৮
কিছুক্ষণ হল একজন অপরাধীকে শনাক্ত করা গিয়েছে। দীপকাকুর কথাই মিলল। লোকটা পূর্বপরিচয়ে কলকাতায় থাকবে মনস্থ করে নিশ্ছিদ্র পরিকল্পনা করেছিল নিজেকে গোপন করার। দীপকাকু বললেন, “অপরাধী যত চালাকই হোক, কিছু না-কিছু ক্লু সে ফেলে যাবেই। সূত্রটা খুঁজে নেওয়াটাই গোয়েন্দার কাজ। এই কেসটার ক্ষেত্রে লোকটা একটাই ভুল করেছিল। ফ্ল্যাটওনারকে দেখিয়ে ফেলেছিল নিজের চেহারা। গতকাল অনিমেষবাবুর ফ্ল্যাটমালিকের সঙ্গে দেখা করার পর গাড়িতে যেতে যেতে দীপকাকু ফোন করলেন সূর্যেন্দুবাবুকে। বললেন, “যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বোনের বিয়ের সিডি, চণ্ডী ঘোষ রোড অর্থাৎ ঝিনুকদের বাড়িতে নিয়ে এসো।”
সূর্যেন্দু একটু সময় চেয়ে নিলেন। কেননা, বোনের বিয়ের সিডি শেষ কোন আত্মীয়কে দেওয়া হয়েছে, মনে পড়ছিল না তাঁর!
ঝিনুকরা পৌঁছেছিল বাবার অফিস লাগোয়া গ্যারাজে। বাইকটার বডিতে চোট লেগেছে, যন্ত্রপাতির তেমন ক্ষতি হয়নি, বাইক পাওয়া যাবে পরের দিন। বাবার গাড়িতে ঝিনুকরা ফিরল বাড়ি। বাবা ফিরলেন না। বললেন, “কটা কাজ সেরে যাচ্ছি।”
দুপুরে ঝিনুকদের বাড়িতে খেয়ে, সোফায় ঘুমিয়ে, বিকেলে বাবার সঙ্গে দাবা খেলার পর দীপকাকু যখন ফোন করতে যাবেন সূর্যেন্দুবাবুকে, কেন এত দেরি হচ্ছে, তখনই ফোন এল মিস্টার বসাকের। বললেন, “অখিল ঘোষালের সঙ্গে কথা হয়েছে। কাল বিকেল পাঁচটার সময় আসছেন।”
খবরটা শুনে দীপকাকু গা এলিয়ে দিলেন সোফায়। বললেন, “থাক তা হলে, একেবারে কালই যাব।”
কথাটার মানে তখন উদ্ধার করতে পারেনি ঝিনুক। সূর্যেন্দুবাবু সিডি নিয়ে এলেন রাত ন’টা নাগাদ। দেরি হওয়ার কারণ হিসেবে বললেন, “বেশ ক’টা আত্মীয়বাড়ি ঘোরার পর বোনের শ্বশুরবাড়ি থেকেই নিয়ে আসতে হল সিডিটা। সব বাড়িতেই চা, জল, মিষ্টি কিছু না-কিছু খেতে হয়েছে, তাই এত দেরি।”
দীপকাকু বললেন, “আর ঘণ্টাদুয়েক আগে এলেও সিডি নিয়ে চলে যেতাম বিশ্বজিৎ বসাকের ফ্ল্যাটে। ফোটো দেখে উনি বলে দিতে পারতেন বিয়ের অনুষ্ঠানে অখিল ঘোষাল ছিল কি না। এখন যথেষ্ট রাত হয়েছে, বৃদ্ধ মানুষ, ঘুমিয়ে পড়েছেন নিশ্চয়ই।”
অগত্যা সিডিটা ঝিনুকদের ডিভিডি-তে চালানো হল। সূর্যেন্দুবাবুর বোন অসাধারণ সুন্দরী। কী মিষ্টি হাসি! বেচারি তখনও জানে না, আর ক’মাস পরেই পিতৃবিয়োগের কষ্ট পেতে হবে তাকে।
অনিমেষবাবুর চলাফেরা করা চেহারাটা দেখা গেল। চাপা স্বভাবের হলেও, চোখেমুখে উপচে পড়ছে একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়ে ওঠার আনন্দ। সেই উপকারী বন্ধুর পাঠানো গয়নার বাক্সটা খুলে স্ত্রীকে দেখাচ্ছেন, সেই ফোটোও উঠেছে। তখন তো জানেন না দামি গয়না দেওয়াটা আসলে বিশ্বাস অর্জনের অভিসন্ধি। টিভির পরদায় দীপকাকু খুঁজছিলেন অনিমেষবাবুর বন্ধুদের। ছ’জনকে দেখাতে পেরেছিলেন সূর্যেন্দু। বললেন, “হয়তো আরও কয়েকজন আছেন, সবাইকে ঠিক চিনি না।”
.
