৫
পরের দিন ঘুম ভাঙতে বেলা হল ঝিনুকের। ঠিক কতক্ষণ আগে কে জানে, একটা ফোন এসেছিল ড্রয়িংরুমে, তারপরই বাবা এসেছিলেন ঝিনুকের ঘরে। জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ঝিনুক, তোদের আজ কী প্রোগ্রাম রে? দীপঙ্কর সকালে আসবে?”
“জানি না।” বলে, পাশ ফিরেছিল ঝিনুক। ঘুম তখনও কমপ্লিট হয়নি। এখন পুরোপুরি জেগে ওঠার পর খটকা লাগছে, বাইরের ঘরে ফোন আসার পরই বাবা কেন দীপকাকুর খোঁজ করলেন? ব্যাপারটা জানতে হচ্ছে।
বিছানায় উঠে বসল ঝিনুক। বালিশের দিকে ঘাড় ফেরাল। ডায়েরি, নোটবুক, পেন, কোনওটাই নেই। মা নিশ্চয়ই গুছিয়ে তুলে রেখেছেন টেবিলে। কাল অনেক রাত অবধি জেগে ঝিনুক কেসের অনুপুঙ্খ লিখেছে ডায়েরিতে। এটা সে করে থাকে দীপকাকুর নির্দেশে। কাকু বলেন, ‘তদন্তের পর্যায়ক্রম এবং তার থেকে ওঠা প্রশ্নগুলোয় খোঁজ করলে সমাধানের একটা আবছা আভাস পাওয়া যায়।’ ঝিনুক কিছুই পায়নি। বরং গোটা ব্যাপারটা লেখার পর সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে! গুরুতর প্রশ্ন হয়ে দেখা দিচ্ছে একটা পয়েন্ট, অপরাধী কনসেপ্ট পাচার করল একজনের কাছে পয়সা নিয়ে, আর দু’জনের কাছে নিল না। রূপরেখার সঙ্গে কেমন ডিল হয়েছে জানা যায়নি। তিনি তো হাঁকিয়ে দিলেন ঝিনুকদের।
রেস্তরাঁয় হুমকির চিরকুট দেওয়া লোকটা আর হ্যান্ডবিলওলা একই ব্যক্তি কিনা, জানা যাবে দু’দিন পর। কাল গড়িয়ার ফোন বুথ থেকে ফেরার পথে দীপকাকু ফরেনসিক ল্যাবে দিয়ে এসেছেন লিফলেটটা। ধুলো লাগা হাতের ছাপ আছে ওতে।
ফোন বুথে তেমন কোনও কাজ হয়নি। বুথ অ্যাটেনডেন্টকে গুরুত্বপূর্ণ কোনও প্রশ্নও করেননি দীপকাকু। টুকটাক গল্পগাছা করে, লোকেশনটা ভাল করে বুঝে নিলেন। বুথে একটাই ফোনসেট। খুব একটা ভিড়টিড় হয় না। এলাকাটা একটু নিরালা টাইপের।
এই তদন্তের সূত্রে এখন পর্যন্ত যাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে ঝিনুকদের, সবাই কেমন যেন একটু ধোঁয়াটে টাইপের! তুলনামূলকভাবে ডাক্তারবাবু মানুষটি ভাল। তবে তাঁকেও পুরোপুরি নিরপরাধ বলা যায় না। অসৎপথে উনিও কনসেপ্ট সংগ্রহ করেছিলেন।
কাল ধর্মতলার রেস্তরাঁয় লাঞ্চ করতে বসে দীপকাকু একটা ইম্পর্ট্যান্ট কমেন্ট করেন, “প্রথমে আইডিয়া চুরি যাওয়া দেখে আমার মনে হয়েছিল, স্রেফ প্রফেশনাল জেলাসি থেকে কোনও এজেন্সি এটা করছে। কিন্তু পেমেন্ট সংক্রান্ত ফোনের যে ঘটনা ঘটল, বোঝাই যাচ্ছে, অ্যারো কোম্পানিকে তুলে দেওয়াই অপরাধীর লক্ষ্য। আমাকে এখন বের করতে হবে, অপরাধী কেন এ কাজ করছে? শত্রুতার মূল কারণটা কী?”
ঘুম থেকে ওঠার পর মাথা কোথায় ফ্রেশ থাকবে, ফের ভারী হয়ে যাচ্ছে। ঝিনুক নেমে আসে বিছানা থেকে।
ঘর থেকে বেরতেই মায়ের মুখোমুখি পড়ে যায়। মা বলেন, “মহারানির ঘুম ভাঙল তা হলে! আজও কলেজ কামাই নাকি?”
আড়মোড়া ভেঙে ঝিনুক বলে, “না। আজ যাব।”
“আমার সৌভাগ্য!” বলে, মা এগিয়ে যান নিজের কাজে। বহুক্ষণ আগেই দিন শুরু হয়ে গিয়েছে মায়ের। ঝিনুকের এখন ফার্স্ট ইয়ার। একটা-দুটো দিন কলেজ অফ করলে কিছু এসে-যায় না।
বাইরের ঘরে বাবা কাগজ পড়ছেন। সেন্টার টেবিলে ধূমায়িত চা-টা মা নিশ্চয়ই দিয়ে গেলেন এখন। বাবার উলটো দিকের সোফায় এসে বসে ঝিনুক। বাংলা পেপারটা দেখছেন বাবা, ইংরেজিটা টেবিলে, তুলে নিয়ে ঝিনুক জানতে চায়, “কার ফোন এসেছিল সকালে?”
কাগজের আড়াল থেকে বাবা বললেন, “তোমার নয়।”
‘তুমি’ করে কথা বলছেন বাবা। মানে, রেগে আছেন। খানিক চুপ করে থেকে ঝিনুক ফের বলল, “দীপকাকুর খোঁজ করছিলে কেন তখন?”
“দরকার আছে।”
আবার সংক্ষিপ্ত উত্তর। ঝিনুক বুঝে উঠতে পারছে না, কী নিয়ে বাবা এতটা সিরিয়াস হয়ে গিয়েছেন। চরিত্রে দিলখোলা মানুষ তিনি। কদাচিৎ রাগতে দেখা যায়। রাগটা তার উপর, নাকি দীপকাকুর উপর, বোঝা যাচ্ছে না।
গলা খাদে রেখে ঝিনুক বলল, “দীপকাকুকে ফোন করে দেখব একবার?”
“করেছিলাম বাড়িতে। মনে হয় বেরিয়ে গিয়েছে। মোবাইল অফ।”
এত সকালে কোথায় বেরলেন দীপকাকু? কাল তো বলেছিলেন, বাড়িতে বসে আজ শুধু ভাববেন। অফিসেও যাবেন না। দীপকাকুর ডিটেকটিভ এজেন্সির দরজা খোলা রাখবে ওঁর একমাত্র স্টাফ সুদর্শনকাকু। খুব দরকার ছাড়া ঝিনুককেও ফোন করতে বারণ করে দিয়েছেন। এমনও হতে পারে, আকস্মিকভাবে জোরালো কোনও ক্লু পেয়ে বেরিয়ে পড়েছেন তদন্তে। গোয়েন্দার তো রুটিন বলে কিছু হয় না!
নিউজ পেপারের উপর দিয়ে বাবাকে লক্ষ করে ঝিনুক। না, মেজাজ বদলের কোনও আভাস নেই। একই রকম থমথম করছে মুখ। এবার একটু দুশ্চিন্তা হচ্ছে ঝিনুকের। কী যে ঘটল! এখনই কোনও উত্তর আশা করা বৃথা, সময়মতো বাবা নিজেই বলবেন। পেপারটা ভাঁজ করে টেবিলে রাখে ঝিনুক, উঠে দাঁড়ায়।
মুখ থেকে কাগজ নামিয়ে বাবা বললেন, “কোথায় যাচ্ছিস?”
“কলেজে যাব। তৈরি হতে হবে।”
“আজ তোদের ইনভেস্টিগেশন নেই?”
“জানি না। দীপকাকু কিছু বলেননি।”
বাবার পরের কথাটা খুবই অপ্রত্যাশিত, “ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। আমার সঙ্গে প্রথমে দীপঙ্করের বাড়ি যাবি। তারপর কলেজ।”
“হঠাৎ দীপকাকুর বাড়ি কেন?” ভীষণ অবাক হয়ে জানতে চায় ঝিনুক।
সোফা ছেড়ে উঠতে উঠতে বাবা বললেন, “ওখানে গিয়ে জানতে পারবি।”
.
