১
ফুটপাত ধরে হাঁটছে ঝিনুক। মুর অ্যাভিনিউ ছেড়ে চণ্ডী ঘোষ রোডে ঢুকতেই টের পায়, একটা গাড়ি তাকে ফলো করছে। কখন থেকে করছে কে জানে! গিয়েছিল কাছেই, শ্রবণাদের বাড়ি। শ্রবণার নতুন ডিভিডি প্লেয়ার দেখতে। ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে অন্যমনস্ক ছিল ঝিনুক। ভাবছিল, বাবাকে কীভাবে কনভিন্স করবে একটা ডিভিডি কিনে দেওয়ার জন্য। তখন থেকেই কি ফলো করছে গাড়িটা? হঠাৎ ফলো করারই-বা কী হল! সে তো এই সময় দীপকাকুর কোনও কেসে অ্যাসিস্ট করছে না। তা হলে কি পুরনো কোনও শত্রু?
সেই আশঙ্কাও বেশ কম। এ পর্যন্ত দীপকাকুর সঙ্গে যে ক’টা তদন্তে সে ছিল, শত্রু জিইয়ে থাকার মতো পরিস্থিতি নেই। তবু বলা তো যায় না!
গাড়ির লোকটার আসল উদ্দেশ্য কি ঝিনুকদের বাড়িটা চিনে রাখা? বাড়ি এখান থেকে মিনিট দেড়েক। ওই তো উলটো দিকের ফুটপাতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আর-একটু এগিয়ে ঝিনুক রাস্তা ক্রস করবে। কিন্তু লোকটার উদ্দেশ্য তো সফল হতে দেওয়া যায় না। মোটামুটি ফিট পাঁচেকের দূরত্ব বজায় রেখে গড়িয়ে আসছে গাড়ি। কিছু একটা করতেই হয়!
হঠাৎই হোঁচট খাওয়ার ভান করে দাঁড়িয়ে গেল ঝিনুক। ড্রাইভারটা ফলো করায় তেমন পোক্ত নয়। এসে পড়েছে ঝিনুকের পাশে। এমনটাই চাইছিল ঝিনুক। সরাসরি ড্রাইভারের জানলার কাছে গিয়ে জানতে চায়, “কী ব্যাপার বলুন তো, ফলো করছেন কেন আমাকে?”
ঝিনুকের রুদ্রমূর্তি দেখে ঘাবড়ে গিয়েছে ড্রাইভার। ব্রেক কষেছে গাড়ির। মুখ থেকে কথাও বেরচ্ছে না তার। একদম নিরীহ, বয়স্ক মানুষ। ফলো করার মতো কাজ এদের মানায় না। ঝিনুক ফের একবার ধমকাতে যাবে, পিছনের সিটে বসে থাকা সাহেবি চেহারার এক ভদ্রলোক বলে উঠলেন, “এক্সকিউজ মি, অ্যাকচুয়ালি হয়েছে কী, পিছনের মোড়ে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, রজত সেনের বাড়ি কোথায়? বলল, এই সামনে। তারপর তোমাকে দেখিয়ে বলল, মেয়েটা যে বাড়িতে ঢুকবে, ওটাই রজত সেনের বাড়ি। কিন্তু তুমি তো হেঁটেই যাচ্ছ!”
হাসির বুড়বুড়ি ভেসে উঠতে চাইছে ঝিনুকের মুখে, গাড়ির ভদ্রলোক পড়েছিলেন কোনও বেআক্কেলের পাল্লায়। হাসি চেপে ঝিনুক বলে, “আমি রজত সেনের মেয়ে।”
ভদ্রলোক বললেন, “তেমনটাই আন্দাজ করেছি। তোমাকে আর জিজ্ঞেস করিনি, সামনেই যখন বাড়ি, বাড়িতেই আলাপ হবে।” একটু থেমে আশঙ্কার গলায় বললেন, “আমরা তোমাদের বাড়ি ছাড়িয়ে যাইনি তো? তুমি কি অন্য কোথাও যাচ্ছ?”
“না, না! ওই তো আমাদের বাড়ি।” আঙুল তুলে দেখায় ঝিনুক।
গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, “যাক, এসে গিয়েছি। তুমি উঠে এসো গাড়িতে।”
গাড়ির নরম সিটে বসার পর চকিতে ঝিনুকের খেয়াল হয়, “কাজটা কি ঠিক করলাম? এরা আমাকে অপহরণ করবে না তো?”
ভয় অমূলক। ড্রাইভার স্টিয়ারিং ঘুরিয়েছে ঝিনুকদের গেট লক্ষ করেই। দীপকাকুর সঙ্গে কাজ করে সন্দেহ করাটা বাতিক হয়ে গিয়েছে। খুবই বিনয়ের সঙ্গে ঝিনুক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করে, “আপনার সঙ্গে কি বাবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল?”
ভদ্রলোক একটু অপ্রস্তুত হলেন। উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইলেন, “কেন, উনি কি বাড়ি নেই? আজ তো সানডে। আমাকে বলেছিলেন, রবিবার সকালের দিকে মোটামুটি বাড়িতেই থাকেন।”
ঝিনুক কোনও উত্তর দেয় না। আসলে আন্দাজ করতে চাইছে, ভদ্রলোকের আগমনের কারণ। বিলাসবহুল গাড়ি চেপে আজ সকালে তো কারও আসার কথা ছিল না। থাকলে বাবা বলতেন। ঝিনুককে সব কথাই বলেন বাবা
গেটের কাছে এসে থামল গাড়ি। নেমে আসে ঝিনুক। নিজেদের বাগানে চোখ পড়তে টের পায়, শুধু বাবা নন, দীপকাকুও আছেন বাড়িতে। টগর গাছের পাশে দাঁড় করানো আছে দীপকাকুর সদ্য কেনা বাইক। অবাক হয় ঝিনুক! দীপকাকু ইদানীং রবিবারগুলোতেও আসতে পারেন না। তাঁর নাকি পসার জমে উঠেছে। একটাই দুঃখ, সে-সব কেসে অ্যাসিস্ট করতে ঝিনুককে ডাকেন না।
ভদ্রলোক নেমে এসেছেন গাড়ি থেকে। বেশ ভাল হাইট। গাড়িতে বসেছিলেন বলে বোঝা যায়নি। বয়স সম্ভবত ষাটের এদিক-ওদিক। পয়সাওলা সম্ভ্রান্ত চেহারা। ঝিনুক বলে, “আসুন। বাবা বাড়িতেই আছেন।”
.
