ফন্দিবাজ বন্দি – ১

খাম থেকে চিঠিটা বের করে ঝিনুকের দিকে এগিয়ে দিলেন দীপকাকু। বললেন, “পড়ো। কী কী মনে হচ্ছে বলো।” বেতের সিঙ্গল সোফায় বসে থাকা ঝিনুক কপাল কুঁচকে চিঠিটা নিল। স্ট্যাম্পমারা খাম দেখে বোঝা গিয়েছে পোস্টে এসেছে। ডেট দশদিন পিছনের। ঝিনুক পড়তে থাকল—

মাননীয় শ্রীদীপঙ্কর বাগচী,

একটি বিশেষ অনুরোধ নিয়ে আমার এই চিঠি। দু’মাস হল পিতৃহারা হয়েছি। সংসারের আর্থিক অবস্থা ভাল নয়। তবু আপনার মতো একজন ডিটেকটিভের (কৃতী এবং মহার্ঘ) শরণাপন্ন হওয়ার কারণ, সম্প্রতি এক অচেনা ব্যক্তি আমাদের বাড়িতে এসে এমন কিছু তথ্য দিয়েছেন, যার থেকে ধারণা হয়, আমার বাবার সুইসাইডের পিছনে এক বা একাধিক মানুষের প্ররোচনা ছিল। যেহেতু বেশ কিছুটা সময় চলে গিয়েছে এবং সূত্রগুলো এত আন্দাজ-নির্ভর, পুলিশ নতুন করে এই রহস্য উদ্ঘাটনে নামবে না। সাধারণ কোনও গোয়েন্দার পক্ষেও এর জট খোলা কঠিন। অগত্যা আপনার দ্বারস্থ হয়েছি। যদি অনুগ্রহ করে অগ্রিম কোনও টাকা ছাড়াই কেসটার দায়িত্ব আপনি নেন, বাধিত হই। যখনই সামর্থ্য হবে, আপনার আর্থিক ঋণ অবশ্যই শোধ করব আর কৃতজ্ঞতায় হয়ে থাকব চিরঋণী।

জানি বাবাকে ফেরত পাব না। তবু তাঁর ভাবমূর্তি কালিমা-মুক্ত হবে। নমস্কার নেবেন।

বিনীত সূর্যেন্দু সোম

পুনঃ: উত্তরের প্রার্থনায় ফোন নম্বর দিলাম **********।

চিঠিটা খুঁটিয়ে পড়ে মুখ তুলল ঝিনুক। স্টাডির চেয়ারটা টেবিলের সামনে থেকে ঘুরিয়ে মুখোমুখি বসে আছেন দীপকাকু, ভ্রুভঙ্গিতে জানতে চাইলেন, “কী বুঝলে?”

ঝিনুক মনে মনে পয়েন্টগুলো গুছিয়ে নিতে থাকল। দীপকাকুর সঙ্গে আজকের সাক্ষাৎপর্বটা ঘটেছে বাঁশদ্রোণী পিরপুকুর অর্থাৎ দীপকাকুর বাড়িতে। দিনটা ডায়েরিতে লিখে রাখার মতো। এর আগে সবক’টা কেসে ঝিনুককে উপযাচক হয়ে দীপকাকুর অ্যাসিস্ট্যান্ট হতে হয়েছে। এই প্রথমবার দীপকাকু ফোন করেছিলেন বাড়িতে। বাবাকে বলেছেন, “রজতদা, ঝিনুক যদি ফ্রি থাকে, সকালের দিকে পাঠিয়ে দিন তো। একটা কেস এসেছে।”

বাবা আগ্রহী হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, “আমিও যাব নাকি ওর সঙ্গে?”

“আসতে পারেন। না এলেও চলে।” বলেছিলেন দীপকাকু।

ফোনের খবরটা ঝিনুককে দিয়ে বাবা বললেন, “নাঃ, তুই একাই যা, বুঝলি তোরা দু’জনে মিলে এখন একটা ইউনিট হিসেবে কাজ করছিস। সেখানে আমার অযথা হাজির না থাকাই ভাল। যখন দরকার পড়বে দীপঙ্কর নিজেই ডেকে নেবে আমাকে।”

বাবার থেকে পারমিশন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির মধ্যে ছোটখাটো ঘূর্ণিঝড় তুলে ফেলল ঝিনুক। ড্রেসআপ করা, নোটবুক-পেন নেওয়া, বাবার থেকে অল্পবিস্তর পকেটমানি…। এসবের ফাঁকে মা বোধহয় দু’-চারবার বললেন, “ওরে, ব্রেকফাস্টটা করে যা। কখন কোন পরিস্থিতিতে পড়বি…!”

কথা কানে নেয়নি ঝিনুক। বাবা গাড়ি রেডি রাখতে বলেছিলেন আশুদাকে। যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি আশুদা পৌঁছে দিয়েছে দীপকাকুর বাড়ি। আসার পর কোনও ভূমিকা ছাড়াই দীপকাকু ঠিকানা লেখা খাম থেকে চিঠিটা বের করে পড়তে দিলেন। পড়ে মনে হল কেসটা ওজনে বেশ ভারী। এদিকে দীপকাকুর ফিজ পাওয়ার কোনও নিশ্চয়তা নেই। এরকম শর্তে কি কাজটা নিতে রাজি হবেন? গোয়েন্দাগিরিটা দীপকাকুর শখ নয়, প্রফেশন।

“কী হল বলো? চিঠিটা পড়ে কী মনে হচ্ছে?” তাড়া দিলেন দীপকাকু।

যে-সব ভাবনা এখন খেলে বেড়াচ্ছে ঝিনুকের মাথায়, তা দিয়ে চিঠির গভীরে থাকা কোনও তাৎপর্য বের করা যাবে না। পত্রলেখকের অসহায়তা অনুভব করে ঝিনুক বলল, “মনে তো হচ্ছে ভদ্রলোকের আর্থিক সংগতি সত্যিই কম। আপনাকে অ্যাফোর্ড করার ক্ষমতা নেই। অথচ ওঁর বাবা যে অপবাদ মাথায় নিয়ে মারা গিয়েছেন, সেটাও মেনে নিতে পারছেন না। বাবার মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সমাজ, পরিজনের কাছে ওঁদের পরিবারের একটা গুডউইল ছিল। রেপুটেশন নষ্ট হওয়ায় খুবই লজ্জায় দিন কাটাচ্ছেন ওঁরা।”

“ভেরি গুড! আরও কয়েকটা সম্ভাবনার কথা বলো।” বললেন দীপকাকু।

“আর কী বলি?” বলে, ভাবতে থাকল ঝিনুক

কাজের মাসি দু’বাটি মুড়ি নিয়ে এল। ঝিনুক জানে, মুড়ির উপর আলুর সাদা তরকারি অথবা ভেজানো ছোলা থাকবে। এ বাড়ির পেটেন্ট ব্রেকফাস্ট। কাজের মাসি আর দীপকাকু, দু’জনেরই দেশের বাড়ি মেদিনীপুরের একই গ্রামে। মায়ের হাতের ডিলিশিয়াস জলখাবার ফেলে ঝিনুক কাজের আগ্রহে সাদামাটা খাবার সোনামুখ করে খেয়ে নেবে, দীপকাকু এটা আদৌ কতটা কাউন্ট করেন, কে জানে!

