হেঁয়ালির অন্ধকারে – ৬

পরের দিন ভোর সাড়ে পাঁচটায় দীপকাকু, ঝিনুক পৌঁছে গেল হাওড়া স্টেশনে। দীপকাকুর কাঁধে কিটব্যাগ, ঝিনুকের হ্যাভারশ্যাক। চারদিন বাইরে থাকার মতো জিনিসপত্তর আছে ব্যাগে। রূপসী বাংলা ছাড়ে হাওড়ার নতুন প্ল্যাটফর্ম শেড থেকে। ট্যাক্সি থেকে নেমে অনেকটা হেঁটে ঝিনুকরা গেটে পৌঁছে দ্যাখে, আবিরবাবু নেই। ঝিনুক বলল, “কী হল, উনি তো বলেছিলেন, ঠিক সাড়ে পাঁচটায় তিনজনের টিকিট কেটে এখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন?”

দীপকাকু ব্যস্ত হলেন না। বললেন, “এখনও তো ট্রেন ছাড়তে দেরি আছে। এসে যাবেন।”

ঝিনুক কিন্তু নিশ্চিন্ত হতে পারল না। দীপকাকুর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে সে দেখেছে, রহস্য অভিযানে পরিস্থিতি ঘনঘন বদলে যায়। আবিরবাবু যদি না আসেন, পুরুলিয়া যাওয়াটা বাতিল হয়ে যাবে। কত যাত্রী গেট পেরিয়ে চলে যাচ্ছে ভিতরে। ঝিনুকের ভীষণ আপশোস হবে যদি ট্যুরটা ক্যানসেল হয়। তদন্তের প্রয়োজনে আগে মাত্র দু’বার মেলট্রেনে চড়তে হয়েছিল। প্রথমবার অপরাজিতা দেবীকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যেতে হয় নিউ জলপাইগুড়ি। ট্রেনেই ঘটেছিল রোমহর্ষক ঘটনা। দ্বিতীয়বার ডক্টর বিপুল নন্দীকে উদ্ধার করতে চাঁদিপুরে। ট্রেনে কোনও ঘটনা ঘটেনি। তবে জার্নিটাও এজয় করা যায়নি। ডক্টর নন্দীর কাছে পৌঁছনোর তাড়া ছিল। তুলনায় এবারের ট্যুরটা অনেক ঝামেলাহীন। কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া হচ্ছে পুরুলিয়ায়। এটাকে তাই অনায়াসে ছোটখাটো বেড়াতে যাওয়া বলা যেতে পারে।

অবশেষে সামনে এসে উদয় হলেন আবিরবাবু, “সে কী মশাই, আপনারা এখানে দাঁড়িয়ে! আমি তখন থেকে খুঁজে যাচ্ছি?”

“কেন, এখানেই তো দাঁড়ানোর কথা ছিল!” বলল ঝিনুক। কেননা, আজকের শেডিউলের যা কিছু কথা ফোনে ঝিনুকের সঙ্গেই হয়েছিল আবিরবাবুর।

আবিরবাবু বললেন, “আমি কিন্তু এখান দিয়ে বারকয়েক ঘুরে গেছি। তোমাদের তা হলে দেরি হয়েছে আসতে।”

“মোটেই না। ঠিক সাড়ে পাঁচটায় এখানে চলে এসেছি আমরা।” বলল ঝিনুক।

কোনও উত্তর না দিয়ে আবিরবাবু হঠাৎ দীপকাকুকে আপাদমস্তক জরিপ করতে থাকলেন। বললেন, “ও, এবার বুঝেছি! আপনার ড্রেসের জন্যে ভুলটা হয়েছে আমার।”

দীপকাকু হাসলেন। ওঁর পরনে আজ পাজামা-পাঞ্জাবি। সকালে দরজা খুলে ঝিনুকও খানিক থতমত খেয়ে গিয়েছিল। নিপাট সাদা পাজামা-পাঞ্জাবিতে দীপকাকুকে আগে দেখেনি সে। চোখে মোটা কাচের চশমাটা এত দিনে মানিয়েছে। অবিকল ভূগোলের স্যার! এরকম ড্রেসের কারণটা এখন বললেন, “আমি যে গোয়েন্দা এ ব্যাপারটা বুঝতে না দেওয়ার জন্যই এই ক্যামোফ্লেজ। আপনার আত্মীয়দের কিছু জানাননি তো?”

আবিরবাবু বললেন, “বন্ধুকে নিয়ে আসছি, এমনটাই জেঠুমণিকে জানিয়েছি। আসল পরিচয়টা বলিনি।”

“ভাল করেছেন। চলুন এবার। ট্রেন ছাড়তে আর বেশি দেরি নেই।” বলে, কিটব্যাগটা কাঁধ পালটে গেটের দিকে পা বাড়ালেন দীপকাকু।

.

রাইট টাইমের পাঁচ মিনিট দেরিতে ছেড়েছে ট্রেন। এই ট্রেনে কোনও বার্থ নেই, গোটাটাই সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট। তিন সিটের এক সারিতে বসেছে ঝিনুকরা। বয়স কমের অ্যাডভান্টেজ হিসেবে ঝিনুক পেয়েছে জানলার পাশের সিট। একটার পর-একটা স্টেশন ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে। গ্রাম-শহরতলি এখনও সেভাবে জেগে ওঠেনি। ভোরের মিষ্টি হাওয়া উথালপাথাল হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে ঝিনুকের মুখে। এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে চুল। জানলার পাশে কলাগাছের ঝোপ। মাঠ, পুকুর, ধানখেত। জার্নিটা দারুণ উপভোগ করছে ঝিনুক। বন্ধুদের কথা মনে পড়ছে। কোথাও বেড়াতে গেলে কতদিন আগে থেকে ওদের প্ল্যান করতে হয়। ঝিনুকের কাজটা এমনই, একদিনের নোটিসে উঠে পড়তে হয় যে-কোনও রুটের ট্রেনে। দীপকাকু অবশ্য জার্নিটাকে বেড়াতে যাওয়া হিসেবে ধরেন না। এখন যেমন হোমওয়ার্ক করে যাচ্ছেন, পড়ছেন বুদ্ধদেবের ছবি দেওয়া ইংরেজি বই। এত চুপচাপ বসে থাকা আবিরবাবুর বোধহয় ধাতে নেই। সকাল থেকে দুটো নিউজ পেপার পড়া হয়ে গিয়েছে। চাওয়ালাকে ডেকে চা দিতে বললেন তিনজনকে।

ঝিনুক বলল, “আমি না।”

“তা হলে কফি খাও। ফ্রেশ লাগবে। সেই কোন ভোরে উঠেছ!” বলে, আবিরবাবু শুরু করলেন গল্প। …এই রুটটা তাঁর ভীষণ চেনা। কলকাতার কলেজে পড়তেন, সপ্তাহান্তে আসতেন পুরুলিয়ার বাড়িতে। এই লাইনের প্রতিটি হকার তাঁর চেনা। এশিয়াবিখ্যাত ছোলামাখা পাওয়া যায় এই রুটে। যদি ওঠে ঝিনুককে খাওয়াবেন। কথার মাঝে হকারের দিয়ে যাওয়া চা-কফি শেষ হল। মূর্তি হারানো নিয়ে আবিরবাবুকে এখন তেমন ভাবিত মনে হচ্ছে না। ওঁর চিন্তা সম্ভবত একটাই, জেঠুমণি যেন জানতে না পারেন, বিষ্ণুমূর্তি চুরি হয়েছে। দীপকাকুকে সে-কথা আরও একবার খেয়াল করিয়ে দিয়েছেন। এর থেকে আন্দাজ করাই যায়, মূর্তির প্রকৃত মূল্য সম্বন্ধে আবিরবাবু একেবারেই অবহিত নন। চুরির নাটক সাজিয়ে জিনিসটা লোপাট করার মতো ধূর্ত মানুষ মনে হচ্ছে না আবিরবাবুকে। দেশের বাড়ি যাওয়ার আনন্দ ফুটে উঠছে চোখে-মুখে। যদিও বলছেন, বাড়ির প্রতি টান অনেক কমে গেছে ওঁর। আসলে ওটা দাদাদের প্রতি অভিমান। যেখানে ছেলেবেলা কাটে মানুষের, জায়গাটাকে কোনওদিনই ভুলতে পারে না। মা-বাবার কাছেও তাঁদের ছোটবেলার পাড়া, তাঁদের বাড়ির কত গল্প শুনেছে ঝিনুক

সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন আবিরবাবু। এদিক-ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে কাকে যেন খুঁজছেন! বোধহয় ছোলাওয়ালা। না পেয়ে বসে পড়লেন সিটে। দীপকাকুকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি অ্যানথ্রোপলজির বই পড়ছেন, তাই না?”

“হ্যাঁ।”

“আমার স্ত্রী অ্যানথ্রোপলজি নিয়ে এমএ করেছে। আলাপের সময় বলেছে আপনাদের?”

“না, বলেননি। তবে আপনাদের বইয়ের র‍্যাকে এই বিষয়ের কয়েকটা বই দেখেছি। ইন্টিরিয়র ডেকরেশনেরও বই দেখলাম। আপনার স্ত্রী কি এখন ইন্টিরিয়র ডিজাইনিং নিয়ে পড়াশোনা করছেন?”

“না, না, ওটা ওর হবি। তবে ইচ্ছে থাকলেও কাজ তেমন কিছু করে উঠতে পারে না। মেয়ের পিছনেই সময় চলে যায়।”

আবিরবাবুর কথা শেষ হতে না-হতে দীপকাকু আঙুলে পেজমার্ক রেখে বইটা বন্ধ করলেন। আবিরবাবুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, আপনার স্ত্রী বিষ্ণুমূর্তিটা দেখার পর কোনও কমেন্ট করেছিলেন কি? মানে, আমি বলতে চাইছি, বিষ্ণুমূর্তিটা কোন শতকের হতে পারে, এ বিষয়ে ওঁর কোনও ধারণা আছে?”

