ফন্দিবাজ বন্দি – ৬

ঝিনুকরা এখন চলে এসেছে গোলপার্কের মোড়ে পহেলি জুয়েলার্সে। গাড়ি চালিয়ে এনেছে আশুদা। এবার সে খুব অস্থির, কেসটার ব্যাপারে কিছুই জানে না। অন্যবার আশুদা রীতিমতো হেপিংহ্যান্ড হিসেবে কাজ করে। একটু আগে যখন ঝিনুক গাড়ি থেকে নেমে পহেলির দিকে এগোচ্ছে, আশুদা চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “সোনার দোকানে ডাকাতির কেস নাকি দিদি?”

“তোমাকে পরে সব বলছি।” বলে, দ্রুত পায়ে দীপকাকুকে অনুসরণ করল ঝিনুক। মনে রেজাল্ট বেরনো উত্তেজনা, আর-একটু পরেই অপরাধীর চেহারা দেখতে পাওয়া যাবে।

তিনতলা বাড়ি জুড়ে পহেলি জুয়েলার্স। গেটে উর্দিধারী দু’জন গার্ড। ভিতরে ঢুকে উপরের দিকে তাকিয়েছিল ঝিনুক। বিভিন্ন কোণে লাগানো আছে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা। দোকানের ইন্টিরিয়র সুন্দর করে সাজানো। শুধুমাত্র শো কেস দিয়ে ভরাট করা হয়নি স্পেস। প্রচুর জায়গা ছাড়া আছে। সেখানে টবে নকল গাছ, রাজস্থানি পুতুল, রাজস্থানের গ্রামীণ শিল্পের ওয়াল হ্যাঙ্গিং। দীপকাকুর বন্ধু রজনীশ শর্মারা ওই রাজ্যের লোক। ভদ্রলোক সাদরে ঝিনুকদের নিয়ে বসালেন নিজের কেবিনে। সীতাহারটা প্রথমে দেখলেন। দীপকাকুকে জিজ্ঞেস করলেন, “কবে নাগাদ কেনা হয়ে থাকতে পারে হারটা?”

উত্তর দিলেন সূর্যেন্দুবাবু, “বোনের বিয়ে হয়েছে টেনথ ডিসেম্বর। সেদিন অথবা তার আগের দিন হয়তো কিনেছে।”

“ঠিক আছে, আমি দেখছি।” বলে, সেই যে রজনীশ শর্মা গিয়েছেন, চল্লিশ মিনিট পার হয়ে গেল, এখনও ফেরেননি। কেবিনটা এয়ার কন্ডিশনড হওয়ার কারণে ধৈর্যের সীমা বাড়লেও, এবার কিন্তু ঝিনুক, সূর্যেন্দুবাবু, নির্মল জানা উসখুস করছেন। দীপকাকুর যথারীতি কোনও বিকার নেই। চলে গিয়েছেন ভাবনার জগতে। সিলিং-এর দিকে মুখ তুলে কাচের টেবিলে আঙুল দিয়ে আঁকিবুকি কাটছেন।

শেষে অবসান হল প্রতীক্ষার। স্প্রিংডোর খুলে গেল। ঘরে ঢুকলেন রজনীশ শর্মা। দীপকাকুকে বললেন, “ভাল খবর আছে। টেনথ ডিসেম্বরের আগের সাতদিনে ওই ডিজ়াইনের হার একটাই বিক্রি হয়েছে। কাস্টমার ঋতঙ্কর ঘোষ।। আয়, ফোটোটা দেখাই।” দীপকাকু তাকালেন সূর্যেন্দুবাবু, নির্মল জানার দিকে। জিজ্ঞেস করলেন, “নামটা চেনা?”

দু’জনে একসঙ্গে মাথা নেড়ে ‘না’ বলল।

তৎপরতার সঙ্গে চেয়ার ছাড়লেন দীপকাকু। রজনীশ শর্মাকে অনুসরণ করে ঝিনুকরা সিঁড়ি ভেঙে পৌঁছল ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার কন্ট্রোলরুমে। দু’জন কর্মী বসে আছেন সেখানে। রজনীশবাবু একজনের পিঠে হাত দিয়ে বললেন, “ওটা দেখাও।”