আজ মেনুতে ছোলা। একমুঠো মুড়ি-ছোলা তুলে নিয়ে ঝিনুক ফিরে গেল চিঠির প্রসঙ্গে। খেতে খেতে বলল, “ভদ্রলোকের ভাষা ব্যবহার দেখে মনে হচ্ছে আর্টস নিয়ে পড়েছেন। যদি না পড়ে থাকেন, তা হলে বলতে হবে বাড়ির পরিবেশে সাবেকি বাঙালিয়ানা আছে।”

“বাঃ, ফাইন অবজারভেশন!” মুড়ি চিবোতে চিবোতে তারিফ করলেন দীপকাকু। পায়ের উপর পা তুলে বসলেন, হাঁটুর উপর রাখা পা-টা তেড়ে নাচাচ্ছেন।

ঝিনুকের সঠিক পর্যবেক্ষণে উত্তেজিত হলেন, নাকি মাথায় ঘুরছে অন্য কিছু? পরিস্থিতি নিজের পক্ষে ধরে নিয়ে ঝিনুক উৎসাহের সঙ্গে ফের শুরু করল, “ভদ্রলোকের ভাষায় সৌজন্য যেমন প্রকাশ পেয়েছে, একই সঙ্গে বোঝা যাচ্ছে উনি যথেষ্ট আত্মাভিমানী।”

“কীরকম?” বিষয়টা ভেঙে বুঝতে চাইলেন দীপকাকু। নড়া পা এখন থেমে গিয়েছে।

ঝিনুক বলল, “চিঠি না পাঠিয়ে, ফোনে আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারতেন। মুখের উপর যদি ‘না’ শুনতে হয়, সেই অপমানটা এড়াতেই চিঠি লিখেছেন। এবার যদি কোনও সাড়া না দেন, উনি ধরে নেবেন আপনি কেসটা নিতে অপারগ।”

“তোমার কী মত, কেসটা আমার নেওয়া উচিত?” প্রশ্নটা করে একগাল মুড়ি মুখে পুরলেন দীপকাকু।

ঝিনুক খানিক বিব্রত হয়ে পড়ল। বলল, “এ ব্যাপারে আমি কী মতামত দেব? কাজ নেওয়ার শর্তগুলো একান্তই আপনার ব্যক্তিগত বিষয়।”

কথা শেষ হতেই দীপকাকু বললেন, “আচ্ছা ধরো, ভদ্রলোক তো সত্যি না-ও বলতে পারেন। ভান করছেন দারিদ্রের। অল্প টাকায় কাজ করিয়ে নেওয়ার মতলব।”

থতমত খেল ঝিনুক। হ্যাঁ, এদিকটাও তার ভাবা উচিত ছিল।

দীপকাকু ফের বললেন, “কারও পোশাক, আচার-ব্যবহার দেখেই তার সম্পর্কে আগাম ধারণা করে নেওয়া বোকামি। ডিটেকটিভদের তো একেবারেই চলবে না। আর চিঠিকে তো কিছুতেই বিশ্বাস করা ঠিক নয়। অন্য কাউকে দিয়েও লেখানো যায়।”

ঢোক গিলতে গিয়ে ঝিনুক দেখল, মুড়ি খাওয়া গলা বড্ড শুকিয়ে গিয়েছে। জলের বোতল চেয়ারের পাশে রেখে গিয়েছে কাজের মাসি। বোতল তুলে জল খেল ঝিনুক। ভাবল, চিঠিটা যদি এতই সন্দেহের চোখে দেখেন দীপকাকু, খামোখা ঝিনুককে ডেকে পাঠানো কেন?

বোতলটা মেঝেয় নামাতে গেল ঝিনুক, চেয়ে নিলেন দীপকাকু। জল গলায় ঢালার আগে বললেন, “চিঠিটায় সত্যি কথাই লেখা আছে।” আবার হোঁচট। ঝিনুক হাঁ করে তাকিয়ে থাকল।

জল খেয়ে বোতল নামিয়ে দীপকাকু বললেন, “চিঠিতে সাধারণ গোয়েন্দার তুলনায় আমাকে উপরে স্থান দেওয়া হয়েছে। এরকম ধারণা যে পোষণ করে, সে নিজের বিষয়ে সহজে কিছু গোপন করবে না। সে নিশ্চিত করে জানে, কাজে নামলে আমি তার ফাঁকিটাও ধরে ফেলব।”

হাঁ মুখটা বন্ধ হল ঝিনুকের। ভাবনা থেমে গিয়ে কথা আসছে না মুখে। দীপকাকু শুরু করলেন, “তা হলে কী দাঁড়াল? তুমিও বিশ্বাস করছ চিঠির আবেদনকে, আমিও করছি। তুমি চিঠির ভাষায় প্রভাবিত হয়ে করছ, আমি অ্যাকসেপ্ট করছি যুক্তি দিয়ে। রহস্য অনুসন্ধানকারীর কাছে যুক্তিটাই প্রধান। এখানে আবেগের কোনও স্থান নেই।”

এতক্ষণ যা আলাপ-আলোচনা হল, নিছকই মগজের ব্যায়াম। দীপকাকু নিজেও করলেন, ঝিনুককেও করালেন। রহস্যের তদন্ত যারা করে, নিয়মিত এই ব্যায়াম করা জরুরি। দুটো কেসের মাঝে বড় গ্যাপ পড়ে গেলে, বুদ্ধিতে মরচে ধরে যাওয়ার চান্স থাকে। ঝিনুকের ক্ষেত্রে সেটাই হয়। কারণ, দীপকাকু সব তদন্তে ঝিনুককে অ্যাসিস্ট করতে নেন না।

ডোরবেল বেজে উঠল। ভাবনায় ডুবে থাকার কারণে অল্প চমকে উঠল ঝিনুক। দীপকাকু বললেন, “যাও, দরজাটা খোলো। মনে হচ্ছে সূর্যেন্দু সোম এলেন।”

ভীষণ অবাক হয়ে চেয়ার ছাড়ল ঝিনুক। দরজার দিকে যাওয়ার সময় সপ্ৰশ্ন দৃষ্টিতে দীপকাকুর দিকে তাকাল।

ঘাড় নেড়ে দীপকাকু বললেন, “হ্যাঁ, আমিই ডেকে পাঠিয়েছি। কেসটা নেব কি না, সব শুনে ঠিক করব।”

দরজা খোলার পর ঝিনুক যাঁকে দেখল, ওর কল্পনার সঙ্গে মেলে না। চিঠি পড়ে মনে হয়েছিল নিরীহ, গোবেচারা চেহারার কেউ হবেন। এই ভদ্রলোক ওয়েল ড্রেসড, কাঁধে চামড়ার ব্যাগ, চোখে লেটেস্ট ফ্রেমের চশমা। ক্লিন শেভেন।

“মি. বাগচী আছেন?” জানতে চাইলেন ভদ্রলোক। বয়স তিরিশের খানিকটা নীচেই হবে। দীপকাকুর চেয়ে কয়েক বছরের ছোট। ইনিই সেই লোক কিনা সন্দেহ হওয়ায় ঝিনুক বলল, “আপনি?”