হেঁয়ালি বা সাসপেন্স বাবা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেন না। আজ কিন্তু পারছেন। বাঁশদ্রোণী ব্রিজ পার হয়ে গেল ঝিনুকদের গাড়ি, বাবা কিন্তু এখনও বলেননি, কেন যাচ্ছেন দীপকাকুর বাড়ি। ঝিনুকও আর জিজ্ঞেস করেনি কারণটা। বোঝাই যাচ্ছে, যা বলার দীপকাকুর সামনেই বলবেন।
গাড়ি ড্রাইভ করছে আশুদা। ক’দিন আগে মা-কে বলেছে, “বাড়িতে গাড়ি থাকতে খোলামেলা মোটরবাইক চেপে ঝিনুকদিদি চোর-গুন্ডা ধরতে যাচ্ছে, এটা কি ঠিক হচ্ছে?” অর্থাৎ আশুদাকে এবারের অভিযানে নেওয়া হয়নি, তাই আক্ষেপ। অথচ দীপকাকুকে তেমন পছন্দ করত না আশুদা, বড্ড ঘুরপাক খাওয়ান। আজ দীপকাকুর বাড়ি যাওয়া হচ্ছে শুনে বেশ চনমনে হয়ে উঠল। রহস্যের নেশা আশুদাকেও পেয়ে বসেছে।
পিরপুকুরে দীপকাকুর ভাড়াবাড়ির সামনে এসে পড়েছে ঝিনুকরা। দীপকাকু থাকেন দোতলায়। মূল বাড়ির গা বেয়ে মাটি থেকে সিঁড়ি উঠে গিয়েছে উপরে।
ঝিনুক এ-বাড়িতে বারতিনেক এসেছে। সবসময়ের কাজের মাসি আর দীপকাকুর সংসার। দীপকাকুর বাবা-মা, ভাই-বোন থাকেন মেদিনীপুরে ওঁদের আদি বাড়িতে।
ঝিনুক আর বাবা সিঁড়ি বেয়ে এখন বন্ধ দরজার সামনে। ডোরবেল টেপেন বাবা। একটু পরে দরজা খুলে যায়। কাজের মাসি সামনে। বাবা বললেন, “দীপঙ্কর আছে?”
“কখন উঠে পড়েছে! আসুন।”
কাজের মাসি কানে কম শোনে। বেশিরভাগ উত্তর আন্দাজে দেয়। এখন যেমন দিল।
ঘরে পা দিয়ে ঝিনুক দেখল, আগের মতোই ওলটপালট অবস্থা। কলকাতায় যদি এলোমেলো ঘরের জন্য কোনও কম্পিটিশন হয়, নিদেন পক্ষে এ-ঘরটা সেকেন্ড হবে। তবে দীপকাকুকে এই মুহূর্তে খুব পরিচ্ছন্ন লাগে, প্যান্ট-শার্ট পরে চুল আঁচড়াচ্ছিলেন আয়নায়। ঝিনুকদের দেখে অবাক হন, “আপনারা হঠাৎ?”
“তুমি কি কোথাও বেরচ্ছিলে?” জানতে চান বাবা
“হ্যাঁ, সে নয় একটু পরে বেরনো যাবে। আপনি বসুন।”
বসার জায়গা বলতে দুটো। দীপকাকুর স্টাডির চেয়ার আর কাত হওয়া বেতের সিঙ্গল সোফা। অতি সন্তর্পণে বাবা বসলেন সোফায়, ঝিনুক চেয়ারে। বাবা বললেন, “সকাল থেকে ফোনে পাচ্ছি না, তাই চলে এলাম।”
“আর বলবেন না! অ্যারোর কেসটা এত ভোগাচ্ছে, দুটো ফোনই অফ রেখে টানা ভেবেছি। একটু আগে সেট দুটো অন করতেই অফিস থেকে ফোন। সুদর্শন বলছে, কাল নাকি বেশ ক’টা পার্টি ফিরে গিয়েছে। ভাবলাম, যাই, ঘুরেই আসি অফিস থেকে।” একটু থেমে দীপকাকু বললেন, “বলুন রজতদা, আপনার হঠাৎ আগমনের কারণ?”
বাবা বললেন, “দাঁড়িয়ে সব কথা হয় নাকি! কোথাও একটা বসো তুমি।”
অপ্রতিভ হন দীপকাকু। বলেন, “হ্যাঁ, এই তো, আনছি।”
দূরে সিঙ্গল খাটের কাছে হেঁটে গেলেন দীপকাকু, নীচ থেকে বের করছেন আদ্যিকালের মোড়া। এরই মধ্যে ঝিনুক চোখ বুলিয়েছে দীপকাকুর হোমওয়ার্কে, বিশাল টেবিলের একপাশে কম্পিউটার। পিছনে ব্ল্যাকবোর্ড, চকে আঁকা পরপর তিনটে রাউন্ড, নীচে পর্যায়ক্রমে লেখা এস পি জি। একটু তফাতে আর-একটা রাউন্ড। তার তলায় লেখা এক্স। বাকি বোর্ড জুড়ে নানান সংখ্যা। মনে হচ্ছে কোনও জটিল অঙ্ক করা হয়েছে। টেবিলে খোলা আছে বিভিন্ন বিষয়ের বই, চার খণ্ড এনসাইক্লোপিডিয়া, মনোবিজ্ঞান, সাধারণ জ্ঞান, বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত বই… বোঝাই যাচ্ছে নাজেহাল অবস্থা।
বাবার সামনে মোড়া নিয়ে এসে বসলেন দীপকাকু, “এবার বলুন।”
শুরু করলেন বাবা, “আজ সকালে বাড়িতে একটা ফোন আসে। আমাকেই করা হয়েছিল ফোনটা। বলল, ‘আপনার স্নেহভাজনকে বলুন অ্যারোর কেস ছেড়ে দিতে। পঞ্চাশ হাজার দেব। যদি না ছাড়ে, ক্ষতি হয়ে যাবে আপনার মেয়ের। ওকে তো রাস্তাঘাটে একলা বেরতে হয়।’ আমি ‘কে বলছেন, কে বলছেন?’ বলতেই কেটে দিল ফোনটা।”
দীপকাকুর ভারী চশমা নেমে এসেছে নাকের ডগায়, চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড়। ঝিনুকেরও রাগে কান গরম হয়ে যাচ্ছে, এত বড় সাহস! এরকম হুমকি! এই জন্যেই বাবা সকাল থেকে মুড খারাপ করে বসেছিলেন।
নাক থেকে চশমা ঠেলে তুলে দীপকাকু বললেন, “ফোনে যে কণ্ঠস্বর আপনি শুনেছেন, নকল বলে মনে হল? গলা পালটানোর চেষ্টা একটু খেয়াল করলেই কিন্তু ধরা যায়!”
বাবা মাথা নাড়লেন। বললেন, “না, সেরকম কিছু তো মনে হয়নি। বেশ খোলা গলায় কথা বলছিল লোকটা। তবে উচ্চারণ অত্যন্ত মার্জিত, হুমকির সুর ভিলেনদের মতোই।”
‘ভিলেন’ কথাটায় ঝিনুকের মন হালকা হয়ে গেল। বাবা হিন্দি সিনেমার কোনও ভিলেনকে কল্পনা করছেন?
দীপকাকু একই রকম সিরিয়াস। খানিক ভেবে নিয়ে বললেন, “এখন পর্যন্ত যা সূত্র পাওয়া গিয়েছে, তিন পার্টনারের মধ্যেই লুকিয়ে আছে অপরাধী। কিন্তু তাদের কারও মুখেই এরকম হুমকির সুর মানায় না। এই কেসের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সম্ভাব্য অপরাধীর আচরণের সঙ্গে অপরাধের কোনও মিল নেই।”
কথা শেষ হতেই ঝিনুক আঙুল তোলে ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে। বলে, “সেই জন্যই আপনি এক্স ধরে আর-একজনের অস্তিত্ব অনুমান করছেন?”
ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসেন দীপকাকু। ওই হাসির মধ্যেও ‘বাহবাটুকু’ পড়া যায়। উৎসাহিত ঝিনুক আরও বলে, “এস পি জি তিনটে রাউন্ড হচ্ছে সুজয়, পার্থ, গৌতম। কি, ঠিক বলেছি কিনা?”
