চাবি রহস্য – ৩

পরের দিন সকাল থেকেই বৃষ্টি। দীপকাকুর আসার কথা ন’টায়। দশটা বাজতে চলল। ঝিনুক রেডি হয়ে সেই থেকে আনচান করছে বাড়িতে। দীপকাকুর মোবাইলে ফোন করল। সুইচড অফ। বাড়িতেও ফোন করেছিল। শেষে কাজের মাসি তুলল। মাসি কানে কম শোনে। ঝিনুক চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে, “দীপকাকু কোথায়?”

তিনবারের বার উত্তর এল, “তিনি তো কোন সকালে ধড়াচূড়ো পরে বেরিয়ে গেলেন।”

ধড়াচুড়ো বলতে মাসি বোধহয় বর্ষাতির কথা বোঝাল। এখন প্রশ্ন হল, এত সকালে কোথায় বেরলেন দীপকাকু? দেবাংশুবাবুর বাড়িতে যাওয়ার কথা তো দশটায়! কাল ঝিনুকদের বাড়িতে বসে দীপকাকু ফোনে সময়টা ওঁকে বলেছিলেন। উনি বলেছিলেন, “চলে আসুন। আমি তো আপনার ফোনের অপেক্ষাতেই ছিলাম। ইতিমধ্যে কোনও অপ্রত্যাশিত ঘটনা আমার অফিস বা বাড়িতে ঘটেনি।”

দীপকাকু বলেছিলেন, “ফাইন। কাল আমরা যখন যাব, বাড়ির কাজের লোকটি যেন থাকে।

দেবাংশুবাবু বলেছিলেন, “বাপনের মা ওই সময়টা বাড়িতেই থাকে।”

সব কথাবার্তা হয়ে গেল, এদিকে দীপকাকুর দেখা নেই!

বৃষ্টি মাঝেমাঝেই তেড়েফুঁড়ে আসছে। ঝড়বাদলার জন্য কি দীপকাকু একাই চলে যাবেন দেবাংশুবাবুর বাড়ি? আশা করা যায় ঝিনুকের প্রতি এতটা অন্যায় ব্যবহার উনি করবেন না। কারণ, কাল রাতে যখন তদন্তটা নিয়ে বসা হল বাবার সঙ্গে, দীপকাকু আলোচনার শুরুতেই পড়া ধরার মতো জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আজ অনেক কিছুই তো নোট করোনি। বললে, ‘সব মনে থাকবে।’ বলো তো দেখি, কার সঙ্গে কী কী কথা হয়েছে। ইম্পর্ট্যান্ট পয়েন্টগুলো শুধু বলবে। সব মিলিয়ে তোমার কী ধারণা, কোথায় খটকা, সেটাও জানাও।”

মা তখন ছিলেন ঘরে। বললেন, “লেখেনি যখন, ও আর বলতে পারবে না। মুখস্থ ওর দ্বারা কোনওদিনই হয় না। আমি ওর স্কুললাইফ থেকে বলে আসছি, যা পড়বি, ছোট ছোট নোট রাখবি। পড়ায় যখন মন দেয়, নোট করে। অন্যমনস্ক হলেই সে-সবের বালাই থাকে না।”

মায়ের বক্তৃতায় রাশ টানতে বাবা বললেন, “তুমি দীপঙ্করকে কী খাওয়াবে বলছিলে, বেশ রাত হল, এবার তো ও বাড়ি যাবে!”

মা তখনই ছুটলেন কিচেনে। যাওয়ার সময় বললেন, “দীপঙ্কর তো রাতের খাবার খেয়েই যাবে।”

দীপকাকুকে খাইয়ে মায়ের খুব শান্তি। রান্নার ব্যাপারে সমঝদার লোক। যে-কোনও সাধারণ রান্নার মধ্যেও অসামান্যতা খুঁজে বের করতে পারেন। বাবা অবশ্য মজা করে বলেন, “এটা দীপঙ্করের বারবার নেমন্তন্ন পাওয়ার ফন্দি।”

সে যাই হোক, ঝিনুক কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদ পর্বের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঝরঝর করে বলে দিয়েছিল। দেবাংশুবাবুর অফিসের কথাগুলো নোট করা ছিল, সেগুলো বলার জন্য তবু খাতা ওলটাতে হয়নি।

দীপকাকু বলেছিলেন, “ভেরি গুড! এই না হলে অ্যাসিস্ট্যান্ট! প্রায় কম্পিউটার মেমরি তোমার।”

প্রশংসাটা কানে বেশি বেশি ঠেকেছিল ঝিনুকের। দীপকাকু তো চট করে এরকম দরাজ সার্টিফিকেট দেন না। এমন নয়তো, তদন্তের পর্যায়টা ঝিনুকের মাধ্যমে বাবাকে শুনিয়ে দিলেন। সারাক্ষণ ঘোরাঘুরি করে নিজে অত্যন্ত ক্লান্ত। খাটনি বাঁচালেন আর কী!

মা তখনই ঢুকলেন চা নিয়ে। অতি আগ্রহে জানতে চাইলেন, “পেরেছে বলতে?”

দীপকাকু বললেন, “মুখস্থ তো ভালই বলল। এখন দেখা যাক মাথায় কতটা ঢুকেছে। অ্যানালিসিস কতটা করতে পারে দেখি।

মা বললেন, “না বুঝে ও মুখস্থ করতে পারে না। পরের কাজটাও পারবে।” মা এমনভাবে কথাটা বললেন, ঝিনুক যেন স্কুল-কলেজের টাস্ক দিচ্ছে। ওসবের বাইরেও যে ঝিনুকের আলাদা ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, মা বিশ্বাসই করতে চান না।

চা রেখে মা চলে যাওয়ার পর ঝিনুক নিজের ধারণা এবং খটকার কথা বলছিল। এক নম্বর খটকা হচ্ছে, “আমরা কেন এখনও গ্রেট বাইট কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ারকে জেরা করিনি?”

উত্তরে দীপকাকু বললেন, “সন্দেহের প্রথম তালিকায় উনি নেই। ওঁর হয়ে আছেন বসন্ত আগরওয়াল। চুরিটা মালিক করাবে, মেশিন আপগ্রেড করতে দেবে ইঞ্জিনিয়ারকে। মালিক সন্দেহের বাইরে গেলেই আমরা ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়ে পড়ব। কারণ, সে নিশ্চয়ই জানে, মেশিনের প্রোডাকশান বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। কাজটা যদি করে উঠতে পারে, চাকরির বাজারে নাম হবে তার।”

ঝিনুক এবার গিয়েছিল দ্বিতীয় ধন্ধে, “সমীরণ দাস একেবারেই পছন্দ করেন না দেবাংশুবাবুকে। কুৎসা রটাতেও ছাড়েন না। উলটোদিকে সূর্য রায় দেবাংশুবাবুর খুব ভক্ত। প্রচুর গুণগান করলেন। এর থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়, দেবাংশুবাবুর সঙ্গে সমীরণ দাসের তিক্ত সম্পর্ক, মানে, মুখ দেখাদেখি নেই। আর সূর্য রায়ের সঙ্গে সম্পর্ক মধুর। নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু দেবাংশুবাবু নিজে বলেছেন, দুই কম্পিটিটরের সঙ্গে তাঁর রিলেশন হ্যালো, হাই-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। তিনজনের মধ্যে কে মিথ্যে কথা বলছেন?”

