ডায়েরির সংকেত – ২

কথা ছিল সকাল আটটায় আসার। সাড়ে সাতটায় হাজির দীপকাকু। ঝিনুক সবে বিছানা থেকে উঠে আড়মোড়া ভাঙছে। এফএম রেডিয়োতে বাজছে রবীন্দ্রসংগীত। দীপকাকুর সাড়া পেয়ে বিছানা থেকে লাফিয়ে নামে ঝিনুক। দ্রুত রেডি হতে থাকে।

কাল সন্ধেবেলা ঝিনুকের ফোনের পর শ্রবণা তার বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করে। ঠিক একঘণ্টা পর রিংব্যাক করে শ্রবণা। বলে, “দিদাকে বলা হয়েছে তোর দীপকাকুর কথা। কালই দেখা করতে চান দিদা। পারবি নিয়ে আসতে?”

“কেন পারব না! ক’টায়, কোথায় যেতে হবে বল?”

“সকাল ন’টা-দশটা। দিদার বাড়িতেই। আমরা ওখানেই থাকব।”

“ঠিক আছে,” বলে, ফোন রেখে দেয় ঝিনুক।

দীপকাকু জেনে নেন কী কথা হল। তারপর বলেন, “আবার শ্রবণাকে ফোন করো। বলো, ওর বাবা-মা যেমন যাচ্ছেন, যান। আমরা ওকে তুলে নেব।”

“কেন?” অবাক হয়ে জানতে চায় ঝিনুক।

“ওর দিদার সম্বন্ধে কিছু তথ্য আগেভাগে জেনে নিতে হবে।”

“সে তো ওর বাবা-মাও দিতে পারতেন!”

“বড়দের তথ্যের চেয়ে তোমাদের বয়সিদের তথ্য অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। কেননা তা কখনওই বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয় না।”

কথাটা মাথায় ঠিকঠাক না ঢুকলেও, আগাম একটা উত্তেজনা বোধ করছিল ঝিনুক। তা হলে কি সত্যিই সে কোনও রহস্যজনক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে? তখনই বাদ সেধেছিলেন মা। বলে ওঠেন, “তোর কী দরকার এসবের মধ্যে থাকার? তুই বলে রেখেছিস, দীপঙ্কর পৌঁছে যাবে। ব্যস, মিটে গেল!”

সে-যাত্রায় দীপকাকুই বাঁচান। বলেন, “না, বউদি, আমাকে ইনট্রোডিউস করার জন্য ঝিনুককে একবার অন্তত দরকার। যতদূর বোঝা যাচ্ছে, ভদ্রমহিলা এখনও পুলিশের কাছে যাননি। কোনও কারণে ঘটনাগুলো গোপনই রাখতে চান। বিশ্বস্ত মানুষ ছাড়া মুখ খুলবেন না। সেক্ষেত্রে ঝিনুক সঙ্গে থাকলে মহিলা হয়তো আমার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত বোধ করবেন।”

দীপকাকুর কথায় বাবাও সায় দেন। তখনই ঠিক হয়ে যায় প্রোগ্রাম।

নিজের আলমারি খুলে দাঁড়িয়ে আছে ঝিনুক। ভাবছে কী পরা যায়! ডিটেকটিভ কাহিনিতে ঢুকতে যাচ্ছে, জিন্‌স, ক্যাজুয়াল টপই বোধহয় মানাবে। কিচেন থেকে মায়ের গলা ভেসে আসে, “দীপঙ্কর একটু বোসো, একেবারে ব্রেকফাস্ট করে বেরবে।’

ড্রয়িং থেকে দীপকাকু বললেন, “না বউদি, দেরি হয়ে যাবে। শুধু চা। ঝিনুককে তাড়াতাড়ি রেডি হতে বলুন।”

ঝিনুক একদম টিপটপ হয়ে ড্রয়িংয়ে এসে দাঁড়ায়। প্লেটে ঢেলে তাড়াতাড়ি চা খাচ্ছেন দীপকাকু। কিন্তু এ কী ড্রেস! সদ্য চান করা, পেতে আঁচড়ানো চুল, ইন না-করে পরা আদ্যিকালের সাদা শার্ট। কালো প্যান্ট। কাবলি জুতো। পকেটে পেন। চোখে ঢাউস চশমা। একেই বোধহয় বলে, সওদাগরি অফিসের কনিষ্ঠ কেরানি। ঝিনুক ভাবে, বেকার সে এত চিন্তাভাবনা করে ড্রেস করল!

ঝিনুককে দেখে দীপকাকু বললেন, “চলো, বেরিয়ে পড়া যাক।”

জানলার কাছে আয়না রেখে মেজাজে দাড়ি কাটছেন বাবা। আয়না থেকে মুখ না সরিয়েই বাবা টিপ্পনী কাটলেন, “যাওয়ার পথে কালীঘাটে একটা পুজো দিয়ে যাস। আর হ্যাঁ, আমার গাড়িটা নিতে পারিস। মক্কেলকে ইমপ্রেস করা যাবে। অফিসের জন্য আমি না হয় ট্যাক্সি নিয়ে নেব।”

বাবার খোঁচা গায়ে মাখেন না দীপকাকু। ঝিনুকরা বেরিয়ে পড়ে।

.

ঝিনুকদের গাড়িটা ব্যবহার করতে কোনও দ্বিধা দেখাননি দীপকাকু। আশুদা গাড়ি চালাচ্ছে। মুখ একটু থমথমে। মনে হয় পছন্দ করছে না দীপকাকুকে। কাল গড়িয়াহাটে ঘোরার ব্যাপারটা চেপে যাওয়ার জন্য মায়ের কাছে বকুনি খেয়েছে। বেচারা আশুদা!

গাড়ির পিছনের সিটে শ্রবণা, দীপকাকু, ঝিনুক। ওয়ারলেস মাঠের সামনে থেকে শ্রবণাকে তোলা হয়েছে। ও রেডি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দীপকাকু একটার পর একটা প্রশ্ন করে শ্রবণার থেকে জেনে নিচ্ছেন ওর দিদার সবিস্তার। ওদের কথোপকথনে কান রেখে জানলার বাইরে তাকিয়ে আছে ঝিনুক।

দীপকাকুর প্রশ্নের উত্তরে শ্রবণা এতক্ষণ যা-যা বলেছে, তা মোটামুটি এরকম— ওর দিদার নাম অপরাজিতা বসু। বয়স প্রায় ষাট। তখনকার দিনে বেশ উচ্চশিক্ষিত। ইতিহাসে এমএ। বছর পনেরো হল স্বামী মারা গেছেন। বাড়িটা ওঁর শ্বশুরমশাই কিনেছিলেন এক সাহেবের কাছ থেকে। এ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাহেব সস্তায় বাড়িটা বিক্রি করে দিয়ে যায়। অপরাজিতার স্বামী ছিলেন একমাত্র সন্তান। অতএব বাড়িটার মালিক এখন অপরাজিতা দেবী। স্বামী ছিলেন সফল ব্যবসায়ী। ট্যাংরায় জুতো তৈরির কারখানা ছিল। কারখানাটা আপাতত লিজে দেওয়া আছে। সেখান থেকেই অপরাজিতা দেবীর যা কিছু আয়। একসময় অতি সচ্ছল অবস্থায় থাকার কারণে ওঁর খরচের হাতটা বেশ বেশি। না চাইতেই তিন মেয়ের জন্য যথেষ্ট ব্যয় করেন। শ্রবণার হয়েছে খুব সুবিধে, বায়না করলেই জিনিস পেয়ে যায়। রিসেন্টলি একটা মোবাইল ফোনের সেট বাগিয়েছে দিদার থেকে। বিশাল বাড়িটা মেনটেন করতেও বেশ কিছুটা খরচ হয়। নীচের তলাটা তাই ভাড়া দিতেন। শেষ ভাড়াটে অপঘাতে মারা যাওয়ার পর আর ভাড়া দেননি। “অপঘাত মানে? কীভাবে মারা গিয়েছিলেন?” শ্রবণার বর্ণনায় বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করেন দীপকাকু

শ্রবণা বলে, “সুইসাইড। বিষ খেয়েছিলেন।”

তারপর শ্রবণা আরও কিছু বলে যাচ্ছিল, দিদার হাইপ্রেশার। কী কী খেতে ভালবাসেন। গুনগুন করে এত সুন্দর গান করেন, অনেক বড় বড় শিল্পীর তাক লেগে যাবে… বোঝা যাচ্ছিল, শ্রবণা তার দিদাকে খুবই ভালবাসে।

দীপকাকু গুম মেরে বসে আছেন। গাড়ি লেনিন সরণি ক্রস করে ক্রিক রো-তে ঢুকে পড়ল।

.

