১
এত তাড়াতাড়ি সন্ধে নেমে যাবে, ভাবতে পারেনি ঝিনুক। গাড়ির পিছনের সিটে বসে ড্রাইভার আশুদাকে বলে, “মা যা-ই জিজ্ঞেস করুক, একদম মুখ খুলবে না।”
সঙ্গে সঙ্গে নব্বই ডিগ্রি মাথা হেলায় আশুদা। ঝিনুকদের অনেক দিনের ড্রাইভার। এরকম নিরীহ ভালমানুষ কলকাতায় খুব কমই পাওয়া যায়।
মুর অ্যাভিনিউ ছেড়ে চণ্ডী ঘোষ রোডে ঢুকেই ঝিনুকদের একতলা বাড়ি। ড্রয়িংরুমের জানলা খোলা। আলো এসে পড়েছে বাগানে। শীতের সন্ধেতে জানলা খোলা মানে দীপকাকু এসেছেন। দাবা খেলছেন বাবার সঙ্গে। সিগারেটের ধোঁয়া বের হওয়ার জন্য খুলে রাখা হয়েছে জানলা।
এই সময় দীপকাকুর উপস্থিতি মোটেই কাম্য নয়। অবশ্য দীপকাকুর কোনও সময়-অসময় নেই, যখন ইচ্ছে চলে আসেন দাবা খেলতে। তিনি আবার নাকি ডিটেকটিভ! আজ পর্যন্ত কোনও উল্লেখযোগ্য কেস সল্ভ করেছেন বলে শোনেনি ঝিনুক। নিজের কাজ নিয়ে দীপকাকু যে হতাশ, সেটা তাঁর আচরণে বেশ ফুটে বেরয়।
মিলিটারি থেকে রিটায়ার করার পর বাবার ব্যাবসাটা এখন শখের। অফিস যাওয়ার কোনও নির্দিষ্ট সময় নেই। বয়সের যথেষ্ট তফাত হলেও দু’জনের জমে খুব।
বাগানের গেটে গাড়ি দাঁড়াতেই খুলে গেল মেন দরজা। অতদূর থেকেই মা উদ্বিগ্ন স্বরে জানতে চাইলেন, “কী রে, এত দেরি হল কেন?”
উত্তরটা ড্রয়িংয়ে এসে দিল ঝিনুক, “আর বোলো না, আধঘণ্টার উপর পাওয়ার অফ ছিল ক্লাসে। কেব্ল ফল্ট। কারেন্ট আসার পর সব কম্পিউটার স্টেডি করে, পুরো ক্লাস নিয়ে, তবে ছাড়লেন স্যার!”
“একটা ফোন করলে পারতিস!” বললেন মা।
জুতো খুলে র্যাকে রাখতে রাখতে ঝিনুক বলল, “কী ফোন করব, ভাবছি এই হয়তো চলে আসবে কারেন্ট।”
“ওটা বোধহয় কেব্ল ফল্ট ছিল না।” দাবার বোর্ডের দিকে চোখ রেখে বললেন দীপকাকু।
“মানে!” ঝিনুকের মুখে বিরক্তি মেশানো বিস্ময়।
“আধঘণ্টার মধ্যে ইলেকট্রিশিয়ান ডেকে কেব্ল সারানো কলকাতার পক্ষে একটু বাড়াবাড়ি।”
দীপকাকুর মন্তব্যে ঝিনুক বলল, “আমি তো আর ঘড়ির দিকে চোখ রেখে বসেছিলাম না। ওটা একঘণ্টাও হতে পারে।”
“আর ওই সময়টুকু তোমরা কম্পিউটার ক্লাসে ব্যয় না করে গড়িয়াহাটে নেল পলিশ কিনতে চলে গেলে!”
