ফন্দিবাজ বন্দি – ৩

দশ মিনিট হয়ে গেল দীপকাকুর চলন্ত বাইকের পিছনে ঝিনুক। জানে না কোথায় যাওয়া হচ্ছে! সূর্যেন্দুবাবুদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাইকে ওঠার আগে ঝিনুক জিজ্ঞেস করেছিল, “এবার কোথায় যাচ্ছি?”

দীপকাকু কোনও উত্তর দেননি। এর মানে, মাথায় চিন্তার ঝড় বইছে তাঁর। মাঝে ঝিনুক আর ডিস্টার্ব করেনি, রাস্তাঘাট দেখতে দেখতে চলেছে। সূর্যেন্দুবাবুর কেসটা ঝিনুকের নাগালের এতটাই বাইরে, এক্ষুনি মাথা ঘামানোর কোনও মানে হয় না। দীপকাকু নিজেই তাকে চিন্তায় শামিল করে নেবেন।

বেশ জোরে ড্রাইভ করছেন দীপকাকু। শিয়ালদা ফ্লাইওভার থেকে নেমে এল ঝিনুকরা। পলকে মৌলালি ক্রস করে দীপকাকু বাইক দাঁড় করালেন এন্টালি থানার সামনে। ঝিনুকের মুড পুরো অফ হয়ে গেল। তদন্তের গোড়াতেই পুলিশের সাহায্য ঝিনুকের না-পসন্দ। বেশিরভাগ ডিটেকটিভ গল্পে পুলিশরা মোটেই পাত্তা পায় না। ঘুরঘুর করে গোয়েন্দার আশপাশে। তদন্তের শেষপর্বে পুলিশকে তাক লাগিয়ে গোয়েন্দা প্রবলেম সল্ভ করে দেন। তবেই না মজা! দীপকাকুর স্বভাব ঠিক উলটো, খুবই গুরুত্ব দেন পুলিশকে। বলেন, ‘চাকরির সুবাদে এরা অপরাধ জগৎটা খুব ভাল করে চেনে। বিশেষ করে কলকাতার পুলিশ তো দুনিয়ার প্রথম সারিতে। এদের হেল্প নিলে আমারই লাভ!’

থানার ভিতরে ঢুকে এক কনস্টেবলকে দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “অ্যাডিশনাল আইসি কল্লোল সেন?”

কনস্টেবল উত্তর দেওয়ার আগেই ডান প্রান্ত থেকে ভেসে এল আন্তরিক সম্ভাষণ, “আসুন দীপঙ্করদা, আপনার জন্যই ওয়েট করছি।”

দীপকাকুর ক্রেজ দেখে ঝিনুক তো অবাক! এগিয়ে গেলেন দেওয়ালের ধারের চেয়ার-টেবিলের দিকে। কল্লোল সেন উঠে দাঁড়ালেন। খুবই ইয়াং অফিসার। দীপকাকুর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন। ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে হাসলেন সৌজন্যের নয়, পরিচিতের। ঝিনুক রীতিমতো কনফিউজড, ভদ্রলোকের সঙ্গে আগে আলাপ হয়েছিল কি?

টেবিলের অন্য প্রান্তের চেয়ারে বসেছে ঝিনুকরা। অফিসার বললেন, “রঞ্জনদা ফোন করেছিলেন আজ সকালে। বললেন, এগারোটা-সাড়ে এগারোটার ভিতরে আসবেন। আমি তাই এসময় কোনও কাজ রাখিনি।”

ধন্ধটা কেটে গেল ঝিনুকের। রঞ্জনকাকু হচ্ছেন দীপকাকুর কলেজবেলার বন্ধু। লালবাজারে আছেন। অনেক কেসে দীপকাকু ওঁর সাহায্য নেন। ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে কল্লোল সেন যে পরিচিতের হাসিটা হাসলেন, পরিচয়টা রঞ্জনকাকুর সাপ্লাই করা নিশ্চয়ই।

কল্লোলবাবু বললেন, “আমিই ছিলাম ওই কেসটার ইনভেস্টিগেটিং অফিসার। আপনার যা যা জানার জিজ্ঞেস করতে পারেন। ওই কেসের ফাইল ও আমার কাছে আছে, কিছু তথ্য-প্রমাণাদি দেখাতে পারব।”

কথা শেষ করে কল্লোল সেন ঝিনুকদের মাথার উপর দিয়ে কাকে যেন কী একটা ইশারা করলেন।

দীপকাকু বললেন, “আমরা কিন্তু এখন কিছুই খাব না। চা-ও নয়। সকাল থেকে বেশ কয়েকবার খেয়েছি।”

“ঠান্ডা বলি তা হলে?” অনুমতি চাইলেন কল্লোল সেন।

দীপকাকু ঝিনুকের মুখের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললেন, “বলুন।”

বিব্রত বোধ করল ঝিনুক। তাকে কি খুবই ক্লান্ত দেখাচ্ছে?

