অদৃশ্য নজরদার – ৩

পরের দিন। দুপুর দুটো। পার্ক স্ট্রিটের একটা রেস্তরাঁয় বসে আছেন দীপকাকু আর ঝিনুক। এখন অবধি ঝিনুক জানে না, তারা কেন এসেছে এখানে। রেস্তরাঁয় ঢোকার আগে ঝিনুক সরল মনে বলেই ফেলেছিল, “এই তো বাড়ি থেকে লাঞ্চ করে বেরলাম, এখন আবার…”

“আমরা এখানে খেতে আসিনি। অন্য কাজে এসেছি।” গম্ভীর স্বরে বলেছেন দীপকাকু।

খুবই লজ্জায় পড়ে যায় ঝিনুক। অবশ্য টেবিলে এসে একদম শুকনো বসিয়ে রাখেননি দীপকাকু। দুটো মকটেল নিয়েছেন। স্ট্র-এ সিপ দিতে দিতে ঝিনুক চোখ বোলাচ্ছে ডাইনিং হলে। দামি হোটেলের গ্রাউন্ড ফ্লোর রেস্তরাঁ। নরম আলো। চড়া এসি। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে জনাপনেরো অ্যারিস্ট্রোক্র্যাট চেহারার মহিলা-পুরুষ চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছেন। কখনও সামান্য ফিসফিস। দু’জনকে দেখা যাচ্ছে, একা-একা বসে লাঞ্চ সারছেন। একজন আবার ম্যাগাজিন পড়তে পড়তে। ধরনটা যেন বাড়ির ডাইনিংয়ে বসে আছেন! রেগুলার আসেন মনে হয়। কিন্তু দীপকাকু কেন এখানে এলেন? সেটা এখনও বুঝে উঠতে পারছে না ঝিনুক। কারণ তো একটা নিশ্চয়ই আছে। দীপকাকুকে এক্ষুনি জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে না। অপারেশন চলাকালীন কৌতূহল দেখালে বিরক্ত হন দীপকাকু। কিছু যে একটা ঘটছে অথবা যে-কোনও মুহূর্তে ঘটতে পারে, দিব্যি টের পাচ্ছে ঝিনুক। দীপকাকুর চোখ-মুখের সতর্ক ভাব তারই আগাম ইঙ্গিত।

কাল অ্যারো কোম্পানি থেকে বেরিয়ে ঝিনুককে বাড়ি পৌঁছে দিতে এসে কিছুক্ষণ বসে গেলেন দীপকাকু। বাবা তখনও অফিসে বেরননি। অফিস যাওয়ার কোনও ফিক্সড টাইম নেই বাবার। কেসটা বেশ জটিল বলেই বাবার সঙ্গে কিছুটা আলোচনা করার ইচ্ছে ছিল দীপকাকুর। লাভ হয়নি। সব শুনে বাবা বলেছিলেন, “কেস ইজ ভেরি মাচ সিম্পল।”

“কীরকম?” জানতে চেয়েছিলেন দীপকাকু।

বাবা বলেন, “ওই পার্টনারদের মধ্যে যে-কোনও একজন ঘুমের মধ্যে কথা বলেন। তখনই তাঁর স্ত্রী অথবা ছেলেমেয়ে, নেক্সট অ্যাডের প্ল্যানটা শুনে নিয়ে বাইরে বিক্রি করে দিচ্ছেন।”

“অ্যাবসার্ড!” মন্তব্য করেছিলেন দীপকাকু।

কিন্তু ঝিনুকের মনে হয়েছিল, বাবার যুক্তি শুনতে জোক্স টাইপের লাগলে ও পুরোটা ফেলে দেওয়ার নয়।

যুক্তিটাকে নস্যাৎ করতে দীপকাকু বলেন, “একটা লোক ঘুমের ঘোরে হুবহু অ্যাড প্ল্যান বলে যাবে, এ হতেই পারে না! ঘুমন্ত মানুষের কথা অত্যন্ত অস্পষ্ট।” নিজের যুক্তির সপক্ষে বাবা একটা মরিয়া চেষ্টা চালান। বলেন, “তুমি হয়তো জানো না দীপঙ্কর, রিসেন্টলি জাপানে এমন একটা লোকের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, যে কিনা সারাদিনে যা কথা বলে, রাতে ঘুমনোর পর একই কথা রিপিট করে। ইন্টারনেট ঘাঁটলেই ইনফরমেশনটা পেয়ে যাবে তুমি।”

