অদৃশ্য নজরদার – ২

এই প্রথম কোনও অ্যাড এজেন্সির অফিসে এল ঝিনুক। দীপকাকুর সঙ্গে বসে আছে ভিজিটর্স সোফায়। সামনে রিসেপশন কাউন্টারে সুন্দরী এক মহিলা। কিছুক্ষণ অন্তর ফোন বাজছে। রিসিভার তুলে মিষ্টি করে কথা বলছেন রিসেপশনিস্ট। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন কাউন্টারে এল, কাউকে ভিতরে পাঠালেন, কারও কাজ এখানেই সমাধা হল। ঝিনুকরা বসে আছে মহিলার যেন খেয়াল নেই!

এখানে ঢুকে দীপকাকু কাউন্টারে গিয়ে নিজের নাম আর সুজয় ঘোষের সঙ্গে দেখা করতে চান, বলেছেন। ঝিনুক লক্ষ করেছে, দীপকাকু নিজের কার্ড রিসেপশনে দেননি। অর্থাৎ অফিস স্টাফের কাছে পরিচয় গোপন রাখতে চান।

ইন্টারকমে মহিলা খবর পাঠালেন ভিতরে। ওপারের নির্দেশ শুনে অপেক্ষা করতে বললেন ঝিনুকদের। তা প্রায় মিনিট কুড়ি হতে চলল, এখনও ডাক আসেনি। ক্রমশ ধৈর্য হারাচ্ছে ঝিনুক। বিপদ থেকে বাঁচার জন্য সুজয় ঘোষ কীরকম আকুল হয়ে ঝিনুকদের বাড়ি গিয়েছিলেন, এখন বসিয়ে রেখেছেন বাইরে! সমস্যা কি নিজেরাই খানিকটা সল্ভ করে ফেললেন?

কাল রাতে হোমওয়ার্কে বেশ খাটুনি গিয়েছে ঝিনুকের। ম্যাগাজিনের অ্যাডগুলোর নীচে খুদি খুদি অক্ষরে লেখা থাকে যে এজেন্সি বিজ্ঞাপন তৈরি করেছে তার নাম। চোখ ব্যথা হয়ে গিয়েছে পড়তে। কয়েকটা অতি পরিচিত বড়সড় বিজ্ঞাপনের তলায় অ্যারো কোম্পানির নামও দেখেছে ঝিনুক। তাতেই আন্দাজ করা গিয়েছে ঘোষবাবুদের কোম্পানি উঁচু তলার। অফিসে এসে সেটা আরও টের পাওয়া যাচ্ছে। সেন্ট্রালি এসি। ছোট ছোট কিউবিক্‌ল। অধিকাংশ স্টাফ ইয়ং, ওয়েল ড্রেসড। মন দিয়ে যে যার কাজ করে যাচ্ছে। গতকালই যে কোম্পানি বড় একটা ধাক্কা খেয়েছে, এদের আচরণে তার কোনও ছাপ নেই। ভাবনা এখানে এসে হোঁচট খায় ঝিনুকের, এরা হয়তো জানেই না ঘটনাটা। সুজয় ঘোষ বলেছিলেন, রিদম ঘড়ির অ্যাড প্ল্যান তিন পার্টনার মিলে করেছিলেন। ডিজ়াইন, ছাপার কাজ বাইরে বিভিন্ন জায়গা থেকে করানো হয়। তা সত্ত্বেও খবর চলে গেল অন্য এজেন্সিতে। তা হলে কি তিন পার্টনারের মধ্যে একজন বিশ্বাসঘাতক লুকিয়ে আছে? কেসটা অত্যন্ত আকর্ষক এবং উত্তেজক তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু দীপকাকু কেমন যেন একটু চুপচাপ, ধ্যানস্থ হয়ে আছেন! আড়চোখে একবার দীপকাকুকে দেখে নেয় ঝিনুক, ঘাড় একটু হেলিয়ে শূন্যে দৃষ্টি রেখে বসে আছেন। মোটা কাচের চশমায় প্রতিফলিত হচ্ছে অফিসের উজ্জ্বল আলো। কী যে দেখছেন, ভাবছেন, বোঝা যাচ্ছে না!

