চাবি রহস্য – ১

আজ ঝিনুকের প্রোফেসর বিডি-র বাড়িতে পড়তে যাওয়ার দিন। বাবা বলেছিলেন, “টিউশন শেষ হওয়ার পনেরো মিনিট আগে আমাকে একটা মিস্ড কল দিস। আমি বউবাজারের কাছাকাছি থাকব, তোকে তুলে নেব।” বাবার সঙ্গে গাড়িতে ফেরার একটা মজা আছে। রেস্তরাঁয় খাওয়ার বায়না করলে, সচরাচর ‘না’ করেন না। ঝিনুকদের গাড়ি এখন পার্ক স্ট্রিটের ফ্লাইওভারে।

আড়চোখে বাবার মুডটা বুঝে নিয়ে ঝিনুক বলল, “অনেকক্ষণ ধরে খিদে পেয়েছে। কোথাও একটু….”

“খাবি? আচ্ছা চ’, ক্যামাক স্ট্রিটে একটা চাইনিজ রেস্তরাঁ আছে, ভাল রান্না করে। তোকে কোনওদিন খাওয়ানো হয়নি।”

বাবার এই কথাতেই ড্রাইভার আশুদা যা নির্দেশ পাওয়ার পেয়ে গেল। ঝিনুক গা ঝাড়া দিয়ে বসে মনে মনে ঠিক করতে থাকল, কী কী আইটেম অর্ডার দেবে।

ফ্লাইওভার থেকে নেমে আশুদা রাস্তার বাঁ দিক ধরে গাড়ি চালাচ্ছে। একটু পরেই থিয়েটার রোডে ঢুকে ক্যামাক স্ট্রিট পৌঁছবে। বাবা বলে উঠলেন, “এখানেই যখন এলাম, দীপঙ্করের অফিসে একবার ঢুঁ মেরে যাই, কী বলিস? ওকেও বলব আমাদের সঙ্গে খেতে যেতে।”

দীপকাকুর সঙ্গে সময় কাটানোর ব্যাপারে ঝিনুক সবসময় উৎসাহী। বলল, “অফিসে কি পাওয়া যাবে? বেশিরভাগ সময় তো বাইরেই থাকেন!”

“দ্যাখ না একবার ফোন করে!” বললেন বাবা।

ঝিনুক নিজের মোবাইল সেটটা চোখের সামনে তুলেও ফোন করল না। লাভ নেই কোনও। দীপকাকু ফোন ধরেন মর্জিমতো। তার চেয়ে অফিসের এত কাছে যখন এসে পড়েছে, দেখে নেওয়াই ভাল।

.

একটা বিশাল বিল্ডিং-এর চারতলায় দীপকাকুর ডিটেকটিভ এজেন্সি। অফিসঘরের সামনে এসে বাবা আর ঝিনুক পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। ঘরটার ভোল সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছেন দীপকাকু। কাচের দেওয়াল, দরজা। ভিতরে ক্লায়েন্ট বসার সুদৃশ্য সোফা, সেন্টার টেবিল। তার উপর ফুলদানি। দীপকাকুর নিজস্ব কেবিন হয়েছে। সেটাও কাচ আর কাঠ দিয়ে পার্টিশন করা। এখানে দাঁড়িয়ে ঝিনুক দীপকাকুর মাথা থেকে বুক পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে। কথা বলছেন শাড়ি পরা, মোটাসোটা এক মহিলার সঙ্গে। সম্ভবত কোনও ক্লায়েন্ট। ভদ্রমহিলার পিঠের অংশটা দেখা যাচ্ছে।

বাবা বললেন, “বাঃ, ব্যাবসা তো বেশ ফুলেফেঁপে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে!”

ঝিনুক এই কথার কোনও উত্তর দিতে পারল না। দীপকাকুর অফিসের বদল দেখে সে একেবারে থ হয়ে গিয়েছে। ঝিনুক দীপকাকুর অফিসে খুব কমই এসেছে। শেষ কবে এসেছিল, মনে করতে পারছে না। অফিসের চেহারাটা মনে আছে, কালচে হয়ে যাওয়া কাঠের ফার্নিচার, বিবর্ণ দেওয়াল। দীপকাকুর অফিসের ফোনটাও ছিল লাগোয়া অফিসের সঙ্গে প্যারালাল লাইনে। এক চান্সে দীপকাকুকে পাওয়া যেত না। ফোন প্রথমে যেত ওই অফিসে। এখন নিশ্চয়ই সেপারেট লাইন নিয়েছেন দীপকাকু। অথচ ঝিনুকদের এত বদলের কথা জানাননি!

“এ কী, আপনারা বাইরে দাঁড়িয়ে কেন! ভিতরে চলুন।”

পিছন থেকে আসা কথায় ঘাড় ফেরাল ঝিনুক। সুদর্শনকাকা, দীপকাকুর অফিসের একমাত্র স্টাফ। হাতে ফ্লাস্ক। মনে হচ্ছে চা এনেছে ক্লায়েন্টের জন্য। ঝিনুক লক্ষ করল, সুদর্শনকাকার পোশাক-আশাকও বেশ ঝকঝকে হয়েছে। বাবা বললেন, “তোমার দাদা খুব ব্যস্ত দেখছি!”

“ওই আর কী! আসুন না!” বলে, সুদর্শনকাকা এগিয়ে গিয়ে কাচের দরজা ঠেলে ঢুকল। ঝিনুকরা অনুসরণ করল তাকে।

ভিতরে পৌঁছতে দীপকাকু নিজের চেম্বার থেকে একটা হাত একটু উপরে তুলে জানিয়ে দিলেন, ঝিনুকদের দেখেছেন। ওই ইশারার আরও একটা মানে হয়, হাতের কাজটা সেরে আপনাদের অ্যাটেন্ড করছি।

কিন্তু বাবা ওইসব সৌজন্যর ধার ধারবেন কেন? দীপকাকু তাঁর নিজের ভাইয়ের মতো। যখন খুশি তাঁর কাছে যাওয়া যেতে পারে। দু’পা এগিয়েছিলেন বাবা, সুদর্শনকাকা এসে বলল, “বাবু, আপনারা একটু ওয়েট করুন। দাদা পার্টিকে ছেড়ে দিয়ে আপনাদের সঙ্গে কথা বলবেন।”