“ব্রিলিয়ান্ট! এক্সেলেন্ট!” বলে উঠলেন দীপকাকু

ডবল কমপ্লিমেন্ট পেয়ে ঝিনুক পূর্ণোদ্যমে পরের বিশ্লেষণে গিয়েছিল, “সমীরণ দাস কী করে জানলেন, গ্রেট বাইট-এর মেশিন আপগ্রেড করছেন দেবাংশুবাবু? সম্ভবত বসন্ত আগরওয়াল বলেছেন। আমরা শুনেছি সমীরণবাবু গ্রেট বাইট-এর মেশিনে একসময় কাজ করেছেন। রিলেশন আছে মিস্টার আগরওয়ালের সঙ্গে। দেবাংশুবাবু দশ লাখ ডিমান্ড করেছেন মেশিনের প্রোডাকশন ক্যাপাসিটি বাড়ানোর জন্য। দশের কমে যদি করা যায়, এই ভেবেই কি মিস্টার আগরওয়াল সমীরণ দাসকে বলেছেন, ‘মেশিন আপগ্রেড যখন সম্ভব, আপনি করুন।’ একই ভাবে উনি যদি ভারতে ছড়িয়ে থাকা ইলেকট্রনিক সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ারদের উসকে থাকেন, তা হলে ধরে নিতে হবে দেবাংশুবাবুর ডায়াগ্রাম, স্পেয়ার পার্টস চুরি করার জন্য অনেকেই প্রলোভিত হয়েছে।”

“গুড অ্যানালিসিস!” বলে উঠলেন দীপকাকু। তারপর বললেন, “তবে তোমার এই পয়েন্টটা আর-একটু স্পেসিফিক করে দিই। আমি নিশ্চিত, চোর কলকাতার কেউ। কারণ, বাইরের লোক দেবাংশুবাবুর অফিস, বাড়ির অন্দরমহলের খবর জানে না। কোন রুটে অফিস যান, ট্যাক্সিতে না প্রাইভেট কারে, এসব খোঁজ নিতে সময় লাগে। সেই সময়টা অন্য প্রদেশের লোক পায়নি। দেবাংশুবাবু অর্ডারটা পাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই উড়ে গিয়েছেন সিঙ্গাপুরে। জিনিসপত্র নিয়ে এসেছেন, তাও বেশিদিন হয়নি। এর মধ্যেই হয়ে গেল চুরি। সেটাও ঘটেছে কলকাতায়। বাড়ি এসে স্পেয়ার পার্টসগুলো দেখিয়েছিলেন স্ত্রীকে। অর্থাৎ চুরি হয়েছে বাড়িতে, অফিসে অথবা অফিস যাওয়ার পথে। শেষের আশঙ্কাটা কম, নিজের গাড়িতে অফিস যান দেবাংশু। ড্রাইভ করেন নিজেই। প্রথম যেদিন ব্যাগটা অফিসে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেদিনই দেখেছিলেন ব্যাগের জিনিসপত্র নেই। পথে কোথাও গাড়ি দাঁড় করাননি। আমার ধারণা, চুরিটা করেছে দেবাংশুবাবুর পরিচিত কেউ। দেবাংশুবাবুর বিষয়ে সমস্ত খবরই সে রাখে।”

“আপনার কি মনে হয়, আজ যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হল, চোর তাদের মধ্যেই কোনও একজন?” জানতে চাইল ঝিনুক

দীপকাকু বললেন, “এখনই সেটা বলা সম্ভব নয়। জবর প্রমাণ কিছু পাইনি। কিছু অসংগতি পেয়েছি।”

“যেমন?” জানতে চাইল ঝিনুক।

দীপকাকু বললেন, “সমীরণবাবুর কথা অনুযায়ী ডায়াগ্রাম চুরি যাওয়ার মিথ্যে অজুহাত খাড়া করে দেবাংশুবাবু কাজটা থেকে সরে যাবেন, তা কিন্তু নয়। ওরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ নকশা একটাই মাত্র কপি থাকবে, তা হতে পারে না। স্পেয়ার পার্টস কেনার সুবিধের জন্য এক কপি ডায়াগ্রাম হয়তো দেবাংশুবাবু সিঙ্গাপুরে নিয়ে গিয়েছিলেন। আরও কপি অফিস বা বাড়ির কম্পিউটারে সেভ করা আছে। ডায়াগ্রাম হাতে পেলে চোরের লাভ হবে নিশ্চয়ই। দেবাংশুবাবুর ক্ষতি একটাই, নতুন করে স্পেয়ার পার্টস কিনতে যেতে হবে সিঙ্গাপুরে। এই ফাঁকে যদি কোনও ইঞ্জিনিয়ার ওঁরই নকশা থেকে মেশিন আপগ্রেড করে দেয়, পরিশ্রমটা বৃথা যাবে তাঁর। এই ঘটনা যদি না ঘটে, দেবাংশুবাবু এক মাসের মধ্যেই অর্ডার সাপ্লাই করে দিতে পারবেন। কোনও ক্ষতিই হবে না। এই সব পরিস্থিতি বিচার করে একজনকে আমরা সন্দেহের বাইরে রাখতে পারি। সে হচ্ছে তথাগত। যেহেতু দেবাংশুবাবুর পাসওয়ার্ড জানে, নকশা হাতানো কোনও ব্যাপার নয়। মিছিমিছি ডায়াগ্রাম চুরি করতে যাবে না।”

“স্পেয়ার পার্টসের জন্য চুরিটা করতে পারেন?” বলেছিল ঝিনুক।

“না, ডায়াগ্রাম কম্পিউটার থেকে পেয়ে গেলে, স্পেয়ার পার্টস কিনে নিতে অসুবিধে হবে না। সিঙ্গাপুর একবার অবশ্য যেতেই হবে। লাখ লাখ টাকার অর্ডারের তুলনায় সেই খরচা খুবই কম। স্পেয়ার পার্টসের দাম কিন্তু বেশি নয়। এই দেশে পাওয়া যায় না। এটাই যা সমস্যা।”

“তা হলে তথাগত কেন অর্ডারটা কত টাকার জেনেও চেপে গিয়েছিলেন?” জানতে চেয়েছিল ঝিনুক।

দীপকাকু প্রশংসার সুরে বলেছিলেন, “বাঃ, তুমি তো দেখছি কোনও ঘটনাই ভোলো না। ওয়েল, ওটা ছিল তথাগতর নেহাতই ছেলেমানুষি। চুরির দোষ যাতে ঘাড়ে এসে না পড়ে, তার জন্যই ওই দুর্বল অছিলা।”

“তা হলে তো একটা কাজ করা যায়, এখনই দেবাংশুবাবুকে ফোন করে জেনে নেওয়া যায়, ডায়াগ্রামের কপি ওঁর কাছে কি না?”

ঝিনুকের পরামর্শ কানে নেননি দীপকাকু। বলেছিলেন, “শোনো, আমি কিন্তু এখনও তথাগত ছাড়া কাউকেই সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখিনি। এর মধ্যে দেবাংশুবাবুও আছেন। যখনই ফোন করে জানতে চাইব, নকশার কপি আছে কি না? উনি যদি দোষী হন, সঙ্গে সঙ্গে বলবেন, ‘নেই।’ সমীরণবাবুর কথামতো ফের ডায়াগ্রাম করার জন্য সময় চাইবেন কোম্পানির কাছে। এই ভাবে এগ্রিমেন্টের সময় পার করে নিজের ‘মুখরক্ষা’ করবেন। অতএব ডায়াগ্রামের কপি আছে কি না, সেটা আমাকে খোঁজ নিতে হবে অন্য রাস্তায়।”

দীপকাকুর বলা শেষ হতে বাবা বলেছিলেন, “এবার কি আমাকে বলার সুযোগ দেওয়া যাবে?”

আসলে হয়েছিল কী, জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব শেষ করে ঝিনুক আর দীপকাকু যখন বাড়ি ফিরেছিলেন, বাবা বলেছিলেন, “দু’জনের মুখ বলে দিচ্ছে, রহস্য সমাধানের হাজার মাইল দূরে আছ তোমরা, অথচ আমাকে দ্যাখো, অফিসে বসে ইন্টারনেট খুললাম। গোটা ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল। এখন আইটি-র যুগ হে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে জেরা করা মান্ধাতার আমলের ব্যাপার। তা হলে শোনো…”

তখনই বাবাকে আটকান দীপকাকু। বলেন, “আপনার চিন্তাভাবনা পরে শুনব। প্রথমে আমাদের ব্যাপারটা পর্যালোচনা করে নিই। আগে যদি আপনার সমাধানের পথ শুনে ফেলি, আমরা খেই হারিয়ে ফেলব। আপনি তো কল্পনার সাহায্যে রহস্যটা উন্মোচন করবেন। আমাদের এগোতে হবে বাস্তবের পথ ধরে। কল্পনায় চোর ধরা অনেক সহজ।”

বাবা তখনকার মতো চুপ করে যান। তাই এখন ঝিনুকদের কথাবার্তা শেষ হতেই শুরু করলেন, “আমার ধারণা, এই চুরির পিছনে কোনও আন্তর্জাতিক চক্র কাজ করছে।”

