৭
গাড়িতে বসে বাবাকে ফোন করলেন দীপকাকু। জানতে চাইলেন, “বদমাশগুলোর বাইকের নাম্বার কেউ লোকেট করেছে কি না?”
বাবা বললেন, “কেউই ঠিকমতো দেখেনি, আলাদা আলাদা নাম্বার বলছে।”
ফোনে বলা বাবার উত্তরটা দীপকাকুর থেকে শুনে নিল ঝিনুক। এত টেনশনের মধ্যেও লক্ষ করল, দীপকাকু আগের ফোন সেট পালটেছেন। এটা অনেক দামি মডেল। কোনদিকে যেতে হবে জানে না বলে আশুদা গাড়ি চালাচ্ছে আস্তে। দীপকাকুর মুখ দেখে ভরসা পাচ্ছে না জিজ্ঞেস করতে। সামনে গড়িয়াহাটের ফ্লাইওভার। দীপকাকু নির্দেশ দিলেন, “এন্টালি থানায় চলো।”
ঝিনুক ভাবল, থানা কেন? এখন তো বাবার কাছে যাওয়া স্বাভাবিক ছিল, ঝিনুকদের জন্য অপেক্ষা করছেন বাবা।
.
কল্লোল সেন সিটে আছেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লাল জামা পরা মস্তান টাইপ ছেলেকে তুমুল ধমকাচ্ছেন। ছেলেটা ভেজা পতাকার মতো চুপসে গিয়েছে।
দীপকাকুকে দেখে মূর্তি পালটে গেল কল্লোলবাবুর, “আসুন, আসুন!” ছেলেটাকে বললেন, “যা এখন।”
ঝিনুকদের দিকে ধন্যবাদসূচক দৃষ্টি ছুড়ে সরে পড়ল ছেলেটা। টেবিলের এপারের চেয়ারে বসলেন দীপকাকু। পাশের চেয়ারে ঝিনুক। কল্লোলবাবু হাসি মুখে জিজ্ঞেস করলেন, “কতদূর এগোলেন? আজ বিকেলের দিকেই হয়তো ফোন করতাম আপনাকে।”
কল্লোলবাবুর কথা যেন কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল দীপকাকুর। চলে গেলেন প্রয়োজনীয় প্রশ্নে, “আমি কেসটা নিয়েছি ডিপার্টমেন্টের কাউকে বলেছেন?”
“না তো!” মুখে বিস্ময়-জিজ্ঞাসা একসঙ্গে ফুটে উঠল কল্লোলবাবুর।
দীপকাকু জানতে চাইলেন, “ডিপার্টমেন্টের বাইরের কোনও লোককে?” কল্লোলবাবু বললেন, “ডিপার্টমেন্টের কলিগদের বলার তো প্রশ্নই ওঠে না। আপনাকে হেল্প করতে রিকোয়েস্ট করেছেন খোদ লালবাজার কন্ট্রোলের রঞ্জন দত্ত। আর বাইরের লোককে বলার আমার দরকারটা কী?” থমকে গেলেন কল্লোলবাবু, কিছু একটা মনে পড়েছে। বললেন, “দাঁড়ান, দাঁড়ান। কাল সন্ধেবেলা গোল্ডেন ইনভেস্টমেন্ট-এর অফিসঘরের মালিক আমায় আবার ফোন করেছিলেন। জানতে চাইলেন, কেসটা এখন কী অবস্থায় আছে। কবে ঘর ফেরত পাবেন উনি। আমি তখন শুধু বলেছি, ‘নতুন করে ইনভেস্টিগেশন চালু হয়েছে। ইম্পর্ট্যান্ট কিছু ব্লু এসেছে আমাদের হাতে। ঘরের আশা এখন ছাড়ুন।”
একটু থেমে কল্লোলবাবু বললেন, “আপনার নাম কিন্তু আমি নিইনি।”
দীপকাকুর মুখে জ্বলে উঠল আশার আলো। বললেন, “আমি এরকম কাউকেই এক্সপেক্ট করছিলাম। এবার বাড়িওলার নাম-ঠিকানা বলুন।”
“ঠিকানা একই। গোল্ডেন ইনভেস্টমেন্ট-এর উপরের ফ্ল্যাটে থাকেন। একসঙ্গে দুটো ফ্ল্যাট কিনে একটা ভাড়া দিয়েছিলেন অনিমেষ সোমকে। ভদ্রলোকের নাম বিশ্বজিৎ বসাক। রিটায়ার্ড মানুষ। বাড়িতেই থাকেন।”
সবটা শুনে উঠে দাঁড়ালেন দীপকাকু। হাত বাড়িয়ে দিলেন কল্লোলবাবুর দিকে। হ্যান্ডশেক করে বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ, আপনার সহযোগিতা মনে রাখব।”
এতটুকু সময় নষ্ট না করে দীপকাকু পা বাড়ালেন দরজার দিকে। ঝিনুক ও চলল পাশাপাশি। জানে, ওদের পিছনে পড়ে রইল একজোড়া বিস্মিত চোখ।
.