বাইরে থেকে বাড়িটার প্রাচীনত্ব, বিশালতা কিছুই বোঝা যায় না! লোহার উঁচু গেটটুকু বাদ দিয়ে পাঁচিলের গায়ে পান-সিগারেটের দোকান। চা গুমটি। আর একটা প্লাস্টিক ছাউনির অস্থায়ী সংসার। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে হর্ন দিতেই কে যেন এসে খুলে দিল! নুড়ি বিছানো রাস্তা। ঝিনুকদের গাড়ি গিয়ে দাঁড়াল পোর্টিকোর তলায়। শ্রবণার বাবা নেমে এসেছেন নীচে। ঝিনুকের সঙ্গে হাসি বিনিময় হল। দীপকাকুকে নমস্কার করে বললেন, “আমি হচ্ছি শ্রবণার বাবা। সমীর সেন।”

প্রতিনমস্কারে দীপকাকু বললেন, “আমি দীপঙ্কর বাগচী। প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর।”

“হ্যাঁ, শ্রবণা আমাকে সব বলেছে। সেই অনুযায়ী ওর দিদাকেও বলেছি। আসুন, উনি আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।”

পুরনো আমলের কাঠের চওড়া সিঁড়ি ধরে উপরে উঠে এল ঝিনুকরা। লম্বা ফালি বারান্দা। কোমর সমান লোহার নকশাকাটা গ্রিল। সমীর আঙ্কল যে ঘরটায় নিয়ে এলেন, সেটাকে কিছুতেই ড্রয়িংরুম বলে চালানো যাবে না। ‘বৈঠকখানা’ বলাই ভাল। বিশাল দরজা, জানলার মাথায় রঙিন কাচের আর্চ। মেঝেতে পুরনো দিনের চৌখুপি, বড় বড় সাদা-কালো টাইল্স। এ ঘরে আগেও একবার এসেছে ঝিনুক। সেদিনের মতো আজও পরিপাটি করে সাজানো আলমারি-ভরতি বই। দেওয়ালে নানান সাইজ়ের অয়েল পেন্টিং। কালো পালিশের প্রকাণ্ড সোফা, সেন্টার টেবিল, কর্নার-র‍্যাক, সবকিছুর মধ্যেই প্রাচীন ঐতিহ্যের ছোঁয়া। এমনকী ঘরের কোণে চোঙাওলা গ্রামাফোন পর্যন্ত আছে। আগেরবার এত খুঁটিয়ে ঝিনুক এসব লক্ষ করেনি। এটা কি দীপকাকুর সঙ্গে আসার ফল?

সোফায় বসে ঘরের চারপাশে চোখ বোলাচ্ছেন দীপকাকু। মুখে কীসের যেন অসন্তুষ্টি! সমীর আঙ্কল আর শ্রবণা গেছে অপরাজিতা দেবীকে ডাকতে। বাড়িটা বড্ড নিঝুম। দূরে কোনও গলিতে ফেরিওলা ডেকে যাচ্ছে। ক্রিক রো থেকে ভেসে আসছে গাড়ি এবং হাতে-টানা রিকশা চলাচলের আওয়াজ। কলকাতাটা যেন পিছিয়ে গেছে পঞ্চাশ-ষাট বছর!

কিছুক্ষণের মধ্যেই অপরাজিতা দেবী এলেন। ঝিনুক উঠে গিয়ে প্রণাম করল। বলল, “চিনতে পারছেন?”

ঝিনুকের থুতনি ধরে আদর করে অপরাজিতা দেবী বললেন, “কেন চিনব না! তুমি তো ঝিনুক। ভাল নাম আঁখি। শ্রবণার সঙ্গে একবারই এসেছিলে।”

শ্রবণার দিদার স্মৃতিশক্তি দেখে কৃতার্থ হয় ঝিনুক, ভাল নামটা অবধি মনে রেখেছেন! একই সঙ্গে খারাপ লাগে, চার মাস আগের সেই স্নিগ্ধ, লাবণ্যময়ী ভাবটা একটু যেন কম পড়ে গেছে ওঁর চেহারায়। দুশ্চিন্তার কারণেই হয়তো।

সমীর আঙ্কল আলাপ করিয়ে দিলেন দীপকাকু, অপরাজিতা দেবীর মধ্যে। অপরাজিতা দেবী সোফায় বসতে যাচ্ছেন, দীপকাকু বললেন, “চিঠি দুটো সঙ্গে আছে?”

মাথা হেলিয়ে অপরাজিতা দেবী আঁচলের আড়ালে রাখা দুটো ভাঁজ করা কাগজ এগিয়ে দিলেন। কাগজ দুটো নিয়ে দীপকাকু প্রথমে পকেট থেকে ম্যাগনিফায়িং গ্লাস বের করলেন। ঝিনুক ভাবে, অত পুরু লেন্সের চশমাতেও হল না, আতশ কাচ লাগবে! খুব দ্রুত আতশ কাচ সামনে রেখে চিঠি দুটো পড়ে নিলেন দীপকাকু। তারপর কাগজ দুটো এক-এক করে আলোর দিকে ধরলেন। ফের আতশ কাচ দিয়ে কীসব দেখলেন খুঁটিয়ে। চিঠি দুটো টেবিলে নামিয়ে রাখলেন। ঘর নিস্তব্ধ। ঝিনুকের চিঠি দুটো দেখতে বড্ড কৌতূহল হচ্ছে।

ইতিমধ্যে ঘরে ঢুকলেন শ্রবণার মা। মায়ের সঙ্গে দীপকাকুর আলাপ করাতে যাচ্ছিল শ্রবণা, কথা শুরুর মুখে দীপকাকু প্রচণ্ড বিরক্তির শব্দ করে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “আপনারা তো একটা গুরুত্বপূর্ণ ভুল করে বসে আছেন!”

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সবাই দীপকাকুর দিকে তাকাল। সমীর আঙ্কল বললেন, “কী ভুল?”

“কালকের লন্ডভন্ড ঘরটা আবার সাজাতে গেলেন কেন? আপনারা নিজের হাতেই নষ্ট করেছেন অনেক সূত্র।”

অপরাধী গলায় অপরাজিতা দেবী বললেন, “আসলে ঘর এলোমেলো থাকলে আমার ভীষণ অস্বস্তি হয়। তার উপর শোওয়ার ঘরটা না গোছালে ঘুমোতাম কী করে?”

“আশ্চর্য! আপনার ঘুমটাই বড় হল!” বলে, সজোরে পায়চারি করতে থাকেন দীপকাকু। ঝিনুক বুঝতে পারে, এ ঘরে এসে থেকে কেন দীপকাকুর মুখে অসন্তোষ লেগে ছিল।

সাময়িক একটা বিরতি পেয়ে ঝিনুক টেবিল থেকে চিঠি দুটো তুলে নিল। চোখ বোলাতেই বুক হিম হয়ে যায় ঝিনুকের। কম্পিউটারে বাংলা হরফে লেখা চিঠি। একটায় লেখা—

‘যে মূল্যবান জিনিসটি আপনার কাছে আছে, সেটা চাই। যদি রাজি থাকেন, কাল সকালে নীল শাড়ি পরে বারান্দায় দাঁড়ান। পরে যোগাযোগ করে নেব। রাজি না হলে আপনার মৃত্যু নিশ্চিত।’

দ্বিতীয় চিঠি—

‘অযথা ঝুঁকি নিচ্ছেন। আরও এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হল। মৃত্যুটা কিন্তু যন্ত্রণাদায়ক হবে।’

বোঝাই যাচ্ছে প্রথম চিঠির প্রস্তাবে রাজি হননি অপরাজিতা দেবী। তারপরই আসে দ্বিতীয় চিঠি। ঝিনুক অবাক হয়ে ভাবে, এরকম দুটো মারাত্মক চিঠি পড়ার পর, কী করে এত নির্বিকার থাকলেন দীপকাকু! তাঁর মাথায় এখন ঘুরছে, কেন ঘরটা গোছানো হল?… পায়চারি থামিয়ে দীপকাকু অপরাজিতা দেবীকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমাকে একটা কথা স্পষ্ট করে বলুন তো, এত কিছুর পরেও কেন পুলিশকে খবর দেননি?”

“পুলিশ সম্বন্ধে আমার একধরনের বিরক্তি এসে গেছে।”

“কেন?”

দীপকাকুর প্রশ্নে অপরাজিতা দেবী বললেন, “আমার নীচের ঘরে ভাড়া ছিলেন সত্যবান মিত্র। দু’মাস হল মারা গেছেন। সুইসাইড। সে-সময় পুলিশ এসে দিনের পর দিন আমাকে জেরা করেছে। এমন আতঙ্ক হয়ে গিয়েছিল, আমি ঘুমের মধ্যেও পুলিশি জেরা শুনতে পেতাম। আমার কাজের লোকেরাও অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। ভদ্রলোক পড়াশোনা নিয়েই থাকতেন। অত্যন্ত ভাল মানুষ। কেন যে হঠাৎ…”

“হুম!” বলে, সোফায় ফিরে এলেন দীপকাকু। আবার সরাসরি প্রশ্ন করলেন অপরাজিতা দেবীকে, “চিঠি দুটো তো কম আতঙ্কের নয়। আপনি ভয় পাননি?” মৃদু হেসে অপরাজিতা দেবী বললেন, “এই বয়সে আর মৃত্যুভয় পাই না। মরতে তো একদিন হবেই! আমার জীবনে আর বাকিটা কী আছে?”