আবিরবাবু ভাবতে একটু সময় নিলেন। বললেন, “সেরকম কোনও কমেন্ট করেছে বলে মনে পড়ছে না! তবে আপনি যদি ওর সঙ্গে কথা বলতে চান, এখনই মোবাইল ফোন থেকে কথা বলে নিন।”

“থাক, দরকার নেই!” বলে, দীপকাকু বই খুলে পড়তে শুরু করলেন।

আরও বেশকিছু সময় ট্রেন চলার পর আবিরবাবু ঝিনুককে বললেন, “তোমার খিদে পাচ্ছে না?”

হেসে মাথা নেড়ে ‘না’ বলল ঝিনুক। আবিরবাবু বললেন, “আমার তো পাচ্ছে। ভোরে ঘুম থেকে উঠলে তাড়াতাড়ি খিদে পায়। আমরা খড়্গপুরে ব্রেকফাস্ট করে নেব। আপত্তি নেই তো?”

ঝিনুক এমনভাবে ঘাড় নাড়ল, যার উত্তর আছে বা নেই দুটোই হয়। আবিরবাবু সেটা খেয়াল না করে বলতে লাগলেন, “ডিম, টোস্ট খাব না। ঠেলাগাড়িতে লুচি-তরকারি বিক্রি হয়, দারুণ টেস্ট!”

লুচির কথা শুনেই কিনা কে জানে, ঝিনুকের এবার সত্যিই খিদে খিদে পাচ্ছে। মিনিট কুড়ির মধ্যেই ট্রেনের স্পিড কমে এল। লাইনের দু’পাশে এখন মফস্সল শহর। আবিরবাবু বললেন, “ঢুকছে খড়্গপুর। যাই, জলখাবারটা কিনে আনি।”

ঝিনুক বলল, “চলুন, আমিও যাই।”

প্ল্যাটফর্মে ট্রেন থামতেই আবিরবাবু নেমে পড়লেন। ঝিনুকও নেমে এল। ঘাড় ঘুরিয়ে আবিরবাবু সম্ভবত চেনা হকারকে খুঁজছেন। পেলেন না। সামনে যে ঠেলাগাড়িতে লুচি ভাজা হচ্ছে সেখানেই এগিয়ে গেলেন। ঝিনুকও পাশে গিয়ে দাঁড়াল। মা থাকলে ঠেলাগাড়ির লুচি কিছুতেই খেতে দিতেন না। না খাওয়ার কিন্তু কিছু নেই। গরম গরম ভেজে দিচ্ছে লুচিওয়ালা। আবিরবাবু বললেন, “দশটা করে দাও।”

ঝিনুক বলল, “অসম্ভব! চারটের বেশি খেতে পারব না আমি। দীপকাকুও অত খাবেন না।”

ঠেলাওয়ালা বলল, “ছ’টা করে দিই? ভাল লাগলে আরও খাবেন! ট্রেন মিনিট কুড়ি দাঁড়াবে। অন্য ইঞ্জিন আসবে নিতে।”

শালপাতার ঠোঙায় লুচি-তরকারি দিল হকার। আবিরবাবু দু’হাতে দুটো ঠোঙা নিলেন। ঝিনুক একটা নিতে যাবে, চোখে পড়ল ঝাঁকড়া চুলের, নোংরা পোশাক পরা একটা লোক তিরবেগে ছুটে আসছে আবিরবাবুকে লক্ষ্য করে। সেকেন্ডের মধ্যে আবিরবাবুর কনুই ধরে টেনে নিল ঝিনুক। স্পিড সামলাতে না পেরে ঝাঁকড়া চুলের লোকটা ধাক্কা খেল ট্রেনের কামরায়। ফের ঘুরে দাঁড়িয়ে দৌড়ে এল। পাগল নাকি! ভাবার সময় নেই ঝিনুকের। জাম্প দিয়ে বাঁ পা-টা চালিয়ে দিল লোকটার মুখে। চার হাত ছিটকে পড়ল লোকটা। উঠেই পালাতে থাকল।

ঝিনুক এবার আবিরবাবুকে খুঁজল। একটু দূরে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। শার্টে লেগেছে তরকারির দাগ। লুচি গড়াচ্ছে প্ল্যাটফর্মে। ঝিনুক এগিয়ে গেল আবিরবাবুর কাছে। হতভম্ব অবস্থা কেটে গিয়ে আবিরবাবুর চোখে এখন বিস্ময়। বললেন, “তুমি এত ভাল ক্যারাটে জানো!”

মাথা নিচু করে ঝিনুক বলল, “ওই আর কী! মাঝখান থেকে আপনার জামাটা নষ্ট হল!”

“জামা! তুমি না সরিয়ে নিলে আমি নিজেই নষ্ট, মানে আহত হতাম। লোকটা কে বলো তো? দেখে মনে হল পাগল। হয়তো খিদে পেয়েছিল!”

“পাগল নয়। আমরা যাতে পুরুলিয়ায় যেতে না পারি, তার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিল লোকটা।” বললেন দীপকাকু। কখন ট্রেন থেকে নেমে এসেছেন, খেয়াল করেনি ঝিনুক।

আবিরবাবু জানতে চাইলেন, “কী করে বুঝছেন পাগল নয়?”

উত্তর দিতে গিয়েও চুপ করে গেলেন দীপকাকু। একটা ছোটখাটো কৌতূহলী ভিড় ঝিনুকদের ঘিরে ধরেছে। এদের মধ্যে অনেকেই ঝিনুকের মাস্টার স্ট্রোকের সাক্ষী। দীপকাকু বললেন, “চলুন। ট্রেনে গিয়ে বসা যাক। লুচি-তরকারিতে যখন বাধা পড়ে গেল, অন্য কিছু দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারা যাবে।”

বিষণ্ন, চিন্তিত মুখ নিয়ে আবিরবাবু ঝিনুকদের সঙ্গে কম্পার্টমেন্টে উঠে এলেন। সিটে বসে বোতলের জল নিয়ে দীপকাকু পরিষ্কার করে দিলেন আবিরবাবুর শার্ট। ঠেলাওয়ালা ঝিনুকদের জানলার সামনে এসে দাঁড়াল। তিনটে লুচি-তরকারির ঠোঙা এগিয়ে ধরল, “খেয়ে নিন বাবু! কী বিচ্ছিরি ব্যাপার হল বলুন তো!”

ঝিনুক ঠোঙা তিনটে ধরল। আবিরবাবু টাকা বার করে হকারকে দিলেন। হকার খুচরো পয়সা ফেরত দিল। আবিরবাবু বললেন, “এ কী! তুমি তিনটের দাম নিচ্ছ কেন? পাঁচটার নাও। দুটো আমার হাত থেকে পড়ে গিয়েছে।”

“ঠিক আছে বাবু, আমার হাত থেকেও পড়তে পারত!” বলে, চলে যাচ্ছিল হকার। দীপকাকু ডাকলেন, “শোনো, পাগলাটা কি স্টেশনেই থাকে?”

“না বাবু, আজ প্রথম দেখছি।”

দীপকাকু আবিরবাবুর দিকে তাকালেন। মিটিমিটি হাসছেন। ঝিনুক দু’জনের হাতে তুলে দিল ঠোঙা। আবিরবাবু এখনও বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেননি। অভিভূত হয়ে পড়া গলায় বললেন, “আপনারা দু’জনেই তো জিনিয়াস মশাই! আমি তো ভাবতেই পারিনি ঝিনুক এত ভাল ক্যারাটে জানে!” দীপকাকু যোগ করলেন, “এই একটা নিখুঁত স্ট্রোকের জন্য দিনের পর দিন প্র্যাকটিস করে যায় ঝিনুক। রবিবার ছাড়া কামাই দেয় না ক্লাসে।”

“আর আপনার ধারণাও মোর অর লেস সঠিক। এইটুকু সময়ের মধ্যে কী করে জাজ করলেন?”

“ঝিনুকের স্ট্রোক নেওয়াটা আমি দেখেছি। তখনই নেমে গেলাম প্ল্যাটফর্মে। লোকটার ফুটমার্ক অবজার্ভ করলাম। নতুন স্পোর্টস শু পরে ছিল। রাবার সোলের ডটগুলো প্ল্যাটফর্মের ধুলোয় দেখা যাচ্ছিল স্পষ্ট। লোকটার জুতোর মাপ আমার চেয়ে এক বেশি। ন’নম্বর জুতো পরে লোকটা। মাথার চুলটা সম্ভবত নকল। পরচুলা।”

“ব্রিলিয়ান্ট!” উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলেন আবিরবাবু।

দীপকাকু বললেন, “লুচিটা খান। ঠান্ডা হয়ে যাবে!”

তিনজনেই খাওয়া শুরু করল। খেতে খেতে দীপকাকু বলতে থাকলেন, “খড়্গপুরে যা ঘটল, এটা নমুনা মাত্র। পুরুলিয়ায় নামার পর আমাদের আটকানোর জন্য আরও অনেক ব্যবস্থা নেওয়া থাকবে। তাই আমরা করব কী, পুরুলিয়ার আগের স্টেশন আদ্রায় নেমে যাব। বাকি পথটুকু যাব ট্যাক্সি অথবা বাসে, যেটা সুবিধেমতো পাওয়া যায়। আর একটা কথা মনে রাখুন, আদ্রা আসার সঙ্গে সঙ্গে আমরা উঠে দাঁড়াব না। ট্রেন থেমে আবার যখন গড়াতে থাকবে, সাডেনলি সিট ছেড়ে প্ল্যাটফর্মের উলটো দিকের গেট দিয়ে নেমে যাব রেললাইনে।”

দীপকাকুর দিকে অবুঝ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকলেন আবিরবাবু। দীপকাকু বললেন, “কী হল, চলন্ত ট্রেন থেকে রং সাইডে নামতে পারবেন তো?”

“তা পারব। কিন্তু আমাকে একটা কথা বলুন তো, আমাদের পুরুলিয়া যাওয়াটা কেন অপছন্দ করছে দুষ্কৃতীরা?”

