ডায়েরির সংকেত – ৪

এই ক’দিনের জন্য বাবা গাড়িটা পুরোপুরি ঝিনুকদের ছেড়ে দিয়েছেন। আশুদা তাতে খুব একটা খুশি হয়নি। কেননা প্রথম দিনেই তাকে যে হারে ঘুরিয়ে যাচ্ছেন দীপকাকু, আশুদার মুখ ভার।

দীপকাকু গাড়ি থেকে নেমে যেখানেই যাচ্ছেন, ঝিনুক সঙ্গে থাকছে। প্রথমে ক্যামাক স্ট্রিটের একটা অ্যাড এজেন্সিতে, সেখান থেকে ক্রিক রো-র সেই টেলিফোন বুথে, যেখান থেকে রঘু পালিয়েছিল, তারপর তালতলা থানা। প্রত্যেকটা জায়গা থেকে বেরিয়ে আসার পর আরও গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে দীপকাকুর মুখ। মহাত্মা গাঁধী রোড ধরে গাড়ি এখন ঠিক কোথায় যাচ্ছে, জিজ্ঞেস করতে ভরসা হচ্ছে না ঝিনুকের।

সকালে বাড়ি থেকে বেরনোর সময় ঝিনুকের মনে হয়েছিল, দীপকাকু বুঝি শ্রবণার দিদার বাড়িতে যাবেন। ওরা অপেক্ষায় আছে। এ ছাড়াও তৃতীয় চিঠিটা দেখার ভীষণ কৌতূহল হচ্ছিল ঝিনুকের। দীপকাকুর সে-ব্যাপারে কোনও আগ্রহ নেই। অপরাজিতা দেবীর বাড়ির কাছাকাছি টেলিফোন বুথে ঢুকে খানিকক্ষণ কাটালেও গাড়ি ঘুরিয়ে ফের তালতলা থানা।

আজ দীপকাকুর পোশাক অনেক পরিপাটি। শার্ট ইন করে পরেছেন। পায়ে শু। কিন্তু সিঁথিকাটা হেয়ার স্টাইল আর বোতলের পিছন-ভাঙা কাচের চশমাটা ওঁকে কিছুতেই স্মার্ট হতে দিচ্ছে না। বেশ অন্যমনস্ক হয়ে আছেন। হাঁটাচলায় অস্থির, তড়িঘড়ি ভাব। চিঠিতে দেওয়া সময় কমে আসাটা নিশ্চয়ই দুশ্চিন্তায় রেখেছে দীপকাকুকে। সকাল থেকে যে-সব জায়গায় গেছেন, কোথাও বেশিক্ষণ সময় নেননি। ক্যামাক স্ট্রিটের অ্যাড এজেন্সিটা দীপকাকুর এক দূর সম্পর্কের মামার। সেখানে গিয়ে খোঁজ নিলেন, সত্যবান মিত্রর বড়ছেলে জয়ন্ত মিত্রর অ্যাড এজেন্সি ‘মাইল স্টোন’-এর পরিচিতি কতটা? চলে কেমন? মামা বললেন, “জয়ন্ত মিত্র দিল্লি থেকে এসেছিল অনেক আশা নিয়ে। কলকাতায় তেমন সুবিধে করতে পারেনি।”

আরও কিছু দরকারি কথা সেরে দীপকাকু বেরিয়ে আসেন। তারপর ওঁর নির্দেশমতো আশুদা গাড়ি নিয়ে যায় ক্রিক রো-র টেলিফোন বুথের সামনে। গাড়ি থেকে নেমে দীপকাকু বুথ-মালিকের কাছে যান। বুথ-মালিক বয়স্ক মানুষ। চোখে-মুখে অনেক অভিজ্ঞতার ছাপ। দীপকাকুর কার্ড দেখে খুব একটা চমকালেন না। দীপকাকু রঘুর বর্ণনা দিয়ে বলেন, “ইদানীং সে ফোন করতে আসে কিনা?”

বুথ-মালিক বললেন, “ক’দিন দেখিনি।

দীপকাকুর পরের প্রশ্ন ছিল, “আপনি তো ডিসপ্লে বোর্ডের নম্বর দেখেই বুঝতে পারেন কাস্টমার কোন অঞ্চলে ফোন করছে। রঘু মোটামুটি কোথায় কোথায় ফোন করত, কিছু বলতে পারবেন? বিশেষ কোনও নম্বরে বারবার ফোন করত কি?”

বুথ-মালিক গম্ভীর গলায় বললেন, “কাস্টমার কোথায় কাকে ফোন করে, এটা দেখা যেমন আমার কাজ নয়, উচিতও নয়।”

এর উপর আর কথা চলে না। ঝিনুকরা এসে গাড়িতে বসেছিল। দূরে শ্রবণার দিদার বাড়িটা দেখা যাচ্ছে, দীপকাকু সেদিকে তাকালেন না। আশুদাকে বললেন, “তালতলা থানা চলো।”

থানায় দেখা হল ওসি পার্থ মজুমদারের সঙ্গে। দীপকাকু ঠিকই বলেছিলেন, খুবই সপ্রতিভ, ভাল ব্যবহার। সাদরে ডেকে নিলেন ঝিনুকদের। দীপকাকু বললেন, “ডায়েরিটা কিন্তু এখন দিচ্ছি না।”

“না, না, রাখুন না আপনার কাছে।” বলে, চা আনতে পাঠালেন পার্থবাবু। তারপর দীপকাকুর উদ্দেশে বললেন, “কী বুঝলেন লেখাগুলো দেখে? শুধুই পাগলের প্রলাপ, নাকি সত্যিই কোনও কাজে আসবে আপনার?”

“মনে তো হচ্ছে খুবই কাজে আসবে। এ ছাড়াও আর একটা জিনিস আপনার কাছে আমার জানার আছে।” বললেন দীপকাকু।

“বলুন।”

“ঘুমের ওষুধের নমুনাটা আপনারা শুধু গ্লাসেই পেয়েছিলেন, নাকি বোতলের মধ্যেও ছিল?”

“যতদূর মনে পড়ছে দুটোতেই ছিল। কেন বলুন তো?” দীপকাকুর প্রশ্নের উত্তরে জানতে চাইলেন পার্থবাবু

দীপকাকু বললেন, “একটু ভেবে, কাগজপত্তর দেখে আমার সেলফোনে পরে জানালেও চলবে। সেই বোতল-গ্লাস কি এখনও আপনাদের কাছে আছে?”

ওসি পার্থ মজুমদারের চোখে তখন বিস্ময়ের দৃষ্টি। একটু সময় নিয়ে বলেছিলেন, “কেসটা যখন প্রমাণিত হয়েই গেছে, ওসব রাখার আর কোনও মানে হয় না। রিপোর্টটুকু রেখে ওগুলো ডেসট্রয় করে দেওয়া হয়েছে।”

“পেলে সুবিধে হত।” বলে, চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন দীপকাকু। তারপর কী একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “আর একটা উপকার কি আমার করতে পারবেন?”