হতাশ হয়েছিল ঝিনুক। কিছুদিন ধরে কেন কী জানি, বাবা জাপান দেশটাকে খুব ফেভার করছেন। নিজের বানানো আশ্চর্য ঘটনার গৌরব চাপিয়ে দিচ্ছেন জাপানের উপর। দীপকাকুও ব্যাপারটা জানেন। তাই প্রসঙ্গটা নিয়ে গিয়েছিলেন অন্য খাতে। বলেছিলেন, “আমি ভেবেছিলাম, এই কেসটা শুধুই বুদ্ধির খেলা, ভদ্রস্থ ধরনের। কিন্তু বাইকে রেখে যাওয়া হুমকির চিঠিটা আমাকে ভাবাচ্ছে। কেসটার ভিতরে আরও অজানা রহস্য আছে। যেটা ইচ্ছে করেই আমাদের কাছে চেপে গিয়েছেন তিন পার্টনার।”

ওই সময় ঝিনুক একটা প্রশ্ন করে, “তিন বন্ধুর মধ্যে একজন অথবা দু’জন মিলে যদি অপরাধী হন, বাইকে চিঠি রাখতে বলার সময় পেলেন কখন? ওঁরা তো আপনার সঙ্গেই ছিলেন?”

“সময় পেয়েছেন। তিনজনকে ছেড়ে বাইকের কাছে পৌঁছতে আমার মিনিট তিন-চারেক লেগেছিল। ওইটুকু সময়ের মধ্যে সেলফোনে বাইরের কাউকে অর্ডার করে দেওয়া অসম্ভব নয়।”

প্রশ্নটা কোনও দিশা দিতে পারল না। দমে গিয়েছিল ঝিনুক। পরক্ষণেই চোখ পড়ে দীপকাকুর হাতের ব্রাউন প্যাকেটে। ওটার বিষয় তো কিছু জানা হয়নি। জিজ্ঞেস করেছিল, “প্যাকেটে কী নিলেন আপনি?”

দীপকাকু বলেছিলেন, “যে-সব অ্যাড চুরি গিয়েছে, আসল এবং নকলের ফোটোকপি করা সিডি, কিছু পেপার কাটিং। যারা নকল করেছে তাদের নাম-ঠিকানা, বিজনেস কেমন চলে, সেই সব তথ্য। এগুলো নিয়ে আজ রাতে বসব। ভাল করে স্টাডি করতে হবে।”

স্টাডি করে দীপকাকু কী পেলেন ঝিনুক জানে না। আজ দুপুর বারোটা নাগাদ ফোন এল দীপকাকুর, “তৈরি হয়ে নাও। আধঘণ্টার মধ্যে আসছি।”

ভাগ্যিস মা জোর করে ভাত খাওয়ালেন, না হলে শরবত খেয়েই লাঞ্চ সারতে হত ঝিনুককে। দীপকাকুকে অ্যাসিস্ট করার ব্যাপারে মা এখন আর খুব একটা আপত্তি করেন না। বুঝে গিয়েছেন, তাঁর মেয়ে আর-পাঁচটা মেয়ের চেয়ে আলাদা।

দীপকাকুর সেলফোন বাজছে। চাপা কিচকিচ শব্দ। আওয়াজটার মধ্যে সাসপেন্সের ভাব আছে। গোয়েন্দার সেলফোনে এরকম রিংটোনই মানায়।

ফোন কানে নিচু গলায় কথা বলছেন দীপকাকু। এই মুহূর্তে কোথায় আছেন বললেন। ওপারের কথা শুনে নিয়ে বললেন, “এগোচ্ছে।” তারপর দু’-একটা হুঁ-হাঁ। সব শেষে ঝিনুকদের বাড়ির ফোন নম্বর। বাবার সেলফোন নম্বর।

অবাক হয় ঝিনুক, ফোনটা সম্ভবত দীপকাকুর কোনও ক্লায়েন্টের। ঝিনুকদের নম্বর চাইছে কেন?