অন্য যে কেউ হলে এ সময় ভীষণ চমকে যেত। ঝিনুক ততটা চমকাল না। দীপকাকুর এই ক্ষমতার বেশকিছু নমুনা সে আগেও দেখেছে। শুধু খারাপ লাগে, বিশেষ গুণটা যখন তার উপর ব্যবহৃত হয়। একেই বোধহয় বলে ক্ষমতার অপব্যবহার। কিন্তু এত সহজে ধরা দিলে তো চলবে না। পালটা যুক্তি দেয় ঝিনুক, “আপনি বোধহয় জানেন না, আমাদের কম্পিউটার ক্লাসে একবার ঢুকলে বেরতে দেওয়া হয় না।”
বোর্ডে একটা দান দিয়ে মিটিমিটি হাসছেন দীপকাকু। হাসিটা বাবার, নাকি ঝিনুকের উদ্দেশে বোঝা যাচ্ছে না! মা থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে। আলতো করে ঝিনুকের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দীপকাকু বললেন, “তোমাদের ইনস্টিটিউশনে আজ পাওয়ার অফ হয়নি। কোনও কারণে একটু আগে ছুটি হয়ে গেছে। তারপর তুমি আর শ্রবণা গড়িয়াহাটে গিয়েছিলে। প্রচুর ঘুরে ফুটপাতের দোকান থেকে অনামী কোম্পানির নেল পলিশ কিনেছ।”
রাগে গা-হাত-পা রি-রি করছে ঝিনুকের। একই সঙ্গে বিস্ময়ের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। আশ্চর্য ক্ষমতা মানুষটার! দাবার বোর্ড দেখে বোঝা যাচ্ছে, খেলা অনেকক্ষণ শুরু হয়েছে। দীপকাকুর পক্ষে ঝিনুকদের দেখে ফেলার কোনও সুযোগই নেই। মায়ের সামনে নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগছে। এইসব অস্বস্তিকর সময়ে বাবা একমাত্র ঝিনুকের সাপোর্টে হয়ে যান। বিচ্ছিরি একটা চাল দিয়ে বাবাকেও আজ বোবা করে রেখেছেন দীপকাকু। কী যে করে ঝিনুক! পায়ে পায়ে হেঁটে যাচ্ছিল ভিতর-ঘরে। তখন মা-কে শুনিয়ে আর একটা টিপ্পনী কাটলেন দীপকাকু, “বউদি, ওর ব্যাগটা সার্চ করুন। ভায়োলেট কালারের নেল পলিশ পাবেন।
নিজের ঘরে ঢুকে হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল ঝিনুকের। কী কুক্ষণেই যে দীপকাকু আসেন এ বাড়িতে! মা এখন হাজারো চিন্তা করতে শুরু করবেন। কাঁধের ব্যাগ বিছানায় ছুড়ে ফেলে অস্থির পায়চারি করে ঝিনুক, কীভাবে দীপকাকুকে শায়েস্তা করা যায়! মানুষটার কাজকম্মো নেই, ঘরে বসে পর্যবেক্ষণ ফলাচ্ছেন! এর আগেও একবার বিচ্ছিরি পরিস্থিতিতে ফেলেছিলেন। ইলেভেনের ফাইনাল। বাংলা পরীক্ষা দিয়ে এসে বাবাকে কোয়েশ্চেন পেপার দেখাচ্ছে ঝিনুক। বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “সব অ্যানসার করেছিস তো?”
“হ্যাঁ, বাবা।” সুবোধ মেয়ের মতো বলেছিল ঝিনুক।
সেদিনও উলটোদিকের সোফায় বসে ছিলেন দীপকাকু। “দেখি, কোয়েশ্চেন পেপারটা?” বলে চেয়ে নিলেন। প্রশ্নপত্রে চোখ বুলিয়ে বলেন, “চার নম্বর প্রশ্নটা, মানে ‘সংজ্ঞা লেখো’ হয় তুমি লেখোনি, নয়তো শেষে দায়সারা লিখেছ।”
ঘাবড়ে গেলেও নিরাসক্ত মুখে ঝিনুক জিজ্ঞেস করেছিল, “কী করে বুঝলেন?”