ওই ছ’জনের একজনকে আজ ‘অখিল ঘোষাল’ বলে শনাক্ত করলেন বিশ্বজিৎ বসাক। ধুতি-পাঞ্জাবি পরে কাঁধে শাল ফেলে কীরকম ইনোসেন্ট মুখ করে ঘুরছে লোকটা। কে বলবে, এই মানুষটাই বিছিয়েছিল এমন জাল! অনিমেষবাবু বেরতে না পেরে শেষ করে দিলেন নিজেকে! নির্মল জানা বলল, লোকটাকে সে মাঝে মাঝে অফিসে আসতে দেখেছে, নাম জানে না।
সূর্যেন্দু আসল নামটা বললেন, হীরালাল বসু। তবে তিনি কোথায় থাকেন, অফিস কোথায় কিছুই জানেন না। বোনের বিয়ের আগে বাড়িতে দু’-চারবার হয়তো এসেছেন। অনিমেষবাবু একবারই আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন ছেলের সঙ্গে। বলেছিলেন, ‘আমার অনেক দিনের বন্ধু। ব্যাঙ্কে উঁচু পোস্টে আছে।’
দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “ভদ্রলোক কি নিজের গাড়িতে এসেছিলেন আপনাদের বাড়ি?”
প্রশ্নটা কেন করা হল ঝিনুক বোঝেনি। এখনও ভেবে যাচ্ছে। সূর্যেন্দুবাবু বললেন, “আমি ভিতর-ঘরে সেল্স রিপোর্ট লিখছিলাম। বাবা ডেকে আলাপ করিয়ে দেওয়ার পর নমস্কার সেরে ফিরে যাই নিজের কাজে। ভদ্রলোক কীসে এসেছেন জানার সুযোগ হয়নি।” এসব আলোচনা আধঘণ্টা আগে হয়ে গিয়েছে। ঝিনুকরা অর্থাৎ দীপকাকু, ঝিনুক, নির্মল জানা, কল্লোল সেন বসে আছেন অনিমেষবাবুর অফিসঘরে। সাড়ে চারটে নাগাদ বিশ্বজিৎ বসাক অখিল ওরফে হীরালাল বসুকে শনাক্ত করে চলে গিয়েছেন নিজের ফ্ল্যাটে। হীরালাল ওঁর কাছে গেলেই আড়ালে গিয়ে দীপকাকুকে ফোন করে জানাবেন। তখনই অপরাধীকে গিয়ে ধরা হবে।
এখন অনিমেষবাবুর অফিসঘরটা দেখলে ভ্রম হবে টিভির এডিটিং রুম বলে। টেবিলের উপর রাখা হয়েছে বড় স্ক্রিনের কম্পিউটার, উফার বক্স, সবই আছে। মনিটরের পরদায় দেখা হয়েছে বিয়ের ফোটো, উইদ মিউজ়িক। এই মুহূর্তে দীপকাকু লাগিয়েছেন পহেলি জুয়েলার্সের সিডিটা। টুপি পরা ছেলেটার ফোটো জুম করে কখনও মাথাটা দেখছেন, কখনও-বা হাত, জামার টেক্সচার, বোতাম। একবার আপশোসের গলায় বললেন, “এই ছেলেটা ধরা-ছোঁওয়ার বাইরে রয়ে গেল।”
ঝিনুক দেখল ঘড়ি। পাঁচটা বেজে এগিয়ে যাচ্ছে কাঁটা। কল্লোল সেন বললেন, “কী ব্যাপার বলুন তো, এখনও এল না?”
পরদায় চোখ রেখে দীপকাকু শান্ত গলায় বললেন, “কলকাতার রাস্তাঘাটের যা অবস্থা, কাউকেই টাইমলি এক্সপেক্ট করা যায় না।
কথা শেষ হয়েছে কি হয়নি, দরজায় ঠকঠক। দীপকাকুর রিভলভিং চেয়ার ঘুরে গেল দরজার দিকে। চোখের ইশারায় ঝিনুককে খুলতে বললেন।
দরজা খোলার পর ধীর পায়ে ঘরে ঢুকলেন মিস্টার বসাক। চেহারায় বিষণ্ণ ভাব। বললেন, “ফোন করেছিল, আসবে না।”
“কারণ কী বলল?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।
“যাচ্ছেতাইভাবে কথা শোনাল। বলল, ‘আপনাকে আমি ভদ্রলোক ভাবতাম। আমি কি চোর না চিটিংবাজ, আমার জন্য নীচে পুলিশ বসিয়ে রেখেছেন? আপনার এই ব্যবহার?”