ঝিনুকের মুখ থেকে প্রশ্নটা পড়ে নিলেন দীপকাকু। ফোনটা বুকপকেটে রেখে বললেন, “সুজয়বাবুর ফোন। তদন্ত কেমন এগোচ্ছে খোঁজ নিলেন। নানান কথায় ভুলে গিয়ে রজতদার কন্ট্যাক্ট নম্বরটা নেওয়া হয়নি ওঁর, জেনে নিলেন।”

কথা শেষ করে একটু ঝুঁকে দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “দ্যাখো তো, আমার পিছনের ম্যাগাজিন পড়া লোকটার খাওয়া শেষ হল কি না?”

ওই লোকটাই তার মানে দীপকাকুর টার্গেট! দীপকাকুর কাঁধের উপর দিয়ে মানুষটাকে দ্যাখে ঝিনুক, ন্যাপকিনে মুখ মুছছেন। অস্ফুটে ঝিনুক বলে, “হয়ে গিয়েছে খাওয়া।”

দীপকাকু উঠে পড়েন চেয়ার ছেড়ে। ঝিনুককে বলেন, “তুমি এখানেই বসে থাকো। ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলে আসছি।”

লোকটার পরিচয়, দীপকাকুর কী প্রয়োজন তাঁর সঙ্গে, কিছুই জানে না ঝিনুক আন্দাজও করতে পারছে না। ভীষণ কৌতূহলে তাকিয়ে থাকে দীপকাকুর হেঁটে যাওয়ার দিকে।

টেবিলের সামনে গিয়ে ভদ্রলোককে সম্ভবত নিজের কার্ড দিলেন দীপকাকু উনি বেশ অবাক হয়েছেন, কার্ডটা পড়ে আরও বিস্মিত হলেন। দীপকাকুকে কী যেন বললেন! উত্তর দিলেন দীপকাকু। ঝিনুকের অস্বস্তি বাড়ে, এত দূরে বসে কথাবার্তা কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। তবে দু’জনের বডি ল্যাঙ্গোয়েজ দেখে আন্দাজ করা যাচ্ছে, আলাপপর্ব মোটেই সৌজন্যমূলক হচ্ছে না। ঝগড়ার ধরন চলে আসছে।

ঝিনুকের আন্দাজ মিলে গেল। ভদ্রলোক তেড়েফুঁড়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বেশ চিৎকার করেই বললেন, “আই অ্যাম নট বাউন্ড টু আনসার ইয়োর কোয়েশ্চেন!”

উত্তরে দীপকাকু কী বললেন শোনা গেল না।

লোকটা আরও খেপে গেল, “ডু হোয়াট ইউ ক্যান। প্রয়োজন মনে করলে কোর্টে যান। আমার পিছনে ঘুরে কী হবে?”

“আপনার নয়, আমি ঘুরছি কেসটার পিছনে। যেটা একদমই আপনার পছন্দ নয়, সেই কারণেই এই চিরকুটটা আপনি আমার বাইকে রেখে দেওয়ার বন্দোবস্ত করেন।”

দীপকাকুর কথা এখন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। পকেট থেকে বের করে দেখাচ্ছেন থ্রেটনিং দেওয়া সেই চিরকুট। ভদ্রলোক এমন ভাব করছেন, যেন চিনতেই পারছেন না লেখাটা! হাত বাড়িয়ে নিতে গেলেন। দীপকাকু সরিয়ে নিয়ে বললেন, “এটা নিয়ে আমি পুলিশের কাছে যাব।”

আগের মেজাজে ফিরে ভদ্রলোক বললেন, “যান, যেখানে খুশি যান। ইউ মে লিভ নাউ।”

ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়লেন ভদ্রলোক। যথেষ্ট বিধ্বস্ত লাগছে তাঁকে। এত তাড়াতাড়ি ধরা পড়ে যাবেন ভাবতে পারেননি। ওঁর মতো অতটা না হলেও ঝিনুকের খারাপ লাগে, কেসটা এত দ্রুত শেষ হয়ে যাক সে চায়নি।

দীপকাকু ফিরে এসেছেন চেয়ারে। কী যেন চিন্তা করছেন! কেস যখন সভ হয়েই গিয়েছে, ভাবার কী আছে এত? ঝিনুক জানতে চায়, “কে লোকটা?”

