৮
সম্ভাব্য অপরাধী, গোয়েন্দা দু’জনেই যদি হসপিটালের শরণাপন্ন হয়, কেসের আর কী অবশিষ্ট থাকে! উৎসাহ হারিয়ে ঝিনুক কলেজ, কোচিং, ক্যারাটে ক্লাব, কম্পিউটার ক্লাসে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। দেখতে দেখতে চারটে দিন গড়িয়ে গেল। একটাই সুখবর, ভরতি হওয়ার পরের দিনই দীপকাকু ছাড়া পেয়েছেন নার্সিংহোম থেকে। আঘাত তেমন মারাত্মক নয়। আপাতত বিশ্রামে আছেন। সুজয়বাবুর অবস্থাও স্টেডি। গতকাল বাড়ি ফিরেছেন। ঝিনুকের যথেষ্ট সন্দেহ ছিল, অ্যারোর কেসটা নতুন উদ্যমে দীপকাকু আদৌ শুরু করবেন কি না। ধারণা মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে আজ সকালে।
ফোন করেছিলেন দীপকাকু। ঝিনুকই ফোনটা তোলে। দীপকাকু বললেন, “দশটা নাগাদ অ্যারোর অফিসে চলে এসো। ওঁদের কেস সম্পর্কিত কয়েকজনকে ডাকা হয়েছে। আজই ঘোষণা করব অপরাধীর নাম।”
এতটাই অপ্রত্যাশিত এই খবর, ঝিনুকের মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়, “ঠিক আছে, আমি আসছি।”
রিসিভার নামিয়ে রাখতে যাবে, দীপকাকু বললেন, “দশটা বাজতে এখনও দু’ঘণ্টা বাকি। ধীরেসুস্থে এসো।”
ফোন রেখে ফিরে আসছিল ঝিনুক। মুখের সামনে থেকে নিউজ পেপার সরিয়ে বাবা বললেন, “কী রে, এরকম ভ্যাবলা হয়ে গেলি কেন? কার ফোন?”
সোফায় ধপাস করে বসে পড়ে ঝিনুক। দীপকাকু ফোনে যা বললেন, বাবাকে বলে। তারপর জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা বাবা, তদন্তের তো এখনও অনেকটাই বাকি আছে, এর মাঝে দীপকাকু নার্সিংহোমে গেলেন। এখন চলছে কমপ্লিট রেস্ট। কখন অপরাধীকে শনাক্ত করলেন?”
নিউজ পেপার ভাঁজ করতে করতে বাবা বলেছিলেন, “জাপানে জানিস তো, রিফ্রেশ পার্লার বলে একটা ব্যাপার আছে। মাথার খাটুনি বেশি হয়ে গেলে, সেখানে গিয়ে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে আসে ওখানকার মানুষ। জট পাকিয়ে যাওয়া চিন্তা ফের ঝরঝরে হয়ে ওঠে। আমাদের পোড়া দেশে সে-সবের ব্যবস্থা তো নেই। দীপঙ্কর তাই শেল্টার নিয়েছিল নার্সিংহোমে। আসলে অনেক আগেই অপরাধীকে চিহ্নিত করেছে, প্রয়োজন ছিল প্রখর যুক্তি দিয়ে তাকে উপস্থাপিত করা। সেবা-শুশ্রূষায় শুয়ে থেকে জাল বিস্তার করেছে যুক্তির।”
জাপানের প্রসঙ্গ উঠে পড়েছে দেখে, শুধু “ও!” বলে চুপ করে গিয়েছিল ঝিনুক। তবে বাবার কথার মধ্যে একটা সত্যি ছিল, দীপকাকুকে নার্সিংহোমে ভরতি করার সময় ডা. রায় বলেছিলেন, “ইনজুরি সেরকম সিরিয়াস নয়, বিকেলেই ছেড়ে দিতে পারব বলে মনে হচ্ছে।”
ঝিনুকের ফোন পেয়ে বাবা ততক্ষণে চলে এসেছিলেন। যন্ত্রণাকাতর দীপকাকুকে দেখে বলেছিলেন, “একটা-দুটো রাত রেখেই দিন ডাক্তারবাবু। বাড়িতে নার্সিং করার মতো কেউ নেই। কাজের বৃদ্ধাকে নিয়ে কলকাতায় একাই থাকে। বাবা, মা, আত্মীয়স্বজন থাকেন দেশের বাড়ি মেদিনীপুরে। যা কিছু টেস্টফেস্ট করার করে নিন, খরচ নিয়ে ভাবতে হবে না।”
সিটি স্ক্যান, এক্স রে, সবই হয়েছে। কিছুই পাওয়া যায়নি। নার্সিংহোম থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ঝিনুক, বাবা মিলে গাড়ি করে দীপকাকুকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলেন। সেখানে গিয়েও শয্যা নিলেন। এই ঘটনায় ঝিনুক একটা জিনিস বুঝে গিয়েছে, দীপকাকু একটু আতুপুতু টাইপের।
“কী রে, কী ভাবছিস এত?” বাবার ডাকে ভাবনায় ছেদ পড়েছিল।
ঝিনুক বলে, “কিছু না!” সোফা ছেড়ে উঠতে যাচ্ছে, বাবা বললেন, “চল, আমিও তোর সঙ্গে যাব। দেখে আসি দীপঙ্করের খেলটা।”
.