অনিমেষবাবুর অফিসটা খুবই কাছে। গাড়িতে হুস করে পৌঁছে গেল ঝিনুকরা। বাবা যে তাদের জন্য অপেক্ষা করে আছেন, দীপকাকুকে বলার সুযোগ পেল না ঝিনুক
নির্মল জানা এখনও ফেরেনি পরমা কমপ্লেক্সের গেটে। অন্য একজন গার্ড দাঁড়িয়ে রয়েছে। এখানে বাইরের লোকের ঢোকা-বেরনো খাতায় এন্ট্রি করা হয় না। ঝিনুকরা সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল দোতলায়। নেমপ্লেট দেখে বিশ্বজিৎ বসাকের ডোরবেল বাজাল।
দরজা খুললেন ধবধবে সাদা চুলের এক বৃদ্ধ। বয়স সত্তর ছাড়িয়েছে অবশ্যই। দীপকাকু জানতে চাইলেন, “বিশ্বজিৎ বসাক?”
বৃদ্ধ বললেন, “আমি।”
দীপকাকু নিজের কার্ড বের করে মিস্টার বসাকের হাতে দিলেন। বসাকবাবু কার্ডের উপর অলস দৃষ্টি রেখে বললেন, “পরিচয়টা মুখে দিন। চশমা ভিতরে।” দীপকাকু পরিচয় দিলেন। বৃদ্ধ ডেকে নিলেন, “আসুন। তা হঠাৎ আমাকে কী প্রয়োজনে?”
সোফায় এসে বসল ঝিনুকরা। ড্রয়িংরুমটা বিশাল। গদিমোড়া সোফাটা বেশ আরামদায়ক। ঘরে অন্য কোনও সাড়াশব্দ নেই। দীপকাকু বললেন, “নীচের অফিসঘরটা আপনি ভাড়া দিতে চান। পুলিশ ইনভেস্টিগেশন চলছে বলে পারছেন না। প্রচুর পার্টি বুঝি চাইছে ভাড়া নিতে?”
“কোথায় প্রচুর? ওই অমঙ্গুলে ফ্ল্যাট কে নেবে? প্রথমত, দু’নম্বরি বিজনেস হত। তার উপর সুইসাইড করলেন অনিমেষবাবু। মানুষটাকে দেখে বোঝা যায়নি এমন সব কাণ্ড ঘটাবেন! এখন একটি মাত্র পার্টি পাওয়া গিয়েছে, যিনি ফ্ল্যাটটা ভাড়া নিতে চান। আমি বলেছি বিক্রি করব। তিনি তাতেও রাজি।”
“নাম?”
“অখিল ঘোষাল। গতকালই ফোন করেছিলেন। বললেন, থানায় খবর নিতে। সরকারের তো আঠারো মাসে বছর। আগেও থানায় বেশ কয়েকবার ফোন করেছি, কালও করলাম। অফিসার বললেন, নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে।” একটু দম নিলেন মিস্টার বসাক। বললেন, “আমি আর পারি না। ফ্ল্যাটটা সেল-আউট করে দিতে পারলে যেন বাঁচি! পুলিশ কতবার যে কতরকমের জেরা করেছে। আজ আবার আপনি এলেন।”
বৃদ্ধের অনুযোগে অপ্রস্তুত হলেন দীপকাকু। সসংকোচে বললেন, “আমায় মার্জনা করবেন। খুব বেশি বিরক্ত আমি করব না। কয়েকটি কথা শুধু জানার আছে। যেমন, গতকালই নীচের তলায় পুলিশের সঙ্গে আমি এসেছিলাম, এটা কি আপনি জানতেন না? কেউ বলেনি আপনাকে?”