“রূপরেখার মালিক। পোস্টারিংয়ের কুকীর্তির জন্য যে দায়ী।’

“উনিই কি মেন কালপ্রিট? খবর বের করে নিচ্ছেন অ্যারো কোম্পানি থেকে?”

উত্তরে মাথা নাড়েন দীপকাকু। বলেন, “জানি না।”

ঝিনুক উৎসাহিত হয়, যাক, কেস তার মানে এখনও শেষ হয়নি! ফের প্রশ্ন করে, “কী বললেন ওঁকে, অত খেপে গেলেন কেন?”

“জানতে চাইলাম, কেন এই অপকর্মটা করেছেন? বলল, ‘দেওয়াল কোনও এজেন্সির ভাড়া করা নয়। আমি ওদের পোস্টারের উপর পোস্টার সাঁটিনি, দু’ইঞ্চি ছেড়ে সেঁটেছি। আপনার যদি কিছু করার থাকে কোর্টে যান।’ থামলেন দীপকাকু। একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “আসলে লোকটা জানে আইন-আদালত করে ওকে ফাঁসানো যাবে না। পারমিশন ছাড়া অন্যের দেওয়ালে পোস্টার সাঁটা বেআইনি। সেদিক থেকে দুটো এজেন্সি সমান দোষী।”

ঝিনুক বলে, “হুমকির চিঠিটা যে উনিই দিয়েছেন, কী করে শিয়োর হলেন আপনি?”

“শিয়োর নই। তবু চার্জ করে দেখলাম কোনও ক্লু বেরয় কিনা। বেরল না। এই কেসের সবচেয়ে মুশকিলের দিক হচ্ছে, কোনও ফাঁক পাচ্ছি না, যেখান থেকে তদন্ত শুরু করব। গোটা বিষয় তিন পার্টনারের মধ্যে আটকে আছে। সেই কারণেই আমি উলটো দিক থেকে তদন্তে ঢুকতে চাইছিলাম।”

“মানে?” জানতে চায় ঝিনুক।

“যারা অ্যারো এজেন্সির কনসেপ্ট হাতিয়ে কাজে লাগাচ্ছে, তাদের ইনভেস্টিগেট করা। কিন্তু যা দেখছি, মনে হচ্ছে অন্য এজেন্সিগুলো আমার সঙ্গে রূপরেখার মতোই ব্যবহার করবে।”

দীপকাকুকে বেশ হতাশ লাগছে। এই হতাশার খানিকটা হয়তো সদ্য অপমানিত হওয়ার কারণে। ঝিনুক রাগ-রাগ চোখে রূপরেখার মালিকের টেবিলের দিকে তাকায়, বিল মেটাচ্ছেন।

ঝিনুক দীপকাকুকে জিজ্ঞেস করে, “ভদ্রলোক যে এখানে লাঞ্চ করতে আসছেন, জানলেন কী করে?”

প্রশ্নটা করার পরই ঝিনুকের মনে হল, বেকার জিজ্ঞেস করল। দীপকাকু কত দ্রুত নানান সোর্স থেকে খবর জোগাড় করেন, ঝিনুক আগেও দেখেছে। তা ছাড়া সুজয়বাবু তাঁদের শত্রুপক্ষের সমস্ত ইনফরমেশন ব্রাউন প্যাকেটে করে দীপকাকুকে দিয়েছেন।

খানিক পরে উত্তর অবশ্য একটা এল। অন্যমনস্ক গলায় দীপকাকু বললেন, “রূপরেখার অফিসটা এই হোটেল থেকে পায়ে হেঁটে দু’মিনিটের পথ। মিস্টার তালুকদার রোজ এখানেই লাঞ্চ সারেন।”

