পকেটে রেখেছিলেন। ঝিনুক ভেবেছিল এবার বুঝি মল্লিকবাজারে যাওয়া হবে। বদলে দীপকাকু বললেন, “চলো, লাঞ্চটা সেরে নিই কোনও রেস্তরাঁয়।”
খেতে আসার পথে ঝিনুক একটা কৌতূহল মিটিয়ে নিল, “আফাং নামটা অদ্ভুত! কোথাকার লোক বলুন তো?”
“চায়নার।” বলেছিলেন দীপকাকু।
ঝিনুক বিস্মিত হয়ে বলেছিল, “চিনের লোক!”
দীপকাকু বললেন, “এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই তো! আজ থেকে পঁচিশ-তিরিশ বছর আগে কলকাতায় ভাল টেকনিশিয়ান পেতে গেলে চাইনিজদের কাছেই যেতে হত। যেমন, চাইনিজ ডেন্টিস্টরা ছিলেন। ধীরে ধীরে টেকনোলজির কদর বুঝল বাঙালি। তাই এখন চারপাশে এত মেশিন সারানোর লোক।”
“আগের সেই চাইনিজ টেকনিশিয়ানরা তা হলে গেলেন কোথায়?” জানতে চেয়েছিল ঝিনুক।
দীপকাকু বললেন, “অনেকেই দেশে ফিরে গিয়েছেন। কেউ আবার অনুন্নত অন্য কোনও দেশে। আফাংয়ের মতো কয়েকজন এখনও রয়ে গিয়েছেন কলকাতায়।”
একটা কৌতূহল তখনকার মতো মিটলেও ঝিনুকের মাথায় রয়ে গিয়েছে বেশকিছু প্রশ্ন। বেয়ারা জল দিয়ে গিয়েছে। খাবার আসতে একটু দেরি হবে, এখন প্রশ্নগুলো করা যায়। দীপকাকু শূন্যে চোখ রেখে কী যেন ভাবছেন! শরীরটা কাঁপছে। টেবিলের তলায় পা দোলাচ্ছেন নিশ্চয়ই। ঝিনুক বলে উঠল, “আমার কয়েকটা জিনিস জানার আছে।”
“বলে ফ্যালো!” টেবিলের ওপার থেকে বললেন দীপকাকু।
ঝিনুক বলল, “ব্যাগের মধ্যে থাকা কাগজগুলোকে এত গুরুত্ব দিচ্ছেন কেন? কী দেখছিলেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে?”
“দেখছিলাম, কাগজগুলো কোথাকার। এতে মোটামুটি একটা আন্দাজ পাওয়া যাবে, কোথায়, কবে নাগাদ ওগুলো ঢোকানো হয়েছে ব্যাগে?”
“কী বুঝলেন কাগজগুলো দেখে?”
বড় একটা শ্বাস ছেড়ে দীপকাকু বললেন, “খুবই বিভ্রান্তিকর। নানাধরনের কাগজ, কলকাতার দশদিন এবং আটদিনের পুরনো বাংলা, ইংরেজি নিউজ পেপার, সিঙ্গাপুরের টুরিস্ট কোম্পানির ক্যাটালগ, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স-এর একটা ম্যাগাজিন। একটা এই মাসের বাংলা ম্যাগাজ়িন। কিছু পিচবোর্ড আর প্লাস্টিক। এর থেকে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো বেশ কঠিন।”
খাবার এসে গেল। ধোঁয়া উঠছে প্লেটে। ঝিনুক এখন ওদিকে মন দেবে না। সে পরের প্রশ্নে গেল, “কলকাতায় চাবি কোথায় ভাল তৈরি করে আপনি নিশ্চয়ই জানেন। তাও কেন নিতাইকে প্রশ্নটা করলেন?”
“ওর রিঅ্যাকশানটা দেখার জন্য। সম্প্রতি ও যদি ব্যাগটার আসল চাবি থেকে নকল করিয়ে থাকে, এক্সপ্রেশনে ফুটে উঠত অপরাধের ছায়া।”
“উঠেছে কি?” জানতে চাইল ঝিনুক।
হতাশ স্বরে দীপকাকু বললেন, “না। হয়তো ভাল অভিনেতা।”
ঝিনুক জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি শিয়োর, চাবি নকল করে ব্যাগটা খোলা হয়েছে? আসল চাবি দিয়েও তো খোলা হতে পারে।”
দীপকাকু খাওয়া শুরু করলেন। মুখ এখন ব্যস্ত। তাই শুধু ঘাড় নাড়লেন। মানেটা বুঝতে পারল ঝিনুক। দুটো ঘটনাই সম্ভব। ঝিনুক খাওয়া শুরু করল। মুখ ফাঁকা হতে দীপকাকু বললেন, “চাঁদনি মার্কেটে চাবি তৈরির দোকান আছে, আমি জানতাম। আফাংয়ের নামটা আমার উপরি পাওনা।
খাওয়ার ফাঁকে ঝিনুক প্রশ্ন করল, “তথাগতবাবুকে কেন জিজ্ঞেস করলেন, দেবাংশুবাবুর পার্সোনাল কম্পিউটারের পাসওয়ার্ড জানেন কি না?”
“দেখছিলাম, লোকটা মালিকের কতটা ঘনিষ্ঠ। পাসওয়ার্ড জানে যখন, খুবই কাছের লোক। অথচ একটা ব্যাপার গোপন করে গেল।”
“কোন ব্যাপারটা?”
“মেশিন আপগ্রেডেশনের জন্য কত টাকার এগ্রিমেন্ট হয়েছে, তথাগত জানে। বলল না।”
“কীভাবে জানল?”
“এরকম বড় অ্যামাউন্টের এগ্রিমেন্ট পেপার, দেবাংশুবাবু অবশ্যই নিজের কম্পিউটারে কপি করে সেভ করে রেখেছেন। স্বাভাবিক কৌতূহলে তথাগত সেটা দেখেছে, পাসওয়ার্ড সে জানে। অথচ বলছে, কত টাকার অর্ডার জানে না। এই পয়েন্টটা কেন এড়িয়ে যেতে চাইছে, দেখতে হবে।”
ঝিনুকও খেতে খেতে ভাবতে থাকল, কেন তথাগতবাবু টাকার অ্যামাউন্টটা জানেন না বললেন? নিজেকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখার জন্য? তা হলে উনিই… না, এত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। দীপকাকু বলেন, “তদন্ত করতে গিয়ে কেসে জড়িত সকলকে সন্দেহ করা যেমন উচিত, তেমনই অপরাধী শনাক্ত করার আগে তার বিরুদ্ধে যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণও হাতে রাখা দরকার।” তাই এখনই অপরাধী নিয়ে ভেবে লাভ নেই। চুরি কীভাবে হয়েছে, সেটাই এখন পর্যন্ত বোঝা গেল না। তার চেয়ে দীপকাকুর তদন্তের গতিপ্রকৃতির উপর আপাতত লক্ষ রাখা যাক। ফের প্রশ্নে গেল ঝিনুক, “চুরির এতদিন পর আপনি কেন দেবাংশুবাবুকে পুলিশে ডায়েরি করতে বললেন? কেসটার মধ্যে এবার পুলিশ ঢুকে পড়বে। চোর ধরবেন আপনি। পুলিশ কিছুটা ক্রেডিট নিয়ে চলে যাবে।”
মিটিমিটি হাসছেন দীপকাকু। বললেন, “কেন ডায়েরি করতে বললাম, একটু পরেই বুঝতে পারবে।”
“আমার লাস্ট এবং ছোট্ট প্রশ্ন, “এত হেভি লাঞ্চ এখন আমরা নিলাম কেন? আজকের মতো কাজ কি শেষ? এবার কি যে-যার বাড়ি ফিরে রেস্ট নেব?” জানতে চাইল ঝিনুক।
দীপকাকু খেতে খেতে মাথা নাড়লেন। গ্রাস শেষ করে বললেন, “এর পরই তো কঠিন কাজে নামব। তাই ভাল করে খেয়েদেয়ে নিলাম। পেটে ভাল খাবার থাকলে ব্রেন দারুণ কাজ করে।”
কথা শেষ হতেই দীপকাকুর সেলফোন বেজে উঠল। বাঁ হাতে বুকপকেট থেকে ফোনটা বের করলেন দীপকাকু। স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে কানে নিলেন সেটটা। বললেন, “হ্যাঁ, বলুন।”
ওপ্রান্তের কথা শুনে নিয়ে দীপকাকু বললেন, “ঠিক আছে। এবার এফআইআর-এর নম্বরটা বলুন।”
ঝিনুক বুঝতে পারল, ফোনের ওপারে দেবাংশুবাবু। দীপকাকু ডায়েরির নম্বরটা শুনে নিয়ে বললেন, “আপনি এখন অফিসে ফিরে যান। আমি রাতে অথবা কাল সকালে ফোন করব। ইতিমধ্যে যদি কোনও আনএক্সপেক্টেড ঘটনা ঘটে, সঙ্গে সঙ্গে ফোনে আমায় জানাবেন।”
ফোনের ওপারে দেবাংশুবাবু সম্ভবত জানতে চাইলেন, “কী ধরনের ঘটনার কথা আপনি বলছেন?”
