চাবি রহস্য – ৫

আর্টিস্ট যার ছবি এঁকেছে, কেউই তাকে চিনতে পারেনি। ব্যতিক্রম দীপকাকু। প্রসঙ্গ এলেই উনি শুধু মিটিমিটি হাসছেন। পারমিতা দেবী বলেছেন, ছবিটা নিখুঁত আঁকা হয়েছে। এই সেই লোক, যে এসি মেশিনটা সার্ভিসিং করতে এসেছিল। ছবিটা আঁকা হয়েছে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত। একটা ব্যাপারে সামান্য হতাশ হয়েছেন পারমিতা দেবী। আর্টিস্টের পাকা হাত দেখে উনি নিজের একটা পোর্ট্রেট আঁকাতে চেয়েছিলেন। দীপকাকুর পাঠানো ইয়ং আর্টিস্ট কিছুক্ষণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পারমিতা দেবীকে বলে, “আপনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের বর্ণনা দিন।”

“ধুত, এভাবে কখনও ছবি আঁকানো যায় নাকি?” বিরক্তিসহ দীপকাকুকে কমপ্লেন করেছিলেন পারমিতা। ঝিনুক তখন সামনে দাঁড়িয়ে, একটু হলে হেসে ফেলছিল।

দীপকাকু পারমিতা দেবীর থেকে আর্টিস্টের আঁকা অপরাধীর ছবিটা নিয়ে বলেছিলেন, “ওরা কথার ছবি আঁকে। ওদের গুরু ফ্রান্সের বিখ্যাত আর্টিস্ট আলফোঁস বাতিল।”

গুরুগম্ভীর তথ্যের ভারে ঝিনুকের স্বতঃস্ফূর্ত হাসিটা মিলিয়ে গেল।

.

তারপর কেটে গিয়েছে দু’দিন। ফিঙ্গারপ্রিন্টের ফোটো এসেছে দীপকাকুর হাতে। আজ দেবাংশুবাবুর কেসের শেষ দিন। দীপকাকু কথা রেখেছেন, সঙ্গে নিয়েছেন বাবাকে। দীপকাকুর হাতে একটা ফাইল, মনে হচ্ছে ওর ভিতরেই রয়েছে রহস্য উদঘাটনের নথিপত্র। বাবার গাড়িতে ঝিনুকরা চলেছে গড়িয়াহাটের কাছে এক হোটেলে। ওখানকার কনফারেন্স রুমে এই কেসটায় জড়িত লোকজনদের ডাকা হয়েছে। বাবা জানতে চেয়েছিলেন, “কাদের কাদের ডাকলে?”

দীপকাকু বলতে চাইলেন না। বললেন, “কনফারেন্স রুমে গিয়ে দেখবেন।”

ঝিনুক জিজ্ঞেস করল, “তথাগতবাবু কি ধরা পড়েছেন?”

এই প্রশ্নেরও কোনও উত্তর দিলেন না দীপকাকু। চলন্ত গাড়ির জানলার বাইরে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলেন, যেন কলকাতার সন্ধে পৃথিবীর অন্যতম এক সুন্দর দৃশ্য।

এরপর বাবা নড়েচড়ে বসলেন। বললেন, “এত সাসপেন্সে রাখলে কিন্তু চলবে না। তা হলে আমরা তোমার কীসের কাছের লোক? চুরিটা অন্তত কীভাবে হয়েছে বলো।”