“নিঃসংকোচে বলুন।” বলেছিলেন পার্থবাবু।

দীপকাকু বললেন, “অপরাজিতা দেবীর বাড়িটা সবসময় লক্ষ রাখার জন্য দু’জন সাদা পোশাকের পুলিশ দু’দিনের জন্য বহাল করতে হবে। আপনাকে তো আগের দিনই বলেছি, মৃত্যুর হুমকি দিয়ে ওঁকে চিঠি পাঠানো হচ্ছে।”

উত্তরে পার্থবাবু বলেছিলেন, “হিসেবমতো এই সার্ভিসটা আমাদের দেওয়ার কথা নয়। কেননা ভদ্রমহিলা নিজে আমাদের কাছে কোনও সাহায্য চাননি। তবু আপনি যখন বলছেন, সে-ব্যবস্থা আমি করব। অবশ্যই এর বদলে আপনাকেও একটা ব্যাপারে কথা দিতে হবে।”

“কী কথা?” ভ্রু কুঁচকে জানতে চেয়েছিলেন দীপকাকু

পার্থবাবু বললেন, “ইনভেস্টিগেশন কমপ্লিট হলে তার সবিস্তার বর্ণনা একদিন এখানে এসে দিতে হবে আমাকে।”

ক্ষণিকের জন্য হাসি ফিরে এসেছিল দীপকাকুর মুখে। বলেছিলেন, “অফকোর্স! তবে এর মধ্যেই হয়তো আরও কয়েকবার আপনাকে আমার দরকার হতে পারে। তারপর ডায়েরিটা ফেরত দেওয়ার ব্যাপারটাও আছে।”

পার্থবাবুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঝিনুকরা এখন মহাত্মা গাঁধী রোড ধরে কলেজ স্ট্রিট মোড়ে চলে এসেছে। বাঁদিকে গাড়ি ঘোরাতে বললেন দীপকাকু। কিছুদূর গিয়েই আর একটা গলি ধরল ঝিনুকরা। গাড়িতে বসেই ঝিনুক দেখতে পেল, পুরনো দোতলা বাড়ির একতলায় ‘মাইল স্টোন’ লেখা গ্লো সাইনবোর্ড। অর্থাৎ এটাই সত্যবান মিত্রর বড়ছেলের অফিস।

গাড়ি সাইড করতে বলে নেমে গেলেন দীপকাকু। ঝিনুকও সঙ্গে সঙ্গে যায়।

বাইরে থেকে বাড়িটা পুরনো লাগলেও অফিসটা ঝকঝকে। কিউবিল করা বিশাল হলঘর। তবে কর্মীসংখ্যা নিতান্ত কম। ঘরটা বেশ ঠান্ডা, সেন্ট্রালি এসি করা আছে। রিসেপশনে গিয়ে দীপকাকু নিজের কার্ড দিয়ে বললেন, “জয়ন্ত মিত্রর সঙ্গে দেখা করতে চাই।”

রিসেপশন টেবিলের ভদ্রমহিলা ইন্টারকমের রিসিভার তুলে ফিসফিস করে কীসব বলেন। ঝিনুক কিচ্ছু শুনতে পায় না। ফোনে এভাবে কথা বলতে পারাটা একটা বিশেষ গুণ। হয়তো এই গুণটার জন্যই মহিলা চাকরিটা পেয়েছেন।

রিসিভার নামিয়ে ভদ্রমহিলা হাতের ইশারায় হলঘরের কোণে কাঠের অ্যান্টিচেম্বার দেখিয়ে দেন।

ঝিনুক মনে করেছিল এই অফিসটার মানানসই মালিক জয়ন্ত মিত্ৰ হয়তো খুব কেতাদুরস্ত সাহেবি লোক হবেন। চেম্বারে ঢুকে দেখা গেল মোটেই তা নয়। চেয়ার ছেড়ে উঠে দীপকাকুর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন জয়ন্ত মিত্র। ঝিনুকের সঙ্গে নমস্কার বিনিময় হল। ফের চেয়ারে বসে জয়ন্তবাবু আপ্লুত কণ্ঠে বললেন, “আমার খুব এক্সাইটিং লাগছে জানেন, লাইফে ফার্স্ট টাইম কোনও রক্তমাংসের গোয়েন্দা আমার কাছে এলেন। এতদিন তো শুধু বইয়ের পাতায় পড়েছি। আমি আবার খুব ডিটেকটিভ গল্পের ভক্ত। বলুন, কী নেবেন, হট না কোল্ড?”

“চা-ই বলুন।” বললেন দীপকাকু।

ইন্টারকম তুলে চায়ের নির্দেশ দিলেন জয়ন্ত মিত্র। তারপর বললেন, “এবার বলুন, আপনাদের জন্য কী করতে পারি?”

বাতানুকূল পরিবেশের কারণেই হয়তো দীপকাকু এখন অনেক শান্ত, স্বাভাবিক। বেশ গুছিয়ে শুরু করলেন, “আপনাকে বিরক্ত করার জন্য আমি প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। যে তদন্তের কারণে আমার আসা, তার সঙ্গে সরাসরি কোনও যোগ নেই আপনার। তবু এই কেসে আপনি যদি সামান্য সহযোগিতা করেন, খুব উপকার হয়।”

“এ কী, আপনি এত হেজিটেট করছেন কেন! যা জানতে চান, নিঃসংকোচে জিজ্ঞেস করুন।” বললেন জয়ন্ত মিত্র।

দীপকাকু বললেন, “আপনার বাবা শ্রীসত্যবান মিত্র যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন, সে বাড়িতে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে।”

কথার মাঝেই জয়ন্ত মিত্র বলে উঠলেন, “জানি।”

দীপকাকু, ঝিনুক দু’জনেই ভীষণ বিস্মিত হয়। দীপকাকু বললেন, “কী জানেন?”

“ওই তো, আমি কেন বাবার জিনিসপত্তরগুলো তুলে নিচ্ছি না। ওগুলো ফেলতেও পারছেন না ওঁরা। সম্ভবত সেই কারণেই আপনাকে পাঠানো হয়েছে।”

জয়ন্তবাবুর কথা শুনে ঝিনুকরা স্বস্তির শ্বাস ফেলল। দীপকাকু বললেন, “হ্যাঁ, এই সমস্যাটা তো আছেই। এ ছাড়াও একটা বিপদে পড়েছেন অপরাজিতা দেবী।”

“কীরকম বিপদ?” জানতে চাইলেন জয়ন্ত মিত্র।

দীপকাকু বললেন, “ঠিক আছে, সে-কথায় না হয় পরে আসছি, তার আগে আপনার ব্যাপারটায় পরিষ্কার হয়ে নেওয়া যাক। আপনি বলুন তো, কেন বাবার জিনিসপত্তরগুলো নিচ্ছেন না?”

এবার যেন একটু গম্ভীর হয়ে যান জয়ন্ত মিত্র। খানিকক্ষণ সময় নিয়ে বললেন, “এ ব্যাপারে একটা গোপন কথা আপনাকে বলতে হয়। আমি কি আপনাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারি?”