“না। ফ্ল্যাট ছেড়ে বড় একটা বেরই না আমি। স্ত্রী শয্যাশায়ী। ছেলেমেয়েরা বাইরে চাকরি করে। দিনের বেলা একটা কাজের লোক আছে, দোকান-বাজার সে-ই করে দেয়।”
দীপকাকু এবার পরের কথায় গেলেন, “অখিল ঘোষালকে আপনি চোখে দেখেছেন? নাকি কথাবার্তা যা হয়েছে, সব ফোনে?”
“একদিন এসেছিল আমার ফ্ল্যাটে। বাকি সময় ফোনেই কথা হয়েছে।”
“ওঁর ফোন নাম্বার আছে আপনার কাছে?”
“না, তাগিদ অখিলবাবুর বেশি। ফোন উনিই করেন।
“আপনার মোবাইলে তো ওঁর নাম্বারটা তা হলে উঠেছে।” উৎসাহের সঙ্গে বলে উঠলেন দীপকাকু।
মিস্টার বসাক বললেন, “না। আমার ল্যান্ডলাইনে ফোন করেন উনি। সেখানে সিএলআই লাগানো নেই।”
হতাশ হলেন দীপকাকু। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “আপনাকে একটা রিকোয়েস্ট করব। এরপর যেদিন অখিল ঘোষাল ফোন করবেন, তাঁকে কথা বলতে বাড়িতে ডাকুন। অ্যাপয়েন্টমেন্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টাইমটা আমায় জানিয়ে দেবেন। কার্ড দেওয়া রইল, ফোন নাম্বার ওতেই আছে।”
খানিকটা দ্বিধা-সংশয়ের মধ্যে পড়ে গেলেন মিস্টার বসাক। জানতে চাইলেন, “কেন এসব করা হচ্ছে, কিছুই তো বুঝতে পারছি না!”
দীপকাকু বললেন, “এগুলো পুলিশি তদন্তের একটা অংশ। তবে আপনাকে আমি কথা দিচ্ছি, অখিলবাবুকে যদি একবার বাড়িতে আনতে পারেন, নীচের ফ্ল্যাটের ঝামেলা থেকে আপনি মুক্তি পাবেন।”
“দেখি, তিনি ফোন করলে তো!”
“করবেনই।” আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথাটা উচ্চারণ করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন দীপকাকু। বললেন, “চলি, খুব তাড়াতাড়ি দেখা হচ্ছে।”
মিস্টার বসাকের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি ভাঙছে ঝিনুকরা। দীপকাকু বললেন, “অখিল ঘোষাল নামটা সত্যি নয়। লোকটা যে অপরাধী আমি নিশ্চিত। ধরা পড়ার সুবন্দোবস্তের জন্য আসল নাম সে ব্যবহার করবে না। কিনবে না ফ্ল্যাটটাও। আসলে লোকটা চাইছে কেসটার নিষ্পত্তি হোক তাড়াতাড়ি। সেই কারণেই আমরা তদন্তে নেমেছি জেনে বাড়িওলা মারফত তাড়া দিচ্ছে পুলিশকে। কিন্তু আমাদের কথা লোকটা জানল কার থেকে? আমার বাইকটাও ভাঙিয়েছে গুন্ডা দিয়ে।”
দীপকাকুই যখন ভেবে কিনারা করতে পারছেন না, ঝিনুক তো কোন ছার! ভাবা ছেড়ে দিয়েছে ঝিনুক। কমপ্লেক্সের সামনে গাড়ির কাছে এসে পৌঁছেছেন ওঁরা। দীপকাকুর মোবাইল বেজে উঠল। স্ক্রিন দেখে ফোন কানে নিলেন, “হ্যালো!”