প্রস্তাবে রাজি হলেন দীপকাকু। বললেন, “হ্যাঁ, এটা আপাতত বলা যায়। চুরির পদ্ধতি ধরার ব্যাপারে আপনি এবং মিস্টার আফাং আমাকে বিরাট হেল্প করেছেন। দেবাংশুবাবুর ব্যাগের চাবিটা আফাংকে দেখাতে উনি বললেন, ‘কলকাতায় এই চাবি বানানো সম্ভব নয়। চাবিটা সংকর জাতীয় ধাতুতে তৈরি। এই মেটাল কলকাতায় অমিল। ভারতের অন্য কোনও বড় শহরে পাওয়া গেলেও যেতে পারে।’ এখানে যে-সব মেটাল পাওয়া যায়, তা দিয়ে চাবিটা বানাতে গেলে একমাত্র আফাংয়ের কাছে আসতে হবে। কারণ, চাবির কাটিং ভীষণ জটিল। খুব সূক্ষ্ম হাতের কারিগর এবং বিশেষ কিছু যন্ত্র ছাড়া এই চাবি তৈরি করা যাবে না। আফাংয়ের কাছে এই চাবি কেউ করাতে যায়নি। গেলে, আফাং তৈরি করত না। এখানকার অ্যাভেলেবল মেটাল দিয়ে চাবিটা তৈরি করলে, হয়তো প্রথম ব্যবহারেই চাবিটা ভেঙে গর্তে পড়ে থাকত। …

“এসব শুনে আফাংয়ের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এই চাবি কোথায় নিখুঁত এবং নির্ভরযোগ্যভাবে তৈরি করা সম্ভব? উনি তখন সিঙ্গাপুরের কথা বলেন। ওখানে ওঁরই কিছু দেশোয়ালি পরিচিত মানুষ সিমলিম স্কোয়ার অঞ্চলে ফুটপাতে বসে এই ধরনের চাবি তৈরি করে। তারা চাবি তৈরি করতে কম্পিউটার, স্ক্যানার পর্যন্ত ব্যবহার করে!… এরপরই আমার মাথায় ঢুকে গেল, চাবি তৈরি হয়েছে সিঙ্গাপুরে। এক্ষেত্রে দেবাংশুবাবুর আসল চাবিটা হাতাতে হবে। সেটা কী করে সম্ভব? আপনার দ্বারস্থ হলাম, জিজ্ঞেস করলাম, বিদেশের হোটেলের সিকিউরিটির ফাঁকফোকর কোথায়? আপনি বললেন, ‘একমাত্র রুম ক্লিন করার সময় একটু ফাঁক পাওয়া যায়। এ ছাড়া জিমন্যাস্টিক দক্ষতায় যদি না সরিয়ে থাকে।’ হোটেলের দেওয়াল বেয়ে ওইসব কায়দার রাস্তা চোর নেবে না। তাতে বাইরের লোকের চোখে পড়ে যেতে পারে। অতএব পথ একটাই, ঘর ক্লিন করার সময় ঢুকতে হবে তাকে। ইতিমধ্যে দেবাংশুবাবুকে ফলো করে সে দেখে নিয়েছে, ব্যাগ কেনার পর চাবিটা রেখেছেন কাঁধে ঝোলানো ছোট চামড়ার ব্যাগে, যেটায় পাসপোর্ট, ভিসা আছে। এরপরই ব্যাপারটা আমার কাছে জটিল হয়ে গিয়েছিল। দেবাংশুবাবু বলছেন যে, স্পেয়ার পার্টস কেনার পর একবারই মাত্র ব্যাগটা রুমে রেখে ঘণ্টাচারেকের জন্য শপিং করতে বেরিয়েছিলেন। সেই সময় ‘রুম মেকআপ’ করতে দিয়ে যাননি। তা হলে চোর ঢুকল কী করে? এটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ আমার মাথায় ক্লিক করে, আচ্ছা, এরকম তো হতে পারে, চোর উঠেছিল দেবাংশুবাবুর আশপাশের কোনও রুমে, নিজের ঘরের ‘মেকআপ রুম’-এর বোর্ডটা ঝুলিয়ে দিয়েছিল দেবাংশুবাবুর দরজায়। সেটা দেখে ক্লিনিং স্টাফ দেবাংশুবাবুর রুম পরিষ্কার করতে ঢোকে, তখন‍ই ক্লিনিং স্টাফকে কোনওভাবে বিভ্রান্ত করে চোর আসল চাবির ছাপ সাবানে বা অন্য কোনও আধুনিক জিনিসে নিয়ে নেয়। তারপর সেই ছাপ দেখিয়ে চাবি তৈরি করে নেয় সিমলিম স্কোয়ার অঞ্চলে বসে থাকা চাবিওয়ালাদের কাছে।”