“আমি সূর্যেন্দু। মি. বাগচীর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা ছিল।”

“আসুন। উনি আছেন।” বলে, ভদ্রলোককে ডেকে নিল ঝিনুক।

জুতো খুলে ঘরে ঢুকে সূর্যেন্দুবাবু একটু থমকালেন, যার প্রধান কারণ, বাইরে এখন ঝলমলে রোদ, ঘরের আলোর সঙ্গে চোখ সইয়ে নিচ্ছেন। দ্বিতীয় ধন্ধটা হল দীপকাকুর গৃহসজ্জা। দীপকাকুর অনেক গুণগান শুনে এসেছেন, আশা করেননি এরকম একজন নামী গোয়েন্দার এত সাধারণ বাসস্থান হবে।

ঝিনুক পা চালিয়ে খাটের কাছ থেকে মোড়াটা নিয়ে এল। দীপকাকু অফিসটা মডার্ন করে ফেললেও, নিজেকে এবং এই বিশাল ঘরটার এতটুকু বদল ঘটাননি। ভদ্রলোককে অফিসে না ডেকে এখানেই-বা কেন ডাকলেন, বুঝতে পারছে না ঝিনুক!

দীপকাকুকে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন সূর্যেন্দু। বেতের চেয়ারটা দেখিয়ে দীপকাকু বললেন, “বসুন।”

চেয়ারে বসে কাঁধের ব্যাগটা মেঝেয় নামিয়ে রাখলেন সূর্যেন্দু সোম। পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছলেন। ঝিনুক গেল রান্নাঘরে, ক্লায়েন্টের জন্য চা বলতে। ফিরল কাচের গ্লাসে জল নিয়ে। রোদে তেতেপুড়ে এসেছেন ভদ্রলোক।

কথা এখনও শুরু হয়নি। চশমার আড়াল থেকে দীপকাকু আপাদমস্তক মেপে যাচ্ছেন সূর্যেন্দু সোমকে। খানিকটা দ্বিধাগ্রস্তভাবে সোমও চেয়ে রয়েছেন দীপকাকুর দিকে। এরকম আদ্যিকালের চেহারার গোয়েন্দাকে দেখবেন, আশা করেননি নিশ্চয়ই! দীপকাকুর পরনে এখন হাফহাতা পাঞ্জাবি, পাজামা। মোটা কাচের ওল্ড ফ্রেমের চশমা। আর চুল আঁচড়ানো ভুলে যাওয়া তো দীপকাকুর মুদ্রাদোষ।

তেষ্টা পেয়েছিল সূর্যেন্দুবাবুর। ঝিনুক জলটা এগিয়ে দিতে এক চুমুকে শেষ করলেন। গ্লাস ফেরত দিয়ে বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ!”

সৌজন্যের হাসি হেসে ঝিনুক মোড়ায় গিয়ে বসল। গ্লাস নামিয়ে রাখল নীচে। সূর্যেন্দু অনুমতি চাইলেন দীপকাকুর কাছে, “আমার ব্যাপারটা তা হলে বলি?”

“বলুন প্লিজ!” বললেন দীপকাকু।

ঝিনুক পেন, নোটবুক বের করে রেডি হল। সূর্যেন্দুবাবু বলতে শুরু করলেন, “আমার বাবা অনিমেষ সোম অত্যন্ত সৎ এবং কর্মনিষ্ঠ মানুষ ছিলেন। কারও সঙ্গে কোনও ধরনের শত্রুতা ছিল না। চাকরি করতেন প্রাইভেট ফার্মে, জয়সওয়াল টি কোম্পানিতে। অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টের হেড ছিলেন। স্যালারি খুব বড় অঙ্কের না হলেও, আমাদের সংসার চলে যেত স্বাচ্ছন্দ্যে। ছাত্রবয়সে অভাবটা কখনওই সেভাবে টের পাইনি। বোন আর আমি সবরকম সুযোগসুবিধে পেয়ে গ্র্যাজুয়েশন করি। আমার অনার্স ছিল।”

পেন থামিয়ে ঝিনুক জিজ্ঞেস করল, “কোন সাবজেক্টে?

আসলে চান্সটা হাতছাড়া করতে চাইল না ঝিনুক, আন্দাজটা মেলে কি না দেখা যাক।

মিলল না। সূর্যেন্দু বললেন, “কমার্স।” উত্তর দিয়েও ঝিনুকের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন, প্রশ্নটা টিচারসুলভ, করল একজন স্টুডেন্ট বয়সি!

প্রয়োজনের তাগিদে সূর্যেন্দু চোখ ফেরালেন দীপকাকুর দিকে। বলতে শুরু করলেন, “আমি যখন মাস্টার্সে ভরতি হয়েছি, মায়ের একটা বড় রোগ ধরা পড়ল। অনেক চিকিৎসা করেও অপারেশন এড়ানো গেল না। মুম্বই নিয়ে যেতে হয়েছিল। আর্থিকভাবে বাবা বেশ খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়লেন। বাধ্য হয়ে পড়া ছেড়ে আমাকে চাকরিতে ঢুকতে হল।”

“তখন থেকেই কি মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের কাজ করছেন?”

প্রশ্নটা করে দীপকাকু নিজের ভারী চশমাটা খুললেন। মুখের ভাপ দিলেন কাচে। পাঞ্জাবির খুঁটে মুছতে থাকলেন। সূর্যেন্দু পুরোপুরি থ বনে গিয়েছেন। সবিস্ময়ে জানতে চাইলেন, “আপনি কী করে জানলেন আমার প্রফেশন? চিঠিতে তো লিখিনি! আপনি যখন ফোন করে ডাকলেন, তখনও বলিনি!”

চশমাটা পরে দীপকাকু বললেন, “আপনার প্রফেশনের লোকেদের ব্যাগ দেখলে মোটামুটি আন্দাজ করা যায়। শিয়োর হলাম পকেটের পেন আর নোটবুক দেখে। দুটোতেই প্রোডাক্টের নাম লেখা। পাতলা জামার কারণে নোটবুকের লেখাটা ভালই পড়া যাচ্ছে। ওষুধের স্যাম্পেল বোঝাই ব্যাগটা বেশ ভারী, আপনি হেলে ছিলেন। কাচের বোতলে ভরা ওষুধও আছে নিশ্চয়ই। আর-একটা লক্ষণ, প্রচুর ডাক্তারের চেম্বারে যেতে হয়, বারেবারে খুলতে হয় জুতো। ফিতে আলগা রাখেন তাই। দেখলাম, পায়ের সাহায্যে অভ্যস্তভাবে জুতো খুলে ফেললেন। এ ছাড়াও জুতোর চেহারায় লেগে রয়েছে পথশ্রমের স্পষ্ট ছাপ।”

বিস্ময়টা ঝিনুকের দিকে ফিরে শেয়ার করতে চাইলেন সূর্যেন্দু। ঝিনুক এমনভাবে হাসল, যার মানে দাঁড়ায়, এই তো সবে শুরু!

