৪
সুজয় ঘোষের আদি বাড়ি যোধপুর পার্কে। সেই বাড়ি থেকে খানিক দূরে এখন একটা ফ্ল্যাটে থাকেন। ফ্যামিলি মেম্বার বলতে স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলে হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়ে বছর দুয়েক হল চাকরিতে ঢুকেছে। মেয়ে যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। পরিবারে একে-অপরের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল। সুজয়বাবু যে ইদানীং কোনও ব্যাপারে খুব চিন্তায় আছেন, বাড়ির লোক বুঝতে পারছে। কিন্তু প্রশ্ন করে কোনও উত্তর পায়নি।
একই পাড়ায় থাকেন গৌতম মজুমদার। পৈতৃক বাড়ি। পরিবারে পাঁচজন, বৃদ্ধ বাবা-মা এবং স্ত্রী ও এক মেয়ে। মেয়ে স্কুলে শিক্ষকতা করে। গৌতমবাবুর কোনও মানসিক পরিবর্তন বাড়ির লোকের চোখে পড়েনি। নিজের কাজের জগতের খবর গৌতমবাবু কখনওই বাড়িতে নিয়ে আসেন না।
পার্থ বর্মন থাকেন পাশের পাড়ায়, পোদ্দারনগরে। শরিকি বাড়ি। সংসার বলতে দুই ভাই। দু’জনেই বিয়ে-থা করেননি। বড়ভাই কলেজে পড়ান। নিজের পড়াশোনা নিয়ে থাকেন। রাতদিনের বৃদ্ধ কাজের লোক দু’ভাইয়ের দেখাশোনা করে।
একটানা তথ্যগুলো দিয়ে থামলেন দীপকাকু। ঝিনুক লিখে নিচ্ছে নোটবুকে। ব্রেকফাস্টের প্লেট সেন্টার টেবিল থেকে তুলে দীপকাকু মায়ের উদ্দেশে বললেন, “এত লুচি কেন দিলেন বউদি? দুপুরে খিদে পাবে না।
এটা কথার কথা, মা ভাল করেই জানেন। আরও চারটে নিয়ে আসবেন একটু পরে। অবলীলায় খেয়ে নেবেন দীপকাকু। সকালে ফোন করেছিলেন, “বউদি, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আসছি। জলখাবারটা আপনার কাছেই সারব।”
কাউকে খাওয়ানোর সুযোগ পেলে মা যেন বর্তে যান! বিশেষ করে দীপকাকুকে। তিনি নাকি রান্নার প্রকৃত সমঝদার। ঝিনুকও লক্ষ করেছে, রান্না নিয়ে দীপকাকু মায়ের সঙ্গে অন্তত আধঘণ্টা দিব্যি আলোচনা চালিয়ে যেতে পারেন। ম্যারিনেট, বেকিং থেকে ফোড়ন পর্যন্ত। ঝিনুক তো চার-পাঁচটার বেশি মশলার নামই জানে না।
আজ লুচির সঙ্গে নতুন পদ মটর-বেগুন। ভূয়সী প্রশংসা করে খেয়ে যাচ্ছেন দীপকাকু। বাবা শেভ করতে করতে টিপ্পনী কাটলেন, “দ্যাখো দীপঙ্কর, তোমার অত ভাল ভাল করার আসল কারণটা আমরা বুঝি।”
“কী কারণ?” খেতে খেতেই জানতে চাইলেন দীপকাকু।
“এ-বাড়ির রেট অফ নিমন্ত্রণটা যেন বাড়ে।”
“সরি রজতদা, আমার সেরকম কোনও ইনটেনশন নেই। আমি সর্বদাই বোঝাতে চাই, রান্না হচ্ছে এক উন্নতমানের শিল্প। রন্ধন শিল্প। যারা সেটা….”
আরও কত কী বলে যাচ্ছেন দীপকাকু, ঝিনুকের সেদিকে মন নেই। সদ্য নোট করা অক্ষরে চোখ বোলাতে বোলাতে কল্পনা করছে, তিন পার্টনারের বাড়ির পরিবেশ। রাগ হচ্ছে দীপকাকু তাকে নিয়ে যাননি বলে।
কাল রেস্তরাঁ থেকে বেরিয়ে দীপকাকু সেই যে উধাও হলেন, যোগযোগ হল আজ সকালে। মাঝে ফোনেও পাওয়া যায়নি। গতকাল ফরেনসিক ল্যাবের কাজ সেরে দীপকাকু গিয়েছিলেন তিন পার্টনারের বাড়ি। উদ্দেশ্য, বাড়ির লোকেরা ব্যাবসার সাম্প্রতিক সমস্যা নিয়ে কিছু জানে কিনা খতিয়ে দেখা। আলোচনা করে বোঝা গিয়েছে, কিছুই জানে না তারা। তার মানে তিন বন্ধুই মিথ্যে বলেননি, ব্যাবসা সংক্রান্ত কোনও আলোচনাই তাঁরা বাড়িতে করেন না। ফ্যামিলি মেম্বারদের কেস হিস্ট্রি জেনে দীপকাকুর মনে হয়েছে, বিজনেসের ক্ষতি করার কোনও অভিপ্রায় তাদের থাকার কথা নয়। তিন পার্টনারের সেরকম নিকট বন্ধুও নেই যে, নিয়মিত ব্যাবসা নিয়ে আলোচনা করবেন। অর্থাৎ যা দাঁড়াল, খবর ফাঁস হচ্ছে তিনজনের মধ্যে থেকেই।
তদন্তে নেমে দীপকাকু এখনও পর্যন্ত তেমন এগোতে পারেননি। রেস্তরাঁয় যে অজ্ঞাতপরিচয় লোকটা চিঠি দিয়েছিল, তার হাতের ছাপ সংগ্রহ হয়েছে। সেটা আদৌ কতটা কাজে লাগবে বোঝা যাচ্ছে না। এই কেসটায় কেন জানি দীপকাকুকে একটু গা-ছাড়া লাগছে।
মা লুচি নিয়ে এলেন, “আর দুটো দিই দীপঙ্কর?”
“না, না, আর নয়!” বলে, ফিরিয়ে দিলেন দীপকাকু। বাবা এসে বসলেন সোফায়। দীপকাকুকে বললেন, “তোমার এই কেসটা তেমন চার্মিং নয়। পুলিশের ইনভলমেন্ট নেই। কাউকে অনুসরণ করার ব্যাপার নেই। অ্যাকশন, ফাইটিং…”
বাবার কথা শেষ হওয়ার আগে দীপকাকু বললেন, “দুটো থ্রেটনিং লেটার আছে।”
সঙ্গে সঙ্গে পয়েন্টটা লুফে নেয় ঝিনুক। বলে, “লাস্ট চিঠিতে দুটো ব্যাপার লক্ষ করেছি আমি। কেস ছেড়ে দিলে ডবল টাকা দেবে বলছে। আপনার সেটেল্ড অ্যামাউন্ট ওরা তার মানে জানে।”
“না-ও জানতে পারে। হয়তো আমাকে জিজ্ঞেস করে নেবে।” বললেন দীপকাকু।
“সেকেন্ড পয়েন্ট, চিঠিতে লিখছে ‘আমরা’, তা হলে কি ধরে নেব, তিন পার্টনারের মধ্যে দু’জন মিলে এই কাজটা করছেন?”