সপ্রশংস দৃষ্টিতে বাবা ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে আছেন, দীপকাকুর কোনও হেলদোল নেই। মিয়ানো গলায় বললেন, “ব্রেন যথেষ্ট ম্যাচিয়োর হয়েছে তোমার। কিন্তু এই কেসটায় আর তোমায় সঙ্গে নেওয়া যাবে না। রিস্ক হয়ে যাবে।”
“না, ঝিনুক থাকবে তোমার সঙ্গে। তবে এবার থেকে তোমরা আমার গাড়িটা ব্যবহার কোরো।”
মনে মনে বাবাকে স্যালুট দেয় ঝিনুক, এক্স-মিলিটারিম্যানের মিলিটারি সুর আজও অটুট।
চা-বিস্কুট নিয়ে এসেছে বৃদ্ধা মাসি। খেতে খেতে কথা চলতে থাকে। দীপকাকু বললেন, “আপনাদের ল্যান্ডফোনে সিএলআই লাগানো থাকলে কোথা থেকে ফোনটা করা হয়েছিল বোঝা যেত।”
বাবা উত্তর দিলেন, “তুমিই লাগিয়ে দিয়ো খরচ করে। তোমার কেসের জন্যই যখন ফোনগুলো আসছে।”
রসিকতাটা ছুঁল না দীপকাকুকে। চায়ের কাপ-ডিশ মেঝেয় নামিয়ে কপাল কুঁচকে বলতে শুরু করলেন, “আপনাকে ফোনে যে কথাগুলো বলা হয়েছে, তার মধ্যে বেশ কয়েকটা ব্লু লুকিয়ে আছে।”
“যেমন?” জানতে চাইলেন বাবা।
“নম্বর ওয়ান, আগে যে চিরকুট দুটো আমরা পেয়েছি, তাতে বহুবচনের ব্যবহার ছিল। কয়েকজন মিলে যেন চিঠিটা দিচ্ছে। ফোনের কথা শুনে মনে হচ্ছে, হুমকি দিচ্ছে একজন। নম্বর টু, ফোন এবং চিঠি এসেছে একই জায়গা থেকে, চিরকুটে লেখা ছিল, ওরা যা দিচ্ছে তার ডবল দেব আমরা। ফোনে অ্যামাউন্টটা বলেই দেওয়া হচ্ছে। এখানে আর-একবার প্রমাণিত হল, তিন পার্টনারের মধ্যেই আছে কালপ্রিট, কেননা টাকার অ্যামাউন্ট ওঁরা তিনজন শুধু জানতেন।” দম নিতে থামলেন দীপকাকু।
এই পাড়াটা বেশ নিঝুম। গাড়ি-ঘোড়ার আওয়াজ নেই। ঘরটা এমন পজিশনে, চড়া আলো ঢোকে না। এখানে বসে বেলা বোঝা দুষ্কর।
দীপকাকু ফের শুরু করলেন, “পয়েন্ট নম্বর থ্রি, লোকটি আপনার বাড়ির ফোন নম্বর পেল কী করে? আমাদের বাদ দিয়ে আপনাকেই-বা ফোন করল কেন?”
“কেন?” প্রশ্নটা ফিরিয়ে দেন বাবা।
“কারণ, লোকটিকে আমি বা ঝিনুক হয়তো মিট করেছি। গলা শুনলেই চিনতে পারব।”
“আর নম্বরটা পেল কী করে?” এবার জিজ্ঞেস করে ঝিনুক।
দীপকাকু একটু চিন্তা করে নিয়ে বললেন, “আমাদের যেভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে, নম্বর জানা কঠিন কাজ নয়। তবু এক্ষেত্রে আমরা সোর্স হিসেবে সুজয়বাবুকেই ধরে নেব। এই কেসে শুধু উনিই জানেন তোমাদের বাড়ির নম্বর।
চুপি চুপি ঢোক গেলে ঝিনুক, তদন্ত চলাকালীন নম্বরটা সে আর একজনকে দিয়েছে।
দীপকাকু বলে যাচ্ছেন, “পয়েন্ট নম্বর ফোর, সবচেয়ে বেশি ইম্পর্ট্যান্ট ‘স্নেহভাজন’ কথাটা ভীষণ শোনা শোনা লাগছে।”
কথা শেষ করে মিটিমিটি হাসছেন দীপকাকু। কিছুই বুঝতে না পেরে বাবা একবার ঝিনুকের, পরের বার দীপকাকুর দিকে তাকালেন। বিদ্যুৎচমকের মতো ঝিনুকের ততক্ষণে মনে পড়ে গিয়েছে সেই ডায়লগ, ‘আপনার স্নেহভাজনের সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হচ্ছে, উনিও আমাকে হেল্প করতে পারবেন।’ ঝিনুক বলে ওঠে, “সুজয় ঘোষ! আমাদের বাড়িতে যেদিন এসেছিলেন, দীপকাকুর প্রসঙ্গে বলেছিলেন কথাটা।”
“রাইট ইউ সে। কথাটা উনি ধার করেছিলেন তোমার বাবার থেকে। রজতদা ওই সম্বোধনে সুজয়বাবুর সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দেন।”
“তা হলে কি সুজয় ঘোষই কালপ্রিট?” বিস্ময়ের সঙ্গে জানতে চাইলেন বাবা।
দীপকাকু ঝিনুকের দিকে তাকালেন। বললেন, “তোমার কী মনে হয়?”
ভাবতে সময় নেয় ঝিনুক। একটু পরে বলে, “সুজয়বাবু অপরাধী হলেও হতে পারেন। ফোনটা কিন্তু উনি করেননি। ধরা পড়ে যেতেন বাবার কাছে। গলা নকল করার কোনও চেষ্টা যখন ছিল না…”
“দুর্দান্ত! ঝিনুক, তুমি তো দেখছি আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে ক্রমশ অপরিহার্য হয়ে উঠছ!”
দীপকাকুর উচ্ছ্বাসে তেমন উৎসাহিত হল না ঝিনুক। কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, “সুজয়বাবু ছাড়া এই কেসের আর-একজন আমাদের বাড়ির ফোন নম্বর জানেন। আমিই তাঁকে দিয়েছি।”
কপালে ভাঁজ পড়ে দীপকাকুর। জানতে চান, “কাকে দিয়েছ?”
“অ্যারোর রিসেপশনিস্টকে।”
“কেন দিলে?”
“উনি বলছিলেন, আমি নাকি মডেলিংয়ের পক্ষে খুব সুটেবল। যোগাযোগের জন্য নম্বরটা রাখলেন।”
দীপকাকুর চোখে-মুখে হতাশা ফুটে উঠল। বললেন, “বিরাট ভুল করেছ তুমি। আ গ্রেট মিসটেক। আমার কাজটা ফের ছড়িয়ে গেল। সুজয়বাবুকে কেন্দ্রে রেখে তদন্ত গুটিয়ে এনেছিলাম প্রায়। এখন তো মনে হচ্ছে, অফিসের কিছু স্টাফও ষড়যন্ত্রের অংশীদার।”
ঝিনুক মাথা নিচু করে আছে। তবে দোষ স্বীকার করে হালকাও লাগছে বেশ। দীপকাকুর কথা এখনও শেষ হয়নি। একটানা বলে যাচ্ছেন, “তোমার যে মডেলিংয়ে এত ঝোঁক, আগে বুঝিনি! আমার সঙ্গে ঘুরে খামোখা সময় নষ্ট করো কেন?”
ভুল ভাঙিয়ে দিতে মুখ তোলে ঝিনুক। তার আগে বাবা বলে ওঠেন, “কেন বেচারিকে বকাবকি শুরু করলে দীপঙ্কর? ইয়ং এজ, মডেলিংয়ের প্রতি আকর্ষণ থাকাই স্বাভাবিক!”
মহা ঝামেলায় পড়ল ঝিনুক। দুই অভিভাবকই তাকে ভুল বুঝতে শুরু করেছেন, একজন করছেন সমর্থন, অন্যজন ভর্ৎসনা।
ভাগ্যিস দীপকাকুর সেলফোন বেজে উঠল। এবার নিশ্চয়ই ঘুরে যাবে প্রসঙ্গ। ফোন কানে নিয়েছেন কাকু, কিন্তু এ কী, মুখটা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে কেন? কোনও গন্ডগোল নিশ্চয়ই। কে ফোন করল?
অনেকক্ষণ ওপ্রান্তের কথা শুনে দীপকাকু বললেন, “না, পুলিশ ডাকার দরকার নেই। আমি এক্ষুনি আসছি।”
ফোন অফ হয়ে গেল। সেট পকেটে রাখলেন দীপকাকু। থমথম করছে মুখ।
বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “কার ফোন?”