“কজ ইজ ভেরি সিম্পল। ওখানে গেলে রহস্য উদঘাটনের অনেক কাছে চলে যাব আমরা।” বললেন দীপকাকু।

ঝিনুক বলল, “অপরাধীরা তার মানে এতদিনে টের পেল, পিছনে গোয়েন্দা লেগেছে।”

উত্তর দিতে সময় নিলেন দীপকাকু। বললেন, “আমাদের আসল পরিচয় সম্ভবত ওরা জানে না। জানার সময়-সুযোগ পায়নি। আমরা তদন্তে নেমেছি টের পেলে, কলকাতাতেই আমাদের কাজে বাধা দিত। ওরা চাইছে না এই সময় আবিরবাবু এবং বাইরের লোক পুরুলিয়ার বাড়িতে আসুক। আবিরবাবু আমাদের যাওয়ার খবর জেঠুমণিকে জানানোর পরই অপরাধীরা তৈরি হয় আটকানোর জন্য। আমাদের আসার খবরটা ওবাড়ি থেকেই পাচার হয়েছে অপরাধীদের কানে। জেঠুমণি যেহেতু জানেন না আমাদের আসল পরিচয়, ধরে নেওয়া যায় অপরাধীরাও জানে না।” একটু থামলেন দীপকাকু। ট্রেন ছেড়ে দিল। দীপকাকু ফের বললেন, “যাক একদিক থেকে ভালই হয়েছে। যতটা খোলা মন নিয়ে পুরুলিয়ায় যাচ্ছিলাম আমরা, তা বোধহয় ঠিক হচ্ছিল না। এই ঘটনাটা আমাদের সতর্ক করে দিল।”

.

প্রায় আড়াই ঘণ্টার পথ পার হয়ে এল ঝিনুকরা। তিনজনের মধ্যে আর বিশেষ কোনও কথা হয়নি। দীপকাকু একবার উঠে ভেস্টিবিউল পেরিয়ে বেশ ক’টা কামরা ঘুরে এসেছেন। ঝিনুক জিজ্ঞেস করেছিল, “পেলেন দেখতে?”

“না। তবে আছে এই ট্রেনেই।” বললেন দীপকাকু। ফের ডুবে গেলেন বইয়ের পাতায়। প্ল্যাটফর্মের ঘটনার পর আবিরবাবু অনেকটাই দমে গিয়েছেন। বসে আছেন মনমরা হয়ে। ঝিনুকের দৃষ্টি জানলার বাইরে। ট্রেনের দু’পাশে প্ৰকৃতি এখন অনেকটাই বদলে গিয়েছে। লাল মাটির রুক্ষ প্রান্তর। গরম হাওয়ার ঝাপটা এসে লাগছে ঝিনুকের গায়ে। খুব যে একটা কষ্ট হচ্ছে, তা নয়। হাওয়ার মধ্যে লুকিয়ে আছে দূরে থাকা পাহাড়, জঙ্গলের গন্ধ। বাঁকুড়ায় থেমে ছিল ট্রেন। এক ঘণ্টা হতে চলল। পরের স্টেশনে নামবে ঝিনুকরা। ট্রেনের গতি কমছে। জানলার পাশে দেখা দিচ্ছে শহরতলি। আবিরবাবু কাঁধে ব্যাগ তুলে নিয়ে বললেন, “আদ্রা ঢুকছে গাড়ি।”

দীপকাকু বললেন, “ঢুকুক। কাঁধ থেকে স্ট্র্যাপটা নামান। যেভাবে নামব বলেছি তার যেন অন্যথা না হয়! মনে রাখবেন, খড়্গপুরের পাগল এখন ছদ্মবেশ ছেড়ে আমাদের উপর নজর রাখছে।”

“কিন্তু আমরা তাকে চিনতে পারছি না।” বলে, কাঁধ থেকে স্ট্র্যাপ নামালেন আবিরবাবু। ট্রেন পুরোপুরি থেমে গিয়েছে। নিজের ব্যাগ খামচে ধরে আছে ঝিনুক।

আবিরবাবু বললেন, “ইদানীং মেল, এক্সপ্রেসগুলোর নতুন স্টাইল হয়েছে, হুইসল না দিয়েই ছেড়ে দেয়।

মিলে গেল আবিরবাবুর কথা। গড়াতে শুরু করল ট্রেন। আবিরবাবু ছুটলেন প্রথমে। পিছনে ঝিনুক, দীপকাকু।

প্ল্যাটফর্মের বিপরীত গেট দিয়ে নেমে এলেন তিনজনে। প্রথমে নেমেও বডিব্যালান্স রাখতে পারেননি আবিরবাবু, পপাত ধরণীতল হয়েছেন। ঝিনুক হাত ধরে তুলছে আবিরবাবুকে। দীপকাকুর নজর এগিয়ে যেতে থাকা ট্রেনের দিকে। কেউ নামল কি ঝিনুকদের দেখাদেখি?

নামেনি। স্টেশন চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে গেল ট্রেন। দীপকাকু এবার আবির বাবুর দিকে তাকালেন। ঠাট্টার সুরে বললেন, “ছেলেবেলায় মনে হচ্ছে একেবারেই খেলাধুলো করেননি। শুধু পড়ালেখা…”

বিব্রত বোধ করলেন আবিরবাবু। জামা-প্যান্টের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, “আসলে অভ্যেস নেই তো!”

“তার মানে! আপনার কি ধারণা, আমি, ঝিনুক রোজ ট্রেনের রং সাইড দিয়ে ওঠানামা প্র্যাকটিস করি?”

দীপকাকুর মজা শুনে হেসে ফেলছিল ঝিনুক, তাড়াতাড়ি সামলে নিল। যতই হোক আবিরবাবু বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ।

কিছুক্ষণ রেললাইন ধরে হাঁটার পর দীপকাকু বললেন, “চলুন, এবার প্ল্যাটফর্মে ওঠা যাক! আর কোনও অসুবিধে নেই বলেই মনে হচ্ছে।”

.

সত্যিই রাস্তায় আর কোনও গোলমাল হয়নি। একটা অ্যাম্বাসাডর ভাড়া করে ঝিনুকরা পুরুলিয়ার কাছাকাছি চলে এল। গোটা রাস্তার সিনিক বিউটি ছিল অপূর্ব! ধু ধু প্রান্তর, আদিবাসী গ্রাম পেরিয়ে এল ঝিনুকরা। ছোট ছোট টিলা, তিরতিরে জল বয়ে-যাওয়া নদী। ঝিনুক প্রায় ভুলতেই বসেছিল, ওরা কী কাজে এসেছে। এখন ইতস্তত পাকা বাড়ি দেখে সংবিৎ ফিরল। বেশিরভাগ বাড়িই পুরনো ডিজ়াইনের। রাস্তায় ঢিমেতালে চলা আদিবাসী মানুষ যেমন দেখা যাচ্ছে, পাশ দিয়ে হুহু গতিতে বেরিয়ে যাচ্ছে লেটেস্ট ডিজ়াইনের বাইক, ফোর হুইলার। এখনও ঠিক শহরে ঢোকেনি ঝিনুকরা। জমিদারবাড়ির মতো একটা বাড়ির সামনে গাড়ি থামাতে বললেন আবিরবাবু। বললেন, “এসে গেলাম!”

ঝিনুক তো থ! এত বড় বাড়ির কথা সে কল্পনা করেনি। বিশাল গ্রিলের গেট। উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা কম্পাউন্ড। পাঁচিলের উপর দিয়ে উঁকি মারছে গাছপালা। বাগানের জন্য অনেকটাই জায়গা ছাড়া আছে মনে হচ্ছে। এ বাড়ির ছেলে হয়ে আবিরবাবু কিনা থাকেন হাজার স্কোয়ার ফুটের ফ্ল্যাটে! দলিল অনুযায়ী পৈতৃক বাড়ির সামান্য অংশেরও মালিক নন আবিরবাবু। যদিও-বা স্মারক হিসেবে বিষ্ণুমূর্তিটা পেয়েছিলেন, বসে আছেন খুইয়ে। লোকটা নিপাট ভালমানুষ বলেই তাঁকে এভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে।

গাড়ির টাকা মিটিয়ে ঝিনুকরা এখন গেট ঠেলে ঢুকে পড়ল। আবিরবাবু বললেন, “গেটের মুখোমুখি এই পোরশানটা বড়দার। বাঁ দিকে জেঠুমণির, ডান দিকে মেজদার। আমি এলে জেঠুমণির পোরশানে থাকি।”

বাঁ দিকের মোরাম বিছানো রাস্তাটা ধরলেন আবিরবাবু। সঙ্গে যেতে যেতে ঝিনুক ভাবল, বাড়ির কেউ তো তাদের রিসিভ করতে এল না! যদিও বাড়ির চৌহদ্দিতে কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। তবু অত বড় একটা গাড়ি থামল, তার তো আওয়াজ আছে। বাড়ি থেকে কোনও মানুষ বের হল না! তার চেয়েও বড় কথা, আবিরবাবু তো ফোন করে জেঠুমণিকে জানিয়েছিলেন, আজ রূপসী বাংলায় আসছেন। ট্রেনের থেকে বড়জোর এক ঘণ্টা লেট হয়েছে ঝিনুকদের। কেউ থাকবে না অপেক্ষায়!

জেঠুমণির পোরশানের বিশাল বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়াল ঝিনুকরা। আবিরবাবু দু’বার কড়া নাড়লেন। ডোরবেল টিপলেন একবার। দরজা খোলার নাম নেই। আবিরবাবুও একটু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। স্বগতোক্তির ঢঙে বললেন, “কী ব্যাপার হল, আমার আসার কথা থাকলে জেঠুমণি দরজা খুলে বৈঠকখানায় বসে থাকেন!”

কথা শেষ হতেই ক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল বড়সড় দরজা। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন বছর সত্তরের এক বৃদ্ধা। আবিরবাবু বললেন, “কী ব্যাপার মাসি, এত দেরি করলে দোর খুলতে? জেঠুমণি কোথায়?”