“পারেন।” বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন দীপকাকু।

ভরসা পেয়ে জয়ন্ত মিত্র বললেন, “সত্যি কথা বলতে কী, আমিও ক’দিন ধরে আপনার মতো একজনকে খুঁজছিলাম। হয়তো ভগবানই আপনাকে পাঠিয়ে দিলেন। আমি আবার খুব ঈশ্বরে বিশ্বাস করি।” বলে, আঙুলে বেশ বড়সড় কালীমূর্তির আংটিটা দেখালেন।

“ভাল কথা, যেটা বলতে যাচ্ছিলেন, সেটা বলুন,” প্রসঙ্গে ফিরিয়ে আনেন দীপকাকু।

জয়ন্তবাবু শুরু করলেন, “বাবা মারা যাওয়ার পর প্রথমটায় অভিমানে সত্যিই আমি জিনিসগুলো নিতে যাইনি। বাবা চিরকাল সংসারের ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন। পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন সবসময়। আমাদের মানুষ করেছেন মা। পরিবারের প্রতি বাবার অবজ্ঞা মা-কেও খুব কষ্ট দিত। মা মারা যাওয়ার পর বাবা যেন আরও দূরে সরে গেলেন। কখন কোথায় থাকেন, কী করেন, কিছুই জানতাম না আমরা। এমনকী কলকাতায় এসে আছেন, তাও আমি খবর পাই অন্য এক সূত্রে।”

“তারপর আপনি দেখা করতে যান।” বললেন দীপকাকু।

“হ্যাঁ। এবং যথারীতি বাবা আমাকে পাত্তা দেন না। কিছু অপমানজনক কথাও বলেন।”

“যেমন?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

“বাবা বললেন, “তুমি কেন এসেছ জানি, বিষয়-সম্পত্তির লোভে। দাঁড়াও, আগে মরতে দাও।’ যে-কোনও সন্তান এই কথা শোনার পর পিতার মুখ আর দেখত না। আমি শুধু কর্তব্যবোধ থেকেই মাঝে মাঝে গেছি। ছোটভাই তো কোনও যোগাযোগই রাখে না। বাবার শরীরটা দিন দিন খারাপ হচ্ছিল, একদিন ডাক্তার নিয়ে গিয়েছিলাম, দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলেন। তখন কি জানতাম সেদিনই তাঁর শেষ দিন!” বলে, চুপ করে গেলেন জয়ন্ত মিত্র। সম্ভবত শোক সামলে নিচ্ছেন। মুখে যাই বলুন, বোঝাই যাচ্ছে বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা কিছু কম ছিল না জয়ন্তবাবুর।

খানিক নীরবতার পর দীপকাকু বললেন, “আমরা কিন্তু মূল জায়গা থেকে সরে এসেছি। কথা হচ্ছিল আপনার বাবার জিনিস…”

কথার মাঝে জয়ন্তবাবু বললেন, “ওই যে বলছিলাম, প্রথমদিকে অভিমানে জিনিসগুলো নিতে না গেলেও, পরে আমি বাড়ির মালিকের অসুবিধে উপলব্ধি করি। সবে ভাবছি, বাবার ফ্ল্যাটটা এবার খালি করে দিয়ে আসা উচিত, তখনই এল বিচ্ছিরি একটা চিঠি।”

“চিঠি!” সবিস্ময়ে বলে ওঠে ঝিনুক।

দীপকাকুর ভ্রু কুঁচকে গেছে। জানতে চাইলেন, “কীরকম চিঠি?”

“দাঁড়ান, দেখাচ্ছি।” বলে, জয়ন্তবাবু ড্রয়ার টেনে বের করে আনলেন একটা ফুলস্কেপ বন্ড পেপার, যার উপর কম্পিউটারে টাইপ করা কিছু বাংলা অক্ষর।

কাগজটা নিয়ে চোখ বোলালেন দীপকাকু। কৌতূহল দমন না করতে পেরে ঝিনুকও পাশ থেকে ঝুঁকে পড়ে। চিঠিতে লেখা—

জানি, সত্যবান মিত্রর মহামূল্যবান জিনিসটা এখন তোমার কাছে। ওটা এক সপ্তাহের মধ্যে চাই। যদি রাজি থাকো, নিজের গাড়ির পিছনের কাচে মা কালীর পোস্টার লাগাও। যোগাযোগ করে নেব। রাজি না হলে মৃত্যুর দিন গোনো।

.

ঝিনুকের মাথা ঝিমঝিম করছে, এ তো প্রায় একই রকম চিঠি, অপরাজিতা দেবীকে যেমনটা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ দুষ্কৃতী নিজেই ভাল করে জানে না, মহামূল্যবান বস্তুটি কার হেফাজতে আছে। তবে এটা থেকে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেল, অপরাজিতা দেবীর কেসের সঙ্গে মৃত সত্যবানবাবু কোনওভাবে জড়িয়ে আছেন। দীপকাকু আন্দাজ করেছিলেন ঠিকই, কী করে করেছিলেন কে জানে! সে যাই হোক, রহস্য তো আরও জটিল হয়ে গেল!

দীপকাকু চিঠিটা পড়তে পড়তে প্রায় চশমায় ঠেকিয়ে ফেলেছেন। কী দরকার বাবা, পকেটে তো ম্যাগনিফায়িং গ্লাস আছেই। চিঠিটা জয়ন্তবাবুকে ফেরত দিয়ে দীপকাকু জানতে চাইলেন, “ক’দিন হল চিঠিটা পেয়েছেন?”

“দিন দশেক হল।”

“গাড়ির পিছনের কাচে পোস্টার সেঁটেছেন?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

জয়ন্তবাবু বললেন, “কেন সাঁটতে যাব? কী ছাই মূল্যবান জিনিস, আমি নিজেই জানি না!”

দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “তারপর আর কোনও চিঠি, অথবা অন্য কোনওভাবে যোগাযোগ করেনি?”

“করেছিল। ফোন করে হুমকি দিল, ‘অযথা দেরি করছেন জয়ন্তবাবু, আরও সাতদিন সময় দিলাম। নইলে মৃত্যু নিশ্চিত।”

জয়ন্তবাবুর কথার পিঠে ঝিনুক বলে ওঠে, “ফোনের গলাটা নিশ্চয়ই বাজখাঁই টাইপের?”

উত্তরে জয়ন্তবাবু বললেন, “ঠিক তাই। তুমি কী করে জানলে?”

একটু হলে ঝিনুক বলে ফেলতে যাচ্ছিল ওদের বাড়িতে আসা সেই ফোনের কথা, দীপকাকুর চোখ কটমটানি দেখে শুধরে নেয়। বলে, “আসলে এইসব ফোনে তো ওরকমই গলা আসে।”

ঝিনুকের কথা চাপা দিতে দীপকাকু তাড়াতাড়ি জয়ন্তবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, “চিঠিটা পাওয়ার পর পুলিশে জানাননি কেন?”

“কী হবে জানিয়ে? জানেনই তো, পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা। এখন তবু লোকটা বলছে জিনিসটা আমার কাছে আছে, পুলিশ বলবে, কী আছে আমাদের দেখান। দু’পক্ষ সামলানো আমার কম্মো নয়। এমনিতে বিজনেসের কাজে সারাটা দিন ব্যস্ততায় কাটে আমার।”

জয়ন্তবাবুর কথার উত্তরে দীপকাকু বললেন, “কিন্তু ওরা যে আপনাকে মৃত্যুর হুমকি দিচ্ছে?”

“দিক। আমি জানি, আমাকে মারা ওদের উদ্দেশ্য নয়। আসল লক্ষ্য জিনিসটা পাওয়া। সেটা যখন আমার কাছে নেই, খামোখা ভয় পাব কেন!” বললেন জয়ন্তবাবু।

সাহসী সিদ্ধান্ত। ঝিনুক ভাবে, অপরাজিতা দেবীও তেমন ভয় পাননি, ভয় পেয়েছে ওঁর মেয়ে-জামাইরা। তার মানে জিনিসটা অপরাজিতা দেবীর কাছেও নেই। কার কাছে আছে সেই মহামূল্যবান বস্তু, যা ভীষণভাবে খুঁজে যাচ্ছে দুষ্কৃতী? আর বস্তুটিই-বা কী?