দীপকাকুর কথা শেষ হতেই বাবা বলে বললেন, “অসাধারণ দীপঙ্কর! ইউ আর এ জিনিয়াস! এই পোড়া দেশে তুমি কতটা কদর পাবে, সেটা নিয়েই চিন্তা হয়। এবার বলো, চোরটি কে?”

বাবার প্রশংসায় কাজ হল না। দীপকাকু সেই যে চুপ করলেন, আর কোনও কথা বললেন না।

অবশেষে ঝিনুকরা পৌঁছল হোটেলের সামনে। কনফারেন্স রুমে ঢুকে ঝিনুক অবাক, পারমিতা দেবী আর লক্ষ্মী বেরা ছাড়া কেসে জড়িত সকলেই আছেন। তথাগতবাবু আছেন, হাতে হাতকড়া নেই। দেবাংশুবাবু, নিতাই, সমীরণ দাস, সূর্য রায়, বসন্ত আগরওয়াল এবং তাঁর উকিল-বন্ধু।

বিরাট টেবিল ঘিরে বসে আছেন সকলে। দীপকাকু, ঝিনুক, বাবা গিয়ে বসলেন ফাঁকা তিনটে চেয়ারে। টেবিলে চায়ের কাপ দেখে বোঝা যাচ্ছে এক রাউন্ড হয়ে গিয়েছে। দীপকাকু শুরু করলেন তাঁর বক্তব্য, “প্রথমেই আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আবারও আমার পুলিশ-বন্ধুকে দিয়ে ফোন করিয়ে আপনাদের এখানে ডেকে আনানোর জন্য। দেবাংশুবাবুর কেসে এই মিটিংটার যে প্রয়োজন আছে, একটু পরেই সেটা আপনারা বুঝতে পারবেন। এবার আপনাদের আমি চোরের ছবি দেখাই।”

পারমিতা দেবীর কাছ থেকে শুনে আঁকা ছবিটা দু’হাতে উপর-নীচে ধরে সকলকে দেখালেন দীপকাকু। ঝিনুক ছবিটা আগে দেখেছে। মাথায় টুপি, চোখে চশমা, গোঁফওলা বছর তিরিশ-পঁয়ত্রিশের একজন মানুষ।

ছবিটা টেবিলে রেখে দীপকাকু বললেন, “এই লোকটা দেবাংশুবাবুর ওয়ার্কশপের এয়ার কন্ডিশন মেশিন সার্ভিস করতে ঢুকেছিল। কিন্তু ছদ্মবেশে।”

ঝিনুক হাঁ হয়ে গিয়েছে দীপকাকুর কথা শুনে। বাকি সকলেরও নিশ্চয়ই একই অবস্থা।

দীপকাকু ফাইল থেকে আরও একটা ছবি বের করতে করতে বললেন, “এবার আমি চোরের আসল চেহারাটা দেখাচ্ছি।”

পেনসিল স্কেচটা সকলের চোখের সামনে তুলে ধরতেই, সূর্য রায় ছিটকে উঠে পড়লেন চেয়ার থেকে। এই আচরণ অত্যন্ত স্বাভাবিক। কারণ, ছবিটা ওঁরই। সূর্য রায় বললেন, “আমাকে এভাবে ফাঁসানোর মানে? কাউকে দিয়ে আমার একটা ছবি আঁকিয়ে বলা হল, ইনিই চোর! বাঃ! এরকম আষাঢ়ে তদন্তের কথা কেউ কোনওদিন শুনেছে কিনা জানি না!”