কিছুক্ষণ অন্তর দু’বার ডোরবেল টিপেও দাঁড়িয়ে থাকতে হল ঝিনুকদের। এরকমটা তো হওয়ার কথা নয়! বাবা বা দীপকাকু, কেউই এখন আর দাবার বোর্ডে বুঁদ হন না। বেশিরভাগ সময় দীপকাকুর কাছে হারতে হারতে দাবার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে গিয়েছে বাবার। তা হলে কী নিয়ে দু’জন এত ব্যস্ত? আন্দাজ করার চেষ্টা করে ঝিনুক। মা নিশ্চয়ই কিচেনে জেদ ধরে বসে আছেন, সামনের ঘরে থাকতেও বাবা কেন দরজা খুলবেন না!
তৃতীয়বার বেল টিপতে যেতেই দরজা খুলে গেল। সামনে বাবা। ঝিনুকের পাশের ভদ্রলোকটিকে দেখে অবাক হয়েছেন।
ভদ্রলোক বলে উঠলেন, “কী হল মশাই, এর মধ্যেই ভুলে গেলেন! মনে নেই, সান্তাক্রুজ এয়ারপোর্ট! অক্টোবর মিল….”
আর বলতে হল না। বাবার মুখে লজ্জা পাওয়া হাসি। বলে উঠলেন, “সরি, সরি মিস্টার ঘোষ। আপনি আসুন। ভিতরে এসে বসুন।”
দরজার পাশে জুতো খুলছেন ভদ্রলোক। ঝিনুক চটি ছেড়ে ঘরের ভিতরে আসে। এখন অবধি যা বোঝা গেল, গত অক্টোবরে অফিসের কাজে বাবা মুম্বই গিয়েছিলেন। সম্ভবত তখনই এয়ারপোর্টে মিস্টার ঘোষের সঙ্গে আলাপ। এটা জানুয়ারি মাস। এর মাঝে বাবার সঙ্গে ফোনেও কথা হয়নি ভদ্রলোকের। কোনও বিশেষ দরকারে মিস্টার ঘোষ সরাসরি বাড়িতে এসে হাজির। কিন্তু ফোন করে এলেন না কেন?
আপাতত দীপকাকুর আসার কারণটা পরিষ্কার। আগেই সেটা ধরে ফেলা উচিত ছিল ঝিনুকের। লম্বা সোফাটার কোণে বসে রুবিক কিউব নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন দীপকাকু। বাবা দীপকাকুর সঙ্গে মিস্টার ঘোষের পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন, “এ হচ্ছে দীপঙ্কর। দীপঙ্কর বাগচী। আমার খুবই স্নেহভাজন, নিজের ভাইয়ের মতো।” চোখ তুলে সৌজন্যের হাসি হেসে ফের রুবিক কিউবে মগ্ন হয়ে গেলেন দীপকাকু।
রুবিক কিউবটা ঝিনুকের চার বছরের বাতিল খেলনা। গত পরশু বাবা অফিস থেকে ফিরে গেমটার খোঁজ করতে শুরু করেন। ঝিনুক বলেছিল, “কী হবে ওটা নিয়ে? ওসব আজকাল আর কেউ খেলে না। ব্যাকডেটেড হয়ে গিয়েছে।”
“হোক, তুই নিয়ে আয়। বেশিরভাগ লোক ওটা সল্ভ না করতে পেরে তুলে রেখে দিয়েছে। ওর মতো গেম হয় না!”
কিউবটা এনে বাবাকে দিয়েছিল ঝিনুক। এবং কী আশ্চর্য, আধঘণ্টার মধ্যে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে বাবা ছ’দিকে ছটা রং এনে ফেলেন। ঝিনুকের তো চোখ বড় বড়, এই প্রথম তার কিউবে ছ’টা রং আলাদা! মা-কে দেখাতে কিউবটা নিয়ে দৌড়য় কিচেনে। মা বলেন, “আচমকা হয়ে গিয়েছে। দে, ঘেঁটে দিই।”
ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফের রং মিশিয়ে দেন মা। বাবার কাছে ফেরত আসে ঝিনুক। সেইবারেও ফের খানিকক্ষণ ঘুরিয়ে কিউবটা আগের পজিশনে এনে দেন বাবা। তখনই বলেছিলেন, “দীপঙ্করকে একবার ডেকে পাঠাতে হবে। দেখি, ও পারে কি না! খুব তো বড় বড় কেস সল্ভ করছে!”
সেই ডাকে সাড়া দিয়ে দীপকাকু এখন জড়িয়ে গিয়েছেন রুবিক কিউবের ধাঁধায়। বাবার অফিসে নতুন একজন জয়েন করেছে, সে বাবাকে শিখিয়ে দিয়েছে সমাধানের সূত্র।
মিস্টার ঘোষ এসে বসেছেন বাবার মুখোমুখি সোফায়। উনি তো জানেন না, বাবা-দীপকাকুর রিলেশন, যেন স্কুলের ক্লাসমেট! কম্পিটিশন, বন্ধুত্ব একসঙ্গে। সাগ্রহে কথা বলে যাচ্ছেন ঘোষবাবু। মুখে শুকনো হাসি নিয়ে বাবা হুঁ, হাঁ করতে করতে বারেবারে তাকাচ্ছেন দীপকাকুর হাতের দিকে, সল্ভ করে ফেলবে কি দীপঙ্কর?