ভদ্রলোকের নামটা মনে মনে নোট করে নেয় ঝিনুক। পরে ওর ডায়েরিতে লিখে নেবে। মিস্টার তালুকদার হেঁটে যাচ্ছেন দরজার দিকে। আচমকাই ঝিনুকদের দিকে তাকালেন। বেশ ভয় পাইয়ে দেওয়া চাউনি।

দীপকাকু লক্ষ করেননি, সেলফোন হাতে নিয়ে কাকে যেন ফোন করছেন! তালুকদার লোকটা কতটা মারাত্মক ঠিক আন্দাজ করা যাচ্ছে না। ঝিনুক আপাতত মন দেয় দীপকাকুর কথায়। ফোনে মনে হচ্ছে ফের সুজয়বাবুকেই ধরেছেন। তালুকদারের সঙ্গে বচসার বিবরণ দেওয়ার পর বললেন, “আপনাদের চার কম্পিটিটরের মধ্যে নরম মানুষ কে, যার সঙ্গে দুটো কথা বলা যায়?”

ওপ্রান্ত কী বলছেন শোনার উপায় নেই। এপ্রান্তে দীপকাকু বললেন, “নার্সিংহোম! পাব এখন?”

সুজয়বাবু ওপ্রান্তে কিছু বললেন, শুনে নিয়ে ফোন পকেটে পুরলেন দীপকাকু। বললেন, “চলো, যাওয়া যাক।”

“কোথায়?”

দীপকাকু বলতে যাচ্ছেন, রেস্তরাঁর বয় এসে দাঁড়াল, হাতে ভাঁজ করা ছোট কাগজ। ট্রে-তে আনেনি যখন, বিল নয় বোঝাই যাচ্ছে। চিরকুটটা দীপকাকুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “ওই টেবিলের বাবু আপনাকে দিতে বললেন।

“কোন বাবু?” জানতে চেয়ে কাগজটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন দীপকাকু। বয় যেদিকে আঙুল তুলেছে, সেখানে কেউ বসে নেই। টেবিলে শুধু একটা গ্লাস। বয় নিজেও ভীষণ অবাক। বলল, “এক্ষুনি তো আমায় দিলেন কাগজটা! কোথায় গেলেন?”

চিরকুটে একবার চোখ বুলিয়ে ঝিনুকের হাতে দিলেন দীপকাকু। বয়কে বললেন, “এসো তো আমার সঙ্গে।”

দীপকাকুকে অনুসরণ করতে করতে কাগজটা পড়ে নেয় ঝিনুক। আগের হুমকি চিঠির মতোই কম্পিউটারে বাংলায় লেখা— “এখনও বলছি কেসটা ছেড়ে দিন। ওরা যা দেবে তার ডবল দেব আমরা।”

এই ক’টা অক্ষরের মধ্যে অনেক প্রশ্ন উঠে আসছে। আগের চিঠিটা তুলনামূলক সোজাসাপটা ছিল। আপাতত লেখাটার দিকে মন না দিলেও চলবে, যে পাঠাল, তার খোঁজ আগে চাই। ঝিনুকরা পৌঁছে গিয়েছে নির্দিষ্ট টেবিলের সামনে। আধখাওয়া লস্যির গ্লাসটা প্রমাণ দিচ্ছে, একটু আগে এখানে কেউ বসেছিল।

“টয়লেটে যাননি তো?” বলল বয়।

গ্লাসের দিকে তাকিয়ে থেকে দীপকাকু বললেন, “ঝট করে একবার দেখে এসো তো।”

বয় চলে যেতে ঝিনুক জিজ্ঞেস করে, “লোকটা কি তালুকদারের?”