“আমার বলা এখনও শেষ হয়নি সূর্যবাবু। আপনি যদি অপরাধী না হন, অযথা উত্তেজিত হচ্ছেন কেন? আপনাকেও বলার সুযোগ দেওয়া হবে।”

ভীষণ ঠান্ডা গলায় কেটে কেটে বলা দীপকাকুর কথাগুলোর সামনে সূর্যবাবু খানিকটা মিইয়ে গেলেন। এসে বসলেন চেয়ারে। চোখ-মুখ রাগে গনগন করছে। দীপকাকু আপাতত নীরব থেকে সূর্য রায়ের ছবিতে পেনসিল চালালেন কিছুক্ষণ। ফের তুলে ধরলেন ছবিটা। অবিকল আগের ছবির মতো হয়ে গেছে। দীপকাকু সূর্য রায়ের ছবিতে চশমা পরিয়েছেন, টুপি ও গোঁফ এঁকেছেন। বললেন, “এবার?”

একটুও না ঘাবড়িয়ে সূর্য রায় বললেন, “এটাও এক ধরনের ভাঁওতাবাজি। প্রথমেই আমার ছবিটা এঁকে চশমা, টুপি, গোঁফ অ্যাড করা হয়েছিল।”

দুটো ছবিই দীপকাকু ফাইলে রাখলেন। মৃদু হেসে বললেন, “ছবিটা আমি তদন্তের সুবিধের জন্য বানিয়েছি।

“আপনাকে দোষী সাব্যস্ত করার মতো প্রমাণ আমার হাতে আছে। মেনে নিচ্ছি, চুরিটাতে আপনার নৈপুণ্যের স্বাক্ষর লক্ষ করার মতো। কিন্তু সেই আপনিই প্রমাণ ছেড়ে গেছেন অজস্র। যেমন, অতি বুদ্ধিমান চোরও ফেলে যায়। প্ৰথম প্রমাণ, যে হাতের ছাপ পাওয়া গেছে দেবাংশুবাবুর বাড়ির ওয়ার্কশপের এসি মেশিনে তার সঙ্গে আপনার হাতের ছাপ মিলিয়ে দিতে পারি। দেবাংশুবাবুর ছেলের অন্নপ্রাশনে ট্রেডের অনেকের মতো আপনিও নিমন্ত্রিত ছিলেন। তখনই বাড়ির ভিতরটা আপনার জানা হয়ে যায়। দেবাংশুবাবু আপনাদের এসি লাগানো নতুন ওয়ার্কশপটা দেখাতে নিয়ে যান। আপনি আন্দাজ করে নেন, স্পেয়ার পার্টসের ব্যাগটা দেবাংশুবাবু কাজের জায়গাতেই রাখবেন। মিলে যায় আপনার অনুমান। আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্ট রয়ে গিয়েছে আরও একটা জায়গায়। দেবাংশুবাবুর ব্যাগের ভিতরে রাখা কাগজপত্রে। নেক্সট…” বলে, দীপকাকু ফাইল থেকে বের করলেন দুটো ফোটোগ্রাফ। দুটোর সাবজেক্ট এক। দীপকাকু বললেন, আপনার কাছে আমি এগজিবিশনের ফোটো নিতে যাইনি, এই ফোটোটা খুঁজতে গিয়েছিলাম (ডান হাতের ফোটোটা দেখালেন)। আর এই ফোটোটা (বাঁ হাতের ফোটো দেখিয়ে বললেন) দেবাংশুবাবুর তোলা। সিঙ্গাপুরের একটা হেরিটেজ বিল্ডিংয়ের পিছনে উঠেছে এই হাইরাইজ বিল্ডিং। সেই বহুতলের মাথায় সাদা মেঘের গোলাকার যে অংশটা দেখা যাচ্ছে, আপনাদের দু’জনের ফোটোতেই সেটা আছে। অর্থাৎ, ফোটোটা আপনারা ঘণ্টাখানেকের তফাতে হলেও তুলেছেন একই জায়গা থেকে। স্থানটি হচ্ছে হোটেল গ্র্যান্ড ম্যাক্স। ভিন্ন জানলা থেকে তুলেছেন বলে ফোটোর অ্যাঙ্গেল একটু আলাদা।”