বাবা আর মিস্টার ঘোষের কথোপকথনে ঝিনুক যতটুকু উদ্ধার করল তা হচ্ছে— মুম্বই এয়ারপোর্ট থেকে কলকাতা অবধি বাবা আর মি. ঘোষ নানান বিষয়ে গল্প করতে করতে এসেছেন। তার মধ্যে বাবা ‘সিকিউরিটি ইদানীং কত আধুনিক হয়েছে’ সেই বিষয়ে বেশকিছু ইনফরমেশন দেন। বাবা যেহেতু সিকিউরিটি এজেন্সির মালিক এবং এক্স-মিলিটারিম্যান, সুরক্ষা বিষয়ে জ্ঞান যথেষ্টরও বেশি। মিস্টার ঘোষ নামী অ্যাড এজেন্সির এক-তৃতীয়াংশর মালিক। বাবার দেওয়া তথ্যগুলো গল্পের মতোই শুনেছিলেন। তখন কে জানত, আর ক’মাস পরেই বাবাকে তাঁর ভীষণ প্রয়োজন হয়ে পড়বে! ইতিমধ্যে বাবার দেওয়া কার্ডটাও তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। শুধু মনে আছে, কথায় কথায় বাবা বলেছিলেন, “মুর অ্যাভিনিউ ছেড়ে চণ্ডী ঘোষ রোডে ঢুকেই আমার বাড়ি। রবিবার সকালে মোটামুটি বাড়িতেই থাকি।”
কার্ড হারিয়ে ফেলার দরুন মিস্টার ঘোষ ফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে পারেননি। তার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়ে মিস্টার ঘোষ, মানে সুজয় ঘোষ (ইতিমধ্যে পুরো নামটা জেনেছে ঝিনুক) নিজের সমস্যার কথা গুছিয়ে বলতে যাবেন, বাবা বলে উঠলেন, “ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, আপনি যদি পাঁচটা মিনিট সময় দেন, দীপঙ্কর পারে কি না একটু দেখে নিই।”
সামান্য হকচকিয়ে গিয়ে চুপ করে গেলেন সুজয় ঘোষ। একবার ঝিনুকের দিকে তাকালেন। সামান্য রুবিক কিউব নিয়ে দুই বয়স্ক মানুষের এত মনঃসংযোগ কেন, তাঁর ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না!
বিজ্ঞাপন কোম্পানির ডিরেকটার সুজয় ঘোষকে এরকম অসহায়ভাবে বসে থাকতে দেখে ঝিনুকের ছেলেবেলার একটা কথা মনে পড়ে গেল। তখন ক্লাস ফোরে পড়ে ঝিনুক। এক-দু’দিন অন্তর দেওয়ালে ঠেস দিয়ে লুকিয়ে নিজের হাইট মাপত। পেনসিলে দাগ দিত মাথার উপর। বাবা ব্যাপারটা লক্ষ করেছিলেন। একদিন ধরলেন, “হ্যাঁ রে, তুই রোজ হাইট মাপিস কেন? মানুষ কি ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ে নাকি?”
ঝিনুক অত্যন্ত সরল একটি উত্তর দিয়েছিল, “কেন, আমাকে যে মা রোজ ‘সুপার মিল্ক’ দেয়!”
“তাতে কী হল?” অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলেন বাবা।
ঝিনুক বলেছিল, “পেপারে, টিভিতে দ্যাখো না, সুপার মিল্ক খেয়ে বাচ্চারা কত তাড়াতাড়ি লম্বা, স্ট্রংগেস্ট হয়ে যাচ্ছে!”
হো হো করে হেসে উঠেছিলেন বাবা। হাসি থামিয়ে বলেছিলেন, “ওসব হচ্ছে অ্যাড এজেন্সির কেরামতি!”
“অ্যাড এজেন্সি মানে কী বাবা?” জানতে চেয়েছিল ঝিনুক।
বাবা তখন বুঝিয়ে বলেন, “এই যে চারদিকে সাইকেল, বিস্কুট, দুধ, গেঞ্জি … বিভিন্ন জিনিসের বিজ্ঞাপন দেখিস, এগুলো কোম্পানি নিজে বানায় না, একটা এজেন্সিকে বরাত দেয় নিজেদের প্রচারের। এজেন্সির কাজই হচ্ছে নানান কোম্পানির বিভিন্ন জিনিসের গুণাগুণ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রচার করা। ওগুলো পুরোপুরি বিশ্বাস করা বোকামি!”
“এজেন্সিগুলো তা হলে মিথ্যেবাদী, বাবা?” বলেছিল ঝিনুক।
“না, না, মিথ্যেবাদী হতে যাবে কেন? ওটাই ওদের কাজ! এই যে লেখকরা কত গল্প-কাহিনি লেখেন বানিয়ে বানিয়ে, আমরা কি বিশ্বাস করি? জানি ওটা গল্প, তবে অনেকটা সত্যির মতো। এজেন্সির লোকরাও সত্যির উপর কল্পনা জুড়ে দেন। খুবই বুদ্ধিমান, গুণী মানুষ ওঁরা।”
সুজয়বাবু সেই বুদ্ধিমান শ্রেণির মানুষ। দুই পরিণত মানুষের ছেলেমানুষির সামনে অনেকক্ষণ হল বোকা হয়ে বসে আছেন। ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ জমানোর মতো কথা খুঁজে পাচ্ছে না ঝিনুক।
হঠাৎই সুজয় ঘোষের দিকে না তাকিয়ে দীপকাকু বলে উঠলেন, “আপনি নিশ্চয়ই খুব বোর হচ্ছেন। ততক্ষণ নিউজ পেপারটা পড়ুন না। সকালে উঠে ভাল করে কাগজটাই তো পড়া হয়নি আপনার।”
কপালে কয়েক ধাপ ভাঁজ পড়ল সুজয় ঘোষের। অবাক কৌতূহলে জানতে চাইলেন, “আপনি কী করে জানলেন, এখনও পেপার পড়িনি আমি?”