“এরকম মনে হওয়ার কারণ?” জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু।

বাবা বললেন, “তোমাদের কেসটা শোনার পর অফিসে গিয়ে ইন্টারনেট সার্চ করছিলাম। বিখ্যাত চুরির কেসে পাওয়া গেল আধুনিক টেকনোলজি-নির্ভর চোরের হাতিয়ার। জাপানের তৈরি এক আশ্চর্য জিনিস।”

“আবার জাপান!” সামান্য আগ্রহটুকুও হারিয়ে ফেললেন দীপকাকু।

জাপান দেশটার প্রতি বাবার পক্ষপাতিত্ব বড্ড বেশি। এর আগেও অনেকবার তার পরিচয় দিয়েছেন বাবা। এবার বললেন, “আমার কথাটা একটু শোনোই না।”

“আচ্ছা, বলুন।” বলে, সোজা হয়ে বসলেন দীপকাকু। ঝিনুকও বাবার কথায় মন দিল। আর কিছু না হোক, চমকপ্রদ আইডিয়া কিছু শোনা যাবে।

বাবা বলতে শুরু করলেন, “জাপান এমন একটা হ্যান্ডি এক্স-রে ক্যামেরা আবিষ্কার করেছে, যে-কোনও তালার ভিতরের অংশের ছবি তোলা যায়। এবং সেই ক্যামেরার সঙ্গেই আছে অটোমেটিক চাবি তৈরির যন্ত্র। ক্যামেরাটা তালার গর্তের উপর রাখার মিনিটখানেকের ব্যবধানে চাবি বেরিয়ে আসবে যন্ত্র থেকে। বিদেশের অনেক চোর আজকাল ওই ক্যামেরাসহ চাবি-মেশিন নিয়ে চুরি করতে বেরচ্ছে। আমার ধারণা, ওরকমই কোনও ক্যামেরা-মেশিন দিয়ে খোলা হয়েছে দেবাংশুবাবুর ব্যাগ।”

দীপকাকু জানতে চাইলেন, “মেশিনটার কত দাম রজতদা?”

“দশ হাজার মার্কিন ডলার।” উত্তর দিলেন বাবা।

দীপকাকু বললেন, “তার মানে, ধরুন, আমাদের টাকায় প্রায় সাড়ে চার লাখ দেবাংশুবাবুর অর্ডার দশ লাখের। চোর যদি ওঁর জিনিসগুলো বিক্রি করতে যায়, পাঁচের বেশি পাবে না। তার জন্য সে সাড়ে চার লাখের মেশিন কিনবে?”

বাবা বললেন, “তোমাদের তো এখানেই গন্ডগোল! বড় করে কিছু ভাবতে পারো না। তুমি কেন ধরে নিচ্ছ, দেবাংশুবাবুর আবিষ্কারের উপর শুধু দেশের ইঞ্জিনিয়ারদের নজর আছে, বিদেশিদেরও থাকতে পারে! তারা যদি কোনওভাবে খবর পায়, এক ভারতীয় ইতালির মেশিনটার প্রোডাকশন বাড়িয়ে দিচ্ছে, পিছনে পড়ে যাবে তার।’

দীপকাকু গম্ভীরভাবে বললেন, “ভারত আর চিন ছাড়া বেশি প্রোডাকশনের মেশিন কোনও দেশেরই দরকার নেই। তাদের জনসংখ্যা আমাদের মতো বিপুল নয়। চিন টেকনোলজিতে স্বাবলম্বী। অন্য দেশের প্রযুক্তি চুরি করতে যাবে না।”

সেই যে বাবা চুপ করে গেলেন, কেস নিয়ে আর একটা কথাও বলেননি। রাতে শুতে যাওয়ার আগে ঝিনুককে বলেছিলেন, “সত্যিই দীপঙ্করের মেধা অসামান্য।! লেগে থাক ওর সঙ্গে। বুদ্ধিচর্চা জীবনকে অনেক প্রাণবন্ত করে। দীপঙ্কর যে মাঝে মাঝে দাবায় হেরে যায় আমার কাছে, আমাকে খুশি করার জন্যই হারে। কিন্তু কেসের ব্যাপারে ও কখনওই কোনও ধরনের হার মানতে রাজি নয়। নিজের চিন্তাভাবনার উপর ওর অগাধ বিশ্বাস।”

.

সকালের বৃষ্টি দেখে বাবা বললেন, “এ যা শুরু হল দেখছি, দুপুরের আগে ছাড়বে না। আজ ডুব মেরে দেব অফিসে। দীপঙ্কর এলে তোরা আমার গাড়ি নিয়েই যাস দেবাংশুবাবুর বাড়ি। এই ওয়েদারে মোটরসাইকেলে রাইড করা ঠিক হবে না। ওখান থেকে আবার কোথায় যেতে হয়…”

মিলিটারিতে কাজ করার সময় বাবা এত নিয়মশৃঙ্খলা মেনেছেন, এখন নিজের সিকিউরিটি এজেন্সিতে ইচ্ছেমতো যান।

গাড়ির ব্যবস্থা হয়ে গেল, এদিকে দীপকাকুর দেখা নেই। বৃষ্টির প্রকোপ বুঝতে ঝিনুক জানলার কাছে গেল, দুটো ভাল ঘটনা একসঙ্গে তার চোখে পড়ল, বৃষ্টি তো কমেই গিয়েছে, বর্ষাতিপরা দীপকাকু বাইক থামালেন গেটের সামনে।

বাবা ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। ঝিনুক বলে উঠল, “এসে গিয়েছেন!”

কাগজ ভাঁজ করতে করতে বাবা বললেন, “কে, দীপঙ্কর? ভালই হল। চ, আমিও তোদের সঙ্গে দেবাংশুবাবুর বাড়ি যাই। কেসটা আমারও খুব ইন্টারেস্টিং লাগছে।”

.

ঝিনুকরা এখন দেবাংশুবাবুর বাড়িতে। গাড়িটা নিলেও বাবাকে সঙ্গে নিলেন না দীপকাকু। বললেন, “রজতদা, কেস এখন ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে গিয়েছে। এই সময় যদি আপনাকে সঙ্গে নিই এবং আপনি কল্পনানির্ভর কোনও পরামর্শ আমাদের দিতে থাকেন, পথভ্রষ্ট হব আমরা। আমি কথা দিচ্ছি, কেসের শেষ দৃশ্যে আপনাকে উপস্থিত রাখব। তার আগেও আপনার থেকে অনেক কিছু জানার আছে আমার।”

হতোদ্যম হয়ে বাবা বললেন, “বলো, কী জানার আছে?”

“আপাতত একটা কথা বলুন, বিদেশের হোটেলগুলোয় সিকিউরিটি ব্যবস্থার ফাঁক কোথায়? মানে, আমি বলতে চাইছি একজন বোর্ডার যদি মনে করে অন্য বোর্ডারের রুমে ঢুকবে, সেটা কীভাবে সম্ভব?”

দীপকাকুর প্রশ্নে কপালে ভাঁজ পড়েছিল বাবার। সঠিক পাত্রকেই প্রশ্ন করলেন দীপকাকু। বাবা এক্স-মিলিটারিম্যান। এখন আবার সিকিউরিটি এজেন্সির মালিক। একটু সময় নিয়ে বাবা বললেন, “বিদেশ বলতে তুমি যদি উন্নয়নশীল বা উন্নত দেশের কথা বলো, তাদের দামি হোটেলগুলোয় সিকিউরিটি ব্যবস্থা খুব টাইট। খুব দরকার ছাড়া রুম সার্ভিস পর্যন্ত দেওয়া হয় না। হোটেল কর্তৃপক্ষ ডুপ্লিকেট চাবি নিয়ে যে-কোনও রুমে ঢুকতে পারে। অন্য রুমের বোর্ডারের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। যদি না সে অন্য কোনও ধরনের পদ্ধতি নিয়ে থাকে।”

“সেটা কীরকম?” জানতে চাইলেন দীপকাকু

বাবা বললেন, “ধরো, পাশের অথবা নীচের রুমের বোর্ডার দড়িতে আংটা লাগিয়ে, যে ঘরে ঢুকবে তার জানলায় ছুড়ে দিল। তারপর দড়ি বেয়ে চলে গেল সেই ঘরে।”

দীপকাকু মাথা নাড়লেন। বললেন, “না, এতটা ঝুঁকি নিতে পারে জিমন্যাস্টিকে দক্ষ কোনও লোক। এ ছাড়াও অনেক সমস্যা আছে। লোকে দেখে ফেলবে। আর কোনও কি রাস্তা নেই?”