ঝিনুকের মনের কথাটি দীপকাকু এবার জিজ্ঞেস করলেন, “চিঠি পড়ে বোঝা গেল, কোনও একটি মহামূল্যবান বস্তু আপনার বাবার কাছে ছিল। আপনার কোনও ধারণা আছে, কী হতে পারে সেটা?”

চিন্তিত মুখে মাথা নাড়েন জয়ন্তবাবু। হয়তো এটা নিয়ে আগেও ভেবেছেন। একটু সময় নিয়ে বললেন, “একটা ব্যাপার আপনাদের বলতে পারি, আমার বাবার কাছে আর্থিক মূল্যে খুব দামি কিছু থাকার সম্ভাবনা কম। টাকাপয়সার দিকে বাবার কোনওদিনই ঝোঁক ছিল না। যদি কিছু থেকেই থাকে, অন্য অর্থে দামি।”

দীপকাকু বললেন, “এই চিঠিটা পাওয়ার পর আপনি তো অনায়াসে বাবার ঘরে গিয়ে দেখতে পারতেন, সেরকম বিশেষ কিছু আছে কি না?”

“মাথা খারাপ আপনার! দেখছেন, কিছু না নিতেই চিঠি দিচ্ছে। বাবার ঘরে ঘুরে এলে তো কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে জিনিসটা চাইবে।” বলে, কী একটু ভেবে নিয়ে জয়ন্তবাবু আবার বললেন, “সত্যি কথা বলতে কী জানেন, বাবার সাবজেক্ট ও রিসার্চ নিয়ে আমি কোনওদিনই তেমন মাথা ঘামাইনি। সেই সংক্রান্ত যদি কিছু হয়, আমি তা বুঝতেই পারব না!”

কথা শেষ হতে না-হতেই দীপকাকু বললেন, “সেই কারণেই আপনি আর ওবাড়িতে যাননি?”

“এগজ্যাক্টলি! ঠিক ধরেছেন!”

কথাবার্তার মাঝে একজন ট্রে হাতে চা নিয়ে ঢুকল। জয়ন্তবাবু বললেন, “নিন, একটু চা খান।”

বেয়ারা তিনজনের সামনে চায়ের কাপ নামিয়ে দিল। দীপকাকুর হাতে এখনও সেই চিঠি, বললেন, “এটা কি আমি ক’দিনের জন্য রাখতে পারি?”

“কেন নয়? অবশ্যই রাখতে পারেন। ইন ফ্যাক্ট, আমি সেই কথাটাই বলতে যাচ্ছিলাম, শুধু চিঠি নয়, আপনি যদি এই কেসটাও হাতে নেন, খুব ভাল হয়।” বললেন জয়ন্তবাবু

দীপকাকু চার ভাঁজ করে চিঠিটা শার্টের পকেটে পুরে চায়ের কাপটা তুলে নিলেন। তারপর বললেন, “আপনি যেরকম স্টেডি, মনে হয় না আমার কোনও সাহায্য আপনার দরকার হবে।”

প্রশংসাটা জয়ন্তবাবুকে আরও বিনয়ী করে তুলল। বিগলিত হেসে বললেন, “আসলে তা নয়, একটু ভয়-ভয় তো করছেই। এসব আপনারাই ভালভাবে…”

কথা শেষ হওয়ার আগেই একটা বিচ্ছিরি ঘটনা ঘটে গেল। দীপকাকুর হাত থেকে চায়ের কাপটা ফসকে সোজা মেঝেতে। লাফিয়ে উঠেছে ঝিনুক। কাপ ভেঙে ছত্রখান। চা ছিটিয়ে পড়েছে দীপকাকুর শার্টে, টেবিলে। বিষম লজ্জায় দীপকাকু একটু বেসামাল হয়ে পড়েছেন, নিজেই হাত দিয়ে টেবিলের চা মুছতে লাগলেন, নিচু হয়ে তুলতে গেলেন ভাঙা কাপের টুকরো। জয়ন্তবাবু মানা করছেন। বলছেন, “ছেড়ে দিন, আমার লোক এসে তুলে দেবে।” কিন্তু কে শোনে কার কথা! দীপকাকু কী যে করছেন, নিজেই বুঝতে পারছেন না! এরই মধ্যে একবার কম্পিউটারে ধাক্কা মেরে বসলেন। জয়ন্ত মিত্র ইন্টারকমে বেয়ারাকে ডাকলেন। পুরো ঘটনায় ঝিনুকেরও ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে।

বেয়ারা এসে ব্যাপারটা মোটামুটি সামলে নিল। দীপকাকু চেয়ারে বসে হাঁফাচ্ছেন আর বলছেন, “আই অ্যাম রিয়েলি ভেরি সরি। আই অ্যাম … “

“ওকে, ইট্স অল রাইট। আপনি মিছিমিছি ব্যস্ত হচ্ছেন। এরকম হতেই পারে। ইট্স অ্যান অ্যাকসিডেন্ট। তবে আপনার শার্টটাও খারাপ হয়েছে।” বলে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করলেন জয়ন্তবাবু।

দীপকাকু আর বেশিক্ষণ বসলেন না। একটু পরেই চেয়ার থেকে উঠে বললেন, “আজ তা হলে চলি। আপনার অনেক সময়, একটা চায়ের কাপ নষ্ট করলাম।”

জয়ন্ত মিত্র হেসে বললেন, “ছাড়ুন তো মশাই! একটা কাপ ভাঙলে আমি গরিব হয়ে যাব না। আবার আসবেন। আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে বেশ ভাল লাগল।”

নমস্কার বিনিময় করে বেরিয়ে আসছিল ঝিনুকরা। জয়ন্ত মিত্র ডাকলেন, “সরি মিস্টার বাগচী, আপনি কিন্তু আসল কথাটাই বলতে ভুলে গেছেন।”

ঘুরে দাঁড়িয়ে দীপকাকু জানতে চাইলেন, “কী কথা!”

“বাবার ঘরটা ছাড়াও অপরাজিতা দেবী কী একটা সমস্যায় যেন পড়েছেন….”

“হ্যাঁ, তবে যা বুঝলাম, সে-ব্যাপারে আপনিও বোধহয় কোনও সাহায্য করতে পারবেন না। চলি।”

.