দীপকাকু সংযোজন করলেন, “তবু ভাল, আপনাদের কোম্পানি টাই পরাটা বাধ্যতামূলক করেনি। কোম্পানিটা তেমন হাইফাই নয়।”

“একেবারেই ছোটখাটো কোম্পানি। আমার তো বায়োলজি ছিল না, ফোর্সফুলি এই লাইনে ঢুকেছি। প্রথম দিকে টুকটাক সেল্স-এর কাজ করতাম।” বলে, সূর্যেন্দু ফিরে গেলেন আগের প্রসঙ্গে, “তো যা বলছিলাম, মায়ের অপারেশনের পর মাসচারেক কাটতে না-কাটতেই সংসারে নেমে এল আর-এক বিপর্যয়। চাকরি গেল বাবার। লস খেয়ে কোম্পানিই পাততাড়ি গোটাল। অফিস থেকে বাবা হাতে সামান্যই টাকা পেলেন। যে মানুষটি অফিস ছাড়া বাকি সময়টা পড়াশোনা নিয়ে কাটাতেন, সবকিছু মাথায় উঠল। পাগলের মতো যে-কোনও একটা কাজের চেষ্টায় এখানে-ওখানে ঘুরতে লাগলেন। হাতে সংসার চালানোর টাকা নেই, বোনেরও বিয়ের বয়স হয়েছে। আমার রোজগার তখন অতি সামান্য। বোন খুব ভাল গান গাইত। গান শিখত এক নামী শিল্পীর কাছে। সে-সব বন্ধ হল। যে দামি ওষুধটা মায়ের রোজ একটা করে খাওয়ার কথা, আমাদের লুকিয়ে মা এক-দু’দিন না খেয়ে টাকা বাঁচাতেন। এভাবেই জীবনের সঙ্গে মরিয়া লড়াই চালাচ্ছিলাম আমরা।”

থামতে হল সূর্যেন্দুবাবুকে। দু’মগ চা নিয়ে ঢুকল কাজের মাসি। সূর্যেন্দু, দীপকাকু নিলেন। ঝিনুক চা খায় না।

চায়ে চুমুক দিয়ে সূর্যেন্দু ফের বলতে শুরু করলেন, “অনেক ঘোরাঘুরির পর বাবা ঠিক করলেন, ব্যাবসায় নামবেন। এ ব্যাপারে তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন কিছু শুভানুধ্যায়ী বন্ধু। অফিসের কাজের সূত্রে তাঁদের সঙ্গে বাবার আলাপ ছিল। তাঁরা বলেছিলেন, আপনি যখন অ্যাকাউন্টস, ট্যাক্সের ব্যাপারটা এত ভাল বোঝেন, প্র্যাকটিসিং লাইসেন্স বের করে নিজেই একটা কনসালটেন্ট ফার্ম খুলুন। আপনাকে আমাদের চেনাজানা লোক, কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেব। আপনি তাদের ইনকাম ট্যাক্স, সেল্স ট্যাক্স-এর ব্যাপারটা দেখাশোনা করবেন। পরামর্শটা মনে ধরেছিল বাবার। কয়েক মাস ট্রেনিং নিলেন ইনকাম ট্যাক্স অফিস থেকে। লাইসেন্স পেলেন। মধ্যবয়স পার হয়ে-যাওয়া মানুষটির লড়াই দেখে অবাক হতাম আমরা। আনন্দ পালিত রোডে অফিসঘর ভাড়া নিয়ে বিজনেস শুরু করলেন বাবা। কোম্পানির নাম দিলেন ‘এটিসি’।”

দীপকাকু বলে উঠলেন, “অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ট্যাক্স কনসালটেন্ট। অ্যাব্রিভিয়েট করলে তো তাই দাঁড়ায়?”

“ইয়েস।” সমর্থন জানিয়ে সূর্যেন্দু বলতে শুরু করলেন, “অফিস থেকে পাওয়া ওই অল্প ক’টা টাকা বিজনেসে ঢাললেন বাবা। বলা যেতে পারে, ওটাই ছিল বাবার লাস্ট ড্রাইভ। কিন্তু…”

“এক মিনিট।” হাত তুলে থামালেন দীপকাকু। জানতে চাইলেন, “আপনাদের বাড়ি কোথায়?”

“নারকেলডাঙা নর্থে, নিজেদের বাড়ি। ঠাকুরদা করে গিয়েছিলেন।”

“ওকে। এবার বলুন।”

চায়ে এক সিপ মেরে বলতে শুরু করলেন সূর্যেন্দু, “বাবার ব্যাবসা চলল না। যেমনটা আশা করেছিলেন, তার টেন পারসেন্টও ক্লায়েন্ট এল না। খুবই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন, সঙ্গে অস্থির ভাব। তবে এই অবস্থা বেশিদিন চলল না। হঠাৎই একদিন বাড়িতে এসে জানালেন, এক কলেজ সহপাঠীর সঙ্গে দেখা হয়েছে রাস্তায়। তিনি নাকি বাবাকে একটা বিজনেসের আইডিয়া দিয়েছেন। ব্যাবসাটা শুরু হবে বাবার ওই অফিসঘরেই, পার্টনারশিপে।”

“কীসের বিজনেস?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

ঝিনুক যথারীতি প্রয়োজনীয় পয়েন্টগুলো নোট করে যাচ্ছে।

সূর্যেন্দু বললেন, “ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি খুললেন।”

“গোল্ডেন ইনভেস্টমেন্ট। ১৬ই/১, আনন্দ পালিত রোড, কলকাতা-৭০০০১৪।” বলে, দীপকাকু চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলেন। চা শেষ করেছেন, এবার সিগারেট ধরাবেন।

সূর্যেন্দু বললেন, “খবরটা আপনি জানেন?”

টেবিল থেকে সিগারেটের প্যাকেট তুলে দীপকাকু বললেন, “কাগজে পড়েছি। নিউজটা দু’দিনের বেশি ফলোআপ করা হয়নি।”

“কী করে হবে? মূল অভিযুক্ত আত্মহত্যা করেছেন। ইনভেস্টাররা কাকে ধরবে? পুলিশও কেসটা নিয়ে আর এগোয়নি।” বললেন সূর্যেন্দু।

সিগারেট ধরিয়ে চেয়ারে ফিরে এলেন দীপকাকু। অফার করলেন সূর্যেন্দুকে।

“নো, থ্যাঙ্কস।” বললেন উনি।

দীপকাকু জানতে চাইলেন, “আপনার বাবার সেই কলেজমেট, তিনি কেন অভিযুক্ত নন? তিনি কোথায়?”