“মর্নিংওয়াকে বেরিয়ে এমন কোনও সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন, জাস্ট ড্রেসটা চেঞ্জ করে চলে এসেছেন এখানে।”
দীপকাকুর কথা শুনে মিস্টার ঘোষ পৌঁছে গিয়েছেন বিস্ময়ের শেষ সীমায়। ফ্যালফ্যালে দৃষ্টিতে একবার ঝিনুক, পরের বার বাবার দিকে দেখছেন।
দীপকাকুর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার নমুনা বহুবার পেয়েছে ঝিনুক। তবু পুরনো লাগে না। সবচেয়ে মজা লাগে, যার উপর সেটা প্রয়োগ করা হচ্ছে, তার বোকা হয়ে যাওয়া দেখে।
অবাক হওয়ার প্রাথমিক ধাক্কা সামলে সুজয় ঘোষ জানতে চাইলেন, “আপনি কি জ্যোতিষচর্চা করেন? যা যা বললেন, অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল!”
বাবা, ঝিনুকের মুখে মিটিমিটি হাসি। সুজয়বাবু আবার বললেন, “আপনি নিশ্চয়ই বিখ্যাত কোনও অ্যাস্ট্রোলজার। আমি আসলে খবর রাখি না, তাই…”
দীপকাকু একই রকম সিরিয়াস। এবারও সুজয়বাবুর দিকে না তাকিয়ে বললেন, “জ্যোতিষীদের মতো অত ক্ষমতা আমার নেই। স্বচ্ছ দৃষ্টি, বুদ্ধি আর কিছুটা বিশ্লেষণ ক্ষমতা থাকলেই, যে কেউ এটা বলতে পারবে।”
“এটা আপনার বিনয়। সত্যিই বলুন না, কী করে বললেন কথাগুলো?”
উত্তর দেওয়ার খুব একটা ইচ্ছে নেই দীপকাকুর। কিউবটা নানান ভাবে ঘুরিয়ে চলেছেন। চেষ্টা করছেন আপ্রাণ। দুটো পিঠ মিলিয়ে ফেলেছিলেন। ঘেঁটে দিতে হয়েছে। ছ’টা রং মেলাতে গেলে, একবারেই করতে হবে।
এদিকে ঝিনুকেরও জানতে ইচ্ছে করছে, দীপকাকু কী করে এতগুলো ব্যাপার মেলালেন। বাবার অবস্থাও একই। বলে উঠলেন, “ছেড়ে দাও দীপঙ্কর। তুমি পারবে না। অনেক ট্রাই করেছ। এবার আমাদের কৌতূহলটা মেটাও দেখি।”
কিউব থেকে মুখ তুললেন দীপকাকু। বললেন, “না, এখনই হাল ছাড়ছি না। তবে আপনাদের ধাঁধায় রেখে নিজের গুরুত্ব বাড়ানোটাও শোভন নয়।” একটু বিরতি নিয়ে বলতে শুরু করলেন, “মিস্টার ঘোষের মোজা তোয়ালে কাপড়ের, রং সাদা। এগুলো জগিং শু-র মোজা। মর্নিংওয়াক থেকে ফিরে মোজাটা না খুলে কালো শু পরে নিয়েছেন। হাতের ঘড়িটা ঠিক অফিসিয়াল নয়, ফোমের চওড়া ব্যান্ড, ইচ্ছেমতো স্টপওয়াচ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। শার্ট, ট্রাউজার গতকাল অফিসে পরে গিয়েছিলেন। শার্টের ইস্তিরি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। পকেটে বেশকিছু কাগজ। টোল ট্যাক্সের রিসিট দেখা যাচ্ছে। এখানে আসতে গেলে কোথাও রোড ট্যাক্স দিতে হয় না। মনে হয়, কাল ওঁকে সেকেন্ড হুগলি ব্রিজ ব্যবহার করতে হয়েছিল। অ্যাড এজেন্সির এমডি-র এরকম অমনোযোগী পোশাকের একটাই কারণ, আচমকা কোনও উদ্বেগ। গত রাতে সব ঠিকঠাক ছিল, মর্নিংওয়াকে বেরিয়েছিলেন। তারপরই গোলমাল। বিষয়টা অবশ্যই সুরক্ষা সম্পর্কিত, খানিকটা গোপনীয় বটে, নয়তো উনি পুলিশের কাছে যেতেন। সেজন্যই মনে পড়েছে রজতদার কথা।”
“ব্রিলিয়ান্ট! আপনি তো একেবারে জিনিয়াস মশাই!” প্রবল আবেগে বলে উঠলেন সুজয় ঘোষ। দীপকাকুর কাছে জানতে চাইলেন, “আপনার অ্যাকচুয়াল প্রফেশনটা কী, একটু বলবেন? আপনার দাদা তো শুধু স্নেহভাজন বলেই ছেড়ে দিলেন। আপনি কি পুলিশের ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চে আছেন?”
দীপকাকুর চোখ আবার রুবিক কিউবে। মোটা কাচের চশমাটা খুলে একবার রুমাল দিয়ে মুছেও নিলেন। যেন চশমার অস্পষ্টতার জন্য খেলাটা পারছেন না।
বাবা বললেন, “দীপঙ্করের আসল পরিচয় পরে দিচ্ছি। এখন বলুন তো, সিকিউরিটি নিয়ে কী প্রবলেম হয়েছে আপনার? কোনও জিনিস চুরি গিয়েছে বা যাচ্ছে?”