একটুও না দমে দীপকাকু বললেন, “কিন্তু যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু নিশ্চয়ই কাঙ্ক্ষিত নয়?”

অপরাজিতা দেবীর আচরণে সামান্য অপ্রস্তুত ভাব। বললেন, “সেটা ঠিক। আর তাই জন্যেই আপনাকে ডাকা।”

প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দীপকাকু বললেন, “মূল্যবান বস্তুটি কী? একবার দেখতে পারি?”

“সেটাই তো বুঝতে পারছি না!” অসহায়ভাবে বললেন অপরাজিতা দেবী। ভ্রু কুঁচকে যায় দীপকাকুর। অবাক কণ্ঠে বলে ওঠেন, “তার মানে আপনি জানেন না, আপনার কাছে কী চাওয়া হচ্ছে?”

“ঠিক তাই!” এটা বললেন সমীর আঙ্কল। তারপর বুঝিয়ে বলার ভঙ্গিতে শুরু করলেন, “দেখুন দীপঙ্করবাবু, এ বাড়ির অনেক কিছুই পুরনো আমলের। ফার্নিচার থেকে শুরু করে নানান শো পিস। দুষ্প্রাপ্য বই। কোনটা যে কত পুরনো এবং অতি মূল্যবান সেটা আমার মাদার-ইন-ল বুঝতে পারছেন না!

“এটা বোঝার অবশ্য একটা সহজ উপায় আছে। কিউরিয়ো-র এক্সপার্ট ডেকে নিয়ে এসে এ বাড়ির জিনিসগুলোকে একবার পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া যায়।” বলে, চুপ করে ভাবতে লাগলেন দীপকাকু

শ্রবণার মা এতক্ষণ শুধু শুনে যাচ্ছিলেন, এবার তাঁর মায়ের উদ্দেশে বলে উঠলেন, “মা, তোমার গয়নাগাটিগুলোর কথা বলো।”

“সে আর কী বলব! তিন মেয়ের বিয়ে দিতে অনেকটাই বেরিয়ে গেছে। আছে যে ক’টা, সবই পুরনো আমলের। রাজা-রানি, নবাব আমলের হলেও অবিশ্বাস করার উপায় নেই। আমার শ্বশুরমশাইয়ের পুরনো জিনিস কেনার ঝোঁক ছিল।”

অপরাজিতা দেবীর কথাগুলো মনস্ক ছাত্রের মতো শুনছেন দীপকাকু। ঝিনুক দীপকাকুকে এরকম ভঙ্গিতে আগে কখনও দেখেনি। এই ছটফট করছেন, পরক্ষণেই শান্ত। অপরাজিতা দেবী বললেন, “গয়নাগুলো কি আপনি একবার দেখবেন?”

“এখন না। আচ্ছা, আপনি ওগুলো ব্যাঙ্কের ভল্টে রাখেননি কেন?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

“সে অনেক ঝামেলার। তা ছাড়া বললাম তো, বেশি কিছু নেই। আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে বিয়ে-থা লেগেই থাকে, আমার মেয়েরা, নাতনিরা পরতে চায়।”

অপরাজিতা দেবীর কথা কেড়ে নিয়ে শ্রবণার মা বললেন, “একটা সোনার কোমরবন্ধ আছে, আর নবাব আমলের মুক্তোর মালা।”

“আপনি কী করে জানলেন ওটা নবাব আমলের?” দীপকাকুর প্রশ্ন।

শ্রবণার মা বললেন, “বাবা আমাদের গল্প করেছেন।”

দীপকাকু হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “আমি একবার শোওয়ার ঘরটা দেখব।”

সমীর আঙ্কল বললেন, “অবশ্যই, আসুন!”

ঝিনুকরা সবাই মিলে অপরাজিতা দেবীর শোওয়ার ঘরে আসে। বৈঠকখানার মতো এই ঘরটাও সুন্দর করে সাজানো। কারুকাজ করা পালঙ্ক। বড় বড় দুটো আলমারি। একটা কাঠের, অন্যটা স্টিলের। ওয়ার্ডরোব, উঁচু বুককেস। ঘরে একমাত্র বেমানান আধুনিক জিনিসটি হচ্ছে রেফ্রিজারেটর। খড়খড়ি দেওয়া জানলা তিনটে হাট করে খোলা। বাইরে ঝকঝকে রোদ্দুর।

ঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে দীপকাকু চলে গেলেন জানলার কাছে। ঝিনুকও গেল। জানলার নীচে বাগান। দীপকাকু জানলার গরাদগুলো টেনে টেনে দেখছেন, পরীক্ষা করছেন ছিটকিনিগুলো। কাজ করতে করতেই অপরাজিতা দেবীকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি যখন লাইব্রেরি যাওয়ার জন্য বেরলেন, নিজের হাতেই বন্ধ করেছিলেন দরজা-জানলা, নাকি কোনও কাজের লোক হেল্প করেছিল? ভাল করে মনে করুন।”

একটু ভেবে নিয়ে অপরাজিতা দেবী বললেন, “আমিই করেছিলাম। পুরো মনে করতে পারছি।”

“ফাইন!” বলে, দীপকাকু এবার যেটা শুরু করলেন, তা দেখে ঝিনুক একেবারে থ! পকেট থেকে মেজারমেন্ট টেপ বের করে গরাদের দূরত্ব মাপছেন। আবার বেরল আতশ কাচ, গভীর মনোযোগ দিয়ে নিরীক্ষণ করতে লাগলেন গরাদ, কাঠের ফ্রেম। কাজ শেষ করে ঘুরে দাঁড়ালেন। অপরাজিতা দেবীকে বললেন, “গয়নাগাটি নিশ্চয়ই ওই স্টিলের আলমারিতে ছিল?”

ঘাড় হেলালেন অপরাজিতা দেবী। দীপকাকু এগিয়ে গেলেন আলমারির সামনে। এবার পকেট থেকে বের হল পেনসিল টর্চ। আলো জ্বালিয়ে চাবির ফুটো পরীক্ষা করতে লাগলেন। চোখের সামনে ধরলেন আতশ কাচ। অপরাজিতা দেবীর উদ্দেশে বলে উঠলেন, “ঘটনার পর গয়নাগুলো আছে কিনা দেখে নিয়েছিলেন?”

“দেখেছিলাম। আছে।” বললেন অপরাজিতা দেবী।

সবাইকে থতমত খাইয়ে দীপকাকু এবার জ্বলন্ত টর্চ নিয়ে ঘরে হামাগুড়ি দিতে শুরু করেছেন। ঝিনুকের ভারী অস্বস্তি হচ্ছে। বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে ব্যাপারটা। এঁরা কী ভাবছেন কে জানে!

খাটের তলায়, আলমারির নীচে আলোকিত টর্চ বুলিয়ে উঠে দাঁড়ালেন দীপকাকু। এতক্ষণের কর্মকাণ্ডে অদ্ভুত চেহারা হয়েছে তাঁর। চুল উসকোখুসকো, নাকের ডগায় চশমা, সামান্য জোরে শ্বাস নিচ্ছেন। একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন, “আপনাদের আর একটু কষ্ট দেব।”

“না, না, বলুন, কষ্টের কী আছে!” সবিনয়ে বললেন সমীর আঙ্কল।

“এই ঘরটাকে গতকাল সন্ধের মতো এলোমেলো করতে হবে। জানি, ব্যাপারটা হয়তো ততটা নিখুঁত হবে না। তবু যতটা পারা যায়।”

সত্যিই এ বাড়ির সবাই খুব ভদ্র, কেউ আপত্তি তুললেন না। অপরাজিতা দেবীর উদ্দেশে দীপকাকু বললেন, “আপনাকে কিছু করতে হবে না। আপনি শুধু বর্ণনা করে যান। আমি আর সমীরবাবু জিনিসগুলো কালকের মতো করে নিচ্ছি।”

মাথা হেলিয়ে অপরাজিতা দেবী বর্ণনা দিতে শুরু করলেন, “আলনার সব শাড়ি, কাপড় মাটিতে ফেলা ছিল। ড্রেসিং টেবিলের সব দেরাজ খোলা। রাইটিং টেবিলের ফাইলগুলো বিছানায় ওলটপালট করে রাখা। বুকশেলফের বেশকিছু বই মেঝেতে পড়েছিল…”

এই সময় ঝিনুকের কনুই ধরে কে যেন টান মারে! ঘুরে তাকাতে দেখে শ্রবণা, চোখের ইশারায় বাইরে যেতে বলছে।

ঘরের বাইরে এসে শ্রবণা হতাশ ভঙ্গিতে বলে ওঠে, “হ্যাঁ রে, সত্যি করে বল তো লোকটা পাগল না জিনিয়াস?”