এই বৃদ্ধার কথা আবিরবাবু বলেছেন। সরলামাসি। জেঠুমণির দেখাশোনা করেন। মাসির চোখে এখন বোবা চাউনি। আবিরবাবু অধৈর্যের গলায় বললেন, “কী হল মাসি, কিছু বলছ না যে!”

বৃদ্ধা হঠাৎই আঁচল মুখে তুলে নিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন। বোঝাই যাচ্ছে এ বাড়িতে বড় কোনও বিপদ ঘটে গিয়েছে। কী হয়েছে, সেটা উদ্ধার করা যাচ্ছে না। বৃদ্ধার কাঁধ ধরে বারবার ঝাঁকিয়ে স্পষ্ট কোনও কথা বার করতে পারছেন না আবিরবাবু। এমন সময় বছর কুড়ি-বাইশের একটি ছেলে এসে দাঁড়াল। বলল, “ছোটকা, জ্যাঠাদাদু হসপিটালে!”

“কেন, কী হয়েছে?” বিষম উৎকণ্ঠায় জানতে চাইলেন আবিরবাবু।

ছেলেটি সম্ভবত আবিরবাবুর ভাইপো। বলল, “কাল রাত্তিরে সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়েছে। তখনই ‘মেডিকেয়ার’ নার্সিংহোমে নিয়ে যাই আমরা। এখন আইসিইউ-তে আছেন। ডেঞ্জার পিরিয়ড কাটেনি।

শকটা ঝট করে সামলে নিলেন আবিরবাবু। যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় দীপকাকুকে বললেন, “আপনারা স্নান করে খেয়ে রেস্ট নিন। আমি একবার নার্সিংহোম ঘুরে আসছি।”

দীপকাকু কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। আবিরবাবুর ভাইপো বলল, “মা তোমাদের জন্য রান্না করে রেখেছেন। বলছিলেন, তুমিও স্নান-খাওয়া করে নার্সিংহোমে যাও। আগে গিয়ে তো কোনও লাভ নেই। অজ্ঞান হয়ে আছেন জ্যাঠাদাদু। বাবা, মেজকা দু’জনেই আছেন ওখানে।”

“না। আমি এখনই যাব।” শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় সিদ্ধান্ত জানালেন আবিরবাবু। ঝিনুক ইতিমধ্যে অন্য একটা হিসেব মিলিয়ে নিয়েছে, এই ছেলেটি হচ্ছে আবিরবাবুর বড়দার ছেলে।

আবিরবাবু লাগেজ ব্যাগ সোফায় রেখে বেরনোর উদ্যোগ নিচ্ছেন। দীপকাকু বললেন, “চলুন, আমরাও যাই।”

বিব্রত বোধ করলেন আবিরবাবু। বললেন, “এতটা জার্নি করে এসে আবার যাবেন?”

“জার্নি আপনিও করেছেন!” বলে, দীপকাকু ব্যাগ কাঁধেই দরজার দিকে এগোলেন। ঝিনুক তার ব্যাগটা রেখে গেল আবিরবাবুর ব্যাগের পাশে। দীপকাকু কেন ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছেন, সেটা ও জানে। ওই ব্যাগ কেউ যদি খোলে, দীপকাকুর আসল পরিচয় আন্দাজ করে ফেলবে!

.

এখন সন্ধে। জেঠুমণির শোওয়ার ঘরে ঝিনুকরা তিনজন। ঘরটা দোতলায়, আকারে প্রায় হলঘরের মতো। খড়খড়ি দেওয়া জানলা, দেওয়ালে মলিন হয়ে-আসা বিশাল পেন্টিং, পুরনো আমলের বিগবেন ঘড়ি। কালচে কাঠের আলমারি, বইয়ের র্যাক, মোমদানি, ধূপদানি, সবকিছুর মধ্যেই অতীত দিনের ছাপ। ঘরে টিউবলাইট নেই, জ্বলছে বাল্ব। হলদেটে আলো আরও রহস্যময় করে তুলেছে ঘরটাকে। দীপকাকু বসে আছেন ইজিচেয়ারে, হাতে জেঠুমণির ডায়েরি। আবিরবাবু বসেছেন সোফায়। সোফার বদলে কৌচ বললেই মানায়। ঝিনুক বসেনি। ঘুরে ঘুরে ঘরটা দেখছে। জেঠুমণির পালঙ্ক শুনশান। ভদ্রলোককে নার্সিংহোমে অজ্ঞান অবস্থায় দেখে এসেছে ঝিনুকরা। ভেন্টিলেশনে রাখা আছে। কে জানে, উনি আর কোনওদিন এ ঘরে ফিরে আসতে পারবেন কি না! ডাক্তাররা এখনও কোনও আশ্বাস দেননি। মাথায় অনেকটা জায়গা জুড়ে রক্ত জমাট হয়ে আছে।

কেসটা যে এভাবে মাঝপথে থেমে যাবে, ভাবতে পারেনি ঝিনুক। যে মানুষটার সঙ্গে কথা বললে রহস্যের জট অনেকটাই খুলে যেত, তিনি চলে গিয়েছেন গভীর আচ্ছন্নতায়। অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে কেসের ভবিষ্যৎ। একটা আশ্চর্য ব্যাপার লক্ষ করছে ঝিনুক, দীপকাকু কিন্তু দমে যাননি। আবিরবাবুকে বলেছেন, “চিন্তা করবেন না। জেঠুমণি উপস্থিত না থাকলেও ওঁর ঘর, বই-খাতা, আসবাব ওঁর হয়ে কথা বলবে। ওঁর ঘরে নিয়ে চলুন আমাকে।”

দীপকাকুর এহেন উৎসাহের একটা কারণ অবশ্য আছে। জেঠুমণির অসুস্থতা যেমন গতি রোধ করেছে তদন্তের, একই সঙ্গে একটা ঘটনা কেসটাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। হয়েছে কী, নার্সিংহোম থেকে ফিরে ঝিনুকরা স্নান-খাওয়া করল। আবিরবাবুর বড়বউদি দারুণ রান্না পাঠিয়েছিলেন। এরপর একটু গড়াতে যাবে, মৌরি চিবোতে চিবোতে দীপকাকু বললেন, “চলুন আবিরবাবু, জেঠুমণির ঠাকুরঘরটা একবার দেখা যাক। বিষ্ণুমূর্তিটা যেখানে রাখা থাকত, সেই জায়গাটা দেখব।”

আবিরবাবু ঝিনুকদের নিয়ে এলেন দোতলায়। ঠাকুরঘর এখানেই। চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আবিরবাবু প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলেন, “ওঃ মাই গড, মূর্তিটা তো এখানে! কী করে সম্ভব?”

ঝিনুক ততক্ষণে শনাক্ত করে ফেলেছে মূর্তিটাকে। অন্য দেবদেবীরা গুরুত্ব অনুসারে মোজাইক পাথরের ধাপে সাজানো। মাঝখানে কাঠের সিংহাসন। সেখানেই আছেন বিষ্ণুমূর্তি, যেটা এত দিন ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছে ঝিনুকরা!

দীপকাকু এগিয়ে গিয়েছিলেন সিংহাসনের সামনে, মূর্তিটা হাতে তুলে পরীক্ষা করছিলেন। পিছন থেকে বাজখাঁই গলায় একজন ধমকে উঠলেন, “এ কী মশাই, চটি পরে ঠাকুর ছুঁলেন? কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই!

মূর্তি যথাস্থানে রেখে ঘাড় ফিরিয়ে দীপকাকু বললেন, “এক্সট্রিমলি সরি! একদম খেয়াল ছিল না।”

বাইরে পরার চটি নয়, দীপকাকুর পায়ে ছিল স্লিপার। বেখেয়ালে কাণ্ডটা ঘটিয়ে ফেলেছিলেন। লোকটির ব্যবহার অত্যন্ত অসৌজন্যমূলক। রাগ হয়ে গিয়েছিল ঝিনুকের। পরে দেখা গেল, মানুষটির কথা বলার ধরনটাই ওরকম। ভাল কোনও কথাও কেমন যেন ধমকের সুরে বলেন! যেমন, তারপরই উনি বলেছিলেন, “দুপুরবেলা তো বউদির হাতের রান্না খেলেন। যতই ভাল লাগুক, রাতে কিন্তু আমার বউয়ের রান্না খেতেই হবে। এবং সেটা পৌঁছে দিয়ে যেতে পারব না। ঘরে যেতে হবে আমার।”

বোঝা গেল ইনি হলেন মেজোছেলে। আবিরবাবু আলাপ করিয়ে দিলেন, “নাম শশীভূষণ বসু।” বড়ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছে নার্সিংহোমে। ওঁর নাম ফণিভূষণ। খুবই মার্জিত ব্যবহার। ঠান্ডা মাথার মানুষ। আবিরবাবু বারবার বড়দাকে দূষছিলেন, “জেঠুমণির এই অবস্থার কথা কেন আমাকে ফোন করে জানালে না?”

অনেক পরে উনি একবারই উত্তর দিলেন, “তুই দুপুরে আসছিস, জেঠুমণির কাছে শুনেছি। তাই আর জানাইনি। জানার পর সারাটা পথ দুশ্চিন্তায় কাটত তোর!”

নীরব হয়ে-যাওয়া জেঠুমণিকে দেখে খুবই অস্থির হয়ে পড়েছিলেন আবিরবাবু। অবস্থা ঠিক কেমন, কতটা সিরিয়াস, জানার জন্য ডাক্তারদের বিরক্ত করে যাচ্ছিলেন। দীপকাকু বাড়তি উদ্যোগ নিয়ে আবিরবাবুকে বাড়ি নিয়ে এলেন। আবিরবাবুর অস্থিরতা কেটে গেল মূর্তিটা দেখার পর। মেজোভাই নিমন্ত্রণ করে চলে যাওয়ার পর দীপকাকু ফাটালেন আর-একটা বোমা। জেঠুমণির ঘরে এসে বললেন, “এই মূর্তিটা নকল!”

“কী করে বুঝলেন?” জানতে চাইলেন আবিরবাবু।

দীপকাকু বললেন, “হাতে নিয়ে দেখলে আপনিও বুঝতে পারতেন!”

