ফন্দিবাজ বন্দি – ২

পরের দিন সকাল প্রায় ন’টা, ঝিনুক দীপকাকুর বাইকের পিছনে। চলেছে নারকেলডাঙায় সূর্যেন্দুবাবুর বাড়িতে। গতকাল থেকেই ঝিনুকের মন বলছিল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দীপকাকু এই কেসের তদন্তে নেমে পড়বেন। কেসটা নিজ মেরিটে দীপকাকুকে আকর্ষণ করেছে। সময় অপচয় একেবারেই চলবে না। বাবার মত ছিল ভিন্ন। বিজনেসের কাজে কাল রাতে আউট অফ স্টেশন ছিলেন। আজ সকালে ঝিনুকের থেকে কেসটা সম্বন্ধে ডিটেল শুনে বললেন, “দীপঙ্কর অ্যাসাইমেন্টটা নেবে না।”

ঝিনুক অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিল, “কেন?”

বাবা বললেন, “কেসটা শুনতেই জটিল, আসলে কিন্তু খুবই সাদামাটা। মাঝে একটা রাত গিয়েছে, দীপঙ্কর নিশ্চয়ই এতক্ষণে উদ্ধার করে ফেলেছে রহস্য। ওর ফোন এল বলে!”

ঝিনুক বলল, “যে প্রবলেমটা আমার থেকে শোনার সঙ্গে সঙ্গে তুমি সল্‌ভ করে ফেলছ, দীপকাকুর এত টাইম লাগবে কেন?”

বাবা বললেন, “এরকমই হয়! খুব সোজা কোনও প্রবলেম জিনিয়াসদের কাছে নিয়ে যেতে নেই। হামেশাই ভুল হয় তাঁদের। তুই ম্যাথের কোনও প্রোফেসরকে হঠাৎ করে ক্লাস ফাইভের অঙ্ক সল্ভ করতে দে, খেই ধরতে সময় লেগে যাবে তাঁর।”

পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে ঝিনুক কিন্তু বাবার কথায় এতটুকু হতোদ্যম হল না। আগেও বাবা দীপকাকুর অনেক কেস ঘরে বসে সমাধানের রাস্তা বের করেছেন। বাবার আবিষ্কৃত পথ অতি সরল এবং বেশ খানিকটা কল্পনানির্ভর। দীপকাকু সেই রাস্তায় হাঁটেন না। বাবার ভুলগুলো শুধরে দেন। তবে বাবার সঙ্গে আলোচনা করলে ঝিনুকের কিছু সুবিধে হয়, সমাধানের সহজ সম্ভাবনাগুলো জানা হয়ে যায়। নয়তো কেসের প্রাথমিক পর্বে ঝিনুক থাকে অগাধ জলে। দীপকাকুর দেওয়া সূত্র ছাড়া সে এক পা-ও এগোতে পারে না। সেটাও পাওয়া যায় ওঁর মর্জিমতো। বাবার সঙ্গে বসে হোমওয়ার্ক সেরে রাখা জরুরি হয়ে পড়ে ঝিনুকের কাছে। এবারও সেই আগ্রহে বাবার কাছে জানতে চাইল, “কেন কেসটা এত সাধারণ মনে হচ্ছে, শুনি?”

বাবা সকালের সেকেন্ড টাইম চায়ে চুমুক দিয়ে গুছিয়ে বলতে যাবেন, ঝিনুক থামিয়ে দিল। বলল, “একটু দাঁড়াও। দীপকাকু এসে পড়বেন এক্ষুনি।”

“কী করে বুঝলি?” জানতে চাইলেন বাবা।

উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। মুচকি হাসল ঝিনুক।

দীপকাকুর বাইক এসে থামল ঝিনুকদের বাড়ির গেটে। অনেক শব্দের আড়ালে থাকা দীপকাকুর বাইকের আওয়াজ আলাদা করে চিনতে পারে ঝিনুক। বাড়িতে ঢুকেই দীপকাকু মায়ের উদ্দেশে হাঁক পাড়লেন, “বউদি, জমিয়ে ব্রেকফাস্ট বানান তো! জম্পেশ একটা কেস এসেছে। পেটে টেস্টি দানাপানি না পড়লে মাথা খুলবে না।”