উত্তর না দিয়ে প্লেট হাতে উঠে গেলেন দীপকাকু। ঘরের বাইরে বেসিনের কাছে গিয়ে রাখবেন। নিজের কাজ নিজের হাতে করতেই পছন্দ করেন।
মা কিচেন থেকে বললেন, “তোমাদের দেব খেতে?”
“দাও।” বললেন বাবা।
রুমালে মুখ মুছতে মুছতে দীপকাকু সোফায় এসে বসলেন। আগের প্রশ্নের রেশ টেনে বললেন, ““আমরা’ কথাটা আমাদের ঠকানোর চেষ্টা হতে পারে একটা জিনিস খেয়াল রেখো, অন্য পাঁচটা কেসের তুলনায়, এটা অনেক জটিল। অপরাধী যথেষ্ট বুদ্ধিমান। শুধু একটাই দুর্বলতা, বারবার হুমকি দিতে হচ্ছে আমাদের। এতেই প্রমাণ হয়, আমাদের তদন্ত সঠিক রাস্তায় চলছে, অপরাধীও আমাদের চেয়ে খুব দূরে নেই। আমরা যে পদ্ধতিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি, সেভাবেই যাব।”
“ঝিনুক, প্লেটগুলো নিয়ে যা।” রান্নাঘর থেকে ভেসে এল মায়ের গলা।
সোফা ছেড়ে উঠে ঝিনুক দীপকাকুকে বলে, “আমরা তা হলে এখন ডা. অজিত রায়ের নার্সিংহোমে যাচ্ছি?”
“হ্যাঁ। তারপর দরকার মনে করলে ‘লোটাস’ এবং ‘আর্টলাইন’-এর মালিকের কাছেও যাব। কোন রাস্তায় তারা জোগাড় করছে অ্যারোর কনসেপ্ট, সেটা বের করতেই হবে। যদিও জানি, অপরাধী কখনওই হ্যান্ড টু হ্যান্ড অ্যারোর আইডিয়া ওদের দিচ্ছে না। লুকিয়ে রেখেছে নিজেকে।”
আবার ডাক দেন মা। ঝিনুক তাড়াতাড়ি কিচেনের দিকে দৌড়য়।
খাবারের প্লেট হাতে ঝিনুক ঘরে এসে দেখে, দীপকাকু নিজের সেলফোনে কার সঙ্গে যেন কথা বলছেন! ঝিনুকদের বাড়ি আসতে হলে, কী রুটে আসবেন, বুঝিয়ে দিলেন সেটাই।
ঝিনুক জিজ্ঞেস করে, “কে?”
“দশ মিনিটের মধ্যেই জানতে পারবে।” বলে, ফোনসেট বুকপকেটে রেখে উঠে দাঁড়ালেন দীপকাকু। মুখে গাঢ় চিন্তার ছাপ। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন শেফের কাছে। রুবিক কিউবটা তুলে নিয়ে ফিরে এলেন সোফায়। ট্রাই করে যাচ্ছেন রং মেলানোর। খুব জানতে ইচ্ছে করছে, কে আসছেন? নিজেকে সংযত রেখেছে ঝিনুক। প্রশ্ন করলে চিন্তার ব্যাঘাত হবে দীপকাকুর। বাবাও চুপ করে আছেন। মিনিট দশেকের মধ্যে তো জানা যাবেই, অতিথিটি কে? খাবারের প্লেটে মন দেয় ঝিনুক।
কুড়ি মিনিট পরে ডোরবেল বাজে। ততক্ষণে ঝিনুকদের জলখাবারের পাট শেষ। দরজা খুলতে যায় ঝিনুক। সম্ভাব্য অতিথি হিসেবে অনেকের নাম ভেবে রেখেছিল। দরজা খোলার পর ঝিনুক দেখল, তাদের কেউ নয়। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন তিন পার্টনারের একজন। গৌতম মজুমদার। চেহারায় কেমন যেন উদ্ভ্রান্ত ভাব! জিজ্ঞেস করলেন, “দীপঙ্কর বাগচী আছেন তো?”
“আছেন। ভিতরে আসুন।” সরে দাঁড়ায় ঝিনুক।
জুতো না খুলেই গৌতমবাবু তড়িঘড়ি পায়ে দীপকাকুর মুখোমুখি সোফায় গিয়ে বসেন। বাবার উপস্থিতি খেয়ালই করছেন না। আকুল আগ্রহে দীপকাকুকে বললেন, “সব শুনে কী মনে হল আপনার?”
“ফোনে আপনি ভীষণ র্যাপিডলি কথা বলছিলেন, পুরোটা বুঝতে পারিনি। ঠান্ডা মাথায় গোড়া থেকে বিষয়টা বলুন।”
ঝিনুক জানে দীপকাকু ফোনের কথা সমস্তটাই শুনেছেন এবং বুঝেছেন। এতক্ষণ চিন্তা করে গিয়েছেন ওই নিয়েই। আবার শুনতে চাওয়ার উদ্দেশ্য, বিষয়টা খতিয়ে দেখা। ঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে শুরু করলেন গৌতমবাবু, “এক ক্লায়েন্টের কাছে আমাদের তিন লাখ টাকা পাওনা। অনেক দিন ধরে আটকে রেখেছে টাকাটা। আমার উপর দায়িত্ব ছিল পেমেন্টটা তোলার। পার্টিকে রেগুলার এসএমএস করে তাগাদা দিয়ে যাচ্ছিলাম আমি। ক্লায়েন্ট বলে যাচ্ছে, পঞ্চাশ হাজার কমাতে। এক পয়সাও কম করতে রাজি হইনি। আজ সকালে পার্টি আড়াই লাখ টাকার চেক সুজয়ের বাড়িতে গিয়ে দিয়ে আসে। সুজয় জানতে চায়, পঞ্চাশ কম কেন?
“পার্টি নিজের মোবাইল ফোনে একটা এসএমএস দেখায়, ‘ঠিক আছে, পঞ্চাশ কম দিন। সুজয় ঘোষের বাড়িতে দেবেন।’ এসএমএস-টা পাঠানো হয়েছে আমার সেলফোন থেকে।”
“কী করে?” ঝিনুকের প্রশ্নটা দীপকাকুই করলেন।
গৌতমবাবু বললেন, “সেটাই তো আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি। এই এসএমএস আমি করিনি। করার প্রশ্নই ওঠে না। এদিকে সুজয় পেমেন্ট রিসিভ করেছে। দোষ নেই ওর। এসএমএস সেন্ডারে আমার নাম, নম্বর। ক্লায়েন্ট ওর সামনে থেকে চলে যাওয়ার পর আমাকে ফোন করে জানতে চায়, কেন কমালাম টাকাটা। খুব পোলাইটভাবেই জিজ্ঞেস করেছিল। পাছে কিছু মনে করি। মালিক হিসেবে ছোট একটা ডিসিশন নিতেই পারি আমি। সুজয়ের কথা শুনে আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম! পেমেন্ট নিয়ে টালবাহানাটা ক্লায়েন্ট আর আমরা তিন পার্টনার ছাড়া বাইরের কেউ জানে না। এসএমএস গিয়েছে আমার ফোন থেকে, অর্থাৎ আমি দোষী। কোম্পানির পঞ্চাশ হাজার টাকা লস। সব শুনে সুজয় বলল, আপনার সঙ্গে দেখা করতে।”
“হুম!” শব্দ করে খানিকক্ষণ নীরব থাকলেন দীপকাকু। একটু পরে জানতে চাইলেন, “সেলফোনটা কোন কোন সময় আপনি কাছছাড়া করেন?”