আমতা-আমতা করে ঝিনুক বলল, “দুটোর মাঝামাঝি। খুবই উঁচু মানের গোয়েন্দা, দারুণ দাবা খেলেন।”

শেষ কথাটা বলে ফেলে বিব্রত বোধ করে ঝিনুক, সার্থক গোয়েন্দার ভাল দাবা খেলাটা কতটা আবশ্যক, জানে না সে। শ্রবণার চিন্তিত মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, কথাটা মনে ধরেনি। শ্রবণা বলে ওঠে, “ওঁর সল্ভ করা মেজর কোনও কেসের কথা তোর জানা আছে?”

“নিশ্চয়ই! বেহালার ব্যবসায়ী পুত্র অপহরণ, বারাসাতে জাল নোটের চক্র, সোনারপুরের মন্দিরে অষ্টধাতুর মূর্তি চুরি…” মিথ্যেগুলো বলতে একটুও গলা কাঁপছে না ঝিনুকের। আসলে ঘটনাগুলো নিউজ পেপারের মাধ্যমে এত চেনা-চেনা ঠেকে, চট করে কেউ অবিশ্বাস করতে পারবে না। যদিও শ্রবণার মুখ থেকে এখনও সন্দেহের মেঘ কাটেনি।

বাঁচিয়ে দিল এ বাড়ির কাজের মহিলা এসে। মাঝবয়সি, আচরণে জড়সড় ভাব। সম্ভবত লক্ষ্মীমাসি। তার পিছনেই দু’ধাপ সিঁড়ি নীচে দাঁড়িয়ে আছে যে লোকটা, হয় ড্রাইভার, নয়তো বিনায়কদা। গতবার যখন এসেছিল ঝিনুক, ভাল করে লক্ষ করেনি এদের। লক্ষ্মীমাসি ভয় পাওয়া গলায় শ্রবণাকে বলে, “পুলিশ এসেছে নাকি গো দিদি? উপরতলায় কীরকম হুডুমদুড়ুম আওয়াজ হচ্ছে!”

“না, পুলিশ নয়। তোমরা তোমাদের কাজে যাও।” গম্ভীরভাবে বলে শ্রবণা। লক্ষ্মীমাসি মোটেই জায়গা ছাড়ে না। সেখানে দাঁড়িয়েই উঁকিঝুঁকি মারতে থাকে ঘরের দিকে। শ্রবণা, ঝিনুক ঘরে ঢুকে যায়।

পরিপাটি ঘরটার কী বিচ্ছিরি অবস্থা হয়েছে এখন! চারদিকে জিনিসপত্তর ছড়ানো-ছেটানো। গালে হাত দিয়ে একদৃষ্টিতে সে-সবের দিকে তাকিয়ে আছেন দীপকাকু। এত কিছুর পরেও বিরক্ত না হয়ে অপরাজিতা দেবী বললেন, “ও, বলা হয়নি! ফ্রিজে যা মিষ্টি ছিল, সব খেয়েছে। ফ্রিজ থেকে জল খেয়ে বোতলটা এখানে রাখা ছিল…”

বোতলটা নিচু টেবিলের উপর রেখে কাজ শেষ করলেন অপরাজিতা দেবী। দীপকাকু একই ভঙ্গিতে। হঠাৎ স্ট্যাচু ভেঙে বলে উঠলেন, “ঠিক আছে, জিনিসগুলো গুছিয়ে নিন। আমি একবার বাড়ির পিছনের বাগানটা দেখব।”

শ্রবণার বাবা সঙ্গে সঙ্গে রাজি। ঝিনুক একটু দোটানায় পড়ে যায়। সে ছাড়া ঘরের তিন মহিলা জিনিসগুলো গোছাচ্ছে, সাহায্য করা উচিত। ওদিকে দীপকাকু কী করেন সেটা দেখার জন্যেও ভীষণ কৌতূহল হচ্ছে। শেষমেশ দীপকাকুদেরই ফলো করে ঝিনুক।

.

বাড়ির পিছনের বাগানটা ভীষণ নিরালা। বড় বড় গাছ। দু’-চারটে পাখিও ডাকছে। দারুণ পরিবেশ! বাগান-শেষে উঁচু পাঁচিল। বোঝাই যাচ্ছে এদিকে কেউ খুব একটা আসে না। বাগানটা দেখতে গিয়ে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল ঝিনুক। হঠাৎ দেখে বাড়ির দেওয়াল থেকে ফিটতিনেক ছেড়ে হেঁটে যাচ্ছেন দীপকাকু। দৃষ্টি মাটির দিকে। সঙ্গে সঙ্গে পাশে গিয়ে হাঁটতে থাকে ঝিনুক। পিছনে সমীর আঙ্কলও আসছেন। অপরাজিতা দেবীর ঘরের নীচে এসেও দীপকাকুকে দাঁড়াতে না দেখে ঝিনুক বলল, “জানলা দিয়ে ঢোকেনি তো?”

দীপকাকু বললেন, “সে চান্স নেই। কোনও পাইপ নেই দেওয়ালে। কার্নিস থেকে কার্নিসের দূরত্বও অনেক।”

“রক ক্লাইম্বিং-এর কায়দায় দড়ি ছুড়ে ওঠা যেতে পারে।”

উত্তরে দীপকাকু বললেন, “তা পারে। কিন্তু গরাদের ওইটুকু ফাঁক দিয়ে গলবে কীভাবে?”

ঝিনুক বুদ্ধি করে বলল, “বাচ্চা ছেলেকে দিয়ে যদি কাজটা করায়?”

দীপকাকুর মুখে মিটমিটে হাসি। বললেন, “বুদ্ধিটা বড্ড উপর-উপর খাটাচ্ছ। তলিয়ে ভাবো। বাইরে থেকে ছিটকিনি খোলা যতটা সহজ, বেরিয়ে এসে বন্ধ করা তার চেয়ে অনেক শক্ত। তা ছাড়া দুটো ঘরের ভিতরে যে তাণ্ডবটা চলেছে, সেটা কোনও বাচ্চা ছেলের কম্মো নয়। উঁচু উঁচু তাক থেকে জিনিস ছুড়ে ফেলা হয়েছে। আর আমি জানলা, গরাদগুলো ভাল করে পরীক্ষা করে দেখেছি, ছিটকিনি লুজ নেই, কোনও দড়ি বা আংটার দাগ নেই জানলার ফ্রেমে।”

পুরোপুরি দমে যায় ঝিনুক। মাটির দিকে তাকিয়ে হেঁটেই যাচ্ছেন দীপকাকু। অপরাজিতা দেবীর ঘরের পর দোতলা শেষ। তারপর একতলার শেষ ঘর। ছোট ছোট দুটো জানলা। সমীর আঙ্কলের উদ্দেশে দীপকাকু বললেন, “এটা নিশ্চয়ই এ বাড়ির ভাঁড়ারঘর?”

“হ্যাঁ। এখন আর ব্যবহার হয় না। তালা দেওয়াই থাকে।” বললেন সমীর আঙ্কল।

“কাজের লোকেরা কোথায় থাকে?”

“নীচের তলায়। রান্নাঘরের পাশে একটা ঘর আছে।”

“আর ভাড়াটে কোন ঘরে ছিলেন?”

“সামনের দিকে। একদম সেপারেট অ্যাকোমোডেশন। শ্বশুরমশাইয়ের আমলে ওটাই ছিল গেস্টরুম। ব্যাবসাসূত্রে যে-সব ভিনরাজ্যের ব্যবসায়ী শ্বশুরমশাইয়ের কাছে আসতেন, ওখানেই থাকার বন্দোবস্ত হত।”

সমীর আঙ্কলের কথা শেষ হতেই মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। ঝিনুক জানে, আওয়াজটা দীপকাকুর সেটের। ঝিনুকদের বাড়ি থাকাকালীন ফোনটা কদাচিৎ বেজেছে, বিদঘুটে শব্দ, তাই ভোলা যায় না।

প্যান্টের পকেট থেকে ফোনসেট বের করে নম্বর দেখলেন দীপকাকু। ঝিনুকের দিকে ফোনটা বাড়িয়ে বললেন, “রজতদার ফোন। ছোট করে কথা সারো। বলে দাও, আপাতত ফোন না করতে।”

সুইচ টিপে কানে ফোন নেয় ঝিনুক, “হ্যাঁ, বাবা বলো।”

অপর প্রান্তে বাবা বললেন, “তোদের তদন্তের কতদূর? পুরনো বাড়ির অ্যান্টিক দাবার বোর্ড বের করে খেলতে বসে গেছে নাকি দীপঙ্কর?”