“অ্যারোর গৌতমবাবু। ডিরেক্টরস চেম্বারে একটা লকার আছে। তার যাবতীয় জিনিস উধাও।”
“সে কী! কী কী ছিল লকারে?” উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন বাবা
মোড়া ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন দীপকাকু। চিন্তিত মুখে বললেন, “কতটা কী চুরি গিয়েছে ওখানে গিয়ে ডিটেল জানতে পারব। ফোনের কথা শুনে মনে হল, মূল্যবান কিছু খোয়া যায়নি। লকারটা ভাঙা হয়নি। খোলা হয়েছে। চুরির ধরনটা সেই একই রকম।”
“মানে?” জানতে চায় ঝিনুক।
দীপকাকু বললেন, “লকারটা নম্বর দিয়ে লক করা হয়। আগের ঘটনার মতোই নম্বরটা জানতেন শুধু তিন পার্টনার।”
“এ তো আর সহ্য হয় না দীপঙ্কর!” তেড়েফুঁড়ে সোফা থেকে উঠলেন বাবা। ফের বললেন, “বারবার একই রকমভাবে বোকা বানাবে, আমরা কিছুই করতে পারব না! আজ আমি যাব তোমাদের সঙ্গে। লকারের কেস যখন, কিছুটা আমার কাজের এক্তিয়ারে পড়ে।”
বাবা সিকিউরিটি এজেন্সি চালান, বলতেই পারেন কথাটা। ঝিনুক ভীষণ এক্সাইটেড, এই প্রথম তাদের অভিযানে সঙ্গী হচ্ছেন বাবা।
গাড়ির পিছনের সিটে বাবা আর ঝিনুকের মাঝে গুম মেরে বসে আছেন দীপকাকু। বাবা বেশিক্ষণ সিরিয়াস থাকতে পারেন না। দীপকাকুর উদ্দেশে বললেন, “এত চিন্তা করার কী আছে! ঘটনাস্থলে যাই, দেখি সবকিছু। তারপর না হয় ভাবা যাবে। মনের উপর বেশি লোড নেওয়া ভাল নয়।”
দীপকাকুর দিক থেকে কোনও সাড়া নেই। হাজরা মোড় পেরোল ঝিনুকরা অফিস টাইম। ভিড়, ট্রাফিকে জমজমাট ফুটপাত, রাস্তা। এরপরই শুরু হবে স্কুল-কলেজের ভিড়। সবাই রোজকার কাজে ব্যস্ত।
ঝিনুক চলছে স্রোতের বিপরীতে। থ্রিলিং লাইফ! মা বলেন, “তোর পড়াশোনা লাটে উঠল বলে!” ঝিনুক মনে করে উলটোটা। একটা সফল অভিযানের পরেই পড়াশোনায় আরও মন বসাতে পারে সে।
“আমাকে বলো তো, কী ভাবছ এত? দেখি, কোনও হেল্প করতে পারি কি না!” বাবার গলায় ধৈর্যের ঘাটতি।
“অঙ্ক।” এইটুকু বলে থেমে যান দীপকাকু।
“অঙ্ক ভাবছ! সে তো কষার জিনিস!” বললেন বাবা।
অন্যমনস্ক গলায় দীপকাকু বলতে থাকেন, “এই কেসটার সবচেয়ে বড় মুশকিল হচ্ছে, সন্দেহভাজনরা প্রত্যেকেই বেশ বুদ্ধিমান এবং সৃজনশীল কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত। এই তালিকায় আমি যারা কনসেপ্ট হাতিয়েছে, তাদেরকেও রাখছি। এদের আচার-আচরণ এত অভিজাত, আড়ালে থাকা অপরাধীকে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। সবাই যেন একটা করে মুখোশ পরে আছে।”
“এই তালিকায় কি আপনি ডা. অজিত রায়কে রাখছেন? ওঁকে কিন্তু বেশ ক্লিন কাট মনে হল।” মন্তব্য করে ঝিনুক।
“হ্যাঁ, ওঁকেও রাখছি। কারণ উনিও অসৎ উপায়ে কনসেপ্ট হাতিয়েছেন। আর-একটা জায়গায় কনফিউশন আছে। উনি বলছেন টাকা দিয়ে অ্যাড কপি কিনেছেন, আর্টলাইনের মালিক বলছেন, টাকা দিতে হয়নি। সত্যিটা বোঝা মুশকিল। সন্দেহের তালিকায় থেকে যাচ্ছেন সবাই।”
“বুঝলাম। তারপর?” বললেন বাবা।
দীপকাকু বলতে থাকেন, “মূল অপরাধী অবশ্যই একজন উঁচুদরের ম্যাথমেটিশিয়ান। নির্ভুল ছক কষে ধাপ্পা দিচ্ছে সকলকে। আমাকেও তাই অঙ্কের ফাঁদ পাততে হবে।”
“ঠিক ক্লিয়ার হল না।” বলে, ঝিনুক।
“অঙ্কের জগতে ফ্যালাসি বলে একটা ব্যাপার আছে। ভুল যুক্তিতে অঙ্ক মেলানো হয়।”
“যেমন?” জানতে চান বাবা।
দীপকাকু বললেন, “ধরুন, এক অ্যারাবিয়ান উইল করে গিয়েছেন, আমি মারা গেলে আমার সম্পত্তির হাফ পাবে বড়ছেলে, মেজো পাবে ওয়ান-থার্ড, ছোট ওয়ান-নাইন্থ।”
“বেশ।” বললেন বাবা।
দীপকাকু ফের শুরু করলেন, “লোকটি মারা যেতে দেখা গেল, তাঁর সম্পত্তি বলতে সতেরোটা উট। এবং সেটা ভাগ করা যাচ্ছে না।”
ঝিনুক চট করে ভেবে নেয়, সত্যিই ভাগ অসম্ভব! সতেরোকে হাফ করতে গিয়ে থেমে যেতে হচ্ছে।
দীপকাকু বলে যাচ্ছেন, “তিন ছেলে সতেরোটা উট নিয়ে গেল কাজির কাছে। বলল, ‘আপনি এই সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান করে দিন।’ কাজি বললেন, ‘এ আর এমন কী কঠিন ব্যাপার? ওরে কে আছিস, আমার উটশালা থেকে একটা উট নিয়ে আয় তো!’
“তিন ছেলেই রাজি নয়, বলে, “না, না, এ হতে পারে না। বাবা আমাদের যা দিয়ে গিয়েছেন, তাই-ই ভাগ করে নেব। আপনার দাক্ষিণ্য নিতে পারব না।’ কাজি বললেন, ‘তাই হবে। একটু সবুর করো।’ কাজির উট নিয়ে আসা হল। মোট আঠারোটা। হাফ, অর্থাৎ ন’টা উট দিলেন বড়ছেলেকে। একের তিন, মানে ছ’টা দিলেন মেজোকে। ওয়ান-নাইন্থ পাবে ছোটছেলে, দুটো উট। যোগফল সতেরো। কাজির উট রয়ে গেল। কাজের লোককে ডেকে বললেন, ‘যা, এটাকে রেখে আয় উটশালায়।
বাবা বিস্মিত। চমকে বলে উঠলেন, “তাই তো, কী করে মিলল হিসেবটা?”
ঝিনুকের অবস্থা বাবার মতোই। মিটিমিটি হেসে দীপকাকু বললেন, “মিলে তো গিয়েছে। কোনও ভুল নেই।”
“তুমি কি এরকমই কোনও অঙ্কের ধাঁধায় ফেলতে চাইছ অপরাধীকে?” জানতে চান বাবা।
“ঠিক ধরেছেন।”
“সেই জন্যেই কি তোমার ব্ল্যাকবোর্ডে অত অঙ্ক কষা দেখলাম?”
“এটাও ঠিক।”
“আর-একটা প্রশ্ন করব?” বিনয়ের সঙ্গে অনুমতি চান বাবা।
দীপকাকু বললেন, “একটা কেন, দশটা করুন।”
“না, মানে, এই প্রশ্নটা একটু অপ্রাসঙ্গিক, তবু করেই ফেলি, খাতা-পেন, কম্পিউটার থাকতে তুমি কেন ব্ল্যাকবোর্ডে অঙ্ক করো?”
ছুটন্ত গাড়ির জানলার বাইরে তাকান দীপকাকু। উদাস দৃষ্টি নিয়ে বলতে থাকেন, “স্কুলে পড়ার সময় থেকে দেখে এসেছি, ব্ল্যাকবোর্ডে সবসময় সঠিক অঙ্ক করা হয়। অঙ্কের পবিত্র স্থান ওই বোর্ড। তাই ওটাই ব্যবহার করি।”
বাবা এমনভাবে দীপকাকুর দিকে তাকিয়ে আছেন, যেন কোনও মহান পির বা সাধুবাবাকে দেখছেন!
.