“বাড়িতে বাথরুমে যাওয়ার সময়। রাতে ঘুমোতে গেলে বালিশের পাশেই থাকে। বাড়ির লোক আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলায় না।”
“জানি। কাল আপনার ফ্যামিলি মেম্বারদের সঙ্গে কথা বলে আমার সেরকমই মনে হয়েছে।” বলে, আবার চুপ করে গেলেন দীপকাকু।
এবার বাবা জানতে চাইলেন, “ফোনসেট আপনি সবসময় পকেটেই রাখেন?’ বাবার সঙ্গে গৌতমবাবুর এখনও আলাপ হয়নি। উত্তর দেবেন কিনা ভাবছেন। দু’জনের মধ্যে পরিচয় করিয়ে দিলেন দীপকাকু। নমস্কার বিনিময়ের পর গৌতমবাবু বললেন, “জেনারেলি পকেটেই থাকে। যখন মিটিংয়ে থাকি, সাইলেন্ট মোড করে সেটটা রাখি টেবিলে, চোখের সামনে।”
“কাল কতবার এরকম রাখতে হয়েছে?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।
“দু’বার। আপনারা চলে যাওয়ার পর তিন বন্ধু মিটিংয়ে বসেছিলাম। সেকেন্ড মিটিং কফিশপে, লোটাস আর আর্টলাইন-এর মালিকের সঙ্গে।”
“ওদের সঙ্গে মিটিংয়ে বসেছিলেন কেন? ওরা তো শত্রুতা করছে!”
“আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যদি ব্যাপারটা সামলানো যায়।”
“বাকি দুই কোম্পানির মালিককে ডাকেননি কেন? চিত্রা, রূপরেখা?”
“রূপরেখার মালিক তালুকদার মোটেই সুবিধের নয়, আপসে যাবেই না। আমাদের এজেন্সির উপর ভীষণ রাগ। ওর অনেক ক্লায়েন্ট আমাদের কাছে চলে এসেছে। সেটা অবশ্য আমাদের কাজের কোয়ালিটি দেখেই।”
“আর চিত্রার মালিক?”
“অজিত আমাদের স্কুলবেলার বন্ধু। ও তো বলেই দিয়েছে, আর কখনও কোনও কনসেপ্ট অসৎপথে কিনবে না। অ্যাকচুয়ালি অজিতের এজেন্সিটা পুরোপুরি শখের। ওকে নিয়ে আমাদের চিন্তা নেই।”
ঘরের চারজনই এখন চুপ। ঝিনুকের হঠাৎ চোখ পড়ে, মা ট্রে নিয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। উঠে গিয়ে চায়ের ট্রে নেয় ঝিনুক। সেন্টার টেবিলে এনে রাখে। ঝিনুক চা খায় না। বড়রা যে যাঁর কাপ তুলে নিয়েছেন। কাপে চুমুক দিয়ে দীপকাকু বলে ওঠেন, “আমি আপনাদের কেসটা ছেড়ে দিচ্ছি।”
সিদ্ধান্তটা এত আকস্মিক, বাবার কাপ থেকে চা চলকে পাঞ্জাবিতে পড়ে গেল। গৌতমবাবুও ভীষণ অবাক হয়েছেন। অসহায় কণ্ঠে জানতে চান, “হঠাৎ এরকম ডিসিশন নেওয়ার কারণ?”
গলাটা একটু ঝেড়ে নিয়ে দীপকাকু বলতে থাকেন, “তদন্তের ভার আমার উপর দিয়ে খুব একটা নিশ্চিন্ত হননি আপনারা। তাই শত্রুপক্ষের সঙ্গে আপস রফায় বসছেন। এতে আমার তদন্তের ক্ষতি হচ্ছে। আমি সেই কেস নিই না, যেখানে ক্লায়েন্ট আমার উপর সম্পূর্ণ ভরসা করতে পারে না।”
গৌতমবাবু ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছেন। বলতে থাকেন, “সরি, এক্সট্রিমলি সরি। আমরা ব্যাপারটা এত খতিয়ে ভাবিনি। দোষ আমাদের। আর এরকম হবে না। আপনি প্লিজ কেসটা ছাড়বেন না।”
দীপকাকুকে ভজানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন গৌতমবাবু। দীপকাকু একই রকম গম্ভীর। ঝিনুকের টেনশন বাড়ছে, যদি সত্যিই তদন্তের ভার ছেড়ে দেন, অনেক কিছু অজানা থেকে যাবে। খুবই ইন্টারেস্টিং পর্যায়ে এসে গিয়েছে কেসটা।
নীরবতা ভেঙে দীপকাকু বলে ওঠেন, “খুব মন দিয়ে ভাবুন তো, কাল কোন কোন সময় ফোনসেটটা আপনার একদম চোখের বাইরে ছিল।”
ঘরের বাকি তিনজন চনমনে হয়ে ওঠেন। কেস তার মানে ছাড়েননি দীপকাকু! ঝিনুক মনে মনে বলে, রহস্য তেমন জম্পেশ হলে প্রকৃত গোয়েন্দার কাছে মান-অভিমান সব তুচ্ছ হয়ে যায়।
গৌতমবাবু চোখ বন্ধ করেছেন। দীপকাকুর নির্দেশমতো মন দিয়ে ভাবছেন। একটু পরে চোখ খুলে বললেন, “যতদূর মনে পড়ছে বলছি। দুটো মিটিংয়ে আমি একবার করে টয়লেটে যাই। ফোনসেট পড়েছিল টেবিলে। অফিস থেকে বেরিয়ে অজিতের চেম্বারে গিয়েছিলাম ব্লাডপ্রেশার চেক করাতে। প্রত্যেক মাসে একবার যাই। বুকপকেট থেকে সেলফোন সমেত কাগজ, পেন অজিতের টেবিলে রেখে পাশের বেডে শুয়েছিলাম।”
“প্রেশার মাপা হবে হাতে, বুকপকেট খালি করতে হল কেন?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।
“স্টেথো দিয়ে বুক, পিঠ পরীক্ষা করে তো, অসুবিধে হবে বলে জিনিসগুলো বাইরে রেখেছিলাম।”
“ফাইন! তারপর বলুন।” বললেন দীপকাকু
গৌতমবাবু বলতে থাকেন, “চেম্বার হয়ে আমি গিয়েছিলাম একটা সেলুনে। আমাদের পাড়ার সেলুন। চুল কেটে মাথা ম্যাসাজ করে দিয়েছিল সনাতন। সেই সময় মিনিট দশকের মতো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বাড়ি ফিরে স্নান করি। ফোনসেট ছিল লিভিংরুমে। ঘুমোতে যাই অন্যান্য দিনের মতোই বালিশের পাশে ফোন নিয়ে।”
এতক্ষণ ভ্রু কুঁচকে সব কথা শুনলেন দীপকাকু। ভ্রু-জোড়ার পজিশন একই জায়গায় রয়ে গেল। বললেন, “তা হলে যা দেখা যাচ্ছে, অনেকেরই সুযোগ ছিল আপনার ফোন থেকে এসএমএস করার। অথচ আপনি অবাক হচ্ছিলেন, কী করে আপনার ফোন থেকে মেসেজটা গেল!”
মৃদু প্রতিবাদের সুরে গৌতমবাবু বললেন, “সে না হয় মানলাম। কিন্তু কথা হচ্ছে, যাদের যাদের সামনে ফোনসেট রেখে গিয়েছিলাম, তারা কী করে বাকি-থাকা পেমেন্টের কথাটা জানবে?”