বাবার সঙ্গে গাড়িতে করে ঝিনুক এখন চলেছে অ্যারোর অফিসে। আশুদাই ড্রাইভ করছে। মাথায় ভিড় করে আসছে নানান প্রশ্ন, কে হতে পারে অপরাধী? সুজয়বাবুই যদি হন, এত তাড়াতাড়ি মিটিংটা ডাকা উচিত হয়নি। আর-একটু সুস্থ হতে দেওয়া যেত। অপরাধের মোটিভ কি পাওয়া গেল? চিত্রাদেবীর সঙ্গে কি অপরাধের কোনও যোগ আছে? ছদ্ম হ্যান্ডবিলওলা ওঁরই কাজের লোক। সম্ভবত ড্রাইভার। চাবি দিতে এসেছিল।
বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন, কেসটা নিয়ে ভাবছিলেন হয়তো। এখন বলে উঠলেন, “দীপঙ্কর কিন্তু রহস্য উপন্যাস থেকে ধার করে শেষ দৃশ্যটা করছে। সমস্ত পাত্রপাত্রীকে ডেকে মিটিং করে, তাদের মধ্যেই অপরাধীকে চিহ্নিত করা, সামলাতে পারলে হয়! রহস্যকাহিনির চরিত্ররা লেখকের ইচ্ছে অনুসারে কথা বলে। বাস্তবের চরিত্র কখন কী আচরণ করবে বোঝা মুশকিল। বিশেষ করে এই কেসের পাত্রপাত্রীরা যথেষ্ট বুদ্ধিমান। অঙ্কের নামে কোনও ধরনের ফ্যালাসি যদি করতে যায় দীপঙ্কর, শিয়োর ফেঁসে যাবে।”
বুকটা একটু ফাঁকা হয়ে যায় ঝিনুকের। নার্ভাস লাগছে। কে জানে কী করবেন দীপকাকু! এখনকার অনুভূতির সঙ্গে ঝিনুক হঠাৎই মিল খুঁজে পায় সেই দিনগুলোর। মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় রোজ সঙ্গে যেতেন বাবা। এরকমই ভয়-ভয় ভাব নিয়ে গাড়িতে বসে থাকত ঝিনুক।
.
অ্যারোর অফিসে পৌঁছে গিয়েছে ঝিনুকরা। মিটিং এখনও শুরু হয়নি। ঝিনুকদের অপেক্ষায় ছিলেন দীপকাকু। চেম্বারে আপাতত সাতজন। ঝিনুকরা তিনজন, তিন পার্টনার আর ডা. রায়। সবাইকে চা দেওয়া হয়েছে। টেবিলের মাঝখানে দুটো মিনারেল ওয়াটারের বোতল। ঝিনুক আশা করেছিল এই মিটিংয়ে রূপরেখা, লোটাস, আর্টলাইন-এর মালিকদের দেখবে। চিত্রাদেবীর কথাও মনে হয়েছিল, ডা. রায় কি ওঁর বদলে এসেছেন?
প্রশ্নটা ডা. রায় নিজেই তুললেন, “মি. বাগচী আমাকে কেন এই মিটিংয়ে ডাকা হয়েছে জানতে পারি কি?”