দীপকাকু বললেন, “ওই যে বললাম, অপ্রত্যাশিত যে-কোনও ঘটনা, যা ঘটার কোনও সম্ভাবনা ছিল না। সেরকম কিছু হলেই ফোন করবেন আমাকে।”
ঝিনুক জানে, দীপকাকু ঘটনাটা আন্দাজ করতে পারছেন, পুরোটা ভাঙতে চাইছেন না এখন। দেবাংশুবাবুর ফোন কেটে দীপকাকু কোনও একজনের নম্বর সার্চ করছেন ফোন সেটে। কল টিপে সেটটা এবার কানে নিলেন। ওপ্রান্তের লোকটির কাছে দীপকাকুর নম্বর সেভ করা আছে। তাই এপ্রান্তে কথা শুরু হল এক ধাপ লাফিয়ে, “ভালই আছি। শোন, আমাকে একটা হেল্প করতে হবে। তিনজনের নাম আর ফোন নম্বর দিচ্ছি, প্রফেশানটাও বলে দেব, তুই তাদের ফোন করে প্রথমেই বলবি লালবাজার থেকে বলছিস, মানে, সত্যি কথাই বলবি। তারপর জানাবি, যাদবপুর থানায় একটা চুরি সংক্রান্ত এফআইআর জমা হয়েছে। তার তদন্তে তোর এক গোয়েন্দা-বন্ধু ইন্টারোগেশনের জন্য যাচ্ছে। তারা যেন বন্ধুটিকে সবরকম সহযোগিতা করে। আমার নামটা অবশ্যই বলে দিবি। যাদবপুর থানার ডায়েরির নম্বরটা তোকে আমি দিচ্ছি। ওরা যদি ক্রস করে, তুই বলতে পারবি। যাদবপুর থানায় যদি ফোন করে, তা হলে তোর কথা মিলে যাবে।”
ঝিনুক এখন পরিষ্কার বুঝতে পারছে, ফোনের ওপ্রান্তে কে আছেন। রঞ্জনকাকু। দীপকাকুর বন্ধু। পুলিশ হেড-কোয়ার্টার্সের একজন ইনচার্জ। দীপকাকুকে বহু কেসে উনি সাহায্য করেছেন। ঝিনুকের সঙ্গে আলাপ আছে।
দীপকাকু ফোনে তিনজনের নাম এবং বাকি ইনফরমেশন দিয়ে বললেন, “বুঝতেই তো পারছিস, লালবাজার থেকে ফোন গেলে ওরা একটু ঘাবড়াবে। নয়তো আমার মতো প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরকে ওরা পাত্তা না-ই দিতে পারে।”
এরপর ফোনালাপ শেষ হল, হ্যাঁ, হুঁ, দেখা হলে সব বলব, বলে। ফোন অফ করে সেট পকেটে রাখলেন দীপকাকু। দু’জনেরই খাওয়া প্রায় শেষ পর্যায়। বাকিটুকু সদ্গতি করতে করতে দীপকাকু বললেন, “চলো, গ্রেট বাইট কোম্পানির মালিক বসন্ত আগরওয়ালের সঙ্গে একটু বাতচিত করা যাক।”
.
গ্রেট বাইট বিস্কুট কোম্পানির অফিস তারাতলার এক প্রান্তে। এলাকাটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা। অফিস এবং কারখানা নিশ্চয়ই একসঙ্গে। কারণ, পাকা দোতলা বিল্ডিংয়ের পিছনেই করোগেটেড শেড দেখা যাচ্ছিল। ঝিনুকরা পাঁচ মিনিট হল অফিসের রিসেপশনে এসেছে। মালিকের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে জানিয়ে দীপকাকু নিজের কার্ড দিয়েছেন রিসেপশনিস্ট মহিলাকে। ভদ্রমহিলা ঝিনুকদের ভিজিটর্স সোফায় বসতে বলে কার্ড পাঠিয়েছেন ভিতরে। ঝিনুকরা বসে আছে মালিকের ডাকের অপেক্ষায়।
অফিসটা খুব ঝকঝকে তকতকে। মডার্ন ফার্নিশ করা। কাচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে দীপকাকু চাপা গলায়, “বাঃ!” বলার পর বলেছিলেন, “মালিক বেশ পরিপাটি স্বভাবের মনে হচ্ছে।”
অফিস দেখে মালিকের স্বভাব হয়তো আন্দাজ করা যায়। কিন্তু ‘পরিপাটি’ বলতে ঠিক কী বোঝাতে চাইলেন দীপকাকু, ঝিনুক ধরতে পারেনি। ঘন ঘন প্ৰশ্ন করলে দীপকাকু বিরক্ত হন, তাই জিজ্ঞেসও করা যাচ্ছে না। এখানে পৌঁছনোর আগে দীপকাকু বেহালার একটা পেট্রল পাম্পে বাইকের জন্য তেল ভরতে ঢুকেছিলেন। তখনও একটা ধোঁয়াশামার্কা কথা বললেন, সেটারও মর্মার্থে যেতে পারেনি ঝিনুক। তেল ভরে দেওয়ার পর পাম্পের ছেলেটিকে কড়কড়ে পাঁচশো টাকার নোট দিলেন। ছেলেটি যখন এগিয়ে গেল ক্যাশ কাউন্টারে, দীপকাকু ঝিনুককে জিজ্ঞেস করলেন, “নোটটা কার দেওয়া বলো তো?”
ঝিনুক ঠোঁট উলটেছিল, অর্থাৎ, কে জানে! সত্যিই তো, সে জানবে কী করে! দীপকাকু বলেছিলেন, “সেই আতঙ্কগ্রস্ত মহিলার। যিনি সবসময় ভাবেন, কেউ তাঁকে মারার চেষ্টা করছে। তোমাদের সামনেই তো উনি একগাদা টাকা দিয়ে গেলেন। ভদ্রমহিলার খবর নেওয়া হল না। নিশ্চয়ই ভাল আছেন। কোনও দরকার থাকলে, ফোন করতেন। ওঁর টাকা খরচ হচ্ছে দেবাংশুবাবুর কেসে। দেবাংশু সেনগুপ্তর দেওয়া অ্যাডভান্সের চেক এখনও ব্যাঙ্কে ফেলিনি। কেন বলো তো?” কোয়েশ্চেনটা এতই আনকমন, ঝিনুক ভাবার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে বলল, “কেন?”
দীপকাকু বলতে থাকলেন, “অ্যাডভান্স হিসেবে যত টাকার চেক দেবাংশুবাবু আমাকে দিয়েছেন, টোটাল কেসের চার্জ অত হবে না। তখন অ্যাডভান্সের চেকটা ফেরত দিয়ে, এর চেয়ে কম অ্যামাউন্টের চেক অথবা ক্যাশ দিতে বলতে হবে।”
“কেসটা তার মানে খুব তাড়াতাড়ি সল্ভড হয়ে যাবে, বলছেন?” খানিকটা নিরাশ কণ্ঠে জানতে চেয়েছিল ঝিনুক। এতদিন পর দীপকাকুকে অ্যাসিস্ট করার সুযোগ পেয়েছে, কেসটা চট করে ফুরিয়ে গেলে ভাল লাগে?
বাইকে বসে দীপকাকু গুছিয়ে বলতে শুরু করলেন, “এই কেসটার দুটো পার্ট। একটা হচ্ছে, চোরাই জিনিস উদ্ধার করা, দুই, চোরকে ধরা। ক্লায়েন্ট, অর্থাৎ দেবাংশুবাবুর চোরের ব্যাপারে কোনও ইন্টারেস্ট নেই। জিনিসগুলো ফেরত পেলেই তাঁর চলবে। আমি শিয়োর, ওইসব ইলেকট্রনিক পার্টস নির্দিষ্ট একটা গণ্ডির ভিতরে হাতফেরতা হচ্ছে। মানে, অটোমেটেড বিস্কুট ম্যানুফ্যাকচারিং মেশিনের মালিক আর ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে। এই চোরাই জিনিসটা যদি সোনা, হিরে অথবা অন্য কোনও মহার্ঘ বস্তু হত, এতক্ষণে বহু হাত ঘুরে চলে যেত নাগালের বাইরে। তাই, দেবাংশুবাবুর জিনিসগুলো পেতে আমার দেরি হবে না। চুরির পদ্ধতি এবং চোরকে ধরতে হবে আমার নিজের আগ্রহে। এই কাজে সময় লাগতে পারে। সেই সময় এবং শ্রমের ফিজ দিতে চাইবেন না দেবাংশুবাবু। জিনিস ফেরত পেলেই ভুলে যাবেন আমাদের। এদিকে আমি আবার এই আশ্চর্য চুরির সমাধান না করে থাকতে পারব না।”
কথাগুলো ধাঁধার মতো লাগছিল ঝিনুকের। এতদিন জানত, চোরাই জিনিস আর চোরের অবস্থান খুব কাছাকাছি। একটার সন্ধান পেলে, অন্যটা নিজে থেকেই চলে আসে। অনেকটা কান টানলে মাথা আসার মতো। দীপকাকু কী করে আন্দাজ করছেন এই কেসে দুটোর ব্যবধান বিশাল? চোরাই জিনিসগুলো পাওয়ার ব্যাপারে দীপকাকু এতটাই কনফিডেন্ট, যেন গন্ধ পাচ্ছেন ইলেকট্রনিক পার্টস আর ডায়াগ্রামের।
“মিস্টার দীপঙ্কর বাগচী, প্লিজ গো ইনসাইড।”
মহিলা রিসেপশনিস্টের ডাকে ভাবনা থেকে ফিরল ঝিনুক। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। দীপকাকু কিন্তু উঠলেন না। ঘরের কর্নারে রাখা পিতলের টব আর গাছের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে কী যেন ভেবে যাচ্ছিলেন! ঝিনুক বলল, “কী হল? ডাকছে আমাদের, চলুন।”
“ও, ডেকেছে বুঝি?” বলে, শশব্যস্ত হয়ে সোফা থেকে উঠে এলেন দীপকাকু চোখেমুখে অন্যমনস্কতার ঘোর। চেহারাটা একেবারেই এই অফিসের সঙ্গে মানাচ্ছে না। এরকম আপাদমস্তক গোবেচারা টাইপের দেখতে গোয়েন্দাকে এত বড় কোম্পানির মালিক সমীহ করলে হয়!