একটু থেমে ফের শুরু করলেন দীপকাকু, “আপনার অফিসে টাঙানো সমুদ্র-দূষণের ফোটোটা দেখিয়ে আপনি যদি মিথ্যে কথা না বলতেন, আমি আপনার তোলা অন্য ফোটোগুলো দেখতে যেতাম না। ফোটোর বিষয়টা এতটাই মর্মস্পর্শী, আমি পরে খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারি, সমুদ্রের ওই দৃশ্যটা কলকাতা থেকে সিঙ্গাপুর যাওয়ার পথে পড়ে না, সিঙ্গাপুর থেকে কুয়ালালামপুর যাওয়ার সময় দেখা যায়। ওই সময় সকালের দুটো ফ্লাইট আছে। এর পরই আপনার প্রতি সন্দেহ গাঢ় হয় আমার। কেন বলছেন, বিদেশ যাত্রা বলতে গত পাঁচ বছরে একবারই শখ করে সিঙ্গাপুর গিয়েছিলেন। নিশ্চয়ই গোপন করতে চাইছেন কিছু। মডার্ন ইলেকট্রনিক্সের প্রতি আপনার এতটাই আগ্রহ, আপনি সিঙ্গাপুর তো বটেই, কুয়ালালামপুর পর্যন্ত নিয়মিত যাতায়াত করেন। অথচ আমাকে বলেছেন, আপনি শুধুমাত্র মেশিন সারাই করে থাকেন, দেবাংশুবাবুর মতো চ্যালেঞ্জিং কাজে হাত দেন না। আপনার মিথ্যে প্রকাশ্যে আনার রাস্তা আমি পেয়ে গেলাম দেবাংশুবাবুর তোলা ফোটো দেখার পর। আমার মনে হল, এগজিবিশনের টোপ দিলে আপনি আপনার সমস্ত ফোটোই আমাকে দেখিয়ে ফেলবেন। সিঙ্গাপুরের লেটেস্ট ফোটো দেখার জন্য আমি এগজ়িবিশনের থিমটা নিজেই বানালাম, ‘দ্য ওল্ড সিটি’। দেবাংশুবাবুর তোলা লিটল ইন্ডিয়ার ফোটোতে আমি পুরনো সিঙ্গাপুরকে পেয়েছি। আপনি আমার ফাঁদে পা দিলেন। দেখিয়ে ফেললেন সিঙ্গাপুরে আপনার তোলা রিসেন্ট ফোটোগুলো। এরপরও আমি দেবাংশুবাবু যে ট্র্যাভেল এজেন্সি থেকে টিকিট বুক করান, সেখানে খোঁজ নিই, দেবাংশুবাবুর ফ্লাইটে ওরা কলকাতার আর কারও টিকিট বুক করেছে কি না? ওরা বলল, ‘না।’ কিন্তু একজন দেবাংশু সেনগুপ্তর বন্ধু বলে পরিচয় দিয়ে ফ্লাইট নম্বর জেনেছিল ফোন মারফত। আপনিই সেই লোক, যিনি অন্য ট্র্যাভেল কোম্পানির মাধ্যমে দেবাংশুবাবুর ফ্লাইটের একটা টিকিট নিজের জন্য বুক করিয়েছিলেন। এবং গোটা পথটাই ছিলেন দেবাংশুবাবুর চোখের আড়ালে। আপনি যে সিঙ্গাপুরে সেই সময় গিয়েছিলেন, তার মস্ত প্রমাণ আমার পুলিশ-বন্ধু ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট থেকে জোগাড় করে দিয়েছে কালই। বিদেশ বলে আপনি ছদ্মনাম ব্যবহার করতে পারেননি। পাসপোর্ট দেখিয়ে ভিসা পেতে হয়েছে। আমি এরপর ফোনে যোগাযোগ করি গ্র্যান্ড ম্যাক্স হোটেলে। ওরা বলে যে, আপনি দুশো পাঁচ নম্বর রুমে ছিলেন। দেবাংশুবাবু ছিলেন একটা রুম বাদ দিয়ে।”