“তাঁর কোনও ট্রেস নেই। পুলিশ খাতাপত্র ঘেঁটে দেখেছে, কোম্পানির একমাত্র মালিক অনিমেষ সোম।”

এবার দীপকাকু বেশ অবাক হলেন, “সে কী! আপনারা পুলিশকে বাবার বন্ধুর নাম বলেননি?”

“না, বলতে পারিনি। কারণ, নামটা আমরা জানি না। আমি ভেবেছি, মা জানেন। মা ধরে বসে আছেন, আমি নিশ্চয়ই জানি। এখানেই আমাদের ভীষণ বড় ভুল হয়ে গিয়েছে। এর পিছনে বাবার স্বভাবের একটা বিশেষ ভূমিকা আছে। খুব চাপা মনের মানুষ ছিলেন বাবা। কাজের জায়গার কথা বাড়িতে বড় একটা তুলতেন না। বাবার ব্যক্তিত্ব এমনই ছিল। আমি সামান্য দূরত্ব রেখেই চলতাম।” সূর্যেন্দুর বলা শেষ হতে দীপকাকু বললেন, “পার্টনারের নাম না জানুন, তাঁকে তো দেখেছেন। চেহারার বর্ণনা পুলিশকে দিতে পারতেন।”

“তাঁকে আমরা দেখিওনি।”

“মাই গড!” বলে, চুপ করে গেলেন দীপকাকু। সিগারেট পুড়ে শেষ, এবার হাতে ছ্যাঁকা লাগবে। ঝিনুক উঠে গিয়ে টেবিল থেকে অ্যাশট্রে নিয়ে এল। সেটায় সিগারেট গুঁজলেন দীপকাকু। ঘরের সবাই এখন চুপ। মাথার উপর শুধু ফ্যানের আওয়াজ।

ঝিনুক খুব অস্থির বোধ করছে। সে তো খবরটা কাগজে লক্ষ করেনি। এমন চরম সিদ্ধান্ত কেন নিলেন সূর্যেন্দুবাবুর বাবা? অ্যাশট্রে টেবিলে রেখে প্রশ্নটা করেই ফেলল সূর্যেন্দুবাবুকে, “আপনার বাবা সুইসাইড করলেন কেন?”

খালি চায়ের মগটা কোথায় রাখবেন ঠিক করতে পারছেন না সূর্যেন্দু। ঝিনুক বলল, “নীচেই রাখুন।”

চা-মগ নামিয়ে সূর্যেন্দু বললেন, “বাবার কোম্পানির ইনভেস্টাররা বলছেন, গোল্ডেন ইনভেস্টমেন্ট বিজনেস স্টার্ট করে এই বলে, আমরা ব্যাঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিটের সুদের চেয়ে ডবল দেব। দু’বছর পর দেখা যায়, ইন্টারেস্টে ডবল নয়, কোম্পানি দিচ্ছে, যে টাকা জমা দেওয়া হয়েছে তার ডবল! বেনিফিটেড ক্লায়েন্টরা আবার নতুন করে ইনভেস্ট তো করলই, ডেকে নিয়ে এল আরও অনেক কাস্টমার। সেটা প্রায় চারগুণ। পরের দু’বছরের মাথায় কোম্পানি টাকা দিতে পারছিল না। ক্লায়েন্টদের ‘আজ আসুন, কাল আসুন’ বলা হচ্ছে। এক সময় ক্লায়েন্টরা ক্ষোভে ফেটে পড়ল। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করল বাবাকে। অফিস ভাঙচুর করল। বাবার গায়ে হাতও তুলল। তখনই এক ফাঁকে পিছনের অ্যান্টিচেম্বারে গিয়ে হ্যাং হয়ে যান।”

তিনজনেই চুপ। দীপকাকু ভাড়া থাকেন দোতলায়। জানলা দিয়ে আমগাছের মাথা দেখা যাচ্ছে। একটা কোকিল ডেকে যাচ্ছে ডালে বসে। এই প্রথম কোকিলের ডাক অসহ্য লাগছে ঝিনুকের।

নীরবতা ভাঙলেন দীপকাকু। জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার বাবার অফিসে যাঁরা যাতায়াত করতেন, কেউই দেখেননি পার্টনারকে?”

“না।”

“আপনি যাননি ওই অফিসে?”

“গিয়েছিলাম। দু’বার। বাবা প্রথম যখন অফিসঘরটা নেন। আর-একবার কী একটা কাজে যেতে হয়েছিল। তখন সেকেন্ড কোম্পানিটা সবে চালু হয়েছে। অফিস বেশ সাজানো হয়েছে দেখলাম। বাবার সেই বন্ধুকে তখন দেখিনি।

“টাকাগুলো গেল কোথায়?” যেন নিজেকেই প্রশ্ন করলেন দীপকাকু।

কথাটা ধরতে না পেরে ঝিনুক বলল, “কোন টাকা?”

দীপকাকু বললেন, “এই যে সেকেন্ড টাইম, লোকে অত টাকা জমা দিল। তার কী হল?”

সূর্যেন্দু বললেন, “এই পয়েন্টটা আমরা পুলিশের কাছে তুলেছিলাম। পুলিশ বলছে, উনি হয়তো প্রাইভেট লোন দিয়ে চড়া সুদে টাকা খাটাতেন। কোনও পার্টি বড় অ্যামাউন্ট লোন নিয়ে উধাও হয়েছে। ফেঁসে গেলেন উনি।”

“আপনারাও কি তাই মনে করেন?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

সূর্যেন্দু বললেন, “বিশ্বাস করতে বেগ পেতে হয়। লোন নেওয়া বা শেয়ারে টাকা খাটানো, এসব নিয়ে বাবার ব্যক্তিগত কোনও উৎসাহ কখনও ছিল না। স্যালারি যা পেতেন সচ্ছলভাবে সংসারটা চলে যেত। বোনের বিয়ের জন্য অল্প কিছু জমাতেন। আমি যখন জেনেছিলাম বাবা বন্ধুর সাহায্যে নিজের বিজনেসের প্যাটার্ন বদলে ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি খুলছেন, অবাক হয়েছিলাম খুব!”

“এ ব্যাপারে বাবাকে কোনও প্রশ্ন করেননি?” জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু

সূর্যেন্দু বললেন, “না, করিনি। কারণ, বাবা তখন সংসার টিকিয়ে রাখার লড়াই চালাচ্ছিলেন। ব্যাবসা বাছবিচার করার সময় সেটা নয়।”

“তারপর যখন দেখলেন, বাবার দ্বিতীয় বিজনেসটা বেশ চালু হয়ে গেল, উনি নিশ্চয়ই হাত খুলে খরচাও করতেন। একবারও মনে প্রশ্ন জাগেনি, এত সহজে টাকা আসার পিছনে কোনও গন্ডগোল থাকতে পারে? নাকি অনেক দিন পর সংসারে সচ্ছলতার হাওয়া আসতে আপনারা সোর্স অফ ইনকামের দিকটা ভুলে থাকতে চেয়েছিলেন?”