ঝিনুক হাসে। বলে, “বাড়ি গিয়ে সব বলব। তুমি এখন আর ফোন কোরো না।”

“ওকে, আমি তা হলে একটা জমজমাট রহস্য কাহিনি শোনার অপেক্ষায় থাকছি। উইশ ইউ বেস্ট অফ লাক।”

ফোন ছেড়ে দেন বাবা। ঝিনুক সেটটা ফেরত দিতে যাবে, দেখে, দীপকাকু মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছেন। হঠাৎ চাপা উত্তেজনায় বলে উঠলেন, “এই তো!”

সমীর আঙ্কল বললেন, “কী?”

ঝিনুকও ঝুঁকে দাঁড়ায়। দীপকাকুর সামনে মাটিতে ছোট ছোট দুটো আয়তাকার গর্ত। ঝিনুক জিজ্ঞেস করল, “কীসের গর্ত?”

“এখানেই মই লাগিয়েছিল।” বলে, আবার ফিতে বের করে গর্ত দুটোর দূরত্ব এবং গভীরতা মাপতে শুরু করেন দীপকাকু।

সমীর আঙ্কল বললেন, “মই লাগালে তো গর্তগুলো গোল হত। এ তো দেখছি রেকট্যাঙ্গুলার!”

“মই সবসময় বাঁশেরই হবে, ধরে নিচ্ছেন কেন? ব্যবহার করেছে স্টিলের ফোল্ডিং ল্যাডার।” বলে, সোজা হয়ে দাঁড়ালেন দীপকাকু। একতলার ছাদের দিকে তাকিয়ে পিছু হটতে থাকলেন।

সমীর আঙ্কল বললেন, “একতলার ছাদে না হয় উঠল। কিন্তু সেখান থেকে তো দোতলার বারান্দাটা বেশ উঁচুতে। পার হল কী করে?

“কোনও ব্যাপারই না। মইটা তুলে আবার ওখানে লাগিয়েছে।”

দীপকাকুর সমাধানে ভীষণ লজ্জা পেলেন সমীর আঙ্কল। বললেন, “সত্যিই তো, ওই স্টিলের মইগুলো বেশ হালকা হয়।”

থুতনি আর ঠোঁটের উপর আঙুল রেখে চোখ কুঁচকে আছেন দীপকাকু। একটু পরে বলে উঠলেন, “এত দূর তো হল, ঘরের চাবি খুলল কী করে?”

সমীর আঙ্কল, ঝিনুক দু’জনেই চুপ করে আছে। বাগানের পাখিগুলো ডাকছে নিজের মনে। স্বগতোক্তির ঢঙে দীপকাকু বললেন, “তার মানে ডুপ্লিকেট চাবি ব্যবহার করা হয়েছে।”

“এমনও তো হতে পারে লোকটা তালা খোলায় এক্সপার্ট?” বললেন সমীর আঙ্কল।

মাথা নেড়ে দীপকাকু বললেন, “সে-সম্ভাবনা নেই। তালা একবার অন্যভাবে খোলা হলে আর আগের মতো লাগানো যায় না।”

সমীর আঙ্কল এবার লজ্জা পাওয়ার বদলে সপ্রশংস দৃষ্টিবিনিময় করলেন ঝিনুকের সঙ্গে।

দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা সমীরবাবু, আপনার শাশুড়ি কি কোনও বিশ্বাসভাজনের কাছে ঘরের ডুপ্লিকেট চাবি রাখেন? এই ধরুন, আপনার মতো ঘনিষ্ঠ কেউ।”

রীতিমতো আঁতকে উঠে একহাত পিছিয়ে গেলেন সমীর আঙ্কল। বিস্ময়ের কণ্ঠে বললেন, “আপনি কি আমাকে সন্দেহ করছেন?”

“সন্দেহ করাটা যদিও আমার প্রফেশনের অঙ্গ, কিন্তু এক্ষেত্রে আমি আপনাকে উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করেছি মাত্র। বলেছি, আপনার মতো বিশ্বাসভাজন আর কেউ…”

দীপকাকুর প্রবোধ বাক্যে কাজ হল না। একটু যেন মিইয়ে গেছেন সমীর আঙ্কল। অভিমানী কণ্ঠে বললেন, “আমার মাদার-ইন-ল খুবই আত্মসচেতন এবং স্বনির্ভর। নিজের সামান্য কোনও কাজ কারও উপর চাপিয়ে দেন না।”

“খুব ভাল কথা। এবার চলুন বাড়ির কাজের লোকদের ইন্টারভিউ নেওয়া যাক।” বলে, ভিতর-বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন দীপকাকু। একটা ব্যাপার দেখে অবাক হচ্ছে ঝিনুক, এরকম একটা জটিল সমস্যার মধ্যেও ছোটখাটো রসিকতা করে যাচ্ছেন দীপকাকু। এইমাত্র সমীর আঙ্কলকে বিব্রত করলেন, কাজের লোকদের জেরা করার বদলে বলছেন ইন্টারভিউ! দীপকাকুর এই গুণটার কথা অজানা ছিল ঝিনুকের।

.

দোতলায় উঠে দীপকাকু প্রথমেই চলে গেলেন বারান্দার শেষ প্রান্তে, যার নীচেই ভাঁড়ারঘরের ছাদ। বিপজ্জনকভাবে শরীর ঝুলিয়ে রেলিং-এর উলটো পিঠে কী যেন পরীক্ষা করতে লাগলেন! সেখানেও ব্যবহার হল আতশ কাচ। অনুসন্ধানের এই পর্যায়টা অবশ্য সহজেই বুঝে গেল ঝিনুক। স্টিলের মইটা ওখানে ঠেস দেওয়া হয়েছিল কি না দেখছেন দীপকাকু। ঝিনুক কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “পেলেন দাগ?”

ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে দীপকাকু বললেন, “পেলাম।”

এবার ফালি-বারান্দার মাঝামাঝি চলে গেছেন দীপকাকু। প্যান্টের পকেট থেকে খেলনা গোছের বাইনোকুলার বের করে চোখে লাগালেন। কত কিছু আছে পকেটে! যেন মিউজিয়াম নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন! বাড়ির সামনেটায় দূরবিন-দৃষ্টি বোলাচ্ছেন এপাশ থেকে ওপাশ। ঠিক কী যে দেখছেন, বোঝা যাচ্ছে না। এ বাড়ির উত্তরে এবং দক্ষিণে দুটো চারতলা বাড়ি। মাঝে কারখানার লম্বা শেড। এরই ফাঁকে দু’-চারটে গাছপালাও চোখে পড়ছে। দীপকাকুর পাশে দাঁড়িয়ে ঝিনুক বলল, “আমি একটু দেখি?”

বাইনোকুলারটা হাতে দিলেন দীপকাকু। সেটা চোখে লাগিয়েই পিছিয়ে আসে ঝিনুক। মনে হয় এই বুঝি ঘাড়ের উপর বাড়ি, গাছপালা এসে পড়ল। তার মানে মোটেই বাচ্চাদের নয় দূরবিনটা। উত্তরের বাড়ির চারতলার জানলায় দৃষ্টি আটকে যায় ঝিনুকের। একজন উসকোখুসকো চেহারার বৃদ্ধ ঝিনুকদের দিকে তাকিয়ে আছে।

.

দীপকাকু, ঝিনুক এখন বৈঠকখানায়। এটাই এখন জেরা করার ঘর। বাড়ির মালিকপক্ষের কাউকে অ্যালাউ করা হয়নি এ ঘরে। একটা লেটার প্যাড চেয়ে নিয়েছেন দীপকাকু। নিজের পেন আর প্যাডটা দিয়ে ঝিনুককে বলেছেন, “আমার ক্রস এগজামিনেশনগুলো সামারি করে লিখে রাখো।” তারপর এক-এক করে ডাকা হল লক্ষ্মীমাসি, বিনায়কদা, ড্রাইভার রঘু-কে। ড্রাইভারকে এই প্রথম দেখল ঝিনুক। আগের দু’জনকে আগেই দেখেছে, সিঁড়ি ভেঙে উঠে এসেছিল ওরা। দীপকাকুর জেরা থেকে ঝিনুক যা-যা লিখেছে, মোটামুটি এরকম— লক্ষ্মীমাসি, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। বছর পনেরো এ বাড়িতে আছে। লক্ষ্মীমাসি শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত। তিনকুলে কেউ নেই। অপরাজিতা দেবীই ওর মা, বাবা, মালকিন, সব কিছু। এরপর এল বিনায়কদা, বয়স ষাটের উপর। বেলেঘাটায় নিজেদের বাড়ি থাকলেও যায় না। শরিকি ঝামেলা। এখানে শান্তিতে আছে। কুড়ি বছর বয়স থেকে এ বাড়ির মালিকের কারখানায় বেয়ারার কাজ করত। বাবু ভালবাসতেন খুব। উনি গত হওয়ার পর মা বাড়িতে ডেকে নেন। বিনায়কদার বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি।

লক্ষ্মীমাসি আর বিনায়কদাকে জরুরি একটা প্রশ্ন করেন দীপকাকু, “উপরে অত বড় কাণ্ড হল, তোমরা টের পেলে না!”