গতকাল দুপুর থেকে এখন পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে কেসটা নিয়ে কী কী কাজ করেছেন দীপকাকু, ডিটেলে বলেননি ঝিনুককে।

ঠিক দশটার সময় বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ঝিনুক। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে দীপকাকু বাইকে চেপে আসেন। তাঁর বাইকের পিছনে বসে ক্যামাক স্ট্রিটের এই অফিসে এসেছে। টালিগঞ্জ থেকে এতটা পথে দীপকাকুর সঙ্গে কথা হয়েছে একবারই। ঝিনুক জানতে চেয়েছিল, “পোস্টারের বদমাইশি যে এজেন্সি করেছে, নাম কী?”

বাইক চালাতে চালাতে দীপকাকু বলেছেন, “রূপরেখা।”

গত কালই নামটার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। ম্যাগাজিনের অ্যাডের নীচে এই নাম দেখেছে ঝিনুক। এরাও নামীদামি প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপন করে। তার মানে দুটো বড় বিজনেস হাউসের মধ্যে লড়াই। একটু পরে ঝিনুক ফের বলেছিল, “এখনও তো একটাও পোস্টার চোখে পড়ল না!”

উত্তর দেননি দীপকাকু। দেশপ্রিয় পার্কের কাছে পৌঁছতেই আশপাশের দেওয়ালে, গুমটি দোকানের গায়ে দেখা গেল সেই দুটো পোস্টার। একটায় ‘সময়ের দাম কমে গেল’। পাশেই একই রকম কাগজে ‘প্লাজা ঘড়ির দাম এখন মাত্র একশো টাকা’। বোঝার উপায় নেই কত বড় অন্যায় লুকিয়ে আছে ওই প্রচার-পদ্ধতিতে।

“মিস্টার বাগচী, প্লিজ গো ইনসাইড।”

রিসেপশনিস্ট মহিলার ডাকে চিন্তা থেকে ফেরে ঝিনুক। সেকেন্ডখানেক আগে ফোন বেজেছিল রিসেপশন ডেস্কে, সম্ভবত ওটাই ছিল ঝিনুকদের ভিতরে যাওয়ার পারমিশন।

সোফা ছেড়ে উঠে গিয়েছেন দীপকাকু। ঝিনুক অনুসরণ করে। বাধা দিলেন রিসেপশনিস্ট, “সরি, মিস্টার বাগচী। শুধু আপনি যেতে পারবেন ভিতরে। আপনার কথাই বলেছি আমি।”

বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে গিয়েছে ঝিনুকের। দীপকাকু বললেন, “না, ও যাবে আমার সঙ্গে। প্রয়োজন আছে।”

“তা হলে যে আবার পারমিশন নিতে হয়!” বলে, ইন্টারকমের রিসিভার তুলতে যাচ্ছিলেন মহিলা, ফোনসেট বেজে ওঠে। রিসিভার কানে নিয়ে ওপ্রান্তের কথা শুনে মহিলা বললেন, “ঠিক আছে, আপনারা দু’জনেই যান।”

ঝিনুক অবাক হয়ে দীপকাকুর দিকে তাকায়। চোখের ইশারায় দীপকাকু ঘরের কোণের উপরের দিকটা দেখান। সেখানে ছোট্ট ক্যামেরা, ঘাড়নাড়া পুতুলের মতো এদিক-ওদিক করছে।

মুহূর্তে বিষয়টা বুঝে নেয় ঝিনুক। এই ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার মাধ্যমেই ভিতরের মানুষটি ঝিনুকদের সমস্যাটা দেখতে পেয়েছেন।

.

অফিস হলের শেষ প্রান্তে এমডি-র চেম্বার। নক করে, ঝিনুককে নিয়ে ভিতরে ঢুকলেন দীপকাকু। বিশাল সেক্রেটেরিয়েট টেবিলের ওপারে বসে আছেন তিন সমবয়সি। সুজয় ঘোষ উঠে দাঁড়ালেন, “সরি, মিস্টার বাগচী, আপনাদের অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখলাম। আসলে এরা দু’জন অন্য কাজে বিজ়ি ছিল। দেরি হয়ে গেল তিনজন একসঙ্গে হতে।”

“ইটস্ অল রাইট।” বলে, দীপকাকু চেয়ার টেনে বসলেন। ঝিনুক বসল পাশের চেয়ারে। সুজয় ঘোষ তাঁর দুই পার্টনার পার্থ বর্মন ও গৌতম মজুমদারের সঙ্গে দীপকাকুর আলাপ করিয়ে দিলেন। হ্যান্ডশেকের পর দীপকাকু “আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট” বলে ঝিনুকের পরিচয় দিলেন। কুণ্ঠিত নমস্কার বিনিময় করল ঝিনুক। অন্য সময় এই পরিচয়ে গর্বিত হত, কিন্তু এই ঝাঁ-চকচকে অফিস, রাশভারী মানুষগুলোর সামনে কেমন যেন নার্ভাস লাগছে!