উটের অঙ্কটা পুরোপুরি মগজ দখল করে নিল ঝিনুকের। ভুল অঙ্ক অথচ কী অদ্ভুতভাবে মিলে গেল হিসেবটা! উলটেপালটে দেখেও যুক্তির কোনও ফাঁক দেখতে পাচ্ছে না ঝিনুক। ভাবতে ভাবতে আরবের মরুগ্রামে পৌঁছে গিয়েছে। অন্তরচোখে দেখতে পাচ্ছে, সতেরোটা উট নিয়ে তিন ছেলে কাজির কুটিরে এসে দাঁড়াল। দিগন্তবিস্তৃত বালিতে সোনা রং ছড়িয়ে অস্ত যাচ্ছে সূর্য। তিন ছেলের ডাকাডাকিতে কাজি এসে দাঁড়ালেন বারান্দায়। দাড়িটুকু বাদ দিলে কাজিসাহেবকে দেখতে অনেকটা দীপকাকুর মতো। ভারী চশমাটা অবশ্য নেই… ভাবনাটা হোঁচট খেল অ্যারোর রিসেপশনে এসে। এইটুকু সময় ঝিনুক ভুলেই গিয়েছিল তারা কোনও কাজে বেরিয়েছে। রিসেপশনিস্ট মহিলা আজও ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসছেন। এবার কিন্তু হাসি ফেরত দিতে পারে না ঝিনুক। মনে পড়ে দীপকাকুর কথা, ইনিও ষড়যন্ত্রকারিণী হতে পারেন। ঝিনুকদের বাড়ির ফোন নম্বরটা নিয়েছিলেন ট্যাক্টফুলি।
আজ আর ইন্টারকম তুলে মালিকের অনুমতি নিলেন না ভদ্রমহিলা। দীপকাকুকে বললেন, “আপনারা ভিতরে যান।”
মালিকপক্ষ সম্ভবত বলে রেখেছিল, দীপকাকু আসবেন। ডিরেক্টরদের চেম্বারের দিকে যেতে যেতে ঝিনুক লক্ষ করল, গতবারের মতোই স্টাফরা যে-যার নিজের কাজে মশগুল। চুরির ঘটনাটা এদের মনে হয় জানানো হয়নি।
ঘরে ঢুকে তিন পার্টনারকে একসঙ্গে পাওয়া গেল। বসে আছেন সেক্রেটারিয়ট টেবিলের ওপ্রান্তের চেয়ারে। মুখে নেমে এসেছে গাঢ় ছায়া। পিছনের দেওয়ালে ওয়ালফিট লকারটার পাল্লা খোলা। আগের দিন এই লকারটা বন্ধ অবস্থায় দেখেছিল ঝিনুক।। ভিতরটা আজ খাঁ খাঁ করছে।
ঝিনুকদের দেখে তিন পার্টনার উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিলেন। দীপকাকু হাতের ইশারায় বসতে বলে, নিজে বসলেন বিশাল টেবিলের এপ্রান্তে। দেখাদেখি ঝিনুক আর বাবা বসলেন ফাঁকা দুটো চেয়ারে। তিনজনের উদ্দেশে দীপকাকু বললেন, “আমাকে প্রথমে কয়েকটা কথা জানতে হবে।”
গৌতমবাবু বললেন, “বলুন।”
“লকারে কী কী ছিল?”
“বিশেষ কিছু না। কোম্পানির কিছু জরুরি কাগজপত্তর। আমাদের খানছয়েক পুরনো কাজের সিডি, যেগুলো বিশেষ কারণে গুরুত্বপূর্ণ আর হাজার তিরিশ ক্যাশ।” বললেন গৌতমবাবু।
“এই চুরির ঘটনায় কতটা ক্ষতি হল কোম্পানির?”
“সত্যি কথা বলতে কী, লস হয়েছে ওই টাকাটাই। বাকি যা চুরি হয়েছে, সব কিছুরই কপি আমাদের আছে।”
“চুরির উদ্দেশ্য কি তা হলে ওই টাকাটাই?”
“বলতে পারছি না। হয়তো তাই।”
এতক্ষণ উত্তর দিচ্ছিলেন গৌতমবাবু। এবার পার্থবাবু বলে উঠলেন, “এই চুরির ফলে সবচেয়ে বড় যেটা ক্ষতি হয়েছে, আমরা আর একে-অপরকে বিশ্বাস করতে পারছি না।”
বাবা হঠাৎ কথার মাঝখানে বলে ফেললেন, “বিশ্বাসটাই তার মানে চুরি গিয়েছে বলুন?”
“ঠিক তাই! এতদিন অন্য চুরিগুলোর মধ্যে বাইরের লোকের উপস্থিতির আশঙ্কা কিছুটা হলেও ছিল। এই চুরিতে একেবারেই নেই।” বললেন পার্থবাবু।
দীপকাকু বললেন, “আমি বুঝতে পারছি, কেন এতটা নিশ্চিত হয়ে কথাটা আপনি বলছেন। লকারের নম্বরটা জানতেন শুধু আপনারা তিনজন। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে, সংখ্যাটা যদি ভুলে যান, এই ভয়ে আপনারা কোথাও সেটা নোট করে রাখেননি তো?”
“না। রাখিনি। একসঙ্গে তিনজনের ভুলে যাওয়া তো সম্ভব নয়। এই তো ক’দিন আগে লকার খুলতে গিয়ে সুজয় নম্বরটা মনে করতে পারছিল না। আমি বলে দিলাম।”
পার্থবাবুর কথা শেষ হতেই দীপকাকু দৃষ্টি ঘুরিয়ে সুজয়বাবুকে প্রশ্ন করলেন, “আপনি নম্বরটা ভুলে গিয়েছিলেন কেন? কোনও ব্যাপারে মানসিক চাপে রয়েছেন কি আপনি?”
“সে তো রয়েইছি। যা চলছে কোম্পানির উপর দিয়ে। তবে লকারের নম্বর ভোলার আসল কারণ ওটা নয়। সাধারণত লকারটা আমি খুলিই না। অলিখিতভাবে ওটার দায়িত্ব পার্থর। তাই নম্বরটা ওর কাছে জেনে নিয়েছিলাম।”
“দায়িত্ব যখন পার্থবাবুর, আপনি খুলতে গিয়েছিলেন কেন?”
দীপকাকুর এই প্রশ্নটায় বেশ ভালই খোঁচা ছিল। পার্থবাবু, গৌতমবাবু দু’জনেই সন্দিগ্ধ চোখে তাকালেন বন্ধু সুজয়বাবুর দিকে। মাথা নিচু করে নিয়েছেন সুজয়বাবু। ধীরে ধীরে বললেন, “লকারে আমাদের পার্টনারশিপ ডিড ছিল। বিজনেসে যা সব ঘটছে, একবার দেখে নিতে চাইছিলাম উইল যথাস্থানে আছে কি না! বয়ানে কোনও কারিকুরি করা হয়নি তো?”
“তার মানে উইলটাও চুরি গিয়েছে?” আতঙ্কের স্বরে বললেন বাবা।
সুজয়বাবু জানালেন, “না, যায়নি। সেদিনই আমি উইলটা আলাদা সরিয়ে রেখেছিলাম।”
“সেটা আপনার দুই পার্টনার জানে?”
পার্থবাবু বললেন, “জানি। সুজয় বলেছিল, উইলটা বিশেষ দরকারে ক’দিনের জন্য ওর কাছে রাখবে। আমি না করিনি। আমাদের মধ্যে এই আন্ডারস্ট্যান্ডিংটুকু আছে।”
“এখনও আছে, নাকি ছিল?” কূট প্রশ্ন রাখেন দীপকাকু।
তিন বন্ধু মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। তিনজনের দৃষ্টিতে কুণ্ঠা, অভিমান একসঙ্গে। সামান্য বিরতিটুকু দিয়ে দীপকাকু বললেন, “ছিল, আজকের ঘটনার পর আপনাদের আর সেই বোঝাপড়া নেই।”
পার্টনারদের দিক থেকে কোনও উত্তর আসে না। দীপকাকুর চোখে চোখও রাখছেন না তিনজনে। নড়েচড়ে বসে দীপকাকু বলতে শুরু করলেন, “আপনারা একটা বিষয় খেয়াল রাখবেন, অপরাধীর মূল উদ্দেশ্য, পার্টনারশিপ ব্রেক করে কোম্পানিটা তুলে দেওয়া। আপনারা নিজেদের মধ্যে মনকষাকষি শুরু করলে অপরাধীর কাজ আরও সহজ হয়ে যাবে।”
পার্থবাবু বললেন, “কালপ্রিট তো আমাদের মধ্যেই একজন, কী করে মিলেমিশে থাকব?”