প্রশ্নটা ঝিনুকের মাথাতেই আগে আসা উচিত ছিল। সে দেখেছে, অপরাজিতা দেবীর ঘরটা আবার যখন ওলটপালট করছিলেন দীপকাকু, আওয়াজ শুনে এরা দু’জনেই উঠে এসেছিল উপরে। দীপকাকুর প্রশ্নের উত্তরে লক্ষ্মীমাসি, বিনায়কদা বলেছে, তখন দু’জনেই নাকি রান্নাঘরে ছিল। পাঁচিলের ওপারে দেশোয়ালিরা কীর্তন করছিল মাইক বাজিয়ে

পরবর্তী কাজের লোক রঘু। বয়স তিরিশের নীচে। রঘুর বাবাও এ বাড়িতে গাড়ি চালাত। বয়স হয়ে যেতে ছেলেকে এখানে দিয়ে ফিরে গেছে দেশের বাড়ি। বছরছয়েক রঘু এ বাড়ির গাড়ি চালাচ্ছে। কথার ফাঁকে মাইকের ব্যাপারটা যাচাই করে নিলেন দীপকাকু। রঘুও বলল, কাল সারাদিন মাইক চলেছিল। শিবরাত্রির আগে এরকম নাকি প্রায়ই হয়।

রঘু বেরিয়ে যেতে ঘরে ঢুকলেন শ্রবণার মা। বললেন, “কিছু খেয়ে নিন আপনারা। এসে থেকেই তো কাজ করে যাচ্ছেন।”

“এখন না। আর ক’টা কাজ বাকি আছে। প্লিজ একবার সমীরবাবুকে ডেকে দিন।”

দীপকাকুর কথা শেষ হতেই ঘরে ঢুকলেন সমীর আঙ্কল। দীপকাকু বললেন, “দুটো ঘর তো দেখা হয়ে গেছে, বাকি ঘরগুলো একবার দেখতে হবে। কাজের লোকদের জিনিসপত্তরগুলো সার্চ করতে হবে।”

“অবশ্যই! চলুন।” বলে, ডেকে নেন সমীর আঙ্কল। দীপকাকুদের অনুসরণ করে সিঁড়ির দিকে যেতেই ঝিনুকের সঙ্গে চোখাচোখি হয় শ্রবণার। বারান্দার এককোণে অপরিচিতের দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আসলে ঝিনুককে তো এই রূপে কোনওদিন দেখেনি।

.

নীচের সব ঘরই দেখা হল খুঁটিয়ে। সার্চ করা হল কাজের লোকের জিনিস। তালা দেওয়া ভাঁড়ারঘর খোলা হল। কোথাও অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়েনি ঝিনুকের। দীপকাকুও হোঁচট খাননি অনুসন্ধান পর্বে। ঝিনুকরা আটকে গেল বাইরের দিকে একটা ঘরের সামনে এসে। এই ঘরটাও তালা দেওয়া। সমীর আঙ্কলের উদ্দেশে দীপকাকু বললেন, “এটা নিশ্চয়ই গেস্টরুম, যে ঘরে শেষ ভাড়াটে ছিলেন?”

মাথা হেলিয়ে সায় দিলেন সমীর আঙ্কল।

দীপকাকু বললেন, “খোলা যাবে একবার?”

“দাঁড়ান, চাবিটা সঙ্গে নেই। উপর থেকে আনতে হবে।” বলে, দু’পা এগিয়েও ফিরে এলেন সমীর আঙ্কল। বললেন, “খুব কি দরকার? ঘরটা তো দুমাস ধরে তালা দেওয়াই আছে। কেউ ঢোকে-বেরয় না।”

“সব ঘরই যখন দেখলাম, এটা আর বাকি থাকে কেন?” বললেন দীপকাকু। অগত্যা সমীর আঙ্কলকে যেতেই হয় দোতলায় চাবি আনতে। সত্যিই ভীষণ নাকাল হতে হচ্ছে ওঁকে। এদিকে দীপকাকুর কোনও ক্লান্তি নেই। এই সময়টুকু কাজে লাগাতে বন্ধ দরজাটা ঠেলে, তালাটা টেনে ভাল করে দেখলেন। ঘরটাকে আধপাক মেরে পরীক্ষা করলেন বন্ধ জানলাগুলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই চাবি হাতে ফিরে এলেন সমীর আঙ্কল।

দরজা খোলা হল। আবছা অন্ধকার ঘরটাতে ভ্যাপসা গন্ধ। সমীর আঙ্কল সুইচ টিপে আলো জ্বালাতে দেখা গেল ঘরটি ধুলোমলিন একটি ড্রয়িংরুম। একটু এলোমেলো হলেও টিভি, ভিসিডি, র‍্যাক-ভরতি বই, সবই আছে। কয়েক জায়গায় মাকড়সার জালও দেখা গেল।

ঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে দীপকাকু বললেন, “এ সব তো আপনাদের নয়, শেষ ভাড়াটের। কী যেন নাম?”

“সত্যবান মিত্র। আপনি কী করে বুঝলেন এগুলো আমাদের নয়?” বিস্ময়ের কণ্ঠে জানতে চাইলেন সমীর আঙ্কল। ঝিনুকও বুঝতে পেরেছে, ঘরটা এঁদের নয়। কেন নয়, যুক্তিগুলো যদিও সাজাতে পারে না। ঘরটা ঘুরে দেখতে দেখতে দীপকাকু সেগুলোই বলতে থাকেন— “প্রথমত, এ ঘরের ইন্টিরিয়র ডেকরেশনের সঙ্গে আপনাদের বাকি ঘরগুলোর মিল নেই। সিগারেটের প্যাকেট, উপচে পড়া অ্যাশট্রে। দেখে বোঝা যায় অন্য কেউ এ ঘরে বাস করত। আপনাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ভদ্রলোক সারাক্ষণ পড়াশোনা নিয়েই থাকতেন। বুকশেলফের অত বই তা প্রমাণও করছে।”

“সত্যিই তো, জলের মতো সোজা!” সমীর আঙ্কলের গলায় সরল উচ্ছ্বাস।

দীপকাকু বললেন, “কিন্তু ব্যাপারটা যে এত সহজ ঠেকছে না।”

“কীরকম!” জানতে চাইলেন সমীর আঙ্কল।

“ভদ্রলোক মারা গেছেন, তবু তাঁর জিনিসপত্তর এখানে রয়ে গেল কেন? ওঁর কি কোনও ওয়ারিশন নেই?”

“আছে। দুই ছেলে। ছোটছেলে দিল্লিতে, বড়জন এখানেই, বালিগঞ্জে। বাবার সঙ্গে দু’ছেলেরই পটত না।”

“সে তো জীবিতকালে। এখন তাদের জিনিসগুলো দিয়ে, ঘরগুলো হোয়াইট ওয়াশ করে রাখাই স্বাভাবিক হত। আপনাদের জায়গায় যে কেউ হলে এটা করতেন।”

“মানছি। আমরাও সেটাই চেয়েছিলাম। বাবা মারা যাওয়ার পর ছোটছেলে আসেইনি, বড়ছেলে সমস্ত ক্রিয়াকর্ম করেছে, তারপর আর এ বাড়িতে পা রাখেনি। দুই ছেলেকেই বারবার ফোন করে বলা হয়েছে জিনিসগুলো নিয়ে যেতে। ছোটছেলে বলেছে, ‘যা করার দাদা করবে, আমি কোনও ব্যাপারে নেই।’ বড়ছেলে বলেছে, ‘ফেলে দিন। বিলিয়ে দিন। বাবার কোনও জিনিসের উপর আমার আগ্রহ নেই।’ কোনও কারণে বাবার উপর হয়তো রাগ, যা মারা যাওয়ার পরও কমেনি।”

“আর আপনারা প্রাণে ধরে জিনিসগুলো ফেলতেও পারছেন না।”

দীপকাকুর কথায় এবার একটু সময় নিয়ে উত্তর দেন সমীর আঙ্কল, “ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। ভদ্রলোক সুইসাইড করার পর পুলিশ এসে ঘর সার্চ করে, তখনই কিছু ইনশিয়োরেন্সের কাগজ এবং ওঁর চাকরিজীবনের কিছু প্রমাণপত্র দেখি। সেগুলো থেকে বিশাল কিছু প্রাপ্তির আশা নেই। তা বড়ছেলেও জানে। সার্চের সময় সে ছিল। মুশকিল হচ্ছে, ওইসব কাগজপত্র ইচ্ছেমতো ফেলে দেওয়া যায় না। হয়তো-বা সেটা আইনের চোখেও অপরাধ। তাই কী করব, এখনও ঠিক করতে পারিনি।”

র‍্যাকের বইগুলো দেখতে দেখতে দীপকাকু বললেন, “ভেরি সিম্পল। গোটা ব্যাপারটা পুলিশকে জানান। তারাই কোর্টের মাধ্যমে বিষয়টা সমাধান করে দেবে।”

“এবার তাই করতে হবে। আসলে ওয়েট করছিলাম যদি ওঁর ছেলেদের মতি ফেরে।”

সমীর আঙ্কলের কথা শেষ হতেই দীপকাকু যেন ঝিনুকের মনের কথাটাই বলে উঠলেন, “আপনাদের নীচের ঘর নিয়ে এরকম একটা জটিলতা আছে, আগে কেন বলেননি?”