“চান্স কম। তালুকদারের সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়েছে দশ মিনিট হয়নি। এর মধ্যে কম্পিউটারে প্রিন্ট আউট বার করে হুমকি দেওয়া…” বলতে বলতে চিন্তার গভীরে তলিয়ে গেলেন দীপকাকু।

ঝিনুক বলল, “আপনি তো বলছিলেন, রূপরেখার অফিসটা এখান থেকে দু’মিনিটের পথ।”

কথাটা দীপকাকু শুনলেন কিনা বোঝা গেল না। দৃষ্টি গ্লাসের দিকে, মাথায় কী ঘুরছে কে জানে! বয় ফিরে এসেছে। বলল, “না, টয়লেটে নেই। লস্যির বিলটাও দিয়ে যায়নি।”

মুখ তুললেন দীপকাকু। বয়কে বললেন, “লোকটার চেহারাটা কেমন বলো তো?”

“বয়স স্যার, চল্লিশটল্লিশ হবে। জিন্স আর শার্ট পরেছিল।”

“গোঁফ? চশমা?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

“চশমা ছিল না, গোঁফ ছিল স্যার।”

“হিন্দিতে কথা বলছিল, না বাংলায়?” এটা জানতে চায় ঝিনুক।

বয় উত্তর দেওয়ার আগে দীপকাকু বললেন, “কলকাতার বাঙালিরা অনেকেই ভাল হিন্দি বলে। তাই কোন ভাষার লোক অত সহজে বোঝা যাবে না।”

টেবিল ঘিরে কিছু যে একটা ঘটছে, টের পেয়ে সুট-টাই পরা রেস্তরাঁর কর্তাব্যক্তি এগিয়ে এলেন, “মে আই হেল্প ইউ?”

ভদ্রলোককে আপাদমস্তক দেখে, দীপকাকু নিজের কার্ড বের করে তাঁর হাতে দিলেন। কার্ডটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রলোকের চেহারায় সম্ভ্রম মেশানো কৌতূহল দেখা দিল। জানতে চাইলেন, “আর ইউ লুকিং ফর সামথিং?”

ঘাড় উপর-নীচ করে উত্তর দিলেন দীপকাকু। ভদ্রলোক আবার বললেন, “ক্যান আই বি অ্যাট ইয়োর সার্ভিস?”

“হ্যাঁ, আমাকে একটা ব্যাপারে পারমিশন দিতে হবে।”

“বলুন স্যার!”

“এই গ্লাসটা আমি নিয়ে যাব।”

“ওহ্ শিয়োর!” বলে ভদ্রলোক নিজেই লস্যির গ্লাসটা তুলতে যাচ্ছিলেন, দীপকাকু বাধা দিলেন। বললেন, “দাঁড়ান, হাত দেবেন না, একটা বক্স নিয়ে আসুন।”

তড়িঘড়ি পায়ে ম্যানেজার ছুটলেন বক্স আনতে।

.

রেস্তরাঁর বাইরে এসেছেন ঝিনুক, দীপকাকু। পার্ক স্ট্রিট এখন মোটামুটি ফাঁকা। রাস্তায় চড়া রোদ, ছায়ার জ্যামিতিক ডিজ়াইন।

ম্যানেজারের দেওয়া বক্সটা দীপকাকু নিয়েছেন ক্যারিব্যাগে। বক্সের মধ্যে আছে গ্লাসটা। হ্যান্ডপ্রিন্ট নেওয়ার জন্য কত সতর্কভাবে জিনিসটা প্যাক করতে হয়, এই প্রথম দেখল ঝিনুক। প্রথমে গ্লাসের উপরের অংশটুকু ধরে লস্যি আর স্ট্র বাস্কেটে ফেললেন দীপকাকু। ম্যানেজারের নিয়ে আসা বক্সটার নীচে টিস্যু পেপারের প্যাক দিলেন, গ্লাসটা আলতো করে রেখে, উপরে দিলেন আর-একটা প্যাক। বক্সের ঢাকা বন্ধ করলেন। গ্লাসের বডিতে অন্য কোনও ছাপ লাগার চান্স রইল না।

ক্যারিব্যাগটার দিকে তাকিয়ে হাঁটছিল ঝিনুক। দাঁড়িয়ে গেলেন দীপকাকু। বললেন, “তুমি ট্যাক্সি নিয়ে বাড়ি চলে যাও।”

“কেন?”