সুজয়বাবু টেবিলের উপর থেকে একটা খাম তুলে দীপকাকুর দিকে এগিয়ে ধরে বললেন, “আপনার অ্যাডভান্সটা। টোটাল কত লাগবে যদি একটু বলেন?”

“পঁচিশ মতো। ট্রাভেলিং ও অন্যান্য এক্সপেন্স বাদ দিয়ে।” বলে, খামটা পকেটে চালান করলেন দীপকাকু। ঝিনুক সন্তর্পণে পার্থ আর গৌতমবাবুকে দেখে নেয়। যা ভেবেছিল তাই, ওঁরা যেন ঠিক ভরসা করতে পারছেন না দীপকাকুকে! কারণটা দীপকাকুর গেট-আপ। নিরীহ ভালমানুষ টাইপের চেহারা। পোশাকও তথৈবচ। ঝিনুক জানে, এটা দীপকাকুর মোড়ক, আড়ালে থাকা তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং হান্ড্রেড পারসেন্ট ফিট স্পোর্টসম্যানটির পরিচয় ঝিনুক আগের তদন্তগুলোতে প্রত্যক্ষ করেছে।

দীপকাকু জিজ্ঞাসাবাদে চলে গিয়েছেন, “পোস্টারিংয়ের ব্যাপারটা দেখছি ‘রূপরেখা’ এজেন্সি করেছে। আগে কোনও শত্রুতা ছিল আপনাদের সঙ্গে?”

“না, মশাই। বিজনেসে যেমন সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকে, তেমনটাই ছিল। কিন্তু এই ঘটনাটা যা করল, আমরা খুব অবাক হয়েছি!” বললেন সুজয় ঘোষ।

“ওদের সঙ্গে কথা বলেছেন?”

“প্রবৃত্তি হয়নি।”

“এরকম চিটিং আর কোন কোন এজেন্সি করেছে?”

“তিনটে এজেন্সি। তার মধ্যে একটা এজেন্সি আমাদের এক বন্ধুর। ছোট এজেন্সি। পরে অবশ্য সে আমাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে। বলেছে, এরকম ঘটনা আর ঘটবে না।”

এই পয়েন্টটা দীপকাকুর বাড়তি মনোযোগ আদায় করে নিল। জিজ্ঞেস করলেন, “বন্ধুটি কনসেপ্ট হাতিয়েছিলেন কীভাবে?”

এবার উত্তর দেওয়ার জন্য নড়েচড়ে বসলেন পার্থ বর্মন। বললেন, “অজিত, মানে আমাদের বন্ধুর ভার্সান, কেউ একজন ফোন করে কনসেপ্টটা ওকে বলে। ওটা যে আমাদের অ্যাপ্রুভ হয়ে যাওয়া অ্যাড কপি, সেটা বলেনি। ঘটনাচক্রে আমাদের আগেই অজিত নকল অ্যাডটা পাবলিশ করে ফেলে।”

“ফোন যে করেছিল, টাকা চায়নি?”

“অবশ্যই চেয়েছিল! অজিত তার চাহিদাও মেটায়। তবে টাকা সে ফোনের লোকটার হাতে দেয়নি। নির্দেশমতো পার্কের বেঞ্চে রেখে এসেছিল।” এটা বললেন গৌতম।

খানিক চুপ করে থেকে দীপকাকু জানতে চাইলেন, “অজিতবাবুর এজেন্সির নাম কী?”

