৯
অনিমেষবাবুর কেসে দীপকাকু এমন ঘনঘন ইউটার্ন মারছেন, তাল রাখা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে ঝিনুকের। হীরালাল বসুকে শনাক্ত করার ঠিক চারদিন পর, আজ সকালে দীপকাকু বাড়ি এসে বললেন, “চলো ঝিনুক, ব্যাপারটা ফয়সালা করে আসি।”
এমনভাবে কথাটা বললেন, যেন পুরনো কোনও ঝগড়া-বিবাদ মেটাতে যাচ্ছেন। আসল ঘটনা অন্য। সেদিন হীরালাল বসুকে অ্যারেস্ট করতে মানা করে দীপকাকু যখন ঝিনুককে বাইকে চাপিয়ে বাড়ি দিতে আসছেন, মোবাইল বেজে উঠেছিল ওঁর। বাইক থামিয়ে ফোনসেটের স্ক্রিন দেখলেন। রেকর্ডিং মোডে নিয়ে এসে স্পিকার অন করে, ‘হ্যালো’ বলার পর ওপ্রান্ত থেকে ভেসে এল পরিচিত গলা, সেই ছেলেটার। বলল, “আপনি তো আচ্ছা লোক মশাই, আমার প্রোপোজ়ালটা ‘ভেবে দেখছি’ বলেও কেসটা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন! আপনি ঠিক কী চান বলুন তো?”
আগের বারের মতো একই রকম বিনয়ে দীপকাকু বললেন, “দেখুন, এই কেসটা আমি টাকার জন্য নিইনি। সিমপ্যাথিটিক গ্রাউন্ড থেকে নিয়েছি। ওদের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ, সমাজের চোখে সম্মানটাও হারিয়েছেন।”
ওপ্রান্ত বলল, “সে-সব ভেবে এখন কী লাভ? দুটোই আর ফেরত পাওয়ার চান্স নেই।”
দীপকাকু বললেন, “একটা আছে। আপনারা তো অনেক টাকা গাপ করেছেন, কিছু টাকা ওদের ফ্যামিলিতে দিন।”
“কত?” জানতে চাইল ওপ্রান্তের ছেলেটা।
দীপকাকু বললেন, “দশ লাখ।”
টাকার অঙ্কটা রিপিট করল ছেলেটা। গলা শুনেই বোঝা যাচ্ছিল প্রচণ্ড চমকেছে। বলল, “আপনার মাথা খারাপ! আপনি কি মনে করেন, চল্লিশ-পঞ্চাশ লাখ নিয়ে সটকেছি আমরা? আরে বাবা, দশ লাখের স্বপ্ন ওরাও দেখে না। আপনি ওদের সঙ্গে কথা বলে নেগোশিয়েট করুন।”
“তাই হবে। ওঁরা কতটা চান জেনে নিই। আপনি কাল আমায় একটা ফোন করুন।” বলে, ফোন অফ করলেন দীপকাকু। বললেন, “সেই একই বুথের নাম্বার।”
গত চারদিন ধরে ঝিনুক ভেবে গিয়েছে, দীপকাকুর সিদ্ধান্ত কী হওয়া উচিত? বাবার সঙ্গে আলোচনা করেছে। কোনও মতামত দিতে পারেননি বাবা। আজ যখন সূর্যেন্দুবাবুর বাড়ির উদ্দেশে বেরচ্ছিল ঝিনুকরা, বাবা নিজের মতামত জানালেন, “তুমি কিন্তু তোমার কাজের এথিক্সের বাইরে যাচ্ছ দীপঙ্কর!”
দীপকাকু বললেন, “রজতদা, মানুষের কল্যাণের জন্য এথিক্স তৈরি হয়। এথিক্সের জন্য মানুষ নয়।”
শুনতে চমকদার হলেও যুক্তিটা যে বেশ বিভ্রান্তিকর, বুঝতে অসুবিধে হয়নি ঝিনুকের। তবে সে-সব নিয়ে আর মাথা ঘামায়নি, দীপকাকুর সঙ্গে চলে এসেছে সূর্যেন্দুবাবুদের বাড়িতে। এখানে এসে দেখছে, কথা বইছে অন্য খাতে। চা, চানাচুর সহযোগে দীপকাকু সূর্যেন্দুবাবুর কেরিয়ার প্ল্যান সম্বন্ধে জানতে চাইছেন। সূর্যেন্দুবাবু বলছেন, “এই কোম্পানিতে খুব বেশি কিছু উন্নতি হবে না আমার। আর চাকরির যা বাজার, অন্য কোথাও কিছু পাচ্ছি না।” বলা শেষ করেই সূর্যেন্দুবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু প্রমাণ জোগাড় হল হীরালাল বসুকে ধরার জন্য?”