“দুটো কোল্ড ড্রিঙ্কস।” বলে, কাউকে নির্দেশ দিলেন কল্লোলবাবু। তারপর দীপকাকুর দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বললেন, “বলুন, কী জানতে চান?”

“কেসটা যে সুইসাইড, আপনি নিশ্চিত?”

“পোস্টমর্টেম রিপোর্ট তাই বলছে।”

“আপনার কী ধারণা, হোমিসাইডকে সুইসাইডের মতো সাজানো হয়নি তো? সামান্য কোনও খটকাও কি রয়ে গিয়েছে মনে?”

এই উত্তরটা দিতে একটু সময় নিলেন কল্লোল সেন। কেসটার আদ্যোপান্ত একবার ভেবে নিয়ে বললেন, “নাঃ, এটা প্লেন অ্যান্ড স্ট্রেট সুইসাইডের কেস। মৃতের পরিবার থেকে আলাদা করে কোনও তদন্তের দাবিও জানানো হয়নি।”

কোল্ড ড্রিঙ্কের বোতল এসে গেল। দীপকাকু স্ট্রয়ে মুখ দেওয়ার পরই ঝিনুক সিপ নিল। চুমুক শেষে দীপকাকু কল্লোল সেনকে বললেন, “ঘটনাস্থলের ফোটোগুলো আমাকে দেখাতে পারেন?”

“কেন নয়?” বলে, চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলেন কল্লোল সেন। খানিক দূরে একটা স্টিলের আলমারি আছে। সেটা খুলে নিয়ে এলেন একটা ফাইল। চেয়ারে বসে ফাইল থেকে বেশকিছু ফোটোগ্রাফ বের করে এগিয়ে দিলেন দীপকাকুর দিকে। ঝিনুক ঝুঁকে দেখতে গেল ফোটো, প্রচণ্ড শক লাগল তার। সরিয়ে নিল চোখ। দীপকাকুর সঙ্গে শেষ যে তদন্তে ছিল ঝিনুক, সেটাও মার্ডার কেস। এক বিত্তশালী সম্ভ্রান্ত মহিলা খুন হয়েছিলেন! মারা যাওয়ার আগে খুনের আশঙ্কা নিয়ে এসেছিলেন দীপকাকুর কাছে। ওই কেসে রক্তাক্ত বডি দেখেছে ঝিনুক। এতটা শক্ড হয়নি। দীপকাকুর হাতে এই প্রথম ঝুলন্ত মৃতদেহের ফোটো দেখল।

কোল্ড ড্রিঙ্কে সিপ দিল ঝিনুক, নাঃ, একদমই খেতে ইচ্ছে করছে না! ওয়াক উঠতে পারে। এই মনের জোর নিয়ে কী করে ডিটেকটিভ প্রফেশনে থাকবে? আড়চোখে দেখল দীপকাকুকে, কোনও বিকার নেই। ম্যাগনিফায়িং গ্লাস বের করে খুঁটিয়ে দেখছেন ফোটোগুলো। মুখ না তুলেই কল্লোল সেনকে জিজ্ঞেস করলেন, “ভদ্রলোকের মোবাইল ফোন পাওয়া গিয়েছিল?”

“না। আমরা যাওয়ার আগেই কেউ চুরি করে নিয়েছে।”

“কিন্তু রিস্ট ওয়াচ নেয়নি। ফোটোতে দেখা যাচ্ছে। পার্স?” চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে জানতে চাইলেন দীপকাকু।

উত্তর দেওয়ার আগে একটু থমকালেন কল্লোল সেন। বললেন, “পার্সও ছিল। ওখান থেকে কার্ড বের করে মোবাইল নাম্বারটা পাই। ফোন কোম্পানিকে সেটা ট্রেস করতে বলেছিলাম। কার্ডেই ছিল অনিমেষবাবুর ল্যান্ড ফোন নাম্বার, ডেকে পাঠিয়েছিলাম বাড়ির লোককে।”

দীপকাকু এবার ফোটো রেখে সরাসরি তাকালেন কল্লোল সেনের দিকে। বললেন, “তদন্তে একটু তা হলে ফাঁক রয়ে গিয়েছিল আপনাদের? চুরি বা ধরুন লুঠ করার অভিপ্রায় যদি থাকে, শুধু মোবাইল কেন?”

কল্লোল সেনের সপ্রতিভতায় এবার ভাটা পড়ল। টেবিলে রাখা হাতটা কনুই ভাঁজ হয়ে চলে এল চিবুকে। হাতঘড়িটা দামি, চকচক করছে। ভ্রু কুঁচকে উনি বললেন, “আসলে সিচুয়েশনটা তখন এমন ছিল, এই ব্যাপারটা মাথায় স্ট্রাইক করেনি। ভেবেছিলাম, অনিমেষবাবু যেভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন ক্লায়েন্টদের কাছে, মোবাইল ফোন চুরি যাওয়া নিতান্ত সাধারণ ঘটনা। এখন মনে হচ্ছে, তাই তো, ঘড়ি, পার্স ছিনিয়ে নেওয়াও কোনও ব্যাপার ছিল না! আচ্ছা, সেলফোনটা নেওয়ার পিছনে আপনি কি কোনও মোটিভ দেখতে পাচ্ছেন?”