মালিকের চেম্বারে ঢুকে দেখা গেল, টেবিলের ওপ্রান্তে দু’জন বসে আছেন। এদের মধ্যে কে মালিক, সহজেই আন্দাজ করা যাচ্ছে। যিনি বসেছেন টেবিলের মাঝ বরাবর, দামি রিভলভিং চেয়ারে, বসন্ত আগরওয়ালের বয়স পঞ্চাশের হয়তো একটু নীচে। গায়ের রং খুব ফরসা। পানমশলা জাতীয় কিছু চিবোচ্ছেন। পাশের লোকটি সম্ভবত ঘনিষ্ঠ সহচর। দীপকাকুকে বিশেষ আপ্যায়নে মিস্টার আগরওয়াল বললেন, “আইয়ে মিস্টার বাগচী। সরি, আপ লোগো কো থোড়া ওয়েট করনা পড়া। প্লিজ বইঠিয়ে। বইঠিয়ে ম্যাডাম।”
শেষ সম্বোধনে ঝিনুক একটু নার্ভাস ফিল করল। এত বড় একটা লোক তাকে ম্যাডাম বলছেন! দীপকাকু বসেছেন। তাড়াতাড়ি পাশের চেয়ারটায় বসে পড়ল ঝিনুক। দীপকাকু কথা শুরু করলেন, “আমি যে আসব, আমার বন্ধু নিশ্চয়ই আপনাকে জানিয়েছে?”
“হ্যাঁ, লালবাজার থেকে ফোন করেছিলেন আপনার ইনস্পেকটর ফ্রেন্ড। সেই জন্য আমিও আমার এক ল-ইয়ার ফ্রেন্ডকে ডেকে আনলাম।” বলে, পাশের লোকটির দিকে হাত দেখালেন আগরওয়াল।
ভদ্রলোক দীপকাকুর দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, “আমি সুমিত মালাকার। হাইকোর্টে আছি।”
হ্যান্ডশেক করলেন দীপকাকু। ঝিনুক লক্ষ করল, দীপকাকুর মুখ বেশ থমথমে হয়ে গিয়েছে। লালবাজারের বদলে হাইকোর্ট হাজির করেছেন বিস্কুট কোম্পানির মালিক। দীপকাকুকে সতর্ক হয়ে কথা চালাতে হবে। আগরওয়াল বলে উঠলেন, “বলুন, আপনাকে কী ধরনের হেল্প করতে পারি আমি?”
দীপকাকু বললেন, “আমার বন্ধু আপনাকে জানিয়েছে, একটা চুরির কেসে আমি আপনার কাছে আসছি। কী চুরি গিয়েছে, সেটা বলেনি। আপনি কি আন্দাজ করতে পারছেন, কোন চুরির ঘটনায় আমাকে আপনার সাহায্য নিতে হচ্ছে?”
দীপকাকুর প্রশ্নটা যথেষ্ট প্যাঁচালো। অসতর্ক হয়ে উত্তর দিলেই ফাঁদে পড়ে যাবেন আগরওয়াল। কিন্তু তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, ওঁর মুখে ফুটে উঠেছে সত্যিকারের অবাক ভাব। বললেন, “নেহি। রিসেন্টলি কোই চোরি কা ইনসিডেন্ট মেরা অগল-বগল মে নেহি হুয়া হ্যায়।”
প্রসঙ্গ থেকে সরে গিয়ে দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, আমায় একটা কথা বলুন তো, আপনার মেশিনের আপগ্রেডেশনের জন্য কোনও ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে এগ্রিমেন্ট করেছিলেন?”
“হাঁ, কিয়া হ্যায়, মিস্টার সেনগুপ্তর সঙ্গে।”
“ওঁকেই কেন কন্ট্রাক্টটা দিলেন? কলকাতায় তো আরও ইঞ্জিনিয়ার ছিল?”
“কাঁহা হ্যায় আচ্ছা ইঞ্জিনিয়ার? ওই সেনগুপ্তবাবুই আছেন ক্যালকাটায়। বাকি দো আদমি হ্যায়, সেনগুপ্ত য্যায়সা নেহি। সেনগুপ্ত বহুত জিনিয়াস আছেন।”
কোনও অবাঙালির মুখে হিন্দি মেশানো বাংলা শুনতে ঝিনুকের বেশ ভালই লাগে। কিন্তু এখন শুধু ভাল লাগলে চলবে না, প্রতিটি কথার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য লক্ষ রাখতে হবে। দীপকাকু যান পরের কথায়, “বাকি যে দু’জন ইঞ্জিনিয়ারের কথা আপনি বলছেন, তাঁদের দিয়ে কখনও কাজ করিয়েছেন?”
“কিয়া থা একবার। সমীরণ দাস কো বুলানা পড়া। ওই সময় দেবাংশুবাবু আউট অফ স্টেশন ছিলেন।”
“সূর্য রায়কে কোনওদিন দরকার পড়েনি? আলাপ আছে?”
“আছে।”
দীপকাকু আর-এক ইঞ্জিনিয়ারের নাম করলেন। ঝিনুক লক্ষ করছে, কীরকম ঠান্ডা মাথায় দীপকাকু স্টেপ বাই স্টেপ কোয়েশ্চেনে আগরওয়ালকে কোণঠাসা করছেন। উকিল-বন্ধুটি এখনও কথা বলতে পারেননি। কারণ, দীপকাকু একটাও বেফাঁস, বেআইনি কথা বলেননি এ পর্যন্ত। আগরওয়াল বললেন, “সূর্য রায়ের সঙ্গে ভেট হয়েছিল ট্রেড ফেয়ারে। কার্ড দিয়ে আলাপ করেছিলেন। মুখটা এখন আর মনে নেই।”
উত্তর দেওয়ার পর আগরওয়াল বললেন, “আপনাদের জন্য চা বলব, না ঠান্ডা?”
“নো, থ্যাঙ্কস।” বলে, দীপকাকু নড়েচড়ে সোজা হলেন। বললেন, “এবার আপনাকে আসল কথাটা বলি, দেবাংশুবাবুকে যে অর্ডারটা আপনি দিয়েছিলেন, তার ডায়াগ্রাম, পার্টস সব চুরি গিয়েছে ওঁর ব্যাগ থেকে।”
“ও মাই গড়!” বলে, প্রায় আঁতকে উঠলেন আগরওয়াল। তারপর বললেন, “হেভি লস হল সেনগুপ্তবাবুর। আমারও ভি হল। আপগ্রেডেশনের এখন কী হবে?”
দীপকাকু বললেন, “একটা কোয়েশ্চেন করব? শুনতে হয়তো ভাল লাগবে না আপনার…”
“তবু করুন। তা হলে বোঝা যাবে, আপনার এখানে আসার আসল উদ্দেশ্য।” এটা বললেন উকিলবাবু। অনেকক্ষণ পরে কিছু বললেন। এতক্ষণ অবজার্ভ করে যাচ্ছিলেন পরিস্থিতি।
দীপকাকু বললেন, “কথাটা হল, আমরা ধরেই নিচ্ছি চুরি যে লোকই করে থাকুক, জিনিসগুলো কোনও না-কোনও ইঞ্জিনিয়ারের হাতে পড়বে। সেই ইঞ্জিনিয়ার যদি তার টেকনোলজি বিক্রি করতে আসে এই কোম্পানিতে, আগরওয়ালবাবু কি কিনবেন?”
“নিশ্চয়ই কিনব! যদি সেনগুপ্তবাবুর চেয়ে সস্তায় পাই। তবে এক মাসের মধ্যে কিনব না। সেনগুপ্তবাবুর সঙ্গে আমার ওয়ান মান্থের এগ্রিমেন্ট আছে। এই টাইমের মধ্যে কাজটা উনি করে দেবেন। লিখে দিয়েছেন।” বললেন বসন্ত আগরওয়াল।
দীপকাকু বললেন, “আপনাকে একটা রিকোয়েস্ট করব। ওই টেকনোলজি কেউ যদি আপনার কাছে বেচতে আসে, আমাকে কাইন্ডলি একবার ইনফর্ম করবেন।”
উকিলবাবু বলে উঠলেন, “করতে উনি কিন্তু বাধ্য নন। অর্ডারটা থানা থেকে আসছে না। সরকারি নির্দেশ নয়।”
“জানি। তাই তো বললাম, রিকোয়েস্ট। তবে এটাও বলে রাখি, চোরাই জিনিস যদি গ্রেট বাইটের কারখানা থেকে উদ্ধার হয়, তা হলে কিন্তু সত্যিই পুলিশি জালে জড়িয়ে যাবেন মিস্টার আগরওয়াল। এখন আপনারা ভেবে দেখুন, কী করবেন?”