মা কিচেন থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, “একটু আগেই তোমার কথা ভাবছিলাম। অনেক দিন বাঁচবে। বোসো, একটা নতুন আইটেম খাওয়াব।”

ঝিনুকের কেমন জানি সন্দেহ হল! মা কি যে-কোনও রান্নার আগেই দীপকাকুর কথা ভাবেন! নয়তো প্রত্যেকটি পদ এত সুন্দর হয় কী করে? মায়ের রান্নার এক নম্বর অ্যাডমায়ারার হচ্ছেন দীপকাকু। মা রান্নাঘরে ফিরে যেতে ঝিনুক বাবার মন্তব্যটা দীপকাকুকে জানিয়ে দিল। বাবার উলটো দিকের সোফায় বসে দীপকাকু বললেন, “বলুন রজতদা, খাবার আসার আগে আপনার অ্যানালিসিস শুনে নেওয়া যাক!”

বাবা এখন যেন একটু নার্ভাস! বললেন, “না, আসলে আমি যেটা ভাবছি, খুবই সিম্পল সলিউশন। এটাই যদি কারণ হয়, তোমার মাথায় এসে যেত।”

দীপকাকু বললেন, “তবু বলুন না আপনি! আমাদের কাজে এটাই তো মজা, সমাধান হাতের কাছে পড়ে আছে অথচ দেখতে পাচ্ছি না।”

নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার ক্ষীণ সম্ভাবনা দেখতে পেলেন বাবা। উৎসাহভরে বলতে শুরু করলেন, “ঝিনুকের কাছে সব শুনে আমার মনে হচ্ছে, অনিমেষ সোম, মানে যিনি আত্মহত্যা করেছেন, তিনিই দোষী। সুইসাইড করা ছাড়া তাঁর আর কোনও গত্যন্তর ছিল না। এই কেসে অযথা নেপাল দাসের বয়ানকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।”

দীপকাকু কপালে ভাঁজ ফেলে জানতে চাইলেন, “কেন এরকম মনে হচ্ছে আপনার?”

উত্তরে বাবা বললেন, “বাসে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া নেপাল দাসের টাকা মেরে না দেওয়াটা ছিল অনিমেষ সোমের কৌশল। নেপাল দাসের ব্যাগের কাগজপত্তর দেখে অনিমেষবাবু বুঝে যান, লোকটা নিয়মিত বাজারে টাকা খাটান। এঁর বিশ্বাস অর্জন করতে গেলে ব্যাগে থাকা পঁচিশ হাজার টাকা সরালে চলবে না। অর্জিত বিশ্বাসই একদিন নেপাল দাসকে অনিমেষবাবুর কোম্পানিতে প্রচুর টাকা লগ্নি করতে উৎসাহিত করবে। অনিমেষবাবুর পরিকল্পনা কাজে লেগে গিয়েছিল। এখন তো এমন অবস্থা হয়েছে, নেপাল দাস টাকা খুইয়েও অনিমেষবাবুর হয়ে প্রশংসা করে বেড়াচ্ছেন।”

বাবার যুক্তি অকাট্য মনে হল ঝিনুকের। তাড়াতাড়ি দীপকাকুর দিকে মুখ ফেরাল। ঠোঁটে একচিলতে হাসিসহ উনি বললেন, “রজতদা, একটা ছোট্ট ব্যাপার আপনার চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। অনিমেষবাবু একপ্রকার লুকিয়ে হসপিটাল ছেড়েছিলেন। নেপাল দাস অথবা তাঁর ছেলের কাছে নিজের নাম-ঠিকানা রেখে যাননি। অর্থাৎ যোগাযোগের কোনও অভিপ্রায় তাঁর ছিল না।”