“আমাকে এখন ফরেনসিক ল্যাবে যেতে হবে। হাতের ছাপটা নিয়ে রাখা ভাল। লোকটার সঙ্গে আবার আমাদের দেখা হবে।”

এখনই বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে না ঝিনুকের। হঠাৎ মনে পড়ে যায় একটা কথা। বলে ওঠে, “আপনি যে কোথায় একটা যাওয়ার কথা বলছিলেন তখন? নার্সিংহোম…”

দীপকাকু যেন একটু অন্যমনস্ক। বললেন, “সেটা কাল গেলেও চলবে।”

“কোন নার্সিংহোম?” জানতে চায় ঝিনুক।

“‘রিপোজ অন’, নিউ আলিপুরে। সুজয়বাবুর ডাক্তার-বন্ধু অজিত রায়ের নার্সিংহোম।”

বাকিটা দীপকাকুকে না বললেও চলবে। ঝিনুক আগের তথ্য অনুযায়ী জানে, অজিতবাবুর একটা অ্যাড এজেন্সি আছে, নাম ‘চিত্রা’। উনি একবার অজান্তে অ্যারোর বিজ্ঞাপন কপি করেছিলেন।

পার্কিং লটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে দীপকাকু স্বগতোক্তির ঢঙে বলতে লাগলেন, “সুজয়বাবু তো বললেন, তাঁর এই ডাক্তার-বন্ধুটির ব্যবহার ভাল। কার থেকে, কীভাবে অ্যাড কপিটা জোগাড় করেছিলেন, জানা গেলেও যেতে পারে। সুজয়বাবুরা অবশ্য অভিমানে এ-বিষয়ে ডিটেলস কিছু জানতে চাননি।” কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গেলেন দীপকাকু। ঝিনুককে বললেন, “কী হল, তুমি আমার সঙ্গে আসছ কেন! ডেকে দেব ট্যাক্সি?”

“না, থাক। আমি ডেকে নিচ্ছি।” বলে, ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পড়ল ঝিনুক। ভীষণ ইচ্ছে করছে দীপকাকুর সঙ্গে যেতে। ফরেনসিক ল্যাবের কাজটা নাকি ভীষণ বোরিং। দীপকাকু কখনওই নিয়ে যেতে চান না।

অনেকটা দূর এগিয়ে গিয়েছেন দীপকাকু। মানুষের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছেন। জানা হল না, আবার কখন যোগাযোগ হবে। এই সময়ই ঝিনুকের খেয়াল হয়, রেস্তরাঁর চিরকুটটা এখন তার কাছে। এটাই কেসটার সঙ্গে ঝিনুকের যোগসূত্র রাখবে। চিরকুটটা পকেট থেকে বের করে ঝিনুক। পড়তে থাকে। দুটো প্রশ্ন খুব বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। এক, ডবল টাকা দিতে চাইছে, মানে অ্যারো কোম্পানির সঙ্গে দীপকাকুর কত টাকার কন্ট্রাক্ট হয়েছে, জানে। দুই, চিঠিটা বহুবচনে লেখা। ‘আমরা’ অর্থাৎ অপরাধী একজন নয়, অনেকজন।

ফুটপাত ঘেঁষে একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়ায়। ড্রাইভার জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলে, “ম্যাডাম, টালিগঞ্জ যাবেন তো? চলে আসুন।”

ঝিনুক বেশ থতমত খেয়ে গেল, ড্রাইভার কি তাকে কোনও সিরিয়াল বা সিনেমার অভিনেত্রীর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছে? স্টুডিয়োগুলো তো সব টালিগঞ্জে। ধন্ধ কাটিয়ে দিল ড্রাইভার। বলল, “বাইকে এক বাবু যাচ্ছিলেন, উনিই বললেন, আপনি টালিগঞ্জ যাবেন।”

ঝিনুক এখন বাড়ি ফিরবে একমাত্র দীপকাকুই জানেন। তার মানে উনিই পাঠিয়ে দিয়েছেন ট্যাক্সি। নিশ্চিন্তে গিয়ে বসে ঝিনুক।