দীপকাকুর কথায় ভালই খোঁচা আছে, সূর্যেন্দু গায়ে মাখলেন না। একটু অন্যমনস্ক থেকে বললেন, “বাবা কিন্তু মোটেই বেশি খরচা করতেন না। হ্যাঁ, তবে অভাব ছিল না। খুব হিসেবটিসেব করে বোনের বিয়েটাও দিয়েছিলেন। বিজনেসে যে এত টাকা লেনদেন হত, বাবা মারা যাওয়ার পর আমরা সেটা জানতে পারি।”

“হুম!” বলে, নীচের ঠোঁট উলটে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন দীপকাকু ঝিনুক জানে, এসময় দীপকাকুর মাথায় চলছে তুমুল তোলপাড়। সূর্যেন্দুবাবুর থেকে যা শুনলেন, সমস্ত সূত্র বিচার হচ্ছে এখন। মনে জমা হচ্ছে একটার পর একটা প্রশ্ন। ঝিনুক কোনও বাছাইয়ে যায়নি, দীপকাকু আর সূর্যেন্দুবাবুর কথাবার্তার ছোট থেকে ছোট পয়েন্টও লিখে নিয়েছে। দীপকাকু কখন কী জানতে চাইবেন, কোনও ঠিক নেই।

বড় একটা শ্বাস ছেড়ে ভাবনায় সাময়িক বিরতি দিলেন দীপকাকু। সূর্যেন্দুবাবুকে বললেন, “এবার সেই ব্যক্তির সম্বন্ধে বলুন, যিনি আপনাদের বাড়িতে এসে বিশেষ কিছু তথ্য দিয়েছেন।”

সূর্যেন্দুবাবু বললেন, “ঠিক তথ্য বলা যায় না, এমন একটা ঘটনা, যার থেকে ভদ্রলোকের মনে হয়েছে, কোনও রকমের জালিয়াতিই বাবার দ্বারা সম্ভব নয়।”

কথার মাঝে দীপকাকু বলে উঠলেন, “যতটা সম্ভব ডিটেলে বলবেন, ভদ্রলোক সম্বন্ধে যতটুকু জেনেছেন, বুঝেছেন, কোনও কিছুই বাদ দেবেন না।”

“ভদ্রলোকের নাম নেপাল দাস। বয়স বাবার মতোই, ষাটের একটু কম। পেশা, মার্কেটে টাকা খাটানো।

সূর্যেন্দুবাবুর কথার মাঝে ঝিনুক ভাবল, মানুষ খেটে টাকা রোজগার করে। টাকাকে খাটিয়ে যে মানুষ জীবন নির্বাহ করে, সে আর যাই হোক, গড়পড়তা লোক নয়।

সূর্যেন্দু বলে চলেছেন, “দিন দশেক হল, ভদ্রলোক এক সকালে আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। পরিচয় দিলেন গোল্ডেন ইনভেস্টমেন্ট-এর লগ্নিকারী হিসেবে। বাবা মারা যাওয়ার পর এরকম বহু ক্ষতিগ্রস্ত ইনভেস্টার আমাদের বাড়িতে এসেছেন, তাদের মনে ক্ষীণ আশা, যদি কিছু টাকা আমরা ফেরত দিতে পারি। প্রতি ক্ষেত্রে আমি যেমন হাতজোড় করে পার্টিদের বলেছি, নেপাল দাসকেও বললাম, ‘গোল্ডেন ইনভেস্টমেন্ট-এর ব্যাপারে আমরা ওয়াকিবহাল ছিলাম না। আমাদের কাছে তেমন টাকা নেই যে, আপনাদের ক্ষতি কিছুটা হলেও পূরণ করব। বাবার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট প্রায় শূন্য। পুলিশ গোটা বিষয়টা জানে। আপনারা এন্টালি থানায় গিয়ে কথা বলে দেখতে পারেন।’ এ-কথার পর কোনও পার্টিই আর তর্কাতর্কিতে যায়নি। পুলিশের নাম শুনেই গুটিয়ে গিয়েছে।”

“কেন?” প্রশ্নটা করল ঝিনুক।

সূর্যেন্দু বললেন, “বাবা আত্মহত্যা করেছিলেন ওইসব পার্টির কাছে অপমানিত হয়ে। তারা কি একা-একা গিয়ে পুলিশের খপ্পরে পড়তে চায়?”

কপালে ভাঁজ ফেলে দীপকাকু জানতে চাইলেন, “পুলিশ কি তা হলে কোনও ইনভেস্টারকেই ইন্টারোগেট করেনি?”

“করেছে বেশ কয়েকজনকে। বিভিন্ন সূত্র ধরে তাদের বাড়ি অথবা অফিসে গিয়ে ধরেছে। সকলেই বলছে, তারা সেদিনের ঝগড়ায় ছিল, তবে পিছনের সারিতে। ঘটনাটা দেখেছে, সক্রিয়ভাবে যোগ দেয়নি।”