জয়ন্ত মিত্রর অফিস থেকে বেরিয়ে ঝিনুকরা গাড়িতে গিয়ে বসল। দীপকাকু গম্ভীর গলায় আশুদাকে ধর্মতলার দিকে গাড়ি চালাতে বললেন। আবার কোথায় যাচ্ছেন কে জানে! ওদিকে শ্রবণারা চিন্তা করে মরছে।

দীপকাকুর মুখ আবার গভীর চিন্তামগ্ন। ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে আছে। শার্ট ভরতি চায়ের দাগ। কী বিচ্ছিরি কাণ্ডটাই না করলেন! ঝিনুকের বুঝতে অসুবিধে হয় না, কিছুটা নার্ভাস হয়েই কাপটা হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল দীপকাকুর। জয়ন্ত মিত্রর কাছে একই রকম চিঠি দেখে সমস্ত ক্যালকুলেশন এলোমেলো হয়ে গেছে। ব্যাপারটা একেবারে অপ্রত্যাশিত।

রাস্তায় এখন ঝাঁ ঝাঁ রোদ। মানুষজন, গাড়ির ভিড়। আশুদা স্পিড তুলতে পারছে না। দীপকাকু সিগারেট ধরিয়েছেন। ধীরে ধীরে চোখেমুখে প্রশান্তি ফিরে আসছে। হঠাৎই দীপকাকু বলে উঠলেন, “তা হলে ঝিনুক, একটা ব্যাপার অন্তত মিলল।”

প্রশ্ন না করে পরের কথাটার জন্য অপেক্ষা করে ঝিনুক। দীপকাকু বললেন, “যে জিনিসটার জন্য এত হুমকি, চিঠি, সেটার মালিক আসলে ছিলেন সত্যবান মিত্র। এখন মালিক বদলে গেছে।”

ঝিনুক বলল, “এমনও তো হতে পারে, জিনিসটা এখনও সত্যবানবাবুর ঘরেই কোথাও লুকনো আছে। আড়ালে থাকা লোকটা অযথা সন্দেহ করছে জয়ন্ত মিত্র আর অপরাজিতা দেবীকে।”

একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে দীপকাকু বললেন, “সেই সম্ভাবনা খুব কম। দুষ্কৃতী যেমন অপরাজিতা দেবীর ঘর লন্ডভন্ড করেছে, তার আগে সত্যবানবাবুর ঘরটাও দেখে নিয়েছে ভালভাবে। ওবাড়ির সব তালার চাবি করানো আছে লোকটার কাছে।”

“আপনি কী করে বুঝলেন সত্যবানবাবুর ঘরে জিনিসটা খোঁজা হয়েছে?” জানতে চায় ঝিনুক।

একটু গর্বের সুরে দীপকাকু বলতে থাকেন, “সত্যবানবাবুর ঘরে ঢুকে আমি কী কী জিনিস লক্ষ করছিলাম মনে করে দেখো। প্রথমে বুককেসের কাছে যাই। দেখি, বেশকিছু বই উলটো করে সাজানো আছে, তাড়াহুড়ো এবং বইয়ের প্রতি দরদ না থাকলে এটা হয়। তারপর দেখি, মেঝেতে পুরনো ছাপের সঙ্গে চটি ও জুতোর কিছু টাটকা ছাপ, যা শোওয়ার ঘর থেকে বাথরুম অবধি গেছে। দেওয়ালে টাঙানো ছবিগুলোর পিছনটাও দেখেছিলাম, ফ্রেমগুলো সেন্টারে ছিল না। দু’-চারটে শো পিস, ড্রয়িংয়ে যা ছিল, সেগুলোও সরানো হয়েছে, পুরনো অবস্থানে সে-সবের ছাপ এখনও স্পষ্ট। সবশেষে যেটা আমি দেখি, অ্যাশট্রের মধ্যে টাটকা কিছু সিগারেটের ফিল্টার। তখনই নিশ্চিত হয়ে যাই, সত্যবানবাবুর মৃত্যুর অনেকদিন পরে দু’জন দুষ্কৃতী এই ঘরে এসেছিল। যাদের একজন চটি পরেছিল, অন্যজন জুতো।”

দীপকাকুর পর্যবেক্ষণ সত্যিই বাহবা পাওয়ার যোগ্য, এই নিয়ে উনি গর্ব করতেই পারেন। কিন্তু একটা খটকা যে থেকেই যাচ্ছে! সেটাই জানতে চায় ঝিনুক, “সত্যবানবাবুর ঘরের বেলায় ওরা দিব্যি সবকিছু গুছিয়ে দিয়ে গেল, অপরাজিতা দেবীর ক্ষেত্রে বিপরীত আচরণ কেন?”

“এর একটা কারণ হয়তো, সত্যবানবাবুর ঘরে যে সময়টা দুষ্কৃতীরা পেয়েছিল, অপরাজিতা দেবীর ঘরে সেটা পায়নি। দ্বিতীয় কারণটা হচ্ছে, জিনিসটা না পেয়ে ওরা ক্রমে অধীর এবং মরিয়া হয়ে উঠছে। তারই প্রকাশ দেখা গেছে অপরাজিতা দেবীর ঘরে।

সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর সিগন্যালে অনেকক্ষণ দাঁড়ানোর পর গাড়ি আবার ছাড়ল। আর একটা কথা খেয়াল হল ঝিনুকের, “আচ্ছা, লোকগুলো কি জয়ন্তবাবুর ঘর লন্ডভন্ড করেছে?”

দীপকাকু বললেন, “উনি যখন সে-ব্যাপারে কিছু বললেন না, ধরে নেওয়া যায় সেরকম কোনও ঘটনা ওঁর ক্ষেত্রে ঘটেনি। হয়তো ওঁর বাড়ির নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভাল।”

ফাঁকা রাস্তা পেয়ে বেশ স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছে আশুদা। ঝিনুক দীপকাকুকে জিজ্ঞেস করল, “আমরা নিশ্চয়ই এখন অপরাজিতা দেবীর বাড়ি যাচ্ছি?”

“না। লাঞ্চ করতে যাচ্ছি আমিনিয়ায়।”

দীপকাকুর কথা শুনেই খিদে পেয়ে যায় ঝিনুকের। আশুদা বলল, “সেই ভাল, আমারও তেল রিজার্ভে চলে গেছে।”

কথাটা প্রথমে ধরতে পারে না ঝিনুক, গাড়ি নিয়ে বেরিয়েই ট্যাঙ্ক ফুল করিয়েছেন দীপকাকু, এখনই কী করে তেল রিজার্ভে চলে যায়! পরক্ষণেই আশুদার কথার আসল মানেটা বুঝতে পেরে হেসে ফেলে ঝিনুক, আশুদারও খিদে পেয়েছে।

.

হোটেলে খুবই পরিতৃপ্তি করে খেয়ে ঝিনুকরা এখন ক্রিক রো-তে চলে এসেছে। সামান্য এই রাস্তাটুকু গাড়ির সিটে মাথা হেলিয়ে ঝিমিয়ে নিয়েছেন দীপকাকু। এত সমস্যার মধ্যে কী করে যে ঘুমোন মানুষটা, কে জানে!

অপরাজিতা দেবীর বাড়ির গেট বন্ধ। দু’বার হর্ন দেয় আশুদা। তাতেই চটকা ভাঙল দীপকাকুর। চোখ কুঁচকে দু’পাশের জানলার বাইরেটা দেখে বললেন, “যাক, পুলিশের লোকদুটো আছে তা হলে।”

ঝিনুক অবাক হয়ে বলল, “কোথায় তারা?”