“চিত্রা’। ওর স্ত্রীর নামে এজেন্সির নাম। ওর স্ত্রীই কোম্পানি চালায়। ও টুকটাক দেখাশোনা করে। অজিত ডাক্তার। একটা নার্সিংহোম আছে।” বললেন সুজয়বাবু।

দীপকাকু পরের প্রশ্নে যান, “বাকি দুটো এজেন্সির নাম বলুন।’

“লোটাস’ আর ‘আর্টলাইন’। এই দুটো এজেন্সি বরাবর আমাদের সঙ্গে টক্কর নেয়।” বললেন গৌতম।

দীপকাকু এবার পুরোপুরি মৌন হয়ে গেলেন। ভ্রু কুঁচকে কী যেন ভাবছেন! চেম্বারের চারপাশে চোখ বোলায় ঝিনুক। সুন্দর ইন্টিরিয়র। বাঁ পাশের দেওয়ালে স্লিক টেলিভিশন। ঘরের এককোণে কম্পিউটার ডেস্ক। তারপরই দেওয়ালে গাঁথা একটা সিন্দুক, যার হ্যান্ডেলটা জাহাজের স্টিয়ারিংয়ের মতো। শেলফে ম্যাগাজিন, বইগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা। তাকের ফাঁকা জায়গায় কিউট শো পিস। দৃষ্টি থামে তিন পার্টনারের পিছনের দেওয়ালে। বেশ বড়সড় ডিসপ্লে বোর্ড। সেখানে পিন দিয়ে আটকানো এঁদের কোম্পানির নানান বিজ্ঞাপনের কাটিং। একটা ছবিতে এসে হোঁচট খায় ঝিনুক। পরিচ্ছন্ন চকচকে রাস্তায় ড্রেসিং গাউন পরা একটা লোক আধশোয়া হয়ে বই পড়ছে। রাস্তার দু’পাশে ছিমছাম কটেজ, ফ্ল্যাটবাড়ি, পার্ক, সুইমিং পুল…. এরকমই একটা বিজ্ঞাপন ম্যাগাজিনের পাতায় দেখেছে ঝিনুক। কিন্তু এটা নয়।

সপ্রশ্ন দৃষ্টি নামিয়ে সুজয়বাবুর দিকে তাকায় ঝিনুক। ভদ্রলোক নীরবে হাসছেন। বড় মলিন হাসি। বললেন, “এই অ্যাডটা চেনা চেনা লাগছে, তাই না?”

ঝিনুক ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানায়।

সুজয়বাবু বললেন, “ওটা একটা হাউজিং কমপ্লেক্সের বিজ্ঞাপন। আমরাই প্রথমে অ্যাডটা তৈরি করেছিলাম। ক্যাপশন ছিল, ‘প্রতিটি ইঞ্চি মনের মতো’। ক্যাপশনসুদ্ধু চুরি হয়ে গেল।”

“কোন এজেন্সি করল?” জানতে চায় ঝিনুক।

“আর্টলাইন। তফাত বলতে, ওদের বিজ্ঞাপনে মডেল পাজামা-পাঞ্জাবি পরে আছে, আমাদের ড্রেসিং গাউন।”

ম্যাগাজিনের পাতায় দেখা অ্যাডটা চোখে ভেসে উঠল ঝিনুকের। বলল, “আর-একটা তফাত আছে। ওদের ছবিতে কোনও কটেজ নেই, সব ফ্ল্যাটবাড়ি।”

“সেটাই হওয়ার কথা। ওরা ‘পূজালি’ কমপ্লেক্সের বিজ্ঞাপন করেছে। যাদের কটেজের প্রভিশন নেই। আমরা করছিলাম ‘ড্রিমল্যান্ড’-এর বিজ্ঞাপন। প্রোমোটারের ভীষণ পছন্দ হয়েছিল অ্যাডটা। পূজালির বিজ্ঞাপন বেরতেই প্রচণ্ড খেপে গেল ড্রিমল্যান্ডের মালিক। ওরা আমাদের অনেক দিনের কাস্টমার। রেগেমেগে মামলা করতে গিয়েছিল কোর্টে। অনেক বুঝিয়ে নিরস্ত করি।”

সুজয়বাবুর কথা শেষ হতেই দীপকাকু বললেন, “আচ্ছা, আমাকে একটা কথা বলুন তো! আইডিয়া ছাড়াও আপনাদের বিজ্ঞাপনের কোন কোন অংশ কপি হয়ে যাচ্ছে? আই মিন, ফোটোগ্রাফি অ্যাঙ্গেল, ক্যাপশনের লেটারের মাপ, কালার…”

কথার মাঝেই পার্থবাবু বললেন, “সেটা বলা খুব শক্ত। ওরা হয়তো পুরো কনসেপ্টটাই পাচ্ছে। প্রয়োজনমতো কিছু কারিকুরি করছে নিজেরা। লোটাস এজেন্সি তো একবার হুবহু কপি করে দিল। মডেল পর্যন্ত এক!”