“বুঝলাম।” বললেন দীপকাকু।

সূর্যেন্দুবাবু আগের কথার খেই ধরে নিলেন, “নেপালবাবুকে পুলিশের কথা বলতে, উনি বললেন, ‘আমি ক্ষতিপূরণের আশায় আসিনি। এসেছি বিবেকের তাড়নায়।’ আমরা ওঁকে ঘরে বসালাম। উনি যা বললেন, মোটামুটি এরকম— বাবার সঙ্গে ওঁর প্রথম সাক্ষাৎটা হয়েছিল আকস্মিক, তখন তাঁরা একে-অপরকে চিনতেন না। নেপালবাবু একদিন বাসে করে যাচ্ছিলেন, শরীরটা হঠাৎ ভীষণ খারাপ লাগতে থাকে, দরদর করে ঘামছেন, বুকে প্রচণ্ড ব্যথা। জ্ঞান হারানোর আগে অনেক যাত্রীর উৎকণ্ঠিত মুখ তাঁর দিকে এগিয়ে এসেছিল। জ্ঞান ফেরার পর যাত্রীদের মধ্যে একটি মুখই তিনি দেখতে পান। যাঁর কোলে মাথা রেখে উনি ট্যাক্সিতে শুয়ে ছিলেন। সেই সহৃদয় ব্যক্তিটি ছিলেন আমার বাবা। নেপালবাবু চোখ মেলতেই বাবা আশ্বস্ত করেছিলেন, ‘চিন্তা করবেন না। আমি সঙ্গে আছি। হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি আপনাকে।’ ফের চোখ বুজে আসছিল নেপালবাবুর, কোনওক্রমে বাবাকে বলেছিলেন, ‘আমার ব্যাগটা দেখবেন, হারিয়ে গেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে!’ এরপর নেপালবাবুর জ্ঞান ফেরে হসপিটালের বেডে। ডাক্তার দেখে ওষুধ দিয়ে গিয়েছেন, অনেকটাই সুস্থ। তখনও বাবা সামনে। নেপালবাবুর ফাইলটাইপ চামড়ার ব্যাগটা ফেরত দিয়ে বলেছিলেন, ‘বাড়িতে খবর পাঠিয়ে দিয়েছি, আপনার ছেলে আসছে।’ নেপালবাবু খুব অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘আপনি বাড়ির ফোন নাম্বার কী করে জানলেন?’ বাবা বলেছিলেন, ‘আপনার শারীরিক অবস্থা দেখে মনে হয়েছিল বাড়িতে খবর দেওয়া খুব জরুরি। বাধ্য হয়ে ব্যাগ ঘাঁটলাম, ফোন নাম্বার পেলাম ওখান থেকেই। তখনই দেখলাম ব্যাগে অনেক টাকা। প্লিজ, টাকাগুলো একবার চেক করে নিন।’ এসব কথার মাঝেই নেপালবাবুর ছেলে হাজির হন। টাকা চেক করার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। নেপালবাবু তখন কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ। ছেলেকে বলেছিলেন, ‘এঁকে দেখে রাখ, সাক্ষাৎ দেবতা! ইনি না থাকলে এতক্ষণে তোরা আমায় শ্মশানে নিয়ে যেতিস।’ প্রশস্তি শুনে বিব্রত বোধ করছিলেন বাবা। কখন একফাঁকে সরে পড়েছিলেন। নাম, ঠিকানা কিছুই রেখে যাননি। খুব আপশোস হয়েছিল নেপালবাবুর। বাবার সঙ্গে ওঁর পরের সাক্ষাৎটা হয় মাসখানেক পরেই। নেপালবাবু যেহেতু বিভিন্ন স্কিমে টাকা লগ্নি করে থাকেন, গোল্ডেন ইনভেস্টমেন্টের পেপার অ্যাড দেখে আনন্দ পালিত রোডের অফিসে যান। দেখেন, বাবা বসে আছেন। বাবাও খুব অবাক হয়েছিলেন নেপালবাবুকে দেখে। দু’জনে অনেক গল্প হয়। নেপালবাবু নির্দ্বিধায় বেশকিছু টাকা লগ্নি করেন গোল্ডেন ইনভেস্টমেন্টে। কারণ, বাবার চরিত্র তাঁর জানা। যেদিন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বাসে, ব্যাগে ক্যাশ পঁচিশ হাজার ছিল। টাকাটা সরিয়ে ফেলার প্রভূত সুযোগ ছিল বাবার। তা তো করেনইনি, বরং আত্মসম্মানবোধ এত প্রবল, ব্যাগ ফেরত দেওয়ার সময় টাকাটা চেক করে নিতে বলেছিলেন। বাবার কোম্পানিতে টাকা দিয়ে নিশ্চিন্তে ছিলেন নেপালবাবু। তারপর বেশ কয়েকবার বাবার অফিসে গিয়েছেন জাস্ট আড্ডা দিতে। শেষ যেবার গিয়েছিলেন, দেখেছিলেন, কিছু ক্লায়েন্ট পেমেন্ট না পেয়ে রাগারাগি করছে। অনেক কষ্টে তাদের শান্ত করছিলেন বাবা, ‘সামনের মাসে অমুক তারিখে আসুন, ঠিক পেয়ে যাবেন। আপনারা ভয় পাচ্ছেন কেন? আমি তো আর পালিয়ে যাচ্ছি না! কলকাতাতেই আমার বাড়ি। কোম্পানি একটা সমস্যার মধ্যে দিয়ে চলছে, খুব তাড়াতাড়ি সেটা ওভারকাম করে ফেলব আমরা।’ ক্লায়েন্টরা চলে যাওয়ার পর নেপালবাবু বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘প্রবলেমটা কী?’ উত্তরে বাবা বলেছিলেন, ‘সমস্যাটা যথেষ্ট ঘোরালো। তবে এর থেকে আমি পালাচ্ছি না। যেভাবে হোক সমাধান করবই। আমার বেশিরভাগ ক্লায়েন্ট লোয়ার ইনকাম গ্রুপের। তাদের টাকা এভাবে মার যেতে দেব না। টাকার মূল্য আমি চাকরি খোওয়ানোর পর থেকে বুঝেছি। আপনিও ভয় পাবেন না, আমার উপর বিশ্বাস রাখতে পারেন।’ এই ‘বিশ্বাস’-এর প্রসঙ্গটা উঠেছিল বলেই নেপালবাবু বাবার অফিসে আর যেতেন না, পাছে বাবার মনে হয়, নেপালবাবু টাকা মার যাওয়ার ভয়ে পরিস্থিতি বুঝতে এসেছেন। এরপর নেপালবাবুর কাছে বাবার মৃত্যুর খবরটাই আসে।”

একটানা কথা বলে থামলেন সূর্যেন্দু। গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন দীপকাকু। বললেন, “গোলমালের দিন, মানে অনিমেষবাবু যেদিন আত্মহত্যা করেন, নেপালবাবু স্পটে ছিলেন না?”

“না। খবরটা সেদিনই পেয়েছিলেন। পরের দিন শ্মশানেও যান। নিজের উপস্থিতি জানান না দিয়ে শেষদেখা দেখেন বাবাকে। তারপর থেকেই প্রচণ্ড মানসিক অশান্তিতে ভুগতে থাকেন। বাবার এভাবে চলে যাওয়াটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তাঁর স্থির বিশ্বাস, এর পিছনে গভীর কোনও ষড়যন্ত্র আছে। গোপনে বাবার কেসটার ব্যাপারে নজর রাখছিলেন। যখন দেখলেন, পুলিশ গোটা ঘটনার দায় বাবার ঘাড়ে চাপিয়ে দিল, নেপালবাবু থাকতে না পেরে আমাদের বাড়িতে এসে জানালেন সব কথা।

“আপনি ওঁকে নিয়ে পুলিশের কাছে গেলেন না কেন?” জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু সূর্যেন্দুবাবু বললেন, “প্রথমত, নেপালবাবুর আপত্তি ছিল, নামে-বেনামে টাকা খাটান মার্কেটে। পুলিশের জেরায় সমস্ত কিছু যদি জানাজানি হয়ে যায়! তা ছাড়া আমিও ভেবে দেখলাম, বাবা যে এরকম করার মানুষ নন, সে-কথা তো পুলিশকে আমরাও জানিয়েছি। ষড়যন্ত্রের কোনও ক্লু দিতে পারিনি। নেপালবাবুও পারছেন না। পুলিশ আমাদের কথা শুনবে কেন?”

“প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরের কাছে আসার পরামর্শ কে দিল?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

“নেপালবাবুই বলেছিলেন, ‘আপনারা ভাল কোনও প্রাইভেট গোয়েন্দাকে দিয়ে তদন্ত করান। সত্য একদিন প্রকাশ পাবেই!’ আপনার রেফারেন্স পেলাম এক ডাক্তারবাবুর কাছে। খুবই স্নেহ করেন আমাকে। ওঁকে আমি গুরুজন মনে করে সুখ-দুঃখের আলোচনা করি।”

“উনি আমায় চিনলেন কী সূত্রে?”

