হেঁয়ালির অন্ধকারে – ৫

পরপর কয়েকদিন ঝিনুক কলেজে আসছে না দেখে কাল রাতে ফোন করেছিল শ্রাবণী, “কী ব্যাপার রে, শরীর খারাপ নাকি?”

আর-একটু হলে সত্যি কথাটা বলে ফেলছিল ঝিনুক, ‘গাড়ি থেকে ব্যাগ চুরির ঘটনাটায় জড়িয়ে পড়েছি!’ বলেনি। কেসটা আগে সল্ভ হোক, তারপর বলা যাবে। অজুহাত হিসেবে ঝিনুক বলল, “বাড়ির একটা কাজে আটকে আছি, দু’-তিনদিনের মধ্যেই কলেজে যাব।”

শ্রাবণী বলল, “যত তাড়াতাড়ি পারিস কলেজে আয়। তুই না থাকলে ঠিক জমে না।”

বন্ধুরা ঝিনুককে মিস করলেও, তদন্তের কাজে লেগে থাকার সময় ঝিনুক বন্ধুদের অভাব বোধ করে না। ভীষণ একাগ্র থাকার চেষ্টা করে কেসের ব্যাপারে। যেমন, কাল অ্যান্টিকের দোকান ঘুরে আসার পর থেকে একটানা কেসটা নিয়ে ভেবে যাচ্ছে। কিছু পয়েন্টস লিখে নিচ্ছে নোটবুকে। ক্রমশ সে আবিষ্কার করছে, দীপকাকুর আপাত এলোপাথাড়ি ইনভেস্টিগেশনের মধ্যে একটা শৃঙ্খলা আছে। তদন্তের সমস্ত পর্যায় যে তার কাছে পরিষ্কার, তা নয়। এখনও বেশকিছু প্রশ্নের উত্তর জানা বাকি। ঝিনুকের অভিনিবেশ দেখে মা ইতিমধ্যে কটাক্ষ করেছেন, “এই মনোযোগটা যদি কলেজের পড়ায় দিতিস, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে হত না। এই সব করে তোর দীপকাকুর যেমন কিছু হয়নি, তোরও হবে না।”

দীপকাকুর কাজটাকে তেমন প্রশংসার চোখে না দেখলেও মানুষ হিসেবে দীপকাকুকে খুব পছন্দ করেন মা। বিকেলে কাকু আসবেন শুনে মাঝদুপুর থেকে লেগে পড়েছেন রান্নায়। আজ সন্ধের মেনু, ঝুরো চিংড়ির চপ আর আলাস্কা পুডিং। মায়ের রান্নার সবচেয়ে বড় ফ্যান দীপকাকু। কমপ্লিমেন্টসের সঙ্গে কিছু টিপ্‌সও দেন।

বিকেল কিন্তু হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। এখনও কেন আসছেন না? নোটবুক, খাতা গুছিয়ে স্টাডি টেবিল থেকে উঠে এল ঝিনুক। চেহারাটা একবার আয়নায় দেখতে গিয়ে হোঁচট খেল, অনেকটা দীপকাকুর মতোই লাগছে। এলোমেলো চুল, থমথমে মুখ, ভারী চশমাটাই নেই, এই যা! ঝিনুকের আপশোস হল। রহস্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে কি চেহারাটা এরকমই হয়ে যাবে? পরক্ষণেই ঝিনুকের মনে পড়ল, আজ স্নানের পর চুলে ব্রাশ করতে ভুলে গেছে সে।

.

আধঘণ্টা পরে ঝিনুকদের ড্রয়িংরুমের ছবিটা এই রকম, গভীর মনোযোগের সঙ্গে দীপকাকু চপ খাচ্ছেন। বাবা দাবা খেলছেন একা-একা। নোটবুক হাতে নিয়ে সিলিং-এর দিকে চেয়ে আছে ঝিনুক। দীপকাকু ফ্রি হলে কেস সংক্রান্ত তার পর্যবেক্ষণ জানাবে। সময়টুকু দীপকাকুই চেয়ে নিয়েছেন। তদন্তের আলোচনা করতে গিয়ে চিংড়ির চপের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হতে চান না তিনি।

বাবাকে ইতিমধ্যে কেসের অগ্রগতি সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত ধারণা দেওয়া হয়েছে। আদৌ সেটা নিয়ে বাবা এখন ভাবছেন কিনা বোঝা যাচ্ছে না। চোখ, হাত দুটোই ব্যস্ত দাবার বোর্ডের উপর।

“দুর্ধর্ষ হয়েছে বউদি!” বলে, হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন দীপকাকু। ঝিনুক চমকে উঠল। মা কিচেন থেকে বললেন, “আরও ক’টা দিচ্ছি, দাঁড়াও!”