“চার নম্বর কোয়েশ্চেনের মাথায় রাইট মার্কটা অন্য পেনে দেওয়া। সেই পেনে তুমি পরীক্ষা দাওনি।”
সেই যাত্রায় বাবা বাঁচান। বলেন, “আমার মেয়েটার ছোট থেকেই ভুলো মন। লিখেছে, পরে খেয়াল হতে মার্ক দিয়েছে।”
আজকের ব্যাপারটা যে কী করে আন্দাজ করলেন দীপকাকু, জানতে ভীষণ কৌতূহল হচ্ছে ঝিনুকের। জিজ্ঞেস করলে বেশি পাত্তা দেওয়া হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং দীপকাকুর একপাটি চটি লুকিয়ে ফেলা যাক। খালি পায়ে বাড়ি ফিরুক। তা হলে বেশ হয়!… এসব ভাবতে ভাবতে আচমকাই ঝিনুকের মনে পড়ে, আরে, আজকেই না শ্রবণা বলছিল, ওর দিদা দুটো উড়ো চিঠি পেয়েছেন! মৃত্যুর হুমকি দেওয়া চিঠি। ওরা কিছুই বুঝতে পারছে না। পুলিশের কাছে যেতে ওর দিদার ভীষণ অনীহা। একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ খুঁজছেন।… তখন কেন মনে পড়েনি দীপকাকুর কথা, ভেবে আশ্চর্য হয় ঝিনুক! আসলে ডিটেকটিভ বলতে যে চেহারার কথা চোখে ভাসে, দীপকাকুর সঙ্গে তার কোনও মিল নেই। মোটা গ্লাসের চশমা পরা দীপকাকুকে নেহাত একজন অঙ্কের টিচার মনে হয়!
ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ঝিনুক। প্রথমে কিচেনে গিয়ে মা-কে শান্ত করতে হবে। খুব অভিমান হলে মা দু’-চার ঘণ্টা কাছেই আসবেন না। এদিকে ঝিনুকের আবার খিদেও পেয়েছে।
যা ভেবেছিল তাই। মা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে চাউ বানাচ্ছেন। ঝিনুক ভালবাসে। মায়ের কাঁধের কাছে গিয়ে ঝিনুক বলল, “সরি, মা। আর হবে না। শ্রবণা এমন জোর করল।”
কবজিতে চোখের জল মুছে মা বললেন, “তুই তো উঠতে-বসতে মিথ্যে কথা বলতে শুরু করেছিস। কী সাহস হয়েছে তোর! ভর সন্ধেবেলা দুটো বাচ্চা-বাচ্চা মেয়ে গড়িয়াহাটে ঘুরে ঘুরে মার্কেটিং করছে! জানিস, কত বাজে লোক ওখানে ঘুরে বেড়ায়?”
একটু অধৈর্য হয়ে ঝিনুক বলল, “মা, আমি বা শ্রবণা কেউই বাচ্চা নই! দু’জনেই হায়ার সেকেন্ডারি দিয়েছি। আর ভিতুদের চোখেই বাজে লোক বেশি পড়ে।”
“হ্যাঁ, তুমি একেবারে সাহসী মাতঙ্গিনী। আসলে সব দোষ তোর বাবার। উনিই আশকারা দিয়ে তোকে মাথায় তুলেছেন। আরে বাবা, মেয়েকে কি ছেলের মতো মানুষ করা যায়! প্রকৃতিগত কারণেই তারা ভিন্ন। জোর করে…”
এই শুরু হয়ে গেল। কতক্ষণ চলবে কে জানে! মানে মানে কিচেন থেকে কেটে পড়ে ঝিনুক। তাকে নিয়ে বাবা-মায়ের এটা পুরনো এবং একমাত্র মতভেদ। এই হয়তো বাবা ক্যারাটে স্কুলে ভরতি করে দিলেন, ক’দিন যেতেই ছাড়িয়ে নিয়ে এসে নাচের স্কুলে অ্যাডমিট করে দিলেন মা। বাবা শেখাচ্ছেন ক্যামেরায় ছবি তোলা, মা উলবোনা, রান্না করা। আর আশ্চর্য, সবকিছুই মোটামুটি পেরে যায় ঝিনুক। অবশ্য কোনওটাই ভাল করে শেখা হয় না। তবে বাবার ইচ্ছেতেই ঝিনুকের সায় বেশি।
.