কথাটা শুনে বাবা একটু দমে গেলেন। পরক্ষণেই নতুন উৎসাহে বললেন, “তুমি একটা জিনিস বুঝছ না! নেপালবাবুর কাগজ-টাগজ দেখে অনিমেষ সোম একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছিলেন, লোকটা যেভাবে কুইক মানির পিছনে ছোটে, একদিন না-একদিন তাঁর অফিসে আসবেই! তখন এই ‘বিশ্বাস’ কাজে লাগবে।”

ঘাড় নাড়তে নাড়তে দীপকাকু বলেছিলেন, “না রজতদা, এটা আপনার একটু বেশি ভাবা হয়ে যাচ্ছে। কলকাতা এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে অনিমেষবাবুর কোম্পানির মতো অসংখ্য কোম্পানি আছে। কবে নেপালবাবু অনিমেষবাবুর অফিসে আসবেন, সেই ভেবে হাতেগরম পঁচিশ হাজার উনি ছেড়ে দিতেন না। যদি আপনার কথাই ধরে নিই, তা হলে তো ভাবতে অসুবিধে নেই, অনিমেষবাবু প্ল্যান করে নেপালবাবুর বাসে উঠেছিলেন। জানতেন, নেপালবাবুর ব্যাগে টাকা আছে এবং শরীর খারাপ তাঁর হবেই।”

এরপর বাবা একেবারেই গুম মেরে গেলেন। মা ঢুকলেন ধোঁওয়া-ওঠা খাবার নিয়ে। দীপকাকু ঝিনুককে বললেন, “কুইক, রেডি হয়ে নাও। সূর্যেন্দুকে বলা আছে, সাড়ে ন’টার মধ্যে ওদের বাড়ি পৌঁছব।”

সূর্যেন্দু সোমকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করতে দেখে ঝিনুক বুঝেছিল, দীপকাকু অনেক সময় ধরে ওঁর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। তখনই সম্পর্কটা নিবিড় হয়। বয়সের নিরিখে দীপকাকুর সম্বোধন মানানসই।

জলখাবার সেরে, মায়ের রান্নার ভূয়সী প্রশংসা করে ঝিনুককে নিয়ে দীপকাকু যখন বেরিয়ে আসছেন, বাবা বললেন, “আমার অ্যানালিসিসটা মাথা থেকে পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলো না দীপঙ্কর, কাজে লাগতেও পারে।”

দীপকাকু বললেন, “আপনার ভাবনাটা স্টেজ ‘এ’-তে আটকে আছে। আমি চলে গিয়েছি ‘ই, এফ’ ছাড়িয়ে। চারপাশে সবই আবছা। আমাদের জন্য উইশ করুন, যেন উতরোতে পারি কাজটা!”

.

‘আমাদের’ শব্দটা ঝিনুককে বাড়তি এনার্জি দিয়েছে। তাই হয়তো এই গরমে মাথায় হেলমেট পরা অবস্থায় এতক্ষণ ধরে দীপকাকুর বাইকে ঘুরে একটুও ক্লান্ত হল না! নারকেলডাঙা অঞ্চলে ঢুকে পড়ল ঝিনুকরা। দোকানের বোর্ডের নীচে লেখা ঠিকানা অন্তত তাই বলছে।

ঝিনুকদের টালিগঞ্জ এলাকার অন্য প্রান্তে এই কলকাতা। বাড়ি, দোকানপাট রাস্তার আলাদা বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ছে। এদিকটায় ঝিনুক কখনও আসেনি। দেখা যাচ্ছে, দীপকাকু অলিগলি চেনেন। ইতিমধ্যে ঝিনুকরা একটা ব্রিজ পার হল। এখন চলেছেন ক্যানেলের পাশের রাস্তা ধরে। একটা গলিতে ঢুকে বাইকের গতি কমালেন দীপকাকু। থামলেন পুরনো আমলের দোতলা বাড়ির সামনে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন সূর্যেন্দু। পাশের খোলা জানলা দিয়ে সম্ভবত দীপকাকুর পথ চেয়ে ছিলেন। সূর্যেন্দুর পরনে এখন পাজামা-পাঞ্জাবি এবং তা বেশ মলিন। রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকরির কেতা বজায় রাখতে কাজের সময় তাঁকে ক্ষমতার বাইরে গিয়ে সাজগোজ করতে হয়। বললেন, “আসুন, আসুন!”