অর্থাৎ সবকিছু সেট করে রজনীশ শর্মা ঝিনুকদের ডাকতে গিয়েছিলেন। কর্মীটির সামনের মনিটরে ফুটে উঠল সাদা-কালো ফোটো। খুব স্পষ্ট নয়, তবু বোঝা যাচ্ছে, গেট দিয়ে ঢোকার পরের চত্বর এটা। ঝিনুকরা মিনিট চল্লিশ আগে এখান দিয়েই এসেছে। মনিটরের পরদায় দেখা যাচ্ছে কাউন্টারে প্রচুর কাস্টমারের ভিড়, যেটা আজ ছিল না। স্ক্রিনের কোনায় ডেট এবং টাইম। সেকেন্ডের ডিজিট পালটে যাচ্ছে। লোকটা কোথায়? দম বন্ধ করে আছে ঝিনুক। রজনীশ শর্মা আঙুল ঠেকালেন মনিটরে। বললেন, “এই যে!” ঝিনুক দেখল, বড় ক্যাপ পরা একটা লোক ঢুকল। টুপির কারণে মুখটা আড়াল হয়ে আছে। কেননা, ক্যামেরাগুলো উপরে। সামান্য যতটুকু আন্দাজ করা যাচ্ছে, মানুষটা তিরিশের নীচে, ফ্রেঞ্চকাট, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।

ঝিনুক আশা করে আছে, এই বুঝি সূর্যেন্দু কিংবা নির্মল জানা বলে উঠবেন, চিনতে পেরেছি। কিন্তু না, সেরকম কোনও লক্ষণ নেই। দু’জনেই গভীর মনোযোগ দিয়ে টুপি পরা লোকটাকে দেখছেন। পাশের ঘরে চলে গেল লোকটা। এই দোকানের প্রত্যেক ঘরে ভিন্ন ডিপার্টমেন্ট। হালকা গয়না, ভারী গয়না, হিরে, রুপো, পাথর…, লোকটা ঢুকল ভারী গয়নার রুমে। হার পছন্দ করছে। মুখটা কিছুতেই দেখা যাচ্ছে না।

ভেসে এল দীপকাকুর গলা, “কী, চেনা যাচ্ছে না তো?” সূর্যেন্দুবাবু, নির্মল জানার উদ্দেশে বলা কথাটা।

কম্পিউটারের পরদার দিকে চোখ রেখে দু’জনেই ঘাড় নাড়ল।

দীপকাকু আবার বললেন, “খুব বুদ্ধি খাটিয়ে ছদ্মবেশটা নিয়েছে। নাটকের নকল চুল-দাড়ি লাগালে দোকানের সিকিউরিটির লোকেরাই হয়তো ধরে ফেলত!”

লোকটাকে শনাক্ত করার বদলে প্রশংসা করে যাচ্ছেন দীপকাকু, ঝিনুকের হতাশ লাগল।

ক্যাশ কাউন্টারে চলে এসেছে সেই কাস্টমার। টাকা দিয়ে গয়না নিচ্ছে। কাউন্টারের মেয়েটি কম্পিউটারের প্রিন্টার থেকে বিল বের করে দিল। আর-একটা কাগজ এগিয়ে দিয়ে নাম, ঠিকানা নিল লোকটার। কোনওভাবেই মুখটা দেখা গেল না। মাথা নিচু করে বেরিয়ে যাচ্ছে সে। বেরিয়ে যাচ্ছে ঝিনুকদের বোকা বানিয়ে। দোকানে যে ক্যামেরা লাগানো আছে, মাথায় ছিল লোকটার। ফোটো মুছে গেল মনিটরের। ঝিনুকদের যতটুকু প্রয়োজন ছিল, সেই অংশটাই দেখানোর ব্যবস্থা করেছিলেন রজনীশ শর্মা। দীপকাকুকে মিস্টার শর্মা জিজ্ঞেস করলেন, “লাভ হল কিছু?”

দীপকাকু বললেন, “একদম হল না, বলা যায় না। তবে আমি ভেবেছিলাম বয়স্ক মানুষ হবেন। এ তো ইয়াং। বোঝা যাচ্ছে, একে কাজে লাগানো হয়েছে। কিন্তু ছেলেটা নিজের চেহারাটা লুকোতে চাইছে কেন? তার মানে একে চিনে ফেলার সুযোগ আছে? অনিমেষবাবুর কাছের কেউ হবেন?”

রজনীশ শর্মার মুখ দেখে বোঝাই গেল, দীপকাকুর কথার অর্ধেক অধরা থেকে যাচ্ছে তাঁর কাছে। কেসটা ডিটেলে তাঁকে বলেননি দীপকাকু। এখন বললেন, “তুই এক কাজ কর। ভিডিয়ো-র এই পোরশানটা সিডিতে কপি করে দে। আর ছেলেটা যে কাগজে নাম-ঠিকানা লিখেছে, তার জেরক্স দে একটা।”

“কোনও অসুবিধে নেই। তবে তোদের আরও আধঘণ্টা ওয়েট করতে হবে।”

“করছি। তুই জিনিস দুটো দে আমায়।” বলে, দীপকাকু দরজার দিকে পা বাড়ালেন। রজনীশ শর্মার বাংলা শুনে ভারী ভাল লাগছে ঝিনুকের। এতটুকু টান নেই উচ্চারণে। বোধহয় জন্ম থেকে ওয়েস্ট বেঙ্গলে।

কন্ট্রোলরুমের বাইরে আসতেই মোবাইল বেজে উঠল ঝিনুকের। জিনসের পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখল, স্ক্রিনে লেখা, বাবা। কানে ফোন নিল ঝিনুক, “বলো।”

ওপ্রান্তে বাবা বললেন, “দীপঙ্করকে করছি, পাচ্ছি না কেন? তোরা কোথায়?”