ফের খানিকক্ষণ ভেবে নিয়ে বাবা বললেন, “একটা রাস্তা আছে, সেটা তেমন প্রশস্ত নয়। কোনও বোর্ডার যদি মনে করে তার রুমটা সাফসুতরো করাবে, বাইরে বেরনোর সময় রুম বন্ধ করে একটা প্লেট ঝুলিয়ে দিয়ে যায়। তাতে লেখা থাকে, ‘মেকআপ রুম’। ওই প্লেটটা সব রুমেই রাখা থাকে। মেকআপ রুমের প্লেট দেখে, ক্লিলিং স্টাফ হোটেলের চাবি দিয়ে দরজা খুলে পরিষ্কার করে বোর্ডারের ঘর। না হলে ওই রুমে কেউ ঢোকে না। এমন হতে পারে, অন্য রুমের বোর্ডার যদি চেষ্টা করে নির্দিষ্ট কোনও রুমে ঢোকার, তাকে অপেক্ষা করতে হবে ক্লিনিং স্টাফ ওই রুমে ঢোকা পর্যন্ত। সেক্ষেত্রেও বাধা আছে, ক্লিনিং স্টাফ অন্য কাউকে সেই রুমে অ্যালাও করবে না। ঢুকতে গেলে ওই স্টাফকে মেরে অথবা অজ্ঞান করে ঢুকতে হবে।”

“ঘুষ। ক্লিনিং স্টাফকে ঘুষ দিয়েও তো ঢোকা যায়?” জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু।

বাবা বললেন, “তা যায়। তবে, আমাদের দেশে যেমন কথায় কথায় ঘুষ দেওয়া হয়, বেশিরভাগ দেশেই তা হয় না।”

বাবার দেওয়া ইনফরমেশন দীপকাকুর কতটা কাজে লাগল, এখনও জানে না ঝিনুক। বাবাকে একটা থ্যাঙ্কস জানিয়ে দীপকাকু বললেন, “এখন এইটুকু হলেই আমার চলবে। পরে আবার বসব আপনার সঙ্গে।” তারপর ঝিনুককে বললেন, “চলো, তোমাদের গাড়িতেই যাই। আকাশের উপর ভরসা নেই, আবার ঢালতে পারে।”

গাড়িতে করে দেবাংশুবাবুর বাড়ি আসার পথে ঝিনুক দীপকাকুকে জিজ্ঞেস করল, “সকালে কোথায় বেরিয়েছিলেন?”

দীপকাকু বললেন, “দুটো জায়গায়। প্রথমে আফাংয়ের বাড়ি।”

প্রথমটা শুনেই ঝিনুক বিষম কৌতূহলে জিজ্ঞেস করল, “তাঁর বাড়ি গিয়ে কী হবে, কাল তো দেখলাম তালা ঝুলছে। আপনি বললেন, মিস্টার আফাংকে লুকিয়ে রাখতে চাইছে অপরাধী।”

“তাও একটা চান্স নিলাম। যদি রাতে ফিরে সকালে বেরিয়ে যান। ভোর থাকতেই পৌঁছে গেলাম ওঁর বাড়ি।”

“পেলেন তাঁকে?”

“পেলাম। অনেক কথাও হল।”

দীপকাকুর কথা শুনে আর-এক প্রস্থ চমকে গেল ঝিনুক। জানতে চাইল, “কী বললেন উনি? কে গিয়েছিল চাবি নকল করাতে?”

“কেউ যায়নি। আত্মগোপনও করেননি আফাং। সন্ধেবেলায় এক বন্ধুর মৃত্যুর খবর এসেছিল। শেষকৃত্যে যোগ দিতে গিয়েছিলেন। রাতেই ফিরে এসেছিলেন।” দীপকাকুর কথার পর ঝিনুক বলল, “যাঃ, তা হলে তো আবার আমরা পিছিয়ে পড়লাম।”

“তা ঠিক বলা যায় না। আফাংয়ের সঙ্গে কথা বলে বেশ উপকার হয়েছে। এই কেসের ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছি আমি।”

“কী কথা হল ওঁর সঙ্গে?”

ঝিনুকের প্রশ্নের উত্তর দীপকাকু বললেন, “এখন নয়, সময়মতো বলব।” তারপর ঝিনুক দ্বিতীয় ব্যক্তির খোঁজ করল, “আর-একজনের কাছে গিয়েছিলেন বললেন?”

“হ্যাঁ, দেবাংশুবাবুর অফিসে গিয়ে তথাগতর সঙ্গে কথা বললাম। জানতে চাইলাম, ডায়াগ্রামটার কপি আছে কি না? সে বলল, ‘আছে।’ তথাগতকে বলে এলাম, আমি যে অফিসে এসেছি, দেবাংশুবাবুকে যেন না বলে। বলছে, ‘বলবে না।’ এবার দেবাংশুবাবু যদি বলেন, ডায়াগ্রাম একটাই ছিল, তা হলে বোঝা যাবে, চুরির নাটকটা দেবাংশুবাবুই সাজিয়েছেন।”

এর আগের কেসগুলোতেও ঝিনুক দেখেছে, দীপকাকুর কাজে কখনও কোথাও ফাঁকফোকর থাকে না। নির্দিষ্ট একটা ছক ধরে এগোন। যেন কাগজে ড্রয়িং করে নেন আগে। মানুষটাকে বাইরে থেকে দেখলে স্বভাবটার আন্দাজ পাওয়া যাবে না। খুবই অগোছালো থাকেন। আজ আবার যে জামাটা পরেছেন, তার বুকপকেটে কালির ধ্যাবড়া দাগ। ডটপেন থেকেও যে কী করে দীপকাকুর পকেটে কালি লিক করে, কে জানে!”

দোতলার এই ফ্ল্যাটে ঢুকে দীপকাকু নামমাত্র আলাপ সারলেন দেবাংশুবাবুর স্ত্রী পারমিতা দেবীর সঙ্গে। ঝিনুক স্পষ্ট দেখল পারমিতা দেবীর মুখে উৎসাহভঙ্গের ভাব। নিশ্চয়ই দীপকাকুর লুক দেখে তেমন ভরসা জাগেনি। দেবাংশুবাবু বললেন, “বাপনের মা-কে আপাতত ছেড়ে দিয়েছি। আপনি ফোনে জানালেন ঘণ্টাদুয়েক দেরি হবে আসতে, ভাবলাম, ওকে আটকে রেখে কী লাভ।? অন্য একটা বাড়ির কাজ সেরে আসুক।”

“এলেই হল!” বলে, দীপকাকু এই ফ্ল্যাটটার ইঞ্চি-ইঞ্চি অংশজুড়ে চোখ বোলাতে লাগলেন। কিচেন, বাথরুম, ড্রয়িং, ডাইনিং সেরে দীপকাকু এখন দেবাংশুবাবুর বাড়ির ওয়ার্কশপে। দেবাংশুবাবুর স্ত্রী এই জায়গা পর্যন্ত আসেননি। এই ঘরে ঢুকেই ঝিনুকের চোখ থমকে গেল একটা জিনিসের উপর, সেই কালো বিদেশি ব্যাগ। যার ভিতর থেকে চুরি গিয়েছে দেবাংশুবাবুর ইঞ্জিনিয়ারিং যন্ত্রপাতি, ডায়াগ্রাম। ব্যাগটা ফ্লোরের উপর দাঁড় করানো।

ঝিনুককে ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে, দেবাংশুবাবু বললেন, “সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে ব্যাগটা ঠিক যেভাবে রেখেছিলাম এই ঘরে, আপনাদের তদন্তের সুবিধের জন্য সেরকমভাবেই সাজিয়ে রেখেছি।”

কথাটা কানে গেলেও, দীপকাকু ব্যাগটার দিকে ঘুরেও তাকালেন না। দেবাংশুবাবুর কাজের টেবিলে বসে গত পনেরো-কুড়িদিনের নিউজ পেপার দেখে যাচ্ছেন। পেপারগুলো ঘরের কোণে একটা টুলের উপর রাখা ছিল। দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “নিউজ পেপার কি আপনি এই ঘরে বসেই পড়েন?”