দীপকাকু ফের গুম মেরে গেলেন। এই কেসটায় ঝিনুক কোনও থই পাচ্ছে না। বিশেষ করে দীপকাকুর শেষ প্রশ্নটা শুনে সব কিছু গুলিয়ে গেল। এ সময় ঝিনুকের একটাই কাজ, এতক্ষণ যা যা শুনল ছোট করে নোট করা। নোটবুক, পেন সঙ্গেই আছে, যেমন থাকে তদন্তে অ্যাসিস্ট করার সময়। ভরসা হচ্ছে না বের করতে। কেন জানি মনে হচ্ছে, দীপকাকুও কেসটার কোনও কূল খুঁজে পাচ্ছেন না!

হঠাৎ কথা বলে উঠলেন দীপকাকু, “কনসেপ্ট পাচারের ব্যাপারে আপনারা তো নিজেদেরই সন্দেহ করেন, সুজয়বাবু এমন কথাই আমাকে বলেছিলেন।”

“হ্যাঁ, ঠিকই বলেছে।” বললেন গৌতম।

“এবার আমাকে এমন কোনও ঘটনার উদাহরণ দিন, যার থেকে আপনারা শিয়োর হয়েছেন, তিনজনের মধ্যেই একজন অপরাধী।”

“আমি বলছি।” বলে, শুরু করলেন পার্থ, “একবার হয়েছিল কী, একটা মোবাইল ফোনের বিজ্ঞাপন আমরা নিউজ পেপারে পাঠিয়ে দিয়েছি, মাথায় এল নতুন আইডিয়া, ক্যাপশন লেখা হবে এসএমএস-এর স্টাইলে, মানে বাংলা কথাটা ইংরেজি লেটারে লেখা। কাস্টমারের মতামত নেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। তারা সবটাই আমাদের উপর ছেড়ে দিয়েছে। অ্যাডটা বদলানোর জন্য ফোন করলাম নিউজ পেপারের অফিসে। তারা বলল, ম্যাটার প্রেসে চলে গিয়েছে। তখন আপশোস করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। বিজ্ঞাপনটা বেরনোর কথা রবিবারের সাপ্লিমেন্টারিতে। তখনও চারদিন বাকি। শনিবার অন্য কাগজে আর-একটা মোবাইল ফোনের বিজ্ঞাপন বেরিয়ে গেল। অবিকল আমাদের কনসেপ্ট। এমনকী, যে ক্যাপশনের আইডিয়া আমরা ছাপাতে পারিনি, সেটাও ছেপে বেরিয়ে গেল!” থামলেন পার্থবাবু। দম নিয়ে বললেন, “শেষ আইডিয়াটা শুধু আমাদের মধ্যেই ছিল, বাইরের কাউকে বলা হয়নি।”

প্রায় একই সঙ্গে গৌতমবাবু বলে উঠলেন, “এবার আপনাকে বের করতে হবে, আমাদের এই তিনজনের মধ্যে কে বিশ্বাসভঙ্গ করছে?”

এ তো দেখা যাচ্ছে চোর নিজেই পুলিশকে নিয়োগ করছে তাকে ধরার জন্য! এটা কি একধরনের চ্যালেঞ্জ? দীপকাকুর উপর এঁদের কীসের এত রাগ! আগে তো কখনও দেখাই হয়নি! ঝিনুকের মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। এই তিন পার্টনার যেন জলজ্যান্ত ধাঁধা! এঁরা দীপকাকুর প্রতি যে আচরণটা করছেন, অনায়াসে রিগিংয়ের সঙ্গে তুলনা করা যায়। এই চেম্বারটাকে গুহা বলে বোধ হচ্ছে ঝিনুকের। দীপকাকুকে নিয়ে মানে মানে কেটে পড়তে পারলেই হয়। অবশ্যই অ্যাডভান্সের টাকাটা ফেরত দিয়ে।