“হ্যাঁ মশাই, মারাত্মক চুরি! পদ্ধতিটা ভীষণ জটিল। চুরিটা হয়েই চলেছে। চোরকে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। সে একজন না অনেকজন সেটাও ধরতে পারছি না আমরা। একেবারে পথে বসিয়ে ছাড়ছে আমাদের।”
“আমাদের মানে?” জানতে চাইলেন বাবা।
দীপকাকুও একবার ঘাড় ফেরালেন এই কথায়। ঠিক তখনই পরদা সরিয়ে ঘরে ঢুকলেন মা। হাতে ট্রে। দামি কাপে চা, বড় প্লেটে স্ন্যাকস। কোন ফাঁকে দেখে নিয়েছেন, সকালের অতিথিটি অভিজাত শ্রেণির। নইলে সহজে মায়ের শখের কাপ আলমারি থেকে বেরয় না। কাপ-ডিশ ভাঙার ব্যাপারে ঝিনুকের হাতযশ আছে। সে কারণেই ঝিনুককে না ডেকে চা-টা মা নিজেই নিয়ে এসেছেন। সেন্টার টেবিলে ট্রে নামিয়ে ঝিনুকের উদ্দেশে মা বললেন, “বাইরে থেকে এলি, যা, চেঞ্জ করে নে।”
ঝিনুক চুপ করে থাকে। মনে মনে বলে, “চেঞ্জ করার আর সুযোগ পেলাম কোথায় মা? এখানে যা সব এক্সাইটিং ব্যাপার হচ্ছে!”
মায়ের সঙ্গে মিস্টার ঘোষের আলাপ করিয়ে দিলেন বাবা। ঘোষবাবু সত্যিই খুব উদ্বিগ্ন। সৌজন্যমূলক হেসে নমস্কার সারলেন। ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে মা একবার তাকালেন ঝিনুকের দিকে। চোখের ভাষা পড়ে নিল ঝিনুক, “বড়দের মধ্যে বসে কী করছ! নিজের কাজে যাও।” কিন্তু ঝিনুককে এখন এ ঘর থেকে নড়ানো খুব মুশকিল।
বাবা ফের জানতে চাইলেন, “আমাদের বলতে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?”
চায়ে চুমুক দিয়ে সুজয় ঘোষ বললেন, “কোম্পানির কথা বলছি।”
“কী চুরি গিয়েছে?” এই প্রশ্নটা দীপকাকুর।
“কনসেপ্ট।”
“আর-একটু ভেঙে বলুন।” এবারও দীপকাকু।
বাবা উৎসাহিত হয়ে বলে উঠলেন, “তা হলে দীপঙ্কর, পারলে না তো! হার মেনে নিলে? রুবিক কিউব দাবার চেয়েও কঠিন।”
“হ্যাঁ, রজতদা। মেনে নিলাম।”
বাবার চোখে-মুখে ছোটদের মতো জেতার আনন্দ। বললেন, “দ্যাখ ঝিনুক, তোর গুরুকে কেমন কাত করে দিলাম!”
এই সিচুয়েশনে ঝিনুকের মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়। বাবা জিতলে আনন্দ, দীপকাকু হারলে দুঃখ। সে যে ঠিক কার সাপোর্টার বুঝে উঠতে পারে না! তবে এই মুহূর্তে দীপকাকুর হার স্বীকার করে নেওয়ার কারণ যে মিস্টার ঘোষের সমস্যা, সেটা বোঝা খুব সোজা।
বাবার দিকে তাকিয়ে ঘোষবাবু বলতে শুরু করেছেন, “ঠিক করেছিলাম আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসা এবং আলোচনাটা সিক্রেট রাখব। কিন্তু আপনার স্নেহভাজনের সঙ্গে কথা বলে মনে হচ্ছে, উনিও আমাকে হেল্প করতে পারেন।”
“অবশ্যই পারবে! আপনি বলুন।” সায় দিলেন বাবা।
“আমাদের এজেন্সির নাম ‘অ্যারো’। শুনেছেন নিশ্চয়ই?”
“শুনেছি। লাস্ট কয়েক বছরের মধ্যে আপনাদের এজেন্সি বিজ্ঞাপন দুনিয়ায় উপরের সারিতে উঠে এসেছে।” বললেন দীপকাকু।
ঝিনুকের অত ফান্ডা নেই, সে শুধু শুনে যাচ্ছে। মিস্টার ঘোষ বলতে থাকেন, “এখন থেকে পনেরো বছর আগে আমরা তিন বন্ধু মিলে এজেন্সিটা খুলি। তার আগে আমরা তিনজনেই ভিন্ন কোম্পানির উঁচু পদে চাকরি করেছি। হঠাৎ মনে হয়েছিল, আর চাকরি নয়, স্বাধীনভাবে কিছু করা যাক।”
“আপনাদের বন্ধুত্ব কত দিনের?” কথার মাঝে জানতে চাইলেন দীপকাকু
“স্কুলবেলার বন্ধু আমরা। আমি আর গৌতম এক পাড়ায় থাকি। পাশের পাড়ায় পার্থ। ছেলেবেলায় একসঙ্গে খেলাধুলো করেছি, কত দুষ্টুমি করেছি। জমাটি বন্ধুত্ব ছিল আমাদের।” বলতে বলতে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিলেন সুজয়বাবু।
“তারপর?” বলে, দীপকাকু খেই ধরিয়ে দিলেন।