“অপরাধীকে এখনও যখন চিহ্নিত করা যায়নি, জোর দিয়ে বলা যায় না, সে আপনাদের মধ্যে আছে, নাকি বাইরের কেউ? এমনও হতে পারে, চতুর্থ কোনও ব্যক্তির সঙ্গে আপনাদের একজন হাত মিলিয়ে থাকতে পারেন।” বলতে বলতে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন দীপকাকু। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বললেন, “ওসব কথা এখন থাক। আমি আপাতত কিছু রুটিন ইনভেস্টিগেশন করব।”
টেবিল ঘুরে দীপকাকু পৌঁছলেন লকারের কাছে। বাকিরা একে-একে ঘিরে দাঁড়ালেন অকুস্থল। দেওয়াল ঘেঁষে লকারের নীচে হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছেন দীপকাকু। প্যান্টের পকেট থেকে বের করেছেন ম্যাগনিফায়িং গ্লাস। খুঁটিয়ে দেখছেন কার্পেট। একটু পরে উঠে দাঁড়ালেন। পকেট থেকে এবার বেরল টর্চ। আলো ফেললেন লকারের ভিতরে। ম্যাগনিফায়িং সমেত মাথাটাই ঢুকিয়ে দিলেন সিন্দুকের গহ্বরে। মাথা বের করে পরীক্ষা শুরু করলেন লকারের পাল্লা। জাহাজের স্টিয়ারিংয়ের মতো হ্যান্ডেল লাগানো তাতে। ওটা ঘুরিয়েই লক করা হয় সিন্দুক।
সব কিছু দেখার পর দীপকাকু বললেন, “চুরি যাওয়ার পর আপনারা লকারের বডিতে, ভিতরে, হ্যান্ডেলে হাতটাত দিয়েছেন, তাই না?”
“হ্যাঁ, তা দিয়েছি। আসলে এতটাই হকচকিয়ে গিয়েছিলাম, চোরের হাতের ছাপ মুছে যাচ্ছে, খেয়াল হয়নি কারওই।”
“ঠিক ধরেছেন। আমি হ্যান্ডপ্রিন্টের কথাই বলছিলাম। যদি না চোর গ্লাস ব্যবহার করে থাকে।” লকারের পাল্লাটা বন্ধ করে দীপকাকু প্রশ্ন করলেন, “এবার আমাকে বলুন, কে প্রথমে লকারটা খোলা অবস্থায় দেখেন?”
সুজয়বাবু বললেন, “আমি। দশটা বাজতে পাঁচ-দশ নাগাদ রোজই অফিসে ঢুকি। পার্থ, গৌতম আসে একটু পরে। আজ চেম্বারে পা দিতেই চোখ পড়ে লকারে, একদম হাটখোলা।”
“তারপর কী করলেন?” জানতে চান দীপকাকু।
সুজয়বাবু বললেন, “তক্ষুনি ফোন করলাম পার্থ, গৌতমকে। মিনিট দশেকের মধ্যে ওরা পৌঁছে গেল। তারপরই আপনাকে জানানো হয়।”
“আপনাদের স্টাফদের মধ্যে কতজন প্রেজেন্ট ছিল তখন?”
“কেউ না। শুধু ওয়াচম্যান নরেন্দ্র থাপা ছিল। আমাদের চেম্বার, অফিস ফ্লোর, ও-ই ঝাড়পোঁছ করে।”
“চেম্বারটা লক করা থাকে না?”
“থাকে। একটা চাবি দেওয়া আছে থাপার কাছে। ঘর পরিষ্কারের পর সকালের দিকটা খোলাই রাখে থাপা। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়ি।”
“থাপা কি চুরির ঘটনাটা জানে?”
“না, আমরা কোনও স্টাফকেই কিছু বলিনি। আপনার সঙ্গে পরামর্শ করে যা বলার বলব।”
“থাপাকে একবার ডাকুন।” বলে, আপাতত থামলেন দীপকাকু। নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলেন। বাকিরাও যে-যার নিজের জায়গায় বসলেন।
পার্থবাবু ফোন তুলে কোনও স্টাফকে বললেন, “থাপাকে একবার ভিতরে পাঠাও তো!”
এই অবসরে ঝিনুক তিন পার্টনারের বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষ করে। এঁরা সমবয়স্ক হলেও পার্থবাবু বেশ চটপটে। এখনও অনেক ইয়ং। গৌতমবাবু ধীর-স্থির, স্টাইলিশ। চশমার ফ্রেম, শার্ট, টাইয়ের কালার কম্বিনেশন দেখলে সেটা মালুম হয়। সুজয়বাবু তুলনায় বয়স্ক দেখতে, একটু শ্লথ। হয়তো হার্টের অসুখের কারণেই এমনটা হয়েছে। পেসমেকার বসানো আছে বুকে। এঁদের মধ্যে কে হতে পারেন অপরাধী, মোটিভটাই-বা কী? ভাবনার মাঝে দরজা আধখোলা করে দাঁড়ায় থাপা, “আসব, স্যার?”
“এসো।” বলে, ডেকে নেন গৌতমবাবু।
নেপালিদের বয়স বোঝা মুশকিল, তিরিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে হবে থাপা। ঘরে ঢুকে একটু থতমত খেয়ে গিয়েছে, এতজন লোকের মাঝে কেন তাকে হঠাৎ ডাকা হল! পর্যায়ক্রমে সবার দিকে ভীরু চাউনিতে তাকাচ্ছে, দীপকাকুর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই, দীপকাকু লকারের দিকে আঙুল তুললেন। থাপা তাকাল সেই দিকে। নিমেষে তার মুখ কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল।
দীপকাকু সম্ভবত থাপার এক্সপ্রেশনটা দেখার জন্যই এই আচরণ করলেন। এবার প্রশ্নে গেলেন দীপকাকু, “আজ সকালে যখন ঝাড়পোঁছ করছিলে এই ঘর, লকারটা এরকম ছিল?”
“না, স্যার। বন্ধই ছিল। আমার সাফ-সাফ মনে আছে।”
“তা হলে চুরি গিয়েছে ঘর পরিষ্কার করার পর!” যেন নিজেকেই বললেন দীপকাকু। ফের জানতে চাইলেন, “ক’টায় চেম্বার ঝাড়পোঁছ করেছিলে?”
“ন’টা থেকে সাড়ে ন’টার ভিতর স্যার।”
“অফিসে তখন কোনও স্টাফ ছিল?”
“না, স্যার! সোনালি ম্যাডাম অন্যদিন দশটার আগে চলে আসেন। আজ এসেছেন সাড়ে দশটায়।”
থাপার কথা শুনে দীপকাকু তাকালেন সুজয়বাবুর দিকে। জিজ্ঞেস করলেন, “সোনালি ম্যাডামের কাজটা কী?”
“আমাদের রিসেপশনিস্ট!” বললেন সুজয়বাবু।
দীপকাকু থাপাকে বললেন, “স্টাফদের মধ্যে তুমিই জানলে চুরির ব্যাপারটা, এখন কাউকে কিছু বোলো না, যাও, সোনালি ম্যাডামকে ডেকে দাও।”
থাপা যাচ্ছে না। দাঁড়িয়ে আছে মাথা নিচু করে। ব্যাপারটা কী? ঝিনুক ভাল করে দ্যাখে থাপার মুখ। এ কী, থাপা তো কান্নার আগের মুহূর্তে চলে গিয়েছে! ধরা গলায় বলছে, “আমি স্যার কিছু…”
দীপকাকু বলে ওঠেন, “আরে, এত ঘাবড়াচ্ছ কেন? তুমি তো কোনও দোষ করোনি। যা বললাম করো।”
চোখ মুছে চেম্বার থেকে বেরিয়ে যায় থাপা। দেখেশুনে যা বোঝা যাচ্ছে, থাপা বেচারি চুরির মধ্যে নেই। তবে বলা যায় না, দীপকাকু বলেছেন, এই কেসের সবাই একটা করে মুখোশ পরে আছে। হয়তো থাপার মুখোশটাই কাঁদছিল। ঝিনুক এবার অপেক্ষা করে সেই ভদ্রমহিলার, যিনি ইতিমধ্যেই সন্দেহের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন।
পুশডোর সামান্য ফাঁক হল। রিসেপশনিস্ট অনুমতি চাইলেন, “মে আই কাম ইন?”
“ইয়েস, কাম।” বলে, ডেকে নিলেন পার্থবাবু।
ঘরে এসে দাঁড়ালেন মহিলা। এখন আর ঝিনুককে দেখে হাসার অবস্থা নেই, ঝিনুকই বরং আপাদমস্তক জরিপ করে ওঁকে।
দীপকাকুকে দেখিয়ে পার্থবাবু রিসেপশনিস্টকে বললেন, “ইনি আমাদের বন্ধু। বিশেষ দরকারে আমাদের কোম্পানি এঁর সাহায্য নিচ্ছে। উনি কয়েকটা প্রশ্ন করবেন তোমাকে।”
“নিশ্চয়ই বলুন।” সপ্রতিভভাবে বললেন মহিলা। ওঁর সামান্যতম ভ্রুকুটি নেই দেখে বেশ অবাক হয় ঝিনুক।
প্রায় বিনা ভূমিকায় দীপকাকু প্রশ্ন করলেন, “আপনার আজ লেট হল কেন অফিসে আসতে? অন্যদিন তো দশটার আগেই চলে আসেন?”