“জানতেই পারে! আপনাদের কাছে ডিউ রাখা কাস্টমার হয়তো তলে তলে অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে।”
দীপকাকুর কথাটা ফেলে দিতে পারলেন না গৌতমবাবু। কী একটু চিন্তা করে নিয়ে বললেন, “আপনার কী মনে হয়, কোনও একজন নয়, কয়েকজন মিলে আমাদের কোম্পানির এগেনস্টে ষড়যন্ত্র করছে?”
“এখনই ঠিক বলা যাচ্ছে না। তবে এটুকু বোঝা যাচ্ছে, আপনি যাদের সামনে ফোনসেট রেখে গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে কেউ একজন এসএমএস-টা পাঠায়। অবশ্য আমি কিন্তু আপনাকেও সন্দেহের বাইরে রাখছি না।”
“আমি!” চমকে উঠে বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন গৌতমবাবু।
“হ্যাঁ, আপনি। কেননা, আপনারাই বলেছেন, তিন পার্টনারের মধ্যে একজন অপরাধী।”
ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি এনে গৌতমবাবু বললেন, “আমাকে দেখে কি আপনার এতই বোকা মনে হয়? নিজের সেলফোন থেকে মেসেজ পাঠিয়ে নিজেকে ধরা দিয়ে দেব!”
“এটাই হয়তো আপনার চালাকি। এত বোকামি আপনাকে মানায় না। তিন বন্ধুর মধ্যে থেকে সন্দেহের বাইরে চলে গেলেন আপনি।”
দীপকাকুর অ্যানালিসিস পছন্দ হয়নি গৌতমবাবুর। না হওয়ারই কথা। গোঁজ
মেরে বসে আছেন।
সান্ত্বনার ঢঙে দীপকাকু বললেন, “দেখুন, আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমাদের কাজের প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে, পাত্রপাত্রী নির্বিশেষে সন্দেহ করা। আমি আমার ডিউটি করছি মাত্র।”
বড় করে শ্বাস ছেড়ে গৌতমবাবু বললেন, “যা যা ঘটেছে, সব কিছু বলে, আমি আমার কাছে সৎ থাকলাম। এবার আপনার কাজ আপনি করুন। এখন উঠি।”
“আমরাও উঠব।” বললেন দীপকাকু।
“কোথায় যাবেন? আমার সঙ্গে গাড়ি আছে। লিফ্ট দিতে পারি।’
“নো, থ্যাঙ্কস। আমার বাইক আছে। অনেক জায়গায় ঘুরতে হবে। প্রথমে যাব আপনাদের ডাক্তার-বন্ধুর চেম্বারে। আজকের কাজ ওখানেই শেষ হয়ে যেত। আপনি যে ঘটনা নিয়ে এলেন, এখন লোটাস আর আর্টলাইনের মালিকের সঙ্গেও দেখা করতে হবে। তারপর যাব আপনার পাড়ার সেলুনে।”
কথার পিঠে গৌতমবাবু বললেন, “সনাতনকে আপনি সন্দেহের বাইরে রাখতে পারেন। ও ব্যাটা লেখাপড়াই জানে না, এসএমএস করবে কী করে?”
“সনাতনকে না হয় সন্দেহের বাইরে রাখলাম, আপনার পাশের সিটে যে লোকটা চুল কাটাচ্ছিল, সেও তো…”
দীপকাকু কথা শেষ করেননি, গৌতমবাবুর চোখে-মুখে চকিতে ভয় খেলে গেল। যেন এখনও বসে আছেন সেলুনে! বললেন, “শত্রু কি তা হলে আমাদের ছায়া অনুসরণ করছে?”
“হতেও পারে।” বলে গম্ভীর হয়ে গেলেন দীপকাকু।
ঝিনুক পায়ে পায়ে ভিতর-বাড়িতে যায়। বেরনোর আগে সামান্য প্ৰসাধন সেরে নিতে হবে। জিন্স, টপ অনেক আগে থেকে পরা আছে।
.
আলিপুরে ঢুকে বাইক থামিয়ে দিলেন দীপকাকু। অবাক হয় ঝিনুক। দীপকাকু বলেন, “নেমে যাও।”
সিট থেকে নেমে আসতে আসতে ঝিনুক জানতে চায়, “গাড়ির কোনও প্রবলেম?”
লুকিং গ্লাসে চোখ রেখে দীপকাকু বলেন, “পিছনে যে মিনিবাসটা আসছে, উঠে পড়বে। বলবে, সেন্ট জোসেফ স্কুল যাব। স্কুলের উলটো দিকের গলিতে ‘রিপোজ অন’ নার্সিংহোম। আমি ভিতরে ডা. অজিত রায়ের সঙ্গে কথা বলব। তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে বাইকটা লক্ষ রাখবে। কেউ চিরকুট রাখতে এলে হাতনাতে ধরবে।”
দ্রুত কথা শেষ করে বাইক স্টার্ট দিলেন দীপকাকু। মিনিবাস এসে পড়েছে সামনে। হাত দেখিয়ে দাঁড় করায় ঝিনুক, উঠে পড়ে।
দীপকাকুর কথামতো ঝিনুক পৌঁছে গিয়েছে নার্সিংহোমের সামনে। দাঁড়িয়ে আছে উলটো দিকের ফুটপাতে পার্ক করা গাড়ির আড়ালে। এত নিখুঁত পথনির্দেশ দিয়েছেন দীপকাকু, মনে হচ্ছে ঘুরে গিয়েছেন একবার। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে নার্সিংহোমের বিশাল গেট। খোলাই আছে গেটটা। সামনে টুলের উপর বসে আছে সিকিউরিটির লোক। ভিতরের কোর্ট ইয়ার্ড বেশ বড়, ইতস্তত গাড়ি, যার মধ্যে দীপকাকুর লাল বাইকটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
এই ফুটপাতে লোক চলাচল কম। হঠাৎ কোনও পথচারীকে দেখলে ঝিনুক এমন ভঙ্গিতে সামনের ব্যালিনো গাড়িতে ঠেস দিচ্ছে, যেন নিজের গাড়ি! ড্রাইভার আশপাশে কোথাও গিয়েছে।
চোখে সানগ্লাসটা পরে নিয়েছে ঝিনুক। চশমাটা হ্যান্ডব্যাগেই থাকে। দীপকাকুর সামনে পরে না। বড়দের সামনে সানগ্লাস পরাটাকে ঔদ্ধত্য দেখানো মনে হয়। এখন পরেছে নিজেকে লুকোতে। চিরকুট রাখে যে লোকটা, ঝিনুককে অবশ্যই চেনে। সানগ্লাসে যদি একটু অপরিচিত থাকা যায়।
রিস্ট উলটে ঘড়ি দ্যাখে ঝিনুক, দশ মিনিটও হয়নি দাঁড়িয়ে আছে, মনে হচ্ছে একঘণ্টা। এখন ভিজিটিং আওয়ার্স নয়। নার্সিংহোমের গেটে মানুষের আনাগোনা নেই। দুটো গাড়ি ঢুকেছে মাত্র।
নার্সিংহোমের বাড়িটা ভাল করে নজর করে ঝিনুক। উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা তিনতলা বিশাল বাড়ি। সবটা জুড়ে নার্সিংহোম হয়তো নয়, বাড়ি লাগোয়া গলিতে আর-একটা গেট আছে। ডাক্তারবাবুর রেসিডেন্স মনে হয় ওটাই। ওঁর অ্যাড এজেন্সি চিত্রা কি এখানেই? ভাবতে ভাবতে ঝিনুকের দৃষ্টি থমকায় নার্সিংহোমের গেটে। জিন্স, ঢোলা সাদা জামা পরা একটা লোক গটগট করে হেঁটে যাচ্ছে। সিকিউরিটি ম্যান তার দিকে ফিরেও তাকাল না।
ঝিনুক সতর্ক হয়। গাড়ির আড়াল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় আসে। হ্যাঁ, যা আশঙ্কা করেছিল তাই। লোকটা এগিয়ে যাচ্ছে দীপকাকুর বাইক লক্ষ্য করে।
হরিণ পায়ে রাস্তা ক্রস করে ঝিনুক। দীপকাকুর বাইকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল লোকটা। আশপাশটা একবার দেখল। ঝিনুক স্টেপ বাই স্টেপ এগোতে থাকে। যখনই লোকটা ঝুঁকেছে বাইকের উপর, প্রচণ্ড স্পিডে দৌড়ে ঝিনুক ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকটার উপর। শার্টের কলার ঝিনুকের মুঠিতে, এক হ্যাঁচকায় লোকটাকে মাটিতে ফেলে দেয় ঝিনুক।
ভীষণ হতভম্ব হয়ে গিয়েছে মানুষটা। হাতে কীসব কাগজপত্তর ছিল, ছড়িয়েছিটিয়ে একশা। লোকটা এতটাই অবাক হয়েছে, মুখ থেকে কথা বেরচ্ছে না। নয়-নয় করে পঁচাত্তর কেজি তো হবেই। এই পুঁচকে মেয়েটা কী করে তাকে ধরাশায়ী করে দিল!