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দীপকাকু বললেন, “আপনাকে ডাকা হয়েছে সুজয়বাবুর স্বাস্থ্যের কারণে। আজ এমন কিছু অপ্রিয় কথা বলব, ওঁর পক্ষে চাপের হয়ে যাবে। সদ্য নার্সিংহোম থেকে বেরিয়েছেন।”
ডা. রায় একটু যেন নিশ্চিন্ত হলেন, ঝিনুক লক্ষ করেছে, দীপকাকু সঙ্গে একটা ব্রিফকেস এনেছেন, সেটা রাখা আছে ওঁর চেয়ারের পায়ার কাছে।
দীপকাকুকে মেজাজে চা খেয়ে যেতে দেখে অস্থির হচ্ছেন পার্থবাবু। বলেই ফেললেন, “নিন, শুরু করুন।”
মুখ তুললেন দীপকাকু। বললেন, “আমি প্রথমেই ধন্যবাদ জানাই অ্যারোর তিন ডিরেক্টরকে। এরকম একটা জটিল কেস ওঁরা ভরসা করে আমার হাতে তুলে দিয়েছেন। এক সময় মনে হয়েছিল, এ কেস আমার পক্ষে সল্ভ করা প্রায় অসম্ভব। অনেক ভেবে আমি একটা প্ল্যান তৈরি করি, অনেকটা অঙ্কের মতো তার ছক।”
দীপকাকু জুতোর বিজ্ঞাপনের প্ল্যানটা বলতে থাকেন। সবশেষে বললেন, “হিসেবমতো প্রমাণিত হয় খবর ফাঁস হচ্ছে সুজয়বাবুর থেকে। সেটা ওঁকে জানাতেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আমি নিশ্চিত ছিলাম, কোম্পানির গোপন খবর সুজয়বাবুর থেকে ফাঁস হলেও উনি সেটা করছেন না। কেননা, তদন্ত করে জেনেছি, কোম্পানির ক্ষতি করার কোনও অভিপ্রায় ওঁর ছিল না। ব্যাবসাটাকে নিজের চেয়েও বেশি ভালবাসেন। ওঁর উদ্যোগেই কোম্পানিটা খোলা হয়েছিল। এর থেকেই আমি ধরে নিই, সুজয়বাবুর অজ্ঞাতে কেউ ওঁর কাছ থেকে অ্যাড প্ল্যান বের করে নিচ্ছে।”
“সেটা কী করে সম্ভব?” প্রশ্নটা করলেন বাবা। বাকিরা গভীর মনোযোগে দীপকাকুর কথা শুনছেন।
“বলছি।” বলে, কাপের তলানিতে চুমুক দিলেন দীপকাকু। ফের শুরু করলেন, “সুজয়বাবু অসুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার নামী নার্সিংহোমে ভরতি করার বন্দোবস্ত করেছিলাম। কাকতালীয়ভাবে ফ্ল্যাটে এসে হাজির হন ডা. রায়। তাঁর আসাটাকে কো-ইনসিডেন্ট হিসেবে ধরলেও, সঙ্গে দু’জন নার্সিংহোমের স্টাফ আনাটা আমার কাকতালীয় মনে হয়নি।”
“আপনি ঠিক কী বলতে চাইছেন, বলুন তো?” রীতিমতো চেঁচিয়ে উঠলেন ডা. রায়। উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে বললেন, “অন্য নার্সিংহোম থেকে একটা অপারেশন সেরে আমি ফিরছিলাম। অপারেশন করতে যাওয়ার সময় দু’জন আসিস্ট্যান্ট আমার সঙ্গেই থাকে।”
হাতের ইশারায় ডা. রায়কে থামিয়ে দীপকাকু বললেন, “সুজয়বাবুকে যখন নার্সিংহোমে নিয়ে আসেন, আমি পিছনে ছিলাম। তখনই আপনার স্টাফদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, আধঘণ্টা আগে আপনি তাড়াহুড়ো করে দু’জন স্টাফ নিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে যান।”