“আসলে থ্রেটনিং লেটার, উপরের ঘরে তাণ্ডব, এ দুটোর সঙ্গে এই ঘরের কোনও সম্পর্ক আছে বলে মনে হয়নি। আপনার কি মনে হয়, আছে?”

সমীর আঙ্কলের পালটা প্রশ্নে দীপকাকু বললেন, “হয়তো নেই। আবার থাকতেও পারে। সবটাই আমার জানা দরকার।”

বুকশেলফের বই, কাগজপত্র দেখার পর নীচের ড্রয়ারগুলো খুলতে শুরু করলেন দীপকাকু। বেশকিছু ড্রয়ার একদম ফাঁকা। একটা থেকে বেশ ক’টা ফাইল বেরল। উলটেপালটে দেখে রেখে দিলেন। পরের ড্রয়ারের গভীরতা কম। সেটা নানান ট্যাবলেটের ফয়েল, ওষুধের শিশিতে ভরা। খুবই মনোযোগ দিয়ে সেগুলো দেখলেন দীপকাকু।

বুকশেফের পাট চুকিয়ে আবার মেঝেতে হামাগুড়ি দিতে শুরু করলেন। পৌঁছলেন রিডিং টেবিলের সামনে। উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের জিনিসপত্তর দেখতে লাগলেন। সিগারেটের প্যাকেট নেড়েচেড়ে দেখে, অ্যাশট্রেটা টেবিলে উপুড় করে দিলেন। সিগারেটের ফিল্টারগুলো তুলে কী যেন দেখতে লাগলেন! তারপর বললেন, “চলুন, অন্য ঘরগুলো দেখে নিই। এসেছি যখন…”

.

শ্রবণার মায়ের আপ্যায়নে ঝিনুকদের সামনে এখন প্রচুর খাবার। এত কিছু খাওয়া ঝিনুকের পক্ষে ইমপসিল। দীপকাকু পরিপাটি করে খাওয়া শেষ করলেন। চায়ের কাপ তুলে নিয়েছেন হাতে। ঘরে এখন কাজের লোক ছাড়া সবাই উপস্থিত। সমীর আঙ্কল বললেন, “কী বুঝছেন মিস্টার বাগচী, কোনও ব্লু পাওয়া গেল? কীভাবে উপরের ঘর দুটো খুলল, কোন জিনিসটাকে মূল্যবান বলছে লোকটা, নাকি কোনও ভুল করছে?”

অন্যমনস্ক গলায় দীপকাকু বললেন, “অনেক কিছুই পাওয়া গেল। তবে ভীষণ অস্পষ্ট, আবছা একটা ধারণা তৈরি হচ্ছে। আর ক’টা দিন লাগবে গোটা ব্যাপারটা বুঝতে।”

উদ্বিগ্ন স্বরে শ্রবণার মা বললেন, “চিঠিতে যে মাত্র এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে! যদি এর মধ্যে কিছু ঘটে যায়!”

উত্তরে দীপকাকু বললেন, “আপনার মা কিন্তু আপনার চেয়ে সাহসী।”

সোফা ছেড়ে উঠে পড়েছেন দীপকাকু। দেখাদেখি ঝিনুকও উঠে দাঁড়ায়। এবার বোধহয় ফেরার পালা। অতি বিনয়ে সমীর আঙ্কল বললেন, “আপনার চার্জ নিয়ে কোনও কথাই হল না। আসলে এমন পরিচিত সূত্রে এসেছেন….”

“রহস্যটার ভিতর আর একটু ঢুকি, তারপর সে-সব নিয়ে কথা হবে’খন।’ বলে, দীপকাকু দরজার দিকে এগোতে যাবেন, এমন সময় অপরাজিতা দেবী বলে উঠলেন, “কিছু অ্যাডভান্স আপনাকে আমাদের দেওয়া উচিত। এই চেকটা আপনার জন্য রেডি করে রেখেছি।”

অপরাজিতা দেবীর বাড়িয়ে ধরা চেকে চোখ বুলিয়ে পকেটস্থ করলেন দীপকাকু। তারপর, হঠাৎ মনে পড়েছে এই ভঙ্গিতে বললেন, “ও, ভাল কথা, আপাতত ক’টা দিন কাজের লোকেদের কোনও অবস্থাতেই বাড়ি যাওয়ার ছুটি দেবেন না।”

মাথা হেলিয়ে ‘আচ্ছা’ বললেন অপরাজিতা দেবী।

.

শ্রবণার দিদার বাড়ি থেকে গাড়ি করে বেরিয়ে এসেছে ঝিনুকরা। ওই বাড়ির গেটও বন্ধ হয়ে গেছে। হঠাৎ আশুদাকে গাড়ি থামাতে বললেন দীপকাকু। গাড়ি থেকে নামতে নামতে ঝিনুককে বললেন, “পাঁচ মিনিট বোসো, এখনই আসছি।”

খুব রাগ হয় ঝিনুকের। এতক্ষণ সঙ্গে রেখে হঠাৎ আলাদা তদন্তে কেন? একেই তো রহস্যটায় প্রচুর ধোঁয়াশা, আরও অন্ধকারে রেখে চলে গেলেন দীপকাকু। অনেক খাটাখাটনির পর আবিষ্কার হয়েছে মাত্র দুটো আয়তাকার গর্ত। তার বিনিময়ে কত অ্যাডভান্স পেলেন কে জানে! রহস্যটা সমাধান করতে না পারলে শ্রবণাদের কাছে নাক কাটা যাবে ঝিনুকের। এসব ভাবনার মাঝেই ফিরে এলেন দীপকাকু। গাড়িতে উঠে বললেন, “চলো, যাওয়া যাক।”

গাড়ি একটু গড়াতেই দীপকাকু পকেট থেকে সেলফোন বের করে নম্বর টিপতে লাগলেন। ফোন কানে দিয়ে বললেন, “হ্যালো, রঞ্জন!”

… …

“দীপঙ্কর বলছি, একটু হেল্প করতে হবে।”

… …

“না, তেমন বড় কিছু নয়। দুটো অ্যাড্রেস দিচ্ছি, ১৬এ/সি গোকুল বড়াল স্ট্রিট। আর একটা হচ্ছে, ৩/৩ সার্পেনটাইন লেন। এ দুটো বাড়িতে খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে, কোনও নতুন লোক এসেছে কিনা।”

… …

“হ্যাঁ। রাইট।”

… …

“ওকে। দু’ঘণ্টা পর।”

… …

“না, না, তুই তো জানিস কলকাতা পুলিশের উপর আমার যথেষ্ট শ্রদ্ধা আছে। কিন্তু কী করব বল, পার্টি চাইছে না এই কেসে পুলিশ আসুক।”

… …

“জানি না। ব্যাপারটা বুঝতে হবে। ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যে অবশ্যই জানাস। ছাড়ছি।”

ফোন অফ করে গম্ভীর মুখে বসে রইলেন দীপকাকু। ঝিনুক ফোনের এক প্রান্তের কথা শুনে যতটুকু বুঝেছে, রঞ্জনবাবু পুলিশের লোক। দীপকাকুর বন্ধু। তুই-তোকারির সম্পর্ক মানে অনেক দিনের বন্ধুত্ব। ঝিনুক যেটা বুঝতে পারছে না, এই দুটো বাড়ির নম্বর হঠাৎ এ কেসে কোথা থেকে এল! রাস্তা দুটোর নাম আগে কখনও শোনেনি!

রোদ-ঝলমলে ব্যস্ত ধর্মতলা পিছিয়ে যাচ্ছে। গাড়িতে গভীর চিন্তামগ্ন অবস্থায় বসে আছেন দীপকাকু। কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস হচ্ছে না, তবু একসময় প্রশ্নটা করেই ফেলে ঝিনুক, “ওই দুটো অ্যাড্রেস কোথাকার?”