ঘরে এসে দেখা গেল, সোফায় বসে আছেন পোড়-খাওয়া চেহারার বছর ষাটেকের এক ভদ্রলোক। উনি নিশ্চয়ই বহিরাগত। দরজার গোড়ায় সম্ভবত এঁরই ধূলিমলিন চটি দেখেছে ঝিনুক। সূর্যেন্দু আলাপ করিয়ে দিলেন, “ইনিই হচ্ছেন নেপালবাবু। আপনি দেখা করতে চান শুনে সাগ্রহে চলে এসেছেন।”

নেপাল দাস গদগদ হেসে হাতজোড় করে দীপকাকুকে নমস্কার করলেন। প্রতিনমস্কার জানিয়ে দীপকাকু বসলেন সোফায়। ঝিনুকও বসল। নেপালবাবু প্রশ্নের অপেক্ষায় তাকিয়ে রয়েছেন দীপকাকুর দিকে। গ্রাহ্য না করে দীপকাকু চোখ বোলাচ্ছেন সারা ঘরে। দেড়শো-দুশো বছরের এই বাড়ির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গৃহসজ্জা। কারুকার্যময় কালো পলিশের সোফা, সেন্টার টেবিল। কর্নার র‍্যাকে পিতলের টব, সত্যিকারের গাছ। কাঠের ফ্রেমের ওপর কাচ ঢাকা দেওয়া র‍্যাক, সেখানে বই, রেয়ার ডিজ়াইনের ফুলদানি। খড়খড়ি দেওয়া জানলার পাশে ফোনস্ট্যান্ড, ফোনসেটটাও পুরনো আমলের। দেওয়ালে ওয়েস্টার্ন ইউরোপের পেন্টিং। অবশ্যই কপি! এ ছাড়াও দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে একটা ফোটোফ্রেম। এটা তুলনায় অনেক নতুন। বুক পর্যন্ত ফোটোটা নিশ্চিতভাবে অনিমেষ সোমের। ঠোঁটে পাতলা হাসি, চশমার আড়ালে চোখ দুটো জ্বলজ্বলে। ভীষণ জীবন্ত ফোটোটা, যেন এক্ষুনি কথা বলে উঠবে!

ঘরে ঢুকলেন মাঝবয়সি একজন ভদ্রমহিলা। সাদাটে শাড়ি, হাতে ট্রে, তাতে তিন গ্লাস শরবত। চেহারায় প্রচ্ছন্ন বিষণ্ণতা।

আলাপ করালেন সূর্যেন্দুবাবু। না করালেও চলত। মায়ের মুখের সঙ্গে ছেলের মুখের খুব মিল।

দীপকাকু শরবতের গ্লাস তুলে নিয়ে সূর্যেন্দুবাবুর মা-কে বললেন, “আপনার সঙ্গে আমি একটু আলাদা কথা বলতে চাই।”

“নিশ্চয়ই বলবেন! এখানেই বলবেন, নাকি পাশের ঘরে যাবেন?” জানতে চাইলেন সূর্যেন্দু।

“অন্য ঘরেই যাই। নীচের তলায় শুধু আপনারাই থাকেন তো?”

“হ্যাঁ। উপরে থাকেন জ্যাঠামশাই। আমরা সেপারেট।”

এক চুমুকে গ্লাস শেষ করলেন দীপকাকু। ঝিনুককে ইশারা করলেন সঙ্গে থাকতে। চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে নেপালবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার সঙ্গে পরে কথা বলছি।”

নেপাল দাস বিগলিত হাসি হাসলেন। যার একটাই অর্থ হয়, কোনও অসুবিধে নেই।

পাশের ঘরটা এঁদের স্টাডি। দুটো দেওয়ালে খোপকাটা র‍্যাক, ঠাসা বই। এক সেট চেয়ার-টেবিল। দীপকাকু চেয়ার দেখিয়ে সূর্যেন্দুবাবুর মা-কে বসতে বললেন। উনি ইতস্তত করলেন। ঘরে আর কোনও বসার জায়গা নেই। দীপকাকু বললেন, “প্লিজ বসুন, আমি বইগুলো দেখতে দেখতে আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করে ছেড়ে দেব।’