লোকটার সামনে দাঁড়িয়ে বড় নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে ঝিনুক জিজ্ঞেস করে, “কী করছিলেন গাড়ির সামনে?”
“কিছু না। হ্যান্ডবিল দিচ্ছিলাম।”
‘হ্যান্ডবিল’ কথাটা রিপিট করে একটু থমকায় ঝিনুক। লোকটার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা কাগজগুলো লক্ষ করে দ্যাখে, সত্যিই কোনও বিজ্ঞাপনের লিফলেট কি না। কীসের অ্যাড, এত দূর থেকে বোঝা যাচ্ছে না।
লোকটা বসেই আছে ঘাস-ধুলোর উপর। ঝিনুক বোঝে, মস্ত ভুল হয়ে গিয়েছে তার। চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পায়, আশপাশ থেকে জনাকয়েক এগিয়ে আসছে অকুস্থলে। মেজাজ বজায় রাখে ঝিনুক, “এত গাড়ি থাকতে আপনি বেছে বেছে আমাদের বাইকে কাগজটা রাখতে আসছিলেন কেন?”
নিরীহ কণ্ঠে লোকটা বলে, “অন্য গাড়িতেও রাখতাম।”
সিকিউরিটি গার্ড ঝিনুকের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। জিজ্ঞেস করে, “কী হয়েছে দিদিমণি?”
ঝিনুক কিছু বলতে যাবে, সামনে এসে দাঁড়ানো সাদা শাড়ির নার্স বলে উঠলেন, “তুমি হঠাৎ ওকে মারতে শুরু করলে কেন?”
বিস্মিত গলায় ঝিনুক বলে, “আমি মারলাম কখন?”
পাশের আর-একটি লোক বলে উঠল, “মারার চেয়ে কী কম করেছ তুমি?”
গার্ড আবার জিজ্ঞেস করে, “আপনার কি কোনও পেশেন্ট আছে এখানে?”
“না।”
“তা হলে এখানে কী করছ তুমি?” জানতে চাইলেন নার্স।
ঝিনুক এবার একটু নার্ভাস ফিল করে। কী উত্তর দেবে ঠিক করে উঠতে পারছে না। নার্সের প্রশ্ন চলে যায় গার্ডের মুখে, “বলুন, এখানে কেন এসেছেন?”
“আমি, মানে আমার কাকা…” বলতে বলতেই ঝিনুক দ্যাখে, দীপকাকু নেমে আসছেন বারান্দার সিঁড়ি বেয়ে।
ধড়ে প্রাণ এল। ডাক্তারবাবুর সঙ্গে কথায় যতই ব্যস্ত থাকুন, কান ছিল বাইরে। অর্থাৎ খেয়াল ছিল ঝিনুকের প্রতি। জটলার কাছে এসে দীপকাকু জানতে চান ঘটনাটা। উপস্থিত লোকজন যে-যার নিজের মতো বলতে থাকে। ঝিনুকের কপালটা ভাল, হেনস্তা হওয়া লোকটা গোবেচারা প্রকৃতির। মাঠ থেকে উঠে ছড়িয়ে থাকা লিফলেটগুলো কুড়িয়ে নিচ্ছে।
দীপকাকু আপাতত সাফাই দিচ্ছেন ঝিনুকের হয়ে, “আসলে ক’দিন আগে আমার বাইকের কিছু ক্ষতি করে একটা অজানা লোক। বাইকটা আমার ভাইঝির খুব প্রিয়। ও ভেবেছিল, আজও হয়তো ওরকম কিছু একটা ঘটতে চলেছে।”
প্রতিবাদীরা মোটামুটি কনভিন্সড। ফিরে যাচ্ছে যে-যার কাজে। দীপকাকু এগিয়ে যান হ্যান্ডবিলওলার কাছে। পিঠে হাত রাখেন। ঝোঁকা অবস্থা থেকে চমকে সোজা হয় লোকটা। হাত থেকে খসে যায় দুটো-একটা লিফলেট। দীপকাকু বলেন, “আমি খুবই দুঃখিত। কিছু মনে করবেন না। ছেলেমানুষি বুদ্ধিতে একটা কাণ্ড করে বসেছে।”
“না, না, ঠিক আছে। আমি কিছু মনে করিনি।” বলে লোকটা মানে মানে কেটে পড়ে। ঝিনুক গোপনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।
দীপকাকু পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটা লিফলেট কুড়িয়ে নিয়েছেন। দেখছেন, কীসের বিজ্ঞাপন। ঝিনুক সামনে গিয়ে বেশ অবাক হয়, দীপকাকু লিফলেটটা ধরেছেন উলটো, দেখছেন খুঁটিয়ে। কারণটা জিজ্ঞেস করতে যাবে ঝিনুক, দীপকাকু বললেন, “তোমার হ্যান্ডব্যাগটা খোলো তো।”
এসময় কোনও প্রশ্ন করা যাবে না। বিরক্ত হবেন। ব্যাগ খুলে সামনে দাঁড়ায় ঝিনুক। খুবই সন্তর্পণে কাগজটা ব্যাগের ভিতর রাখেন দীপকাকু। ঝিনুক ইতিমধ্যে দেখে নিয়েছে, কম্পিউটার কোম্পানির বিজ্ঞাপন আছে ওতে। দীপকাকু বললেন, “লিফলেটটা ওইভাবেই থাক, হাতটাত দিয়ো না। ফরেনসিক টেস্ট করতে হবে।”
“কেন?”
“লোকটার পরনে জিন্স। বয়স চল্লিশ। গোঁফ আছে। চশমা নেই।”
চকিতে ঝিনুকের মনে পড়ে যায় রেস্তরাঁর বয়ের দেওয়া বর্ণনা, এরকমই একটা লোক তাকে চিরকুট দিয়ে ঝিনুকদের টেবিলে পাঠিয়েছিল। ঝিনুক বলে ওঠে, “হাতের নাগালে পেয়েও লোকটাকে ছেড়ে দিলেন!”