“পাঁচিলের গায়ে ঝুপড়ির সামনেটা দ্যাখো, তাস খেলছে দু’জনে। ফুটপাতবাসীর ছদ্মবেশ নিয়েছে।”

দীপকাকুর কথা মিলিয়ে নিতে ঝিনুক আড়চোখে ঝুপড়ির দিকে তাকায়, সত্যিই নোংরা পোশাকে দু’জন লোক তাস খেলা বন্ধ রেখে ঝিনুকদের গাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে।

গেট খুলল বিনায়কদা। গাড়ির জানলার কাছে এসে কী যে বলল, বোঝা গেল না। অপরাজিতা দেবী অপেক্ষায় আছেন, সেটাই জানাল বোধহয়। গাড়ি পোর্টিকোর নীচে দাঁড়ানোর আগে ঝিনুক জানলা দিয়ে দেখল, শ্রবণা দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে, নতুন করে কিছু ঘটেনি। ঝিনুকের কেমন জানি একটা আশঙ্কা মনে গেঁথে গেছে, প্রতিটা মুহূর্তে মনে হচ্ছে কিছু ঘটবে। এবং একই সঙ্গে দীপকাকু নতুন কোনও পথের সন্ধান পাবেন।

হোটেলে খেতে বসে জয়ন্তবাবুর কাছ থেকে নিয়ে আসা চিঠিটা ফের বের করেছিলেন দীপকাকু। তখন কিন্তু ম্যাগনিফায়িং গ্লাসের সাহায্য নেন। খানিকক্ষণ পরীক্ষা করার পর, প্যান্টের পকেট থেকে বের করলেন দোমড়ানো-মোচড়ানো আর-একটা কাগজ। চিঠির কাগজের মতোই। তার উপর অবশ্য বেশকিছু ইংরেজি অক্ষর। দুটো কাগজ পাশাপাশি রেখে আতশ কাচ দিয়ে কী যেন খুঁটিয়ে দেখলেন! ধীরে ধীরে তাঁর মুখে ফুটে উঠল হাসি। নিজেকেই যেন বলে উঠলেন, “আমার সঙ্গে চালাকি!”

ঝিনুক তক্ষুনি বিষয়টা জানতে যাচ্ছিল, দীপকাকু হাতের ইশারায় ঝিনুককে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “আগে খেয়ে নাও, ক্রমে সব জানতে পারবে।”

সেই সময় বেয়ারা গরম গরম খাবার নামিয়ে দিচ্ছে টেবিলে। তারপর আর কথাটা তোলার সুযোগ পায়নি ঝিনুক। গাড়িতে উঠেই ঘুমিয়ে পড়লেন দীপকাকু।

বিনায়কদাকে অনুসরণ করে ঝিনুকরা দোতলায় উঠে এসেছে। সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে শ্রবণা। ঝিনুককে দেখে উদ্বিগ্ন স্বরে জানতে চাইল, “কী হয়েছে তোর হাতে?”

কনুইয়ের কাটাটা ভুলেই গিয়েছিল ঝিনুক। এখন শুধু ব্যান্ডএড লাগানো আছে। ঝিনুক বলল, “ও কিছু না। একটু ছড়ে গেছে।”

শ্রবণা আশ্বস্ত হয়ে ঝিনুকদের ড্রয়িংয়ে বসতে বলে দিদাকে ডাকতে গেল।

ড্রয়িংয়ে ঢুকেই বুকশেফের কাছে চলে গেছেন দীপকাকু। ঝিনুক ক্লান্ত হয়ে সোফার আশ্রয়ে। বইগুলো দেখতে দেখতে দীপকাকু বললেন, “ভদ্রমহিলার বিভিন্ন বিষয়ে যথেষ্ট আগ্রহ, অনেক ধরনের রেয়ার সব বই আছে।”

কথা শেষ হতেই ঘরে ঢুকলেন অপরাজিতা দেবী। পায়ের শব্দে দীপকাকু ঘুরে দাঁড়ালেন। অপরাজিতা দেবীর মুখ আজ ভীষণ থমথমে। ভয়ে মানুষের মুখ এমনটা হয় না। তা হলে কি অন্য কিছু ঘটেছে?

অবসন্ন পায়ে সোফায় এসে বসলেন অপরাজিতা দেবী। ওঁর সঙ্গে শ্রবণাদের না দেখে একটু অবাক হয় ঝিনুক। সোফায় বসে সেই প্রশ্নটাই দীপকাকু একটু অন্যভাবে করলেন, “আপনার মেয়ে-জামাইরা এখন নেই নাকি বাড়িতে?”

উত্তরে অপরাজিতা দেবী বললেন, “জামাইরা নেই। দুই মেয়ে আর নাতনি আছে। আমিই ওদের এ ঘরে আসতে বারণ করেছি।”

“কারণ?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

“আপনার সঙ্গে একান্তে আমার কিছু কথা আছে।” বললেন অপরাজিতা দেবী। ঝিনুক প্রমাদ গোনে, এই হয়তো ওকে উঠে যেতে বলা হবে।

না, তা হল না। অপরাজিতা দেবী তৃতীয় চিঠিটা আঁচলের আড়াল থেকে বের করে দীপকাকুর হাতে দিলেন। বললেন, “এটা পড়ে নিন আগে। তারপর কথাটা বলছি।”

চিঠিটায় একবার চোখ বুলিয়ে ঝিনুকের হাতে সেটা চালান করে দিলেন দীপকাকু। ঝিনুক দেখে, “শ্রবণা ফোনে যা বলেছিল অবিকল তাই লেখা আছে— মিছিমিছি দেরি করছেন ম্যাডাম। মৃত্যু ততই…”

অপরাজিতা দেবী বলতে শুরু করেছেন, “আপনাকে না জানিয়েই আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সত্যি কথা বলতে কী, লাস্ট চিঠিটা পাওয়ার ঘণ্টাখানেক পর ডিসিশনটা আমি নিই। তখন আর ফোনে আপনাকে যোগাযোগ করা যায়নি।”

“সিদ্ধান্তটা যদি একটু বলেন।” বিনয়ের সঙ্গে জানতে চান দীপকাকু।

অপরাজিতা দেবী বললেন, “হিসেবমতো আর একদিন সময় আছে। তারপরই চিঠির লোকটা যে জিনিসটা চাইছে সেটা আমায় ওর হাতে তুলে দিতে হবে। জিনিসটা কী এখনও আমি জানি না।” একটু থামলেন অপরাজিতা দেবী। ফের বললেন, “আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, ওই গয়নাগাটি অথবা কিছু পুরনো নথির মধ্যেই লুকিয়ে আছে মহামূল্যবান জিনিসটা।”

“পুরনো নথি বলতে?” কথার মাঝে প্রশ্ন করলেন দীপকাকু।

অপরাজিতা দেবী বললেন, “এই ধরুন কিছু চিঠি, দলিল… যেগুলো দেখে আমি সেরকম কিছু উদ্ধার করতে পারিনি। প্রসঙ্গত একটা কথা বলি, আমার শ্বশুরমশাই জমি বন্ধক রেখে টাকা ধার দিতেন। সেরকম বেশকিছু দলিল এ বাড়ির আলমারিতে আছে।”

“বুঝলাম। তারপর বলুন।” বললেন দীপকাকু।

“আমার এক দূরসম্পর্কের ভাশুর, আমার স্বামীর কাকার ছেলে, থাকেন শিলিগুড়িতে। আমার হাজব্যান্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। তিনি এ বাড়ির ইতিবৃত্ত অনেকটাই জানেন। আমার ধারণা, উনি জিনিসগুলো দেখলে আন্দাজ করতে পারবেন মূল্যবান জিনিস কোনটি। তাই আমি ঠিক করেছি আর সময় নষ্ট না করে কালই শিলিগুড়ি যাব।”

“সে কী, এত বড় ঝুঁকি নেবেন আপনি! এতে আরও সুবিধে হয়ে যাবে ওদের। সহজেই জিনিসগুলো আপনার থেকে ছিনিয়ে নেবে।” আশঙ্কিত গলায় বললেন দীপকাকু। কী একটু ভেবে নিয়ে আবার বললেন, “আপনার সঙ্গে নিশ্চয়ই মেয়ে-জামাইরা কেউ যাচ্ছে? তারা কি এ ধরনের হামলা সামলাতে পারবে?”