“আজ একটা অদ্ভুত ঘটনা হয়েছে, অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছি, হঠাৎ ফোন ছেলের স্কুল থেকে। ‘তাড়াতাড়ি আসুন। আপনার ছেলের শরীরটা একটু খারাপ হয়েছে।’ ছেলের মর্নিং সেকশন। দৌড়লাম স্কুলে। গিয়ে দেখি, কিচ্ছু হয়নি। টিচাররা বললেন, কোনও ফোন করেননি তাঁরা।”
ভদ্রমহিলা থামতে দীপকাকু বললেন, “ফোনটা কি ল্যান্ডসেটে এসেছিল?”
“হ্যাঁ। কলার আইডি লাগানো নেই, কোথা থেকে করা হয়েছে ধরতে পারলাম না।”
“কাউকে সন্দেহ হয়?”
ঠোঁট উলটে মাথা নাড়েন মহিলা। দীপকাকু বলেন, “ঠিক আছে, আপনি আসতে পারেন।”
ঝিনুক হতাশ হয়, তার যেন মনে হচ্ছিল প্রশ্নোত্তর পর্ব আরও কিছুক্ষণ চলবে। রিসেপশনিস্ট ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর দীপকাকু পার্টনারদের কাছে জানতে চান, “আপনাদের অফিসের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরাগুলোর কন্ট্রোল রুম কোথায়?”
“পাশের ঘরে।” বলে, গৌতমবাবু জানতে চান, “কেন বলুন তো?”
চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে দীপকাকু বলেন, “দেখব আপনাদের রিসেপশনিস্ট এ ঘর থেকে বেরনোর পর কোথায় যাচ্ছেন, কোনও ফোন করছেন কি না?”
“আসুন।” বলে, গৌতমবাবু দীপকাকুকে নিয়ে চললেন অ্যান্টিচেম্বারে। দু’জনকে অনুসরণ করে ঝিনুক।
একফালি ঘর, ছ’টা ক্যামেরার ছ’টা মনিটর শেলফে রাখা। সামনে চেয়ার। এখানে বসে কে ঢুকছে, বেরচ্ছে, স্টাফরা ফাঁকি দিচ্ছে কিনা, সমস্ত দেখা যায়। তবে এসবই বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো। কোম্পানির অতি গোপন খবরও বাইরে চলে যাচ্ছে। লকার ফাঁকা করে দিয়ে যাচ্ছে চোর।
ছ’টা মনিটরের পরদায় অফিসের সবক’টা জ়োন দেখা যাচ্ছে এখন। রিসেপশনিস্ট গেলেন কোথায়? একটু অপেক্ষার পর দেখা গেল, মহিলা রুমালে মুখ মুছতে মুছতে কাউন্টারে গিয়ে বসলেন। চোখে-মুখে জল দিতে গিয়েছিলেন মনে হয়। কিছুক্ষণ শূন্যদৃষ্টিতে বসে থাকার পর চুলে আঙুল ডুবিয়ে মাথা নিচু করে রইলেন।
পরদার দিকে তাকিয়ে থেকে দীপকাকু বললেন, “খুবই আপসেট হয়ে আছেন মহিলা। বুঝতে পারছেন না, সকাল থেকে যা-যা ঘটছে, কেন ঘটছে? এঁকে সন্দেহের তালিকার বাইরেই রাখতে পারি আমরা। অপরাধীর সঙ্গে এঁর কোনও যোগাযোগ নেই।”
পাশ থেকে গৌতমবাবু বললেন, “চুরির টাইমিং একদম নিখুঁত! সোনালিকে লেট করিয়ে, সুজয় ঢোকার দশ মিনিট আগে, যখন আমাদের ক্যামেরা অন থাকে না, ঠিক তখনই। ভিতরের লোক ছাড়া কেউ এই ফাঁকটা খুঁজে পাবে না।”
কোনও উত্তর দিলেন না দীপকাকু। কন্ট্রোল রুম থেকে বেরিয়ে মেন চেম্বারের নির্দিষ্ট চেয়ারে গিয়ে বসলেন। ঘরের সবাই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছেন দীপকাকুর দিকে। গভীর চিন্তামগ্ন দীপকাকু একটু পরে বললেন, “যে-সব জিনিস চুরি গিয়েছে, তার একটা লিস্ট আমাকে দিন।”
“লিস্ট আমার করাই আছে।” বলে, পার্থবাবু একটা কাগজ এগিয়ে দিলেন দীপকাকুর দিকে। লিস্টে চোখ বোলাতে বোলাতে দীপকাকু বললেন, “আপনারা যদি মনে করেন, চুরির ব্যাপারে পুলিশের সাহায্য নেবেন, নিতে পারেন।”
“আপনি যেমন বলবেন। পুলিশের কাছে যাওয়ার খুব একটা ইচ্ছে নেই আমাদের। লোক জানাজানি হবে। বদনাম হবে কোম্পানির।” বললেন গৌতমবাবু।
“তা হলে থাক।” বলে, লিস্ট পকেটে পুরলেন দীপকাকু। এবার সুজয়বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “পার্টনারশিপের উইলটা কি এখন সঙ্গে আছে আপনার?”
“হ্যাঁ, আমার ব্রিফকেসেই আছে।”
“একবার দেখতে পারি?”
“অবশ্যই।” বলে, সুজয়বাবু ব্রিফকেস থেকে উইলটা বের করে দীপকাকুর হাতে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দীপকাকু ডুবে গেলেন উইলের মধ্যে।
.
ভবানীপুরের একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ঝিনুকদের টিম শিঙাড়া খাচ্ছে। অ্যারোর অফিস থেকে বেরনোর পর বাবা বলেছিলেন, “দীপঙ্কর, তোমার কেসের ঝামেলায় আজ ব্রেকফাস্টটা স্কিপ হয়ে গিয়েছে। ভীষণ খিদে পাচ্ছে এখন।”
তখনই এই দোকানের হদিশ দেন দীপকাকু। বলেন, “চলুন, ভবানীপুরে একটা দোকানে দারুণ শিঙাড়া করে, আমি খাওয়াব।”
শিঙাড়ার টেস্ট সত্যিই খুব ভাল। সমস্যা একটাই, বসার জায়গা নেই দোকানে, ফুটপাতে দাঁড়িয়ে খেতে হয়।
গরম শিঙাড়া ঠিক ম্যানেজ করে উঠতে পারছে না ঝিনুক। আশুদা ইতিমধ্যে তিনটে সাবাড় করে দিয়েছে। ঝালে-গরমে বাবার অবস্থা বেশ কাহিল। জিভ শুলিয়ে দীপকাকুকে বললেন, “আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি না, তুমি কেন সুজয় ঘোষকে গার্ড করছ? উনিই কেসটা তোমাকে দিয়েছেন বলে!”
উত্তরে দীপকাকু হাসলেন। বাবা আবার বললেন, “আজকের ঘটনায় স্পষ্ট ওঁকে দায়ী করা যায়। উনি কাউকে দিয়ে ফোন করিয়ে সোনালিকে লেট করিয়েছেন। মিনিটদশেক আগে অফিসে ঢুকে সেরেছেন কাজটা।”
“বুঝলাম। কিন্তু ওঁর মোটিভটা কী?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।
বাবা বললেন, “ওই একই। নিজেদের মধ্যে গন্ডগোল পাকিয়ে কোম্পানিটা তুলে দেওয়া।”
“সেটাই-বা করতে চাইছেন কেন?”
বাবা নিরুত্তর। দীপকাকু বলতে থাকেন, “এইসব কাণ্ডের আসল উদ্দেশ্য যতক্ষণ না আমি জানতে পারছি, কাউকে দায়ী করা যাচ্ছে না। গভীর কোনও রহস্য লুকিয়ে আছে এই কেসের অন্তরালে। যার তল খুঁজে পাচ্ছি না আমরা।”
দীপকাকুর সেলফোনে রিং হচ্ছে। এত অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছেন, খেয়ালই করছেন না! ঝিনুক বলে দেয়, “ফোন ধরুন।”
অপ্রতিভ দীপকাকু পকেট থেকে ফোন বের করে কানে নেন। ওপ্রান্তের কথা খানিকটা শোনার পরই সেটটা বাবার কানে চেপে ধরেন। এই অদ্ভুত আচরণের মানে খুঁজে পায় না ঝিনুক। সেকেন্ডখানেক পরে বাবা মাথা নাড়েন। ওপ্রান্তের কথা শেষ হল মনে হয়। দীপকাকু ফোনটা ফেরত নিয়ে স্ক্রিনে চোখ রাখলেন। বাবাকে বললেন, “গলাটা কি চিনতে পারলেন? সকালের হুমকিটা কি ইনিই দিয়েছিলেন?”