“চেহারা, বয়সটাই শুধু মিলছে। একই লোক কিনা প্রমাণ করতে গেলে গ্লাসের হ্যান্ডপ্রিন্ট আর লিফলেটে লাগা ধুলোর হাতছাপ মেলাতে হবে।”
“লোকটাকে সার্চ করলে হয়তো হুমকির চিঠি পাওয়া যেত।” আপশোসের সুরে বলে ঝিনুক।
“হুমকির চিরকুট দিতে এসে আইওয়াশের জন্য যে হ্যান্ডবিল সঙ্গে রাখে, সে অত বোকা নয়। চিঠি ঠিক সরিয়ে দেবে, গিলেও নিতে পারে।” বলে, দীপকাকু হাঁটতে থাকেন বারান্দার দিকে। অনুসরণ করে ঝিনুক।
.
মিটিংয়ের মাঝপথ থেকে উঠে গিয়েছিলেন দীপকাকু। চেম্বারে ঢুকতেই ডাক্তারবাবু কপাল কুঁচকে জানতে চান, “কী হয়েছিল বাইরে?”
“তেমন কিছু না। আপনি বলুন।” বলে, চেয়ারে বসলেন দীপকাকু।
ডা. অজিত রায় তাকিয়ে আছেন ঝিনুকের দিকে। দীপকাকুর খেয়াল হয়, ঝিনুকের পরিচয় দেওয়া হয়নি। বলেন, “ও হচ্ছে আমার ভাইঝি। আমাকে অ্যাসিস্ট করে।”
সৌম্যদর্শন মানুষটি ঝিনুককে নমস্কার করে বলেন, “আপনি বসুন।”
লজ্জা পায় ঝিনুক। তবে মানুষটি যে প্রকৃত ভদ্র এবং অভিজাত, বুঝতে অসুবিধে হয় না। ডা. রায় বলতে থাকেন, “লোকটা ফোনে আমাকে বলল, ড্রয়িং, ক্যাপশনসুদ্ধ লে-আউটটা দেশপ্রিয় পার্কের একটা গাছের তলায় রাখবে। আমি পঞ্চাশ হাজার টাকার ব্যাগটা সেখানে রেখে লে-আউট নেব। তারপর হাঁটা দেব সোজা, পিছন ফিরে দেখব না।”
“আপনি তাই করলেন?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।
“করলাম।”
“কেন করলেন? এটা তো একটা অন্যায় কাজ।”
“জানি। কিন্তু তখন মনে হয়নি কতটা গুরুতর অন্যায়। কম্পিটিশনের খাতিরে বিজনেসে টুকটাক আনফেয়ার কাজ অনেকেই করে। সেটা যে আমার বাল্যবন্ধুদের সঙ্গে করছি, জানতাম না। অ্যাডটা পাবলিশ হওয়ার পর সুজয়রা যখন আমাকে জানাল, ওটা ওদের অ্যাপ্রুভ করা অ্যাডকপি, শুনে আমার মাথায় হাত, সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি। ঠিক করেছি, আর কখনওই ওইভাবে কোনও প্ল্যান কিনব না।
“লোকটা আর ফোন করেনি? মানে, আরও প্ল্যান কেনার জন্য?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।
“করেনি আবার? তারপর আরও দু’বার ফোন করে। পাত্তা দিইনি আমি।”
“ফোন নম্বরটা রেখেছেন?”
“রেখেছি। শেষবারের নম্বরটা। খোঁজ নিয়ে দেখেছি, নম্বরটা গড়িয়া অঞ্চলের একটা ফোন বুথের।”
“নম্বরটা আমাকে দিতে পারেন?”
“অবশ্যই পারি!” বলে, টেবিলের ডানপাশে কাগজপত্তর, ডায়েরি হাঁটকাতে লাগলেন ডা. রায়। তখনই ঝিনুকের চোখ আটকায় একটা ফোটোফ্রেমে। টেবিলের পাশে ওয়ালর্যাকের উপর রাখা আছে ফোটোটা। বছর সাত-আটের ফুটফুটে ছেলে। কী মিষ্টি হাসি! শুধু ক্লোজ-আপ। চোখ সরানো মুশকিল ফোটোটা থেকে। ঝিনুক জিজ্ঞেস করেই ফেলে, “ফোটোটা কার?”
ফোন নম্বর খুঁজতে খুঁজতে ডাক্তারবাবু বলেন, “আমার ছেলের।”
ডা. রায়ের বয়সের সঙ্গে ছেলের বয়স মানাচ্ছে না। ঝিনুক তাই বলে, “নিশ্চয়ই ছেলেবেলার ফোটো?”
“ওর বেলা আর বাড়েনি। ওই বয়সেই মারা গিয়েছে।”
ডা. রায়ের কথায় ভীষণ ধাক্কা লাগে ঝিনুকের। কষ্ট গুটলি পাকিয়ে উঠছে গলায়। দীপকাকুর দিকে চোখ যায়। উনিও চেয়ে আছেন ফোটোটার দিকে। নিষ্পলক।
ডা. রায় একটা ডায়েরিতে খুঁজে পেলেন বুথের নম্বরটা। ছোট প্যাডের পাতায় নম্বর লিখে দীপকাকুকে এগিয়ে দিলেন।
চোখ বুলিয়ে পকেটে রাখলেন দীপকাকু। বললেন, “আজ তা হলে আসি। অনেক অমূল্য সময় নষ্ট করলাম আপনার।”
“না, না। সময় কিছু নষ্ট হয়নি। সকালের পেশেন্ট দেখা আমার হয়ে গিয়েছে। আবার সেই বিকেলে। এখন রাউন্ড দেব নার্সিংহোমে।”
দীপকাকু উঠে দাঁড়িয়েছেন। হঠাৎ যেন কী মনে পড়ে তাঁর! বললেন, “ডাক্তারবাবু, আর-একটা প্রশ্ন।”
“বলুন না।”
“আপনার নার্সিংহোম তো ভালই চলে। তবুও এজেন্সির জন্য আপনি ওই অসৎ উপায়টা নিয়েছিলেন কেন?”
ম্লান হাসলেন ডা. রায়। বললেন, “ছেলে মারা যাওয়ার পর আমার স্ত্রী খুব একা হয়ে পড়েছিল। অ্যাডের কাজের প্রতি বরাবরই ন্যাক ছিল ওর। এজেন্সি খুলে দিলাম। কিন্তু কোনও কাজ পাচ্ছিল না। তখনই নানা উপায়ে ব্যাবসাটাকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছিলাম। এখন অবশ্য সে চিন্তাটা আর নেই। বিজনেস মোটামুটি স্টেডি।”
“থ্যাঙ্ক ইউ ডা. রায়।” বলে, হ্যান্ডশেক করলেন দীপকাকু।
ডাক্তারবাবু বললেন, “ওকে, যখনই দরকার পড়বে, আসবেন। আই অ্যাম অলওয়েজ অ্যাট ইয়োর সার্ভিস।”
ঝিনুক ডাক্তারবাবুকে বিদায়-নমস্কার করার সময় আর-একবার ছেলেটার ফোটোর দিকে তাকায়, কী জীবন্ত! যেন বলছে, ‘আবার এসো।’
.