হতাশা আর বিরক্তি নিয়ে বাবা ঝপ করে বসে পড়লেন সোফায়। দমে-যাওয়া মন নিয়ে ঝিনুকও বসল পাশে। ভাবল, দীপকাকু কি তা হলে পর হয়ে গেলেন? কিন্তু কাকুর এই উত্থানের পিছনে ঝিনুকের অবদানও কিছু কম নয়।

সুদর্শনকাকা চায়ের কাপ-ডিশ বাবার সামনে রাখল। দু’জনের জন্য এনেছিল নিশ্চয়ই। ভাগ করল তিনটে। ভাগ্যিস ঝিনুক চা খায় না! না হলে মুশকিলে পড়ে যেত সুদৰ্শনকাকা। দুটো চা নিয়ে কাকা ঢুকল চেম্বারে। সেপারেটরের উপর দিয়ে ভেসে আসছে ভদ্রমহিলার গলা, “না, না, এটা আপনাকে নিতেই হবে! আমার জন্য এতটা সময় আপনি ব্যয় করলেন।

ঝিনুক আন্দাজ করল, মহিলা দীপকাকুকে ফিজ দিতে চাইছেন। দীপকাকু নিতে আগ্রহী নন। আচরণটা দীপকাকুর সঙ্গে ঠিক যেন মিলছে না! নিজের চার্জ বুঝে নেওয়ার ব্যাপারে কখনওই এতটুকু দ্বিধা করেন না দীপকাকু। এক্ষেত্রে কেন এরকম করছেন, জানতে কৌতূহল হচ্ছে ঝিনুকের। কিন্তু উপায় নেই। ভদ্রমহিলা এখনও বলে যাচ্ছেন, “প্লিজ, আপনাকে এটা নিতেই হবে! নয়তো খুব খারাপ লাগবে আমার।”

বাবাও উৎকর্ণ হলেন। কপালে পড়েছে ভাঁজ। ঘাড় ঘোরালেন দীপকাকুর কেবিনের দিকে।

ফিজটা বোধহয় নিলেন দীপকাকু। ভদ্রমহিলা বেশ খুশি মুখে বেরিয়ে আসছেন। চেহারায় সম্ভ্রান্ত ঘরের ছাপ। বয়স চল্লিশের উপর। বিবাহিতা। প্রথম নজরেই মানুষকে এই ভাবে দেখতে ঝিনুক শিখেছে দীপকাকুর কাছে।

ভিতর থেকে দীপকাকুর গলা ভেসে এল, “রজতদা, চলে আসুন।”

বাবা অবশ্য ডাকার অপেক্ষায় না থেকেই সোফা ছাড়লেন। ঝিনুকরা কেবিনে ঢুকল। বাবা চেয়ারে বসতে বসতে জানতে চাইলেন, “কী ব্যাপার বলো তো? ক্লায়েন্ট তোমাকে টাকা দিতে চাইছে, তুমি নিচ্ছ না! টাকা কি বেশি হয়ে গেল তোমার?”

“না, রজতদা। সামান্য একটা অ্যাডভাইসের জন্য এত টাকা দিয়ে গেলেন…. অস্বস্তি লাগে নিতে।”

ঝিনুক দেখল, দীপকাকুর হাতে খুব সম্ভবত গোটা দশেক পাঁচশো টাকার নোট। চেয়ারে বসে ঝিনুক জানতে চাইল, “ওঁর প্রবলেম কী ছিল?”

“কিছুই না। ছ’মাস আগে বাড়ির কাজের মেয়েকে তাড়িয়ে ছিলেন। হাতটান ছিল মেয়েটার। যাওয়ার সময় সেই মেয়ে শাসিয়ে যায়, ভদ্রমহিলাকে দেখে নেবে। তারপর থেকেই আতঙ্কে আছেন এই মহিলা। বাড়ি থেকে বেরনো কমিয়ে দিয়েছেন। কিছুদিন ধরে তাঁর যেন মনে হচ্ছে, বাড়ির সামনে একটা অপরিচিত ছেলে ঘুরঘুর করছে। মেয়েটাই পাঠিয়েছে নির্ঘাত! ছেলেটা নাকি একদিন সিকিউরিটি গার্ডের চোখে ফাঁকি দিয়ে ভদ্রমহিলার দোতলার বেডরুমের সামনেও চলে এসেছিল। আবছা একটা পুরুষ-চেহারা সরে যেতে দেখেছিলেন তিনি সেদিন সন্ধেবেলায়।”

ঝিনুক বলল, “উনি পুলিশে জানাচ্ছেন না কেন?”

“ওই যে বললাম, ছেলেটাকে দেখেছেন আবছায়ায়। নিজের দেখার ব্যাপারে এখনও ততটা শিয়োর নন। পুলিশ কোনও ধরনের অস্পষ্ট সন্দেহকে আমল দিতে চায় না।”

দীপকাকুর বলা শেষ হতেই বাবা জানতে চাইলেন, “তুমি ওঁকে কী পরামর্শ দিলে?”

“বললাম, বাড়ির ভিতরে-বাইরে জায়গা বেছে কয়েকটা ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা লাগাতে। যার মনিটরগুলো থাকবে ওঁর লিভিংরুমে। ঘরে বসেই লক্ষ রাখতে পারবেন বাইরের কেউ যাচ্ছে-আসছে কি না।”

“ব্যস, এই সামান্য টিপ্‌সটুকুর জন্য উনি তোমাকে কড়কড়ে এত ক’টা নোট দিয়ে গেলেন! সাধে কি আর তোমার অফিসের চাকচিক্য এতটা বেড়েছে? এরকম কিছু ভিতু বড়লোক পার্টি পেলে তোমার তো একেবারে পোয়াবারো! এই মানুষগুলো আসলে ভেবে পায় না, টাকা খরচ করবে কীভাবে!”