“না, তারা কেউ যাচ্ছে না। তারা জানেই না আমি কাল শিলিগুড়িতে যাচ্ছি। শেষ মুহূর্তে বলব। সত্যি কথা বলতে কী, আমি কারও উপরই ভরসা করতে পারছি না।”

ভীষণ অবাক হয়ে দীপকাকু জানতে চাইলেন, “আপনি একলা যাবেন?”

মৃদু হেসে অপরাজিতা দেবী বললেন, “না, আপনারা আমাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাবেন। আপনার সঙ্গে ঝিনুকেরও টিকিট কেটে রেখেছি। এখন যদি আপনারা না যেতে চান আমাকে একলাই যেতে হয়।”

এই প্রথম ঝিনুকের এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি হল, ভয় আর আনন্দ একসঙ্গে। এরকম একটা অ্যাডভেঞ্চারের সুযোগ সহজে আসে না। একাগ্র চিত্তে দীপকাকু কী যেন ভেবে যাচ্ছেন! একটু পরে মুখ তুলে বললেন, “কোন ট্রেনে টিকিট হয়েছে?”

“দার্জিলিং মেলে। এসি-তে করতে বলেছিলাম। প্রচুর ওয়েটিং। স্লিপার ক্লাসে আরএসি হয়েছে। আশা করি, কালকের মধ্যে কনফার্মড হয়ে যাবে।”

দীপকাকুর পরের প্রশ্ন, “কাকে দিয়েছিলেন টিকিট করতে?”

“কাছেই একটা ট্র্যাভেল এজেন্সিতে। বিনায়ক গিয়ে টিকিট নিয়ে এসেছে।” বলে, টিকিট দুটো দীপকাকুর দিকে বাড়িয়ে দেন অপরাজিতা দেবী।

টিকিট দেখতে দেখতে দীপকাকু বললেন, “বিনায়ক তো জেনে গেল আপনি শিলিগুড়ি যাচ্ছেন!”

“ও আমার অনেক দিনের লোক। কাউকে কিছু বলবে না। বারণ করা আছে। বেশ আস্থার সঙ্গে কথাটা বললেন অপরাজিতা দেবী।

উত্তরে দীপকাকু বললেন, “আপনি বোধহয় কাজের লোকেদের উপর বেশিই বিশ্বাস করেন। যে-কারণে আমাকে না জানিয়ে রঘুর ছুটি মঞ্জুর করে দিয়েছেন।”

সঙ্গে সঙ্গে অপরাজিতা দেবীর মুখে অপরাধী ভাব ফুটে ওঠে। বললেন, “সত্যি আমার খুব ভুল হয়ে গেছে। শ্রবণা পরে বলেছে আপনারা নাকি আগেই আন্দাজ করেছিলেন রঘু পালিয়ে যাবে। আসলে কী করে ওকে অবিশ্বাস করি বলুন তো? বাইরের সব কাজ, এমনকী ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলা, সব রঘুকে দিয়েই করাতাম।” একটু থেমে অপরাজিতা দেবী আবার বললেন, “আচ্ছা, রঘু কেন পালাল, আন্দাজ করেছেন কিছু?”

দীপকাকু বললেন, “এখন বলব না। ট্রেনে যেতে যেতে বলব। তার আগে আপনার আর-এক বিশ্বস্ত লোকের সঙ্গে একটু কথা বলতে হবে। লক্ষ্মীকে একটু পাঠিয়ে দিন।”

“এক্ষুনি দিচ্ছি।” বলে, উঠে গেলেন অপরাজিতা দেবী।

সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঢুকল শ্রবণা। ঝিনুকের উদ্দেশে বলল, “শোন না একটু বাইরে।”

না গেলে খারাপ দেখায়। যতই হোক, বন্ধু। বাধ্য হয়ে উঠতে হল ঝিনুককে। শ্রবণার পিছু পিছু বারান্দায় আসার সময় দেখল, কাঁচুমাচু মুখে লক্ষ্মীমাসি সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছে। ইস, এই জেরা পর্বটা অজানা থেকে যাবে, ভেবে আক্ষেপ হয় ঝিনুকের।

বারান্দায় এসে শ্রবণা প্রথমেই জিজ্ঞেস করে, “হ্যাঁ রে, কেসটার কতদূর কী সমাধা করলেন তোর দীপকাকু?”

আর একটু হলে আগামীকাল শিলিগুড়ি যাওয়ার প্রোগ্রামটা বলে ফেলতে যাচ্ছিল, খেয়াল পড়ে অপরাজিতা দেবীর কথা, উনি এখনও বাড়ির কাউকে কিছু বলেননি। ঢোক গিলে ঝিনুক বলল, “আশা করি দু’-একদিনের মধ্যেই কিছু একটা রেজ়াল্ট পাওয়া যাবে।”

“তাই যেন হয় বাবা! দিদার বাড়িটা আমার কাছে কত শান্তির জায়গা ছিল বল তো! দিব্যি ছুটি কাটাতে আসতাম। কী বিচ্ছিরি সব ঘটনা ঘটতে লেগেছে!”

শ্রবণার কথা শুনে বোঝা যাচ্ছে একটু যেন ভরসা পেয়েছে দীপকাকুর তদন্তে। ভরসাটা কী কারণে এসেছে, পরের প্রশ্নে তা বোঝা গেল, “আচ্ছা, রঘু যে কেটে পড়বে তোরা কী করে জানলি? ও-ই কি মেন কালপ্রিট? নাকি ওকে দিয়ে অন্য কেউ এসব করাচ্ছে?”

উত্তরে ঝিনুক গম্ভীরভাবে বলল, “এখনই সেটা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে রঘু যে সুবিধের লোক নয়, সেটা স্পষ্ট।”

“কীভাবে বুঝলি?” অপার কৌতূহলে জানতে চায় শ্রবণা।

এবার আর নিজেকে সংযত করতে পারে না ঝিনুক, এখনও তার বীরত্বের কথা কাউকে ভালভাবে জানানো হয়নি। পেট ফুলছে। বন্ধুদের কাছে এসব গল্প করার মজাই আলাদা। রঘুকে চেজ়িং-এর ঘটনাটা বলতে শুরু করে ঝিনুক। বিস্ময়ে শ্রবণার চোখ বড় বড় হয়ে যায়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ড্রয়িং থেকে বেরিয়ে আসে লক্ষ্মীমাসি। তার মানে জেরা শেষ। ঝিনুক ঘরে ফিরতে গিয়ে দেখে অপরাজিতা দেবীও ড্রয়িংয়ে ঢুকলেন।

অপরাজিতা দেবীকে দেখে দীপকাকু বললেন, “আপনাকে আর একটু কষ্ট দেব। গয়নাগুলো, আগের চিঠি দুটো আর সেই সব দলিল-দস্তাবেজ, যা আপনার মনে হয়েছে মূল্যবান হলেও হতে পারে, সবকিছু দেখতে চাই। ওগুলো দেখার সময় কেউ যেন এই ঘরে না আসে, আপনিও না।”

.