“চাবি সম্পর্কিত কোনও একটা কেস আপনি দুর্দান্তভাবে সল্ভ করেছিলেন, যার ক্লায়েন্ট দেবাংশু সেনগুপ্ত, ডাক্তারবাবু ওঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। একদিন আপনার সঙ্গে দেখা করার খুব ইচ্ছে ডাক্তারবাবুর।”

কথাগুলো দীপকাকু শুনলেন কি না বোঝা গেল না! হঠাৎ পুরনো প্ৰসঙ্গ টেনে আনলেন, “আচ্ছা, কলেজের বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ার ঘটনাটা অনিমেষবাবু বাড়িতে এসে কাকে বলেন?”

“আমার মা-কে। মায়ের থেকে আমি আর বোন জানতে পারি।”

সূর্যেন্দুবাবুর কথার পর মেঝের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলেন দীপকাকু। খানিকক্ষণ পর যেন নিজেকেই বলছেন, এমন সুরে বলতে থাকলেন, “তাঁকে কেউ দেখেনি! নামও জানা যাচ্ছে না! তিনি আদৌ ছিলেন তো?”

ভ্রু-জোড়া ঘনিষ্ঠ হয়ে গেল সূর্যেন্দুবাবুর। সবিস্ময়ে জানতে চাইলেন, “তার মানে? বাবা কি বন্ধুর ব্যাপারটা বানিয়ে বলেছিলেন? কিন্তু কেন?”

শূন্যে দৃষ্টি রেখে দীপকাকু বললেন, “সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। বিষয়টার আরও গভীরে ঢুকতে হবে।”

আবার নীরব হয়ে গেলেন দীপকাকু। সূর্যেন্দুবাবু, ঝিনুক তাকিয়ে রয়েছেন ওঁর দিকে। কোনও সাড়া নেই। ছোট করে ঝিনুক নকল কাশি কেশে নিল। ওতেই সংবিৎ ফিরল কাকুর। সূর্যেন্দুবাবুর উদ্দেশে বললেন, “আপনি দিনকয়েক কলকাতায় আছেন তো? আপনাদের কাজে ট্যুর প্রায় লেগেই থাকে।”

“আছি এখন। আপাতত লোকাল বেল্টে কাজ।”

“ওকে, ফাইন। আমি কাল অথবা পরশু আপনাকে ফোন করতে পারি। ঘণ্টা দু’-তিন আমার সঙ্গে থাকতে হতে পারে, পারবেন তো টাইম দিতে?”

“কোনও প্রবলেম হবে না। মার্কেটের কাজ আমি অ্যাডজাস্ট করে নেব। তেমন বুঝলে ছুটি নিয়ে নেব ক’দিন। আপনি যে কেসটা নিচ্ছেন, এটাই কত বড় ভাগ্যের ব্যাপার! অনেক দিন পর মা-কে গিয়ে একটা ভাল খবর দিতে পারব।”

কথার শেষের দিকে কণ্ঠস্বর আবেগসিক্ত হয়ে উঠেছিল সূর্যেন্দুবাবুর। দীপকাকু সেটা গ্রাহ্যই করলেন না। বললেন, “কেসটা নিয়েছি, এটা কিন্তু বলিনি। গোটা বিষয়টা এখন জানার পর্যায়ে চলছে। এমন হতে পারে, কেসটা পরে তেমন ইন্টারেস্টিং ঠেকল না। তখন আপনাদের কিছু সাজেশান দিয়ে সরে যাব আমি।”

মুখটা বেশ ম্লান হয়ে গেল সূর্যেন্দুবাবুর। বললেন, “সবটাই আপনার উপর ছেড়ে দিলাম। টাকার কোনও কমিটমেন্ট ছাড়াই আপনি যে এতক্ষণ ধরে আমার কথা শুনলেন, আজকালকার যুগে ক’জনই-বা শোনে? আজ উঠি। ফোনের অপেক্ষায় থাকব।”

ঘাড় কাত করে অনুমতি দিলেন দীপকাকু। চেয়ার ছেড়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন সূর্যেন্দুবাবু। ঝিনুকও গেল। সৌজন্য দেখানো হবে, বন্ধ করতে হবে দরজাও।

চৌকাঠে ছেড়ে রাখা জুতোয় পা গলিয়ে সূর্যেন্দুবাবু বললেন, “তোমার নাম ঝিনুক, তাই না?”

থতমত খেল ঝিনুক। এতক্ষণের কথাবার্তায় দীপকাকু তো একবারও তার নাম ধরে ডাকেননি! সূর্যেন্দুবাবুকে জিজ্ঞেস করল, “কী করে জানলেন?”

“আমার সেই ডাক্তারবাবু বলেছেন, দীপঙ্কর বাগচীর একজন লেডি অ্যাসিস্ট্যান্ট আছে। তিনি যে এত অল্পবয়সি, সেটা কল্পনা করিনি।”

কলেজে ঢুকেও যদি ‘অল্পবয়সি’ শুনতে হয়, কার না রাগ হয়? ঝিনুকের ও গরম হচ্ছে মাথা। মানুষটার অবস্থা বিচার করে রাগ করা যাচ্ছে না।

সূর্যেন্দু সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়ালেন। বললেন, “প্লিজ, তুমি একটু চেষ্টা করো, যাতে কেসটা উনি নেন।

আশ্বাস মেশানো হাসিসহ ঝিনুক বলল, “করব!”

দীপকাকুর দোতলার ভাড়ার ফ্ল্যাট থেকে সিঁড়ি চলে গিয়েছে রাস্তায়, মন্থর পায়ে নামছেন সূর্যেন্দু। বোঝাই যাচ্ছে, ঝিনুকের আশ্বাস তাঁকে তেমন চাঙ্গা করতে পারেনি।

দরজা বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াল ঝিনুক। দেখল, দীপকাকু চেয়ারে নেই। উঠে গিয়েছেন জানলার কাছে। বাইরে তাকিয়ে কী যেন ভাবছেন! ঝিনুক পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কোকিলটাকে গাছের ডালে দেখা যাচ্ছে না। সম্ভবত দীপকাকুর গম্ভীর মুখ দেখে পালিয়েছে!

ঝিনুকের উপস্থিতি টের পেলেন দীপকাকু। বললেন, “কেসটা সল্ভ করা বেশ কঠিন হবে মনে হচ্ছে। শিকার এবং শিকারি দু’জনেই অদৃশ্য। সময়ও চলে গিয়েছে অনেকটা। কতটুকু কী সূত্র পড়ে আছে, কে জানে? আবার শিকার এবং শিকারি যদি একই ব্যক্তি হয়, কেসটা নিয়ে নাড়াচাড়ার কোনও মানে হয় না।”

দীপকাকুর কথাগুলো জটিল এক ধাঁধার মতো লাগল ঝিনুকের। দ্রুত পায়ে নোটবুকের দিকে এগিয়ে গেল। ডায়ালগটা লিখে নিতে হবে। পরে বের করা যাবে অর্থ।