বসার ঘরে এসে দাঁড়ায় ঝিনুক। বাবা, দীপকাকু দু’জনেই দাবায় মগ্ন। দীপকাকু হয়তো ভুলেই গেছেন কিছুক্ষণ আগে কী বিচ্ছিরি অবস্থায় ফেলেছিলেন ঝিনুককে। গলাঝাঁকি দিয়ে বাবার সোফার হাতলে বসল ঝিনুক।
“কী হল, মা পেয়েছে নেল পলিশটা?” জানতে চাইলেন বাবা।
“না। মুড অফ, সার্চ করেনি।”
বোর্ডের দিকে তাকিয়ে বাবা বললেন, “তা হলে তো পোয়াবারো। এ সময় আমার কাছে শেল্টার নেওয়া কেন?”
“তোমার কাছে নয়। দীপকাকুর সঙ্গে একটু কথা আছে।”
“কী কথা?” এটা বললেন দীপকাকু। ঝিনুকের দিকে না তাকিয়েই।
ঝিনুক শুরু করল, “আমার বন্ধু শ্রবণাকে তো দেখেছেন? একটা সমস্যায় পড়েছেন ওর দিদা।”
“সমস্যাটা কী?” অনাগ্রহে জানতে চাইলেন দীপকাকু।
বাবা বললেন, “ওসব পরে হবে। আমাদের বোর্ডের সমস্যা আরও ঘোরতর।”
ঝিনুক দমল না। বলল, “শ্রবণার দিদা দুটো উড়ো চিঠি পেয়েছেন। লাইফ থ্রেটনিং লেটার।”
গজের চালটা দিতে গিয়েও থেমে গেলেন দীপকাকু। বললেন, “আর একটু ডিটেলে বলো।
“খুব বেশি কিছু শ্রবণা বলেনি। ওর দিদা নাকি একজন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরের খোঁজ করছেন।”
“পুলিশের কাছে যাননি?” ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলেন দীপকাকু।
“বোধহয় না।”
বাবা তাড়া দেন, “কী হল দীপঙ্কর, তোমার দান দাও।”
“দাঁড়ান, ব্যাপারটা শুনতে দিন।” বলে, ঝিনুকের দিকে পুরো ঘুরে গেলেন কাকু।
বাবা বললেন, “সত্যি দীপঙ্কর, তোমার পসার দেখছি খুবই খারাপ। একটা ছোট্ট মেয়ের ইনফরমেশনে তুমি রোজগারের গন্ধ পাচ্ছ!”
“রোজগার নয় রজতদা, কাজের স্যাটিসফ্যাকশন। যেদিন থেকে সিদ্ধান্ত নিলাম গোয়েন্দাগিরিটা প্রফেশন করে নেব, যার জন্য অফিসঘর অবধি নিলাম, আজ পর্যন্ত একটাও জম্পেশ কেস এল না! খালি ‘ছেলে কেন বখে যাচ্ছে, ফলো করো’, ‘বিজনেস পার্টনার পার্সোনাল অ্যাকাউন্টে কত জমা করছে, বের করে দাও’, এইসব ফালতু কেস আসছে। রিয়েলি হোপলেস!” হতাশ শ্বাস ছাড়লেন দীপকাকু। তারপর ঝিনুকের উদ্দেশে বললেন, “তোমার বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় না?”