কমেন্টটা বোধহয় পছন্দ হল না দীপকাকুর। অভিমানভারী গলায় বললেন, “রজতদা, এই ক্লায়েন্টগুলো কিন্তু এমনি-এমনিই আসছে না। আমার রেপুটেশন জেনে নিয়ে তবেই আসছে। ঝিনুক তো আমায় কয়েকটা কেসে অ্যাসিস্ট করেছে। জানে, কাজগুলো কতটা কঠিন ছিল। স্পটে না থাকলেও, সে-সব বৃত্তান্ত আপনিও শুনেছেন।”

দীপকাকু কিছুটা ক্রেডিট তাকে দিচ্ছেন দেখে ঝিনুক খুশি হল। একই সঙ্গে এটাও লক্ষ করল, অফিসটা যতই দেখনদারি হোক না কেন দীপকাকু নিজে কিন্তু পালটাননি। সেই ওল্ড ফ্যাশনের চশমার ফ্রেম, আধা কোঁচকানো ফুলহাতা শার্ট, একটা হাতায় আবার বোতাম নেই! চুল আঁচড়ানোটাও আগের মতোই, নাম কা ওয়াস্তে! ঝকঝকে টেবিল, নতুন কম্পিউটারের ওপ্রান্তে যে মানুষটা বসে আছেন, পুরো ঘরটার মধ্যে তিনি বেমানান। জিনিয়াসরা বুঝি এরকমই হন! আশপাশটা বদলে দিতে পারলেও নিজে থেকে যান একই রকম, মৌলিক।

বাবা বলে উঠলেন, “যাক, ওসব ছাড়ো। আমরা এসেছিলাম তোমাকে রেস্তরাঁয় খাওয়াতে নিয়ে যাব বলে। কিন্তু তুমি চোখের সামনে যেভাবে রোজগার করলে, খাওয়াতে হবে তোমাকেই।”

দীপকাকু একবাক্যে রাজি। টাকাগুলো পার্সে পুরে নিয়ে বললেন, “চলুন, যাওয়া যাক। কোথায় খাবেন বলুন?”

চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছিলেন দীপকাকু। কেবিনে ঢুকল সুদর্শনকাকা, হাতে ভিজিটিং কার্ড। দীপকাকুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “ভদ্রলোক এসেছেন। বললেন, আপনার সঙ্গে নাকি ফোনে কথা হয়ে আছে।”

দীপকাকু একবার চোখ তুলে বাইরেটা দেখে নিয়ে কার্ডটা পড়লেন। বিব্রত কণ্ঠে বললেন, “তাই তো, আমি একেবারে ভুলেই গিয়েছিলাম অ্যাপয়েন্টমেন্টটা!”

ফের চেয়ারে বসে পড়লেন দীপকাকু। বাবার উদ্দেশে বললেন, “রজতদা, জাস্ট আ ফিউ মিনিটস। কেসটা একবার শুনে নিয়ে বেরিয়ে যাব। আমারও বেশ খিদে পেয়েছে।”

দীপকাকুর টেবিলের উলটো দিকে দুটো চেয়ার। ক্লায়েন্টের জন্য একটা ছেড়ে দিয়ে বাবা উঠে গেলেন দীপকাকুর পাশের চেয়ারে। যেতে যেতে বললেন, “নো প্রবলেম। অনেক দিন হয়ে গেল, তোমার ক্লায়েন্ট এবং কেস মিট করিনি। আই উইশ, তোমার এই কেসটা বেশ জমকালো হবে।”

দীপকাকু বললেন, “দেখা যাক, আপনার শুভকামনা কতটা ফলপ্রসূ হয়। বেশ কিছুদিন হল আমিও সেরকম কঠিন কোনও কেস পাচ্ছি না।”

.

সুদর্শনকাকা কেবিন থেকে বেরিয়ে গিয়ে ক্লায়েন্টকে পাঠিয়ে দিয়েছে। দরজা ঠেলে ঢুকলেন বছর পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশের এক ভদ্রলোক। গোঁফ আছে, চোখে দামি ফ্রেমের চশমা, হাতের ঘড়িটা ব্র্যান্ড নিউ, মনে হচ্ছে বিদেশি। পরনের পোশাকও বেশ উঁচুদরের। হাতে ঝুলছে সফ্ট লেদারের কালো ব্রিফকেস। এত ঝকঝকে জিনিস সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও ভদ্রলোকের চেহারায় কেমন একটা বিধ্বস্ত ভাব।

ঘরে ঢুকে লোকটি যেন ধাঁধায় পড়ে গিয়েছেন। কারণটা টের পাচ্ছে ঝিনুক, বাবা আর দীপকাকুর মধ্যে কে যে ডিটেকটিভ, বুঝে উঠতে পারছেন না!

শেষমেশ বাবাকেই সাব্যস্ত করে নমস্কার ঠুকলেন। বাবার চেহারা রাশভারী তো, তাই। সঙ্গে সঙ্গে নমস্কারটা বাবা পাস করে দিলেন দীপকাকুর দিকে। আঙুল দেখিয়ে বললেন, “আমি নই, ইনি।”

নমস্কারটা গ্রহণ করলেন দীপকাকু। ঝিনুকের পাশের চেয়ারটা নির্দেশ করে ভদ্রলোককে বললেন, “প্লিজ, বি সিটেড।”

ভদ্রলোক বসলেন। কালো ব্রিফকেসটা রাখলেন চেয়ারের পাশে, মেঝেতে। একটু যেন জড়সড় হয়ে আছেন মানুষটি, যা ওঁর পোশাক-আশাকের সঙ্গে একেবারেই মানাচ্ছে না।

দীপকাকু বলে উঠলেন, “বলুন মিস্টার সেনগুপ্ত, আপনার সমস্যাটা।”

সেনগুপ্তবাবু ইতস্তত করছিলেন ঝিনুক আর বাবার দিকে তাকিয়ে। একঝলকে সেটা দেখে নিলেন দীপকাকু। বললেন, “আপনার ব্যাপারটা যদি তেমন গোপনীয় এবং ব্যক্তিগত না হয়, অনায়াসে এঁদের সামনে বলতে পারেন। এঁরা আমার খুবই নিকটজন।”

একটু যেন ফ্রি হলেন সেনগুপ্তবাবু। বললেন, “না, সেরকম গোপন করার মতো কিছু নয়। তবে ঘটনাটা আমার স্ত্রী ছাড়া এখনও কাউকে জানাইনি।”

“আমার কাছে আসার কথা আপনাকে কে বলল? তাকেও কি জানাননি ব্যাপারটা?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

সেনগুপ্ত বললেন, “আপনার কাছে পাঠালেন ‘অ্যারো অ্যাড এজেন্সি’-র সুজয় ঘোষ। উনি আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। আপনি ওঁদের কোম্পানিকে কীভাবে ভরাডুবির হাত থেকে বাঁচিয়েছেন, সেই গল্প করলেন। তখনই আমি বুঝতে পারি, আমার প্রবলেমটা আপনিই একমাত্র সল্ভ করতে পারবেন। আমি অবশ্য আমার সমস্যাটা সুজয়দাকে বলিনি। শুধু একজন ভাল ডিটেকটিভের সন্ধান চেয়েছিলাম।”