“ওটা আধঘণ্টা নয়, প্রায় একঘণ্টা। আরোগ্য সদনে আমার অপারেশনটা ছিল মিনিট কুড়ির।” যথেষ্ট সপ্রতিভ হয়ে বললেন ডা. রায়। কেন জানি ঝিনুকের মনে হল, এটা অজুহাত। সময়ের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে চাইছেন ডাক্তারবাবু। দীপকাকু বললেন, “আরোগ্য সদনের ব্যাপারটা জানতাম না। ঠিক আছে, এনকোয়ারি করলেই সত্যিটা বেরিয়ে যাবে। যদি না আপনি এখান থেকে বেরিয়েই আরোগ্যর কর্তৃপক্ষকে টাকা খাইয়ে দেন।”
ডা. রায় ভীষণ গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে আছেন দীপকাকুর দিকে। ভ্রুক্ষেপ না করে দীপকাকু বলতে থাকেন, “রিপোজ অন নার্সিংহোম তথা ডাক্তার অজিত রায়ের বাড়িটা ঘুরে দেখতে গিয়ে আমাদের চোখে পড়ে চিত্রা এজেন্সির বোর্ড। সেখানে ঢুকে আমি প্রথম মোটিভের গন্ধ পাই। চকলেটের বিজ্ঞাপনের একটা ফোটো টাঙানো ছিল চিত্রাদেবীর চেম্বারে। মডেল ডা. রায়ের প্রয়াত সন্তান। অ্যাডটা তৈরি করেছিল অ্যারো কোম্পানি। চিত্রাদেবী বলেন, ক’দিন আগে ডা. রায় ওই ফোটোটা তাঁকে দেন। তখনই আমার মাথায় আসে, অ্যারোর সিন্দুক ভাঙার কথা। লকারের খোয়া যাওয়া জিনিসগুলোর যে লিস্ট আমার কাছে ছিল, চকলেটের বিজ্ঞাপনের ফ্লপি তার মধ্যে একটা।”
আবার তেড়েফুঁড়ে ওঠেন ডা. রায়, “এদের লকারের নম্বর আমি কী করে জানব? তা ছাড়া ওই ফ্লপিটা চাইলে কি সুজয়রা আমাকে দিত না? চুরি করতে হবে কেন?”
“দিতেন অবশ্যই। কিন্তু আপনি চাইবেন না। প্রয়াত সন্তানের প্রসঙ্গ এঁদের সামনে তুলতে চান না আপনি। ফ্লপিটা চুরির উদ্দেশ্যে সিন্দুক খোলেননি, উইল হাতানো ছিল উদ্দেশ্য। তিন পার্টনারের মধ্যে ঝগড়া লাগিয়ে দেওয়াই ছিল আপনার মূল লক্ষ্য। ফ্লপিটা ঘটনাচক্রে হাতে এসে যায়।”
মৃদু হাসছেন ডা. রায়। শ্লেষ মিশিয়ে বললেন, “মিস্টার বাগচী, আপনার অ্যানালিসিসের মধ্যে খানিকটা কল্পনা ঢুকে যাচ্ছে না? লকারের নম্বর জানি না, তবু চুরিটা আমিই করলাম?”
“আপনি নিজের হাতে করেননি, করিয়েছেন। সব একে-একে প্রমাণ করব আমি। আপনি প্লিজ, আমার বক্তব্য শেষ করতে দিন।”
বচসা সামলাতে উদ্যোগ নেন গৌতমবাবু। ডা. রায়ের উদ্দেশে বলেন, “দ্যাখ অজিত, তুই যদি নির্দোষ হোস, তা হলে এত রি-অ্যাক্ট করছিস কেন? ওঁকে বলতে দে। বিশ্বাস করা না-করা তো আমাদের ব্যাপার।”
একটু শান্ত হলেন ডাক্তারবাবু। দীপকাকু পূর্ণ উদ্যমে বলতে শুরু করলেন, “আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল বলেই চিত্রাদেবীর সঙ্গে কথা চলাকালীন ঘরে ঢোকে সেই লোক, যে বারবার আমাদের হুমকির চিঠি দিত। আমার ইশারায় ঝিনুক ফলো করতে গেল লোকটাকে। চিত্রাদেবীকে জিজ্ঞেস করলাম লোকটার পরিচয়। উনি বললেন, মাসচারেক হল ডাক্তারবাবু লোকটাকে চিত্রাদেবীর ড্রাইভার হিসেবে নিয়োগ করেছেন। ওই লোকটাকেই ঝিনুক