সেরকম কোনও সদিচ্ছা দীপকাকুর নেই। জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা কেন ধরে নিচ্ছেন, তিনজনের একজন বেইমানিটা করছেন? দু’জন একসঙ্গে হয়েও তো করতে পারেন। উদ্দেশ্য, বাকি একজনকে অপদস্থ করা বা বিজনেস থেকে ছেঁটে ফেলা।”

কোনও উত্তর আসে না তিন পার্টনারের কাছ থেকে। একে-অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন। মনে মনে দীপকাকুকে বাহবা দেয় ঝিনুক, জিতে গেলেন এই রাউন্ডে। ধাঁধাটাকে দিলেন আরও জটিল করে।

খানিকক্ষণ সবাই চুপচাপ। প্রসঙ্গ থেকে সরে এসে দীপকাকুই শুরু করলেন, “আপনারা কি বিজনেস নিয়ে বাড়িতে বা অন্য কোনও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করেন?”

“আমি তো করি না।” বললেন সুজয়বাবু

“আমিও না।” একই কথা প্রায় একই সঙ্গে বললেন পার্থ ও গৌতম।

“আর-একটা কথা, আপনাদের ব্যাবসা সংক্রান্ত গোপনীয় মিটিংগুলো নিশ্চয়ই এই চেম্বারেই হয়?” জানতে চান দীপকাকু।

মাথা নেড়ে সায় দেন তিন পার্টনার। দীপকাকু পরের প্রশ্নে যান, “ফোনের মাধ্যমে আলোচনা করে কোনও গুরুত্বপূর্ণ ডিসিশন নেন কি?”

“জেনারেলি না।” বললেন গৌতমবাবু। তিনজনের চোখেই অবোধ দৃষ্টি, ধরতে পারছেন না কেন এই প্রশ্নগুলো করছেন দীপকাকু। শেষ প্রশ্নটা অন্তত বুঝতে পেরেছে ঝিনুক, ফোন ট্যাপের আশঙ্কা করছেন দীপকাকু।

চাকা লাগানো চেয়ারটা একটু পিছিয়ে নিয়ে দীপকাকু বসে থেকেই ঘরের চারপাশে চোখ বোলালেন। এক সময় দৃষ্টি স্থির হল তিন পার্টনারের উপর। বললেন, “আমি আপনাদের সার্চ করব।”

তিন বন্ধু তো বটেই, দীপকাকুর প্রস্তাবে ঝিনুকও একটু হতচকিত হল। পার্থবাবু কপাল কুঁচকে জানতে চাইলেন, “হঠাৎ সার্চ কেন?”

“দেখব, আপনাদের কারও কাছে স্পাই ক্যামেরা বা টেপরেকর্ডার আছে কি না।”

গৌতমবাবুর ঠোঁটে বাঁকা হাসি। বললেন, “এটা কী ধরনের ইনভেস্টিগেশন মশাই! আমরা যখন সশরীরে এখানে আছি, লুকিয়ে ক্যামেরা, টেপ আনতে যাব কেন? যা দেখার বা শোনার নিজের চোখে, কানেই তো হয়ে যাচ্ছে।”

দীপকাকু বললেন, “আপনাদের কথামতো আমি কিন্তু এখনও ধরে নিইনি, তিনজনের মধ্যে থেকে খবর বেরিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে চতুর্থ কোনও ব্যক্তির হাত আছে কিনা আমায় দেখতে হবে। এমন হতেই পারে, অগোচরে বাড়ির কেউ আপনাদের পোশাকে স্পাই ক্যামেরা বা টেপরেকর্ডার ঢুকিয়ে দিচ্ছে। জানেনই তো সেগুলোর সাইজ খুব ছোট। অনায়াসে পোশাকের আনাচকানাচে রেখে দেওয়া যায়।”

কথাটা সম্ভবত তিন বন্ধুর মনে ধরল। চোখেমুখে ফুটে উঠল আত্মসমর্পণের ভাব। অর্থাৎ দীপকাকু যা ভাল বুঝবেন, করবেন। ওঁদের কোনও আপত্তি নেই।

চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন দীপকাকু। ওপ্রান্ত থেকে সুজয়বাবুও উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “নিন, আমাকে দিয়ে শুরু করুন।”