দাবা খেলায় বাবাকে ঠিক এই ভাবেই কিস্তি দেন দীপকাকু। তারপর মুখটা এমন নির্বিকার করে রাখেন, যেন হারছেন উনিই। ওই ভঙ্গিতেই বসে আছেন আপাতত। উকিলবাবু এবং আগরওয়াল পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন। নিজেদের মধ্যে চাপাগলায় কিছু কথাবার্তাও সারা হল। উকিলবাবু তাকালেন দীপকাকুর দিকে। বললেন, “ওকে। আমরা ইললিগালি কোনও টেকনোলজি কিনব না। ডিল হবে প্রপার পেপার্স অ্যান্ড বিলের এগেনস্টে। তবে কী কিনছি, তা কিন্তু আপনাকে আমরা জানাতে পারব না।”
দীপকাকুর মুখ দেখে বোঝা গেল বেশ হতাশ হয়েছেন। বড় করে শ্বাস ফেলে বললেন, “যতটা সাহায্যের প্রত্যাশা নিয়ে এসেছিলাম, ততখানি পাওয়া গেল না। আমি আসাতে আপনারাই বরং উপকৃত হলেন। টেকনোলজিটা কিনবেন আটঘাট বেঁধে।”
উকিলবাবুর গলায় এবার সহানুভূতির সুর, “কী করা যাবে বলুন মিস্টার বাগচী, আমার ক্লায়েন্ট যদি টেকনোলজিটা না কেনেন, অন্য কোনও কোম্পানি কিনে নিয়ে ব্যাবসায় এগিয়ে যাবে। বুঝতেই পারছেন, কম্পিটিশনের যুগ।”
চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন দীপকাকু। ঝিনুকও দাঁড়িয়ে পড়ল। দীপকাকু হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলেন দু’জনের সঙ্গে। বললেন, “থ্যাঙ্কস টু বোথ অফ ইউ। আশা করি খুব তাড়াতাড়ি আবার আপনাদের সঙ্গে আমার দেখা হবে।”
“অ্যাট লিস্ট এই কেসে যেন না হয়!” হাসতে হাসতে বললেন আগরওয়াল।
হাসিটা কেবিনের বাইরে আসার পরেও ঝিনুকের কানে বাজতে থাকল। যথেষ্ট বিদ্রূপ ছিল ওই হাসিতে। দীপকাকু সেটা খেয়াল করেছিলেন কি না, বোঝা গেল না।
গ্রেট বাইট কোম্পানির লাউঞ্জে রাখা বাইকে দীপকাকু যখন বসতে যাচ্ছেন, ঝিনুক বলল, “আপনার কথার সঙ্গে মালিকের স্বভাবটা কিন্তু মিলে গেল।”
সবিস্ময়ে দীপকাকু জানতে চাইলেন, “কীরকম?”
“ওই যে বলেছিলেন, ‘পরিপাটি’। সত্যিই তাই, জেরার মুখোমুখি হওয়ার আগে উকিল ডেকে নিয়েছেন।”
দীপকাকু মিটিমিটি হাসছেন। ঝিনুক হাসিটার মানে করতে পারল না। ধরে নিল নিশ্চয়ই বাহবা দেওয়ার হাসি।
.
তারাতলা থেকে লেকটাউনে এসে পৌঁছল ঝিনুকরা। এখানে ইঞ্জিনিয়ার সমীরণ দাসের বাড়ি এবং অফিস একসঙ্গে। সমীরণবাবুর ঠিকানার কাছাকাছি এসে দীপকাকু একটা চা-দোকানের সামনে বাইক থামালেন। এতটা রাস্তা ড্রাইভ করে ক্লান্ত হয়েছেন যথেষ্ট। দোকানিকে চা দিতে বলে, সমীরণ দাসের বাড়িটা কোথায়, জিজ্ঞেস করলেন। দোকানি আঙুল তুলে একটা দোতলা বাড়ি দেখিয়ে দিল।
দোকানি দু’জনকেই চা দিয়েছে। অন্য সময় ঝিনুক চা খায় না, এখন খাচ্ছে। এতক্ষণ বাইকের পিছনে বসে থাকতে থাকতে ঝিমুনি লেগে গিয়েছিল। রাস্তাতেই দেখল, দুপুর ঢলে গেল বিকেলের দিকে। প্রচুর লোকজন দেখা হল আসার পথে। কেউ খুব ব্যস্ত, কারও হাঁটায় আবার বেড়ানোর ছন্দ। ঝিনুকদের মতো জটিল রহস্য সমাধানে ব্যস্ত হয়তো কেউই নয়। চোর এবং চোরাই জিনিস এখনও ঝিনুকদের থেকে অনেক দূরে। অথচ দীপকাকু এমন ভাব করছিলেন, চুরির জিনিসপত্র বুঝি আগরওয়ালের ফ্যাক্টরিতে লাগানো হয়ে গিয়েছে।
চা শেষ করে সিগারেট ধরালেন দীপকাকু। দোকানিকে পয়সা মেটালেন। ঝিনুককে বললেন, “চলো, দেখা যাক এই লোকটা কীরকম।”
ফের বাইকে চেপে সমীরণ দাসের বাড়ির সামনে এল ঝিনুকরা। গেটের থামে নেমপ্লেট। ঝিনুক বাইক থেকে নেমে গেট খুলে দরজার সামনে গেল। বেল টিপল। ভিতর থেকে মহিলাকণ্ঠ ভেসে এল, “খুলছি।”
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। খুলে গেল দরজা। এক ভদ্রমহিলা এসে দাঁড়ালেন। জিজ্ঞেস করলেন, “লালবাজার থেকে এসেছেন আপনারা?”
দীপকাকু বেমালুম “হ্যাঁ” বলে দিলেন। মহিলা সন্দেহের চোখে তাকিয়ে রইলেন ঝিনুকের দিকে, ভাবলেন হয়তো, এইটুকু মেয়ের কী করে পুলিশে চাকরি পাওয়া সম্ভব?
।দীপকাকু তাড়া দিলেন, “আছেন, সমীরণবাবু?”
“হ্যাঁ, আছেন। আসুন।”
মহিলা সম্ভবত সমীরণবাবুর স্ত্রী। ওঁকে অনুসরণ করে দরজা পেরতেই ভদ্রমহিলা ডানহাতি ঘরটা দেখালেন, “ওই যে, কাজ করছেন।”
ঘরে অসংখ্য কম্পিউটার। যিনি কাজ করছেন, তাঁর পিঠটা দেখতে পাচ্ছে ঝিনুকরা। মূল টেবিলের সম্পূর্ণ উলটো দিকে ঘুরে গিয়ে বড়িখোলা কম্পিউটারে ঝুঁকে আছেন সমীরণবাবু। কম্পিউটারটা ওয়াল র্যাকের উপর বসানো।
দীপকাকু পারমিশন চাইলেন, “আসতে পারি?”
মুখ না ঘুরিয়ে সমীরণবাবু বললেন, “আসুন এবং কুইক, যা জিজ্ঞেস করার করে নিন। আমি এখন ভীষণ ব্যস্ত।”
দীপকাকু চেয়ারে গিয়ে বসলেন। ঝিনুক বসবে কিনা ঠিক করে উঠতে পারছে না। মনে হচ্ছে, এই জিজ্ঞাসাবাদের পর্বটা দ্রুতই শেষ হবে।
গলাটা যতটা সম্ভব মোলায়েম করে দীপকাকু বললেন, “আপনাকে বিরক্ত করছি বলে খুবই খারাপ লাগছে আমার। কিন্তু এমন একটা প্রয়োজনে…”
সমীরণবাবু মখোমুখি হলেন দীপকাকুর। চেয়ারটা রিভলভিং। ভদ্রলোকের বাঁ চোখে আতশ কাচ, কপালে লাগানো ব্যান্ডের সাহায্যে সেটা ঝুলছে। কাচ উপরে তুলে সমীরণবাবু বললেন, “পুলিশের লোক এত বিনয়ী হয়, জানতাম না তো!
দীপকাকু বললেন, “আমি পুলিশের লোক নই। প্রাইভেট ডিটেকটিভ। লালবাজারের এক পুলিশ-বন্ধু আমাকে এই কেসে হেল্প করছে।”
“হরেদরে সেই একই হল। বলুন, আপনার জন্য আমি কী করতে পারি?” ঝিনুক টুক করে দীপকাকুর পাশের চেয়ারে বসে পড়ল। দীপকাকু বলতে থাকলেন, “একটা চুরির ঘটনায় আপনার সাহায্য নিতে এসেছি। চুরিটা হয়েছে আপনার পরিচিত এক ইঞ্জিনিয়ার-বন্ধুর। দেবাংশু সেনগুপ্ত।”
“দেবাংশু আমার বন্ধু, এ-কথা আপনাকে কে বলল?” বেশ বিরক্তি সহকারে প্রশ্নটা করলেন সমীরণবাবু।
দীপকাকু বললেন, “কেউ বলেনি সেভাবে। আসলে আপনারা একে-অপরের পরিচিত, একই ধরনের কাজ করেন, সেই কারণেই বললাম।”
“একই ধরনের কাজ করি বলেই কি বন্ধু হয়ে গেলাম? কলকাতার সমস্ত গোয়েন্দা বুঝি আপনার বন্ধু?”
সমীরণবাবুর অশিষ্ট ব্যবহারে দীপকাকু একটু দমে গেলেন। সময় নিচ্ছেন পরের কথায় যাওয়ার। তার আগেই সমীরণবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কী চুরি হয়েছে সেনগুপ্তর?”
দীপকাকু আগের মুডে ফিরে যাওয়ার জন্য গলাটা একবার ঝেড়ে নিলেন। বললেন, “একটা মেশিন আপগ্রেডেশনের জন্য দেবাংশুবাবু স্পেয়ার পার্টস এনেছিলেন সিঙ্গাপুর থেকে। ব্যাগ থেকে সে-সব জিনিস উধাও হয়ে গিয়েছে।”
“বাজে কথা।”
সমীরণবাবুর মন্তব্য শুনে স্বাভাবিক কারণেই চমকালেন দীপকাকু। মুখ থেকে বেরিয়ে এল একটাই কথা, “মানে?”
“বললাম তো, বাজে কথা! বানানো গল্প। মুখরক্ষার জন্য এসব ফেঁদেছে।” ঝিনুক কোনও হেল্প করতে পারবে না জেনেও দীপকাকু একবার ওর দিকে তাকিয়ে নিলেন। তারপর সমীরণবাবুকে বললেন, “আপনার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না! ‘মুখরক্ষা’ বলতে আপনি কী মিন করছেন?”