একবার ধরেছিল নার্সিংহোমের সামনে। হ্যান্ডবিল দেওয়ার ছল করে আমার বাইকে হুমকির চিরকুট রাখতে এসেছিল। গার্ড, নার্সরা নতুন কাজের লোককে চিনতে পারেনি। ডা. রায়ের বাড়ি এমনিতেই বিশাল এবং তিনটে অংশে ভাগ করা। নার্সিংহোম, লিভিং এরিয়া, চিত্রা এজেন্সি। ডাক্তারবাবুর নির্দেশে লোকটা সামনের অংশে কখনওই যেত না।” একটু থেমে দীপকাকু বললেন, “ফলো করতে গিয়ে ঝিনুক ফিরছে না দেখে আমি বাইরে যাই। চোখে পড়ে সাদা অ্যাম্বাসাডর রাখা আছে পোর্টিকোর নীচে। গাড়ির নম্বর বাংলায় লেখা। ওই গাড়িটা একটু আগে নিয়ে এসেছে ড্রাইভার। চাবি দিতে এসেছিল মালকিনকে। সাদা গাড়িটা চেপে ডা. রায় যেতেন গড়িয়ার ফোন বুথে। ওখান থেকে যাবতীয় উড়ো ফোনগুলো করতেন।”
আবার একটা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন ডা. রায়। দীপকাকু তাঁর দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন, “বুথ অ্যাটেনডেন্টকে আমি এখনই ডেকে এনে আপনাকে শনাক্ত করাতে পারি।”
ক্রমশ অসহায় হয়ে উঠছে ডা. রায়ের চেহারা। বাবা বললেন, “এখনও তো মোটিভটা ক্লিয়ার হল না। ডাক্তারবাবু কেন এসব কাণ্ড করছিলেন?”
“বলছি।” বলে, ফের শুরু করলেন দীপকাকু, “ঝিনুককে খুঁজতে গিয়ে দেখি, ড্রাইভারের সঙ্গে মারামারি করছে। ধরতে যাই লোকটাকে। মার খাই। ভালই লোক জোগাড় করেছেন ডা. রায়। ব্যাটা ব্ল্যাকবেল্ট। যাই হোক, আমার আঘাত তেমন গুরুতর না হলেও, আমি ভান করি অসুস্থতার। ঝিনুককে বলি, ডা. রায়ের নার্সিংহোমে আমাকে ভরতি করতে। কারণ, অপরাধী এবং অপরাধের মাধ্যম দু’জনেই আছেন ওখানে। আমাকে বের করতে হবে, কেন তড়িঘড়ি নিজের নার্সিংহোমে সুজয়বাবুকে অ্যাডমিট করলেন ডাক্তারবাবু। চিকিৎসাবিজ্ঞানের হাত ধরেই কি অপরাধটা ঘটছে? ইতিমধ্যে আমি চিত্রাদেবীর সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, ছেলের মৃত্যুশোক ডা. রায় এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ওঁদের শোওয়ার ঘরে ছেলের একটা বিশাল ফোটো আছে। যার সামনে অনেক রাত অবধি জেগে বসে থাকেন ডাক্তারবাবু। সন্তান জন্মানোর পর থেকেই ডা. রায় আদরযত্নের ব্যাপারে ভীষণ বাড়াবাড়ি করতেন। চিত্রাদেবীর চোখে সেটা খানিকটা অস্বাভাবিক ঠেকত। সায়ন্তনের ফুলের মতো চেহারা আর বুদ্ধিদীপ্ত চনমনে ভাব দেখে, অনেক অ্যাড এজেন্সি চাইত মডেল করতে। বিজ্ঞাপন জগৎ সম্বন্ধে চিত্রাদেবীর বরাবরের আগ্রহ ছিল। উনি চাইতেন ছেলে মডেল হোক। ডা. রায় অনুমতি দিতেন না। বলতেন, ‘সবে তো ক্লাস থ্রি, বড় হতে দাও।”