মন খারাপটা থেকেই গেল ঝিনুকের। সাদার্ন অ্যাভিনিউ-এ লোটাস এজেন্সিতে ঢোকার আগে দীপকাকু সেটা খেয়াল করে বলেছিলেন, “কী ব্যাপার, মুখটা এমন ব্যাজার কেন? তোমার দুঃসাহসিক চেষ্টাটা মাঠে মারা গেল বলে!”
“কোনটা?” ভ্রু কুঁচকে জানতে চেয়েছিল ঝিনুক
“অপারেশন হ্যান্ডবিল। লোকটাকে ছেড়ে দেওয়ায় তুমি বোধহয় খুশি হওনি?”
রাগ হয়ে গিয়েছিল ঝিনুকের। কোনও উত্তর দেয়নি। যত বড়ই গোয়েন্দা হোন, দীপকাকুর মধ্যে আবেগ-অনুভূতিগুলো একটু কম। ডা. রায়ের নির্বিকার ভাবটাও ভাল লাগেনি ঝিনুকের। এদিকে ঝিনুক কিছুতেই ভুলতে পারছে না ছেলেটার মুখ। এত অল্পবয়সে কী করে মারা গেল! ওর মা নিশ্চয়ই ওকে ভুলতে পারেননি।
লোটাস এজেন্সিতে গিয়ে কোনও লাভ হল না। মালিক দেখাই করতে চাইলেন না দীপকাকুর সঙ্গে। কার্ড ফেরত দিয়ে রিসেপশনিস্ট বললেন, “আগামী এক সপ্তাহ আমাদের ডিরেক্টর খুব ব্যস্ত। তারপরে আপনি দেখা করুন। আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে নেবেন।”
ভদ্রভাবে অপমান করা হল এটা। গোমড়ামুখে বেরিয়ে এসেছিলেন দীপকাকু। পরের গন্তব্য আর্টলাইন এজেন্সি। তিনি আবার কেমন ব্যবহার করেন কে জানে!
ঝিনুকরা এখন যাচ্ছে বিডন রো ধরে কলেজ স্ট্রিটে। ওখানেই আর্টলাইনের অফিস। কলকাতার এদিকটা ঝিনুকের প্রায় আসাই হয় না। অথচ ওর দুই প্রিয় কলেজ-বন্ধু থাকে এখানে। মোটরবাইকের পিছনে বসে ফুটপাতে, বসতবাড়িতে চোখ বোলাচ্ছিল ঝিনুক, যদি ওদের হঠাৎ দেখা যায়। জানে, অবাস্তব আকাঙ্ক্ষা। তবুও..! একটা ব্যাপার খেয়াল হতে ঝিনুক হেসে ফেলে, যদি বাই এনি চান্স দেখা হয়েও যায় বন্ধুদের সঙ্গে, ঝিনুককে চিনতে পারবে না। মাথায় হেলমেট, চোখে কালো চশমা। যেন টিভি সিরিয়ালের ক্যারেক্টার। অবশ্যই রহস্য গল্পের।
দেড়শো নাকি দুশো বছরের পুরনো বাড়িতে আর্টলাইনের অফিস। চওড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকে ঝিনুকেরা। এই বাড়িতে যে পঞ্চাশটারও বেশি অফিস আছে, প্রমাণ মিলেছে সিঁড়িতে ওঠার মুখে লেটার বক্সগুলো দেখে। দেওয়ালেও সেইসব কোম্পানির বোর্ড লাগানো। বোঝাই যাচ্ছে, আর্টলাইন তেমন বড়সড় এজেন্সি নয়।
পুরো সেকেন্ড ফ্লোরটা আর্টলাইনের। ভিতরে ঢুকে ভালই লাগে ঝিনুকের। ইতিহাসের দিদিমণি টাইপের চেহারা রিসেপশনিস্টের। দরজা, জানলা, আসবাবপত্তর ইংরেজ আমলের এবং সবকিছুই নিট অ্যান্ড ক্লিন। সিলিং থেকে নেমে আসা লম্বা রডের হলুদ ফ্যানটাও চকচক করছে।
দীপকাকুর কার্ড নিয়ে ভিতরে গিয়েছিলেন রিসেপশনিস্ট। ফিরে এসে বললেন, “আপনারা যান। উনি অপেক্ষা করছেন।”
চেম্বারে ঢুকতেই চেয়ার ছেড়ে উঠে সম্ভাষণ জানালেন আর্টলাইনের মালিক রাজদীপ সরকার। ইয়ং এজ। পৈতৃক ব্যাবসা সামলাচ্ছেন মনে হয়। দীপকাকুকে বললেন, “বলুন, আপনাদের কোন কাজে লাগতে পারি আমি?”
মানুষটাকে বেশ খোলামেলা মনে হচ্ছে ঝিনুকের। চেম্বারটাতেও তাঁর মনের প্রতিফলন রয়েছে। ওঁর চেয়ারের পিছনে খোলা বিশাল জানলা। রোদ তেমন উজ্জ্বল নয়, দেখা যাচ্ছে পুরনো কলকাতার বাড়িঘর। আকাশটাকেও মনে হচ্ছে পুরনো দিনের।
এখানে আসার কারণটা গুছিয়ে বললেন দীপকাকু। এ-কথাও বলতে ভুললেন না, “ক’দিন আগে অ্যারোর গৌতম মজুমদারের সঙ্গে আপনার এবং লোটাসের মালিকের মিটিং হয়েছে। নিজেদের মধ্যে একটা অ্যাডজাস্টমেন্টে এসেছেন আপনারা। তবু আমাকে আসতে হল বিশেষ একটা প্রয়োজনে।”
“বলুন, প্লিজ।” রাজদীপ সরকারের মুখে আন্তরিক আগ্রহ।
দীপকাকু বললেন, “আমি শুধু জানতে চাই, অ্যারোর অ্যাড কপি আপনি কীভাবে সংগ্রহ করেছিলেন?”
“বিজনেস সিক্রেট আপনাকে কেন বলব?”
ভদ্রলোককে হঠাৎ বেঁকে যেতে দেখে অবাক হয় ঝিনুক। দীপকাকুও সঙ্গে সঙ্গে ট্যারা হয়ে গেলেন, “বললে ভাল করতেন। একটু দেরি হলেও, বের আমি করবই, কে সাপ্লাই দিচ্ছে প্ল্যান। তখন কিন্তু আপনিও আইনি ঝামেলায় জড়িয়ে যাবেন।”
মিটিমিটি হাসছেন রাজদীপ। বললেন, “আমি আপনাকে টেস্ট করছিলাম। দেখছিলাম, হেল্প করতে না চাইলে কেমনভাবে রি-অ্যাক্ট করেন আপনি। আসলে আমি কোনওদিনই বাস্তবের গোয়েন্দা দেখিনি। যা পড়েছি গল্প-উপন্যাসে।”
রাজদীপ এবার দৃষ্টি ঘোরালেন ঝিনুকের দিকে। উৎসাহী কণ্ঠে বললেন, “লেডি অ্যাসিস্ট্যান্ট দেখাটা আমার উপরি পাওনা। রেয়ার ব্যাপার। আপনার এই তদন্তের ইন ডিটেল নিশ্চয়ই উনি লিখে রাখছেন?”
“হ্যাঁ। সামনের কোনও একটা পুজোসংখ্যায় গল্পটা পাবেন।” গম্ভীরভাবে বললেন দীপকাকু।
রাজদীপ হো হো করে হেসে উঠলেন। ভাগ্যিস ধরতে পেরেছেন ঠাট্টাটা! এতক্ষণ এমনভাবে ঝিনুক আর দীপকাকুকে দেখছিলেন, যেন চিড়িয়াখানার খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন!