“মনে হচ্ছে তো সেই লোকটাই। তবে গলাটা এখন বদলে ফেলার চেষ্টা করেছে।”
“কারণ, ফোনটা উনি আমাকে করেছিলেন। ওঁকে সম্ভবত আমি চিনি।” বিষম কৌতূহলে ঝিনুক জানতে চায়, “কী বললেন ফোনে?”
“গোয়েন্দাবাবু, কী বুঝছ, পারবে কেসটা সল্ভ করতে? বাকি কথা শুনেছেন রজতদা।” বললেন দীপকাকু।
বাবা বললেন পরবর্তী অংশ, “এককালীন হাজার পঞ্চাশ পাবে, বলো তো আরও পাঁচ বাড়িয়ে দিতে পারি। কেসটা ছেড়ে দাও। কখন কোথায় টাকা পাঠাতে হবে বলো?”
বাবার বলা শেষ হতে দীপকাকু ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে বললেন, “গড়িয়ার বুথ থেকেই করা হয়েছে ফোন।”
রিস্ট তুলে ঘড়ি দেখলেন বাবা। বললেন, “হ্যাঁ, পঞ্চাশ মিনিট মতো হল, আমরা অ্যারোর অফিস থেকে বেরিয়েছি। এর মধ্যে তিন পার্টনারের কোনও একজন ইজ়িলি গড়িয়ায় পৌঁছে তোমাকে ফোন করতেই পারে।”
বাবার কথা শুনতে শুনতে সেলফোনের বোতাম টিপছিলেন দীপকাকু, এবার কানে নিলেন। ওপ্রান্তের কাছে জানতে চাইলেন, সুজয় ঘোষ, পার্থ বর্মন, গৌতম মজুমদারের মধ্যে কেউ অফিসে আছেন কি না?
সম্ভবত অপারেটরকে ফোন করেছেন দীপকাকু। ওপ্রান্তের কথা শুনে ফোন পকেটে পুরলেন। ঝিনুক জিজ্ঞেস করল, “কী বলল?”
হতাশ ভঙ্গিতে দীপকাকু বললেন, “মিনিট পঁয়তাল্লিশ হতে চলল, তিনজনই বেরিয়ে গিয়েছেন অফিস থেকে। আমি চাইছিলাম, যেন একজন বের হয় অথবা কেউ না বের হয়।”
বাবা বললেন, “একজন বেরনোটা তো বুঝলাম, ফোনটা হয়তো সে-ই করেছে। কেউ না বেরয়, এটা চাইছ কেন?”
“চতুর্থ ব্যক্তির খোঁজে। যিনি ফোনটা করেছেন, মার্জিত উচ্চারণ, বয়সে আমার চেয়ে বড়, ‘তুমি’ করে কথা বললেন ফোনে। সম্ভবত ইনিই অপরাধী অথবা তিন পার্টনারের একজনের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন।”
দীপকাকুর অনুমান-ক্ষমতা দেখে প্রতিবারের মতোই বিস্মিত হয় ঝিনুক। মার্জিত উচ্চারণের ফোন সকালে বাবার কাছেও এসেছিল। যা দেখা যাচ্ছে, অপরাধী নাগালের মধ্যে এসে গিয়েছে। তিন পার্টনার অফিস থেকে বেরিয়ে গিয়ে ব্যাপারটা গুলিয়ে দিলেন।
চা নিয়ে এসেছে দোকানের কাজের ছেলে। ভাঁড় হাতে তুলে দীপকাকু বললেন, “চা খেয়ে চলুন যাওয়া যাক গড়িয়ার ফোন বুথে।”
“এখন গিয়ে কী হবে, পাখি তো হাওয়া!” বললেন বাবা।
দীপকাকুর মুখে চাপা হাসি। বললেন, “গিয়ে দেখি, যদি কোনও পালক পড়ে থাকে।”
হেঁয়ালিটা বাবা ধরতে পারলেন কিনা বোঝা গেল না। মন দিয়েছেন চা খাওয়ায়। ঝিনুক বুঝতে পারে, পালক অর্থাৎ কোনও প্রমাণ ফেলে যাওয়ার কথা বলছেন দীপকাকু।
.
দুপুর বলে গড়িয়ার এই রাস্তাটা আজ যেন আরও বেশি নির্জন। দীপকাকুর নির্দেশমতো বুথের একটু আগে গাড়ি দাঁড় করাল আশুদা। সামনে দিয়ে দাঁড়ালে বুথ অ্যাটেনডেন্ট ঘাবড়ে গিয়ে কথাই বলতে পারত না। একটু বোকাসোকা ধরনের ছেলেটা।
কাচঘেরা ফোনের ঘরটায় ঝিনুকের বয়সি একটা মেয়ে হেসে হেসে কথা বলে যাচ্ছে। আন্দাজ করা যায়, কথা চলছে অনেকক্ষণ ধরে। অ্যাটেনডেন্ট নিজের জায়গায় বসে ঝিমোচ্ছে।
ঝিনুকরা সামনে গিয়ে দাঁড়াতে নড়েচড়ে বসে ছেলেটা। আগের আলাপে ছেলেটাকে নিজের আসল পরিচয় দিয়ে রেখেছিলেন দীপকাকু। সেই কারণেই ছেলেটা আজ শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, “বসুন না স্যার!”
দীপকাকু চেয়ারটা বাবাকে ছেড়ে দিয়ে ছেলেটাকে প্রশ্ন করলেন, “সকাল থেকে ক’জন কলার এসেছে বুথে?”
“দশ-বারোটা হবে স্যার। মেশিন দেখে বলে দিতে পারি।”
“দরকার নেই। আমাকে বলো, ঘণ্টাদেড়েক আগে কোনও বয়স্ক লোক ফোন করতে এসেছিলেন?”
একটু ভেবে ছেলেটি বলে, “এসেছিলেন স্যার, গাড়ি করে।”
“কী গাড়ি?”
“অ্যাম্বাসাডর, সাদা। লোকটার মোবাইল বোধহয় কাজ করছিল না। ফোন টিপতে টিপতে বেরিয়ে এলেন গাড়ি থেকে। বুথে ঢুকে ফোন করলেন।”
“কল কতক্ষণের ছিল?”
“একটা পাল্স স্যার।”
“লোকটাকে দেখতে কেমন একটু বলো।”
ছেলেটি যা বলল, তিন পার্টনারের সঙ্গেই মিলে যায়। দীপকাকু সন্তুষ্ট হলেন না। বললেন, “গাড়িটার কোনও স্পেশ্যালিটি, আঁচড়ের দাগটাগ…”
কপাল কুঁচকে অনেক ভেবে ছেলেটা বলে, “গাড়ির নম্বর বাংলায় লেখা।”
“ড্রাইভার ছিল নাকি নিজেই ড্রাইভ করছিলেন?”
প্রশ্নবাণে ছেলেটা ক্লান্ত। বলে, “মনে করতে পারছি না স্যার!”
বাবা হঠাৎ ধমকে ওঠেন, “নম্বর দেখতে পেলে, ড্রাইভারকে দেখতে পেলে না?”
নার্ভাস হয়ে ছেলেটা আমতা-আমতা করছে, হাত দুটো জড়ো করে, অকারণেই নমস্কারের ভঙ্গি করে ফেলেছে। দীপকাকু সামাল দেন। ছেলেটার পিঠে হাতে দিয়ে বলেন, “একটু মনে করার চেষ্টা করো তো, ভদ্রলোক এর আগে একই রকমভাবে, ফোনে লাইন পাচ্ছেন না এই অজুহাতে তোমার বুথে এসেছিলেন কিনা?”
ছেলেটার মুখ মুহূর্তে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, “এসেছিলেন স্যার, তখন ড্রাইভার ছিল।”
“ড্রাইভারের চেহারাটা মনে করতে পারবে?” জানতে চান দীপকাকু
বিষণ্ণ মুখে মাথা নাড়ে ছেলেটি। বলে, “গাড়ির জানলা দিয়ে কতটুকু আর দেখা যায় বলুন!”
দীপকাকু কার্ড বের করে ছেলেটিকে দেন। বলেন, “ভদ্রলোককে কখনও যদি দেখতে পাও, সঙ্গে সঙ্গে একটা ফোন কোরো আমাকে।”
বুথের সামনে থেকে ফিরে যাওয়ার সময় ঝিনুক দ্যাখে, তার বয়সি মেয়েটা এখনও কথা বলে যাচ্ছে। এইসব অনর্গল-ভাষিণীর জন্যই নিরালা জায়গাতেও বুথটা টিকে আছে।
গাড়িতে বসে দীপকাকু বললেন, “সাদা অ্যাম্বাসাডর, মার্জিত উচ্চারণ, বাংলায় লেখা গাড়ির নম্বর। অপরাধীর রুচি আছে বলতে হবে!”