“কীরকম! কীভাবে বুঝতাম?”

উত্তরে দীপকাকু নিজের দু’হাতের চেটো দেখালেন। আঙুলে, চেটোতে লেগেছিল তেলকালি। বললেন, “মূর্তিটাকে পুরনো দেখানোর জন্য ব্যবস্থাটা নিয়েছিলেন দিবাকর সামন্ত।”

জেঠুমণির নামটা প্রথম দিকে বলেছিলেন আবিরবাবু। আজ নার্সিংহোমে গিয়ে টাইটেলটা জানা গেল। কাজের মাসির কাছে কাপড় চেয়ে নিয়ে দীপকাকু যখন হাতটা মুছছিলেন, আবিরবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “মূর্তিটাকে পুরনো দেখানোর ব্যবস্থা কেন করেছিলেন?”

“আপনার দুই দাদার চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য। আসল মূর্তিটাকে খুঁটিয়ে দেখেছিলেন আপনার স্ত্রী। আমাকে বলেছিলেন, মূর্তির গায়ে শ্যাওলা-সবুজ ছাপ ছিল। সেই এফেক্ট নকল এবং নতুন মূর্তিতে আনার চেষ্টা করেন দিবাকরবাবু। উনি চাননি যে, আপনার দাদারা জানুক মূর্তিটা আপনাকে দেওয়া হয়েছে। ওটা দেওয়ার আগে একটা নকল মূর্তি বানিয়ে রেখেছিলেন। আপনাকে আসলটা দিয়ে নকলটা সিংহাসনে বসিয়ে দেন।”

দীপকাকুর কথার পর ঝিনুক, আবিরবাবু দু’জনেই বাক্যহারা হয়ে গেলেন। দীপকাকু পেয়ে গেলেন বাড়তি উদ্যম। বললেন, “চলুন, আপনার জেঠুমণির ঘরটা একবার দেখি। মনে হচ্ছে আমার অনেক প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাব।”

প্রথমে তল্লাশি চালানো হল কাঠের আলমারিতে। কাজের মাসি কোনও এক গোপন জায়গা থেকে বার করে দিয়েছিল চাবি। আলমারির মধ্যে এক গোপন কুঠরি আবিষ্কার করলেন দীপকাকু। দুটি উইল বেরল সেখান থেকে। একটা দলিলে ফণিভূষণ, শশীভূষণকে সমস্ত সম্পত্তি ভাগ করে দেওয়া আছে। সেটাতেই লেখা আছে, জীবদ্দশায় দিবাকরবাবু ভোগ করবেন নিজের পোরশান। মৃত্যুর পরে পাবে বড় এবং মেজোভাই। দ্বিতীয় উইলটা করা হয়েছে শুধুমাত্র গৃহদেবতার বিগ্রহের জন্য। যেটা পাচ্ছেন আবিরবাবু।

খুব অবাক হয়ে আবিরবাবু বললেন, “ওইটুকু একটা মূর্তির জন্য উইল করতে হল!”

দীপকাকু বললেন, “এতেই বোঝা যায় মূর্তিটা কত মহার্ঘ!”

তারপর দীপকাকু চলে গেলেন বইয়ের র‍্যাক, জেঠুমণির স্টাডি-টেবিল ঘাঁটতে। পেয়ে গেলেন ডায়েরি। সেই থেকে ইজিচেয়ারে বসে ডায়েরি পড়েই যাচ্ছেন। মাঝে চা দিয়ে গেছে কাজের মাসি। ঝিনুকের পুরো দোতলাটা ঘোরা হয়ে গিয়েছে। বারান্দায় গিয়েছিল। হাওয়াটা অদ্ভুত! কলকাতার মতো ভেজা ভাব নেই। ঝিনুক বাবা-মায়ের সঙ্গে একবার বিহারের শিমুলতলায় গিয়েছিল, হাওয়াটা সেরকম। শিমুলতলা এখন বোধহয় ঝাড়খণ্ডে পড়েছে! ভাবনার মাঝে দীপকাকুর গলা শুনতে পেল ঝিনুক। আবিরবাবুকে কিছু বলছেন। আধখোলা জানলার পাশে চলে গিয়েছিল ঝিনুক। ফিরে এল।

দীপকাকু বললেন, “দিবাকর সামন্ত তখনকার দিনে বিএ পাশ। স্বাধীনতার আগের কথা বলছি।”

“জানি! আমার বাবা কোনওক্রমে স্কুলগণ্ডি পেরিয়েছিলেন।” বললেন আবিরবাবু।

দীপকাকু বললেন, “ঠিক। ডায়েরি পড়ে যা বুঝছি, আপনার বাবা ছিলেন সাহসী এবং উদ্যমী মানুষ। সেই গুণ সম্বল করে উনি ব্যাবসায় প্রচুর উন্নতি করেন। দেশ তখন স্বাধীন হওয়ার মুখে। আপনার বাবা সদ্য যুবক। ডিব্ৰুগড়ে চলছে এক অস্থির সময়। আমেরিকান সৈন্যরা ঘাঁটি গেড়েছে সেখানে। ভারতীয়দের চাকরির কোনও সুযোগ নেই। আপনার বাবা সোজা আমেরিকান কর্নেলসাহেবের সামনে চলে গেলেন। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট?’

“আপনার পিতা নারায়ণ বসু ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে যা বললেন, তার সারমর্ম দাঁড়ায়, ‘আমার ওল্ড ফাদার বেঙ্গলে ব্রিটিশদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়ে সপরিবার এখানে পালিয়ে এসেছিলেন। উনি এখন চলচ্ছক্তিহীন। পুরো সংসার আমার ঘাড়ে। সাহেব, তুমি এখন আমার পিতা। গড হলে গড। দয়া করে রোজগারের কিছু একটা ব্যবস্থা করে দাও।’

“কর্নেলসাহেবকে বাংলায় বসবাসের কিছু প্রমাণপত্র দেখিয়েছিলেন নারায়ণ বসু। সাহেব কতটা কী বুঝেছিলেন, কে জানে! বেঙ্গল ভারতের কোথায়, তাই হয়তো জানতেন না! তবু একজন ভারতীয় যুবকের দ্বিধাহীন প্রার্থনায় খুশি হয়ে বলেছিলেন, ‘ফায়ারউড সাপ্লাই করতে পারবে?’

“নারায়ণবাবু বললেন, ‘আপনি অর্ডার দিলে এনিথিং পারব।’

“এই এনিথিংটাই এভরিথিং হয়ে দাঁড়াল। মার্কিনদের সঙ্গে মেলামেশা করে অল্পদিনেই নারায়ণ বুঝে নিলেন কোন দেবতা কোন ফুল পছন্দ করেন। অল্পদিনেই পয়সার মুখ দেখতে লাগলেন তিনি। উত্থানটা চোখের সামনে দেখলেন দিবাকরবাবু। তাঁর চেয়ে কম শিক্ষিত হয়েও একজন বাঙালি কেমন এগিয়ে গেল! হিংসে করার বদলে নারায়ণ বসুর ভক্ত হয়ে পড়লেন দিবাকর সামন্ত। চাকরি চাইলেন নারায়ণ বসুর কাছে। পেয়েও গেলেন। আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ হল আত্মবিশ্বাসী, সফল এক বাঙালিকে। নারায়ণ বসুও খুব বিশ্বাস করতেন দিবাকরবাবুকে। ব্যাবসার খুঁটিনাটি হিসেবপত্তর, টাকাপয়সা সামলাতেন দিবাকরবাবু। একই সঙ্গে তিনি লক্ষ করছিলেন, মালিকের আশপাশে দিনের পর-দিন স্তাবকের ভিড় জমছে। প্রত্যেক মানুষের একটা দুর্বল দিক থাকে। নারায়ণ বসুরও ছিল। স্তাবকতায় গলে যেতেন। ভক্ত পরিমণ্ডল হয়ে থাকতে ভালবাসতেন। দিবাকরবাবু এটাও লক্ষ করলেন, মালিকের ইয়ার-বন্ধুদের মধ্যে বেশকিছু গুন্ডা-বদমাশ ঢুকে যাচ্ছে। নারায়ণবাবুকে সতর্ক করেছিলেন তিনি। ভুল বুঝলেন নারায়ণ বসু। ভাবলেন, দিবাকরবাবু ঈর্ষান্বিত হয়ে অভিযোগ আনছেন। কয়েক বছরের মধ্যেই সত্য উপলব্ধি হল তাঁর। ততদিনে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছে। বন্ধুরা এমনভাবে গ্রাস করেছিল নারায়ণবাবুকে, ব্যাবসা গুটিয়ে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। তলে তলে ব্যাবসা, সম্পত্তি বিক্রি করা শুরু করলেন নারায়ণবাবু। এ ব্যাপারে দিবাকরবাবু তাঁকে সর্বক্ষণ সাহায্য করে গিয়েছেন। একটা সময় সব যখন বিক্রি হয়ে গিয়েছে, এলাকার কাউকে কিছু না জানিয়ে পরিবার এবং বিশ্বস্ত সহচর দিবাকরবাবুকে নিয়ে নারায়ণবাবু রাতের আঁধারে রওনা দিলেন পশ্চিমবঙ্গের উদ্দেশে। তখনকার দিনে অসম থেকে কলকাতায় আসা সহজ ছিল না। বারবার ট্রেন পালটে নৌকোয় নদী পেরিয়ে আসতে হত। প্রচুর সময় লাগত তাতে। নারায়ণবাবুরা তখনও অসম বর্ডার পেরননি, ডাকাত পড়ল ট্রেনে। ওই দলের বেশিরভাগ লোক নারায়ণবাবুর একসময়ের স্তাবক। একটু দেরিতে যারা খবর পেয়েছে নারায়ণবাবু সম্পত্তি বিক্রির টাকা নিয়ে ট্রেনে উঠেছেন। ডাকাতির একটু আগে নারায়ণবাবু ওদের সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে চিহ্নিত করে ফেলেন। নিজের পরিবার এবং গৃহদেবতার দায়িত্ব দিবাকরবাবুকে দিয়ে চলে যেতে বলেন পাশের কামরায়। অতঃপর ডাকাতদের হাতে খুন হন নারায়ণবাবু। বুদ্ধি এবং সাহসের দ্বারা যে সম্পদ তিনি উপার্জন করেছিলেন, সমস্তটাই লুণ্ঠিত হয়। আদর্শ পুরুষের এই পরিণতি দেখে খুবই ভেঙে পড়েন দিবাকরবাবু। তখন তাঁর একমাত্র কর্তব্য হয় মালিকের পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা। সেই দায়িত্ব তিনি দীর্ঘ সময় ধরে পালন করে এসেছেন। নিজের বিয়ে-থা করা হয়ে ওঠেনি। মালকিনের গয়না বেচে বহু পরিশ্রমে পুরুলিয়ায় যখন ব্যাবসা দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন, তখন একটা কথা ভেবে আপশোস হত, মালিক যদি আর-একটু আগে সতর্ক হতেন, অসমের সম্পত্তি এবং প্রাণ ওইভাবে খুইয়ে আসতে হত না। দুঃখটা অনেক বছর বহন করেছেন দিবাকরবাবু। তাঁর নায়কের ওই পরাজয় তিনি মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। নারায়ণবাবুর শিক্ষা কাজে লাগিয়ে পুরুলিয়ায় ব্যাবসা দাঁড় করিয়েছিলেন দিবাকরবাবু। শুধু মনে হত, বাবু যদি এসব দেখে যেতে পারতেন! হঠাৎই একদিন দিবাকরবাবু আবিষ্কার করলেন অসমের সম্পত্তির কিছুই খোয়া যায়নি। অসম্ভব বিচক্ষণতায় সমস্ত সম্পদ সুরক্ষিত রেখেছেন তাঁর মালিক নারায়ণ বসু।”