“ দম নিতে থামলেন দীপকাকু। এসি ঘরে বসেও তাঁর কপালে বিজবিজ করছে ঘাম। এত কথা গুছিয়ে বলার তো একটা ঝক্কি আছে! ফের শুরু করলেন, “ডা. রায় তখন কিছুদিনের জন্য বিদেশে। ফরেন ট্যুর ওঁকে হামেশাই করতে হয়। সুজয়বাবুরা সায়ন্তনকে মডেল করার প্রস্তাব নিয়ে আসেন সেই সময়। চিত্রাদেবী না করেননি। কর্তা বাড়ি নেই। পরে যখন জানবেন, খুব একটা রাগ করতে পারবেন না, সুজয়বাবুরা তো ওঁর স্কুলের বন্ধু। দুর্ঘটনা ঘটল সেই অ্যাডের ফোটো তোলার দিন। লোডশেডিং, এসি বন্ধ। সায়ন্তনকে অনেকক্ষণ বসে থাকতে হয়েছিল স্টুডিয়ো ফ্লোরে। অসুস্থ হয়ে পড়ে সে। পরে জানা গিয়েছে স্টুডিয়োয় আসার আগে মায়ের দেওয়া ব্রেকফাস্টটা জানলা গলিয়ে ফেলে দিয়েছিল সানি। যেমন প্রায়ই দিত। খালি পেটে ছিল সেদিন। খিদে পেয়েছে, বলতেও পারেনি মা-কে। ব্রেকফাস্ট ফেলে দেওয়াটা ধরা পড়ে যাবে। ধকল সহ্য হয়নি। পরের দিন মারা গিয়েছিল নার্সিংহোমে। বিদেশ থেকে সেই রাতেই ফিরে আসেন ডা. রায়। শুটিংয়ের ঘটনাটা শোনেন। সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে অ্যারো কোম্পানির উপর। মুখে কিন্তু কিছু বলেন না। আদ্যোপান্ত ভদ্রলোক তিনি। মনে মনে ঠিক করে নেন, অ্যারো কোম্পানিকে দেউলিয়া করে ছাড়বেন। প্রবল শোকে কোনও কোনও মানুষের মধ্যে এরকম প্রতিশোধস্পৃহা জাগে। কিন্তু কথা হচ্ছে, সায়ন্তনের মৃত্যুর জন্য সুজয়বাবুরা কতটা দায়ী? মৃত্যু যেভাবে হয়েছে তাতে বোঝা যায়, ছেলেটি ছোট থেকেই কোনও অসুখে ভুগছিল। ব্যাপারটা নিশ্চিতভাবে জানতে আমি নার্সিংহোমে ভরতি হয়ে চুরি করি সায়ন্তনের চিকিৎসার ফাইল। সেই রাতে আরও কয়েকটা কাজ সারি। সুজয়বাবুকে ভরতি করে প্রথমেই বুকের এক্স-রে করা হয়। প্লেটটা আমি হাতিয়ে নিই। ডা. রায়ের পুরো নার্সিংহোমটার আনাচকানাচে সন্ধান চালাই, যদি কেস সম্পর্কিত আরও কোনও ক্লু পাওয়া যায়। সেই সময়টা আমার
বেডে শুয়ে প্রক্সি দিচ্ছিল আমার এক পুলিশ-বন্ধু। সে ভিজিটিং আওয়ার্সে এসে টয়লেটে লুকিয়েছিল। সময়মতো আমার বেডে চলে যায়।”
নিশ্চয়ই রঞ্জনকাকু, আন্দাজ করতে পারে ঝিনুক। প্রত্যেকটা কেসে উনি ভীষণভাবে সাহায্য করেন দীপকাকুকে। ডিউটি করেন লালবাজার কন্ট্রোলে। ঝিনুক ক’দিন ধরে ভাবছিল, কেন এই কেসে এখনও ওঁর এন্ট্রি হয়নি। দেখা যাচ্ছে প্রবেশ-প্রস্থান দুটোই সারা হয়ে গিয়েছে।
দীপকাকু বলে যাচ্ছেন, “পরের দিন নার্সিংহোম থেকে আমাকে রিলিজ করা হয়। বাড়িতে বসে সায়ন্তনের ফাইল খুলি। ডাক্তার অলকেশ সেনের নাম পাই। যিনি একজন নামী হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ। ফাইল এবং সুজয়বাবুর বুকের এক্স-রে নিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করি। সায়ন্তনের ফাইল দেখে উনি বলেন, ডা. রায় ওঁর বন্ধু। সায়ন্তনের হার্টে জন্ম থেকেই একটা বড় গোলমাল ছিল। যে-কোনও মুহূর্তে ওর আয়ু সংক্ষিপ্ত হতে পারত। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ওই ধরনের রোগ নিয়ে জোরকদমে রিসার্চ চলছে। ব্যাড লাক, রিসার্চ ফলপ্রসূ হওয়ার আগেই চলে গেল সায়ন্তন। ওর রোগটার কথা চিত্রাদেবীর কাছে গোপন করে গিয়েছিলেন ডাক্তারবাবু। স্ত্রীকে রেহাই দিয়েছিলেন চিরকালীন উৎকণ্ঠা থেকে। শেষরক্ষা হল না।”