কথা কেড়ে দীপকাকু জানতে চাইলেন, “লোকটার ফোনের মধ্যে গাড়িঘোড়ার আওয়াজ পেয়েছেন?”
“পেয়েছি। তবে খুব ব্যস্ত রাস্তা নয়।”
দীপকাকু ঝিনুককে বললেন, “উলটো দিকের দোকানদারটাকে নিয়ে এসো। সিগারেট-পানের দোকান।”
দীপকাকুর নির্দেশের জন্য সবসময় ছিলাটান অবস্থায় থাকে ঝিনুক। ছিটকে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
ওয়ানওয়ে রাস্তা। গাড়ি দেখে একটা লেন দৌড়ে পার হল। ডিভাইডারের ভাঙা রেলিং গলে পরের লেনে পা রেখে দেখল, দোকানদার ওর দিকে ভয়-ভয় চোখ করে পালানোর উপক্রম করছে। অবাক হল ঝিনুক, লোকটা আমাকে দেখে পালাচ্ছে কেন? কী করে জানল ধরতে আসছি?
থলথলে শরীর লোকটার। ঝিনুক ফুটপাতে উঠে ছোট্ট স্প্রিন্ট টেনেই নাগালে পেল তাকে। গামছা, জামার কলার একসঙ্গে ধরে পেড়ে ফেলল মাটিতে। এমন ধপ করে আওয়াজ হল, ঝিনুক ভাবল, গেল বুঝি লোকটার কোমর ভেঙে!
নিচু হয়ে লোকটার বুকের কাছে শার্ট ধরে তুলতে যাবে ঝিনুক, ক্রস করে এগিয়ে গেল একটা সুঠাম হাত। ঘাড় ঘুরিয়ে ঝিনুক দেখল, কল্লোল সেন। দোকানদার তার মানে ঝিনুককে নয়, পুলিশ ড্রেসের কল্লোলবাবুকে দেখে পালাচ্ছিল!
লোকটাকে মাটি থেকে তুলে কল্লোল সেন ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। বললেন, “ব্রেভ গার্ল!”
.
দোকানদারকে নিয়ে আসা হয়েছে অফিসঘরে। রীতিমতো কাঁপছে সে। দীপকাকু তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “ঘাবড়াবার কিছু নেই। বলো, পালাচ্ছিলে কেন?”
দীপকাকুর শান্ত কণ্ঠস্বরে দোকানদার বুঝি ভরসা পেল। বলল, “পালাব না! দিদিমণি ছুটে আসছে, পুলিশ আসছে…!”
“তুমি তো কোনও দোষ করোনি! ভয় কীসের?” প্রশ্নটা করতে করতে দীপকাকু চেয়ারে বসলেন। চোখের ইশারায় নির্মল জানাকে দূরে থাকা টুলটা দিতে বললেন। এগিয়ে দিল নির্মল জানা। দীপকাকু দোকানদারকে বললেন, “বোসো।”
বসল লোকটা। বলল, “রাস্তার ধারে বিজনেস করি, না বুঝে কখন কী অন্যায় করে ফেলেছি, কে জানে?”
সিপিইউ-তে সিডি পালটে মনিটরে বিয়ের ফোটো আনলেন দীপকাকু। হীরালাল বসুর ফোটোটা এনলার্জ করে বললেন, “এই ভদ্রলোক একটু আগে তোমার দোকানে ছিল?”
“ছিল, স্যার।” বলল দোকানদার।
দীপকাকু বললেন, “আমরা আজ এখানে এসেছি, ভুমি ‘ভদ্রলোককে বলেছ। ক’দিন আগেও বলেছিলে, যখন এসেছিলাম। কেন? লোকটা কি তোমায় টাকা দেয়?”
“না, স্যার, সেরকম ব্যাপার নয়। আসলে ভদ্রলোক আমায় খুব পছন্দ করেন।”
“কেন?”