এত দূর বলে চুপ করে গেলেন দীপকাকু। মিটিমিটি হাসছেন।

ঝিনুক ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। বলল, “তার মানে! কী দাঁড়াল আলটিমেটলি?”

দীপকাকু এখনও হাসছেন। আবিরবাবু বললেন, “কোথায় সেই সব সম্পদ? আমিও ঠিক বুঝলাম না, জেঠুমণি কী বলতে চেয়েছেন। ইনফ্যাক্ট, এত ঘটনা জেঠুমণি কোনওদিন আমাদের বলেননি। মা তো পুরনো কথা তুলতেই চাইতেন না। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, জেঠুমণির যে ডায়েরি লেখার অভ্যেস আছে, এটাই কোনওদিন লক্ষ করিনি।”

দীপকাকু এবার একটু সিরিয়াস হয়েছেন। গম্ভীর মুখে বললেন, “ডায়েরি লেখা সম্প্রতি শুরু করেছিলেন। বয়স হচ্ছে, যদি ভুলে যান পুরনো ঘটনা, সেই ভয়ে লেখা। তবে এই লেখাই এত কাজে লেগে যাবে ভাবতে পারেননি উনি। মূর্তিটা উদ্ধার করতে এই ডায়েরি বিরাট ভূমিকা নেবে।”

“মানে?” জানতে চাইলেন আবিরবাবু।

দীপকাকু বললেন, “বলছি, সরলামাসিকে একবার ডাকুন তো!”

সোফা ছেড়ে উঠে গেলেন আবিরবাবু। দীপকাকু এবার ঝিনুকের দিকে তাকালেন, মুখে খুশির উচ্ছ্বাস। বললেন, “কেস এইট্টি পারসেন্ট সলভড। মেরে এনেছি মনে হচ্ছে।”

“কিন্তু আমি যে কিছুই…”

ঝিনুকের কথা শেষ হল না। মাসিকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন আবিরবাবু। দীপকাকু মাসিকে জিজ্ঞেস করলেন, “কাল যখন বাবুর স্ট্রোক হল, তার আগে কে দেখা করতে এসেছিল?”

মাসি বলল, “আমি ঠিক খেয়াল করিনি। রান্নাঘরে ছিলাম। দরজা খোলাই থাকে। দিবারাত লোক আসছে-যাচ্ছে!”

“ফণিবাবু, শশীবাবু এসেছিল কিনা খেয়াল করেছ?” জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু।

“হ্যাঁ, তেনারা এসেছিলেন। বাবুর সঙ্গে ঝগড়াও হল।”

“ঝগড়া!” বিস্ময়ের কণ্ঠে বললেন দীপকাকু।

সরলামাসি বলল, “ইদানীং রোজই ঝগড়া বাধছে!”

“কী বিষয়ে ঝগড়া, শুনেছ কিছু?”

“আজকাল তো কানে ভাল শুনি না। যতদূর মনে হয় টাকাপয়সা চায়।”

“দুই ছেলেই?” জানতে চান দীপকাকু।

মাসি বলল, “বড়ছেলের ছেলেও চায়। তা বুড়োটা এত টাকা কোথায় পাবে বলো বাপু? সব লেখাপড়া তো সে করেই দিয়েছে!”

দীপকাকু এবার অন্য প্রসঙ্গে গেলেন। বললেন, “স্ট্রোক কোন ঘরে হয়েছিল, নীচের বৈঠকখানায় নাকি উপরে শোওয়ার ঘরে?”

একটু যেন চনমন করে উঠল সরলামাসি। বলল, “সেটাই এক আশ্চয্যি কথা! ঠাকুরঘরে সন্ধে দেওয়া হয়ে গিয়েছিল বাবুর। এর মাঝে শশীদাদাবাবু, ফণিদাদাবাবু, উত্তম ঘুরে গিয়েছে। বাবু ছিলেন শোওয়ার ঘরে।…”

“উত্তম কে?” কথা কেটে জানতে চাইলেন দীপকাকু

আবিরবাবু বললেন, “বড়দার ছেলে।”

সরলামাসি ফিরে গেল আগের প্রসঙ্গে, “আমি রান্নাঘরে আছি, হঠাৎ উপরে ধুপ করে আওয়াজ। কী ব্যাপার হল দেখতে উঠে গেলাম দোতলায়। দেখি, বাবু কাত হয়ে পড়ে আছেন ঠাকুরঘরের সামনে। আমি তো অবাক! সন্ধে দেওয়া হয়ে গেছে, এখন তো ঠাকুরঘরে যাওয়ার কথা নয়!” দম নিল মাসি। ফের বলল, “তখনও জ্ঞান ছিল। ঠাকুরপুজোর জল চোখেমুখে দিলাম। ঠাকুরঘরের দিকে আঙুল তুলে কী যেন বলতে চাইছিলেন! জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে, বলুন?’ কিছুই বলতে পারছেন না। কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল। শুধু ‘সিংহ’ কথাটা দু’বার শুনতে পেয়েছি।”

“থ্যাঙ্ক ইউ মাসি। ইউ হ্যাভ ডান এ গ্রেট জব।” বিষম উৎসাহে বলে উঠলেন দীপকাকু।

সরলামাসি থতমত খেয়ে বলল, “কিছু ভুল বললুম কি?”

একগাল হেসে দীপকাকু বললেন, “সমস্তটাই ঠিক করেছ মাসি। দোতলায় উঠতে যদি আর-একটু দেরি করতে, রহস্যভেদ করা আমার পক্ষে কঠিন হয়ে যেত।”

“আমি তা হলে যাই?” বলল মাসি। মানে মানে কেটে পড়তে পারলে যেন বাঁচে!

“হ্যাঁ, যাও!” অনুমতি দিলেন দীপকাকু।

মাসি ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আবিরবাবু জানতে চাইলেন, “কী ব্যাপার হল মিস্টার বাগচী, আপনি কি সত্যিই কেসটা সল্ভ করে ফেললেন?”

ইজিচেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন দীপকাকু। আবিরবাবুর প্রশ্নের সরাসরি কোনও উত্তর না দিয়ে বললেন, ““সিংহ’ নয়। ওটা হবে ‘সিংহাসন’। চলুন ঠাকুরঘরে যাওয়া যাক!”

ঠাকুরঘরের দরজার কাছে এসে দীপকাকু বললেন, “সিংহাসনটা নিয়ে আমি তল্লাশি চালাব। আপনারা দু’জন এখানে পাহারায় থাকবেন। বাইরের কেউ এলেই জানাবেন আমাকে।”

ঝিনুক, আবিরবাবু যুগপৎ ঘাড় হেলালেন। দীপকাকু ঢুকে গেলেন ঠাকুরঘরে। ঝিনুক রইল চৌকাঠে, আবিরবাবু সিঁড়ির মুখে। দীপকাকুর সার্চ করার ধরন ঝিনুক জানে। একেবারে ইঞ্চি-ইঞ্চি করে তল্লাশি করবেন। দেখতে দেখতে মাথা ধরে যায় ঝিনুকের। এখানেও তাই করছেন। নকল মূর্তিটা নামিয়ে কাঠের সিংহাসন তুলে নিয়েছেন কোলে। উলটেপালটে নেড়েচেড়ে দেখছেন গোটা জিনিসটা। আতশ কাচও বের হল। পাজামা-পাঞ্জাবি ময়লা হচ্ছে, সেদিকে কোনও হুঁশই নেই।

খুব বেশি সময় অবশ্য লাগল না। সিংহাসনের নীচের সাইডে লুকানো শাটার ছিল, খুলে ফেললেন দীপকাকু। বেরিয়ে এল একটা চিরকুট। কাগজটায় চোখ বুলিয়ে দীপকাকু বললেন, “আরও কঠিন পরীক্ষায় পড়ে গেলাম! তবে তদন্তের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি।”

চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ঝিনুক জানতে চাইল, “কী ওটা?”

“বলছি, ঘরটা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিই!” বলে, চিরকুট পকেটে রেখে ঠাকুরঘর গোছাতে লাগলেন দীপকাকু।

.

আবার জেঠুমণির ঘরে ফিরে এসেছেন তিনজনে। পকেট থেকে চিরকুটটা বার করে আবিরবাবুর হাতে দিলেন দীপকাকু। বললেন, “হাতের লেখাটা চিনতে পারছেন না?”