দীপকাকু উত্তর দিতে যাবেন, শোনার জন্য ঝিনুক উদ্গ্রীব, অসময়ে বেজে উঠল ঘরের ফোন। জানলার পাশের কোণে ফোনস্ট্যান্ড। সূর্যেন্দুবাবু উঠে গিয়ে ফোন ধরলেন। ওপারের কথা শুনে, কান থেকে রিসিভার নামালেন। দীপকাকুকে বললেন, “আপনাকে চাইছেন।”
দীপকাকু নিজের মোবাইল ফোনটা দেখালেন। অর্থাৎ এটায় করতে বলুন। রিসিভার তুলে সে-কথা জানালেন সূর্যেন্দু। ওপারের বক্তব্য শুনে নিয়ে দীপকাকুকে বললেন, “বলছে, অসুবিধে আছে।”
দীপকাকু চকিতে ঝিনুকের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে বললেন, “জানলার মুখোমুখি রাস্তায় একজন দাঁড়িয়ে আছে। ধরবে। পালাতে দেবে না কিছুতেই।”
ত্বরিতগতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ঝিনুক। যাওয়ার আগে একঝলক দেখে নিল, সোফা থেকে নেমে দীপকাকু হামাগুড়ি দিয়ে ফোনের দিকে এগোচ্ছেন।
রাস্তায় এসে ঝিনুক দেখল, অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে দীপকাকুর কথা। উনি কি দেওয়াল ভেদ করেও দেখতে পান? চোখে তো এত মোটা কাচের চশমা!
সূর্যেন্দুবাবুদের বাড়ির জানলার দিকে ঠায় তাকিয়ে থাকা কাঠ-কাঠ চেহারার পিঠে টোকা মারল ঝিনুক। ভীষণ চমকে উঠে ঘাড় ফেরাল গুন্ডামতো লোকটা। ঝিনুক রীতিমতো ধমক দিয়ে জানতে চাইল, “কী চাই এখানে?”
লোকটা পালাতে উদ্যত হচ্ছিল, ঝিনুক দেখল, রেঞ্জেই আছে। পেট লক্ষ্য করে আড়াআড়ি চালিয়ে দিল পা। লোকটা তো ছিটকে পড়লই, তার চেয়ে অনেক ক্ষুদ্র একটা জিনিস পড়তে দেখে হতভম্ব হয়ে গেল ঝিনুক, পিস্তল!
লোকটা পিস্তলটা ফিরে পেতে যেই লাফাল, সামান্য জাম্প করে বাঁ পায়ে স্ট্রোক নিল ঝিনুক।
চোয়ালে লাগল লোকটার। ফুট চারেক দূরে গিয়ে পড়ল। ফেরার আর চেষ্টা করল না। বুঝে গেল, মার আসছে ক্যারাটে জানা মেয়ের কাছ থেকে। দৌড় লাগাল লোকটা। ব্যাড লাক, মারুতি ভ্যানের গায়ে ধাক্কা লেগে পড়ে গেল। ঝিনুকের মনে হচ্ছে, মারুতিটা ওকে রেসকিউ করতে এসেছিল। কেননা, দরজা খোলা ছিল গাড়িটার। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে লোকটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে! এসব ভাবতে ভাবতেই দৌড়ে গিয়ে দুষ্কৃতীকে ধরে মাটিতে ফেলে দিল ঝিনুক। হাঁটু দিয়ে চেপে রাখল গলা। পাশ থেকে ভেসে এল দীপকাকুর কণ্ঠ, “ছেড়ে দাও। একটা ট্যাক্সি ধরো তাড়াতাড়ি। একে মালিকের কাছে নিয়ে যেতে হবে।”
দীপকাকুর হাতে এই প্রথম পিস্তল দেখল ঝিনুক। তাক করা আছে লোকটার দিকে। আন্দাজ করা যায়, পিস্তলটা দুষ্কৃতীরই। কী স্মার্ট লাগছে দীপকাকুকে!
বিস্ময় কাটিয়ে ঝিনুক চোখ বোলাল রাস্তায়। ওই তো একটা ফাঁকা ট্যাক্সি আসছে!