“নিয়ে আসুন তাড়াতাড়ি। একেবারে আনপ্যারালাল টেস্ট!” এরপর দীপকাকু ঝিনুককে বললেন, “নাও, শুরু করো তোমার বক্তব্য।”

ঝিনুক ভাবল দেরি করা ঠিক হবে না। খাওয়া এখন চলতেই থাকবে। এই ফাঁকে তার সাজিয়ে রাখা ভাবনা গুলিয়ে যেতে পারে। বলতে শুরু করল ঝিনুক, “এখন পর্যন্ত অনুসন্ধান করে যা বোঝা যাচ্ছে, গয়না নয়, মূর্তিটা চুরি করাই চোরের লক্ষ্য ছিল। কারণ হিসেবে বলা যায়, মূর্তিটা ভল্টে রাখার পরই ম্যানেজারের কাছে ফল্স ইনফরমেশন দিয়ে ফোনটা করা হয়। যাতে মূর্তিটা ভল্ট থেকে বার করে নেন আবিরবাবু। আবার এমনও হতে পারে, উড়োফোনের খবরটা ম্যানেজারের বানানো। মূর্তিটা দেখে উনি বুঝেছিলেন, কতটা দুর্মূল্য। কালো বাইক আরোহীর সাহায্যে মূর্তিটা হাতিয়ে নেন। সন্দেহের যে তালিকা আমরা তৈরি করেছিলাম, তিনজন আপাতত তার বাইরে চলে গিয়েছে।”

“কে কে?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

মা আরও চারটে চপ নিয়ে এসে দীপকাকুর প্লেটে দিলেন। ফের একবার প্রশংসা করলেন কাকু, “ব্যাপক হয়েছে বউদি! তবে আর দেবেন না। একটু অতৃপ্তি থাকা ভাল!”

মা ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ঝিনুক বলল, “প্রথম হচ্ছে, সুরেশ থাপা। ও যদি চুরির চক্রান্তের সঙ্গে জড়িয়ে থাকত, চোরের সর্দারকে জানিয়ে দিত আমরা তদন্তে নেমেছি। এত দিনে হুমকি দেওয়া ফোন বা চিঠি পেয়ে যেতাম আমরা।”

“ভ্যালিড পয়েন্ট।” বললেন বাবা। দাবার বোর্ড থেকে এতক্ষণে মুখ ফিরিয়েছেন। দীপকাকুকে বললেন, “তোমার সঙ্গে থেকে ঝিনুকের তো অনেক উন্নতি হয়েছে! ওর কথা থেকে স্পষ্ট যেটা বেরিয়ে এল, তোমরা ইনভেস্টিগেশনে নেমেছ অপরাধী এখনও তা জানে না। জানলে চিঠি, ফোন পেতেই। এর থেকে একটা ব্যাপার পরিষ্কার হয়ে গেল যে, সব পাত্রপাত্রীরা জানে কেসটা হ্যান্ডেল করছ তুমি। তারা কেউ অপরাধী নয়। সবাই লিস্ট থেকে বাদ।”

দীপকাকু বললেন, “এত সরলীকরণে আমি বিশ্বাসী নই। রহস্য অনুসন্ধানের ইতিহাসে এরকম বহু উদাহরণ আছে, কালপ্রিট নিজেই তদন্তের ভার দিচ্ছে গোয়েন্দার উপর। রহস্যসন্ধানীকে মিসগাইড করাই তার মূল লক্ষ্য। যদি ডিটেকটিভ ক্লায়েন্টের প্রভাব এড়িয়ে সঠিক পথে চলতে থাকে, তখনই আসে থ্রেটনিং লেটার আর ফোন। এই কেসটার ক্ষেত্রে অপরাধী যদি সন্দেহের তালিকার কেউ হয়, আমাদের ছাড় দিয়ে রেখেছে একটাই কারণে, আমরা এখনও সঠিক পথের দিশা পাইনি।”

দীপকাকুর কথার পর চুপ করে গেলেন বাবা। ফাঁকা প্লেট টেবিলে নামিয়ে রুমালে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে দীপকাকু ঝিনুকের উদ্দেশে বললেন, “আর কাকে লিস্ট থেকে বাদ দিতে চাও তুমি?”