চেয়ারের পাশ থেকে ব্রিফকেসটা টেবিলে তুললেন দীপকাকু। বললেন, “এতেই আছে আমার সাক্ষ্যপ্রমাণাদি।”
খুলে ফেললেন বাক্স। বের করলেন একটা ফাইল। বললেন, “এর মধ্যে আছে সায়ন্তনের সব রিপোর্ট।” এরপর বেরল একটা ফ্লপি এবং চারটি ফুল সাইজের ফোটো। দীপকাকু বললেন, “এই ফ্লপিটা চুরি গিয়েছিল লকার থেকে। অ্যারো কোম্পানি সায়ন্তনের চারটে পোজে ফোটো তুলেছিল, ফোটোগুলো আমি ডাউনলোড করে নিয়েছি।”
ঝিনুক ফোটোগুলো নিয়ে দ্যাখে, ভাল লাগে সেই স্ন্যাপটাই, চিত্রাদেবীর চেম্বারে যেটা লাগানো ছিল। এটা তারই কপি। দীপকাকু সুজয়বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এবার আমি এমন একটা কথা বলব, আপনি কিন্তু ঘাবড়ে যাবেন না। বাস্তবিক ঘাবড়ানোর কিছু নেই।”
“আমি ঠিক আছি। আপনি বলুন।” আশ্বস্ত করেন সুজয়বাবু।
দীপকাকু এবার বের করলেন একটা এক্স-রে প্লেট। বললেন, “এটি সুজয়বাবুর বুকের ছবি।” প্লেটের এক জায়গায় আঙুল রেখে দীপকাকু বলে যান, “ডা. সেন এই বস্তুটি কী, ঠিক বুঝতে পারেননি। পেসমেকারের পাশে বসানো হয়েছে, পাঁজরের উপর। আমি এটা নিয়ে যাই ফরেনসিক ল্যাবে। তাঁরা পরীক্ষা করে বলেন, এটি একটি উন্নত প্রযুক্তির মাইক্রোফোনের ছবি, ব্যাটারিচালিত। হাফ ইঞ্চি সাইজ। চামড়ার তলায় থেকেও অনেক দূরের শব্দ ক্যাচ করতে পারে। আমি বুঝে যাই কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন ডা. রায়, যখন সুজয়বাবুর পেসমেকার বসান। পাছে অন্য নার্সিংহোমে গেলে ব্যাপারটা ধরা পড়ে যায়, সেই কারণেই তাড়াহুড়ো করে সুজয়বাবুকে ভরতি করেন নিজের নার্সিংহোমে। মাইক্রোফোনটি ডা. রায় কিনেছিলেন টোকিও থেকে। সায়ন্তন মারা যাওয়ার পর ডা. রায় মেডিক্যাল কনফারেন্সে একবার টোকিও যান। ওখানকার মার্কেটে এসব জিনিস আকছার মেলে। ছোট্ট মাইক্রোফোনটির ক্ষমতা এতটাই, রিসিভার সেন্টার পঞ্চাশ-ষাট কিলোমিটার দূরে থাকলেও চলে। সেন্টারটি ছিল ডা. রায়ের চেম্বারের পাশের ঘরে। তালা ভেঙে সেখানে আমায় ঢুকতে হয়েছে, সার্চ করে পাই পোর্টেব্ল ডিশ অ্যান্টেনা আর ল্যাপটপ। ল্যাপটপের সাহায্যে স্যাটেলাইটের ফ্রিকোয়েন্সি ম্যাচ করে রিসিভ করা হত মাইক্রোফোনের আউটপুট। সুজয়বাবুর আশপাশের সমস্ত কথা চলে আসত সেন্টারে। রেকর্ডেড হত সেগুলো। সময়মতো গিয়ে সে-সব শুনতেন ডা. রায়। খুবই সহজ হয়ে গিয়েছিল অ্যারো কোম্পানি তুলে দেওয়ার