বারকয়েক চোখ বুলিয়ে মাথা নাড়লেন আবিরবাবু। বললেন, “হাতের লেখাটা তো চিনতে পারছিই না! যা লেখা আছে, মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝলাম না!”

কাগজটা ফেরত নিলেন দীপকাকু। বললেন, “এটা আপনার বাবার হাতের লেখা। দিবাকরবাবুকে মূর্তিটার সঙ্গে এই চিরকুটটাও দিয়েছিলেন। এটা একটা ধাঁধা। এর অর্থ বার করতে পারলেই বোঝা যাবে বিষ্ণুমূর্তিটা কেন দামি! কথা বলতে বলতে দীপকাকু গিয়ে বসলেন জেঠুমণির পড়ার চেয়ার-টেবিলে। পড়তে লাগলেন চিরকুটটা: ‘হরিণের শিঙে মাছি বসে না, তোমার আলো কখনও নেভে না/ হরি বোসের তিন ভাই, এক আনিও ভাগ নাই/ থাকলে হরির অন্তরে/ বেরবে না কোনও মন্তরে/ কপাল দোষে আসে যদি অনটন/ ভাঙলেই পাবে ললাটিকা তখন।’

ঝিনুক বলল, “এ তো সাংঘাতিক পাড়ল। কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না।”

“সত্যিই কঠিন। এর মানে বার করতে দিবাকরবাবুর বারো-পনেরো বছর লেগে গিয়েছে। আমাদের কিন্তু লাগবে না।” বললেন দীপকাকু।

“কেন?” প্রশ্ন করল ঝিনুক।

উত্তর দিলেন আবিরবাবু, “কারণ, মিস্টার বাগচী জেঠুমণির চেয়ে অনেক বেশি ইন্টেলিজেন্ট। যার প্রমাণ এই ক’দিনে আমি বহুবার পেয়েছি।”

“ইটস নট লাইক দ্যাট।” আপত্তি জানালেন দীপকাকু। বললেন, “এই ধাঁধাটা বের করতে আমারও কয়েক বছর লেগে যেত। আপনার জেঠুমণি একটা সুবিধে করে রেখেছেন।”

“কীরকম?” জিজ্ঞেস করলেন আবিরবাবু।

দীপকাকু বললেন, “জেঠুমণি ইচ্ছে করলে এই ধাঁধাটা সমেত মূর্তিটা আপনাকে দিতে পারতেন। না দেওয়ার কারণ, ওঁর সম্ভবত আশঙ্কা হয়েছিল, বাবার এই লেখাটাকে যদি আপনি খামখেয়ালিপনা ভেবে ফেলে দেন। সেই জন্যেই এই ধাঁধার মূল উদ্দেশ্যটা উনি মুখে বলে দিলেন আপনাকে। ওই কথাগুলোর মধ্যেই ধাঁধার অর্ধেক উত্তর পাওয়া যাবে বলেই আমার বিশ্বাস। আপনার মনে আছে, মূর্তিটা দেওয়ার সময় জেঠুমণি আপনাকে কী বলেছিলেন?”

“নিশ্চয়ই আছে! আমার বাবা নাকি তাঁর হাতে বিষ্ণুমূর্তিটা দিয়ে বলেছিলেন, এই দেবতা আমাদের বংশের সৌভাগ্য বহন করছেন। কতদিন করবেন, বলা মুশকিল। যদি তেমন দুর্দিন আসে, বুঝবে, দেবতার ক্ষমতা শেষ হয়েছে। মূর্তিটা যেন ভেঙে খানখান করে দেওয়া হয়।”

আবিরবাবুর কথাগুলো একটা কাগজে নোট করে নিলেন দীপকাকু। মুখ তুলে বললেন, “এই কথা কিন্তু আপনার বাবা বলেননি, উনি শুধু মূর্তি আর চিরকুটটা দেওয়ার সময় পেয়েছিলেন। ট্রেনে হামলা হতে পারে, আন্দাজ করেই আপনার বাবা মূর্তি বিষয়ক হেঁয়ালিটা আগেই লিখে রেখেছিলেন। হেঁয়ালি রচনার উদ্দেশ্য, মূর্তি এবং চিরকুট যদি হামলাবাজদের হাতে যায়, ওরা মূর্তির মূল্য নির্ধারণ করে উঠতে পারবে না। ওঁর বিশ্বাস ছিল দিবাকরবাবু অবশ্যই পারবেন। তা হয়নি, ধাঁধাটা বেশ কঠিন হয়ে গিয়েছিল। মানে উদ্ধার করতে অনেক বছর লেগে যায় দিবাকরবাবুর।”

“ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন, একটা কথা বলি?” অনুমতি চাইলেন আবিরবাবু। দীপকাকু বললেন, “বলুন।”

“আপনি এমনভাবে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন, যেন সমস্তটাই স্বচক্ষে দেখা। বিবরণের মধ্যে আপনার কল্পনা মিশে যাচ্ছে না তো!”

এই প্রথম দীপকাকুর বিরুদ্ধে মোলায়েম চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন আবিরবাবু। আচরণটা তেমন অন্যায্য মনে হচ্ছে না ঝিনুকের। দীপকাকু সত্যিই যেন একটু বেশি বেশি ভেবে ফেলছেন।

ঝিনুকের মুখ দেখে অসন্তুষ্টি যেন পড়তে পারলেন দীপকাকু! দু’জনেই বিপক্ষে চলে গিয়েছে তাঁর। তাই খুব সংযত ভঙ্গিমায় বলতে শুরু করলেন, “এই কেসটা হাতে নেওয়ার পর একটা মোক্ষম জায়গায় আমার খটকা লাগে। বিষয়টা আমি আপনাদের বলিনি। ভেবেছিলাম, দিবাকরবাবুর সঙ্গে কথা বলে কৌতূহলটা মিটিয়ে নেব। সুযোগ হল না। দিবাকরবাবু হসপিটালে। বেশ দমে গিয়েছিলাম। এই চিরকুটটা আমার খটকার জবাব দিয়ে দিল।”

“কীরকম?” জানতে চাইল ঝিনুক।

দীপকাকু বললেন, “দিবাকরবাবুর ভার্সান অনুযায়ী আবিরবাবুর বাবা নাকি বলেছিলেন, গৃহদেবতার ক্ষমতা একদিন শেষ হয়ে যাবে, তখন যেন মূৰ্তিটা ভেঙে ফেলা হয়! আমার প্রশ্ন, ট্রেনে ডাকাত পড়ল, খুন হলেন নারায়ণবাবু। বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল গোটা পরিবার। এর চেয়ে দুর্দিন আর কী হতে পারে? প্রয়াত নারায়ণবাবুর নির্দেশমতো কেন তখনই মূর্তিটা নষ্ট করে ফেলা হল না?” থামলেন দীপকাকু। তাঁর দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন আবিরবাবু, ঝিনুক। ফের শুরু করলেন দীপকাকু, “এই জন্যেই নষ্ট করা হয়নি— হেঁয়ালির অর্থ সেই সময় বার করতে পারেননি দিবাকরবাবু। যখন মানেটা পরিষ্কার হল, ততদিনে পরিবার খারাপ সময় কাটিয়ে সুস্থির অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছে।”

তিনজনেই চুপ। পুরনো আমলের ফ্যানটা ঘটঘট শব্দে ঘুরে যাচ্ছে। আবিরবাবু সিগারেটের প্যাকেট বার করে দীপকাকুর দিকে বাড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কনফিডেন্ট, ধাঁধাটার মানে বার করতে পারবেন?”

প্যাকেট থেকে সিগারেট নিয়ে দীপকাকু বললেন, “পারব।”

আবিরবাবু সিগারেট নিলেন ঠোঁটে। লাইটার বার করে দীপকাকুরটা ধরিয়ে, নিজেরটা ধরালেন। বললেন, “কতদিন সময় লাগবে?”

“দেখা যাক। দু’-একদিনের মধ্যেই পারব বলে মনে হচ্ছে। ভাবছি, আজ রাত জেগে কাজ করব।”

ঝিনুক মন দিয়ে দু’জনের কথা শুনছিল। ক্ষীণ একটা কিছুর আওয়াজ পেয়ে চোখ গেল বাঁ পাশের জানলায়। এ কী! পাল্লাটা সামান্য খুলে আবার বন্ধ হয়ে গেল কেন? এখন তো তেমন জোরে বাতাস বইছে না! সোফা ছেড়ে জানলার দিকে দৌড়ে গেল ঝিনুক। পাল্লা খুলে গিয়ে ঝুপ করে একটা আওয়াজ উঠে এল মাটি থেকে। পরিষ্কার বোঝা গেল জানলার বাইরে থেকে কেউ লাফ দিল মাটিতে। লোকটা ঘরের সমস্ত কথা শুনেছে। সময় নষ্ট করার কোনও মানে হয় না। ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল ঝিনুক। ফার্নিচার বাঁচিয়ে দৌড়ে পার হয়ে গেল বৈঠকখানা। বারান্দায় এসে দেখতে পেল, লোকটা দৌড়চ্ছে গেটের কাছে রাখা বাইক লক্ষ করে। ঝিনুক লাফিয়ে নামল বাগানে। মোরাম বিছানো রাস্তায় ভাল দৌড়নো যাবে না। গাছপালা লাফিয়ে পার হয়ে ঝিনুক সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করল লোকটার কাছে পৌঁছনোর। দূরত্ব কমে আসছে। কিন্তু ধরা বোধহয় যাবে না। লোকটা দৌড় শুরু করেছে অনেক আগে। বাইকে উঠে পড়েছে, বাঁ পা সামনে রেখে শরীরটা শূন্যে ছুড়ে দিল ঝিনুক। নিষ্ফল হল চেষ্টা। কুইক স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল বাইক, ঝিনুক আছড়ে পড়ল বাইকের চাকার দাগে।

ভালই চোট লেগেছে, উঠে দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে ঝিনুকের। কেউ তাকে হেল্প করতে এগিয়ে আসছে না। এতক্ষণে তো দীপকাকুর চলে আসার কথা। কোনওক্রমে উঠে দাঁড়াল ঝিনুক। হাঁটু, কনুই জ্বালা-জ্বালা করছে। ছড়েটড়ে গিয়েছে নিশ্চয়ই। হাত ঘুরিয়ে কনুইটা দেখার চেষ্টা করল। বড্ড অন্ধকার, ভাল দেখা যাচ্ছে না। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাড়ির দিকে ফিরল ঝিনুক। জেঠুমণির ঘরের আলো জানলা গলে পড়েছে বাগানে। সেই আলোয় ভেসে উঠলেন আবিরবাবু। এগিয়ে এলেন। তারপরই দেখা গেল দীপকাকুকে। ওঁরা তা হলে জানলার নীচটা পরীক্ষা করতে গিয়েছিলেন। যেখানে লাফিয়ে পড়েছিল লোকটা।

ঝিনুকের কাছে চলে এলেন আবিরবাবু। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চাইলেন, “কী গো, তেমন লাগেনি তো? কী লাফটাই না দিলে! তোমাকে উঠে দাঁড়াতে দেখে একটু ভরসা পেলাম!”