ঝিনুক অবাক হয়ে দেখতে লাগল, কী নিপুণ ভঙ্গিতে দীপকাকু সার্চ করছেন! যেন বেশকিছু বছর বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সে চাকরির অভিজ্ঞতা আছে। অতি দ্রুত শার্ট-প্যান্টের সমস্ত অংশে চলে যাচ্ছে হাত। সুজয়বাবুর জুতো খোলালেন। আলাদা করে পরীক্ষা করলেন জুতো জোড়া। একই প্রক্রিয়া চলল তিনজনের উপর। কারও কাছেই কিছু পাওয়া গেল না।

ঝিনুক ছাড়া সবাই এখন দাঁড়িয়ে আছেন। দীপকাকু বললেন, “এবার আমি ঘরটা সার্চ করব। আপনারা বাইরে অপেক্ষা করুন।” ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি রিসেপশনে গিয়ে বোসো। কাজ শেষ হলে যাচ্ছি।”

আদেশটায় বিমর্ষ হতে গিয়েও হয় না ঝিনুক। দীপকাকুর ঘর সার্চ করার ধরনটা ভীষণ বোরিং। শুচ্ছেন, বসছেন, হামাগুড়ি দিচ্ছেন, কান পাতছেন, গন্ধ শুঁকছেন, সে এক জগঝম্প ব্যাপার! তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে ঝিনুক। তার চেয়ে বাইরে বসে থাকাই ভাল। পরে রেজাল্টটা জেনে নেবে।

একে-একে তিন পার্টনার চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেলেন। ঝিনুকও বেরতে যাবে, দ্যাখে, দীপকাকু হামাগুড়ি দিয়ে সেক্রেটারিয়েট টেবিলের তলায় ঢুকে যাচ্ছেন।

.

রিসেপশনের সামনের সোফায় বসেছে ঝিনুক। রিসেপশনিস্ট আগের মতোই ব্যস্ত। তবে এবার ওঁর আচরণ একটু অন্যরকম। কাজের ফাঁকে যখনই ঝিনুকের সঙ্গে চোখাচোখি হচ্ছে, মিষ্টি করে হাসছেন। হাসি বিনিময় করছে ঝিনুক। যদিও ভদ্রমহিলা তাকে দেখে কেন হাসছেন, তা এখনও অবধি বুঝে উঠতে পারেনি!

একটা সময় রিসেপশনিস্ট মহিলা একটু ফাঁকা হলেন। কাউন্টারে কোনও ভিজিটর নেই, ফোনও বাজছে না। ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে ভদ্রমহিলা জানতে চাইলেন, “রেজাল্ট কী হল?”

ঘাবড়ে যায় ঝিনুক, কীসের রেজাল্ট জানতে চাইছেন? ঝিনুক সত্যিই একটা ফলাফলের অপেক্ষায় বসে আছে, এমডি-র চেম্বারে কিছু পাওয়া গেল কিনা? তা হলে কি রিসেপশনিস্ট এবং কর্মীরাও জানেন, কেন ঝিনুকরা এখানে এসেছে?

ঝিনুককে এতটা অপ্রস্তুত হতে দেখে মহিলার ভ্রু-জোড়া ঘনিষ্ঠ হয়। একটু অবাক কণ্ঠে বলেন, “তুমি মডেলিংয়ের জন্য আসোনি?”

“না তো!” বিস্মিত হয়ে বলে ঝিনুক।

“ওঃ, আই অ্যাম রিয়েলি সরি! আসলে পোর্টফোলিও পাঠিয়ে কোনও ক্যান্ডিডেট যদি সিলেক্টেড হয়, অভিভাবকের সঙ্গে আসে দেখা করতে।”

“না, না, আমাদের সেরকম কোনও ব্যাপার নেই।” শুধরে দিয়ে মিষ্টি করে হাসে ঝিনুক।

ফোন বেজে ওঠে রিসেপশন ডেস্কে। রিসিভার তুলে কথা বলেন রিসেপশনিস্ট। ফোন নামিয়ে ফের ঝিনুকের উদ্দেশে বলেন, “যদি কিছু না মনে করো, একটা কথা বলি?”

ঝিনুক ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানায়। মহিলা বলেন, “তুমি কিন্তু ইজিলি মডেলিংয়ে আসতে পারো। দারুণ গ্রেসফুল দেখতে তোমাকে!”