অন্য প্রান্তের কথা শুনে নিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, বলছি।”
তারপরের কথাটা শোনার পর দীপকাকু ফোনসেট চোখের সামনে নিয়ে স্পিকার অন করলেন। ঝিনুক এবার শুনতে পাচ্ছে অন্য প্রান্তের কথা। মনে হচ্ছে ইয়াং কোনও ছেলের গলা। বলছে, “ওটা ছিল নমুনা। এবার আপনার অবস্থা ওরকম হবে। আপনি কী নিয়ে খেলছেন এখনও জানেন না….!”
অন্য প্রান্তের কথা শুনতে শুনতে দীপকাকু ফোনের আরও কয়েকটা সুইচ টিপে জানতে চাইলেন, “আপনারা কী চান?”
“খুব সিম্পল। আমাদের ধরার চেষ্টা ছেড়ে দিন।”
দীপকাকু বললেন, “কিন্তু এটা তো আমার প্রফেশন, এর থেকে আর্ন করে দিন চলে।”
“ওরা তো ভিখিরি হয়ে গিয়েছে। কত টাকা দেবে আপনাকে? আমরা তার চারগুণ দেব।”
“ঠিক আছে! আপনি পরে একবার ফোন করুন। আমি ভেবে নিয়ে বলছি।” বলে, ফোন অফ করলেন দীপকাকু।
লোকটার সাহস দেখে গা রি-রি করছে ঝিনুকের। দীপকাকুকে বলল, “আপনি কি ওর সঙ্গে একটু বেশি ভাল ব্যবহার করলেন না?”
“করলাম, ইচ্ছে করেই। ছেলেটা খুব কনফিডেন্ট বা অহংকারীও বলতে পারো। আমি সমীহ করলাম, যাতে ও আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে বেপরোয়া হয়। তখনওই ওকে ধরতে সুবিধে হবে। এখন দেখছি, ছেলেটা শুধু বাইক চেনেনি, আমার ফোন নাম্বারটাও জোগাড় করেছে। বাইকের নাম্বারটা মোটর ভেহিক্লসে দিয়ে জেনেছে সব।”
দীপকাকুর বুদ্ধি সবসময় তারিফযোগ্য। নতুন করে বাহবা না জানিয়ে ঝিনুক বলল, “নাম্বারটা সেভ করে নিয়েছেন তো?”
“লাভ নেই কোনও। পাবলিক বুথের নাম্বার। তবে গলাটা রেকর্ড করে নিয়েছি।”
চকিত উচ্ছ্বাস খেলে গেল ঝিনুকের চোখে-মুখে। মনে মনে বলল, এবার বুঝলাম, নতুন সেট দীপকাকু স্টাইলের জন্য নেননি, রেকর্ডিং-এর ব্যবস্থা আছে দেখে নিয়েছেন। টেকনোলজির যেমন উন্নতি হচ্ছে, ডিটেকটিভদেরও পাল্লা দিয়ে আপডেট হতে হবে।
গাড়িতে ওঠার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না দীপকাকুর। আশুদা সিটে বসে আঙুল দিয়ে স্টিয়ারিং বাজাচ্ছে। অধৈর্য হলে এমনটাই করে। প্যাকেট বের করে সিগারেট ধরালেন দীপকাকু। ওটাই লাস্ট ছিল। ফেলে দিলেন প্যাকেটটা। ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “অপরাধী দেখা যাচ্ছে দু’জন। একজন ইয়াং, অন্যজন বয়স্ক। এদের মধ্যে যোগসূত্রটা কোথায়?”
কথা শেষ করে দীপকাকু রাস্তা পার হওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। গাড়ি কোনখানে ভুলে গেলেন নাকি? ঝিনুক জিজ্ঞেস করল, “কোথায় চললেন?”
চোখের ইশারায় ওপারের সিগারেটের দোকানটা দেখালেন। ঝিনুক আশ্বস্ত হল, বেভুল হয়ে যাচ্ছেন না। এইমাত্র সিগারেট ফুরিয়েছে তাঁর।