“প্লিজ, কাম টু দ্য পয়েন্ট। কে সাপ্লাই দিচ্ছে অ্যারোর আইডিয়া?” সিরিয়াস কণ্ঠে জানতে চাইলেন দীপকাকু।
নিজেকে ধাতস্থ করে রাজদীপ বললেন, “আইডিয়া পেয়েছি ফোনে।”
‘ফোনে তো আপনাকে কপি কালেক্ট করতে বলা হয়। কোথায় যেতে হয়েছিল, কত টাকা দিতে হয়েছে?”
দীপকাকুর প্রশ্নটা ঠিক যেন বুঝতে পারছেন না রাজদীপ! কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন, “কপি বা ডিজ়াইন কিছুই দেয়নি। যা বলার ফোনেই বলেছিল। টাকাপয়সাও কিছু চায়নি।”
“স্ট্রেঞ্জ!” বলে ওঠেন দীপকাকু। ঝিনুকও ভীষণ অবাক হয়েছে। ডা. রায় বলেছেন, টাকা দিয়ে লে-আউট কিনেছেন। রাজদীপ বলছেন, পয়সা লাগেনি। কেউ একজন মিথ্যে বলছেন নিশ্চয়। দীপকাকুর অবাক হওয়ার আসল কারণটা ধরতে পারলেন না রাজদীপ। বললেন, “আমিও খুব আশ্চর্য হয়েছিলাম জানেন। কোনও বিনিময় ছাড়া কেন কেউ এ-কাজটা করবে? পরে লোটাসের ডিরেক্টর রানার সঙ্গে কথা বলে জানলাম, ওর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।”
“রানাবাবু কি আপনার বন্ধু?” রাজদীপের কথার সুরে আন্দাজ করলেন দীপকাকু।
“হ্যাঁ। কলেজবেলা থেকে।”
“উনি কিন্তু আমাদের এড়িয়ে গিয়েছেন।”
“জানি। খানিক আগে ফোন করে বলেছে। ওর বক্তব্য, আমাদের সঙ্গে যখন অ্যারোর কথা হয়েছে, ফারদার ফোনে এরকম কোনও ইনফরমেশন এলে ওদের জানাব। তা হলে আবার কেন ডিটেকটিভ!”
তখনই কোনও উত্তর দিলেন না দীপকাকু। ভাবতে সময় নিলেন। একটু পরে বললেন, “আপনারা ছাড়াও তো দুটো এজেন্সি অ্যারোর প্ল্যান পেয়েছে। তালিকাটা বাড়তেও পারে। তাই আপনাদের সাহায্য নিয়ে সোর্সটাকে যদি এখনই না আইডেন্টিফাই….”
কথা কেড়ে নিয়ে রাজদীপ বললেন, “আচ্ছা মশাই, আপনি কি এখনও বুঝতে পারছেন না, সোর্স লুকিয়ে আছে ওই তিন পার্টনারের মধ্যেই। নিজেদের ভিতর কোনও ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে, শোধ নিতে বিশ্বাসভঙ্গ করছে একজন।”
“ফোনের গলা আপনি কি চিনতে পেরেছিলেন?”
“না। অন্য কাউকে দিয়ে ফোনটা করাতে পারে।”
“ফাইন! নম্বরটা আছে আপনার কাছে?”
“আছে।” বলে মোবাইলের বোতাম টিপতে লাগলেন রাজদীপ। এক সময় থেমে নম্বরটা বললেন।
চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন দীপকাকু। নমস্কারের ভঙ্গি করে বললেন, “আজ তা হলে উঠি। কো-অপারেট করার জন্য ধন্যবাদ।”
“সে কী মশাই, নম্বরটা তো আপনি লিখলেন না! মনে থাকবে এত বড় নম্বর?”
মুচকি হেসে দীপকাকু বললেন, “থাকবে।”
রাজদীপ সরকারের বিস্মিত দৃষ্টি পিছনে ফেলে বেরিয়ে এল ঝিনুকরা। ঝিনুক কিন্তু মোটেই অবাক হয়নি। তার কারণ এই নয় যে, দীপকাকুর স্মৃতি খুব প্রখর। অন্য একটা সূত্র আছে।
অফিসবাড়ির আলো-অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ঝিনুক দীপকাকুকে বলল, “ডা. রায়ের কাছে এই নম্বর থেকেই ফোন গিয়েছিল না?”
“গুড! মাথা তো ভালই কাজ করছে তোমার।”
উৎসাহ পেয়ে ঝিনুক আবার বলল, “কী করে ধরলাম বলুন তো? আমি ডা. রায়ের দেওয়া নম্বরটা কিন্তু দেখিইনি।”
“শুনেছিলে বুথের নম্বর। এটাও যেহেতু ফোন বুথের এবং দেখলে আমি নোট করলাম না, দুইয়ে-দুইয়ে চার করে নিলে।”
নিভে গেল ঝিনুকের উৎসাহ, দীপকাকুকে অবাক করে দেওয়া বড় কঠিন কাজ।
.
রাস্তায় ঝাঁ ঝাঁ করছে রোদ। ঘড়ি দ্যাখে ঝিনুক, প্রায় দেড়টা বাজে। খিদে খিদে পাচ্ছে। মোটরবাইক রাখা ছিল অফিস বিল্ডিং ঘেঁষে। দীপকাকু স্ট্যান্ড থেকে নামাচ্ছেন গাড়িটা। খাওয়ার কথাটা একটু ঘুরিয়ে তুলতে যায় ঝিনুক, “এবার আমরা নিশ্চয়ই যোধপুর পার্কের সেলুনে যাব?”
সিটে উঠতে গিয়ে থমকে গেলেন দীপকাকু। জিজ্ঞেস করলেন, “সেলুনে কেন যাব?”
“গৌতমবাবু ফোন রেখে যেখানে ঘুমিয়ে….”
কথার মাঝপথেই হেসে ফেললেন দীপকাকু। বাইকে উঠে বসে হেলমেট পরতে পরতে বললেন, “ওটা ওঁকে ঘাবড়ে দেওয়ার জন্য বলেছিলাম। উনি ঘুমিয়ে পড়লেও সেলুনের বাকি লোক তো জেগেছিল। ওঁর সামনে থেকে সেলফোন নিয়ে অন্য একজন বসে বসে মেসেজ পাঠাবে, কেউ লক্ষ করবে না, তা হয় নাকি?”
সত্যি তো, এদিকটা তার ভেবে দেখা উচিত ছিল! নিজের মাথাতেই ছোট্ট করে একটা চাঁটি মারতে ইচ্ছে করছে ঝিনুকের। দীপকাকু নিজে থেকেই বললেন, “আমরা এখন যাব গড়িয়ার সেই ফোন বুথে, যেখান থেকে ফোন করে আইডিয়া পাচার হয়েছে। তার আগে অবশ্য লাঞ্চ সেরে নেব ধর্মতলায়। তোমার খিদে পেয়েছে বোধহয়। শুকনো লাগছে মুখটা!”
নাঃ, লোকটাকে যতটা নীরস দেখতে লাগে, ততটা নয়, ততটা নয়, ফিলিংটিলিংগুলো আছে। লাজুক হাসি হেলমেটে ঢেকে ঝিনুক বাইকের পিছনে উঠে বসে।