দীপকাকু বললেন, “মোটিভ নিয়ে পরে ভাবব। বিষয়টা নোটিস করার মতো, এটা বুঝতে পারছি।”

একটু পড় নিয়ে দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “পুলিশকে কে বা কারা খবর দিয়েছিল?”

“ক্লায়েন্টরাই ফোন করে। অনিমেষবাবু চিৎকার-চেঁচামেচি, মারধরের ফাঁক গলে চলে যান অ্যান্টিচেম্বারে। ক্লায়েন্টরা অনেকক্ষণ ধরে দরজায় ধাক্কানোর পরেও যখন দেখল খুলছেন না, খবর দিল আমাদের। আমরা এসে ডাকাডাকি করার পরও খুললেন না দরজা। তখন ক্র্যাশ করতে হল ডোর। দেখলাম, ঝুলছেন। ওই পরিণতি দেখে অনেক ক্লায়েন্ট তক্ষুনি হাওয়া। কিছু লোক ছিল, আমরা তাদেরই ইন্টারোগেট করি।”

“অফিসে স্টাফ ক’জন ছিল অনিমেষবাবুর?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

কল্লোলবাবু বললেন, “সেই মুহূর্তে কেউ ছিল না। সমস্ত ঝড়ঝাপটা গিয়েছে অনিমেষবাবুর উপর দিয়ে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতেই স্টাফরা পালিয়েছিল। ক্লায়েন্টদের জিজ্ঞেস করে জানলাম, স্টাফ ছিল তিনজন। একজন বেয়ারা, দু’জন অফিস ক্লার্ক।”

“তাদের সঙ্গে মিট করেছেন?”

“হ্যাঁ। প্রথমে ধরি বেয়ারাকে। ঘটনার দু’দিন পর পান খেতে এসেছিল ওদের অফিসের উলটো দিকের দোকানে। আসলে খোঁজ করতে এসেছিল কোম্পানির অবস্থা। পানওয়ালাকে বলে রেখেছিলাম, স্টাফদের কাউকে দেখলে খবর দিতে।” থামলেন কল্লোলবাবু।

দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “বাকি দু’জন?”

“বেয়ারার কাছে ঠিকানা নিয়ে আমহার্স্ট স্ট্রিটের একটা মেস থেকে ওদের তুললাম। দু’জনে একই গ্রামের ছেলে। জেরা করে তেমন লাভ হল না। কোম্পানির টাকা কোথায় কীভাবে খাটে, কিছুই জানত না তারা। কম্পিউটারে হিসেব-নিকেশের কাজটুকু করত। অনিমেষবাবুর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নাম্বারটা শুধু দিতে পেরেছে। সেই নাম্বারটা আমরা অনিমেষবাবুর ছেলের থেকেও পেয়েছি। অ্যাকাউন্টে মাত্র দু’হাজার টাকা পড়ে আছে।”

কল্লোলবাবুর কথা শেষ হতে দীপকাকু জানতে চাইলেন, “ওই স্টাফদের সঙ্গে কি দেখা করা যাবে? ডেকে পাঠাতে পারবেন তাদের?”

“পাঠানোই যায়। তবে আপনি বোধহয় একবার গোল্ডেন ইনভেস্টমেন্টের অফিসটা দেখতে চাইবেন। বেয়ারা নির্মল জানা এখন ওই কমপ্লেক্সের সিকিউরিটি গার্ড। আমিই এজেন্সিকে বলে কাজটা পাইয়ে দিয়েছি। চাকরি গিয়ে বেচারা খুব বিপদে পড়ে গিয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ওর সঙ্গে আপনি কথা বলে নিতে পারেন।”

“ঠিক আছে, তাই হবে।” বলে, চুপ করে রইলেন দীপকাকু। ঝিনুক কিন্তু এবার ছোট ছোট করে নোট নেওয়া শুরু করেছে। সকাল থেকে যে হারে ইনফরমেশন জড়ো হচ্ছে, মনে রাখা অসম্ভব।

নীরবতা ভাঙলেন দীপকাকু। বললেন, “পুলিশের দিক থেকে তদন্ত দেখছি শেষ। কেসটা ক্লোজ, মানে ফাইনাল হচ্ছে কবে?”

“একটু অপেক্ষা করছি। এত লোকের টাকা মার গিয়েছে, কোনও ইনফরমেশন যদি আসে, যার উপর বেস করে টাকাগুলো উদ্ধার করা যায়। অফিসঘরটা এখনও আমাদের হেফাজতে রেখেছি। যদিও ফ্ল্যাটের আসল মালিক চাপ দিচ্ছে স্পেসটা ফ্রি করে দিতে। নতুন ভাড়াটে ঢোকাবে।”

“চলুন, তা হলে যাওয়া যাক। ঘটনাস্থলটা একবার দেখি।” বলে, চেয়ার ঠেলে উঠলেন দীপকাকু।