কপাল থেকে আতশ কাচের হোল্ডারটা খুলে টেবিলে রাখলেন সমীরণবাবু। বললেন, “আমি আগেই জানতাম, গ্রেট বাইট-এর প্রোডাকশন দেবাংশু বাড়াতে পারবে না। মুখে শুধু বড় বড় কথা। আপনাদের নিশ্চয়ই বলেছে, ইলেকট্রনিক ডায়াগ্রামটাও হারিয়ে গিয়েছে।”
দীপকাকু উত্তর দেওয়ার অবস্থায় নেই। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে আছেন। ফের সমীরণবাবুই বলতে থাকলেন, “ডায়াগ্রাম হারিয়ে গিয়েছে বলার কী সুবিধে জানেন? ফের ওটা তৈরি করতে এক মাসের উপর লাগবে, ততদিনে গ্রেট বাইট-এর সঙ্গে যে এগ্রিমেন্টটা ছিল, তার পিরিয়ড ওভার হয়ে যাবে। কাজটা থেকে মানে-মানে সরে পড়বে দেবাংশু। এইভাবে নিজের মুখরক্ষা করবে। নয়তো মার্কেটে ওর রেপুটেশনের তেরোটা বাজবে। বারোটা তো অনেক দিন আগেই বেজে গিয়েছে।”
দীপকাকুর চোখ-মুখ বলে দিচ্ছে, এক গ্লাস জল পেলে এই সময় একটু স্বস্তি পেতেন। শুকনো গলায় দীপকাকু বললেন, “দেবাংশুবাবু যে গ্রেট বাইট-এর অর্ডারটা নিয়েছেন, আপনি কী করে জানলেন?”
“না জানার কী আছে! নিজের লাইনের খবর রাখব না? এগ্রিমেন্টে কী লেখা হয়েছে সেটা পর্যন্ত জানি। শুধু চুরির মিথ্যে গল্পটা জানতাম না। আপনার কাছে শুনলাম।”
“দেবাংশুবাবু কি এর আগেও আপগ্রেডেশনের অর্ডার নিয়ে ফেল করেছেন?”
“একবার নয়, বহুবার। আপগ্রেডেশন কেন, রিপেয়ারিং নিয়েও নানা চ্যালেঞ্জ নিয়েছে। মরা মেশিনকে বলে জ্যান্ত করে দেবে! এই করেই তো ওর নামটা মার্কেটে খারাপ হয়েছে। গ্রেট বাইট-এর মালিক একেবারেই বোকা লোক, তাই ফেঁসেছে সেনগুপ্তর কাছে। সেনগুপ্তও চাইছে একটা বড়সড় সাকসেস। সার্কিটে ফিরে আসার জন্য এই সাফল্য ওর কাছে ভীষণ জরুরি।”
সমীরণবাবুর কথার পর দীপকাকু ভাবার জন্য সময় নিলেন। মিনিটখানেক বিরতির পর বললেন, “চুরিটা যদি সাজানো হয়, উনি আমাদের খরচ করে অ্যাপয়েন্ট করলেন কেন?”
“করল এই কারণে, ইনভেস্টিগেশন করতে গিয়ে আপনারা ইনডাইরেক্টলি ওর চুরির গল্পটা প্রচার করে দেবেন আমাদের সার্কেলে।”
সমীরণবাবুর কথার পিঠে দীপকাকু বললেন, “কিন্তু আমরা তদন্তের শেষে যখন প্রমাণ করব, চুরিটা দেবাংশুবাবু নিজেই সাজিয়েছেন, আইনত অপরাধী হবেন উনি। ইচ্ছে করলে আমরা ওঁর শাস্তিরও ব্যবস্থা করতে পারি।”
“ততদিন কেসটা ও আপনাকে টানতেই দেবে না। দেখুন না, কাল-পরশুর মধ্যেই হয়তো বলবে, ‘ইনভেস্টিগেশনের আর দরকার নেই। ডায়াগ্রামটা নতুন করে রেডি করছি আমি।’ আপনি ভাড়াটে গোয়েন্দা, ক্লায়েন্টের ইন্টারেস্ট না থাকলে ফালতু খাটতে যাবেন কেন? আপনাকে একটা ভাল উপদেশ দিচ্ছি, সময় থাকতে ওর কাছে ফুল পেমেন্টটা আদায় করে নিন। যদিও সহজে রাজি হবে না দিতে।”
‘ভাড়াটে গোয়েন্দা” কথাটা কানে খট করে লাগল ঝিনুকের। বেশ অপমানজনক শোনাল পরিচয়টা। দীপকাকু মনে হচ্ছে কথাটা গায়ে মাখেননি। অন্য চিন্তায় মগ্ন। কপাল কুঁচকে টেবিলের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন। একটু পরে মুখ তুলে সমীরণবাবুকে বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ মিস্টার দাস, আমাদের একটা সঠিক দিশা দেখানোর জন্য। দরকার পড়লে পরে আবার আসব।”
চেয়ার থেকে উঠে পড়লেন দীপকাকু। ঝিনুকও উঠে দাঁড়াল। সমীরণবাবু বললেন, “পরে নিশ্চয়ই আসবেন। তবে লালবাজার থেকে ফোনটোন করাবেন না। স্ট্রেট চলে আসবেন। লালবাজার, পুলিশ, এসব শুনলে কাজে কনসেনট্রেট করতে অসুবিধে হয়। আমি জানি, দেবাংশুই আপনাদের আমার কাছে পাঠিয়েছে, যাতে কাজে গন্ডগোল করে ফেলি আমি। পুলিশ নিয়ে আমার ফোবিয়ার কথা ও জানে। এই বাড়িটার পজেশান নিতে গিয়ে পুলিশের কাছে ভীষণ নাকাল হয়েছিলাম।”
মেকি একটা হাসিসহ দীপকাকু বললেন, “এখন তা হলে আসি।”
ঝিনুকরা বেরিয়ে এল সমীরণ দাসের বাড়ি থেকে। দীপকাকুর মুখ থেকে চিন্তার মেঘ কাটেনি। বাইকের কাছে এসে হ্যান্ডেলে হাত রাখলেন। বললেন, “লোকটাকে ঠিক বোঝা গেল না, বুঝলে! আমাদের রাস্তা গুলিয়ে দিচ্ছে না তো? নাকি সত্যিই দেবাংশুবাবু নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে চুরির গল্পটা বানিয়েছেন?”
ঝিনুক দ্রুত গোটা ব্যাপারটা ভেবে নিল। বলল, “হতেও পারে, জানেন। চুরির একমাত্র সাক্ষী দেবাংশুবাবু নিজে। ঘটনাটা ওঁর কাছ থেকেই জানতে পারেন অফিসের দু’জন এবং দেবাংশুবাবুর স্ত্রী।’
“ভ্যালিড পয়েন্ট!” দীপকাকু সমর্থন জানালেন ঝিনুককে। তারপর বললেন, “সিঙ্গাপুর গিয়ে স্পেয়ার পার্টস কিনেছেন। এটা সত্যি। কারণ, সেগুলো ওঁর স্ত্রীকে দেখিয়েছেন। ক’দিন ধরে হয়তো আপগ্রেডেশনের কাজ করেছেন বাড়িতে। যখন দেখলেন, কাজটা ওঁর দ্বারা সম্ভব হল না। পার্টস, ডায়াগ্রাম ফেলে দিয়ে চুরির গল্পটা খাড়া করলেন।”
ঝিনুক বলল, “ওঁকে দেখে কিন্তু এরকম মিথ্যেবাদী মনে হয় না।”
দীপকাকু ঝিনুকের দিকে ধমকের দৃষ্টিতে তাকালেন। মনে করিয়ে দিলেন পুরনো পরামর্শ, “চেহারা দেখে কোনও মানুষকে বিচার করবে না। চেহারাটা মানুষের স্থায়ী পোশাক ছাড়া আর কিছুই নয়।”
ঝিনুক মাথা নিচু করে নিয়েছে। বাইকে উঠে বসলেন দীপকাকু। বললেন, “সমীরণবাবুর কথা খুব সহজেই যাচাই করা যায়। সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ারদের মহলে খোঁজ করলেই জানা যাবে, আর কোন কোন কোম্পানির ক্ষেত্রে দেবাংশুবাবু একই ঘটনা ঘটিয়েছেন। অসাধ্যসাধন করব বলেও পারেননি। এখন চলো, দেবাংশুবাবুর আর-এক কম্পিটিটর সূর্য রায়ের সঙ্গে কথা বলে দেখি।”
বাইক স্টার্ট দিলেন দীপকাকু। ঝিনুক পিছনে উঠে বসল। বিকেল গড়িয়ে এখন সন্ধে নামছে।
.