অপরাজিতা দেবীর কাছ থেকে আজকের মতো বিদায় নিয়ে ঝিনুকরা আবার গাড়িতে। বাড়ির রাস্তা ধরেছে আশুদা। দীপকাকু ভীষণভাবে কী যেন ভেবে যাচ্ছেন! চোখ বন্ধ। হাতের তালুতে থুতনি। ভাবনার অবশ্য অনেক রসদই পেয়েছেন অপরাজিতা দেবীর দেখানো জিনিসগুলো থেকে। সোনার দু’-তিনরকম হার। বিভিন্ন পাথর বসানো আংটি। মুক্তোর মালা। সোনার উপর পাথর বসানো কোমরবন্ধটা পরীক্ষা করতে করতে দীপকাকু বললেন, “এটা রুপোর উপর জল করা। পাথরগুলো আসল।”

কথামতো পরীক্ষা চলার সময় ওই বাড়ির কেউ ঘরে ছিল না। পুরনো দলিলগুলো যত্ন করে খুলে দেখলেন দীপকাকু। সব মিলিয়ে প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিট টাইম লাগল। তারপর থেকে দীপকাকু একটা কি দুটো কথা বলেছেন। এই মৌন অবস্থা আর কতক্ষণ চলবে, কে জানে!

ঝিনুকের ভাবনার মাঝে নড়েচড়ে বসলেন দীপকাকু। পকেট থেকে সেলফোন বের করে সুইচ টিপতে থাকলেন। ফোন কানে তুলে খানিক অপেক্ষার পর হতাশ হয়ে বললেন, “নাঃ, এখনও চালু করেনি!”

কিছু না বুঝে দীপকাকুর দিকে তাকিয়ে থাকে ঝিনুক। দীপকাকু বললেন, “যে নম্বরে ফোন করেছিল রঘু, কানেকশনটা এখনও চালু করেনি। লোকটাকে আমার ভীষণ দরকার।”

হঠাৎ আবার সেই লোকটার খোঁজ কেন, ধরতে পারে না ঝিনুক। দীপকাকু নিজের মনেই বলে ওঠেন, “অঙ্কটা মিলেও মিলছে না। রঘুব্যাটাই শুধু গরমিল।”

ফের খানিকক্ষণ নীরবতা। ঝিনুকরা রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশনের কাছে পৌঁছে গেছে। আর একটু পরেই বাড়ি। দীপকাকু পকেট থেকে ছোট্ট একটা চিরকুট বের করলেন, ফোন নম্বর আর কীসব লেখা। চিরকুটের নম্বর দেখে ফের ফোন করলেন। এবার অপর প্রান্ত সাড়া দিল। দীপকাকু বললেন, “হ্যালো, আমি কি সৌগত ভট্টাচার্যর সঙ্গে কথা বলছি?”

“ইমপ্রেশন সাইবার কাফে তো আপনার, আমার একটা কাজ করে দিতে হবে। একপাতা বাংলা টাইপ করাব আমি। আজ রাত দশটার মধ্যে দিতে পারবেন?”

“কী ফন্ট ইউজ হয় আপনার? বিদিশা? কেন, দুর্গা হবে না?”

“ঠিক আছে, বিদিশাতেই করে দেবেন। আমি আধঘণ্টার মধ্যে পৌঁছচ্ছি।” বলে, সজোরে ফোনের সুইচ অফ করলেন দীপকাকু। একই সঙ্গে প্রবল উচ্ছ্বাসে বলে উঠলেন, “আই হ্যাভ ডান ইট। সেম ভয়েস।”

ঝিনুক কিন্তু সেই অগাধ জলে। একটা জিনিস বুঝতে পারছে, দীপকাকু ফোন করেছিলেন রঞ্জনবাবুর দেওয়া সেই সাইবার কাফের ঠিকানায়। যে অ্যাড্রেসে রাজেশ সাংভির নামে ফোনের কানেকশন নেওয়া ছিল। ওই ফোনেই যোগাযোগ করেছিল রঘু। কিন্তু দীপকাকুর উচ্ছ্বাসের কারণটা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। ফোনের আসল মালিককে তো পাওয়া যায়নি। ঠিকানা ভুল। তা হলে? ঝিনুক ঘুরিয়ে দীপকাকুকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি সত্যিই কি এখন বাংলা টাইপ করাতে যাবেন নাকি? আমাদের পাড়াতেও একজন টাইপ করে দেয়। তবে কী ফন্ট ইউজ করে জানি না।”

ঝিনুকের কথার ধার দিয়েই গেলেন না দীপকাকু। আত্মগতভাবে বলতে লাগলেন, “অপরাজিতা দেবীকে দেওয়া তিন নম্বর চিঠিটা অন্য কেউ দিয়েছে। ওই একটা চিঠির ফন্ট আলাদা। বাকি সব চিঠি, এমনকী জয়ন্ত মিত্রর চিঠিটাও দুর্গা ফন্টে ছাপা। নানান সম্ভাবনার কথা ভাবতে ভাবতে, এখন অবধি আমাদের তদন্তের সমস্ত খুঁটিনাটি বিচার করতে গিয়ে খেয়াল পড়ল, রঞ্জনের কাছে শোনা সাইবার কাফেটার কথা, যেখানে তৃতীয় চিঠি প্রিন্ট হলেও হতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল, রঘু ফোন করে পালানোর পর আমি যখন রিডায়াল করি, একজন বাঙালি কথা বলেছিল, রাজেশ সাংভি নামে কোনও অবাঙালি নয়। এখন ইমপ্রেশনে ফোন করতে দেখি, সেই একই গলা। মানে সৌগত ভট্টাচার্যর। অতএব যা দাঁড়াল, রাজেশ সাংভির নামে নেওয়া কানেকশনটা সৌগতরই।”

“অন্য নামে কানেকশন নেওয়ার কারণ?” জানতে চাইল ঝিনুক।

“সম্ভবত গোপন কাজকর্ম ওই ফোনেই সারে। থার্ড চিঠিটা কোথাও গিয়ে ছাপতে চাইলে সহজে রাজি হবে না।”

দীপকাকুর কথার পিঠে ঝিনুক বলল, “সৌগত ভট্টাচার্য গোপন কানেকশনের ঠিকানাটা এক রাখল কেন? মিথ্যে অ্যাড্রেস দিয়ে রাখতে পারত।”

একটু যেন সহানুভূতির সুরে দীপকাকু বললেন, “খুবই অ্যামেচার অপরাধী। সদ্য লাইনে এসেছে। তাই এত অসতর্ক।”

এবার ঝিনুক গম্ভীর হয়ে যায়। একটু ভেবে নিয়ে বলে, “তা হলে যা বোঝা গেল, রঘু তিন নম্বর হুমকির চিঠিটা দিয়েছে এবং মূল অপরাধীর সঙ্গে রঘু নেই। সুযোগ বুঝে দাঁও মারতে চাইছিল। কিন্তু কোথায় যেন একটু খটকা লাগছে!”

“কোথায়?” উদাসভাবে জানতে চাইলেন দীপকাকু।

“রঘু কি অত ভাল বাংলা লিখতে পারে?”

ঝিনুকের মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে দীপকাকু বললেন, “মাথাটা বেশ খুলেছে দেখছি!”

পরের কথায় আর যাওয়া গেল না। বাড়ি পৌঁছে গেছে ঝিনুকরা। এখন প্ৰধান কাজ, শিলিগুড়ি যাওয়ার ব্যাপারে মায়ের থেকে পারমিশন বের করা।