একটু দ্বিধা নিয়ে শুরু করল ঝিনুক। কে জানে, কী যুক্তিতে কাকু আবার এঁকে তালিকায় ঢুকিয়ে নেবেন! যুক্তিগুলো গুছিয়ে নিয়ে বলল, “আমরা অনায়াসে সুমনা বসুকে সন্দেহের বাইরে রাখতে পারি। আমার ধারণা, আপনিও ওঁকে কিছুটা হলেও বাইরে রেখেছেন। তা যদি না হত, আবিরবাবুর পাড়ায় গিয়ে আপনি হোটেলের খোঁজ করতেন না। আবিরবাবু কবে ব্যাঙ্কে যাচ্ছেন, এটা ওঁর স্ত্রী ছাড়া আর যদি কেউ জেনে থাকে, তাকে সারাক্ষণ নজর রাখতে হবে আবিরবাবুর বাড়ির উপর। যে কাজটা গোপাল রায় করত। নামটা অবশ্য মিথ্যে হতে পারে। এখানে সুমনা বসুর পক্ষে আমার একটাই যুক্তি, নাটকীয় ঘটনার মাধ্যমে জিনিসটা যদি হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্য থাকত ওঁর, যার সাহায্যে চুরিটা করবেন, বাড়ির সামনের লজে তাকে রাখতেন না। আবিরবাবু যেদিন গয়না, মূৰ্তি আনতে যাবেন ব্যাঙ্ক থেকে, লোকটাকে একটা ফোন করে দিলেই চলত। লোকটা কলকাতার যেখানে খুশি থাকতে পারে। এ ছাড়াও গোপাল রায় নামের লোকটা লজের জানলায় দাঁড়িয়ে সর্বক্ষণ নজর রাখত আবিরবাবুর ফ্ল্যাটে। আবিরবাবু কোথাও বেরলেই লোকটা পিছু নিত। দেখত, ব্যাঙ্কে যাচ্ছেন কি না। এই একই যুক্তিতে আমরা লিস্ট থেকে বাদ দিতে পারি আবিরবাবুকে। উনিও গোপাল রায়ের সাহায্য নিলে, তাকে বাড়ির উলটো দিকের লজে তুলতেন না। আমার মনে হয়, তৃতীয় কোনও ব্যক্তি গোপাল রায়কে এই কাজে নিয়োগ করেছে। সেই লোকটি ম্যানেজারবাবুও হতে পারেন অথবা অন্য কেউ। আর-একটা বিষয় এখানে খেয়াল করতে হবে, আবিরবাবু বলেছিলেন, আপনার ফিজ যদি ওঁর সাধ্যের বাইরে হয়, তদন্তটা করাবেন না। যার একটাই মানে হয়, মূৰ্তিটা কতটা দামি সে-বিষয়ে ওঁর কোনও ধারণা নেই। সেটা বোঝার জন্যই আপনি ফিজের প্রসঙ্গটা প্রথমেই উত্থাপন করেছিলেন। পরীক্ষা করে দেখছিলেন, নিয়োগকর্তাই কালপ্রিট কি না।” একটানা কথা বলে থামল ঝিনুক।

দীপকাকু বললেন, “হ্যাঁ, এবার তোমাকে চল্লিশ দেওয়া যায়!”

বাবা বললেন, “এত কিছুর পরেও মাত্র চল্লিশ! বাকি ষাটে আর কী কী আছে?”

মা ট্রে-তে দু’কাপ চা নিয়ে ঢুকলেন। টেবিলে ট্রে নামিয়ে দীপকাকুকে বললেন, “চা-টা এখন খেয়ে নাও। পুডিং করেছি, বাড়ি যাওয়ার আগে দেব।

“আবার পুডিং!” দীপকাকুর মুখে শিশুর মতো খুশি ছড়িয়ে পড়ল। দেখে কে বলবে, এই মানুষটিই কত সব জটিল, গম্ভীর ব্যাপারস্যাপারের সঙ্গে ওঠাবসা করেন।

ঝিনুক যোগ করল, “পুডিংটা আবার যেমন-তেমন নয়, স্পেশ্যাল আইটেম! আলাস্কা পুডিং!”