সেনগুপ্তর কথা শুনে ঝিনুক বেশ উৎসাহিত হয়ে পড়ল। অ্যাড এজেন্সির কেসটা সত্যিই ভীষণ জটিল ছিল। এক-এক সময় মনে হচ্ছিল, সল্ভ করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু সল্ভ করে ফেললেন দীপকাকু। ওই ক’টা দিন ঝিনুক রুদ্ধশ্বাস অবস্থায় কাটিয়েছে দীপকাকুর সঙ্গে। সেনগুপ্তবাবুর কেসটা যদি সেরকম মানের হয়, ঝিনুক দীপকাকুকে অ্যাসিস্ট করবেই করবে। কোনও ওজর-আপত্তি শুনবে না। আবার এমনও হতে পারে, সেনগুপ্তবাবুর কেসটা হয়তো খুবই সহজ, উনি নিজে সেটা ধরতে পারছেন না। দীপকাকু এখন এই টেবিলে বসেই ব্যাপারটা সল্ভ করে দেবেন। যেমন একটু আগে বড়লোক ভদ্রমহিলার ক্ষেত্রে হল। ক্লায়েন্টরা সবসময়ই নিজের সমস্যাকে বড় করে দেখেন। না দেখলে দীপকাকুর কাছে আসবেন কেন?

“হ্যাঁ, এবার বলুন আপনার প্রবলেমটা?” কথাটা বলে দীপকাকু দৃষ্টি স্থির করলেন সেনগুপ্তবাবুর মুখে।

বলতে শুরু করলেন সেনগুপ্ত, “আমি ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ার। কার্ড দেখে সেটা এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছেন। পেশাটা গুছিয়ে বলি। আমি কোনও চাকরি করি না। বিভিন্ন কোম্পানিকে কনসালটেন্সি এবং টেকনিক্যাল সার্ভিস দিই। আমার ফার্মের নাম ‘অ্যাডভান্স ইলেকট্রনিক্স’। মির্জা গালিব স্ট্রিটে আমার অফিস এবং ওয়ার্কশপ। খুব বড় কিছু নয়। একজন আমায় অ্যাসিস্ট করে। আর-একজন চা, জল এনে দেয়। বাড়িতেও কাজ করি, আলাদা কাজের ঘর আছে।”

“আপনি ডিগ্রি করেছেন কোন ইউনিভার্সিটি থেকে?” কথার মাঝে প্রশ্ন করলেন দীপকাকু।

“যাদবপুর। পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনও করি ওখান থেকে।”

“চাকরি নেননি কেন?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

“পড়াশোনা করতে করতেই আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম, চাকরি কোনওদিনই করব না। যা করার নিজে করব। বললে অহংকারের মতো শোনাবে, তবু এটাই ফ্যাক্ট, আমার জেদ সফল হয়েছে। আমাদের ট্রেডে আমাকে লোকে একডাকে চেনে। বহু ভাল ভাল চাকরির অফার আমি পেয়েছি, এখনও রোজ একটা-দুটো করে পাই। কিন্তু কোনও মূল্যেই আমি স্বাধীনভাবে কাজ করার আনন্দটা খোয়াতে চাই না।”

“বুঝলাম!” বললেন বাবা।

সেনগুপ্তবাবুর দৃষ্টি গেল বাবার দিকে, বোধহয় বুঝে নিতে চাইলেন বাবার উক্তিটা কটাক্ষ কিনা। নিশ্চিন্ত হয়ে ফের শুরু করলেন বলতে, “আমাদের লাইনে একটা ব্যাপারে আমার বিশেষ দক্ষতা আছে। বিদেশ থেকে যে-সব উৎপাদন-নির্ভর ইলেকট্রনিক মেশিন আমাদের দেশে আসে, তার উৎপাদন ক্ষমতা আমি নিয়ন্ত্ৰণ করতে পারি। অবশ্যই হালকা ধরনের মেশিনের কথা বলছি, হেভি ইন্ডাস্ট্রি নয়। এখন যেমন আমি একটা বিস্কুট তৈরির মেশিনের প্রোডাকশন বাড়ানোর অর্ডার নিয়েছি। কিন্তু এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল, অর্ডারটা তো ফুলফিল করতে পারবই না, মার্কেটে আমার সুনামটাও নষ্ট হবে।”

“ওই দুর্ঘটনার কারণেই আপনি আমার কাছে এসেছেন?” বললেন দীপকাকু।

“ইয়েস। এ এক আশ্চর্য চুরি! আমি কিছুতেই এর কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছি না। হয়েছে কী, বিস্কুট ম্যানুফ্যাকচারিং অটোমেটেড মেশিনের প্রোডাকশন বাড়ানোর কাজ ইন্ডিয়ায় প্রথমে আমিই ট্রাই নিই। মেশিনগুলো প্রধানত আসে ইতালি আর চিন থেকে। একটা ইতালির মেশিনের পিসিবি বোর্ডের ডায়াগ্রাম নিয়ে কাজ শুরু করি আমি। বুঝতে পারি, বোর্ডটা আপগ্রেড করতে গেলে যে-সব ইলেকট্রনিক পার্টস আমার লাগবে, ভারতের বাজারে পাওয়া সম্ভব নয়। তখন…..”