“একদম ভিতরের একটা ঘরে ছিলাম, তাই বোধহয় টাওয়ার পাওনি। কী বলছ বলো?”

“দীপঙ্করের বাইকে বিচ্ছিরি একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে।” খবরটা শুনে মাথাটা একবার পাক খেয়ে গেল ঝিনুকের। ভয় পাওয়া গলায় জানতে চাইল, “তোমার? তুমি কোথায়?”

ওপার থেকে বাবা বললেন, “আমি ঠিকই আছি। বাইকটা স্ট্যান্ড করে অফিসে ঢুকেছি, হঠাৎ শুনি হইচই। বেরিয়ে দেখি, দুটো ছেলে একটা বাইকে চেপে পালাচ্ছে। তাড়া করছে আমার অফিসের আশপাশের লোক। ছেলে দুটো ভেঙে দিয়ে গিয়েছে দীপঙ্করের বাইক। একেবারে যাচ্ছেতাই ভাবে। সবচেয়ে মারাত্মক যেটা ঘটেছে, ওরা যখন লাঠি, রড দিয়ে বাইকটা ভাঙছিল, আমার অফিস-গলির কিছু লোক আটকাতে যায়। ওই দু’জনের একজন পিস্তল দেখায় তাদের। খুবই ডেঞ্জারাস এলিমেন্ট মনে হচ্ছে। দীপঙ্করকে নিয়ে চলে আয় তাড়াতাড়ি। বাইকটা সারাতে দিয়েছি অফিসের কাছের গ্যারাজটায়।”

ফোন কেটে গেল। ঝিনুক নিজে আন্দাজ করতে পারছে তার মুখের অবস্থা। দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “কী হল, কার ফোন? রজতদার?”

ধাতস্থ হতে সময় নিল ঝিনুক। গলা শুকিয়ে কাঠ। ধীরে ধীরে বলল, ফোনে শোনা ঘটনাটা। দীপকাকু গুম মেরে রইলেন। একটু পরে বললেন, “মনে হচ্ছে থ্রেটনিং। দুষ্কৃতী আমায় চেনে না। কোনওভাবে চিনেছে বাইকটাকে। আমাকে চিনলে, ফলো করে এসে রজতদার গাড়িটায় হামলা চালাত। হাতে যেহেতু পিস্তল, আশুও কিছু করতে পারত না।” চকিতে ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, “আচ্ছা, ওদের বাইকের নাম্বারটা কি কেউ দেখেছে? কিছু বললেন রজতদা?”

ঝিনুক মাথা নাড়ল। ভাবল, এ-কথাটা বাবাকে জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল। অ্যাকসিডেন্ট বাবার হয়েছে ভেবে এত ভয় পেয়ে গিয়েছিল, মাথা কাজ করছিল না।

সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এ দাঁড়িয়ে কথাবার্তা চলছে। খবরের আকস্মিকতায় কেউ নড়তে পারেননি। দীপকাকু সূর্যেন্দুবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি যে কেসটা হাতে নিয়েছি, চেনাজানার মধ্যে কাকে কাকে বলেছ?”

“কাউকেই না। এটা তো বলার ব্যাপার নয়, এ কান-ও কান হয়ে অপরাধী অ্যালার্ট হয়ে যাবে। বোনকেও বলিনি। বলেছি, পুলিশ হারটা দেখতে চেয়েছে।”

দীপকাকু এবার নির্মল জানাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি বলেছ কাউকে?”

“না, স্যার। বিশ্বাস করুন কাউকেই বলিনি!”

“ঠিক আছে, ঠিক আছে।” বিরক্তি প্রকাশ করে দীপকাকু স্বগতোক্তি করলেন, “আর কার থেকে লিক হতে পারে খবরটা?”

ভেবে বোধহয় কিছু পেলেন। রজনীশবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “শোন, আমাকে এখন বেরতেই হচ্ছে। তুই সিডি আর কাগজটা একে দিয়ে দিস।”

সূর্যেন্দুবাবুকে দেখালেন দীপকাকু। ঝিনুককে বললেন, “চলে এসো।”