তদন্তে জিজ্ঞাসাবাদ পর্বটা ভীষণ বোরিং। একই প্রশ্ন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে করা হয় বিভিন্নজনকে। কোন প্রশ্ন কখন করা হবে, সে এক জটিল অঙ্ক। ঝিনুক ম্যাথে কোনওদিনই স্বচ্ছন্দ নয়। দীপকাকুর প্রশ্নগুলো ফলো করতে গিয়ে হিমশিম খেল সে। আবার এ-কথা মানতেই হবে, ওই প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে রহস্যের জট অনেকটাই খুলে ফেলা যায়। কিন্তু দেবাংশুবাবুর কেসে উলটো ফল হচ্ছে, জট পাকিয়ে যাচ্ছে আরও। এখন দেখা যাক, সূর্য রায় কতটা হেল্প করতে পারেন।
মিনিট পাঁচেক হল ঝিনুক আর দীপকাকু, সূর্য রায়ের অফিসে এসে পৌঁছেছেন। ভদ্রলোক বয়সে দেবাংশুবাবুর চেয়ে বছর পাঁচেকের হয়তো জুনিয়র। ক্লিন শেভ, ঝকঝকে চেহারা। খুবই সপ্রতিভ। ঝিনুকদের আসার খবর পেয়ে নিজেই এগিয়ে এলেন। সাদরে নিয়ে এসে বসালেন চেম্বারে। বললেন, “লালবাজারের ফোন পেয়েছি। আপনারা একটু বসুন, এখনই আসছি।”
সূর্য রায় ঘর ছেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দীপকাকু চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন। ভেবে ভেবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। গাড়িও চালাচ্ছেন নাগাড়ে। চেম্বারটা এয়ারকন্ডিশনড, জিরিয়ে নিচ্ছেন দীপকাকু। ঝিনুকের চোখ বোজার কোনও উপায় নেই। সূর্য রায় ঘরে ঢুকলেই দীপকাকুকে ঠেলে তুলে দিতে হবে। বিনা ভূমিকায় ঘুমিয়ে পড়তে উনি ওস্তাদ। সূর্য রায়ের চেম্বারটাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে ঝিনুক। দেখার অবশ্য বিশেষ কিছু নেই, খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘর। টেবিলে কম্পিউটার, একপাশে কিছু কাগজপত্র, মেশিন-কোম্পানির ক্যাটালগ। পেনস্ট্যান্ড, বাহারি পেপারওয়েট। চেম্বারের দেওয়ালে ডিজিটাল ঘড়ি আর চারটে বিশাল সাইজ়ের ফোটোগ্রাফ। চারটেই ল্যান্ডস্কেপের ছবি। বেশ যত্ন করে বাঁধানো।
সূর্য রায়ের অফিসটা ক্রিক রো-তে। বাড়ি সল্টলেকে। এখানে আসার পথে দীপকাকু তথ্য দুটো দিয়েছেন। ওই সময় বাবার ফোন আসে ঝিনুকের মোবাইলে। চলন্ত বাইকে বসে কথা বলে ঝিনুক। বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “তোদের ইনভেস্টিগেশন কোন পর্যায়ে?”
ঝিনুক বলল, “খুব একটা এগোয়নি। এখন এক ইঞ্জিনিয়ারকে ইন্টারোগেশন করতে যাওয়া হচ্ছে।”
“বাড়ি ফিরতে ক’টা বাজবে?” জানতে চাইলেন বাবা।
ঝিনুক বলল, “আজকের মতো এটাই শেষ সাক্ষাৎকার মনে হচ্ছে।”
“তোদের ওই সব জেরায় কোনও কাজ হবে না। খামোখা লোকগুলোকে ব্যস্ত করা। এই চুরির রহস্য আমি অনেকটা উদ্ধার করে ফেলেছি। দীপঙ্করকে নিয়ে তাড়াতাড়ি চলে আয়, সব বলব।”
বাবার সঙ্গে আর কথা বাড়ায়নি ঝিনুক, “ঠিক আছে,” বলে ফোন কেটেছিল। এতক্ষণ ঘুরে ঝিনুকরা রহস্য সমাধানের কিনারে পৌঁছতে পারল না, বাবা অফিস আর বাড়ি করেই সব জট খুলে ফেললেন! এটা বাবার বরাবরের অভ্যেস, দ্রুত সমাধানে পৌঁছতে চান। ফলে তাঁকে কিছু অবাস্তব আইডিয়ার সাহায্য নিতে হয়। সেই সব পরামর্শ কোনও কাজেই লাগে না দীপকাকুর। পুশডোর ঠেলে কেবিনে ঢুকলেন সূর্য রায়, ঝিনুক দীপকাকুকে ঠেলতে গিয়ে দেখল, চোখের পাতা খুলে ফেলেছেন। কী করে টের পেলেন দরজা খোলা হচ্ছে? কোনও আওয়াজ তো হয়নি! ঘরে হাওয়ার চাপটা একটু বদলে গিয়েছিল কি?
সূর্য রায়ের হাতে ট্রে, উপরে তিনটে বিগ সাইজের কাগজের কাপ। বললেন, “কফি চলবে তো?”
দীপকাকু বললেন, “খুব চলবে। কিন্তু আপনি নিয়ে এলেন কেন, অন্য কোনও স্টাফ তো…”
“না, আমার এই ছোট্ট অফিসে এটাই রীতি। যে-যার নিজের জিনিস নিয়ে এসে খাও। কাউকে অর্ডার করা যাবে না।”
ট্রে-টা টেবিলে নামিয়ে রেখে সূর্য রায় গিয়ে বসলেন নিজের চেয়ারে। দীপকাকু কফির কাপ তুলে নিলেন।
ঝিনুকও খাবে। মাঝে মাঝে কফি খেতে তার খারাপ লাগে না।
কফির কাপে চুমুক দিয়ে দীপকাকু বললেন, “একটা চুরির ঘটনায় আপনার কাছে এসেছি, আমার বন্ধুর ফোনে আপনি জেনে গিয়েছেন সেটা। এবার আমাকে বলুন, দেবাংশু সেনগুপ্ত নামে কাউকে চেনেন কি?”
“যদি ইঞ্জিনিয়ার দেবাংশু সেনগুপ্ত হন, তা হলে অবশ্যই চিনি!” বলে, একটা কফির কাপ তুলে নিলেন সূর্য রায়।
দীপকাকু বললেন, “হ্যাঁ, তাঁর কথাই বলছি। চুরিটা তাঁরই হয়েছে। সিঙ্গাপুর থেকে ইলেকট্রনিক পার্টস নিয়ে এসেছিলেন, ব্যাগ থেকে হাওয়া।”
“এ হেঃ, খুবই খারাপ ঘটনা তো! নিশ্চয়ই অনেক টাকার জিনিস? দেবাংশুদা ছোটখাটো অর্ডার ধরার লোক নন।” বললেন সূর্য রায়।
দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “দেবাংশুবাবু ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কেমন?”
“আমাদের লাইনে সারা ইন্ডিয়ার মধ্যে বেস্ট।”
কফি খাওয়া ভুলেই গিয়েছে ঝিনুক। ইনি তো সমীরণবাবুর বিপরীত কথা বলছেন!
দীপকাকুও ভীষণ অবাক হচ্ছেন নিশ্চয়ই। ফের জিজ্ঞেস করলেন, “দেবাংশুবাবুর সাকসেস রেট কেমন?”
“নাইনটি পারসেন্ট তো হবেই! যন্ত্রপাতির ব্যাপারে টেন পারসেন্ট ফেল কোনও ব্যাপারই নয়।”
“কিন্তু সমীরণবাবু তো উলটো কথা বলছেন! দেবাংশুবাবুর নাকি মার্কেটে খুব বদনাম। বড় বড় কথা বলে কাজ ধরেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডোবান।”
“ও, আপনারা তা হলে সমীরণদার বাড়ি হয়ে এখানে এসেছেন? ভালই করেছেন লোকটাকে আগে দেখে এসে। ওঁর মতো হামবাগ ইঞ্জিনিয়ার কলকাতায় দুটো নেই! একসময় খুব পসার ছিল। আমি, দেবাংশুদা কাজ শুরু করতেই ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছেন। মডার্ন টেকনোলজি নিয়ে পড়াশোনা করেননি। যা শিখেছিলেন ইয়ং এজ-এ, তাই ভাঙিয়ে খাচ্ছেন। আমাকে আর দেবাংশুদাকে প্রচণ্ড হিংসে করেন। দেবাংশুদাকে বেশি।”
“বেশি কেন?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।
সূর্য রায় বললেন, “দেবাংশুদা বরাত নেয় চ্যালেঞ্জিং কাজের। সাকসেসও পায়। আমি ওসব ঝুঁকির কাজ নিই না। দেবাংশুদার মতো আমি জিনিয়াস নই। সার্ভিসিংয়ের যা অর্ডার আসে আমার কাছে, সেটাই সাকসেসফুলি করার চেষ্টা করি। মার্কেটে দেবাংশুদার একটা আলাদা রেসপেক্টেবল পজিশন তৈরি হয়েছে। এটাকেই হিংসে করেন সমীরণদা। একসময় ওই রেসপেক্টটা কারখানার মালিকরা ওঁকে করত।”
দীপকাকু পরের কথায় যাওয়ার আগে এক ঢোক কফি খেয়ে নিলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার কী মনে হয়, কে চুরি করতে পারে দেবাংশুবাবুর জিনিসগুলো?”
সূর্য রায় বললেন, “দেখুন, দেবাংশুদার কাজের উপর অনেকেরই নজর আছে। আমি অন্যান্য প্রভিন্সের ইঞ্জিনিয়ারদের কথাও বলছি। সমীরণদার তো আছেই। এদের মধ্যে যে কেউ চুরি করতে বা করাতে পারে।”
“আর আপনি?” দীপকাকু স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে প্রশ্নটা করলেন। এই সময় ওঁর ব্যক্তিত্ব ভীষণ কঠোর টাইপের হয়ে যায়।
সূর্য রায় কিন্তু তেমন নার্ভাস হলেন না। ম্লান হাসিসহ বললেন, “আপনি গোয়েন্দা। কাউকেই সন্দেহের ঊর্ধ্বে আপনি রাখবেন না, জানি। আমার সপক্ষে শুধু একটাই কথা বলি, দেবাংশুদাকে আমিও খুব শ্রদ্ধা করি। দেবাংশুদার সাফল্যে আনন্দিত হই। যাকে প্রকৃত শ্রদ্ধা করা যায়, তার কাছ থেকে চুরির কথা ভাবাও যায় না। তা ছাড়া চুরি ব্যাপারটা স্বভাবজাত। চুরি সকলে করতে পারে না।”
“দশ লাখ টাকার অর্ডার হলেও, না?” কথার পিঠে জানতে চাইলেন দীপকাকু। সূর্য রায় একটু থমকালেন। বিস্ময়ের কণ্ঠে বললেন, “এত টাকার কন্ট্রাক্ট নিয়েছিল দেবাংশুদা! ইটস আ রিয়েলি বিগ অর্ডার। কোন কোম্পানির জানতে পারি কি?”