কথা কেটে দীপকাকু ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “পিসিবি বোর্ড মানে বুঝতে পারছ তো? টিভি, রেডিয়ো, ডিভিডি-র ভিতরে এক ধরনের চৌকো, আয়তাকার সবুজ রঙের প্লাস্টিকের পাতলা বোর্ড থাকে, যাতে খুদে খুদে নানা আকারের পার্টস লাগানো। ওই বোর্ডটাই যন্ত্রটার ব্রেন। মেশিন কন্ট্রোল হয় ওর মাধ্যমেই।”

ঝিনুক ঘাড় হেলাল। অর্থাৎ বুঝেছে। এতক্ষণ মাথার উপর দিয়ে চলে যাচ্ছিল অনেক কিছু।

সেনগুপ্তবাবু ধরে নিলেন থেমে যাওয়া কথার সূত্র, “তখন ঠিক করি সিঙ্গাপুর যাব। পার্টস আনতে আগেও অনেকবার আমাকে সিঙ্গাপুর যেতে হয়েছে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, সিঙ্গাপুরে ইলেকট্রনিক গুডস-এর বিশাল মার্কেট আছে। এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড়।’

“হ্যাঁ, জানি। দুটো বিখ্যাত মল আছে। সিমলিম টাওয়ার আর সিমলিম স্কোয়ার। দুটোই বহুতল। সিমলিম স্কোয়ার সাততলা। টাওয়ারটা কত, এখন ঠিক মনে পড়ছে না।”

দীপকাকুর ফান্ডা দেখে বাবা অবাক হয়ে ওঁর দিকে তাকালেন। ঝিনুক মোটেই আশ্চর্য হয় না। দীপকাকুর ফান্ডা সম্বন্ধে তার সম্যক ধারণা আছে।

সেনগুপ্তবাবু বলতে থাকলেন, “আজ থেকে কুড়ি দিন পিছনে, মানে তেইশ তারিখ আমি সিঙ্গাপুর রওনা দিই। আপগ্রেডেশনের ডায়াগ্রাম সঙ্গে নিয়ে যাই। তিন দিন, দু’রাত থাকি। দুটো মলে শপিং করি। যা যা চেয়েছিলাম সবই পেয়ে যাই। দেন ব্যাক টু কলকাতা। অবশ্য এখানে ফিরেই কাজটা নিয়ে বসিনি। অন্য কিছু কাজ ছিল। সেগুলো সেরে, গত চারদিন আগে বিস্কুটের মেশিনটা নিয়ে বসব ঠিক করি। সেই মতো যে ব্যাগে সিঙ্গাপুর থেকে পার্টসগুলো নিয়ে এসেছিলাম, সেটা সঙ্গে করে অফিস যাই। ওয়ার্কশপে বসে ব্যাগ খুলে দেখি, ডায়াগ্রাম, পার্টস কিচ্ছু নেই, আজেবাজে কাগজ ভরা। আমার তো মাথায় হাত! যে কোম্পানির জন্য কাজটা করছিলাম, সেই অর্ডারটা তো গেলই, সম্মানটাও ধুলোয় মিশল বড় মুখ করে কোম্পানিকে বলেছিলাম, আপনাদের প্রোডাকশন আমি টেন পারসেন্ট বাড়িয়ে দেব। আরও একটা চিন্তাও মাথায় ঢুকল। জিনিসগুলো যদি আমার মতোই কোনও ইঞ্জিনিয়ার চুরি করে থাকে, তা হলে সেই ইঞ্জিনিয়ার আমার ডায়াগ্রাম আর ইলেকট্রনিক পার্টস নিয়ে বিস্কুট ম্যানুফ্যাকচারিং মেশিনের আপগ্রেডেশন শুরু করে দেবে। আমি পিছিয়ে পড়ব আমাদের সার্কিটে। এসব ছাড়াও যে ব্যাপারটা আমাকে সবচেয়ে অবাক করেছিল, তা হচ্ছে, জিনিসগুলো ব্যাগ থেকে সরল কী করে?”

“ব্যাগটাই চেঞ্জ করে দিয়েছে। এ তো সিম্পল ব্যাপার! একই রকম দেখতে অন্য একটা ব্যাগ রেখেছে আপনার ব্যাগের জায়গায়।” বলে উঠলেন বাবা।

সেনগুপ্ত মাথা নাড়লেন। বললেন, “না, ব্যাগের চাবি তো আমার কাছে! ওই চাবি দিয়েই তো খুললাম ব্যাগটা!”

বিষয়টা যে এত সরল নয়, বুঝলেন বাবা। দীপকাকুর দিকে তাকালেন মতামত শোনার জন্য। কপাল কুঁচকে দীপকাকু মন দিয়ে শুনে যাচ্ছিলেন সেনগুপ্তবাবুর কথা। এখন জিজ্ঞেস করলেন, “ডুপ্লিকেট চাবিটা কোথায়? কার কাছে থাকে?”

সেনগুপ্তবাবু বললেন, “দুটো চাবিই আপাতত একই সঙ্গে আছে। কারণ, ব্যাগটা আমি এবারই সিঙ্গাপুর থেকে কিনেছি। পার্টস রাখার জন্য আইডিয়াল ব্যাগ। বেশ দামি। চাবি এখনও আলাদা করা হয়নি। বাড়ির আলমারির লকারে ছিল।”

“ব্যাগটা রেখেছিলেন কোথায়?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

সেনগুপ্ত বললেন, “ব্যাগ ছিল আমার বাড়ির ওয়ার্কশপে। কাজ করার জন্য ব্যাগটা যেদিন অফিসে নিয়ে আসি, চাবি দুটো নিয়েছিলাম লকার থেকে।”

“ব্যাগের ভিতরের সব পার্টস লাস্ট কবে দেখেছিলেন?”

দীপকাকুর প্রশ্নের উত্তরে সেনগুপ্ত বললেন, “সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে সেদিনই বাড়িতে বসে একবার দেখেছিলাম। স্ত্রীকেও দেখালাম। যদিও এসব ব্যাপারে ওর কোনও আগ্রহ নেই। তবু মূল্যবান সংগ্রহগুলো নিজের লোককে তো একটু দেখাতে ইচ্ছে করে। আমার চার বছরের ছেলেও দেখেছে, ও মনে করে এসব জিনিস বাবার খেলনাপাতি।”

দীপকাকু গম্ভীর স্বরে “হুম!” করলেন। সামান্য বিরতি নিয়ে স্বগতোক্তির ঢঙে বলতে থাকলেন, “তার মানে, আপনার জিনিসগুলো চুরি হয়েছে কলকাতাতেই। কিন্তু কীভাবে হল? দুটো চাবিই আপনি রেখেছিলেন লকারে। ব্যাগটা কি অন্যভাবে খোলা হয়েছে?”