উত্তরে দেবাংশুবাবু বললেন, “না, কাগজ আমি ড্রয়িংয়ে বসে পড়ি। স্ত্রীকে বলেছি পুরনো পেপার এখানে জমা রাখতে। অন্তত এক মাসের। সকালে এত তাড়াহুড়োর মধ্যে কাগজ দেখি, সব খবর ভাল করে পড়া হয় না।”

দীপকাকুকে অত কাগজ নিয়ে বসতে দেখে দেবাংশুবাবু বললেন, “এসি-টা চালিয়ে দেব?”

দীপকাকু ‘না’ করে দিলেন। সত্যিই এসি-র দরকার নেই, বৃষ্টির জন্য ওয়েদার আজ বেশ ঠান্ডা। দেবাংশুবাবুর ফ্ল্যাটে ওয়ার্কশপেই শুধু এসি লাগানো। বাকি ঘরগুলোয় ফ্যান। দেবাংশুবাবুর মেশিনপত্রের জন্যই হয়তো এয়ার কন্ডিশনও বাধ্যতামূলক।

ঝিনুক এখনও বুঝতে পারছে না, দীপকাকু ওই কাগজগুলোর মধ্যে থেকে কোন বিশেষ খবরটা খুঁজছেন! এখন জিজ্ঞেস করা যাবে না, তদন্ত চলাকালীন প্রশ্ন করা বারণ। ঝিনুক ওয়ার্কশপটায় ভাল করে চোখ বোলাল। প্রচুর যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার, পিসিবি বোর্ড। সবকিছুই বেশ গুছিয়ে রাখা আছে। তুলনায় দেবাংশুবাবুর অফিসের ওয়ার্কশপ অনেক অগোছালো। মনে হয়, এই ঘরটাও পারমিতা দেবীর গোছানো। অন্য ঘরগুলোয় সুন্দর করে ডেকরেশন করা। দেওয়ালে পেন্টিং। ভদ্রমহিলার রুচি আছে। ওঁর পরনের হালকা সবুজ ঢাকাই শাড়ি, অল্প গয়না, হালকা প্রসাধন দেখেও সেটা বোঝা যায়। দেবাংশুবাবুর স্ত্রী-কে দীপকাকু অনায়াসে সন্দেহের বাইরে রাখতে পারেন। এই মহিলার সঙ্গে যে লোহার যন্ত্রপাতির কোনও সম্পর্ক নেই, এটা বোঝার জন্য খুব বেশি বুদ্ধির দরকার হয় না। এই ফ্ল্যাটের আর-এক বাসিন্দা এই মুহূর্তে উপস্থিত না থাকলেও, অন্য ঘরগুলোয় স্কুলের বই, গল্পের বই, খেলনা, ড্রয়িংখাতা বলে দিচ্ছে, সে প্রবলভাবে আছে। দেবাংশুবাবুর চার বছরের ছেলে। তার একটা খেলনা বন্দুক ওয়ার্কশপেও দেখা গেল। ঝিনুক এক ফাঁকে পারমিতা দেবীকে জিজ্ঞেস করল, “আপনার ছেলেকে দেখছি না!”

“স্কুলে। ওদের মর্নিং সেকশন। এবার ফিরল বলে!” বললেন পারমিতা।

দেবাংশুবাবুর বাড়িতে আসার পথে একটা স্টেশনারি দোকান দেখে ঝিনুক আশুদাকে গাড়ি দাঁড় করাতে বলে। দীপকাকু জিজ্ঞেস করেন, “কী ব্যাপার?”

ঝিনুক বলে, “দেবাংশুবাবুর ছেলের জন্য একটা চকলেট-বার কিনব।”

“কেনো। কিন্তু আমি যখন দিতে বলব, তখনই দেবে। তার আগে নয়।” বলেন দীপকাকু।

কথাগুলো ভেবেই মনটা তেতো হয়ে যায় ঝিনুকের। দীপকাকুর কাজের জগৎটা এমনই যে, একটা বাচ্চাকে চকলেট দেওয়ারও বিধিনিষেধ থাকে! বাচ্চাটা স্কুল থেকে ফিরবে কখন? ও এলে তদন্তের গুমট ভাবটা অন্তত একটু কাটে।

“চুরিটা মনে হচ্ছে এই ঘর থেকেই হয়েছে!” কাগজগুলো থেকে মুখ তুলে বলে উঠলেন দীপকাকু।

বিষম বিস্ময়ে দেবাংশুবাবু বললেন, “তাই! কী করে বুঝলেন?”

ঝিনুকও খুব অবাক হল। দীপকাকু এরকমভাবে সিদ্ধান্তটা জানালেন, যেন নিউজ পেপার ঘেঁটে এই খবরটাই পেলেন এতক্ষণে। দু’জনের বিস্মিত দৃষ্টির সামনে দীপকাকু তুলে ধরেছেন একটা ম্যাগাজিনের কভার। বললেন, “এর ভিতরের বইটা আপনার ব্যাগে অন্যান্য কাগজের সঙ্গে ছিল। সেখানে যে দুটো ডেটের বাংলা, ইংরেজি মিলিয়ে চারটে নিউজ পেপার দোমড়ানো অবস্থায় পাওয়া যায়, সেই ক’টা পেপার আপনার এই নিউজ পেপার বান্ডিলে মিসিং। অর্থাৎ, এই ঘরে বসে ব্যাগের সমস্ত জিনিস বের করে, আপনারই কাগজ, ম্যাগাজিন দিয়ে বোঝাই করেছে ব্যাগ। ওর মধ্যে কিছু সিঙ্গাপুর টুরিজম-এর ক্যাটালগ ছিল, যা সম্ভবত আপনারই। ওদেশ থেকে আনা। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটা ম্যাগাজিনও ছিল।”

দেবাংশুবাবু বললেন, “হতে পারে, জানেন। এবার তো সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সে যাতায়াত করেছি। ম্যাগাজ়িন হাতে নিই বটে, পরে আর দেখা হয়ে ওঠে না। কিন্তু একটা ব্যাপার ভেবে আমি অবাক হচ্ছি, এই ঘরে ঢুকল কী করে? শুধু ঢোকেইনি, বেশ কিছুক্ষণ সময়ও কাটিয়েছে। ব্যাগ থেকে জিনিসপত্র বের করা, কাগজ ঢোকানো, ব্যাগটা আগের জায়গায় রাখা, নিজের ব্যাগে বা ঝোলায় জিনিসগুলো ভরে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া, এত কাজ করল কখন? ব্যাগটা খুললই-বা কী করে?”

“এসব জানার জন্য আপনার বাড়ির লোককেও জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার। চলুন, ব্যাপারটা সেরে ফেলি।” বলে, চেয়ার থেকে উঠে এলেন দীপকাকু।

.

ঝিনুকরা ড্রয়িংরুমে এসে বসেছে। অন্য বাড়ির কাজ সেরে ফিরে এসেছে বাপনের মা। আর-একজনও ফিরেছে স্কুল থেকে, এতটুকু সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি। মা-র হাত ধরে দাঁড়িয়ে জুলজুল করে ঝিনুককে দেখছে। ভীষণ সুইট দেখতে দেবাংশুবাবুর ছেলেকে। চোখে-মুখে দুষ্টুমি ভরতি। মা কিছু একটা বুঝিয়েছেন, তাই চুপ করে আছে এখন। বাচ্চাটাকে ডেকে চকলেট দিতে ইচ্ছে করছে ঝিনুকের, নামটাও জেনে নেওয়া যাবে সেই ফাঁকে। কিন্তু উপায় নেই, চকলেট দেওয়ার আগে পারমিশন নিতে হবে দীপকাকুর।

“তুমিই বাপনের মা? আসল নাম কী?” দীপকাকুর জেরা শুরু হল।

বাপনের মা-র বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে আছে। মাথা নেড়ে বলল, “নাম, লক্ষ্মী বেরা।”

“বাপন এখন কী করে?” প্রশ্নটা এমনভাবে করলেন দীপকাকু, বাপন যেন তাঁর চেনাজানা কেউ।

লক্ষ্মী বেরা বলল, “একটা গ্রিল কারখানায় কাজ করে, বাবু।”

“তুমি এই বাড়ির ওয়ার্কশপটাও ধোওয়ামোছা করো তো?”