“গোড়ায় এজেন্সিটা দাঁড় করাতে আমাদের প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে। কোম্পানিটা দাঁড়িয়ে যাওয়ার প্রধান কারণটাই কিন্তু হচ্ছে আমাদের গভীর বন্ধুত্ব এবং পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস। বেশ কয়েক মাস ধরে আমাদের কোম্পানি পড়েছে বিচ্ছিরি সমস্যায়। নিজেদের মধ্যে বিশ্বাসটাতেই ফাটল ধরে যাচ্ছে।” একটু দম নিয়ে সুজয় ঘোষ বলতে থাকেন, “আপনারা হয়তো জানেন, অ্যাড এজেন্সির সবচেয়ে বড় সমস্যা ‘কনসেপ্ট’ চুরি হয়ে যাওয়া। ধরুন, কোনও একটা প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপন তৈরি করলাম আমরা, মানে ড্রয়িং, স্লোগান। কাস্টমারকে দু’-চারটে নমুনা দেখালাম। একটা অ্যাপ্রুভ হল। দেখা যাচ্ছে, আমরা পাবলিশ করার আগেই, আমাদের কাস্টমারের প্রতিযোগী সংস্থা প্রায় সেম ডিজাইন, স্লোগান নিয়ে তাদের প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপন মার্কেটে ছড়িয়ে দিয়েছে। পুরনো কাস্টমারের কাছে হেনস্তার একশেষ হচ্ছি আমরা। তারা কাজ দেওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে।”
“চুরিটা আটকাতে পারছেন না কেন? এ তো খুব সোজা, আপনাদের কোনও স্টাফ ভিতরের খবর বাইরে পাচার করে দিচ্ছে।” বললেন বাবা।
মিস্টার ঘোষ বললেন, “না, মশাই। আমরাও প্রথম প্রথম তাই ভাবতাম। সেই কারণে আর্টিস্ট, কপি রাইটারদের দিয়ে চার-পাঁচরকম স্যাম্পেল করালেও, কাস্টমার কোনটা পছন্দ করছে জানতে দিতাম না। জানতাম আমরা তিনজন। প্রচারের উদ্যোগ নেওয়ার আগেই দেখি, কাগজে, হোর্ডিংয়ে আমাদের আইডিয়া নিয়ে অন্য কোম্পানির প্রোডাক্ট জ্বলজ্বল করছে। যেমন, আজ সকালে মর্নিংওয়াকে বেরিয়ে দেখি, দু’দিন পর যে পোস্টার আমাদের সাঁটার কথা, সেটা অন্য এজেন্সি সেঁটে দিয়ে গিয়েছে। এবারের চুরিটা আরও ন্যক্কারজনক, নীতিহীন। চোরেদেরও তো একটা নীতি থাকে। এদের সেটাও নেই।”
“ঘটনাটা সবিস্তার বলুন।” আগ্রহী কণ্ঠে বললেন দীপকাকু।
“ব্যাপারটা হয়েছে কী, একটা প্রোডাক্টের অ্যাড আমরা দু’ধাপে করব প্ল্যান করেছিলাম। এই পদ্ধতি আগেও অনেকবার ব্যবহার হয়েছে। আপনারা হয়তো লক্ষ করেছেন, কিছুদিন ধরে কলকাতার দেওয়ালে একটা পোস্টার ছেয়ে গিয়েছে, কালো কাগজের উপর হলুদ লেটারিং— ‘সময়ের দাম কমে গেল।”
ঝিনুক উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠে, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি দেখেছি! কীসের অ্যাড বলুন তো ওটা?”
“সেটাই হল কথা। এই প্রশ্নটাই আমরা পাবলিকের মনে ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। দু’সপ্তাহ ধরে প্রশ্নটা মাথায় নিয়ে ঘুরবে লোকে। তারপর সেই পোস্টারের পাশেই পড়বে নতুন পোস্টার, ‘রিদম ঘড়ির দাম এখন মাত্র একশো টাকা’।’
“দারুণ আইডিয়া!” বলে উঠল ঝিনুক।
একটুও উৎসাহিত হলেন না সুজয় ঘোষ। বিষণ্ণ গলায় বললেন, “আজ হাঁটতে বেরিয়ে দেখি, আমাদের প্রথম পোস্টারের পাশে সাঁটা রয়েছে— ‘প্লাজা ঘড়ির দাম এখন মাত্র একশো টাকা’।”
ঝিনুক তো বটেই, দীপকাকুও হতবাক হয়ে গিয়েছেন। বাবা বলে উঠলেন, “মাই গড! চুরি তো ওরা করেইছে, নিজেদের বিজ্ঞাপনের খরচার হাফ আপনাদের ঘাড় থেকে তুলে নিল। সত্যিই এটা খুবই নোংরা অ্যাটিটিউড।”
আলোচনা চলাকালীন যে যাঁর চা শেষ করেছেন। তবু নিজের ফাঁকা কাপের দিকে তাকালেন সুজয়বাবু। এতক্ষণ কথা বলে গলা শুকিয়ে গিয়েছে হয়তো। ফের নিজের থেকেই বলতে শুরু করলেন, “এর আগে পাঁচবার আমাদের কনসেপ্ট চুরি করেছে। সেটাকে তবু বিজনেসের অঙ্গ হিসেবে ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু এবার যা করল, পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, আমাদের ব্যাবসা তুলে দেওয়াই ওদের মূল লক্ষ্য।”
“ওদের বলতে? আপনাদের আইডিয়া কি বিভিন্ন এজেন্সি চুরি করছে, কোনও একটি এজেন্সি নয়?” অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর প্রশ্ন করলেন দীপকাকু।