আঁচল টেনে একটু গুটিয়ে-সুটিয়ে চেয়ারে বসলেন সূর্যেন্দুবাবুর মা। দীপকাকু র‍্যাক থেকে একটা বই টেনে ফুঁ দিয়ে ধুলো ঝাড়লেন। বইয়ে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলেন, “ইনভেস্টমেন্ট স্কিমের বিজনেসে নামবেন বলে যেদিন সিদ্ধান্ত নিলেন অনিমেষবাবু, সেদিন আপনাকে এসে ঠিক কী বলেছিলেন?”

অতীত উদ্ধার করতে একটু সময় নিলেন সূর্যেন্দুবাবুর মা। বললেন, “সেদিন রাতে বাড়ি ফিরেছিলেন বেশ ভাল মুডে। বাইরের পোশাক ছাড়তে ছাড়তে আমাকে বললেন, ‘বুঝলে মীরা, আজ এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। দারুণ একটা বিজনেসের আইডিয়া দিয়েছে। ওকে পার্টনার করে ব্যাবসায় নামব। এবার নিশ্চয়ই আমাদের দিন ফিরবে।’ আমি ওঁর কথায় খুব একটা আগ্রহ দেখাইনি। এর আগে যখন অফিসঘরটা নিয়েছিলেন, তখনও বলেছিলেন ‘দিন ফিরবে।” ফেরেনি। বন্ধুটি কতটা কাছের, বোঝার জন্য আমি শুধু জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কোথাকার বন্ধু?’ বলেছিলেন, ‘কলেজবেলার। বড় চাকরি করে। মাঝে অনেক দিন দেখা হয়নি।”

হাতের বইটা র‍্যাকে রেখে, একটু বেছে আর-একটা বই তুলে নিলেন দীপকাকু। ফের ধুলো ঝাড়লেন। গেলেন পরের প্রশ্নে, “আপনার মেয়ের বিয়েতে বন্ধুটি নিশ্চয়ই নিমন্ত্রিত ছিলেন। আসেননি?”

“না, আসেননি। ওঁর আরও অনেক বন্ধু কিন্তু এসেছিলেন। নিমন্ত্রিতের সংখ্যায় উনি কোনও কার্পণ্য করেননি।”

মীরাদেবীর কথা শুনে, “হুম!” শব্দ করে চুপ করে রইলেন দীপকাকু। ব‍ই থেকে মুখ তুলে জানতে চাইলেন, “আচ্ছা, সেই উপকারী বন্ধুটির অনুপস্থিতি দেখে আপনি কোনও প্রশ্ন করেননি অনিমেষবাবুকে?”

“করেছিলাম। উনি অদ্ভুতভাবে হেসেছিলেন। বলেছিলেন, ‘দ্যাখো, কোথায় কাজেকম্মে আটকে গিয়েছে!’ এই কথার মিনিট কুড়ি কি আধঘণ্টার ভিতরে কর্তা একটা বড় প্যাকেট নিয়ে এলেন। ব্রাউন পেপারে মোড়া ছিল প্যাকেটটা। বললেন, ‘এই দ্যাখো, পার্টনার আসতে না পারলে কী হবে, কুরিয়ার করে গিট ঠিক পাঠিয়ে দিয়েছে!”