সেনগুপ্তবাবু বললেন, “দেখে কিন্তু কিছু বোঝার উপায় নেই। ব্যাগটা যদি আনতাম, দেখানো যেত। ভাবলাম নিয়ে বেরব…”

“নিয়ে বেরিয়েছেন আপনি।” বললেন দীপকাকু।

কথাটা বুঝতে না পেরে সেনগুপ্ত অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন দীপকাকুর দিকে। ঝিনুকদের অবস্থাও একই রকম।

দীপকাকু বললেন, “ব্যাগটা আছে আপনার চেয়ারের পাশে। ভুলে গিয়েছেন ওটার কথা।”

একবিঘত জিভ কেটে সেনগুপ্ত বললেন, “এই রে! দেখেছেন, নিয়ে বেরিয়েছি আপনাকে দেখাব বলে, এদিকে খেয়াল নেই!”

ব্যাগটা টেবিলে তুলে এনে সেনগুপ্ত জানতে চাইলেন, “আপনি কী করে বুঝলেন, এটাই সেই ব্যাগ?”

“আপনি যখন চেম্বারে ঢুকেছেন, তখনই ওটার দিকে চোখ গিয়েছিল আমার। ইমপোর্টেড জিনিস। একটু আনইউজুয়াল দেখতে।”

“নাঃ, আপনার চোখের তারিফ করতে হবে!” বলে, সেনগুপ্ত কালো নরম লেদারের ব্যাগটা দীপকাকুর হাতে তুলে দিলেন। ব্যাগটা কোলের উপর নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে লাগলেন দীপকাকু। চাবির গর্তে এসে থামলেন। টেবিলের ড্রয়ার টেনে বের করলেন ম্যাগনিফায়িং গ্লাস। চাবি লাগানোর মেটালের অংশটা খুঁটিয়ে দেখতে থাকলেন।

সুদর্শনকাকা ফের তিন কাপ চা নিয়ে ঢুকল। সেনগুপ্তবাবু এমনভাবে চায়ের কাপটা তুলে নিলেন, যেন এটার অপেক্ষাতেই ছিলেন! ব্যাগটা দেখা হল দীপকাকুর। ঝিনুকের দিকে ব্যাগ আর ম্যাগনিফায়িং গ্লাস বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “দ্যাখো, তোমার কী মনে হচ্ছে বলো।”

চোখের কোণ দিয়ে ঝিনুক প্রথমে সেনগুপ্তবাবুর এক্সপ্রেশন দেখল। যা ভেবেছিল তাই, দীপকাকু ঝিনুককে এত গুরুত্ব দিচ্ছেন কেন, তা সেনগুপ্ত বুঝে উঠতে পারছেন না! ওঁর তো জানা নেই ঝিনুকের আসল পরিচয়।

ব্যাগের লেদার খুবই সফ্ট। কোথাও কোনও হেয়ারলাইন কাটাছেঁড়ার দাগ নেই। চাবি দেওয়ার পিতল রঙের প্লেটটা দীপকাকুর মতোই আতশ কাচ দিয়ে দেখল ঝিনুক। না, আশপাশে কোনও আঁচড়ের দাগ নেই। দেখা শেষ হলে সেনগুপ্তবাবুকে বলল, “চাবি এনেছেন?”

“হ্যাঁ, এনেছি।” বলে, প্যান্টের পকেট থেকে চাবির স্টাইলিশ রিং বের করে দিলেন, যাতে দুটো চাবিই ঝুলছে। এখনও আলাদা করেননি। করার দরকারও নেই আর। আসল জিনিস তো হাওয়া!

চাবি দিয়ে ব্যাগটা খুলে ফেলল ঝিনুক। ব্যাগের ভিতরের দিকটা ক্রিম কালারের ভেলভেটে মোড়া, কোনও জিনিসপত্র নেই। একেবারে খালি।

দীপকাকু উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে উঠলেন, “ভিতরে যে বলছিলেন কীসব কাগজটাগজ ছিল, সেগুলো কোথায়?”

“ফেলে দিয়েছি। কী হবে আজেবাজে কাগজ রেখে!”

“কোথায় ফেলেছেন কাগজগুলো?” জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু। সেনগুপ্তবাবু বললেন, “অফিসে। ওয়েস্ট পেপার বক্সে।”

“ইমিডিয়েট অফিস অ্যাসিস্ট্যান্টকে বলুন, বক্সটা সরিয়ে রাখতে। কাগজগুলো আমার দেখা দরকার।”

দীপকাকুর নির্দেশমতো নিজের মোবাইল সেট থেকে অফিসে ফোন করলেন সেনগুপ্ত। নিতাই নামে কাউকে বললেন, “ওয়েস্ট বক্সের কিছু যেন ফেলে দিয়ো না।”

ওদিকের কথা শেষ হওয়ার পর দীপকাকু ঝিনুককে জিজ্ঞেস করলেন, “কী বুঝলে ব্যাগটা দেখে?”

ঝিনুক বলল, “চাবি দিয়ে এক চান্সে খোলা হয়েছে। তার বা অন্য কিছু ব্যবহার করলে কিছু দাগ অন্তত পড়ত।”

“কারেক্ট!” দীপকাকুর গলায় প্রশংসার সুর। হঠাৎ যেন খেয়াল পড়েছে, এমনভাবে দীপকাকু সেনগুপ্তকে বললেন, “এর সঙ্গে আপনার আলাপ করানো হয়নি, আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট আঁখি সেন। নিকনেম ঝিনুক। আর ইনি হচ্ছেন ঝিনুকের বাবা রজত সেন। আমার বড়দাদার মতো।

“আমি দেবাংশু সেনগুপ্ত।” বলে, সেনগুপ্তবাবু দু’জনকেই নমস্কার জানালেন। ঝিনুক এতক্ষণে ভদ্রলোকের পুরো নামটা জানতে পারল।

দীপকাকু ফিরে গেলেন কেসের প্রসঙ্গে। বললেন, “তা হলে যা বোঝা গেল, ব্যাগটা খোলা হয়েছে চাবি দিয়েই। সেটা হয়তো আসল অথবা নকল চাবি।”

“নকল চাবি কী করে বানাবে চোর? আসল দুটো চাবিই তো ছিল আমার লকারে!” বললেন সেনগুপ্ত।

“আপনার স্ত্রী ছাড়া আর কেউ কি ওই লকারটা ব্যবহার করে?” জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু।

“না। বাড়িতে আমরা তিনজন মানুষ। ছেলে ছোট, লকারে হাত দেওয়ার তো কোনও প্রশ্নই ওঠে না। আমি আর আমার স্ত্রী লকার খোলা-বন্ধ করি।”

“এই চুরির ব্যাপারে কোনও বিশেষ ব্যক্তিকে আপনার সন্দেহ হয়?” সেনগুপ্তবাবুর উদ্দেশে দীপকাকুর প্রশ্ন।

দেবাংশু সেনগুপ্ত বললেন, “কাকে সন্দেহ করি বলুন তো? পুরো ব্যাপারটাই তো আমার কাছে ভোজবাজির মতো লাগছে। চাবি আমার কাছে, অথচ ব্যাগের ভিতর থেকে জিনিস উধাও হয়ে গেল!”