লক্ষ্মী বেরা উত্তর দিতে পারল না। দেবাংশুবাবু হেল্প করলেন, “আমার কাজের ঘরের কথা বলছেন।”

ওয়ার্কশপের মানে বুঝতে পেরে লক্ষ্মী বেরা সহজ হল। বলল, “করি, বাবু। গোটা ফ্ল্যাটটা আমিই তো ধোওয়ামোছা করি।”

“কোন ব্যাগ থেকে বাবুর যন্ত্রপাতি চুরি হয়েছে জানো?”

“জানি। ব্যাগটা আমি হাত দিয়ে তুলে মেঝে পরিষ্কার করেছি। বাবুর ঘরের জিনিস একটুও এদিক-ওদিক করি না। যেখানকার জিনিস সেখানেই রাখি।”

লক্ষ্মী বেরার উত্তরের পর দীপকাকু বললেন, “এই যে এ বাড়ি থেকে জিনিস চুরি হল, তোমার ভয় করেনি? পুলিশ এসে জেরা করবে, থানায় নিয়ে যাবে?”

“করেনি আবার? চুরি হয়েছে শোনার পর দু’রাত ঘুমোতে পারিনি। বউদির কাছে এসে কেঁদেছি। বউদিই আমাকে সাহস দিলেন। বললেন, “তুমি যদি অন্যায় না করে থাকো, ভয় পাচ্ছ কেন? আমি তোমার সঙ্গে আছি।”

লক্ষ্মী বেরার কথা শেষ হতেই ঝিনুকের চোখ গেল পারমিতা দেবীর দিকে। মহিলা শুধু সুরুচিসম্পন্না নন, সু-মনেরও অধিকারিণী। ঝিনুকের সঙ্গে চোখাচোখি হতে পারমিতা বললেন, “বাপনের মা সত্যিই খুব বিশ্বাসী লোক। এ পাড়ায় ছ’বাড়িতে কাজ করে, এক-আধদিন ডুব ছাড়া আর কোনও বদনাম নেই।”

পারমিতা দেবীর দিকে তাকিয়ে কথাগুলো দীপকাকুও শুনলেন। তারপর ইশারায় ডাকলেন মা-র হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এ বাড়ির কনিষ্ঠ সদস্যটিকে। একটুও ইতস্তত না করে ছেলেটি চলে এল দীপকাকুর সামনে। দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম কী?”

“সাম্য, সাম্য সেনগুপ্ত। বাড়ির নাম সমু।” স্পষ্ট উচ্চারণে বলল পারমিতা দেবীর চার বছরের ছেলে।

ঘরের কোণের বড় আলমারিটার দিকে তাকিয়ে দেবাংশুবাবুর উদ্দেশে দীপকাকু বললেন, “ওই আলমারির লকারেই ছিল ব্যাগের চাবি?”

দেবাংশুবাবু বললেন, “হ্যাঁ, ওটাতেই ছিল।”

“আলমারির চাবিটা একবার দেখি।”

দীপকাকুর নির্দেশ মেনে চাবির গোছা আলমারির মাথা থেকে এনে দিলেন পারমিতা। দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “এর মধ্যে লকারের চাবিটা আছে তো?”

ঘাড় হেলিয়ে “হ্যাঁ” বললেন পারমিতা।

দীপকাকু এবার সাম্যকে বললেন, “তোমার চকলেট, খেলনা কোথায় লুকিয়ে রাখেন মা, যেটা নিয়ে তুমি জেদ করো?

সাম্য আলমারির দিকে আঙুল তুলল।

দীপকাকু চাবির গোছাটা সাম্যর হাতে দিয়ে বললেন, “যাও, আলমারির কোথায় মা চকলেট বা খেলনা রাখেন, দেখাও।”

সাম্য চাবি নিয়ে চলল আলমারির দিকে। এক নম্বর, দু’নম্বর করে দুটো চাবি লাগে এই ধরনের আলমারি খুলতে। দিব্যি খুলে ফেলল ওইটুকু ছেলে! লোয়ার র‍্যাকে পা রেখে লকার পর্যন্ত খুলল। বের করে আনল চকলেটের প্যাকেট। এগিয়ে এসে দীপকাকুর কাছে দাঁড়াল।

দেবাংশুবাবু বলে উঠলেন, “স্ট্রেঞ্জ! ও আলমারির লকার পর্যন্ত খুলতে পারে?” পারমিতা দেবী অপরাধীর কণ্ঠে বললেন, “এক-একসময় এত বায়না করে, আমাকে ওগুলো লকারেই রাখতে হয়।”

“রেখে কোনও লাভ নেই, দেখলেন তো? এখন কে বলতে পারে, লকার থেকে চাবি বের করে ও কাউকে দেয়নি?” বললেন দীপকাকু।

দেবাংশুবাবু রেগেমেগে এগিয়ে এলেন সাম্যর কাছে, একটু ঝুঁকে ছেলের কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে জিজ্ঞেস করলেন, “বল, কাকে দিয়েছিস চাবি? বল?”

দেবাংশুবাবুর হাত সরিয়ে দিয়ে দীপকাকু বললেন, “এভাবে জোর করলে বলবে না। বলার হলে নিজে থেকেই বলবে।”

বাবার বকুনিতে সাম্যর চোখে জল। মা-র কাছে এগিয়ে গেল, চকলেটের প্যাকেটটা তুলে দিল হাতে। ঝিনুকের উদ্দেশে দীপকাকু বলে উঠলেন, “কী হল, তুমি যে ওর জন্য চকলেট আনলে, সেটা দাও।”

কোনও কোনও কথা দীপকাকু ভীষণ রং ডেলিভারি করেন। যে ভঙ্গিতে চকলেটটা দিতে বললেন, মনে হল, যেন ঝিনুক জিনিসটা চেপে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। অথচ নিজেই বলেছিলেন, “আমি না বলা পর্যন্ত দেবে না!”

ঝিনুক সোফা থেকে উঠে গিয়ে সাম্যকে চকলেট-বারটা দিল। জলভরা চোখে সাম্য “থ্যাঙ্ক ইউ” বলতে ভুলল না। ঝিনুক এটা অবশ্য বুঝতে পারছে, কেন দীপকাকু চকলেটটা প্রথমেই দিতে বারণ করেছিলেন। ছেলেটিকে দিয়ে আলমারি খোলানোর প্ল্যান আগেই ভাবা ছিল। ঝিনুকের থেকে চকলেট পেয়ে গেলে সাম্যর হয়তো আলমারি খোলার আগ্রহ হত না। দীপকাকুর পূর্ব-পরিকল্পনাকে স্যালুট করতেই হয়।

দেবাংশুবাবু খুবই ভেঙে পড়লেন। কপালে হাত দিয়ে বসে থাকলেন সোফায়। স্বগতোক্তির ঢঙে বললেন, “শেষমেশ আমার ছেলের হাত দিয়েই এত বড় অঘটনটা ঘটে গেল!”

দীপকাকু বললেন, “এখনই এটা ধরে নেওয়ার সময় আসেনি। তদন্ত আরও এগোক, তারপর নিশ্চিত হওয়া যাবে। আপনি এখন আমায় বলুন, সিঙ্গাপুরে কোন হোটেলে উঠেছিলেন?”

তদন্তের মোড় অন্যদিকে ঘুরে যাচ্ছে দেখে, একটু বুঝি চাঙ্গা হলেন দেবাংশুবাবু। বললেন, “গত চারবার আমি হোটেল ‘গ্র্যান্ড ম্যাক্স’-এ উঠেছি। হোটেলটা কমদামি। সেজন্যই যে ওখানে উঠি তা নয়, অন্য অনেক সুবিধেও আছে।”

“যেমন?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।

দেবাংশুবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি কখনও সিঙ্গাপুর গিয়েছেন?”