“কী ছিল প্যাকেটে?” জানতে চাইল ঝিনুক।

মীরাদেবী বললেন, “বেশ ভারী সোনার হার। পরে ওজন করে দেখা হয়েছে, ছ’ভরির কাছাকাছি।”

“সেই হারটা মেয়ের কাছে আছে, নাকি ব্যাঙ্কের লকারে রেখেছেন?” জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু।

মীরাদেবী বললেন, “আমি খোঁজ নিইনি। ওটা ওর শ্বশুরবাড়ির ব্যাপার।”

“ওকে। আপনি এবার একটু নেপালবাবুকে পাঠিয়ে দিন।” বলে, দীপকাকু র‍্যাক থেকে আর-একটা বই নামালেন।

একটু পরেই দোরগোড়ায়, “আসব?” অনুমতি চাইলেন নেপাল দাস।

দীপকাকু বললেন, “আসুন। বসুন চেয়ারে।”

বসলেন নেপালবাবু। ভদ্রলোকের চেহারাটা ভোলেভালা গোছের, যা ওঁর কাজের সঙ্গে মোটেই মানানসই নয়।

দীপকাকু চলে গেলেন সরাসরি প্রশ্নে, “আচ্ছা নেপালবাবু, আপনি মোট কত টাকা ইনভেস্ট করেন অনিমেষবাবুর কোম্পানিতে?”

“এক লাখ করে দু’খেপে মোট দু’লাখ।”

“আপনার কাছে তার কোনও রসিদ আছে?”

“রসিদ মানে ওই সার্টিফিকেট আর কী!”

“সার্টিফিকেটে নিশ্চয়ই একজনের সই আছে?”

“হ্যাঁ। অনিমেষ সোমের।”

“তবু আপনার কেন মনে হচ্ছে, ওই ব্যাবসার পিছনে আরও কেউ ছিল? সেটা কি শুধুমাত্র অনিমেষবাবু আপনার উপর যে বদান্যতা দেখিয়েছিলেন, তার জন্য? নাকি অন্য কোনও সূত্র আছে, যা হয়তো খুবই ক্ষীণ, তেমন জোরালো নয়?”

দীপকাকুর প্রশ্নের তক্ষুনি কোনও উত্তর দিলেন না নেপালবাবু। একটু চিন্তা করে বললেন, “শুধুমাত্র আমার উপকারের জন্য নয়। ভদ্রলোকের সঙ্গে পরে আমি কথাবার্তা বলে দেখেছি, আদ্যন্ত ভালমানুষ। আমার এত বয়স হল, মানুষ তো কিছু কম দেখিনি! ভাল-খারাপ মোটামুটি আন্দাজ করতে পারি। অনিমেষবাবুর সঙ্গে কথা বলে আমার যেটা সবচেয়ে বেশি মনে হয়েছিল, মানুষটি কোনওভাবেই এই বিজনেসের উপযুক্ত নন। এসব কারবারের লোকেরা অত্যন্ত ঘোড়েল প্রকৃতির হয়। অথচ আমি যখন ওঁর অফিসে যাই, কোম্পানি হাজারের উপর ক্লায়েন্টের টাকা দু’বছরে ডবল করে দিয়েছে। আমার তখনই মনে হয়েছিল, এই মানুষটির পক্ষে এত বড় কাণ্ড ঘটানো সম্ভব নয়। অবশ্যই পিছনে পাকা মাথার কেউ আছে। কিন্তু কে জানত, ওই পাকা মাথার জালে একদিন ফেঁসে যাবেন ভদ্রলোক? এখন ভীষণ আক্ষেপ হয়, কেন যে অনিমেষবাবুকে সতর্ক করিনি! ওঁর চেয়ে অনেক বেশি বছর ধরে আমি এই ট্রেডে ঘোরাফেরা করছি।”

থামলেন নেপালবাবু। দীপকাকুও চুপ থেকে কী যেন ভাবছেন! একটু পরে নেপালবাবুর উদ্দেশে বললেন, “আপনি তো এই লাইনের পুরনো লোক, অনিমেষবাবুর কাছে জানতে চাননি, টাকাটা উনি কোথায়, কীভাবে খাটান?”