দীপকাকু বললেন, “ভোজবাজি মানে তো ম্যাজিক, সেখানে কিন্তু মন্ত্রের কোনও ব্যাপার নেই। কারসাজি লাগে। চুরিটাও হয়েছে অতীব ধূর্ত কারও কারসাজিতে। একটা সন্দেহভাজনের তালিকা তৈরি করে আমাদের এগোতে হবে।”

“তালিকায় মাত্র একজনকে আমি দেখতে পাচ্ছি। আমার স্ত্রী। কিন্তু সে এসব ইলেকট্রনিক ব্যাপার থেকে শতহস্ত দূরে থাকে। তা ছাড়া তাকে আমি নিজের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করি।”

আঙুল দিয়ে টেবিলের পেপারওয়েট ঘোরাতে ঘোরাতে দেবাংশুবাবুর কথাটা শুনলেন দীপকাকু। ঘোরানো থামিয়ে দিয়ে জানতে চাইলেন, “আপনার ডায়াগ্রাম, স্পেয়ার পার্টস পেলে কার কার লাভ হবে বলে মনে হয়?”

“লাভ তো হবে সবক’টা অটোমেটেড বিস্কুট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির। কিন্তু ‘গ্রেট বাইট’ কোম্পানির মালিক ছাড়া তো কেউ জানেই না যে, মেশিনের স্পিড বাড়ানোর পদ্ধতি আমি বের করে ফেলেছি। ওরা জানে, কারণ ওদের কাছ থেকে কাজের বরাতটা নিয়েছিলাম।”

“কত টাকার এগ্রিমেন্ট হয়েছিল?” জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু।

“দশ লাখ।”

“দশ!” চোখ বড় বড় করে বলে উঠলেন বাবা। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “ওইসব মেশিনের দাম কত?”

“দেড় কোটির কাছাকাছি।” বললেন সেনগুপ্ত।

ঝিনুক বড় করে ঢোক গিলল। দেখল, বাবারও কণ্ঠনালি ওঠানামা করছে। দীপকাকু নির্বিকার। জিজ্ঞেস করলেন, “কাজটার জন্য কোনও অ্যাডভান্স নিয়েছিলেন?”

“নিইনি। চাইলেও দিত না। বলেছিল, কাজ দেখে দেবে। ওরা বিশ্বাস করতে পারছিল না যে, বিদেশ থেকে কেনা মেশিনের প্রোডাকশন ক্যাপাসিটি কলকাতার কোনও সাধারণ ইঞ্জিনিয়ার বাড়িয়ে দেবে। তাই খাতায়-কলমে একটা এগ্রিমেন্ট হয়েছে। কাজটা যদি আমি সাকসেসফুলি করতে পারি, ওই অ্যামাউন্টের টাকা আমায় দেবে। টাকাটা বাঁচানোর জন্য ওরা চুরি করাতেই পারে আমার জিনিসগুলো। সেক্ষেত্রে, একজন ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ার লাগবে ওইসব স্পেয়ার পার্টস মেশিনে ইনস্টল করতে।’

“ওদের কোম্পানিতে কি সেরকম ইঞ্জিনিয়ার কেউ আছে?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

সেনগুপ্তবাবু বললেন, “আছে একজন। কিন্তু তার দ্বারা এসব কাজ সম্ভব নয়। এরা বাঁধা গতের কাজ করতে ভালবাসে বলেই চাকরি বেছে নেয়। ইনোভেশনের দিকে এদের কোনও আগ্রহ নেই।”

“আপনার মতো ইঞ্জিনিয়ার ক’জন আছে, যাদের আপনি জানেন?”

“কলকাতায় আছে দু’জন। বলা যেতে পারে ইস্টার্ন ইন্ডিয়ায় এরাই আমার কম্পিটিটর। দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরুতে কয়েকজন আছে, যাদের নাম আমি শুনেছি, কাজের সঙ্গে তেমন পরিচিত নই।”

“কলকাতার দু’জনের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন?”

“হ্যালো, হাই-এর একটা রিলেশন আছে। কাজের ক্ষেত্রে কেউ কাউকে হেল্প করি না। সেখানে আমরা হার্ডকোর প্রফেশনাল।”

সেনগুপ্তবাবুর উত্তরের পর দীপকাকু চুপ করে গেলেন। হাত দুটো জড়ো করে রেখেছেন টেবিলে। কপাল কুঁচকে কী যেন ভাবছেন। ঘরে শুধু ফ্যান চলার মৃদু শব্দ। একটু পরে দীপকাকু বললেন, “তা হলে যা দেখা যাচ্ছে, চুরি যাওয়া জিনিসগুলো পেলে আপনার জানাশোনার মধ্যে তিনজনের লাভ। দু’জন আপনার কম্পিটিটর আর বিস্কুট কারখানার মালিক। চুরিটা সম্ভবত এঁরা করেননি। কোনও পেশাদার নিয়োগ করেছিলেন। আবার এমনও হতে পারে, চুরির ছকটা এঁদের মাথা থেকে বেরিয়েছে। কারণ, এঁরা যথেষ্ট ইনটেলিজেন্ট। চুরিটা করিয়েছে আপনার আশপাশের কাউকে দিয়ে।”

আবার থামলেন দীপকাকু। একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “আপনার অফিসে স্টাফ তো বললেন দু’জন। যে আপনাকে টেকনিক্যাল কাজে হেল্প করে, সেও কি ইঞ্জিনিয়ার? আপনার জিনিসগুলো চুরি করে কাজে লাগাতে পারবে?”

“না। ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা কোনওটাই তথাগতর নেই। অর্ডিনারি বিএসসি। এখনও কাজ শেখার পর্যায়ে আছে।”

“ওকে দিয়ে চুরি করানোটা কি সম্ভব?” বললেন দীপকাকু।

সেনগুপ্ত বললেন, “কিন্তু চুরিটা ও করবে কখন? ব্যাগটা তো ওর নাগালের মধ্যেই ছিল না। তা ছাড়া ও ততটা চোস্ত ছেলেও নয়।”

“আর নিতাই? যাকে একটু আগে ফোন করলেন আপনি?”