দীপকাকুও এসে গেলেন। বললেন, “গোপাল রায়!”

“কে গোপাল রায়?” জিজ্ঞেস করল ঝিনুক।

“রামকৃষ্ণ লজ থেকে আবিরবাবুর ফ্ল্যাটের উপর নজর রাখত যে। খড়্গপুরে এই লোকটাই আবিরবাবুকে ধাক্কা মারতে এসেছিল।”

“কী করে বুঝলেন?”

ঝিনুকের প্রশ্নের উত্তরে দীপকাকু বললেন, “জানলার নীচে বাগানের মাটিতে ন’নম্বর স্পোর্টস শু-র ছাপ, আর এই প্যাকেটটা পড়েছিল।”

দীপকাকুর হাতে সিগারেটের প্যাকেট। রামকৃষ্ণ লজের নান্টু বলেছিল, “গোপাল রায় সিগারেট খেত।”

দীপকাকু বললেন, “সিগারেটের প্যাকেটের বদলে যদি পার্স বা মোবাইল পড়ে যেত, জানা যেত লোকটার আসল নাম।”

তিনজনে পায়ে পায়ে এগিয়ে চললেন জেঠুমণির পোরশানে। দীপকাকু জানতে চাইলেন, “বাইকটার নম্বর দেখতে পেয়েছ?”

ঝিনুক দু’পাশে মাথা নাড়ল, “নম্বর দেখার সময় পেলাম কোথায়?”

দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “কালার?”

উত্তর দিতে ইচ্ছে করল না ঝিনুকের। একবারও দীপকাকু দেখলেন না, ঝিনুক কতটা উন্ডেড! ঝিনুককে দেখতে হবে গাড়ির নম্বর, কালার? আশ্চর্য ব্যাপার!

দীপকাকু নিজেই বলে উঠলেন, “দূর থেকে তো কালো বাইকই মনে হল! অন্ধকারে অবশ্য সব গাঢ় রং কালো দেখায়।”

বারান্দার কাছে পৌঁছে গেল ঝিনুকরা।

আবিরবাবু বললেন, “মিস্টার বাগচী, ঝিনুকের একটা ফার্স্টএড দরকার। বিচ্ছিরিভাবে পড়েছে।”

“ফার্স্টএডের ব্যবস্থা আমার ব্যাগে আছে। সকালে কাল কোনও মেডিক্যাল শপ থেকে অ্যান্টি-টিটেনাস ইনজেকশন নিতে হবে।” বলে, একটু থামলেন কাকু। ফের বললেন, “এবার ভাবছি ইনজেকশনটাও কাছে রাখব।

দীপকাকুর ঠেস দেওয়া কথাটা ঝিনুকের ছড়ে যাওয়া জায়গাগুলোর জ্বালা আরও বাড়িয়ে দিল। আবিরবাবু ধরতে পারলেন না দীপকাকুর কটাক্ষ। বললেন, “ঝিনুক তার মানে প্রায়ই এরকম সাহসী কাণ্ড ঘটায়?”

“প্রত্যেক কেসে অ্যাভারেজ দু’বার।” বললেন দীপকাকু।

আবিরবাবু মানুষটি সত্যিই সরল। এবারও কথার মর্মার্থ বুঝতে ব্যর্থ হলেন। বললেন, “একেবারে বুলেট মেয়ে! পিস্তল না রেখেও কাজ চালাতে পারবেন আপনি।”

প্রশংসাটা দীপকাকুর ঠেস দেওয়া কথাগুলোকে হারিয়ে দিল। গর্বিত ভঙ্গিতে দীপকাকুর দিকে তাকাল ঝিনুক, হাসছেন। তবে ব্যঙ্গের নয়। আত্মতৃপ্তির। দল গোল করার পর কোচ যেমন হাসেন!

.

আবিরবাবুর মেজদার পোরশানে ডিনারটা বেশ ভালই হল। ঝিনুকের কনুইয়ে ব্যান্ডএড দেখে উদ্বেগের সঙ্গে ওঁরা জানতে চাইলেন, “কী হয়েছে?”

দীপকাকু বললেন, “অন্ধকারে মোরাম রাস্তায় হাঁটছিল, স্লিপ করে গেছে পা।”

তবু ভাল, ওবাড়ির লোক ঝিনুকের হাঁটুর অবস্থা দেখতে পায়নি। শর্ট কুর্তা, পাজামা পরেছিল। ডান হাঁটুতে রীতিমতো ব্যান্ডেজ বাঁধতে হয়েছে। হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছে ঝিনুকের।

মেজোছেলে শশীভূষণের বাড়িতে খেতে খেতে দীপকাকু অনেক ইনফরমেশন জোগাড় করলেন। বড়ছেলে ফণিভূষণের কী কী ব্যাবসা আছে? চলে কেমন? জানা গেল, পারিবারিক সূত্রে পাওয়া কাঠের ব্যাবসাটা এখন তেমন চলে না। ট্রান্সপোর্টের বিজনেস খুলেছেন ইদানীং। সেটা বেশ ভালই চলে। আর একটা গাড়ি সারানোর গ্যারাজ আছে। হোমিয়োপ্যাথ ডাক্তার শশীভূষণের পসার যথেষ্ট ভাল। ঘরের আসবাব, গ্যাজেটস-এ তার ছাপ আছে। এক ছেলে, এক মেয়ে। দু’জনেই খুব মিশুকে। চেহারায় অবস্থাপন্ন ঘরের ঔজ্জ্বল্য। ঝিনুক একটা জিনিস ভেবে পাচ্ছে না, দুই ছেলের অবস্থা যখন খারাপ নয়, কেন তাঁরা টাকা চাইতে যেতেন জেঠুমণির কাছে? জেঠুমণি টাকা পাবেন কোথায়! ব্যাঙ্কের ইন্টারেস্টে বোধহয় নিজের খরচ চালাতে হয় জেঠুমণিকে। এসবের উত্তর আর কোনওদিন পাওয়া যাবে কিনা কে জানে! ডিনারের পর ফোন করা হয়েছিল নার্সিংহোমে। অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি।

সারাদিনের ধকলে আবিরবাবুকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। জেঠুমণির পোরশানে ফিরে এসে শুতে চলে গেলেন। পাশের ঘরে শুয়েছে ঝিনুক আর সরলামাসি। দরজা ভাল করে বন্ধ করার পর মাসি জানলাগুলোও বন্ধ করতে যাচ্ছিল। ঝিনুক মানা করল।

সরলামাসি বলল, “চোরটা যদি আসে আবার!”

ঝিনুক বলল, “আসবে না। দীপকাকু জেগে আছেন না!”

“উনি কি সারারাত জেগে থাকবেন?” জানতে চেয়েছিল সরলামাসি

উত্তর দেওয়ার বদলে অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল ঝিনুক। খানিক আগে জেঠুমণির ঘরে গিয়ে দীপকাকুকে এই প্রশ্নটাই সে করেছিল। টেবিলে দুটো কাগজ পাশাপাশি রেখে বসে ছিলেন কাকু। একটা নারায়ণ বসুর হেঁয়ালি লেখা চিরকুট, অন্যটা দীপকাকুর হাতের লেখায় দিবাকরবাবুর সেই নির্দেশ, মূর্তিটা দেওয়ার সময় আবিরবাবুকে তিনি যে-সব কথা বলেছিলেন। ঝিনুকের প্রশ্ন শুনে একটু পরে মাথা তুলেছিলেন দীপকাকু। বলেছিলেন, “মনে হচ্ছে পুরো রাত জাগতে হবে না। তার আগেই বার করে ফেলব।”

“আমি জাগব আপনার সঙ্গে?” অধীর আগ্রহে বলেছিল ঝিনুক।

দীপকাকু বলেছিলেন, “একদম না। যথেষ্ট ঝক্কি গেছে তোমার শরীরে। যে পেনকিলারটা দিয়েছি, খেয়ে শুয়ে পড়ো।”

ওষুধটার জন্যেই সম্ভবত ঝেপে ঘুম আসছে ঝিনুকের। জড়িয়ে যাচ্ছে চোখ। মন ঘুমোতে চাইছে না। মাথায় ঘুরছে চিরকুট লেখা হেঁয়ালিটা। যার অর্থ বার করতে পারলেই বোঝা যাবে বিষ্ণুমূর্তির প্রকৃত দাম। কিন্তু ধাঁধাটা যেমন কঠিন, ততটাই অদ্ভুত! কী সহজ ভাষায় লেখা, ‘হরিণের শিঙে মাছি বসে না, তোমার আলো কখনও নেভে না/ হরি বোসের তিন…’ ঘুমিয়ে পড়ল ঝিনুক। স্বপ্নে ভেসে উঠল জ্যোৎস্না-ধোওয়া বনাঞ্চল। একটা উজ্জ্বল রঙের হরিণ জল খেতে এসেছে ছোট্ট হ্রদে। হরিণের শিঙে মাছি নয়, উড়ে উড়ে বসছে রঙিন প্রজাপতি।