“ভদ্রলোক এই অফিসে মাঝে মাঝে আসতেন। এখান থেকে বেরিয়ে পান খেতেন আমার কাছে। একবার হয়েছিল কী, ভুলে হাতব্যাগ ফেলে গেলেন দোকানে। আমি ব্যাগটা অফিসে জমা দিয়েছিলাম। ব্যাগ ফেরত পেয়ে খুশি হয়েছিলেন বাবু। টাকা দিতে চেয়েছিলেন আমায়, নিইনি।”
“ওঁর ব্যাগে কী ছিল?” প্রশ্নটা জরুরি হলেও স্বাভাবিক কণ্ঠে জানতে চাইলেন দীপকাকু। জেরার এই কৌশলে অন্য পক্ষ মুখ ফসকে সত্যি বলে ফেলে।
দোকানদার বলল, “কী ছিল আমি দেখিনি স্যার! সোজা পাত্রদার হাতে এসে জমা দিয়েছি।”
ভ্রু কুঁচকে দীপকাকু জানতে চাইলেন, “পাত্র কেন? অনিমেষবাবু ছিলেন না?”
“ছিলেন। আমি ওঁকেই দিতে গিয়েছিলাম। বললেন, ‘পাত্রকে দাও। পেয়ে যাবে।”
উত্তর শুনে চুপ করে রইলেন দীপকাকু। কিছু ভাবছেন। ফের জিজ্ঞেস করলেন, “এই অফিসের উপর নজর রাখতে উনিই বলেছিলেন তোমায়?
“হ্যাঁ স্যার, এখানে টাকা রেখে প্রচুর লস হয়েছে ওঁর। কোম্পানি আবার কবে খুলবে, তাই নিয়ে খুব চিন্তায় ছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, অফিসের উপর লক্ষ রাখতে, মাঝে মাঝে এসে খবর নিয়ে যাবেন।”
“লোকটার গাড়ির নাম্বার বলো।”
“খেয়াল করিনি স্যার। ভদ্রলোকের নামটাও কখনও জিজ্ঞেস করিনি।”
“মিথ্যে কথা বলছ। এখনও চেষ্টা করছ লোকটাকে বাঁচাতে।”
দীপকাকুর কথা শেষ হতেই কল্লোলবাবুর থাপ্পড়ে টুল থেকে পড়ে গেল লোকটা। গড়গড় করে বলে দিল গাড়ির নাম্বার। নাম বলল, “বোসবাবু।”
কালবৈশাখীর হেলে-পড়া গাছের মতো চেহারা নিয়ে ঘর ছাড়ল লোকটা। কল্লোল সেন দীপকাকুর উদ্দেশে বললেন, “নাম্বারটা মোটর ভেহিকলস-এ দিলে বাড়ির অ্যাড্রেস পেয়ে যাব। অ্যারেস্ট করে ফেলি লোকটাকে?”
এখন ঝিনুক বুঝতে পারছে, কেন সূর্যেন্দুবাবুকে দীপকাকু জিজ্ঞেস করেছিলেন, হীরালাল বসু গাড়ি করে ওঁদের বাড়িতে গিয়েছিলেন কি না।
কল্লোলবাবুর প্রশ্নের উত্তর দিতে একটু সময় নিলেন দীপকাকু। বললেন, “আর ক’টা দিন ওয়েট করুন। লোকটাকে এখন অ্যারেস্ট করলে এভিডেন্সের অভাবে বেরিয়ে যাবে। আরও কিছু প্রমাণ জোগাড় করি।”
“ওকে। ইটস অল রাইট। লোকটা তো রইলই নাগালের মধ্যে।” বলে, কল্লোলবাবু জানতে চাইলেন, “আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো! আপনি কীভাবে আন্দাজ করলেন হীরালাল বসু সিগারেটের দোকান থেকে খবর পাচ্ছে?”
দীপকাকু ফের সিডি পালটে টুপি পরা ছেলেটার ফোটো ছোট-বড় করছেন। মনিটরে চোখ রেখেই কল্লোলবাবুর প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকলেন, “সিগারেট ফুরিয়ে যাওয়ায় কাল এখান থেকে বেরিয়ে ওর দোকানে গিয়েছিলাম। প্যাকেট দেওয়ার সময় ক্যাজুয়ালি বলল, ‘আপনি আগের দিন বাইকে এসেছিলেন না?” আমি তখনই বুঝে যাই লোকটা সর্বক্ষণ এই কমপ্লেক্সের উপর নজর রাখছে।”
কল্লোলবাবু মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইলেন দীপকাকুর দিকে।