“নিশ্চয়ই যায়!” বলে, ঘরের কোণে ফোনস্ট্যান্ডের দিকে পা বাড়ায় ঝিনুক। মনে মনে দীপকাকুকে বলে, “এইসব কেসে বোঝা যাবে আপনার বুদ্ধির দৌড়! নিজেকে একেবারে শার্লক হোম্স ভেবে বসে আছেন!”
ডায়াল করতে শ্রবণাই ধরল। ঝিনুক বলল, “তুই আজকে একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভের কথা বলছিলি না, তোর দিদার দরকার? আমার এক চেনা….”
কথার মাঝখানেই শ্রবণা বলে ওঠে, “আরে শোন না কী হয়েছে! বাড়ি ফিরে দেখি বাবা-মা দু’জনেই নেই। গঙ্গাদি বলল, কী একটা ফোন পেয়ে তক্ষুনি দিদার বাড়ি গেছে। ফোন করলাম দিদাকে। বাবা ধরেছিলেন। তারপর যা বললেন সে এক আশ্চর্য কাণ্ড!”
“কী কাণ্ড?” গভীর কৌতূহলে জানতে চায় ঝিনুক।
ফোনের ওপার থেকে শ্রবণা বলতে থাকে, “বিকেলের দিকে দিদা মাঝেমধ্যে বউবাজার লাইব্রেরিতে বই পালটাতে যান। আজও গিয়েছিলেন। সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে দেখেন, লিভিং, ডাইনিং, দুটো ঘরই লন্ডভন্ড। অথচ দিদা যেমনভাবে তালা দিয়ে গিয়েছিলেন ঘরে, সেটা ঠিক সেরকমই আছে।”
“তা হলে নিশ্চয়ই জানলা দিয়ে ঢুকেছিল। চুরি গেছে কিছু?”
“না রে, কিছুই চুরি যায়নি। আর জানলাও বন্ধ ছিল ভিতর থেকে।
“স্ট্রেঞ্জ!” বলে, ঝিনুক ফোন কানে রেখেই দীপকাকুর দিকে তাকাতে গিয়ে দেখে, কাকু ঘাড়ের কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন। চোখ কুঁচকে ঝিনুক রিসিভারে বলল, “কাজের লোকগুলো তখন কোথায় ছিল?”
“লক্ষ্মীপিসি আর বিনায়কদা বাড়িতেই ছিল। ড্রাইভার ছিল গাড়িতে, দিদার সঙ্গে।”
ঝিনুক বলল, “তা হলে ব্যাপারটা তো বেশ গোলমেলে মনে হচ্ছে। দীপকাকুকে নিয়ে কি এখনই যাব?”
“দীপকাকু কে?” অপর প্রান্ত থেকে জানতে চায় শ্রবণা।
“ও হো, বলা হয়নি! দীপকাকু আমাদের বাড়ির খুব ঘনিষ্ঠ। খুবই উঁচুমানের প্রাইভেট ডিটেকটিভ।” কথাটা বলেই আড়চোখে দীপকাকুকে একবার দেখে নেয় ঝিনুক। উঁচুমানের খোঁচাটা কি ধরতে পারলেন? মোটেই না। অন্যমনস্ক হয়ে কী যেন ভাবছেন!
ফোনের ওপারে শ্রবণা বলে, “দাঁড়া, ফোনে আর একবার বাবার সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করি, দেখি কী বলেন।”
ফোন ছেড়ে দেয় শ্রবণা। রিসিভার নামিয়ে রাখে ঝিনুক। দীপকাকু সাগ্রহে জানতে চান, “কী বলল, এখনই যেতে হবে?”