“গ্রেট বাইট বিস্কুট কোম্পানির। প্রোডাকশন বাড়ানোর বরাত নিয়েছিলেন। অফারটা আপনার কাছে এলে নিতেন?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।
সূর্য রায় বললেন, “অবশ্যই নিতাম! তবে আমি শিয়োর, অফারটা কোম্পানি দেবাংশুদাকে দেয়নি। হয়তো ওদের মেশিন সারাতে গিয়ে দেবাংশুদাই বলেছে, আপনাদের মেশিনের প্রোডাকশন বাড়িয়ে দিতে পারি। এভাবেই চ্যালেঞ্জ ডেকে নেওয়া দেবাংশুদার স্বভাব।”
তিনজনের কফি শেষ। দীপকাকুর বোধহয় আর কিছু জানার নেই। দেওয়ালের ছবিগুলোর উপর চোখ বোলাতে লাগলেন। বলে উঠলেন, “ফোটোগুলো আপনার তোলা, তাই না?”
সূর্য রায় বেশ অবাক হলেন। বললেন, “কী করে বুঝলেন? কোথাও তো আমি নাম লিখে রাখিনি!”
“এটাই তো আমাদের কাজ। সাধারণ চোখে যা ধরা পড়ে না, আমরা সেটা দেখতে পাই।” দীপকাকুর আত্মবিশ্বাসটা একটু অহংকারের মতো শোনাল।
সূর্য রায় কিন্তু মোহিত হয়ে পড়েছেন দীপকাকুর দেওয়া ছোট্ট স্যাম্পেলিং-এ। বললেন, “প্লিজ, আমাকে বলুন না, কোন সূত্রে আপনি ধরতে পারলেন, ফোটোগুলো আমার তোলা? গোয়েন্দার আশ্চর্য অনুমানক্ষমতা আমি গল্পের বইয়ে পড়েছি। আজ চোখের সামনে দেখলাম।”
দীপকাকু বললেন, “আপনার পিতলের পেনস্ট্যান্ডে গ্যাংটকের এনচে মনাস্ট্রির ছবি এনগ্রেভ করা। ওই মনাস্ট্রিরই ফোটো তুলেছেন আপনি।”
ফোটোফ্রেমটার দিকে আঙুল তুলে দেখালেন দীপকাকু। ফের বললেন, “একই সাবজেক্টের ছবি, দুটো মিডিয়ামে। দুটো জিনিস যদি একসঙ্গে কেউ গিফ্ট করে, সাবজেক্টটা রিপিট করত না। আপনার নিশ্চয়ই মনাস্ট্রিটা ভাল লেগে গিয়েছিল, তাই ফোটো তো তুলেছেন, একটা স্মারকও নিয়ে আসার ইচ্ছে হয়েছিল। গ্যাংটকের বাজার থেকে কিনেছেন পেনস্ট্যান্ডটা।”
সূর্য রায় অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন দীপকাকুর দিকে। বললেন, “প্ৰায় ঠিকই বলেছেন। পেনস্ট্যান্ডটা অবশ্য আমার স্ত্রী আমাকে গিফ্ট করেছে। তার কারণ, মনাস্ট্রিটাকে আমার ভাল লেগে যাওয়া। অনেকটা সময় দিয়ে ফোটোটা তুলেছিলাম। মিসেস সেটা লক্ষ করেছিল। গ্যাংটকের বাজারে পেনস্ট্যান্ডটা দেখতে পেয়ে কিনে দিল আমায়। লক্ষ করে দেখুন, মনাস্ট্রিটা অনেকটা চিনা প্যাগোডার আদলে তৈরি। ভারতে এরকম মনাস্ট্রি খুব একটা দেখা যায় না।”
“ঠিকই বলেছেন আপনি। মায়ানমারে বেশকিছু জাপানি আদলের প্যাগোডা আছে।” এই তথ্যটা যোগ করলেন দীপকাকু
সূর্য রায় বললেন, “এই ফোটোর ব্যাপারটা না হয় বোঝা গেল। বাকিগুলো যে আমিই তুলেছি, কী করে বুঝলেন?”
“ফোটো তোলার ধরন দেখে। প্রথমত সব ক’টা ফোটোয় ল্যান্ডস্কেপ প্রাধান্য পেয়েছে। দ্বিতীয়ত, আপনি ফোর গ্রাউন্ডে অনেকটা জায়গা ছাড়েন, পারস্পেকটিভ বোঝাতে গেলে ফ্রেমের উপরে কোনও একটা সাবজেক্ট ধরেন। শুধু প্লেন থেকে তোলা ছবিটার ক্ষেত্রে সেই সুযোগ পাননি।”
দীপকাকুর জ্ঞানের বহর দেখে সূর্য রায় এবার পুরোপুরি বাক্যহারা হয়ে গিয়েছেন। একটু পরে বিস্ময়ের ঘোর থেকে বললেন, “আপনি তো মশাই ফোটোগ্রাফিটাও গুলে খেয়েছেন!”
দীপকাকু সবিনয়ে বললেন, “আমার কিছু ফোটোগ্রাফার বন্ধু আছে, তাদের কাছেই এসব জেনেছি। আমি কিন্তু ফোটো তোলার ব্যাপারে খুবই কাঁচা। থিয়োরিটিক্যালি ফোটোগ্রাফিটা হয়তো কিছুটা বুঝি, আপনাদের মতো এত সুন্দর ছবি তুলতে পারি না।”
কথা শেষ করে দীপকাকু উঠে গেলেন প্লেন থেকে তোলা ফোটোটার কাছে। ফোটোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এটা তো বিদেশযাত্রার ফোটো মনে হচ্ছে। সমুদ্রের পাশে যে শহরটা দেখা যাচ্ছে, এ দেশের নয়। দারুণ তুলেছেন ফোটোটা!”
চেয়ার ছেড়ে সূর্য রায় উঠে গেলেন দীপকাকুর পাশে। বললেন, “বছরপাঁচেক আগে একবার সিঙ্গাপুর গিয়েছিলাম, তখনই ফোটোটা তুলি। সাবজেক্টটা লক্ষ করুন, শহরের আবর্জনা কীভাবে দূষিত করছে সমুদ্রকে!”
ফোটোর কাচে আঙুল ঠেকিয়ে সূর্য রায় বললেন, “এই দেখুন, শহরের নালা থেকে বেরিয়ে আসছে কালো ময়লা জল। সমুদ্রের নীল জলে ছড়িয়ে পড়ছে।”
ঝিনুকও উঠে এল চেয়ার থেকে। কাছে গিয়ে দেখল ফোটোটা। দীপকাকু ফোটো থেকে চোখ সরিয়ে সূর্য রায়কে জিজ্ঞেস করলেন, “গত পাঁচ বছরে ওই একবারই আপনি সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ, কেন বলুন তো?” সূর্য রায়ের গলায় বিস্ময় মেশানো প্রশ্ন। ফোটো থেকে মন সরে গেল ঝিনুকের, কান রাখল দীপকাকু-সূর্য রায়ের কথাবার্তায়।
দীপকাকু বললেন, “আসলে আপনাদের লাইনের সমস্ত আধুনিক যন্ত্রাংশ তো সিঙ্গাপুর বাজারে পাওয়া যায়, তাই বলছিলাম…”
কথার মাঝে সূর্য রায় বলে উঠলেন, “আমার যাওয়ার খুব একটা দরকার পড়ে না। একবারই গিয়েছিলাম শখ করে। আমার বিদেশযাত্রা বলতে ওই একবারই। আমি তো ইনোভেটিভ কিছু তৈরি করি না, বিদেশি মেশিন খারাপ হলে সারাই করি মাত্র। স্পেয়ার পার্টস-এর জন্য ই-মেলে অর্ডার করি কোম্পানিকে। ওরা কুরিয়ারে পাঠিয়ে দেয়।
“স্পেয়ার পার্টস কিনতে সমীরণবাবু কি যান সিঙ্গাপুরে?”
“জানি না। ঠিক বলতে পারব না।”
সূর্য রায়ের কথার পরে দীপকাকু হাত বাড়িয়ে দিলেন হ্যান্ডশেকের জন্য। বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ মিস্টার রায়। আজ তা হলে আসি। দরকার পড়লে আবার আসব কিন্তু।”
দীপকাকুর হাত ছেড়ে সূর্য রায় বললেন, “ইউ আর অলওয়েজ ওয়েলকাম। ইটস মাই প্লেজার। কাইন্ডলি আপনার একটা কার্ড যদি দিয়ে যান, পরে একটা ব্যাপারে যোগাযোগ করব।”
“কী ব্যাপারে বলুন তো?” কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু একটু ইতস্তত করে সূর্য রায় বললেন, “আসলে এই সময় কথাটা তুললে বড্ড অপ্রাসঙ্গিক শোনাবে বলেই বলছি না। একটা সিরিয়াস কাজে ব্যস্ত আছেন আপনারা। তবু যখন জিজ্ঞেস করছেন, বলি, ইনি নিশ্চয়ই আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট?”
ঝিনুককে দেখিয়ে কথাটা বললেন সূর্য রায়। দীপকাকু বললেন, “হ্যাঁ, তো?”