“জিজ্ঞেস করেছিলাম। উনি বলেছিলেন, “টাকা শেয়ারে খাটানো হয়।’ বিশ্বাস করিনি। বলেছিলাম, ‘শেয়ার আমি ভালই বুঝি, টাকা যেমন বাড়ে, কমেও। শেয়ারের ভরসায় আপনারা এত টাকা ক্লায়েন্টদের দিতে পারতেন না।’ তখন উনি বলেছিলেন, ‘কিছু টাকা অবশ্যই শেয়ার মার্কেটে খাটাই আমরা। তবে বেশিরভাগ টাকাটাই ধার দিই আমাদের কয়েকজন ব্যবসায়ী বন্ধুকে। যারা জাহাজে বিদেশ থেকে জিনিসপত্র আমদানি করে। অনেক সময় এমন হয়, জাহাজ এসে গিয়েছে, ওদের কাছে টাকা নেই। অথচ জিনিসগুলো একবার নামিয়ে নিতে পারলে, দু’-চারদিনের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে বেচে দিতে পারবে। এত শর্ট টার্মে ব্যাঙ্ক লোন দেবে না। ওরা আসে আমাদের কাছে। মোটা অঙ্কের ইন্টারেস্ট চার্জ করে টাকা ধার দিই ওদের। জাহাজ থেকে জিনিস খালাস হওয়ার পাঁচ-সাতদিনের ভিতরে উইদ ইন্টারেস্ট টাকা ফেরত পেয়ে যাই আমরা। এভাবে একই টাকা, মাসে বেশ কয়েকবার খাটিয়ে নিই।”

থামলেন নেপালবাবু। সঙ্গে সঙ্গে দীপকাকু বললেন, “তা হলে তো বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল। ওই ব্যাবসাদাররা অনিমেষবাবুর থেকে টাকা ধার নিয়ে শোধ দেয়নি?”

“ধরে নিলাম তাই ঘটেছে। লোকগুলোকে তো ধরতে হবে। টাকা আত্মসাৎ করবে তারা, অনিমেষবাবু গলায় দড়ি দেবেন, এটা তো মেনে নেওয়া যায় না। আপনি জানেন, দুঃসংবাদটা পেয়ে আমি যখন বার্নিংঘাটে গেলাম, দেখি, অনিমেষবাবুর মৃতদেহে একটা মালা পর্যন্ত নেই! মর্গ থেকে সূর্যেন্দু এবং তার গোটাচারেক বন্ধু মিলে বডিটা নিয়ে এসেছে সোজা শ্মশানে। পাড়ায় ঢুকে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেনি লজ্জায়। ওরা আজও অনিমেষবাবুর ফোটোয় মালা দিতে পারে না। বাইরের লোক, আত্মীয়স্বজন এসে যদি উপহাসের দৃষ্টিতে তাকায় ফোটোর দিকে।”

নেপালবাবুর কথার পর দীপকাকু আর কিছু বললেন না। মেঝের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। র‍্যাক থেকে শেষ যে বইটা নিয়েছিলেন, সেটা এখনও হাতে। প্রথমে বইটার কথাই বুঝি খেয়াল হল, নড়ে উঠল হাত। ঘুরে গিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে বইটা রাখতে রাখতে নেপালবাবুর উদ্দেশে বললেন, “ঠিক আছে। এখন আপনি আসতে পারেন। পরে হয়তো প্রয়োজন পড়বে আপনাকে।”

চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন নেপালবাবু। একই রকম বিনয়ে বললেন, “রাত অথবা দিন, যখনই দরকার পড়বে, ডেকে নেবেন। ফোন নম্বর দেওয়া আছে সূর্যেন্দুর কাছে।”

নেপালবাবু চলে গেলেন ঘর ছেড়ে। দীপকাকু আবার বইয়ের র‍্যাকের সামনে দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে কী যেন দেখছেন! কোনও বিশেষ বই খুঁজছেন কি? ঝিনুকের মাথায় এখন বিরাট চিন্তা। এই যে পরপর দুটো দীর্ঘ সাক্ষাৎকার হল, এক লাইনও নোট করা হয়নি। পরে সব মনে থাকলে হয়! দীপকাকু কখন কী জানতে চাইবেন, তখন পড়ে যাবে মুশকিলে।

“আপনারা চা এখানেই খাবেন, নাকি বাইরের ঘরে দেব?” দরজার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন সূর্যেন্দু।