“না।”

“ওখানে ‘লিটল ইন্ডিয়া’ বলে একটা জায়গা আছে। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে ওই অঞ্চলটায় আমাদের দেশের লোকের বসবাস বেশি। একটা পার্ক আছে, যেখানে প্রতিদিন ছোটমতো বাজার বসে। ‘লিটল ইন্ডিয়া বাজার’ বলে অনেকে। পুরনো জিনিসপত্র বিক্রি হয়। যদিও বিক্রেতারা কেউই ভারতের নয়। বেশিরভাগই চাইনিজ। ওই পার্কের কাছেই আমার হোটেল। পার্ক পেরোলেই ইলেকট্রনিক মল, সিমলিম স্কোয়ার আর সিমলিম টাওয়ার। হোটেল থেকে ওয়াকিং ডিসট্যান্স। তারপর ধরুন, মুস্তাফা শপিং মল। কী পাওয়া যায় না ওখানে? কসমেটিক থেকে ইলেট্রনিক গ্যাজেটস। জুতো, জামাকাপড়, সব। সিঙ্গাপুর বেড়াতে গিয়ে ইন্ডিয়ান, বাংলাদেশিরা ওখান থেকেই শপিং করে। আমার হোটেলের উলটো দিকে বাংলাদেশি রেস্তরাঁ আছে। দিব্যি মাছ-ভাত পাওয়া যায়। দামও বেশ সস্তা। এই সব কারণেই আমি লিটল ইন্ডিয়ায় থাকা পছন্দ করি।”

একটানা কথা বলে থামলেন দেবাংশুবাবু। হঠাৎ কী মনে পড়তে বললেন, “দাঁড়ান, আমার একটা ছোট ডিজিটাল স্টিল ক্যামেরা আছে, সেটা দিয়ে এবার সিঙ্গাপুরের কিছু ফোটো তুলেছিলাম। লিটল ইন্ডিয়ার ছবি দেখাচ্ছি।”

দেবাংশুবাবু উঠছিলেন ফোটো আনতে, পারমিতা বললেন, “তুমি বোসো, আমি এনে দিচ্ছি।”

ঝিনুক দেখল, ঘর ছেড়ে কখন যেন বেরিয়ে গিয়েছে বাপনের মা। সাম্য দূরে কর্নারে বসে মনোযোগ সহকারে খারাপ একটা খেলনা গাড়ি জবরদস্তি চালানোর চেষ্টা করছে। মনে হচ্ছে ব্যাটারি ফুরিয়েছে গাড়িটার।

পারমিতা চার বাই ছয়ের ফোটো অ্যালবাম নিয়ে এলেন। ফোটো দেখা শুরু হল। দৌড়ে এল সাম্য। দেবাংশুবাবু দেখাতে লাগলেন যে-সব জায়গার কথা বলছিলেন এতক্ষণ। হোটেলের জানলা দিয়ে অনেক ফোটো তুলেছেন। ফোটো তোলার হাতটা নেহাত মন্দ নয়। দীপকাকু বললেন, “ফোটোর অ্যালবামটা কি ক’দিনের জন্য রাখতে পারি?”

“রাখুন না, কোনও অসুবিধে নেই!” সাগ্রহে সম্মতি দিলেন দেবাংশুবাবু।

দীপকাকু অ্যালবামটা প্যান্টের পকেটে পুরে নিলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “ডায়াগ্রাম, স্পেয়ার পার্টস ভরতি ব্যাগ হোটেলের রুমে রেখে বাইরে গিয়েছিলেন কখনও?”

“বহুবার গিয়েছি। ওখানে তো রুম সার্ভিস নেই। হোটেলের উলটো দিকের ফুটপাতে চা-দোকান। সকালে চা খেতে গিয়েছি। লাঞ্চ বা ডিনারের জন্য দু’-চারবার গিয়েছি বাংলাদেশি হোটেলটায়। কখনও-বা শপিং করে, খেয়ে একেবারে ঢুকেছি।”

দীপকাকু বললেন, “খাওয়াটাওয়ার জন্য তো বেশি সময় লাগার কথা নয়। ঘণ্টা দেড়-দুইয়ের জন্য বাইরে ছিলেন কখনও, যখন ব্যাগ এবং চাবি রুমের ভিতরে?”

একটু ভেবে দেবাংশুবাবু বললেন, “এরকম ঘটেছে মাত্র একবার। যেদিন ফিরব, তার আগের সন্ধেয় মুস্তাফা সেন্টারে শপিং করতে গিয়েছিলাম। ঘণ্টাচারেক ওই শপিং মলে কাটাই। আত্মীয়স্বজনদের জন্য কিছু কেনাকাটা করি। বুঝতেই তো পারছেন, বিদেশে গেলে রিলেটিভরা কিছু না-কিছু এক্সপেক্ট করে।”

“মুস্তাফা সেন্টারে যাওয়ার আগে নিজের রুমটা কি ‘মেকআপ’ করতে দিয়ে গিয়েছিলেন? ওই হোটেলে ‘মেকআপ রুম’-এর বোর্ড নিশ্চয়ই ছিল?”

দেবাংশুবাবু বললেন, “ছিল, তবে রুম ক্লিন করতে আমি একবারই দিয়েছিলাম। যেদিন পৌঁছই, তার পরের দিন। তখন ঘরে ব্যাগ, স্পেয়ার পার্টস কিছুই ছিল না। কারণ, সেগুলো কিনতেই গিয়েছিলাম সিমলিম টাওয়ার এবং স্কোয়ারে।”

কথা শেষ করে দেবাংশুবাবু ফিরতি প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা, আপনি হোটেলের ইনফরমেশন এত নিচ্ছেন কেন? আমি তো বাড়ি ফিরে স্পেয়ার পার্টস, ডায়াগ্রাম সবই দেখেছি, ব্যাগেই ছিল।”

“ডায়াগ্রামের কোনও কপি আছে আপনার কাছে?”

“আছে।” বললেন দেবাংশুবাবু।

ঝিনুক লক্ষ করল, দীপকাকু সযত্নে দেবাংশুবাবুর করা ‘হোটেল’ নিয়ে প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলেন। এখন জিজ্ঞেস করলেন, “মুস্তাফা সেন্টারে শপিং করতে যাওয়ার সময় ব্যাগের চাবি দুটো কোথায় রেখেছিলেন?”

“বিদেশে গেলে আমি সবসময় কাঁধে একটা ছোট চামড়ার ব্যাগ রাখি। যেটায় পাসপোর্ট, ভিসা, ফ্লাইটের বোর্ডিং পাস থাকে। চাবিটা রেখেছিলাম ওই ব্যাগেই।”

“ব্যাগটা শপিং করতে যাওয়ার সময় নিয়ে বেরননি?”

“না, মুস্তাফা সেন্টারে যা ভিড় হয়, হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে। তার চেয়ে হোটেলের রুম সেফ।”

“সিঙ্গাপুরের টিকিট আপনি কোন ট্র্যাভেল এজেন্টকে দিয়ে বুক করান?”

“থিয়েটার রোডে ‘সান ট্র্যাভেলস’। প্রতিবার ওরাই আমার টিকিট, ভিসা করে দেয়। একটা ফোন করে নিতাইয়ের হাত দিয়ে কাগজপত্র পাঠিয়ে দিই।”

দীপকাকু বললেন, “হ্যাঁ, নিতাই আমাকে বলেছে। আচ্ছা, এবার আমাকে একটা জিনিস লিখে দিন, কবে কত নম্বর ফ্লাইটে গিয়েছেন এবং ফিরেছেন।”

“আমি আপনাকে বোর্ডিং পাসও দিতে পারি। লাস্ট জার্নির বোর্ডিং পাস আমার পাসপোর্টের সঙ্গেই থাকে,” বললেন দেবাংশুবাবু।

দীপকাকু বললেন, “তাই দিন। ট্র্যাভেল এজেন্টের ফোন নম্বরটাও লিখে দেবেন।”

দেবাংশু উঠে গেলেন বোর্ডিং পাস আনতে। কথাবার্তার ফাঁকে পারমিতা দেবী কিচেনে গিয়ে চা বানালেন। ট্রে-তে চা আর স্ন্যাক্স নিয়ে এসে সেন্টার টেবিলে রাখলেন। অফার করার আগেই দীপকাকু চায়ের কাপ তুলে নিয়ে তাঁকে বললেন, “এবার আপনাকে ক’টা কথা জিজ্ঞেস করব।”

“নিশ্চয়ই, করুন।” উলটো দিকের সোফায় বসতে বসতে বললেন পারমিতা।

দীপকাকু শুরু করলেন, “আপনার ছেলে আশপাশের ফ্ল্যাটে যায়?”