“সে বরং তথাগতর চেয়ে চালাক-চতুর। তবে ছেলেটা অফিসের গোড়াপত্তন থেকে আছে। অফিসটাকেই ঘরবাড়ি মনে করে। রাতে শোয় অফিসের ওয়ার্কশপে।”

“বাড়িতে কাজের লোক?”

“একটি। বাপনের মা। তার আসল নাম জানি না। সকাল-সন্ধে একবার করে আসে। চার বছর ধরে কাজ করছে। এখন পর্যন্ত হাতটানের কোনও নিদর্শন দেখায়নি।’

“ভেরি গুড!” বলে, ফের চুপ করে গেলেন দীপকাকু। এই ‘ভেরি গুড’-এর মানে ঝিনুক জানে। কেসটা দীপকাকুর বেশ পছন্দ হয়েছে। ঝিনুকেরও মনে হচ্ছে, অ্যাড এজেন্সির কেসের মতোই জটিল দেবাংশু সেনগুপ্তর কেসটা। চুরিটা হয়েছে এত নিখুঁতভাবে, কোনও দিশা পাওয়া যাচ্ছে না।

দীপকাকু বলে উঠলেন, “ঠিক আছে। আমি কাল ফার্স্ট আওয়ারে আপনার অফিসে যাব। আমার ফিল্ড ইনভেস্টিগেশন শুরু হবে ওখান থেকেই।”

স্বস্তির শ্বাস ফেললেন সেনগুপ্ত। বললেন, “খুব ভাল কথা। চলে আসুন অফিসে। সব শুনে কী মনে হল? বমালসমেত চোরকে ধরা যাবে তাড়াতাড়ি?”

প্রশ্নটা এড়িয়ে দীপকাকু জানতে চাইলেন, “আপনার জিনিসগুলো যদি কোনও ইঞ্জিনিয়ারের হাতে যায়, মেশিন আপগ্রেডেশন করতে তার কতদিন লাগতে পারে?”

“তা ধরুন, আমার ডায়াগ্রামটা বুঝতে দিনচারেক লাগবে। তবে সেই ইঞ্জিনিয়ার যদি ইতিমধ্যে ওই মেশিনের আপগ্রেডেশন নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়ে থাকে, তা হলে হয়তো একদিন। যদিও তারপর হচ্ছে আসল কাজ, বারোটা কন্ট্রোল সার্কিট বোর্ডে আমার স্পেয়ার পার্টস ইনস্টল করতে হবে। পুরো কাজটা শেষ করতে কমপক্ষে দিন দশ-বারো তো লাগবেই।”

দীপকাকু বললেন, “এনাফ টাইম। আশা করি এর মধ্যে চোরকে শনাক্ত করতে পারব। যদি না এর পিছনে অন্য কোনও গল্প লুকিয়ে থাকে।”

“অন্য গল্প বলতে?” অবাক হয়ে জানতে চাইলেন সেনগুপ্ত।

দীপকাকু বললেন, “সে-সব আমার উপর ছেড়ে দিন। কাল দেখা হচ্ছে।” দেবাংশুবাবু এবার বললেন, “আপনার চার্জটা যদি একটু বলেন! অ্যাডভান্স কিছু করতে হয় তো, তাও বলুন। আমি চেকবই সঙ্গে নিয়ে এসেছি।”

দীপকাকু বললেন, “চার্জটা এখনই বলা খুব মুশকিল। কাজটা নিয়ে খানিকটা এগোই। অ্যাডভান্স আপনি যে-কোনও অ্যামাউন্ট করতে পারেন।”

বুকপকেট থেকে চেকবই বের করে টাকার অঙ্কটা লিখলেন দেবাংশুবাবু। সই আগেই করা ছিল। পাতা ছিঁড়ে চেকটা এগিয়ে দিলেন দীপকাকুর দিকে। চোখ না বুলিয়েই দীপকাকু চেক চালান করলেন ড্রয়ারে।

দেবাংশু সেনগুপ্ত এবার উঠে পড়লেন। তিনজনকেই বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে গেলেন কেবিন থেকে। ওঁর যাওয়ার দিকে অলসভাবে তাকিয়ে রইলেন দীপকাকু, মাথাটা হেলান দিয়েছেন নিজের দু’হাতের পাতায়।

বাবা বললেন, “কী ব্যাপার? এরকম ঝিমিয়ে গেলে কেন? চেকটাও ভাল করে দেখলে না। কেসটা কি তোমার মনঃপূত হয়নি?”

“হয়েছে। আবার এ-কথাও মনে হচ্ছে, কেসটা ফল্স। এত অনবদ্য চুরি যে করবে, সে খামোখা ওইসব জিনিস চুরি করতে যাবে কেন! দশ লাখের জিনিস, চোরাই বলে হয়তো পাঁচ পাবে। বুদ্ধিটা সে আরও দামি দামি জিনিস চুরি করার পিছনে লাগাতে পারত। আমার তো মনে হচ্ছে সেনগুপ্তর সুনাম নষ্টের অজুহাতে কেউ ওঁকে আমার রেপুটেশনের ক্ষতি করতে পাঠিয়েছে।”

কথাটা শেষ হতেই বাবার মুখ থেকে শুধু “অ্যাঃ!” শব্দটা বেরিয়ে এল। ঝিনুকও বেশ অবাক হল। এই দিকটা তো সে ভেবে দেখেনি!

দীপকাকু কিন্তু নিজের জায়গায় ঠিক আছেন। উনি বলেন, “যে-কোনও কেসে সন্দেহের বাইরে কাউকেই রাখবে না।” তাই যিনি তদন্তের ভার দিলেন, তাঁকেও রাখা হল সন্দেহের তালিকায়। দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে একটু আড়মোড়ামতো ভেঙে দীপকাকু বললেন, “চলুন রজতদা, খাওয়ার কথা তো দেখছি ভুলেই গিয়েছেন আপনারা!”

সত্যিই ভুলে গিয়েছিল ঝিনুক। কেসটার যা মেরিট, ভুলে যাওয়ারই কথা। এই তদন্তে দীপকাকুর সঙ্গে তাকে থাকতেই হবে।