“ওঁর ফেস খুব ফোটোজনিক। যদি পারমিশন দেন আপনারা, কয়েকটা ক্লোজআপ তোলার ইচ্ছে রইল আমার।”
কথাটা শুনে দীপকাকু একবার চকিতে ঝিনুকের মুখের দিকে তাকালেন, যেন দেখে নিলেন সত্যিই ফোটোজেনিক কি না। তারপর বললেন, “তুলবেন। এতে অসুবিধের কী আছে?”
ঝিনুক পড়েছে খুবই অপ্রীতিকর অবস্থায়, এক্সপ্রেশন কীরকম রাখবে ঠিক করে উঠতে পারছে না। এখানে এসেছে এক কাজে, কথা শেষ হচ্ছে তার প্রসঙ্গে।
দরজার দিকে যেতে যেতে দীপকাকু অবশ্য পুরনো বিষয়টা ফিরিয়ে আনলেন। বললেন, “সামনের দু’-চারদিনের মধ্যে কেউ যদি আপনার কাছে কোনও স্পেয়ার পার্টস বিক্রি করতে আসে, একটু যাচাই করে নেবেন। চোরাই জিনিস বুঝলে তখনই ফোন করবেন আমাকে।
“অবশ্যই। সে আর বলতে!” বললেন সূর্য রায়।
ঝিনুকরা বেরিয়ে এল কেবিন থেকে। সূর্য রায়ও সঙ্গে এলেন এগিয়ে দিতে।
.
মৌলালি ক্রসিং-এ বাইক দাঁড় করিয়েছেন দীপকাকু। সিগন্যাল পাওয়া যায়নি। সন্ধে উতরে গিয়েছে অনেকক্ষণ, চারপাশে জ্বলে উঠেছে নিয়নের আলো। সূর্য রায়ের ক্রিক রো-র অফিস থেকে এই জায়গা পর্যন্ত পৌঁছতে লেগেছে মিনিটতিনেক, একটাও কথা বলেননি দীপকাকু। এখন বলে উঠলেন, “তুমি তো দেখছি অনেকক্ষণ ধরে কিছু নোট করছ না। এত কথাবার্তা হল, প্রচুর ইম্পর্ট্যান্ট পয়েন্টস ছিল এর মধ্যে।”
“বাড়ি ফিরে নোট করে নেব।” বলল ঝিনুক।
“তোমার ফোটো তুলতে চাওয়ার কথাটা আবার লিখো না।”
ঝিনুক যেহেতু বাইকের পিছনের সিটে, দেখতে পাচ্ছে না দীপকাকুর এক্সপ্রেশন। নিশ্চয়ই হাসছেন। এখনও মজা করার মুডে আছেন! কেস তো পেঁচিয়ে জিলিপি হয়ে গিয়েছে!
সামনের গাড়িগুলো থেকে স্টার্টের আওয়াজ উঠল। সিগন্যাল পাওয়া গেল তার মানে। দীপকাকুও বাইকে কিক মারলেন। ঝিনুক জিজ্ঞেস করল, “এখন তা হলে আমরা বাড়ি ফিরছি?”
“না। আর-একজনের কাছে যাওয়া বাকি আছে।”
“কে সে?”
“গেস করো।”
আন্দাজ করার মতো মনের অবস্থা এখন আর ঝিনুকের নেই। এবার মানে-মানে বাড়ি ফিরতে পারলে হয়। বাবা কী সমাধান সূত্র বের করেছেন দেখা যাক। হয়তো দেখা গেল এই কেসে বাবার চিন্তাভাবনাই ঠিক। দীপকাকু যে রাস্তায় হাঁটছেন, মনে হয় না এই আশ্চর্যজনক চুরির গভীরে ঢুকতে পারবেন। চুরি কীভাবে হয়েছে, সেটা নিয়ে আদৌ মাথা ঘামাচ্ছেন না দীপকাকু। কে চুরি করতে পারে, এই নিয়েই ভাবছেন বেশি। ঝিনুকরা তাই গ্রহের মতো ঘুরে যাচ্ছে কেসটাকে ঘিরে।
মল্লিকবাজারের কাছে এসে বাইকের গতি কমিয়ে সাইড নিচ্ছেন দীপকাকু। ঝিনুক বুঝতে পারল, কার কাছে যাওয়া হবে এখন। বাড়তি উৎসাহ নিয়ে বলে উঠল, “মিস্টার আফাংয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।”
বাইক স্ট্যান্ড করে দীপকাকু বললেন, “পৌঁছে যাওয়ার পর বলছ! এত ক’টা কেসে আমার সঙ্গে থেকে তা হলে কী উন্নতি হল?”
ভর্ৎসনা গায়ে মাখল না ঝিনুক। কোনও কিছু শিখতে গেলে বকুনি খেতেই হয়।
মল্লিকবাজারে সারসার গাড়ি সারানোর দোকান। দীপকাকু এক দোকানের মালিককে আফাংয়ের নামটা বললেন। ঠিকানা বলতে হল না। পঞ্জাবি মালিক বললেন, “দুটো গলি ছেড়ে থার্ড গলিতে ঢুকে যান। ডান সাইডে চারটে বাড়ির পর তিনতলা বাড়ি। টপ ফ্লোরে থাকে।”
তিন নম্বর গলির মুখে এসে ঝিনুকের মনে হল, এতক্ষণে সত্যিই তারা চুরি-রহস্যের গভীরে ঢুকছে। দীপকাকুর পকেটে আছে দেবাংশুবাবুর ব্যাগের চাবি। মিস্টার আফাংকে সেটা দেখানো হবে। আফাং বলে দেবেন, রিসেন্টলি কে তাঁর কাছে চাবি ডুপ্লিকেট করিয়েছে। লোকটার চেহারার বর্ণনা দেবেন মিস্টার আফাং। চোর শনাক্তকরণে দীপকাকু অনেকটাই এগিয়ে যাবেন। বাকি থাকবে শুধু কোন ফাঁকে চুরিটা হয়েছে, সেটা জানা।
দোকান-মালিকের নির্দেশমতো তিনতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল ঝিনুকরা। পুরনো বাড়ি। দেড়শো-দুশো বছরের তো হবেই। দরজা হাট করে খোলা। দীপকাকু, ঝিনুক বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়লেন। সিমেন্টের চৌকো দালান। তিনদিকে পরিকল্পনাহীন ঘর, বারান্দা। তারে ঝোলানো জামাকাপড়, পরদা এবং আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র দেখেই বোঝা যাচ্ছে, এই বাড়িতে একসঙ্গে প্রচুর পরিবার বাস করে। একতলার বারান্দায় একটি লোককে বেরিয়ে আসতে দেখে দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “ইঞ্জিনিয়ার আফাংয়ের ঘরটা কোথায়?”
লোকটি সিঁড়ি দেখিয়ে বলল, “সোজা তিনতলায় চলে যান। বাঁ-হাতি ঘর।”
সিঁড়িতে আলো নেই। অন্যান্য ঘর থেকে যৎসামান্য এসে পড়েছে। ঝিনুকরা সাবধানে উঠে এল তিনতলায়। কিন্তু এ কী, বাঁ দিকের ঘরে যে তালা ঝুলছে!
ঝিনুক, দীপকাকু দরজার সামনে গেলেন। হ্যাঁ, এটা মিস্টার আফাংয়েরই ঘর। দরজার পাল্লায় সাদা রঙে ইংরেজিতে নাম লেখা। পাশে চাইনিজ অক্ষরে বোধহয় ওই নামটাই লেখা আছে। ঝিনুকের চোখ দরজার কড়ায়। বলল, “তালাটা দেখেছেন, একেবারে অন্যরকম।”
দীপকাকু বললেন, “হুঁ। বিদেশি তালা। চাবিবিশারদের কাছে এরকম তালা থাকাই স্বাভাবিক।”
পকেট থেকে ম্যাগনিফায়িং গ্লাস বের করলেন দীপকাকু। বারান্দার হলুদ বালবের আলোয় পরীক্ষা করলেন তালাটা। বললেন, “মেড ইন চায়না।
ঝিনুক বলল, “গেলেন কোথায়?”
“দেখছি, দাঁড়াও!” বলে, দীপকাকু উলটো দিকের ঘরের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডোরবেল টিপলেন।
দরজা খুলে যেতে দেখা গেল এক বৃদ্ধকে। জিজ্ঞেস করলেন, “কিস কো মাঙতা? কাকে চাই?”
দীপকাকু বললেন, “মিস্টার আফাংয়ের ঘরে দেখছি তালা। কোথায় গিয়েছেন, বলতে পারেন?”
ভদ্রলোক অবাক হয়ে আফাংয়ের দরজায় চোখ রাখলেন। বললেন, “কোথায় গেল? কাঁহা গ্যায়া? আজকাল ঘর সে নিকলতা নেহি হ্যায়। তবিয়ত খারাপ। কাস্টমার লোগ এখানে এসে কাম করিয়ে নিয়ে যায়। উমর ভি হো গ্যায়া।”
“কাছাকাছি ওঁর কোনও রিলেটিভের বাড়িতে হয়তো যেতে পারেন?”
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন, “কহি নেহি যাতা হ্যায়। আগে চাঁদনিচকে দুকান ছিল। এখন বাড়িতেই কামকাজ করে।”
বৃদ্ধকে ধন্যবাদ জানিয়ে দীপকাকু সিঁড়িতে পা রাখলেন। ঝিনুককে বললেন, “মনে হচ্ছে, মৌচাকে ঢিল লেগেছে।”
“মানে?” জানতে চাইল ঝিনুক।
“আমরা কাজে নেমেছি জেনে, অপরাধী আফাংকে লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছে।”
দীপকাকু আর কোনও কথা বললেন না। এখন সিঁড়িতে শুধুই তাঁর ভারী বুটের শব্দ।