একটানা কথা বলে, দম নেওয়ার জন্য দীপকাকু থামলেন। সূর্য রায়ের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে। দরদর করে ঘামতে লাগলেন। ঝিনুকের মনে পড়ল, ইনি চেয়েছিলেন তাঁর পোর্ট্রেট তুলতে। এখন এঁরই একটা ফোটো তুলতে ইচ্ছে করছে ঝিনুকের।

ফের শুরু করলেন দীপকাকু, “সূর্যবাবু, আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে, আপনার বাড়িতে ফোটো দেখার সময় আমি একবার বাথরুমে গিয়েছিলাম। যাওয়াটা ছিল ছুতো। দেবাংশুবাবুর তোলা ফোটোর মতো একই ফোটো আপনার কাছে দেখতে পেয়ে বাথরুম যাওয়ার বাহানা করি। বাথরুম থেকে ফোন করি দেবাংশুবাবুকে। বলি, ‘একটু পরে আমায় ফোন করে বলুন, তথাগত পালিয়েছে।’ আপনার সামনে সেই ফোন এসেছিল। আপনি নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন, যাক, সন্দেহটা তা হলে অন্য লোকের উপর পড়েছে। সেই ভরসায় আপনি এখনও দেবাংশুবাবুর স্পেয়ার পার্টস, ডায়াগ্রাম বাড়ি অথবা অফিসে রেখে দিয়েছেন। আমি যদি এখনই থানায় একটা ফোন করি, পুলিশ গিয়ে আপনার বাড়ি, অফিস সার্চ করে জিনিসগুলো বের করে ফেলবে।”

টেবিলের উপর মাথাটা নামিয়ে দিলেন সূর্য রায়। নিস্তব্ধ হয়ে আছে গোটা ঘর। দীপকাকুর রহস্য উন্মোচনে সকলেই হতবাক। একটু পরে দীপকাকুই বলে উঠলেন, “আপনাদের সকলকে এক জায়গায় ডেকেছি একটা কারণে, আমি চাই না এই কেসটা পুলিশ হ্যান্ডেল করুক। আপনারা নিজেদের মধ্যে ব্যাপারটা মিটিয়ে নিন। ছোট্ট একটা সার্কেলের ভিতর হয়েছে চুরিটা, বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে এর তেমন যোগাযোগ নেই। আপনারা প্রত্যেকেই গুণী মানুষ, ভুল শুধরে নেওয়ার একটা সুযোগ দিন সূর্যবাবুকে। উনিও যথেষ্ট প্রতিভাধর ইঞ্জিনিয়ার। অবশ্য আমার অনুরোধ অনায়াসে অগ্রাহ্য করতে পারেন দেবাংশুবাবু। চোর ধরার জন্য অ্যাপয়েন্ট করেছিলেন আমাকে। সূর্যবাবুকে পুলিশে দেবেন কি না, সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একমাত্র ওঁরই আছে। আমি শুধু নিজের চার্জটা মকুব করে দিতে পারি।”

দেবাংশুবাবুর ডিসিশন শোনার জন্য মুখ তুললেন সূর্য রায়। চোখে করুণা ভিক্ষা। দেবাংশুবাবু ওঁর দিকে না তাকিয়ে বললেন, “আমিও পুলিশের ঝামেলায় যেতে চাই না। সূর্য যদি আমার টেকনোলজি অন্য কোম্পানিকে বিক্রি করতে যায়, বাধ্য হব পুলিশের কাছে যেতে।”

টানা চুপ করে বসে থাকার পর হঠাৎ কথা বলে উঠলেন সমীরণ দাস, “আচ্ছা, আবার আমাকে পুলিশ দিয়ে এখানে ডেকে পাঠানোর কারণটা জানতে পারি কি?”