“তাই নাকি!” বললেন দীপকাকু। উৎসাহ দেখে ঝিনুকের আশঙ্কা হল, কেসটা না গুলিয়ে ফেলেন। মা চলে যেতেই সিরিয়াস হয়ে গেলেন কাকু। চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “আবিরবাবুকে না হয় তালিকার বাইরে রাখা গেল, সুমনা বসুর সংগ্রহে থাকা ইন্টিরিয়র ডেকরেশনের ম্যাগাজিন, অ্যানথ্রোপলজির বইগুলোই আমায় ধন্ধে ফেলেছে। ওই বইগুলোই বলে দিচ্ছে, মূর্তিটা কত প্রাচীন সুমনা বসুর পক্ষে আন্দাজ করা কঠিন নয়।”

দীপকাকুর যুক্তি খণ্ডন করতে ঝিনুক বলল, “আপনিই তো বলেছিলেন, ‘স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক খারাপ হলে, স্ত্রী ওই মূর্তিটা হাতানোর চেষ্টা করতে পারেন।’ আমরা তো দেখলাম, রিলেশন খুবই ভাল।”

“আধঘণ্টায় এত কিছু বোঝা সম্ভব নয়। ওইটুকু সময় অভিনয় দিয়ে ভরাট করা যায়। ওঁরা কেন চাইবেন ওঁদের ব্যক্তিগত ব্যাপার বাইরের লোক জানুক। তবে তোমার একটা পয়েন্ট মানতে হবে, গোপাল রায়কে সুমনা বসু নিয়োগ করেননি।”

যাক, অন্তত একটা পয়েন্ট গৃহীত হল! হাঁফ ছেড়ে বাঁচল ঝিনুক। পরবর্তী পয়েন্টে গেল, “আমি একজনকে সন্দেহের তালিকায় রাখতে চাই।”

“কে সে?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

ঝিনুক বলল, “অ্যান্টিক ওয়ার্ল্ডের মালিক মিস্টার সাংভি। আমরা যখন দোকান থেকে বেরিয়ে এলাম, সন্দেহজনক দৃষ্টিতে উনি আমাদের দেখছিলেন।”

ভর্ৎসনার হাসি নিয়ে দীপকাকু বললেন, “শুধুমাত্র ভঙ্গি দেখে সন্দেহ সিনেমা-টিনেমায় হয়। বাস্তবের অপরাধীরা অনেক চতুর। সাধারণ মানুষের সঙ্গে এমনভাবে মিশে থাকবে, ধরতেই পারা যাবে না।”

ঝিনুক এবার প্রসঙ্গ পালটাল। বলল, “আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না। বিষ্ণুমূর্তি খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ আপনি বুদ্ধমূর্তি নিয়ে পড়লেন কেন?”

দীপকাকু বললেন, “এটাই এই কেসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। দ্যাখো, যে চার হাতওলা বিষ্ণুমূর্তির বর্ণনা আমরা পেয়েছি, সাংভির কথা অনুযায়ী সেটা তেমন দুষ্প্রাপ্য কিছু নয়। এটা অবশ্য আমারও মনে হয়েছিল। সাংভি যেহেতু অ্যান্টিক জিনিসের ব্যাবসা করে, ওর কাছে কমফার্ম হয়ে নিলাম। তখনই আমার মাথায় এল বুদ্ধমূর্তির কথা। আমরা সাধারণত অমিতাভ বুদ্ধ অর্থাৎ ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তির সঙ্গে পরিচিত। এ ছাড়াও বুদ্ধদেবের অনেক ধরনের মূর্তি নানান জায়গায় পাওয়া যায়। যেমন তিব্বতে পাওয়া যায় রাজমুকুট পরা বুদ্ধমূর্তি। স্থানীয় নাম ‘সঙ-গে-ওপা-মে’। লাসায় পাওয়া যায় কাঠের মূর্তি, ওরা বলে, ‘জো-বো’। আমরা যে মূর্তির খোঁজ করছি সেটা মেটালের এবং মুকুট পরিহিত। হতে পারে তিব্বত থেকেই এসেছিল। কারণ, আবিরবাবুর বাবা অসমে থাকাকালীন মূর্তিটা সংগ্রহ করেন। তিব্বত, ভুটান হয়ে মূর্তিটা এসেছিল অসমে। অপরিচিত মূর্তি এবং চার হাত দেখে আবিরবাবুর পরিবার ওটাকে বিষ্ণুমূর্তি হিসেবে ধরে নেন। পূজিত হতে থাকেন সংসারে।” থামলেন দীপকাকু। দম ছাড়ল ঝিনুক। বাবাঃ, এর মধ্যে এত কিছু ব্যাপার আছে! কী বিশাল পরিধি জুড়ে ভাবনা-চিন্তা করছেন দীপকাকু! ঝিনুক এর নাগাল পাবে কী করে!