“ওই বাড়ির পাশের দুটো বাড়ির।”

“সে কী, ঠিকানা দুটো যে একদম আলাদা!”

“মধ্য কলকাতার ওই জায়গাটায় অজস্র লেন, বাই লেন। কুড়ি-পঁচিশ ফুট গলির ভিন্ন একটা নাম। আমার মনে হয় বেঁচে থাকতেই ওখানকার আদি বাসিন্দারা নিজেদের নামে রাস্তা করে গেছেন।”

এখনও মজা করে যাচ্ছেন দীপকাকু! আর একটু সাহস পায় ঝিনুক। বলে, “ওই দুটো অ্যাড্রেসে নতুন লোক এসেছে কি না খোঁজ নিচ্ছেন কেন?”

মিটিমিটি হেসে দীপকাকু বললেন, “তুমি একটু ভেবে দ্যাখো তো, বের করতে পারো কি না!

ভাবার ভান করে ঝিনুক। সে বিন্দুমাত্র আন্দাজ করতে পারছে না। একটু পরে বলে, “না, কিছুই বুঝতে পারছি না!”

“একটু সময় দিলেই বুঝতে পারতে। তবু আমি উত্তরটা দিচ্ছি, তা হলেই তুমি বুঝতে পারবে কীভাবে ভাবনার শৃঙ্খল সাজিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়। এটা তোমার জন্য একটা স্যাম্পেল।” বলে, একটু থামলেন দীপকাকু। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে ধরালেন একটা। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “অপরাজিতা দেবীর বারান্দা থেকে মাত্র দুটো বাড়ি দেখা যায়। তোমাকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে আমি দুটো বাড়ির নম্বর জেনে এসেছিলাম। চিঠিতে লেখা ছিল, যদি রাজি থাকেন, নীল শাড়ি পরে বারান্দায় দাঁড়াবেন। সময়ের উল্লেখ ছিল না। অর্থাৎ সারাক্ষণ কেউ ওঁর বাড়ির উপর নজর রাখছে। যা একমাত্র ওই দুটো বাড়ি থেকেই সম্ভব।”

হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে যেতে ঝিনুক বলে ওঠে, “হ্যাঁ, আমি দেখেছি নর্থ সাইডের বাড়ির চারতলার একটা বুড়ো এই বাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল।”

“আমিও দেখেছি। সন্দেহ করার মতো কিছু নেই বলেই আমার মনে হয়, তা হলে ওরকম প্রকাশ্যে এসে দাঁড়াতেন না। তা ছাড়া ভদ্রলোকের বয়স প্রায় আশির কাছাকাছি। সারাদিন ওই ঘরটাতেই থাকেন। জানলায় দাঁড়ানোই তাঁর বিনোদন।”

শুধুমাত্র দূরবিন চোখে লাগালেই যে হয় না, পিছনে একটা উর্বর মস্তিষ্ক থাকা দরকার, সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে ঝিনুক। কিন্তু আর একটা খটকা যে এই প্রসঙ্গে চলে এল। দীপকাকুর কাছে জানতে চাইল, “সামনের দুটো বাড়িতে নতুন লোক আসার কথা কেন ভাবছেন? বাড়ি দুটোর কারও সঙ্গে অপরাজিতা দেবীদের পুরনো ঝগড়াও থাকতে পারে। ওদের মধ্যেই কেউ মিছিমিছি ভয় দেখাচ্ছে হয়তো।”

“আশ্চর্য নয়! ওঁরা অনেক কথাই চেপে যাচ্ছেন। তবে প্রতিবেশীর ঝগড়া খুনের হুমকি অবধি সাধারণত গড়ায় না। অপরাজিতা দেবীকে লক্ষ রাখার জন্য ওই দুটো বাড়ির কোনও একটা ঘর ভাড়া নেওয়াই স্বাভাবিক। দেখা যাক, রঞ্জন কী খবর দেয়।”

সিগন্যাল পেরিয়ে কখন যে গাড়ি থিয়েটার রোডে এসে পড়েছে, খেয়ালই নেই ঝিনুকের। দীপকাকু থামাতে বললেন। ঝিনুক বুঝতে পারে, দীপকাকু নিজের অফিসে চলে যাবেন। কিন্তু তারপর! ঝিনুক কি তা হলে রহস্য সমাধানের বাইরে চলে যাচ্ছে? প্রবল অনিশ্চয়তায় দীপকাকুকে বলে ওঠে ঝিনুক, “শ্রবণাদের কেসটায় আমি কিন্তু ইনভল্ভড হয়ে পড়েছি। আমাকে বাদ দিলে হবে না। কখন যোগাযোগ করব বলুন?”

গাড়ি থেকে নেমে ফুটপাতে দাঁড়ালেন দীপকাকু। মুখে আবার সেই মিটমিটে হাসি। বললেন, “ওকে, তোমাকে সঙ্গে নিয়েই কাজ করব। সামান্য একটু টেস্ট নেব তার আগে। তুমি বাড়ি গিয়ে যা-যা দেখলে, বুঝলে, লিখে ফেলো। তার থেকে কী ধারণা হয়, ফোনে জানাও। তারপর ঠিক করব তোমাকে সঙ্গে নেওয়া যাবে কি না, চলি।

দীপকাকুর হেঁটে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে ঝিনুক। অতল জলে ফেলে দিয়ে গেলেন। যা-যা দেখেছে, সব তো গুলিয়ে যাচ্ছে।

আশুদা গাড়ি চালিয়ে দিয়েছে। রাস্তার দু’পাশে বড় বড় হোর্ডিং, বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম, দুর্দান্ত ড্রেস-করা ছেলেমেয়ে… অন্যদিন হলে এসবই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখত ঝিনুক। আজ অবিকল দীপকাকুর মতোই গম্ভীর হয়ে পিছনের সিটে বসে আছে।

কিছুক্ষণ গাড়ি চালানোর পর আশুদা সামান্য ঘাড় ফিরিয়ে বলল, “দিদি, তোমরা যখন ওই বাড়ির উপরে ছিলে, ওদের একটা কাজের লোক আমার সঙ্গে গল্প করতে এল। বারবার জানতে চাইছিল, তোমরা কী কারণে এসেছ? কোথা থেকে এসেছ? আমি অবশ্য এড়িয়ে এড়িয়ে উত্তর দিয়েছি।”

ঝিনুক উৎসাহিত হয়ে বলল, “লোকটার চেহারার বর্ণনা একটু দাও তো!” আশুদা বলতে থাকে।

.

বাড়ি ফিরতেই মা পথ আগলে দাঁড়ালেন। এখনই তাঁকে বলতে হবে শ্রবণার দিদার বাড়িতে কী হল, না হল! কোনওক্রমে পাশ কাটিয়ে ফোনের কাছে যায় ঝিনুক। দীপকাকুর মোবাইলে ডায়াল করে। ওপ্রান্তে নম্বর দেখেই দীপকাকু বুঝেছেন, ঝিনুকদের বাড়ির ফোন। ফোন ধরেই বলে ওঠেন, “হ্যাঁ বউদি, ঝিনুক এক্ষুনি পৌঁছে যাবে। একটু আগে আমাকে অফিসে নামিয়ে দিয়ে গেছে।”

ঝিনুক বিরক্তির সুরে বলে, “আমি ঝিনুক বলছি।”

“সে কী, লেখা হয়ে গেছে সব!” ঠাট্টা করলেন দীপকাকু।

“না, এত তাড়াতাড়ি সেটা সম্ভব নয়, আপনিও বোঝেন। একটা খবর আছে। আশুদা বলছিল, ওবাড়ির কোনও এক কাজের লোক আশুদার কাছে আমাদের খবরাখবর নিচ্ছিল। বর্ণনা শুনে মনে হচ্ছে…”

কথা শেষ করতে না দিয়ে ওপ্রান্ত থেকে দীপকাকু বলে উঠলেন, “জানি, বিনায়ক। দূরবিন দিয়ে দেখার সময় আমারও চোখে পড়েছে। যাই হোক, এই পয়েন্টটাও লিখে রাখো। সব কিছু না-লেখা অবধি আমাকে ফোন কোরো না।”

হতাশ ভঙ্গিতে ফোন নামিয়ে রাখে ঝিনুক। এই কেসটাতে সে এখনও অবধি কিছু কন্ট্রিবিউট করে উঠতে পারেনি। ড্রেস চেঞ্জ না করেই নিজের স্টাডিতে গিয়ে বসে। ওবাড়ির দেখাগুলো পরপর সাজাতে গিয়ে, একটা ব্যাপারেই বারবার জড়িয়ে পড়ে, কী এমন মূল্যবান জিনিস অপরাজিতা দেবীর কাছে আছে, যা উনি নিজেও জানেন না! আর অন্য একজনের জিনিসটা ভীষণ দরকার!