দীপকাকুর মুখে হাসি খেলে গেল। বললেন, “দেবাংশুবাবুর প্রতি আপনার ভুলটা ভাঙিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। এবার নিশ্চয়ই মানবেন, দেবাংশুবাবু অনেক উঁচুদরের ইঞ্জিনিয়ার। অযথা অসূয়া পুষে রাখবেন না। মিথ্যে প্রচার করবেন না ওঁর নামে। বরং বন্ধুত্ব করে নিন।”

বরফ কতটা গলল, কে জানে! গুম হয়ে রইলেন সমীরণ দাস। এবার মিস্টার আগরওয়াল জানতে চাইলেন, “আমাকে ডাকলেন কেন?”

দীপকাকু বললেন, “আপনাকে ডেকেছি একটা রিকোয়েস্ট করতে, এই সব চুরিটুরির ব্যাপার দেখে আপনি যেন পিছিয়ে না যান টেকনোলজিটা কিনতে। দেবাংশুবাবু অনেক মেধা, পরিশ্রম দিয়ে জিনিসটা আবিষ্কার করেছেন।”

বসন্ত আগরওয়াল হাসলেন, বললেন, “টেকনোলজি আমি কালই কিনে নেব। পরশু বিক্রি করে দেব পাঁচটা কোম্পানিকে। রেট নেব দু’লাখ। মেশিন আপগ্রেডেশনে আমার কোনও খরচ হল না।”

দীপকাকু বললেন, “কিন্তু কম্পিটিশনে তো আপনি এগিয়ে থাকতে পারবেন না!”

“সে আশা আমি ছেড়ে দিয়েছি। একবার যখন ডায়াগ্রাম বাইরে গিয়েছে, অন্য কোম্পানি সেটা পাবেই। তার আগেই যা লাভ করার করে নিতে হবে আমাকে।”

তারিফ করার দৃষ্টিতে বসন্ত আগরওয়ালকে দেখলেন দীপকাকু। এমন সময় ওঁর ফোন বেজে উঠল। নম্বরটা চেনা নয়, স্ক্রিনে চোখ রেখেই কানে তুলে নিলেন সেটটা। ‘হ্যালো’ বলার একটু পরেই বলে উঠলেন, “খুন হয়েছেন! আমি এখনই যাচ্ছি।”

বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “কে খুন হল?”

“সেই ভদ্রমহিলা। আমার অফিসে আপনারা দেখেছিলেন। সবসময় ভয়ে থাকতেন, কেউ বুঝি তাঁকে ফলো করে যাচ্ছে”, বলে দীপকাকু বাকি সকলকে বললেন, “সরি, আমাকে চলে যেতে হচ্ছে। আপনারা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা সেরে নিন।”

ঝিনুক তাড়াতাড়ি দীপকাকুর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাবা বললেন, “খুনটুন আমার একটুও সহ্য হয় না। তোমরা গাড়িটা নিয়ে যাও। আমি ট্যাক্সি ধরে বাড়ি চলে যাব।”

দেবাংশুবাবুর কেসের সাফল্য উপভোগ করা হল না। কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে গম্ভীর মুখে সিঁড়ি ভাঙতে লাগলেন দীপকাকু। গাম্ভীৰ্য কিছুটা ধার করে ঝিনুকও নামতে লাগল পিছনে পিছনে। দীপকাকুর মতোই গত কেসের সাফল্য এখন তার কাছে অতীত!