বাবাও খানিকটা স্তম্ভিত হয়ে বসে রয়েছেন। একটু পরে বললেন, “সব শুনে যা মনে হচ্ছে, মূর্তিটা যখন পুরুলিয়ায় ছিল, চোরেরা টের পায়নি তার অস্তিত্ব। কেননা, খোলা জায়গায় পুজো হত বিষ্ণুর। কলকাতায় আসার পরই মূর্তির মূল্য কেউ একজন টের পায়। কে সে?”

দীপকাকু বললেন, “এটা যেমন পয়েন্ট, এটার বিরুদ্ধে যাচ্ছে আর-একটা বিষয়। রামকৃষ্ণ লজে যে লোকটা উঠেছিল, বাংলা উচ্চারণে অন্য জেলার টান ছিল তার। কলকাতার অপরাধী বাইরে থেকে লোক এনে কেন কাজে লাগাবে? তা হলে কি লোকটা প্রবাসী বাঙালি? অসমে থাকে? মূল অপরাধী কি অসম থেকেই অপারেট করছে গোটা চক্রান্তটা? অসমের লোকের পক্ষে হয়তো জানা সম্ভব মূর্তিটার দাম। এমন হতেই পারে, আবিরবাবুর বাবা মূর্তিটা চুরি করে আনছিলেন। ডাকাতরা ওই মূর্তিটা পেতে চড়াও হয়েছিল আবিরবাবুর বাবার কম্পার্টমেন্টে। ততক্ষণে উনি মূর্তিটা চালান করে দিয়েছেন বিশ্বস্ত কাজের লোক জেঠুমণির হাতে। এত দিন মূর্তির অস্তিত্ব নিয়ে অন্ধকারে ছিল অপরাধীরা। মূর্তিটা কলকাতায় আসার পর কোনওভাবে ওরা জানতে পারে ওটা আছে। তারপর থেকে শুরু হয় ষড়যন্ত্র।”

“তা হলে ওই মিথটা, বিষ্ণুমূর্তি বহন করছে আবিরবাবুদের সৌভাগ্য, ওটা কি বানানো?” জানতে চাইল ঝিনুক।

দীপকাকু বললেন, “মিথ মানেই কল্পনার মিশেল থাকবে। প্রশ্নটা হচ্ছে মিথটা কে বানাল? আবিরবাবুর বাবা কি? মূর্তির সুরক্ষার জন্য গল্পটা বোধহয় বানিয়েছিলেন। আবার জেঠুমণিও বানাতে পারেন। পুরুলিয়ায় না গেলে সেটা বোঝা যাবে না। জেঠুমণি আমাদের বলতে পারবেন মূর্তিটার ইতিহাস। যার সূত্র ধরে আমরা পৌঁছতে পারব রহস্য সমাধানে।”

“পুরুলিয়া যাওয়াটা তা হলে কনফার্ম করে দিই আবিরবাবুকে? কবে যাচ্ছি, কী বলব?” বিষম উৎসাহে জানতে চাইল ঝিনুক।

দীপকাকু উত্তর দেওয়ার আগে বাবা বললেন, “আমিও যাব তোমাদের সঙ্গে। কেসটা খুবই ইন্টারেস্টিং লাগছে।”

দীপকাকু রাজি হলেন না। বললেন, “আপনার গিয়ে কাজ নেই রজতদা। আমরা তো আবিরবাবুর পারিবারিক ইতিহাস শুনতে যাচ্ছি। বসে বসে গল্প শুনে কী করবেন? বরং আমরা যদি সত্যিই অপরাধীর কাছে পৌঁছনোর সুযোগ পাই, আপনাকে সঙ্গে নেব।”

“সেই ভাল। তোমরা শুনে এসে গল্পটা আমাকে বোলো!” এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন বাবা। এক্স-মিলিটারিম্যান তো! গল্পগাছার চেয়ে অ্যাকশন বেশি পছন্দ করেন।

দীপকাকু নিজের সেলফোনটা এগিয়ে দিলেন ঝিনুকের দিকে। বললেন, “এখনই ফোন করে দাও আবিরবাবুকে। বলো, কাল সকাল ছ’টায় হাওড়া থেকে ‘রূপসী বাংলা’ ট্রেনটা ধরব। আর ওই কথাটা আর-একবার মনে করিয়ে দিয়ো, আমার আসল পরিচয়টা পুরুলিয়ার বাড়িতে যেন না জানান।”

ফোন সেটটা নিয়ে আবিরবাবুর নম্বর সার্চ করতে থাকল ঝিনুক।