“ঠিক তাই। সেই জন্যই তো কম্পিটিটরদের মূল অপরাধী হিসেবে ভাবতে পারছি না আমরা। আসল অপরাধী একজন। যে অন্য এজেন্সিগুলোকে আমাদের কনসেপ্ট বিক্রি করে দিচ্ছে। সেই পান্ডাটি কে? হিসেবমতো আমাদের তিন পার্টনারের মধ্যে একজন। রিম ঘড়ির অ্যাড সিক্রেট শুধু আমরাই জানতাম। বারবার কনসেপ্ট চুরি হয়ে যাচ্ছে দেখে, টোটাল কাজটা অফিসের কাউকে দিয়ে করাইনি। বাইরে বিভিন্ন জায়গায় অংশবিশেষের কাজ করিয়েছিলাম।”
“এই সমস্যায় আপনার হঠাৎ রজতদার কথা মনে পড়ল কেন?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।
উত্তর দেওয়ার বদলে ঝিনুকের দিকে তাকালেন মিস্টার ঘোষ। অতি বিনয়ে বললেন, “আর-এক কাপ চা হলে বড় ভাল হয়।”
আলোচনার একটা অংশও মিস করতে চায় না ঝিনুক, সিনেমায় যেমন ছবি হঠাৎ ফাস্ট করে এফেক্ট আনা হয়, সেইভাবেই মা-কে চায়ের কথা বলে এসে বাবার পাশের টুলে বসে পড়ল ঝিনুক। সুজয় ঘোষ বলে যাচ্ছেন, “আজকের কীর্তি দেখে তো মাথায় বজ্রাঘাত! প্রথমেই ভাবলাম পার্টনারদের ফোন করি। সেলফোন ছিল সঙ্গে। পরমুহূর্তে ভাবলাম, ঘুম ভাঙিয়ে ওদের খারাপ খবরটা দেওয়ার কোনও মানে হয় না। আবার আর-একটা কথাও মনে হল, কালপ্রিট তো ওই দু’জনের মধ্যেই একজন। আমার উৎকণ্ঠায় সে খুব মজা পাবে। সেটাই-বা তাকে পেতে দেব কেন? এদিকে টেনশনটা একা সহ্য করাও মুশকিল। হার্টের অসুখ আছে আমার। পেসমেকার বসানো হয়েছে। কী করি ভেবে পাচ্ছি না! পুলিশ, কোর্ট, এসব ভাবতে ভাবতে মাথায় এল, এটা তো প্রাইভেসি লিক আউট হয়ে যাওয়ার ঘটনা। নিরাপত্তার জন্য কিছু করতেই হবে। মনে পড়ল মিস্টার সেনকে। ওঁর সঙ্গে আলাপ হতেই মনে হয়েছিল, ভীষণ নির্ভরযোগ্য মানুষ। তাই সরাসরি চলে এলাম।
ঘরের চারজনই এখন একদম চুপ। ওয়াল ক্লকের মৃদু কিচকিচ শব্দটা শুধু শোনা যাচ্ছে। ব্যাটারিচালিত ঘড়ি। ঝিনুক ঘড়িটার দিকে তাকায়, অবাক হয়, খেয়ালই ছিল না তাদের ঘড়িটা রিম কোম্পানিরই। এদেরই বিজ্ঞাপনের বরাত পেয়েছিলেন মিস্টার ঘোষ। কিচকিচ শব্দটা ছিঃ ছিঃ শোনায় ঝিনুকের কাছে, যেন ভর্ৎসনা করছে সুজয় ঘোষকে।
বাবা শুরু করলেন কথা, “দেখুন মিস্টার ঘোষ, আপনার সমস্যায় আমি কতটা হেল্প করতে পারব জানি না। তবে আমার এই ভাইটিকে যদি দায়িত্ব দেন, আশা করি প্রবলেমটা সল্ভ করে দেবে।”
ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না সুজয়বাবু। অবাক হয়ে তাকালেন দীপকাকুর দিকে।
বাবা ফের বললেন, “আলাপ করিয়ে দেওয়ার সময় দীপঙ্করের আসল পরিচয়টা আপনাকে আমি দিইনি। দীপঙ্করের বারণ আছে। খুব প্রয়োজন ছাড়া ওর পরিচয় কাউকে দেওয়া যাবে না। আপনার ক্ষেত্রে দরকার হয়ে পড়েছে। দীপঙ্কর একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ কেস ইতিমধ্যে সল্ভ করেছে, নামটামও বেরিয়েছে কাগজে।”
কথা কেড়ে নিয়ে সুজয় ঘোষ বললেন, “ভালই হল, উনিই কেসটার দায়িত্ব নিন।” তারপর সরাসরি দীপকাকুর দিকে তাকালেন। বললেন, “কী, নিচ্ছেন তো?”
দীপকাকু নীরব। ঝিনুকের অস্বস্তি বাড়ছে, কেন এখনও ‘হ্যাঁ” বলছেন না দীপকাকু? আর-একটা ব্যাপার খারাপ লেগেছে ঝিনুকের। দীপকাকুর পরিচয় দেওয়ার সময় বাবা কেন অ্যাসিস্ট্যান্টের পরিচয়টা দিলেন না!
দীপকাকু চুপ করে থাকার মানেটা করে নিতে দেরি হল না সুজয় ঘোষের। যতই হোক, ব্যবসায়ী মানুষ। বললেন, “আপনার অ্যাডভান্স অ্যামাউন্ট যদি বলেন, আজই চেক রেডি করে দিতে পারি। ইনফ্যাক্ট, চেকবই থাকলে এখনই করে দিতাম।”
“সাড়ে এগারো হাজার টাকা।” বললেন দীপকাকু
এরকম খটমট অ্যামাউন্ট শুনে ঘরের বাকি তিনজনের ভ্রু কুঁচকে গেল। অ্যাডভান্স চাওয়ার ধরনটাও ঝিনুকের বেশ খারাপ লেগেছে। সুজয় ঘোষ খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে জানতে চাইলেন, “চেকটা তা হলে আপনার অ্যাড্রেসে আজ পাঠিয়ে দিচ্ছি। ঠিকানাটা যদি একটু বলেন!”
“আজ দরকার নেই। আমি কাল আপনাদের অফিসে যাব, তখনই দেবেন।” বলে, একটু থামলেন দীপকাকু। কী যেন চিন্তা করে নিয়ে বললেন, “আমাকে তদন্তের ভার দিলেন, এটা কি আপনার পার্টনারদের বলবেন?”