“না। আমাদের এই কমপ্লেক্সে নেমন্তন্ন ছাড়া কেউ কারও ফ্ল্যাটে ঢোকে না। যে-যার নিজের মতো থাকে।”

দীপকাকুর পরের প্রশ্ন, “আপনাদের আত্মীয়স্বজনরা এই বাড়ির ওয়ার্কশপটা দেখেছে? ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন কাদের কাদের?”

পারমিতা দেবী বললেন, “সমুর অন্নপ্রাশনের সময় অনেকেই দেখেছে। ছাদে খাওয়ানো হয়েছিল, রিসেপশন হয়েছিল ফ্ল্যাটে। তখন সবে ওয়ার্কশপটা সাজানো হয়েছে, দেবাংশু গেস্টদের ধরে ধরে নিয়ে গিয়েছে ওয়ার্কশপটা দেখাতে। নিমন্ত্রিত ছিল প্রচুর। ওর ট্রেডেরও অনেক লোক ছিল।”

দেবাংশুবাবু বোর্ডিং পাস নিয়ে এলেন। সোফায় বসে অপরাধীর গলায় বললেন, “তা হলে কি আমাদের আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে কেউ? ঘরটা দেখানোই ভুল হল!”

“আপনি এখন কোনও কমেন্ট করবেন না।” বলে, দীপকাকু বোর্ডিং পাস এবং সাদা কাগজে লেখা ট্রাভেল এজেন্টের ঠিকানাটা দেবাংশুবাবুর থেকে নিয়ে বুকপকেটে রাখলেন। ফের পারমিতাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি, বাপনের মা আর দেবাংশুবাবু ছাড়া ওয়ার্কশপে আর কার কার যাতায়াত আছে?”

“সুমু তো হামেশাই ঢুকে যায়। এ ছাড়া তথাগত, নিতাই ঢোকে, দেবাংশু অফিসে বসে ওদের এটা-সেটা আনতে পাঠায়।”

“এ ছাড়া আর কেউ কি সম্প্রতি ওই ঘরে ঢুকেছিল?”

পারমিতা দেবী একমনে ভাবতে থাকলেন। হঠাৎ মনে পড়েছে এই ভাবে বলে উঠলেন, “ও হ্যাঁ, গত সপ্তাহে ওয়ার্কশপের এসি-টা সার্ভিসিং করতে এসেছিল একজন।”

“আপনারা কি সার্ভিস করতে ডেকেছিলেন?”

“আমি ডাকিনি। দেবাংশু মনে হয় এসি কোম্পানিকে ফোন করেছিল।” পারমিতা দেবীর কথা শুনে দেবাংশুবাবু যেন আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন, “আমি? না, এসি কোম্পানিকে আমি তো কোনও ফোন করিনি! তা ছাড়া ওঘরে ঠান্ডা তো ভালই হচ্ছিল! হঠাৎ সার্ভিস করতে ডাকতে যাব কেন?”

দীপকাকু স্বগতোক্তির ঢঙে বললেন, “চুরিটা তার মানে তখনই সারা হয়েছে।” পারমিতা দেবীকে জিজ্ঞেস করলেন, “যখন এসি-টা সার্ভিস করছিল, আপনি ওয়ার্কশপে ছিলেন?”

“মেশিনটা খুলতে দেখে আমি সরে এসেছি। লোকটা নিজের মতো কাজ করে। যাওয়ার সময় আমাকে বলে চলে গেছে।” বললেন পারমিতা।

দীপকাকু দেবাংশুবাবুকে বললেন, “এসি-র ডিলারকে ফোন করুন, রিসেন্টলি কোনও লোক পাঠিয়েছিল কি না আপনার বাড়িতে?”

দেবাংশুবাবু এই মুহূর্তে যথেষ্ট উত্তেজিত এবং অস্থির। পকেট থেকে সেলফোন বের করলেন, কিন্তু ঠিকমতো বোতাম টিপতে পারছেন না। সোফা ছেড়ে একটু দূরে সরে গেলেন। দীপকাকু পারমিতা দেবীকে জিজ্ঞেস করলেন, এসি সার্ভিস করতে আসা লোকটার চেহারা মনে আছে?”

অসহায়ভাবে মাথা নাড়লেন পারমিতা। বললেন, “একটুও মনে করতে পারছি না। অন্য সব মুখ চলে আসছে চোখের সামনে। যেমন, গ্যাস ডেলিভারি-ম্যান, কুরিয়ার সার্ভিসের লোক, কেবল টিভি-র টাকা নিতে আসে যে ছেলেটা…”

দীপকাকু বললেন, “অত টেনশন করে ভাবতে হবে না। এ বাড়িতে আসে-যায়, সেরকম মুখগুলো এক-এক করে ভাবতে থাকুন, চট করে দেখবেন, ওই মুখটা মনে পড়ে গিয়েছে।”

দেবাংশুবাবুর ফোন করা হয়ে গিয়েছে। এগিয়ে এসে বললেন, “না, ওরা কোনও লোক পাঠায়নি। সম্প্রতি যাদবপুর অঞ্চলে কোনও সার্ভিস হয়নি ওদের। ঠিকানা ভুল করে যে আমাদের বাড়িরটা করে যাবে, তার সম্ভাবনাই নেই।”

মেঝের দিকে তাকিয়ে নীচের ঠোঁট উলটে কিছুক্ষণ ধরে কীসব চিন্তা করলেন দীপকাকু। মাথা তুলে বললেন, “ঠিক আছে। আমি ফোন করে দিচ্ছি, ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যে ফরেনসিক ল্যাবরেটরি থেকে দু’-তিনজন আসবে আপনাদের বাড়িতে। এয়ারকন্ডিশন মেশিনের গায়ে আছে অপরাধীর হাতের ছাপ। ওরা তার ছবি তুলবে। আশা করি, এই কয়েক দিনের মধ্যে আপনি এসি মেশিনের বডি ক্লিন করেননি।”

“না, করা হয়নি। খুব কমই করা হয়। বাপনের মা-র হাত যায় না অত উঁচুতে।” বললেন পারমিতা দেবী।

দীপকাকু পারমিতা দেবীর উদ্দেশে বললেন, “আগামীকাল পোর্ট্রেট পার্লের জন্য একজন আর্টিস্ট আসবে আপনার কাছে। সার্ভিস করতে-আসা লোকটার মুখ কালকের মধ্যে নিশ্চয়ই মনে পড়ে যাবে আপনার। মুখে মুখে তার বর্ণনা দেবেন, আর্টিস্ট তখনই এঁকে নেবে।”

“এঁরা কি সব পুলিশের লোক? আপনারা কেউ থাকবেন না?” সন্ত্রস্ত হয়ে জানতে চাইলেন পারমিতা।

দীপকাকু বললেন, “পুলিশ হলেও চিন্তার কিছু ছিল না। তবে ফরেনসিক ল্যাবটা প্রাইভেট। আর্টিস্ট কোনও চাকরি করে না। ইয়ং, ট্যালেন্টেড ছেলে। আমার সঙ্গে বেশ ক’টা কাজ সাকসেসফুলি করেছে।”

দেবাংশুবাবু জানতে চাইলেন, “আপনার সঙ্গে পরে কীভাবে যোগাযোগ হবে?”

“আপনার প্রয়োজনে আপনি ফোন করবেন। আমিও দরকার অনুযায়ী কল করে নেব।” বলে, সোফা থেকে উঠে সোজা দরজার দিকে হাঁটা দিলেন দীপকাকু।

ঝিনুক অনুসরণ করতে গিয়ে একবার পিছন ফিরল সাম্যর জন্য। সাম্য খেলা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। মিষ্টি হেসে টা-টা করছে ঝিনুককে। ঝিনুকও হাত নাড়ল। এই বাড়ির কেস যতই জটিল এবং ঝামেলার হোক না কেন, এই বাচ্চাটির হাসির সরলতা এতটুকু কেড়ে নিতে পারেনি।