মাথা নাড়ে ঝিনুক।
তখনই চাউমিনের প্লেট নিয়ে ঘরে ঢুকলেন মা। বললেন, “কেউ কোথাও যাবে না। আগে খেয়ে নাও।”
সোফায় ফিরে আসলেন দীপকাকু, ঝিনুকও। মা এখন অনেকটা স্বাভাবিক। দীপকাকুকে বললেন, “আচ্ছা দীপঙ্কর, এবার বলো তো কী করে বুঝলে ঝিনুক গড়িয়াহাটে গিয়েছিল? তার উপর আবার বেগুনি রঙের নেল পলিশ কিনেছে, খুব ঘুরেছে…”
চাউমিনের প্লেট হাতে তুলে দীপকাকু বললেন, “ভেরি সিম্পল বউদি, ঝিনুক ঘরে ঢুকতেই আমি হালকা স্পিরিট আর নেল পলিশ রিমুভারের গন্ধ পাই। ওর জুতোয় প্রচুর ধুলো। গাড়িতে যাতায়াত করেছে, এত ধুলো লাগার কথা নয়।”
“কিন্তু নেল পলিশের রংটা পর্যন্ত কী করে বলে দিলে?” জানতে চাইলেন মা। নিরাসক্তভাবে দীপকাকু বললেন, “ওর হাতের নখ, চেটো লক্ষ করলেই বুঝতে পারবেন।”
ঝিনুক নিজের বাঁ হাত চোখের সামনে মেলে ধরে বেশ বিব্রত বোধ করল। সত্যিই পছন্দ করার আগে অন্য রং বড্ড বেশিবার চেটোয় আর নখে ট্রাই করা হয়ে গেছে। সিলেক্টেড রংটা লাগানো আছে নখে।
দীপকাকুর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা দেখে মা তো থ! বাবা পর্যন্ত বলে উঠলেন, “মার্ভেলাস! দীপঙ্কর, তোমার হবে!”
অন্য সময় হলে প্রশংসাটা উপভোগ করতেন দীপকাকু। এখন মাথায় ঘুরছে শ্রবণার দিদার কেসটা। ঝিনুককে জিজ্ঞেস করলেন, “শ্রবণার দিদার বাড়িটা কোথায়?”
“ক্রিক রো। বিশাল সাহেবি আমলের বাড়ি। দোতলা। মাসচারেক আগে একবার শ্রবণার সঙ্গে গেছি। ওই বাড়িতে দিদার নিজের লোক বলতে কেউ নেই। তিনজন সবসময়ের কাজের লোক নিয়ে থাকেন।”
“নিজের লোক নেই কেন?”
“শ্রবণার কোনও মামা নেই। দাদুও মারা গেছেন। দিদার তিন মেয়ে। তিনজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে।”
“হুম!” বলে, চুপ করে গেলেন দীপকাকু। একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “কী মনে হচ্ছে, কেসটা দেবে আমাকে?”
বাবা আক্ষেপের সুরে বললেন, “দীপঙ্কর, তোমার মতো জিনিয়াসকে এসব মানায় না। কেস যদি আসার হয়, এমনিই আসবে। এত আগ্রহ দেখানোর কিছু নেই।”
“রজতদা, আপনি যদি আমার লাইনে আসতেন, বুঝতেন কী কঠিন ঠাঁই! গল্প-উপন্যাসে প্রাইভেট ডিটেকটিভদের যেরকম উজ্জ্বল করে দেখানো হয়, বাস্তবে তা নয়। বিশেষ করে আমাদের কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দারা যথেষ্ট যোগ্য। প্রাইভেট ডিটেকটিভরা সেখানে ভিড়তেই পারে না। আপনি এই মুহূর্তে কলকাতার কোনও উল্লেখযোগ্য গোয়েন্দার নাম বলতে পারবেন?”
মাথা নাড়লেন বাবা। পরক্ষণেই বললেন, “বাস্তবে বাঙালিরা গোয়েন্দাগিরির চাইতে দাবাটা ভাল খেলে। নাও, চাল দাও।”
দায়সারাভাবে দীপকাকু যে চালটা দিলেন, ঝিনুক অবধি ভীষণ চমকে ওঠে, দুটো চালের পরেই মেট নির্ঘাত! কী হল মানুষটার, কেসটা হাতে আসতে না-আসতেই বেহাল হয়ে পড়েছেন!