ঘাড় ফিরিয়ে দীপকাকু বললেন, “চলো, বসার ঘরেই যাই।”

দু’কাপ চা, চানাচুর, বিস্কুট রাখা আছে সেন্টার টেবিলে। নেপালবাবুকে দেখা যাচ্ছে না।

নিজের কর্তব্যটুকু সেরে চলে গিয়েছেন। বাড়তি কৌতূহল দেখাননি।

ঝিনুক, দীপকাকু বেতের সোফায় গিয়ে বসলেন। জিন্‌স-এর পকেট থেকে নোটবুক বের করে ফেলেছে ঝিনুক, শর্টে হলেও সাক্ষাৎপর্ব দুটো লিখে নেবে।

সূর্যেন্দুবাবুর দিকে তাকিয়ে ঝিনুক বিনয়ের সঙ্গে বলল, “আমি চা খাই না।” বিব্রত হলেন সূর্যেন্দু। বললেন, “ওঃ, তাই! সরি, আমার জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল। তোমাকে আর-এক গ্লাস ঠান্ডা দিতে বলি?”

“না, না, ইটস অল রাইট! কিছু লাগবে না।”

ঝিনুকের কথা শেষ হতে না-হতেই দরজায় এসে দাঁড়ালেন সূর্যেন্দুবাবুর মা। দীপকাকু যেন ওঁর অপেক্ষাতেই ছিলেন। ঠোঁট থেকে কাপ নামিয়ে বললেন, “মাসিমা, আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করা হয়নি। অনিমেষবাবু মারা যাওয়ার আগের ক’দিন কেমন ছিলেন? কিছু বলতেন কি আপনাকে? আত্মহত্যার কথা বলতেন?”

নির্মম প্রশ্নগুলো দীপকাকু কী অনায়াসে করতে পারেন! বড় হয়ে ঝিনুক যদি ডিটেকটিভের প্রফেশনে যায়, এতটা আবেগহীন হতে অনেক সময় লেগে যাবে।

ভদ্রমহিলার অভিব্যক্তিতে ছিল আকুল প্রার্থনা, কেসটা যেন দীপকাকু নেন! প্রশ্ন শোনার পর ফের বিষণ্ণ হলেন। নিচু গলায় বললেন, “ঘটনাটা ঘটার চার-পাঁচদিন আগে ওঁকে খুব অস্থির লাগছিল। রাতে ঠিকমতো ঘুমোচ্ছিলেন না। বারেবারে উঠে যাচ্ছিলেন বারান্দায়। পায়চারি করছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কী হয়েছে, কোনও প্রবলেম? এত ছটফট করছ কেন?’ নিজেকে সামলে নিয়ে বলেছিলেন, “ও কিছু না! বিজনেসে একটু টেনশন যাচ্ছে।’ আমি বলেছিলাম, ‘কেন বেছে বেছে এই ব্যাবসায় ঢুকতে গেলে? রাতের পর রাত ঘুমোতে পারছ না!’ উনি একটাই কথা বলেছিলেন তখন, ‘এ বেগার ক্যান নট বি এ চুজার।”

দীপকাকু খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন মীরাদেবীর মুখের দিকে। ঝিনুকের নোট নেওয়া এখন মাথায় উঠেছে। লক্ষ করল, মীরাদেবীর চোখের কোণে চিকচিক করছে জল।

চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন দীপকাকু। চানাচুর, বিস্কুটের প্লেটে হাত দেননি। সূর্যেন্দুবাবুকে বললেন, “আপাতত আমার কাছ থেকে তোমার ছুটি। নিজের শেডিউলে ফিরে যেতে পারো। প্রয়োজনমতো ফোন করে নেব।”

বাধ্য ছাত্রের মতো ঘাড় কাত করলেন সূর্যেন্দু। মীরাদেবীর দিকে তাকিয়ে দীপকাকু বললেন, “চলি, মাসিমা!”

“এসো বাবা। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, কাজে সফল হও।”

মীরাদেবীর কথা শেষ হওয়ার আগেই দীপকাকু দরজার বাইরে। ঝিনুক পা চালাল।