আচমকা কমপ্লিমেন্ট পেলে সকলেরই স্মার্টনেস উধাও হয়ে যায়। ঝিনুকের মুখেও লজ্জা পাওয়া হাসি। এর ফাঁকে মহিলা জানতে চান, “তোমার নাম কী?”

“আঁখি। আঁখি সেন।”

“ফোন নম্বর?”

ইতস্তত করে ঝিনুক। রিসেপশনিস্ট পেন হাতে তুলে অপেক্ষায় আছেন। নম্বরটা বলেই দেয় ঝিনুক। তার সঙ্গে এ-কথাও বলে, “আমার কিন্তু মডেলিংয়ে কোনও ইন্টারেস্ট নেই।”

“সে পরে দেখা যাবে। কনট্যাক্ট নম্বরটা তো নেওয়া থাক। আমি তো জানি, এক-এক সময় নতুন মুখ খুঁজতে গিয়ে কী ছোটাছুটি করতে হয়! তোমার নম্বরটা দিতে পারলে আমার ইম্পর্ট্যান্স বাড়বে কোম্পানিতে।”

রিসেপশনিস্টের কথা শেষ হতে না-হতেই ঝিনুক দ্যাখে, কোমর সমান পুশডোর ঠেলে বেরিয়ে আসছেন দীপকাকু। কিন্তু এ কী চেহারা হয়েছে! চুল এলোমেলো, নাকের ডগায় চশমা। ইন করা শার্ট এখন বাইরে। প্যান্ট ও কুঁচকানো। যেন ভিতরে বিচ্ছিরি মারপিট হয়েছে। ঝিনুক জানে, আসলে তা নয়, ঘরটর সার্চ করার পর দীপকাকুর চেহারা এরকমই হয়। মুখটা ভীষণ থমথমে। তার মানে কিছুই পাওয়া যায়নি। ঝিনুকের পাশে এসে বললেন, “চলো।”

সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় ঝিনুক। দীপকাকুর হাতে ব্রাউন রঙের বড়সড় প্যাকেট। ভিতরে কী আছে, এখনই জানতে চাওয়া ঠিক হবে না। দীপকাকুর মুড একদমই ভাল নেই।

.

চারতলা থেকে লিফটে করে নেমে এল ঝিনুকরা। লাউঞ্জের বাইরে ঝাঁ ঝাঁ রোদ। অফিসের মধ্যে বসে টের পাওয়া যায়নি বেলা এত বেড়েছে।

মেন গেটের একটু ভিতরে দীপকাকুর বাইক। বড্ড তাড়াতাড়ি হেঁটে যাচ্ছেন সেটা লক্ষ করে। তাল রাখতে প্রায় দৌড়তে হচ্ছে ঝিনুককে।

বাইকের সামনে গিয়ে দীপকাকু কেমন জানি থমকে গেলেন। ঝিনুক ততক্ষণে পৌঁছে গিয়েছে পাশে। স্পিডোমিটারের কাচের উপর একটা চিরকুট। তুলে নিলেন দীপকাকু। নিজে পড়ে ঝিনুকের হাতে দিলেন। চিরকুটে লেখা— “কেসটা ছেড়ে দিন। আগুনে হাত দেবেন না।” গোটা গোটা অক্ষর, কম্পিউটার প্রিন্ট। বারচারেক পড়ে মুখ তোলে ঝিনুক, দীপকাকু পাশে নেই! কোথায় গেলেন?

এপাশ-ওপাশ তাকাতে চোখে পড়ে, গেটে দাঁড়ানো সিকিউরিটি গার্ডের সঙ্গে কথা বলছেন দীপকাকু। গার্ডের হাবেভাবে বিস্ময়। বাইকের দিকে বারবার দেখছে আর মাথা নাড়ছে। এখানে দাঁড়িয়েই ঝিনুক বুঝতে পারে, লোকটা খেয়ালই করেনি বাইকের সামনে কেউ এসেছিল কি না!

দীপকাকু ফিরে আসছেন। মুখ-চোখ ভীষণ সিরিয়াস। একটু যেন রাগও ঘনিয়েছে মুখে! ঝিনুকের সামনে এসে ব্রাউন প্যাকেটটা ধরতে দিলেন। বাইকের হ্যান্ডেল ধরে স্টার্ট কিক মারতে মারতে বললেন, “আবার খবর বেরিয়ে গেল!”