“অবশ্যই বলব! আপনাকে তদন্তের দায়িত্ব দিচ্ছে কোম্পানি। আমি নই। কেননা, আমি বাকি দুই বন্ধুর কাছে বিশ্বস্ত থাকতে চাই। কোনও কিছুই লুকিয়ে করব না।”
“ফাইন! এবার আপনার একটা পার্সোনাল কার্ড দিন আমাকে।”
“ও, শিয়োর!” বলে, পার্স বের করলেন মিস্টার ঘোষ।
ঝিনুকের খেয়াল হয়, ভদ্রলোক অনেকক্ষণ হল চা চেয়েছেন। কিচেনের উদ্দেশে উঠে যায় সে। মায়ের কাছ থেকে চা নেওয়ার সময় শুনতে পায়, বসার ঘরে কারও সেলফোন বাজছে। রিংটোন অচেনা। সম্ভবত সুজয় ঘোষের।
চায়ের ট্রে নিয়ে বসার ঘরে এসে ঝিনুক দ্যাখে, তিনজনের জায়গায় দু’জন। সুজয় ঘোষ নেই।
“কোথায় গেলেন?” বাবা, দীপকাকুর কাছে জানতে চায় ঝিনুক।
বাবা বললেন, “এক পার্টনারের ফোন এসেছিল, তাঁর চোখেও পড়েছে পোস্টারিংয়ের বদমাইশি। তিন পার্টনার এক্ষুনি মিটিং-এ বসবেন। তাই বেরিয়ে গেলেন।”
“ইস, চা খেতে চাইলেন! দেরি হয়ে গেল!” আপশোস করে ঝিনুক। টেবিলে ট্রে-টা নামিয়ে রাখতে না-রাখতেই দীপকাকু একটা কাপ তুলে নিয়ে গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন। বাবা অনেক রিল্যাক্সড। কেস চলে গিয়েছে দীপকাকুর জিম্মায়। হাসি হাসি মুখ করে দীপকাকুকে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, তুমি ওরকম সাড়ে টাইপের অ্যাডভান্স চাইলে কেন?”
প্রশ্নটা ঝিনুকেরও, সেও তাকিয়ে থাকে দীপকাকুর দিকে। চায়ে চুমুক দিয়ে দীপকাকু বললেন, “মোটরবাইকের শেষ কিস্তিটা দেওয়া বাকি আছে। কালই চিঠি পাঠিয়েছে ডিলার। ঠিক সাড়ে এগারো হাজার টাকাই ডিউ আছে। ভাবলাম, দেনাটা মিটিয়েই ফেলি।”
ঝিনুক তো অবাক! বলে, “আর আমরা যদি কেসটা সল্ভ না করতে পারি, তখন তো ফেরত দিতে হবে টাকাটা?”
“দেবে। পরবর্তী যে কেসটা আসবে, তার থেকে অ্যাডভান্স নিয়ে দিয়ে দেবে।” ব্যঙ্গের সুরে কথাটা বললেন বাবা।
দীপকাকু হাসছেন। ঝিনুক কিন্তু গম্ভীর। খুবই চিন্তিত মুখে দীপকাকুকে জিজ্ঞেস করে, “আপনার কি মনে হচ্ছে কেসটা খুব ইজ়ি, সহজেই সল্ভ করে ফেলব আমরা?”
“তদন্তে এখনও নামিনি, টাফ না ইজ়ি বলা কঠিন। তবে তোমার শেষ দুটো প্রশ্নে ‘আমরা” শব্দটা খেয়াল করলাম। মনে হচ্ছে এই কেসে তুমি আমার পিছু ছাড়বে না।”
ঝিনুক একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। সত্যিই সে বুদ্ধি করে ‘আমরা’ কথাটা বলে টেস্ট করছিল। মানুষটা সর্বদাই ভীষণ সজাগ। ঝিনুকের দোষ নেই, দীপকাকু সব ধরনের কেসে তাকে নেন না। কিছু কিছু কাজের পরিবেশ, পরিস্থিতি, মানুষ, সবই নাকি খুব খারাপ। যত দূর আন্দাজ করা যাচ্ছে, এই কেসটা তেমন হবে না। ঝিনুকের মনের কথাটাই বলে ওঠেন বাবা, “এই তদন্তে ঝিনুককে তোমার সঙ্গে নেওয়া উচিত দীপঙ্কর। অ্যাড ওয়ার্ল্ড সম্বন্ধে ওর একটা ধারণা তৈরি হবে।
নির্বিকারভাবে বসে আছেন দীপকাকু। পুরু ঘোলাটে চশমার আড়ালে চোখের ভাষা পড়া যাচ্ছে না। হঠাৎই সোফা ছেড়ে উঠে পড়ে বললেন, “ঠিক আছে, সকাল দশটায় রেডি থেকো। সুজয় ঘোষের অফিসে যাব।”
ঝিনুক স্বাভাবিক কারণেই খুব খুশি। বাবা বললেন, “সে কী, এখনই চললে!”
“হ্যাঁ, রজতদা। কেসটা বেশ ক্রিটিক্যাল মনে হচ্ছে। এখন থেকেই কাজ শুরু করে দিতে হবে।”
“কোথা থেকে শুরু করবে কাজ?”
“প্রথমে যাব পোস্টারগুলো দেখতে। মিস্টার ঘোষের ‘অ্যারো’ কোম্পানি সম্বন্ধে ডিটেলে খোঁজখবর নেব। যে এজেন্সি প্লাজা ঘড়ির অ্যাড অ্যারো এজেন্সির পোস্টারের পাশে সেঁটেছে, তাদের ব্যাপারেও খোঁজ নিতে হবে।” কথা বলতে বলতে দরজা পেরিয়ে গেলেন দীপকাকু। খানিক পরেই বাইরে বাইক স্টার্টের আওয়াজ পাওয়া গেল।
দীপকাকুর অ্যাডভান্স চাওয়ার ধরন তখন ভাল লাগেনি ঝিনুকের, চেক হাতে আসার আগেই দীপকাকুকে কাজে নেমে পড়তে দেখে, এখন মনে মনে ‘সরি’ চেয়ে নেয়।
ঝিনুকও আপাতত কিছু হোমওয়ার্ক করে নেবে। ম্যাগাজিনের বিজ্ঞাপনের পাতাগুলো এতদিন এড়িয়ে যেত। আজ দেখবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। ক্যাপশন, ডিজ়াইন, এজেন্সির নাম, মোটামুটি একটা ধারণা তৈরি করতে হবে। রহস্য যে কখন কোন বিষয়ে পাকিয়ে ওঠে, বোঝা মুশকিল!