কাজ।” থামলেন দীপকাকু। ঝিনুক লক্ষ করে বাবাকে, চোখ জ্বলজ্বল করছে, এখানেও জাপানের জয়গান। মাইক্রোফোন, যন্ত্রপাতি যা পাওয়া গিয়েছে, সবই টোকিওর। দীপকাকু ফের শুরু করেন, “সন্তানশোক ডাক্তারবাবুকে পাগল করলেও বুদ্ধি নষ্ট করে দেয়নি। নানান চালে তিনি পর্যুদস্ত করছিলেন ভুল প্রতিপক্ষকে। যেমন একটা উদাহরণ দিই, গৌতমবাবু প্রেশার চেক করাতে গেলেন ডা. রায়ের কাছে। ওঁর মোবাইল থেকে মেসেজ পাঠানো হল ক্লায়েন্টকে। একফাঁকে অতি ক্ষিপ্রতায় কাজটি সেরেছিলেন ডা. রায়।”
বড় একটা শ্বাস নিয়ে একেবারেই চুপ করে গেলেন দীপকাকু। প্রত্যেকেই অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন, ডা. রায় ছাড়া। টেবিলে মাথা নামিয়ে দিয়েছেন উনি।
চশমার কাচ মুছে, গলা খাদে রেখে দীপকাকু বলতে থাকেন, “শোকসন্তপ্ত পিতার এই অদ্ভুত অপরাধের জন্য আপনারা কী শাস্তি দেবেন, নিজেরাই ঠিক করুন। পুলিশের কাছে যদি যান, আমি সাক্ষ্যপ্রমাণগুলো দিতে পারি। আপাতত আমার কাজ শেষ। শুধু একটা কথা, আপনারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, সুজয়বাবুর বুক থেকে মাইক্রোফোনটি বের করার ব্যবস্থা করুন।”
দীপকাকু ব্রিফকেস গুছিয়ে নিচ্ছেন। ঝিনুক সায়ন্তনের একটা ফোটো তুলে নেয়। যে ফোটোটা তার সবচেয়ে পছন্দের। রোল করে রাখে নিজের কাছে।
এতক্ষণ ঘরের সবাই যেন হিপনোটাইজড হয়ে বসেছিল। সংবিৎ ফিরছে। ডা. রায়ের কোনও বিচলন নেই। একই ভঙ্গিতে রয়েছেন অনেকক্ষণ। সুজয়বাবু আলতো করে পিঠে হাত রাখলেন বন্ধুর। বললেন, “কী হল তোর, এরকম করে আছিস কেন? তোর কষ্টটা আমরা বুঝি!”
মাথা তোলেন ডা. রায়। চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে। জড়ানো গলায় বললেন, “আমায় ক্ষমা করে দে সুজয়। ছেলেটা সবসময় আমার কানের কাছে বলে, ‘বাবা, তুমি এত বড় ডাক্তার হয়েও আমাকে বাঁচাতে পারলে না!’ কই, ওর মা-কে, তোদেরকে তো কিছু বলে না! ছেলেটাকে অভুক্ত রেখে তোরা শুটিং চালিয়ে গিয়েছিস?”
“শান্ত হ, শান্ত হ অজিত!” পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন সুজয়বাবু। পার্থবাবু, গৌতমবাবু এগিয়ে আসছেন সান্ত্বনা দিতে। ঝিনুকরা উঠে পড়ে।
.
কেসটা বড় করুণভাবে শেষ হল। গাড়িতে বাবা, দীপকাকু দু’জনেই গুম মেরে বসে আছেন। মনের ভার কমাতে ঝিনুক হাতে রাখা ফোটোটা খোলে। সায়ন্তনের হাসিটা সত্যিই কী প্রাণবন্ত! কে বলবে, ওর বুকে মারাত্মক রোগবালাই বাসা বেঁধে ছিল! ফোটোটা আজ যেন বেশি হাসছে! হবে না কেন, সানির কষ্টটা এতদিন ওর বাবা বয়ে বেড়াচ্ছিলেন। সেটা বাইরে এনে দিয়েছেন দীপকাকু। সায়ন্তন তাই খুব খুশি। ঝিনুকের আপশোস হয়, ছেলেটার সঙ্গে আলাপ হল ঠিকই, কিন্তু অনেক দেরিতে। যখন ও আর নেই!
